বোকামন #পর্ব_২৯

0
7

#বোকামন
#পর্ব_২৯
#Tahsin_Atoshi

বৃষ্টি হওয়ার পর প্রকৃতিটা একটা শান্ত রুপ নিয়েছে। সব ধুয়ে মুছে নতুনভাবে সাজিয়ে উঠেছে সকলের মাঝে। স্মৃতি সোফায় বসে বসে টিভি দেখছে আর আড়চোখে আহানের রান্না।

সামান্য বৃষ্টিতে ভেজায় ঠান্ডা লেগে গেছে তার। টিভি দেখেও সেদিকে খুব একটা মনোযোগ দিতে পারছে না সে। না চাইতেও সকালে ঘটনা-টুকু চোখের সামান্যে ভেসে উঠছে। আহানের চোখে চোখ রাখাটা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের থেকে কম না তার কাছে৷ অথচ লোকটার কোনো হেলদোল নেই। ব্যাপারটা হজম হয়না স্মৃতির৷ আর থাকতে পারলো না সে। আবারো লজ্জায় মুখটা নিচে নামিয়ে নিলো।

ধীরে ধীরে উঠে ঘরে আয়নার সামনে দাঁড়ালো। নিজেকে দেখে নিজেই একটু অবাক হয়। এতো লজ্জা সে পাচ্ছে! এটাও সম্ভব? কিন্তু সেটাও বেশিক্ষণ সহ্য হলো না । হুট করেই আহান এসে স্মৃতির কোমড় জড়িয়ে কাধে মাথা রাখলো। আয়নার প্রতিবিম্বে তাকায় স্মৃতি। সেখানেই দেখতে পায় আহান চোখ বন্ধ করেই স্মৃতির ঘারে মুখ গুজে আছে। জমে যায় সে। মুখ থেকে কথা বের হয়না তার। তবুও নিজেকে ঠিক রেখে জিজ্ঞেস করে,

-আ্ আপ্ আপনার কি হয়েছে?

ঘারে মুখ গুজেই পাল্টা প্রশ্ন করে আহান,

-কি হবে?

-তা্… তাহলে এ্..এমন ব্যবহার কেন করছেন?

ঘার থেকে এবার মুখ তোলে আহান। কোমড় জড়িয়েই নিজের দিকে ফেরায়। ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে,

-কেমন ব্যবহার করছি?

-র্..রাতে আমার সাথে একই রুমে ঘু..ঘুমালেন। তা…তারপর স্ সকালে খাবার বানালেন। তা্ তারপর..

আহান কোমড় ধরে আরো কাছে টানে। মুচকি হেসে প্রশ্ন করে,

-তারপর?

-স্ সকালে বৃষ্টিতে ভেজার সময় ওই কাজ। আ্ আর এখন…?

-আমার বউয়ের সাথে আমি করতে পারি না?

-পা্ পারেন। কিন্তু আ্ আপনিই তো বলেছেন আপনি কখনো আমাকে মেনে নিবেন না। আ্ আর আপ্ আপনি তো হু..

কথা শেষ করতে না দিয়েই মুখ চেপে ধরে আহান। গম্ভীর কন্ঠে বলে,

-ওর কথা শুনতে চাইনা। আর আমি নতুনভাবে আমাদের জীবনটা শুরু করতে চাই। কতদিন আর এভাবে থাকবো?

-কিন্তু..?

-কি?

-কিছু না।

চুপ থাকে দু’জন। এবার চোখে চোখ মেলায় স্মৃতি। আহানও মেলায়। কোমড় ছেড়ে দুইগালে হাত রাখে এবার। ধীরে ধীরে কাছে আসতে চাইলেই স্মৃতি থামিয়ে দেয়। ইতস্তত বোধ করে সে। হালকা মাথা নিচু করে বলে,

-এ্ এখন না। আপনাকে কিছু বলার আছে আমার।

-হুম বলো।

-আ্ আম..

কথা শেষ করার আগেই হঠাৎ করে ভেসে আসে পোড়া গন্ধ। ভ্রু কুঁচকে তাকায় স্মৃতি। কিছু না বলেই দু’জন দ্রুত রান্না ঘরের দিকে ছোটে। তরকারি পুরে গন্ধ বের হয়েছে। তা দেখে মাথায় হাত দেয় আহান। রাগ হয় স্মৃতির। ভ্রুঁ কুঁচকে বলে,

-আপনি..আপনি পাগল? এভাবে রেখে কেউ যায়। পুরে গেলো তো সব। এখন কি করবেন?

-আবার রান্না করবো।

আহানের ডোন্ট কেয়ার ভাব৷ রাগ হয় স্মৃতি। রাগ দেখিয়ে উচ্চস্বরেই বলে,

-চুপচাপ গিয়ে বসুন। আমি রান্না করছি।

-কিন্তু ম্যাম আমি রান…

কথা শেষ করে দেয়না স্মৃতি। রাগ নিয়েই শুধু আহানের দিকে তাকায়। ভ্রুঁ কুঁচকে জিজ্ঞেস করে,

-সত্যি করে বলুন তো আপনার সমস্যা কি? বন্ধুদের সাথে বাজি ধরেছেন নাকি? এক রাতেই কেউ এতোটা বদলে যায় কীভাবে?

হাসে আহান। হালকা মাথা চুলকে বলে,

-বুঝলে কীভাবে?

-মা্ মানে?

-মানে ঠিকই বুঝেছ। বন্ধুদের সাথে বাজি ধরেছি। কে কার বউয়ের সাথে কতটা ভালোভাবে থাকতে পারে এবং পটাতে পারে। আর..আর… আর আমি পেরেছি। দেখলে আমার সামান্য কেয়ার আর কথাতে তুমি কীভাবে মাখন হয়ে গেলে।

আহানের কথা শুনেই মুখটা বাংলার পাঁচ -এর মতো হয়ে যায়। না চাইতেও চোখে পানি চলে আসে তার। চুপচাপ রান্না করার জন্য উদ্যত হয়। এছাড়া কোনো কাজ নেই তার। ঘরে ফোনটা বাজছে। ইচ্ছে হচ্ছে না তার ফোনটা ধরতে। মন খারাপ করেই কাজ করতে শুরু করে।

.

তুহিন এখনো ভার্সিটিতেই বসে আছে। বন্ধুরা কেউই আসেনি। অবশ্য বৃষ্টি হলে সেও আসে না। কিন্তু আজ এসেছে৷ ঘরে একা থাকাটা এখন বিরক্তিকর হয়ে উঠেছে তার জন্য।
একা একা খুব একটা বোরিংও লাগছে না তার। মেঘলা আকাশ দেখতে দারুণ লাগে। তাই তো বসে থাকা। দূরে থাকা গন্ধরাজ ফুল গাছটায় ফুলে ভরা। চোখ বন্ধ করে বৃষ্টি ভেজা প্রকৃতির মাঝে ফুলের ঘ্রাণ খুব একটা খারাপ লাগে না তার। আবার চোখ খুলে দৃষ্টি স্থির রাখে ফুল গাছটার দিকে।

গাছটার কাছেই মেয়েটা দাড়িয়ে আছে। তার সাথে আরো দুটো মেয়ে। দেখে খুব অবাক হয় তুহিন। প্রথমদিন এসেই দুটো বান্ধুবী বানানো মুখের কথা না। মেয়েটার কথাবার্তা, আচরণ দেখেই বোঝা যায় সে কতটা চঞ্চল। খুব একটা ভালো লাগে না তুহিনের। বেশি চঞ্চল মেয়ে সে খুবই অপছন্দ করে। মেয়েরা থাকবে শান্ত, লজ্জাশীল। যেমনটা স্মৃতি ছিল। শান্ত, মায়াবতী,লজ্জাশীল। যে কেউ প্রেমে পরতে বাধ্য। আনমনেই হেসে ওঠে তুহিন। ভেতর থেকে ভেসে আসে দীর্ঘশ্বাস। আবারো চোখ বন্ধ করে নেয়। কিন্তু তা আর বেশিক্ষণ হয়ে ওঠে না। পেছন থেকে সেই মেয়েলি আওয়াজ,

-আপনার কি কোনো ফ্রেন্ড নেই? একাই থাকেন?

চোখ খুলে তাকায় তুহিন। মিষ্টিকে দেখে। তার পাশে বান্ধুবী দুটোও আছে। মেয়ে দুটো মিষ্টিকে ইশারায় বারণ করলেও থামে না মিষ্টি৷ আবারো জিজ্ঞেস করে,

-আচ্ছা আপনাকে সবাই ভয় পায় কেন? আপনি কি খুব রাগি?

ভ্রুঁ কুঁচকায় তুহিন। গম্ভীরতা নিয়েই বলে,

– হ্যাঁ রাগি। কেন তুমি ভয় পাও না?

-নাতো। ভয়ের কি আছে। আমি কি কোনো ভুল করেছি নাকি?

-তুমি মেয়ে বড্ড বেশি কথা বলো। বাবা-মা বলেনি কিছু? বাইরে গেলে যে একটু কম কথা বলতে হয়।

তুহিনের এমন কথায় চুপ হয়ে যায় মিষ্টি। কোনো উওর না দিয়েই স্থান ত্যাগ করে। তুহিন কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে যাওয়ার পানে। তার যায় আসে না কিছু এতে। আবারো আকাশের দিকে তাকিয়ে রয় সে।

.

রান্না ঘরে এসে দাড়িয়ে আছে হুমায়রা। কিন্তু কি করবে তাই জানে না সে। রান্না তো পারে না। তবুও এসেছে। না হয় ওই মেয়ে আবার ভাগ বসাবে কিনা৷ আর সেটা সে একদমই হতে দেবে না। মৌমিতাও মাএই রান্না ঘরে এসেছে। হুমায়রাকে রান্না ঘরে দেখে অবাক হয় তিনি। পাশে দাড়িয়ে জিজ্ঞেস করে,

-কিছু লাগবে মা?

অন্য মনস্ক থাকায় ভয়ে কেঁপে ওঠে হুমায়রা। বুকে হাত দিয়ে একটু শ্বাস নিয়ে শান্ত হয়। ঠোঁট উল্টে বলে,

-আন্টি আমাকে রান্না শেখাবেন?

-কেন মা আমার রান্না পছন্দ হয়না?

-হ্ হয় তো।

-তাহলে?

-এমনি আমি শিখবো। কতদিন এভাবে সুয়ে বসে থাকবো। এটা তো আর..

-কি? তোমার বাড়ি না তাই বলবে?

জোরপূর্বক হাসে হুমায়রা। মৌমিতা এবার কৌতুহল নিয়ে প্রশ্ন করে,

-কিছু কি হয়েছে মা?

-ন্ না। কিছু হয়নি।

দুজনের মাঝে আবারো নিরবতা বিরাজ করে। কিছু একটা ভেবে একটু দ্বিধা নিয়ে হুমায়রা প্রশ্ন করে এবার,

-আন্টি সায়মা কবে যাবে?

-কেন মা?

-ন্ না এমনি।

-পরীক্ষা তো শেষ। থাকবে অনেকদিনই। যতদিন ওর ইচ্ছে। সবার আদরের তো তাই আর বারণ করি না। থাকুক কিছুদিন।

-ওহ্।

আবারো মন খারাপ হয়ে যায় হুমায়রার৷ একা একা বিরবির করেই বলতে থাকে এবার,

“আসছে আদরের মেয়ে। তো থাকুক না আদরের। বারণ করেছে কে? শুধু আমার বরটার দিকে নজর না দিলেই হয়। ধ্যাত ভাল্লাগে না। ”

মৌমিতা খেয়াল করলো হুমায়রার বিরবির করাটা৷ কিন্তু কথাগুলো ঠিক কান পর্যন্ত গেলো না তার। পাল্টা প্রশ্নও করলেন না তিনি। মুচকি হাসি দিয়ে বললেন,

-তুমি ঘরে যাও মা। আমি আছি তো।

– ন্ না। আমি রান্না শিখবো।

হাসেন মৌমিতা। বারণ করেন না তিনি। শুধু বলেন,

-আচ্ছা এর জন্য তোমার বরের কাছ থেকে আগে পারমিশন নিয়ে এসো। না হয় রাগ করবে।

-উ…উনি রাগ করার কে? আমি শিখবো।

-হুম তোমাকে তো কিছু বলবে না। পরে আমাকে কথা শোনাবে। আমি এসবে নেই বাবা। যাও মা।

মন খারাপ হয়ে হুমায়রার। রাগ দেখিয়ে বড় বড় পা ফেলে বেরিয়ে যায় রান্না ঘর থেকে৷ সাথে সাথেই সামনে পরে সাঈমা। দেখেই নাক ছিটকে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নেয় হুমায়রা। পাশ কাটিয়ে চলে যেতে নিলেই পেছন থেকে সাঈমা বলে ওঠে,

-ভাবছি তোমার মাঝে কি আছে? উম….রূপ নাকি গুণ? রূপে তো তোমার থেকে আমিই সুন্দরী। আর গুণ? তোমার কোনো গুণ আছে কি? রান্না তো পারো না। তা কি করতে পারো?

রাগ হয় হুমায়রার। কিন্তু কথা বলতে ইচ্ছে করে না। কারণ এখন কথা বললে মুখ থেকে তিতা কথা ছাড়া কিছু বেরও হবে না। কিছু না বলেই শুধু মুচকি হাসি উপহার দিয়ে ঘরের দিকে চলে যায়। হুমায়রার মুচকি হাসি দেখে অবাক হয় সাঈমা। এই মেয়ে কোনো পাল্টা উওর দিলো না। খুব অপমানিত বোধহয় তার।
ঘরে আসতেই শুভকে ঘুমিয়ে থাকতে দেখে বিরক্ত হয় হুমায়রা। রাগ দেখিয়ে বলে,

-এতো ঘুম কোথা থেকে আসে আপনার। সকাল সকাল উঠতে পারেন না?

শুভ ঘুম হালকা ভেঙেছিল। হঠাৎ হুমায়রার এমন চিৎকার করে বলা কথায় ভয়ে উঠে বসে পরে। ভ্রুঁ কুঁচকে ভালো মতো বোঝার চেষ্টা করে ঠিক শুনেছে নাকি ভুল? হুমায়রা তো এমন ব্যবহার করে না…! শুভর এমন কান্ডে আরো রাগ হয় হুমায়রার। একটা বালিস মুখের দিকে ছুড়ে দিয়ে বলে,

-অফিস নেই আপনার? সারাদিন পরে পরে ঘুমাবেনই নাকি?

-আ.. আসলে কিছুদিন পর তো মাস্টার্স ফাইনাল পরীক্ষা। ভাবলাম পড়ায় মনোযোগ দিবো।

-ঘুমিয়ে…?

-ন্ না উঠছি তো।

-উঠুন।

বলেই জোরে শ্বাস ফেলে। রাগ যেন তবুও কমছে না। কি করবে ঠিক বুঝতে পারে না সে। মন চাচ্ছে আআআ করে চিৎকার করতে। কিন্তু সেটাও তো সম্ভব না। এটা তো আবার শশুড় বাড়ি। শুভ বুঝতে পারে হুমায়রা রেগে আছে। কিন্তু কারণটা ঠিক বোধগম্য হয়না। হালকা নিচু কন্ঠেই ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করে,

-ক্ কিছু কি হয়েছে হুর…?

-হ্যাঁ অনেক কিছু হয়েছে। মন চাচ্ছে আপনার মাথা ফাটাই।

-কে…কেন? আমি কি করেছি?

-কিছু না।

-আমার মাথা ফাটালে যদি মরে যাই…? তখন তো তুমি বিধবা হয়ে যাবে..!

কিছু বলে না হুমায়রা৷ চুপচাপ বারান্দায় চলে যায়। ভালো লাগছে না। সবকিছু ভাঙচুর করতে পারলে শান্তি লাগতো তার। কি করবে সেটাও বুঝতে পারছে না। কিছুক্ষণ পরই শুভও পাশে এসে দাড়ায়। হালকা নিচু হয়ে ফিসফিস করে বলে,

-আজকে আবার বউটা এতো রেগে আছে কেন? সকাল থেকে দেখছি মেজাজ পুরো এক হাজার ডিগ্রি হয়ে আছে।

আড়চোখে তাকায় হুমায়রা। তার মন চাচ্ছে শুভর গলা টিপে দিতে৷ নিজের ভাবনা নিজের কাছেই রাখে সে। শুভর দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত লাগিয়ে বলে,

-বিয়ে করেছেন কেন আমাকে হ্যাঁ? অন্য মেয়েকে বিয়ে করতে পারতেন না? আমাকেই কেন করতে হবে? আমি তো সুন্দরও না৷ না আছে রূপ না আছে গুণ।

বলে আবার রাগ দেখিয়ে ঘরের দিকে এগিয়ে আসতে নিলেই শুভ হাত ধরে থামায়। কোমড় জড়িয়ে কাছে টেনে কপালে কপাল ঠেকিয়ে বলে,

-ভালোবাসি তাই। আর রূপ নেই কে বললো? আছে তো। কত সুন্দর আমার বউ৷ আর গু….

-গুণ নেই আমার। কিছু নেই৷ কিছু পারি না৷ কিছু হবে না আমার দ্বারা। এ্যা মামনির কাছে যাবো আমি।

বলেই এবার হুমায়রা কান্না করে দিলো। ভ্যাবাচেকা খায় শুভ। এই মেয়েকে সে বুঝে উঠতে পারে না। এই রাগ,এই কান্না। কি হয় কিছুই বোধগম্য হয়না তার। অবশ্য মেয়েদের বোঝা কি এতো সহজ। তবে এটা ঠিক খেয়াল করেছে সাঈমা আসার পর থেকে এমনটা বেশি হচ্ছে। রাগ হয় তার। তবুও আরো কিছুদিন দেখবে ভেবে ছেড়ে দেয়। আপাতত বউকে সামলানো জরুরি। কিন্তু কি বলে শান্তনা দিবে সে জানে না। এভাবে বাপের বাড়ি নিয়ে যাওয়াটাও ঠিক একটা পছন্দ করেনা সে। তাই মিথ্যা শান্তনা সে দিতে পারবে না।

#চলবে….

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here