#বুকের_পাঁজর
#লেখনিতে : #ভরসা_জান্নাত (শ্যামকন্যা)
পর্ব:০২
চার বোন গোসল করে নামাজ পড়ে ড্রয়িং রুমে বসে টিভিতে সিআইডি দেখছে।বাড়ির গিন্নি রা যে যার রুমে,কর্তারা এলে তাদের খাবার দিবেন।বাড়ির সবাই সকাল আর রাতের বেলা একসাথে খায়, দুপুরে প্রায় সবার বাইরে থাকতে হয়,তাই এটা আর একসাথে খাওয়া হয়ে ওঠে না।
আপাতত চার বোন সিআইডি দেখতে ব্যস্ত। চারজনের মধ্যে তর্কাতর্কি হচ্ছে খুনি কে এটা নিয়ে।চারজনে চারজনকে খুনি বানিয়েছে যেখানে খুনি একজন।এবার লাস্টেই বোঝা যাবে কার ধারণা সঠিক।
তিন বোন সোফায় বসে সিআইডি দেখলেও ছোটো বোন তাদের পায়ের কাছে বসে আছে।বসে আছে বললে ভুল হবে,কখনো দাঁড়ায়,কখনো বসে,কখনো ওড়না কামড়ায় বা কখনো আঙুল কামড়ায়।শিউলিও তাদের সাথে বসে টিভি দেখে,আর সে একা দেখলে সবসময় শুধু সিরিয়াল দেখে।
চার জন যখন আসল খুনিকে খুঁজতে ব্যস্ত তখন ই বাড়িতে সবাই প্রবেশ করল জিলাপি হাতে। প্রতি শুক্রবারই জিলাপি পাওয়া যায় তাদের মসজিদে।যদিও বাড়ির মেয়েরা সবসময় শালীন ভাবে থাকে তবুও তারা ঘরে ঢোকার সময় কাশি দিয়ে ঢোকে।
আজকেও তার ব্যাতিক্রম কিছু হলো না।তাদের কাশির শব্দে চার বোন ইহজগতে প্রবেশ করে।বাবা চাচা ভাইদের দেখে তারা সবাই সোফা থেকে উঠে দাঁড়ালো।
সবার শেষে বাড়িতে হিম ঢোকে।সাদা পাজামা আর কালো পাঞ্জাবি পড়া হিম কে দেখে কারো নিস্বাস থেমে গেল বোধ হয়। হার্টবিট মিস করল কটা কে জানে।কারো ভেতরে যে এতটা তোলপাড় হচ্ছে তা সবার ই অজানা রইল।
বাড়িতে এসে সবাই সোফায় বসল। আকরাম শিকদার হিরাকে ডাক দিলেন।হিরা হাসি মুখে গেলে তিনি তার জিলাপি গুলো হিরাকে দিয়ে দিলেন।এভাবেই সবাই হিরাকে জিলাপি দিল।তার ছোটো হাত খানা জিলাপি দিয়ে ভরে গেছে।
ও চোখ দিয়ে বোনেদের ডাকে।তিন বোন হেসে ওর কাছে গেলে ও জিলাপি সব তাদের হাতে দিয়ে দেয়।এটা প্রতি শুক্রবার এর ঘটনা।সবার ছোটো হওয়ায় আদুরে তো সে হবেই।প্রত্যেকের জিলাপি ও একা হাতে কোনোদিন কি রাখতে পারে?বাড়ির কর্তারা জেনেও ওর কাছেই দেবে,আর ও বোনদের ডেকে তাদের হাতে দেবে।
সবার জিলাপি নেওয়া হয়ে গেছে হিরার, শুধু হিমের টাই হয়নি। সবার শেষে বসে আছে সে,হীরা তার সামনে গিয়ে দু হাত রাখলো।চোখ বন্ধ করে সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে ছিল হিম।হীরা সামনে আসতেই চোখ খুলে তাকালো।
ব্যাস,হিরার হাঁটু আউট কফ কন্ট্রোল হয়ে গেল।হিমের তাকানো দেখলেই ওর হাঁটু কাঁপে,হিমের সামনেই দাঁড়াতে পারে না।সবাই যেমন ওকে আদর করে তেমন শাসনও করে।
একমাত্র হিম যে ওকে শাসন করে না,একেবারে গায়েই হাত তোলে।
এই তো এসএসসি পরীক্ষার আগে বিদায় অনুষ্ঠানে ওর বান্ধবী রা সবাই শাড়ি পড়েছিল।ওদের দেখাদেখি হিরাও জেদ ধরেছিল শাড়ি পড়বে।দাদির অনুমতি নিয়ে শালীন ভাবেই শাড়ি পড়েছিল।
ও যখন নিচে নামবে তখন হিমও হাসপাতারে যাওয়ার জন্য রেডি হয়ে নিচে নামছিল। দুজনের সিঁড়িতে ই দেখা।হিম ওর সামনে দাঁড়িয়েছে দেখে জিজ্ঞেস করেছিল,
“কিছু বলবেন ভাইয়া?”
“শাড়ি কেনো পড়েছিস?”
“আজকে আমাদের স্কুলে বিদায় অনুষ্ঠান হওয়ায় সবাই শাড়ি পড়বে।তাই আমিও পড়েছি।”
“কাকে জিজ্ঞেস করে পড়েছিস?”
“দাদিকে”
“এখনই এই শাড়ি খুলে বোরকা পড়ে যাবি।”
“কেনো ভাইয়া?আজকে একটু পড়ে যায় না প্লিজ।”
ব্যাস,ওমনি একটা থাপ্পড়।হিরার পেছনে থাকা হাবিবাও হয়ত তখন কেঁপে উঠেছে চড়ের শব্দে।এমনকি রান্না ঘর থেকে তিন গিন্নি বেরিয়ে এসেছে কিসের শব্দ হলো তার খোঁজ নিতে।হিরা হয়ত একটুর জন্য সিঁড়ি থেকে নিচে পড়েনি।
“যা বলেছি তাই করবি।স্কুলে যাচ্ছিস,নাচতে না।সবাই শাড়ি পড়বে বলে তোকেও পড়তে হবে এমন কোনো কথা নেই।আমি নিচে বসে আছি। পাঁচ মিনিটের মধ্যে চেঞ্জ করে নিচে আসবি।”
বলেই হনহন করে নিচে নেমে গেল হিম।হাবিবা হিরাকে নিয়ে রুমে গেল।সেদিন হিরা রেডি হয়েছিল আর কেদেছিল।
কাঁদতে কাঁদতে যখন নিচে নামলো তখন হিমের আরেকটা ধমক খেতে হলো।দিন টাই খারাপ গেল ওর।
এর আগেও এমন হয়েছে,ও ছোটো বলে সমসময় মার খায়।বাকিরা হিমের ধমক খায় ঠিকই কিন্তু মার টা যেন শুধু ওর জন্য বরাদ্দ।
আপাতত ও হিমের থেকে জিলাপি নিতে পেলেই বাঁচে। ততক্ষণে বাড়ির কর্তিরা সবাই চলে এসেছে।
রহিমা বেগম বললেন,
“বউ মা রা সবাই খাবার রেডি করো।আর খোকারা সবাই যা চেঞ্জ করে আয়।দাদুভাই তোমরাও যায়।আর সবাই তাড়াতাড়ি এসো।আমরা কিন্তু খেয়েই মেয়ে বাড়ি যাব।”
তার কথায় মাথা নারিয়ে সবাই যে যার রুমে চলে গেল শুধু বাড়ির মেয়েরা ছাড়া।সবাই যেতেই হিরা জিলাপি নিয়ে বসল।এই মেয়ের এসব দিয়েই দিন যায়,ভাত খেতে গেলেই যত বাহানা।
হিরাকে জিলাপি খেতে দেখে আসমা বেগম ওর কাছ থেকে জিলাপির বাটি কেড়ে নিলেন।
“আগে ভাত খাবি তারপর এসব।”
“মা…”
“চুউউপ”
বলেই তিনি জিলাপির বাটি নিয়ে চলে গেলেন।হিরার পাশে বাকি তিন বোন বসল।হিরার মুখ ভর্তি জিলাপি থাকায় গোল মুখটা একদম ফুলে উঠেছে।
হাবিবা ওর মুখে টোকা মেরে বলল,
“ওলে লে বাবুটা জিলাপি খাবে?”
হিরার রেগে তাকানো থেকে তিন বোন হেসে দিল।আর হিরা মুখ পরিষ্কার করতে ব্যস্ত।
দু মিনিটের মধ্যে খাবার টেবিল টা জমে উঠল।
গিন্নি রা তাদের কর্তাদের খাবার দিতে ব্যস্ত,খাবার দিয়েই তারা নিজেদের খাবার নিবেন,তারা বসলেই সবাই খাওয়া শুরু করবে।
হিরার ডান পাশে হামিম,হামিমের পরে হাসিব আর হাসিবে পরে হিম।হিরার বা পাশে হাবিবা,তারপর হালিমা আর তারপর হাওয়া।খাবার টেবিলের দুই মাথায় বাড়ির বড় কর্তা আর বড় কর্তি বসে।আর এক পাশে বসে ছোটরা আরেক পাশে বড়রা।
হামিম হিরা খোচাতে ব্যস্ত,হিম মোবাইল এ কিছু একটা দেখছে।সবার নজর কারার জন্য ইসলাম শিকদার কাশি দিলেন।এতে সবাই ওনার দিকে তাকালো। কিন্তু উনি কাশি দিয়ে তিন নাতির দিকে বললেন,
“বলছিলাম কি একসাথে কি তিন টা বিয়ে দেওয়া যায় না।”
ওনার কথা আর দৃষ্টি দেখে সবাই হিম আর হাসিবের দিকে তাকালেও কোনো একজনের বুকের মধ্যে ছ্যাত করে উঠল।চোখ টা জ্বলে উঠল তবে নিজেকে সামলে সেও হিম হাসিবের দিকে তাকালো।
কাউকে কিছু বলতে না দিয়েই হিরা উৎসাহিত গলায় বলে উঠল,
“উফ তাহলে তো আরো মজা হবে।একসাথে তিন ভাইয়ের বিয়ে।ভাবলেই নাচতে ইচ্ছে করছে।”
ওর কথা শুনে আসমা বেগম কড়া চোখে তাকালেও বাকি সবাই হেসে দিল।
আকরাম শিকদার বললেন,
“খারাপ বলোনি বাবা।তিন ছেলের ই বিয়ের বয়স হয়েছে।বড় টাই তো বিয়ে করতে রাজি হচ্ছিল না।এখন যখন রাজি হয়েছে তখন বাকি দুটোও রাজি হবে।আগে না হয় বড় ভাই বিয়ে করছিল না বলে তাদের বিয়ের কথা ওঠেনি।এখন তো আর সমস্যা নেই।”
তাদের কথার মধ্যেই গিন্নিরা সবাই বসে পড়েছেন।এবার সবার চোখ দুজনের দিকে।
“হিমের উত্তর যা আমার উত্তরও তাই।”
হাসিবের কথা কারো মন মতো না হলেও সবাই আপাতত হিমের দিকে তাকিয়ে।
“এখনো বিয়ের বয়স হয়নি।”
হিমের কথায় সবার চোখ গোলগোল হলো বুঝি।২৯ বছর চলে, কিছুদিন পর যার বয়স ৩০ হবে তার নাকি বিয়ের বয়স হয়নি।আদোও সে নিজের বয়সের কথা বলল কিনা কে জানে।
কেউ কিছু বলার আগেই রহিমা বেগম বললেন,
“সবাই খাওয়া শুরু করো।একটু পর বেরোতে হবে।আগে একটার বিয়ে দেওয়া যাক,পরে বাকি দুইটার কথা ভেবো সবাই।”
তার কথায় সবাই খাওয়ায় মনোযোগী হলো।
খাওয়া শেষে পুরুষ সবাই যে যার রুমে চলে গেল।মেয়েরা সব ড্রয়িং রুমে আর মহিলারা সব গুছিয়ে রেডি হবেন।
বাড়ির গিন্নিরা সব গুছিয়ে যে যার ঘরে যাবেন এর মধ্যে হিম নিচে নেমে এলো।নিজের মায়ের হাতে তিনটে প্যাকেট দিয়ে তিন কর্তী কে বলল,
“এখানে তিনজনের জন্য বোরকা আর হিজাব আছে।এটা পড়েই আজ তোমরা যেও। ভালো লাগবে I think ”
বলেই উপরে চলে গেল।তার এই কাজ গুলোই তো একজনের খুব ভালো লাগে।কিশোরী বয়সে এই পুরুষের প্রেমে পড়েছিল,আজো উঠতে পারেনি।কত স্বপ্নই না দেখেছে তাকে নিয়ে, নামাজে সে যে এই পুরুষ কেই চায় সবসময়।
#চলবে?

