এক_মেঘলা_দিনে #পর্ব_১৯.১

0
2

#এক_মেঘলা_দিনে
#পর্ব_১৯.১
#আনিকা_আফসা

আজ মেঘ করেছিল আকাশে, এখন বৃষ্টি পড়ছে টপটপ করে। লাচ্ছি আর আমি বারান্দায় বসে দেখছি তা। প্রকৃতি এক নতুন রুপ পেয়েছে মনে হচ্ছে। হঠাৎ মনে হলো কেউ হয়তো আমায় দেখছে। এদিক ওদিক তাকালাম কিন্তু দেখলাম না বিশেষ কাউকে। তখনই ঘরের ভেতর থেকে ফোনটা বেজে উঠলো। আমি সেদিকে তাকিয়ে আবার বাইরে তাকালাম। তারপর মাথা নেড়ে নিজের মাথায় একটা চাপড় মেরে বললাম,
“বেশি বেশিই ভাবছি আমি”

এই বলে ঘরে চলে আসলাম। ফোনের কাছে গিয়ে দেখলাম রুদ্রের ফোন এসেছে। রুদ্র পরশু চলে গিয়েছে নিজের বাড়িতে। সামনে বিয়ে তাই । ভাবতেই বুক কেঁপে উঠলো কাল আমার গায়ে হলুদ আর তারপর বিয়ে। যাকে ভালোবেসেছি , মনেপ্রাণে চেয়েছি তাকে পাবো আমি। দিনগুলো কত তাড়াতাড়ি কেটে গেল ভাবতেই অবাক লাগছে। লাজুক হেঁসে ফোন রিসিভ করে কানে দিলাম তখনই রুদ্র বললো,

“ফোন ধরতে এতো সময় লাগে?”

আমি মিনমিন করে বললাম,

“ঐ আসলে বারান্দায় ছিলাম।”

রুদ্র এক ভ্রু কুঁচকে বলল,”বারান্দায় কি করছিলে? বৃষ্টিতে ভিজছিলে? ঠান্ডা লাগলে তখন কি হবে? জ্বর আসবে না? আবার মাইগ্রেন এর ব্যাথাও তো বাড়তে পারে। বেশি পাকনামো করো না?”

আমি রুদ্রের এতো গুলো ধমক শুনে থ হয়ে গেলাম। গাল ফুলিয়ে বললাম,

“বৃষ্টিতে ভিজছিলাম না রুদ্র। আমি শুধু দেখছিলাম। আর তুমি শুধু বকো কেন আমাকে? হবু বউ হই তোমার ভুলে যেও না কিন্তু। একটু ভালোবেসে বললে কি হয়?”

রুদ্র বাঁকা হেঁসে বলল,”ভালোবেসে বলবো? তারজন্য তো ওয়েট করতে হবে সুইটহার্ট। বিয়ে হোক তারপর অনেক ভালোবাসবো। একবার বিয়ে হোক তারপর তোমাকে গভীর ভালোবাসা দিবো। আর মাত্র তিনদিন তো । ছিহ্, তোমার এতটুকু তর সইছে না আমার ভালোবাসা পাওয়ার জন্য?”

লজ্জায় গাল লাল হয়ে গেল আমার। বুঝালাম কি আর সে বুঝলো কি? আমি চোখ খিচে বললাম,

“ধ্যাত!!!”

এই বলে কেটে দিলাম ফোন। রুদ্র হাসতে থাকলো। আমাকে জ্বালাতে অনেক মজা লাগে কিনা।

_____________

রাত ১২ টা,,

আরফান মির্জা বসে হিসাব করছিলেন খাতা কলম দিয়ে কিছু। দেখার সুবিধার্থে চোখে সাদা চশমা পড়া। কাল মেয়ের গায়ে হলুদ, তাকে সব লিস্ট করতে হবে না? মেয়েটা দেখতে দেখতে বড় হয়েই গেল। আরফান মির্জা সামনে থাকা টেবিলের উপর খাতাটা রাখলো। চোখে জল জমেছে, চশমা খুলে তা মুছে ফেললো। মেয়ে হয়ে যেহেতু জন্মেছে পরের ঘরে তো যেতেই হবে। এটাই তো আমাদের সমাজের নিয়ম।

“বাবা!!”

বাবা পিছনে তাকিয়ে দেখলেন আমি দাঁড়িয়ে আছি। আমি চুপচাপ এগিয়ে গিয়ে বাবার কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়লাম। বাবা আমার আকষ্মিক এই কান্ডে কিছুটা অবাক হলেন। তবুও নিজের অবাকের রেশ কাটিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,

“কি হয়েছে মা? কোনো সমস্যা?”

আমি চুপ রইলাম কিছুক্ষণ। তারপর হঠাৎ বললাম,

“আমি বিয়ে করবো না বাবা।”

বাবা চমকে উঠলেন। বললেন,

“কেন? কিছু হয়েছে? হঠাৎ এই কথা বলছিস কেন? রুদ্রর সাথে ঝগড়া হয়েছে?”

আমি উঠে বসলাম। বাবা আমার উত্তরের আশায় আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। আমি হঠাৎ বাবাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলাম এবং বললাম,

“আমি তোমাদের ছাড়া যাবো না বাবা। যেতে পারবো না। প্লিজ বিয়েটা ক্যান্সেল করে দেও। তোমার মেয়ে তোমাকে ছাড়া থাকতে পারবে না বাবা। দম বন্ধ হয়ে আসবে না আমার? ছোটবেলা থেকে তোমরা আমাকে বড় করেছো আর এখন এভাবে পাঠিয়ে দিতে চাইছো? আমি থাকতে পারবো না বাবা ,থাকতে পারবো না।”

বাবার চোখে জল চলে এলো। মেয়ের আসল সমস্যা বুঝতে পেরেছেন। আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,

“এটা তো নিয়তি মা। সবাইকেই তার বাবা – মাকে ছেড়ে যেতে হয়। আর তুই বড় হয়েছিস না? এখনো বাচ্চামো করছিস?”

আমি তাও কেঁদে গেলাম। ইতিমধ্যে চোখের জলে বাবার শার্ট ভিজিয়ে ফেলেছি।বাবার শার্ট ভিজে একাকার হয়ে গেছে আমার চোখের জলে। আমি এখনো কেঁদে যাচ্ছি, মুখ তুলে তাকানোর সাহস হচ্ছে না।

বাবা অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন। শুধু মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলেন ধীরে ধীরে, যেমনটা ছোটবেলায় জ্বর এলে দিতেন।

তারপর ধীর গলায় বললেন, “পাগলী মেয়ে আমার।”

আমি কান্নার মাঝেই মুখ তুললাম। বাবার চোখও লাল হয়ে আছে। চশমাটা আবার চোখে পরে নিয়েছেন, কিন্তু জলটা লুকোতে পারেননি।

“জানিস তো মা,”

বাবা বললেন, “আমারও বুকটা ফাঁকা লাগে ভাবলে পরশু থেকে তুই এই ঘরে থাকবি না। রাতে খাবার টেবিলে একটা প্লেট কম পড়বে। সকালে উঠে দেখবো তোর ঘরের দরজা বন্ধ।”

আমার কান্না যেন আরো বেড়ে গেল। বাবাকে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরলাম।

বাবা একটা ছোট নিঃশ্বাস ফেলে বললেন,

“কিন্তু আমরা তোকে আঁকড়ে রাখলে তুই বড় হবি কীভাবে? রুদ্র ছেলেটা খারাপ না। তুই নিজে পছন্দ করেছিস ওকে। আর তোর মা তো কাল থেকে ঘুমায়নি, শুধু তোর গায়ে হলুদের শাড়িটায় হাত বুলাচ্ছে, ভাঁজ করছে আর খুলছে।”

আমি মুখ কুঁচকে বললাম, “তাহলে তোমাদের মায়া হয় না আমার জন্য?”

বাবা হেসে ফেললেন। সেই হাসির ভেতর কষ্ট মিশে আছে।
“মায়া না হলে এত রাত জেগে হিসাব করি? কাল তোর গায়ে হলুদে যেন কিছু কম না পড়ে, সেই চিন্তায় ঘুম আসে না। কিন্তু মা, মায়া মানেই আটকে রাখা না। মায়া মানে ছেড়ে দিয়ে দেখা, তুই কতদূর উড়তে পারিস।”

আমি চোখ মুছে বাবার দিকে তাকালাম এবং বললাম,
“ভয় লাগে বাবা। যদি ওখানে ভালো না লাগে? যদি আমি মানিয়ে নিতে না পারি?”

বাবা আমার কপালে আলতো করে হাত রাখলেন এবং বললেন,
“ভয় লাগবেই। আমিও তোর মাকে বিয়ে করে আনার রাতে সারা রাত ঘুমাইনি। ভাবতাম, মেয়েটা অচেনা শহরে এসে মানিয়ে নিতে পারবে তো? কিন্তু আজ দেখ সে কি সুন্দর মানিয়ে নিয়েছে।”

বাবা একটু থেমে বললেন, “আর শোন, দূরে গেলেও তুই একা না। ফোন আছে, আর এই বাড়ির দরজা সবসময় তোর জন্য খোলা। রাগ হলে, কষ্ট হলে, ফিরে আসবি। বাবার কোল তোর জন্য বরাদ্দই থাকবে।”

আমার বুকের ভেতর জমে থাকা পাথরটা একটু হালকা হলো।
আমি ফিসফিস করে বললাম, “প্রমিস বাবা?”

বাবা হেসে মাথা নাড়লেন, “প্রমিস। কিন্তু রুদ্রকে বেশি জ্বালাস না। ছেলেটা ভালো কিন্তু ।

আমি লজ্জা পেয়ে মুখ লুকালাম বাবার বুকে।
বাইরে তখনো বৃষ্টি পড়ছে। ঘরের ভেতরটা অদ্ভুত শান্ত হয়ে গেল। আমার বাবাকে ছাড়তে ইচ্ছে হলো না। বাবাকে বললাম,

“ভালোবাসি বাবা!!”

বাবা হাসলেন, এবং বলল,

“আই লাভ ইউ টু মা আমার ”

তখনই আওয়াজ এলো,

“বাবাকেই ভালোবাসলে হবে? মাকে তো কারোর মনেই পড়ে না আজকাল ”

আমি বাবার বুক থেকে মুখ তুললাম। দরজায় মা দাঁড়িয়ে আছে। বাবা হেঁসে বললেন,

“তুমি কখন এলে?”

মা দরজার সাথে হেলান দিয়ে বুকের সাথে দুই হাত গুজে বললেন,

“এসেছি অনেকক্ষণ আগে কিন্তু আপনারা এত আবেগী হয়ে ছিলেন যে আমাকে কারো নজরই পড়লো না। বুঝি বুঝি, মাকে এখনই ভুলে যাওয়া হচ্ছে তাইনা?”

আমি দৌড়ে গেলাম মায়ের কাছে, জড়িয়ে ধরলাম শক্ত করে এবং বললাম,

“লাভ ইউ এ লট মা”

মা মুচকি হেঁসে জড়িয়ে নিলেন নিজের সাথে। মাথায় চুমু খেয়ে বললেন,

“পাগলী মেয়ে আমার”

#চলবে

(সবার রেসপন্স আশা করছি। কমেন্ট করতে তো টাকা লাগে না ভাই, তাহলে এতো কৃপণতা কেন? কেন ? কেন? 😒)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here