#বুকের_পাঁজর
#লেখনিতে:#ভরসা_জান্নাত (শ্যামকন্যা)
#পর্ব:০৬
দুপুরেও যে বাড়ি টা হাসি খুশি ছিল সন্ধ্যার পর তা মৃত্যুপুরী তে রূপ নিয়ে।ঘন অন্ধকার শুধু প্রকৃতিতেই নামেনি, শিকদার বাড়িতেও নেমেছে। ক্ষণে ক্ষণে কান্নার আওয়াজ ভেসে আসছে।
রহিমা শিকদার জ্ঞান হারিয়েছেন,তাকে পাশের রুমে রাখা হয়েছে। আকরাম শিকদার, আসলাম শিকদার আর আলামীন শিকদার তাদের বাবার বিছানায় দেহের ভর দিয়ে তার লাশের দিকে তাকিয়ে আছে।
তিন গিন্নি তাদের কর্তাদের পাশে দাঁড়িয়ে অবিরাম কেঁদে যাচ্ছে।হিরা,হাওয়া,হালিমা তাদের দাদুর মাথার কাছে বসে।
বাড়ির তিন ছেলে দাদার ঘরের দরজার সামনে রয়েছে।হামিম হাসিব দেয়াল ঘেঁষে বসে দাদার প্রাণহীন দেহের দিকে তাকিয়ে।হিম তাদের পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
শিউলি আর হাবিবা তাদের জ্ঞানহীন দাদির পাশে বসে কেঁদে ই যাচ্ছে।
আস্তে আস্তে মানুষ আসা শুরু করেছে। ইসলাম শিকদারের মেয়ে আকলিমা বেগম রংপুরে থাকেন।তারা রওনা দিয়েছেন।
ইসলাম শিকদারের বোন বগুড়া থাকেন।তাকেও আসতে বলা হয়েছে।তারা সবাই জানে ইসলাম শিকদার শুরুতর অসুস্থ।অনেক দূর থেকে আসবে,সরাসরি মৃত্যুর খবর শুনলে রাস্তাঘাটে কি না কি হয় সেই হিসাব করে তাদের কিছু বলেননি রোকেয়া বেগম।
হিরার চোখের পানি যেন থামার নাম নিচ্ছে না।মেয়েটা হারানো ব্যাথা বোঝে না,নানা নানি ওর জন্মের আগেই মারা গেছে।এই প্রথম কাউকে হারালো ও।হাওয়া না হয় বাড়ির বাইরে ছিল কিন্তু ও আর ওর দাদু,দুজন তো বাড়িতেই ছিল।ও যে কখন শিকদার বাড়িতে একা জীবন্ত মানুষ হয়ে গেছে বুঝতেই পারিনি।কিছু ভাবতে পারছে না ও।
হামিম হাসিব সবাই কেঁদেছে। শুধু হিম ছেলেটাই চোখ লাল করে দাঁড়িয়ে আছে।ওর চোখ থেকে ঐ এক ফোঁটায় পানি পড়েছে যা কেউ দেখেনি।এখন গায়ে একটা টিশার্ট পড়া।ওর মাথাতে ছিল না এটা।বেশ কিছুক্ষণ পর খেয়াল করেছে।হিরা অজ্ঞান হয়ে যেতেই ও ওকে কোলে করে রুমে দিয়ে এসেছিল। ততক্ষণে হাওয়া এসে পড়েছে।বেচারি কিছু বুঝে উঠতে পারেনি তখন, শুধু হ্যাবলার মতো দাদার লাশকে দেখেছে।
হিরাকে রুমে দিয়ে হিম সোজা নিজের রুমে গেছে।ফোন টা রুমেই রয়েছে।রুমে ঢুকে আগে হামিম কে কল করল, রিং হওয়া অবস্থায় টিশার্ট পরে ফেললো।
“হ্যালো”
“ভাইয়া সবাইকে নিয়ে দ্রুত বাড়িতে আয়।একটু দরকার।বাবাদেরও নিয়ে আসিস।”
হামিমকে কিছু বলতে না দিয়েই কল কেটে দিল হিম।
নিচে নামতে নামতে হাবিবাকে কল করল।
“আসসালামুয়ালাইকুম”
“ওয়ালাইকুমুস সালাম।শোন,আম্মুদের নিয়ে দ্রুত বাসায় আয় তো।হিরা অসুস্থ হয়ে পড়েছে।”
বলেই কল কেটে দিল।
মহিলারা ভাবে বেশি,তাই কিছু বলতেই হতো।না বললে কি না কি ভেবে প্যানিক করত,তার থেকে হিরার কথা বলে সামলে নেওয়াটাই উচিত বলে মনে হলো।
দাদার রুমে গিয়ে হাওয়াকে ঐ ভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ওকে ডাক দিল।
“হাওয়া”
হিমের ডাকে তার দিকে তাকালো হাওয়া।
“মানুষ মরণশীল।একদিন সবাইকেই চলে যেতে হবে।যা হিরার কাছে যা।জ্ঞান ফিরলে ভয় পাবে।”
ওর কথায় মাথা নাড়িয়ে কাঁদতে কাঁদতে উপরে চলে গেল হাওয়া।ব্যাগটাও তখনো ওর কাঁধে।
আধা ঘন্টার মধ্যেই হামিম রা চলে এলো।হামিম কে হিম ম্যাসেজ করেছিল,লেখাছিল ‘দাদার ঘরে আয়’
সেই অনুযায়ী সবাই ইসলাম শিকদারের ঘরে গেলেন।হিম তখন বিছানার কোনায় বসে।সবাইকে আসতে দেখে উঠে দাঁড়ালো। ইসলাম শিকদার কে ঐ ভাবে শোয়া আর তাদের গোছানো ছেলেটাকে উদ্ভ্রান্ত ছন্নছাড়া অবস্থায় দেখে তাদের বুকটা ছ্যাত করে উঠল।মাথায় খারাপ ভাবনা আসছে, কিন্তু মন মানছে না।
“দাদা আর আমাদের মধ্যে নেই।”
হিমের ভারী কন্ঠের কথাটা সবার কাছে অবিশ্বাস্য লাগছে।ভুল শুনলো নাকি।তখনো ইসলাম শিকদারের তিন ছেলে হিমের দিকে প্রশ্নবিদ্ধ চোখে তাকিয়ে।তাদের তাকানো দেখে হিম মাথা নাড়লো।তখনই তিন ছেলের চিৎকার করা কান্নার আওয়াজ শোনা গেল, তিন জনেই বাবার লাশের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল।
একদিকে দাদার মৃত্যু আরেকদিকে বাবাদের কান্না সহ্য করা গেল না।হামিম নিচে বসেই হুঁ হুঁ করে কেঁদে দিল।হাসিবও নিজেকে সামলাতে পারল না।
ওদের কান্নার মাঝেই বাড়িতে মহিলারা প্রবেশ করল। বাড়িতে ঢুকতেই নিজেদের ছেলে স্বামীর কান্নায় তাদের বুকটা খচখচ করে উঠল।আসমা বেগম পড়ে যেতে লাগলেন।হিম ফোনে হিরার কথা বলেছে তার মানে হিরার….।ভাবতে পারলেন না আসমা বেগম।কান্নার আওয়াজের দিকে ছুটে গেলেন।তার পিছু পিছু বাকিরা গেল।
ইসলাম শিকদারের রুমে ঢুকতেই দেখা গেল হামিম হাসিম কাঁদছে,বাড়ির কর্তরা বিছানায় কাকে ধরে জানি চিৎকার করছেন।
‘বাবা’ ‘বাবা’করছেন তারা।রহিমা বেগম এগিয়ে তিন ছেলের সামনে গেলেন।ঐ তো,তার তিন ছেলে তাদের বাবাকে ধরে কাঁদছে, কিন্তু কেনো?
তার সাথে কথা বলেই তো রহিমা বেগম বেরিয়েছিলেন।কত কথায় তো বলেছিলেন তার সারাজীবনের সঙ্গীর সাথে।
তার ভাবনার মাঝেই হিম এসে দাঁড়ালো তার মাঝে।নিজের পাশে কারো অস্তিত্ব পেয়ে তার দিকে তাকালেন তিনি।
“দাদু..ভাই তোমার…. দাদু”
কাঁপা কন্ঠে জিজ্ঞেস করলেন তিনি।তার কথায় হিম মাথা নাড়ল।তার কাঁধ জড়িয়ে ধরল।
“মা”
বড়ছেলের অসহায় কন্ঠে তার দিকে তাকালেন তিনি।তাকে দেখে তার তিন ছেলে উঠে বসেছে।থেমে থেমে কাঁদছে তারা।
হঠাৎ করে দুনিয়া অন্ধকার হয়ে এলো তার।হিমের উপর নিজের ভার ছেড়ে দিলেন। হিম সামলে নিলো কিন্তু তিন ছেলে মাকে এভাবে ঢলে পড়তে দেখে লাফিয়ে উঠল।মা মা বলে ডাকতে লাগল।
“মানসিক চাপে অজ্ঞান হয়ে গেছে।দাদার এভাবে চলে যাওয়া নিতে পারেনি।আমি দাদিকে তোমাদের রুমে রেখে আসছি।”
বলেই দাদিকে কোলে নিয়ে মা বাবার রুমে চলে গেল হিম। শিউলি কে ডেকে বলল তার কাছে থাকতে।
পুনরায় দাদার রুমে আসতেই হাওয়াকে দেখল।সবার কান্না শুনে মেয়েটা নিচে নেমে এসেছে।
“হিরার কি অবস্থা?”
হিমের প্রশ্নে সবাই হিমের দিকে তাকালেও হিম হাওয়ার দিকে তাকিয়ে।সত্যিই তো,এসবের মধ্যে হাওয়া হিরা যে নেই তা খেয়াল করেনি কেউ।আর হিম তো ফোনে হিরার কথা বলল,কি হয়েছে কি হিরার।
“এখনো জ্ঞান ফেরেনি।”
হাওয়ার কথায় হিম আর কিছু বলল না।সোজা উপরে হিরার কাছে গেল।ওর পিছু পিছু রোকেয়া বেগম আর আসমা বেগম গেলেন।
হিরাকে ওভাবে দেখে আসমা বেগমের মা মন টা নিতে পারল না। ডুকরে কেঁদে উঠলেন।হিম তখন হিরার পার্লস চেক করছে।
চিন্তার কিছু না,একটু পরেই জ্ঞান ফিরে আসবে।হিরার অবস্থা দেখে নিশ্চিত হয়ে হিম নিচে চলে গেল।
রোকেয়া বেগম হিরার মাথায় হাত দিয়ে চলে গেলেন।সবাইকে ভেঙে পড়লে হবে না। আত্নীয় স্বজন কে জানাতে হবে তো।
আসমা বেগম হিরার পাশে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন।কি অবস্থা তার মেয়েটার,চোখ টা তখনও ভেজা।মুখ শুকিয়ে গেছে,চুলগুলোর কি বিচ্ছিরি অবস্থা!!
নিজের চোখ মুছে তিনি মেয়ের কপালে চুমু দিয়ে বেরিয়ে গেলেন।বাড়ির পরিস্থিতি ভুললে চলবে না।সবাইকে সামলাতে হবে।অনেক কাজ।
এশার আযান দিয়েছে। শিকদার বাড়িটা আশপাশের আত্মীয় স্বজন আর প্রতিবেশীতে ভরে উঠেছে।
হিমের বন্ধুরাও এসেছে।ওদের হিম ই ডেকেছে।হয়ত কোনো দরকারে!!
এশার নামাজ পড়েই শিকদার বাড়ির সবাই বেবিয়ে যাবে গ্রামের উদ্দেশ্যে। ইসলাম শিকদারের ইচ্ছা ছিল নিজের জন্মভিটায় শায়িত হওয়ার।
অ্যাম্বুলেন্স এসেছে পড়েছে। ইসলাম শিকদারের লাশকে তাতে তোলা হয়েছে।যদিও বাড়ির গাড়ি রয়েছে তারপরেও রহিমা বেগম, আকরাম শিকদার, আসলাম শিকদার আর আলামীন শিকদার সবাই অ্যাম্বুলেন্স এ যাবে।
হিম হামিমকে অ্যাম্বুলেন্সের ড্রাইভারের পাশে বসতে বলে রওনা দিতে বলল। বাড়ির সবাইকে নিয়ে ওরা চলে আসবে।
অ্যাম্বুলেন্স চলে যেতেই হিম বাড়িতে প্রবেশ করল।সবাই ইসলাম শিকদারের রুমে,দূরের আত্মীয়দের বলা হয়েছে ওদের দাদাবাড়ি মানে খুলনায় যেতে।
কেউ তার মৃত্যুর খবর জানে বা কেউ জানে না।
আপাতত হাওয়া হিরার মামা’রা চলে এসেছে।হালিমা হাসিবের নানা বেঁচে নেই।নানি আর এক মামা এসেছে।
হিম হামিমের নানা নানি তো ঐ গ্রামেই থাকে।হিমের নানা আর দাদা চাচাতো ভাই।
হাসিব হিম মিলে সব আত্মীয়দের গাড়িতে তুলে দিল।তাদের গাড়িতে হাসিব সাথে গেল।ওদের গাড়ির পিছনে হিমের বন্ধুরাও গেল।
সুমাইয়া এসেছে,হাবিবা হালিমার কাছে বসে আছে ও।কি থেকে কি হলো ও বুঝতেই পারছে না।এই তো কিছুক্ষণ আগে শিকদার বাড়ির মহিলারা ওর জন্য তাদের বড় ছেলের বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে গেল।হামিম কে তার পরিবার চেনে,তাই তারাও না করেনি।বিয়ে ফাইনাল করবে তখনই হিমের কল এলো। তৎক্ষণাৎ ই সবাই বেরিয়ে গেল।মাগরীবের নামাজ পড়ার পরপরই হাবিবা ওকে কল দিয়ে ইসলাম শিকদারের মৃত্যুর কথা জানালো।
সবার সম্মতি নিয়েই ও এখানে এসেছে।ওর ভাবনার মাঝেই হিম ঘরে ঢুকে কাশি দিল।
“সবাই চলো,গাড়ি বের করেছি। অনেকটায় সময় লাগবে যেতে।দেড়ি করলে চলবে না।আমি রেডি হতে যাচ্ছি,তোমরাও রেডি হয়ে নেও।”
বলেই চলে গেল নিজের রুমে।
হিম চলে যেতেই সবাই ডুকরে কেঁদে উঠল।রোকেয়া বেগম নিজের জা’দের নিয়ে চলে গেলেন।হাবিবাদের বলে গেলেন রেডি হতে। মুহূর্তেই ঘরটা খালি হয়ে গেল।সুমাইয়াও গেলো ওদের সাথে।
কালো প্যান্ট আর ডার্ক চকলেট শার্ট পড়ে হিম নিচে নেমে এলো।শার্টের হাতা ভাজ করে গাড়িতে হেলান দিয়ে আকাশের দিকে তাকালো।
কিছুক্ষণের মধ্যেই বাড়ির মহিলারা বেরিয়ে এলেন।তাদের কে গাড়িতে ঠিক ভাবে বসিয়ে নিজে ড্রাইভিং সিটে বসল।করিম বসেছে ওর পাশে।
মুহূর্তেই ওদের কালো গাড়িটা শিকদার বাড়ি ছেড়ে চলে গেল। মানুষে পরিপূর্ণ থাকা শিকদার বাড়ি ক্ষণিকের মধ্যেই জনমানবশূন্য হয়ে পড়ল। বাড়ির সবচেয়ে বড় কর্তা আর কখনো পা রাখবেন না এই বাড়িতে।
তার অস্তিত্ব চিরকালের মতো মুছে গেলো শিকদার বাড়ি থেকে।
#চলবে?

