বোকামন #পর্ব_৪৩

0
7

#বোকামন
#পর্ব_৪৩
#Tahsin_Atoshi

বড় একটা ঘোমটা দিয়ে বিছানার মাঝে চুপটি করে বসে আছে মিষ্টি। কেমন যেন লাগছে নিজের কাছেই। চিৎকার করে কাঁদতে পারলে হয়তো একটু শান্তি লাগতো। কিন্তু সেটাও যেন সম্ভব হচ্ছে না। এখন সে অন্য একজনের স্ত্রী। তবুও মনটা পরে আছে অন্যকোথাও। এ কেমন জীবন। এটাই কি হওয়ার ছিল। কেন এমন হলো? হাজার প্রশ্ন মাথায়৷ কিন্তু বলার কিছু নেই। ঘোমটা টাও বিরক্ত লাগছে৷ তার আড়াল দিয়ে তো কিছুই দেখা যাচ্ছে না।

হঠাৎ দরজার শব্দে নড়েচড়ে বসলো মিষ্টি৷ হার্টবিট যেভাবে বারছে বোধহয় এখনই হার্ট অ্যাটাক করবে সে। শরীরটাও কাঁপছে। কিন্তু ভয়ে নয়। ঠিক কি কারণে সেটাও সে জানে না। হুট করে অনুভব করলো লোকটা তার সামনে এসে বসেছে। ঘোমটার নিচ থেকে শুধু সাদা পাঞ্জাবি ও হাতটাই চোখে পরলো। এক পলক তা দেখে আবার চোখ বন্ধ করে জোরে নিশ্বাস নিলো। নিজেকে এই বলে ঠিক করলো,
আল্লাহ যা করেন ভালোর জন্যই করেন।

লোকটা আরেকটু সামনে এগিয়ে বসলো। হালকা একটু কাশি দিয়ে জিজ্ঞেস করলো,

-এভাবে বড় করে ঘোমটা দিয়ে আছো কেন?

হঠাৎ এমন কন্ঠে ভরকায় মিষ্টি। কন্ঠটা তার পরিচিত। এটা কি তুহিন? আবার নিজের ভাবনার উপর নিজেই বিরক্ত হলো। তুহিন কীভাবে আসবে এখানে? এটা তো সামিউল নামের সেই লোকটা। যার সাথে আজ বিয়ে হলো। কন্ঠ প্রায় এক হতেই পারে। বা অতিরিক্ত ভাবনার কারণে ভুল শুনতে পারে। উওর না পেয়ে লোকটা আবারো জিজ্ঞেস করল,

-চুপ করে আছো যে? কথা বলাও অফ নাকি?

মিষ্টি এবার নিজেকে ঠিক করে। এরপর বলে,

-ব্…বড়রা বলেছে এভাবে দিয়ে র্ রাখতে। আ্ আপনি এসে নাকি তুলবেন।

লোকটার প্রতিক্রিয়া ঠিক বুঝে উঠতে পারে না মিষ্টি। বুঝবে কীভাবে? ঘোমটার জন্য চেহারাই তো দেখতে পাচ্ছে না।লোকটা এবার আরেকটু এগিয়ে আসে। এরপর ধীরে ধীরে ঘোমটা তুলে ফেলে। মিষ্টি তখনও নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে আছে। কেন যেন ভয় করছে তার।

হঠাৎ নিজের থুতনিতে হাতে স্পর্শ পেয়েই কেঁপে ওঠে। সাথে সাথেই চোখ বন্ধ করে ফেলে। তা দেখে হাসে লোকটা। মুখটা উচু করে কপালের সামনে থাকা বেবি হেয়ারগুলোকে ফু দিয়ে উড়িয়ে দিয়ে এরপর বলে,

-এখন কি পণ করেছ আমার মুখটাও দেখবে না।

ভ্রুঁ কুঁচকায় মিষ্টি। সব সময় কি ভুলই শুনবে? নাহ….! সাথে সাথেই চোখ খুলে সামনে তাকায়। কাঙ্ক্ষিত মানুষটাকে দেখে দেখে বিস্ময়ের চরম পর্যায়ে চলে যায় যেন। আবারো চোখ বন্ধ করে নিজেকে ধাতস্থ করে সে ভুল দেখছে। এরপর ধীরে ধীরে খোলে। না ভুল নয়। অবাক হয়ে বলে,

-আপনি…! আপনি এখানে কেন? আমার হাসবেন্ড কোথায়? আপনি কি করছেন এখানে?

হাসে তুহিন। মিষ্টির মাথায় হালকা টোকা দিয়ে বলে,

-আপনার হাসবেন্ডই আপনার সামনে বসে আছে ম্যাম। বিয়ে করলেন অথচ নিজের হাসবেন্ডকেই চিনেন না কি আজব…!

অবাক হয় মিষ্টি৷ কৌতুহল নিয়ে বলে,

-ম্ মানে? ক্ কিন্তু আ্ আমার হাসবেন্ডের নাম তো সামিউল হোসেন। আপ্ আপনি…

এবার শব্দ করেই হাসে তুহিন। এরপর ঠোঁট উল্টে ভাবুক হয়ে বলে,

– কি মেয়েরে বাবা…! একটা ছেলেকে ভালোবাসলো অথচ তার সম্পর্কে সব না জেনেই?

এরপর মিষ্টির বিস্মিত চেহারার দিকে তাকিয়ে বলে,

-শুনু ম্যাম আমার পুরো নামই হচ্ছে সামিউল হোসেন। আর তুহিন নাম? এটা নিক নেইম বলতে পারো। বাসার মানুষ, বন্ধু-বান্ধব সবাই এই নামেই নাকে। কিন্তু বার্থ সার্টিফিকেটে সামিউল হোসেনই।

-ক্ কিন্তু এসব কীভাবে? আ্ আর আপনি তো আমাকে ভালোবাসেন না তাইনা তাহলে বিয়ে করেছেন কেন? যান আপনার ওই প্রেমিকার কাছে। ওর বিরহে বসে থাকুন।

হুট করেই মিষ্টির কোলে সুয়ে পরে। কিছু বলে না মিষ্টি। মুখ ঘুরিয়ক অন্যদিকে তাকায়। হাসে তুহিন। এরপর বলে,

-বিয়ের আগে তো ঠিকই পিছু পিছু ঘুরতে। কোনো মেয়েদের সাথে কথা বললে ওমনি রাগ দেখাতে। আর এখন বিয়ে হলো দেখে কি ভালোবাসা কমে গেল নাকি হুম?

কথা বলে না মিষ্টি। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে তুহিন৷ এরপর ধীরে উঠে দাড়িয়ে বলে,

-ওকে তাহলে বাইরে যাই৷ অনেক সুন্দর সুন্দর মেয়েরা এসেছে। একজন না একজনের সাথে প্রেম তো হয়েই যাবে।

ওমনি চমকে তাকায় মিষ্টি। সেদিকে পাত্তা দেয়না তুহিন৷ দরজার কাছে এগিয়ে যায়। মিষ্টিও দ্রুত গিয়ে সামনে দুই হাত মেলে আটকে দাড়ায়। মুখ ফুলিয়ে বলে,

-কোথায় যাচ্ছেন?

-আর কোথায় যাবো? বউ তো রেগে বসে আছে। কথাও বলবে না। তো আজকের রাতটা আমি অবশ্যই মাটি করতে পারবো না। যাই একটা প্রেমি…

কথা বলার আগেই মিষ্টি তুহিনের হাতে একটা চিমটি কাটে। দুই পায়ে আঙুলে ভর দিয়ে হালকা উঁচু হয়ে তুহিনের সমান হওয়ার চেষ্টা করে। তবুও পুরোপুরি আর পেরে ওঠে না। সেভাবে দাঁড়িয়েই বলে,

-খুব সখ না অন্য মেয়েদের দেখার। আপনাদের ছেলেদের ক্যারেক্টার এমন কেন হুম?

-কেমন?

এক পা এগিয়ে প্রশ্ন করে তুহিন। হঠাৎ এমন এগিয়ে আসতে দেখে ভরকায় মিষ্টি। সেও এবার পিছিয়ে যায়। হালকা তুতলে বলে,

-এ্ এই যে শ্ শুধু মেয়েদের সাথে…

-মেয়েদের সাথে…

মিষ্টির কথার সাথে মিলিয়ে তুহিনও বলতে বলতে কাছে এগোয়। আর মিষ্টি পেছাতে থাকে।

-দ্ দেখুন এভাবে এগিয়ে আসছেন কেন আপনি?

-আমার বিয়ে করা হালাল বউ তুমি। কাছে গেলে কি গুণাহ হবে?

-ন্ না। কিন্তু আপনার সাথে কথা নেই আমার।

-কেন?

-আপনি সেদিন আমাকে সবার সামনে অপমান করেছেন।

এবার পা থেমে যায় তুহিনের। সেদিনের ঘটনার জন্য সে খুবই লজ্জা বোধ করছে। এভাবে মিষ্টির বলায় আরো বেশি খারাপ লাগে। হাঁটু গেড়ে কান ধরে বসে এবার। মিষ্টির দিকে তাকিয়ে বলে,

-সেদিনের ঘটনার জন্য আমি খুবই লজ্জিত মিষ্টি৷ আমার এমনটা করা উচিত হয়নি৷ আ্ আম এক্সট্রিমলি সরি মিষ্টি।

হঠাৎ তুহিনের এমন অসহায় কন্ঠ শুনে মিষ্টিরও খারাপ লাগে। হাটু গেড়ে সেও বসে। তুহিনের দুই হাত ধরে বলে,

-ইট’স ওকে। আ্ আমিই হয়তো বেশি করে ফেলেছিলাম। বেশি অধিকার দেখিয়ে ফেলেছিলাম৷ যা করা উচিত হয়নি। সরি..

এইটুকুতেই গলা আটকে আসে মিষ্টির। কান্না পায় তার। ধীরে উঠে অন্যদিকে চলে যাবে সেই মুহূর্তেই হাত ধরে আটকে দেয় তুহিন। চোখের পানি মুছে দিয়ে বলে,

-অধিকার না দেখালে আজ আমি তোমার বর হতাম কীভাবে? ঠিকই করেছ তুমি।

ঠোঁট উল্টায় এবার। কৌতুহল নিয়ে জিজ্ঞেস করে,

-এ্ এসব… কীভাবে? আমার তো অন্য একজনের সাথে বিয়ে ঠিক হয়েছিল।

-আর কীভাবে? নাটের গুরু তো একজনই আছে না হুমায়রা। সেই করেছে এসব।

ছয়দিন আগে,,,,,

ক্যান্টিনে খাবার খাওয়ার উদ্দেশ্যেই সবাই সেখানে গিয়ে বসে। মিষ্টির মামা-মামিও উপস্থিত ছিল সেখান। তুহিন বসতে না চাইলেও হুমায়রা জোর করেই সেখানে বসায়। এরপর খাবার অর্ডার দিয়ে রেহেনা বেগমের দিকে তাকায়। তার মুখটা তখনও মলিন হয়ে আছে মিষ্টির জন্য। মেয়েটার এমন অসুস্থতা..এরই মাঝে হুমায়রা বলে,

-আন্টি আপনি কি কিছু নিয়ে চিন্তিত?

রেহেনা বেগম এবার একটু চমকে তাকায়।দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,

-হুম মা। মিষ্টিকে নিয়ে চিন্তা হচ্ছে খুব৷ পরের সপ্তাহে মেয়েটার বিয়ে। অথচ দেখ এখন হাসপাতালে। হাজার বুঝিয়েও ওকে ঠিক রাখতে পারি না। শশুড় বাড়ি গিয়েও এভাবে বাবা-মায়ের কথা ভেবে কান্নাকাটি করে অসুস্থ হলে কেমন হবে তোমরাই বলো।

কিছুক্ষণ চুপ থাকে হুমায়রা৷ এরপর বলে,

-মিষ্টি আপুর এবারের অসুস্থতা কিন্তু বাবা-মায়ের জন্য চিন্তা করে হয়নি আন্টি৷ আপু একজনকে ভালোবাসে। তার কথা ভেবেই হয়েছে।

হুমায়রার কথায় মিষ্টির মামা-মামি দুজনই অবাক হয়ে তাকায়। কৌতুহল নিয়ে বলে,

-কোথায়? মিষ্টি তো এমন কিছু বলেনি।

-আপনারা রাগ করবেন তাই হয়তো বলেনি। আসলে আন্টি মিষ্টি আপু তুহিন ভাইয়াকে ভালোবাসে৷ তুহিন ভাইয়াও মিষ্টি আপুকে ভালোবাসে।

হুমায়রার এমন কথায় তুহিন অবাক হয়ে তাকায়। কিছু বলবে তার আগেই চিমটি কেটে ইশারায় চুপ থাকতে বলে। তুহিনও চুপ হয়ে যায়। এদিকে শুভ বোবার মতো হুমায়রার কথা মনোযোগ সহকারে শুনছে। হুমায়রা আবারো বলে,

-শুনেছি মিষ্টি আপুর নাকি আপনার বন্ধুর ছেলের সাথে বিয়ে ঠিক হয়েছে? আপু রাজি না বিয়েতে। কিন্তু আপনাদের বলতেও পারছে না। বাবা-মা মা’রা যাবার পর আপনারাই তো আপুকে বড় করেছেন৷ তাই..

অবাক হয় রেহেনা বেগম। হুমায়রার কথার মাঝেই বলে,

-কি বলছো মা। মেয়েটাকে কখনো বাবা-মায়ের অভাব বুঝতে দেইনি। যখন যা চেয়েছে তাই দিয়েছি। এটাও কি মুখ ফুটে বলতে পারতো না৷ একবার বলেই দেখতো।

মুচকি হাসে হুমায়রা। তার কথায় যে প্রভাব পরছে তা ঠিকই বুঝতে পারছে। হেসেই এরপর বলে,

-এর জন্যই তো আন্টি। আপনারা সব সময় আদর যত্ন করেছেন। তাই আপু আপনাদের বিরুদ্ধে যেতে পারছে না৷

এবার মিষ্টির মামা আলম মিয়া মুখ খোলেন। তুহিনের দিকে তাকিয়ে বলে,

-তুমি সত্যিই মিষ্টিকে ভালোবাসো?

তুহিন কি বলবে ঠিক বুঝতে পারে না। হুমায়রাও কিছু বলে না। শুধু তাকিয়ে রয় ভাইয়ের উওরের অপেক্ষায়। তুহিন একটু শ্বাস নেয়। এরপর বলে,

-জ্বী আঙ্কেল। আমি ভালোবাসি মিষ্টিকে। আর ওকেই বিয়ে করতে চাই।

তুহিনের উওরে অবাক হয়ে তাকায় সবাই। হুমায়রার তো চোখ বেরিয়ে যাওয়ার উপক্রম। আবার মনে মনে খুশিও হয়।

-কি কাজ করো?

আলম মিয়ার প্রশ্নে ধ্যান ভাঙে হুমায়রার। আবারও মনোযোগী হয় সবার কথায়।

হালকা কাশি দিয়ে তুহিন বলে,

-জ্বী..আমর একটা ছোটখাটো নিজস্ব ব্যবসা আছে।

-ঠিক আছে। আগামীকাল তোমার বাবা-মাকে আমাদের বাসায় নিয়ে আসবে। আর হ্যাঁ আরেকটা কথা মাথায় রাখবে আমাদের মেয়েকে কষ্ট দিলে এর পরিণাম কিন্তু ভালো হবে না।

মিষ্টির মামা-মামি অল্পতেই মেনে নেয়ায় বেশ অবাক হয় হুমায়রা। কিছু একটা ভেবে হুমায়রা বলে,

-আঙ্কেল আরো একটা কথা ছিল..!

-হুম বলো মা।

-এই ব্যাপারে আপুকে কিছু বলবেন না প্লিজ। আপু জানবে যে তার সাথে ওই ছেলেরই বিয়ে হবে। এটা সারপ্রাইজ থাকবে প্লিজ।

হাসে আলম মিয়া। এরপর বলেন,

-ঠিক আছে। তোমরা আজকালকার মেয়েরাও পারো বটে।

-উফ.. আঙ্কেল থ্যাংক ইউ। সারপ্রাইজটা পেলে আপু খুব খুশি হবে।

এরপর চলে আসে তুহিনের বাসায়। কিন্তু সেখানেও খুব একটা সমস্যা হয়নি। বলার সাথে সাথেই সবাই মেনে নিয়েছে। সেটা হয়েছে মূলত তিন্নির কারণে। তিন্নি আগে থেকেই বাসার মানুষকে বলে রেখেছে তুহিন একটা মেয়েকে ভালোবাসে। সবাই অপেক্ষায় ছিল কখন তুহিন নিজ থেকে বলবে এই বিষয়টা। শেষে বলেই ফেললো কিনা৷
__

সবটা শুনে অবাক হয় মিষ্টি। তুহিনের দিকে তাকিয়ে কৌতুহল নিয়ে জিজ্ঞেস করে,

-আপনি সত্যিই ভালোবাসেন আমাকে?

-না-তো..!

ওমনি মিষ্টির মুখটা চুপসে যায়। মাথা নিচু করে ফেলে। তা দেখে হাসে তুহিন। কোমড় জড়িয়ে কাছে টেনে বলে,,

-আমি তোমাকে না তোমার এই বাচ্চামো, অধিকারবোধ, আমাকে নিয়ে করা এতো পাগলামি এসবকে ভালোবাসি৷ সব সময় এমনই থেকো। আমিও তোমাকে নিঃস্বার্থভাবে ভালোবেসে যাবো।

তুহিনের কথায় চোখ চকচক করে ওঠে মিষ্টির। হয়তো আকাশের চাঁদটাই সে হাতে পেয়ে গেলে। লজ্জাও লাগে খুব। তা দেখে হাসে তুহিন। শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলে,

-ভালোবাসি পাগলি। তোমার ভালো খারাপ সবটা নিয়েই ভালোবাসি। হয়তো প্রথম ভালোবাসার মতো এতো ভালোবাসা দিতে পারবো না। কিন্তু কখনো অসুখী রাখবো না তোমায়।

মিষ্টিও বুকে মুখ লুকিয়ে ফেলে। সেভাবেই বলে,

-আমিও ভালোবাসি আপনাকে। প্রথম ভালোবাসার মতো ভালোবাসতে হবে না৷ শুধু মনে একটু জায়গা দিলেই হবে আর সব সময় আমার হয়ে থাকলেই হবে।

#চলবে…..!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here