বুকের_পাঁজর #লেখনিতে:#ভরসা_জান্নাত (শ্যামকন্যা) #পর্ব:০৫

0
2

#বুকের_পাঁজর
#লেখনিতে:#ভরসা_জান্নাত (শ্যামকন্যা)
#পর্ব:০৫

“একটা ইনফরমেশন পেয়েছি স্যার।আপনি দ্রুত চলে আসুন।”
জবাব না দেয়েই কল কেটে দেয় যুবক।বাইরে ভোরের আলো কেবল ফুটতে শুরু করেছে, আযান শেষ হলো।ফোন রেখেই উঠে দাঁড়ালো, পড়নে একটা ট্রাওজার।ওয়াশরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে বাইরে যাওয়ার জন্য তৈরি হলো।কালো প্যান্টের উপর সাদা শার্ট,শার্টের সামনের একটা বোতাম খোলা।মাথায় টুপি পড়েই বের হলো।নামাজ পড়েই কাজে যাবে।
___________________________________________________________________________

শিকদার বাড়ির সবাই উঠে পড়েছে।ছোটরা যে যার পড়াশোনা করছে।পড়াশোনায় ফাঁকি দেয় না কেউ,এদিক দিয়ে সবাই ভালো।হাবিবা,হালিমার ডাক্তার হওয়ার ইচ্ছে এবং নিজেদের হাসপাতালেই যুক্ত হতে চায় যেখানে তাদের মা বাবা সহ হিম যুক্ত আছে।তবে হাওয়ার ইচ্ছে টিচার হওয়ার।বাংলা নিয়ে পড়ছে সে। এটা তার প্রিয় সাবজেক্ট,বাংলা নিয়ে পড়ে মানে এই না যে সে ভালো স্টুডেন্ট না।তবে ওদের সবার থেকে হিরা আলাদা,তার কোনো স্বপ্নই নেই।পড়া দরকার তাই পড়ছে, অন্তত নিজের বাচ্চাদের তো পড়াতে পারবে।যদি কিছু করার সুযোগ আসে তবে সে কেমিস্ট হতে চাই, রসায়নের প্রতি খুব আগ্রহ তার।

“হিম কোথায়? এতক্ষনে তো নিচে নামার কথা।বাড়িতে নেই নাকি?”
আকরাম শিকদার রোকেয়া বেগমের কাছে জিজ্ঞেস করলেন।সবাই সকালের খাবার খেতে বসেছে, একমাত্র হিমের চেয়ার ফাঁকা।
“না,ও বাড়িতে নেই।কখন গেছে জানি না তবে দারোয়ান বলল সে নাকি হিম কে রেডি হয়েই বেরিয়ে যেতে দেখেছে।ভোর সকালে হাসপাতালে কি কাজ তোমার ছেলের বুঝি না আমি”

ওনার কথায় হামিম,হাসিব,আকরাম শিকদার, ইসলাম শিকদার আর রহিমা শিকদারের হাত থেমে গেল।কি জবাব দেবে তারা। জেনেও না জেনে থাকতে হবে। আল্লাহর কাছে উনি সবার আগে একটা জিনিস ই চান,হিম সুস্থ থাকুক।হিমের ভবিষ্যৎ ভাবলেই ওনার গায়ে কাঁটা দেয়,কি হতো তার ছেলে যদি স্বাভাবিক মানুষ হতো। আল্লাহ তার ছেলেকে এমন এক ক্ষমতা দিয়েছে যে ক্ষমতা কাজে লাগালে বিপদ নিশ্চিত। আল্লাহ যা করে ভালোর জন্যই করে,ছিল কোনো কারণ।আপাতত প্রসঙ্গ পাল্টানো উচিত।

“আছে কোনো দরকার।দেশের যে অবস্থা,কখন কার কি হবে কেউ কি বলতে পারবে।হয়ত জরুরি কোনো রুগী এসেছে, ডাক্তারের কাজ ই হলো রুগীর চিকিৎসা করা। তোমাদের ডাক পড়লে কি তোমরা না যাওয়া হতে!!যায় হোক,আজকে তোমরা সুমাইয়ার বাসায় যাও।অফিসে অনেক কাজ আছে,হাসপাতালেও বেশ কাজ রয়েছে তাই আমরা কেউ যাব না।হাবিবা হালিমাকে নিয়ে যেও।”
“বড় চাচ্চু,আমি আর হাওয়াপুও যায়?”
“মেয়ে দেখতে যাচ্ছি আমরা,কোনো অনুষ্ঠানে না।তুমি আর হাওয়া বাসায় থাকবে।যেকোনো সময় হিম হাসপাতাল থেকে আসতে পারে।”

আসমা বেগমের কথায় মাথা নিচু করে নিল হিরা। কিন্তু কেউ কিছু বলল না,আসমা বেগমের কথায় যুক্তি আছে।আর বাড়িতেও তো কাউকে থাকতে হবে।

“আমি কিন্তু যাব না।শরীর টা কেমন জানি ভালো লাগছে না।তোমরা যাও।”
ইসলাম শিকদারের কথায় সবাই চিন্তিত মুখে ওনার দিকে তাকালো।শরীর প্রায় সময় খারাপ থাকে তার।৮৫+ বয়স যার,তার জন্য এটা স্বাভাবিক।

“কি হয়েছে বাবা?খুব খারাপ লাগছে?ডাক্তারের কাছে যাবে?”
আকরাম শিকদারের কথায় ইসলাম শিকদার হেসে দিলেন।ওনার বয়স হয়েছে,কেউ কি বোঝে না। মৃত্যুর ডাক আসবেই,বাস্তব হলেও মেনে নিতে কষ্ট।ওনার মনটা কেমন খচখচ করছে।মন বলছে,উনি আর বেশিক্ষণ নেই।
“ধুর ছেলে,এমনিই একটু মাথা ব্যাথা করছে। ওষুধ খেলেই ঠিক হয়ে যাবে।এখন খা তো।খাওয়ার সময় এত কথা বলতে নেই।”
ওনার কথায় মাথা নাড়িয়ে সবাই খাওয়ায় মন দিল।
___________________________________________________________________________

ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে মটু পাতলু দেখছে হিরা।দাদুর রুম থেকে এসেই এখানে বসলো,ঘুমিয়ে আছে তাই ডাকেনি তাকে।হাওয়া পড়াতে গেছে। যদিও তাঁর প্রয়োজন হয়না কিন্তু এটা অনেক টা প্রাকটিস,তাই কেও কিছু বলে না।

সাদা প্লাজুর উপর খয়েরি রঙের কামিজ পড়া সে,সাদা রঙের ওড়না গলায়।গলার কাপড় কখন নিচে নেমে গেছে কিন্তু সে খেয়াল কি তার আছে?সে তো হাসতে ব্যস্ত।তখন দরজা খুলে ভিতরে ঢুকল হিম।তারা মাঝে মাঝেই রাত করে বাড়ি ফেরে,যাতে কাউকে ডিস্টার্ব করতে না হয় তাই সবার কাছে একটা ডুবলিকেট চাবি থাকে।

ভেতরে ঢুকতেই যা হিমের চোখে পড়ল তাতে পা থেকে পাথা অবদি শিরশির করে উঠল তার।হিরা কার্টুন দেখছে কিন্তু তার ওড়না বুকে থাকলেও গলা থেকে অনেকটা নেমে গেছে।ফর্সা গলার বিউটি’বন দেখে গলা শুকিয়ে গেল হিমের।বারবার ঢোক গিলছে, নিষিদ্ধ কিছু করতে ইচ্ছে করছে তার।চোখ বন্ধ করে ফেলল সে, কিন্তু তবুও ভেসে উঠল ঐ ফর্সা গলা,ঐ বিউটি’বন।চোখ খুলল সে কিন্তু এবার যা দেখল তাতে চোখটা বড়’ই হয়ে গেল,ডান কাধ থেকে ওড়না পড়ে গেছে হিরার।হিমের চারিদিক থেকে হিরার হাসির শব্দ আসছে যেন,আর চোখের সামনে লোভনীয় কিছু।পুনরায় চোখ বন্ধ করে ঘুরে গেল ও,বড় বড় শ্বাস ফেলল কয়েকবার। ডাক্তার মানুষ সে,নিজেদের কে কন্ট্রোল করতে পারে। এছাড়া বিদেশে কত মেয়েই তো দেখেছে,কত ছোটোই না তাদের পোশাক। কিন্তু সবার জীবনে এমন কিছু মানুষ থাকে যাদের সামান্য ছোঁয়ায় হার্টবিট বেড়ে যায়।কয়েকবার মাথা নাড়া দিয়ে হিম শক্ত কন্ঠে বলল,
“ওড়না ঠিক কর বেয়াদব।”

বলে দুমিনিট পর পেছন ফিরল,কেউ নেই।দরজা বন্ধের শব্দ পেয়েই ঠোঁটের কোনে হাসি ফুটল তার।অপেক্ষার দিন শেষ,তাকে নিজের বুকে আনার সময় চলে এসেছে।বয়সের দিকে তাকিয়ে চুপ ছিল, কিন্তু নিজের জীবনের উপর সামান্য আস্তা থাকলে করতো অপেক্ষা।আপাতত সাওয়ার নিতে হবে তার।ভাবতে ভাবতেই নিজের রুমে চলে গেল হিম।
___________________________________________________________________________

নিজেদের ঘরে গিয়ে হাপাচ্ছে হিয়া। হাঁপাতে হাঁপাতে ই দরজা ঘেঁষে বসে পড়ল।ইস,কি লজ্জায় না পড়তে হলো।রাগে ওড়না টা দূরে ফেলে দিলো।যা থাকতেই চায় না তাকে জোর কি লাভ!! আচ্ছা,ও কোন দিক দিয়ে খারাপ যে সবার ওড়না তাদের কাছে থাকলেও ওর ওড়না ওর কাছে থাকে না। ভাবতে ভাবতে ফ্লোর থেকে উঠে আয়নার সামনে দাঁড়ালো যেখানে ওর হাঁটুর নিচ পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে। খোঁপা করা চুল গুলো ছেড়ে দিল। আচ্ছা সত্যিই এই বয়সটাই এমন!ও তো বইতে পড়েছে,সত্যিই নিজেকে আয়নায় দেখতে ইচ্ছে করে।নিজের মধ্যে অদ্ভুত কিছু দেখতে পায়।

সব ভাবা বাদ দিয়ে ও ওড়না টা ঠিক করে গায়ে দিল।একটু পরেই হাওয়া চলে আসবে।বাড়ির লোকেরা কখন আসবে কে জানে। আপাতত ও দাদুর রুমে যাবে,ঘুম থেকে উঠেছে কিনা কে জানে।না উঠলে ডাকবে,নামাজ পড়েছে কিনা আল্লাহ ই ভালো জানে।ভাবতে ভাবতে রুম থেকে বের হলো। সিঁড়ির সামনে এসে হিমের রুমের দিকে তাকালো।একটু আগের কথা মনে পড়তে লজ্জায় চোখ দুটো বন্ধ করে ফেলল।হিমের সামনে ও কীভাবে যাবে?
হিম আসলে হিমের খেয়াল রাখতে বলে গেছে মা।কিছু লাগবে কিনা ও কীভাবে বুঝবে? জিজ্ঞেস করার মতো অবস্থায়ও নেই ও।ধুর,হাওয়া আসলে হাওয়ায় সব দেখবে।যার তা সে ই বুঝে নিক,ও ক্যান মাথা ঘামাবে।ভেবেই নিচে নেমে গেল।
___________________________________________________________________________

“দাদু?ও দাদু,কথা বলো না।দাদু,কথা বলছো না কেনো?দাদু?”

হিরা বলছে আর ইসলাম শিকদার কে ধাক্কা দিচ্ছে।পুরো শরীর ঠান্ডা হয়ে গেছে তার। নিঃশ্বাস পড়ছে না।ও কি করবে ভেবে পেলো না। হঠাৎ হিমের কথা মাথায় এলো।আর কিছু না ভেবেই দৌড়ে হিমের রুমে চলে গেলো।দরজা খোলা দেখে ভেতরে চলে গেল।কোথাও নেই হিম, তারমানে ওয়াশরুমে।পাগলের মতো হিমের ওয়াশরুমের দরজায় ধাক্কা দিতে লাগলো ও।

উপর থেকে এসেই সাওয়ার নিতে এসেছিল হিম।আপাতত তো বাড়িতে হামিম হাসিব নেই,ওরা ছাড়া ওর রুমে তেমন কেউ আসে না।ওয়াশরুমে ধাক্কা দেওয়া তো পরের কথা,ওরা আসলেও বসে থাকে, ওয়াশরুমে ধাক্কা দেয় না।সাওয়ার অফ করতেই হিরার গলা শুনতে পেলো। কীভাবেই না ডাকছে ওকে,দ্রুও প্যান্ট পড়ে বের হলো ও।

ওয়াশরুমের দরজা খুলে হিম বের হতেই হিরা ওর কাছে এগিয়ে গেল।কেমন জানি করছে ও,কিছু বলতে চাইছে কিন্তু পারছে না। মুখ দিয়ে শব্দই বের হচ্ছে না,এক বার মাথায় হাত দিচ্ছে আবার পেছন দিকে দেখাচ্ছে।চোখ দিয়ে পানি পড়ছে।হিম হাত রাখলো ওর কাঁধে,

“রিল্যাক্স, রিল্যাক্স।কি হয়েছে বল,আমি শুনছি তো।”
হিরা বড় বড় শ্বাস নিয়ে হিমের দিকে তাকিয়ে ভাঙা গলায় বলল,
“দদদাদুউ,দাদু.. ঠাঠান্ডাআ,কককথথাআ ববলেএ না।”

এইটুকু বলতেই দম বেরিয়ে গেল ওর।বাকি কথা শোনার প্রয়োজন হলো না হিমের। শুধু প্যান্ট পড়া অবস্থাতেই বেরিয়ে গেল,ওর পিছু পিছু হিরাও গেলো।

হিম গিয়েই আগে পার্লস চেক করল,হিরা ইসলাম শিকদারের কখনো হাত বা পা টিপছে আর চাতক পাখির ন্যায় ওর দিকে তাকিয়ে আছে।পার্লস চেক করেই এদিক ওদিকে তাকিয়ে হিরার দিকে তাকালো,ওকে কাছে ডাকলো।
“ওখান থেকেই বলুন না”
“কাছে আয়”

এক পা ফ্লোরে আর অন্য পা বিছানায় দেওয়া হিমের কাছে গিয়ে দাঁড়ালো হিরা।হিম ওর মাথায় হাত রেখে বলল,
“মানুষ মরণশীল, আল্লাহ ডাক দিলে আমাদের তো যেতেই হবে তাই না?”

হিমের কথায় টপটপ করে পানি পড়ছে হিরার চোখ থেকে।ওর চোখের পানি দেখেই ওকে বুকে টেনে নিল হিম, হুঁ হুঁ করে কেঁদে দিল হিরা।হিমের বুকে মাথা রেখে ওর পিঠ আঁকড়ে হাও মাও করে কাঁদছে হিরা। হঠাৎ করে ও হিমের পিঠ ছেঁড়ে দিল। সম্পূর্ণ শরীরের ভার হিমের উপর দিয়ে দিল।হিরাকে এভাবে নিশ্চুপ হতে দেখেই হিম ওর মুখ টা উঁচু করল, অজ্ঞান হয়ে গেছে মেয়েটা।ওর কপালে চুমু দিয়ে চোখ বন্ধ করে আবার বুকে টেনে নিল ওকে, বন্ধ চোখের পাতা থেকে গড়িয়ে পড়ল এক ফোঁটা পানি।

#চলবে?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here