#এক_মেঘলা_দিনে
#পর্ব_১৯.২
#আনিকা_আফসা
আজ সন্ধ্যায় গায়ে হলুদ আমার। সারাবাড়ি জমজমাটভাবে সাজানো হচ্ছে। কম সময়ে হলেও বাবা অনেক আয়োজন করেছেন। তার স্বপ্ন আমাকে ধুমধাম করে বিয়ে দেওয়ার। ডেকোরেশন এর লোকেরা এদিক সেদিক ছোটাছুটি করছে। আমি এখনো বসে বসে ডাইনিং টেবিলে পরোটা ছিড়ছি আর মাংসের ঝোলে চুবিয়ে মুখে দিচ্ছি। মা তখনই এসে অবাক হয়ে বললেন,
“তোর এখনো হয়নাই? এই তুই সত্যি নতুন বউ তো? তাড়াতাড়ি শেষ কর।”
আমি চুপচাপ মায়ের মুখের দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে ফোনে নজর দিলাম। রুদ্রের সাথে কথা হয়নি আজ। মা আমাকে বলেই চলে গেছেন নিজের কাজে। আমার খাওয়া শেষ হতেই আমি চলে গেলাম। লাচ্ছিটার খাবার নিয়ে ঘরে এসে লাচ্ছিকে খাবার দিলাম। ভদ্র বাচ্চার মতো সেও চুপচাপ খেয়ে নিলো। তখনই হুড়মুড় করে আপু এলো রুমে । আপুর হাতে বাটি। আপু আমাকে তা ধরিয়ে দিলো। আমি বাটিটা নিয়ে অবাক হয়ে বললাম,
“এসব কি?”
“দেখতে পারছিস না? ফেসপ্যাক আছে। মুখে লাগিয়ে বসে থাক।”
আমি মুখ কুঁচকে বললাম,”এসব এখন লাগাবো না। মুড নেই।”
আমি নাকের পাটা ফুলিয়ে ও চোখ রাঙিয়ে বলল,”চুপচাপ লাগা, মুড থাকা লাগবে না। মা দিয়েছে। আর আজ না তোর গায়ে হলুদ। এমন পাগল সেজে আছিস কেন?”
আমি চোখ ঘুরিয়ে বললাম,”তো গায়ে হলুদ তো সন্ধ্যায়।”
আপু চোখ গরম করে বলল,”আমার রাগ উঠাস না আনি। নে এগুলো মেখে তারপর গোসল করতে যা আর সুন্দর পোশাক পর একটা।”
আমি বললাম,”এত সকালে গোসল।”
আপু কোমড়ে হাত দিয়ে বলল,”জ্বি এত সকালেই। চুপচাপ যা।”
আমি মাথা নাড়লাম। আপু চলে যেতে নিতেই আমি আপুকে পিছন থেকে ডাক দিলাম। আপু আমার দিকে তাকালে বলে উঠলাম,
“ঐ আসলে, রুদ্রের খবর জানো? কথা হয়েছিল?”
আপু বলল,”হ্যা ঐ নিহান বলেছিলো, রুদ্র মেবি অফিসে গেছে। ওর কিছু কাজ ছিলো। ”
আমি মাথা নেড়ে বললাম,”ওহ্ আচ্ছা।”
আপু চলে গেলো। আমি বিড়বিড় করে বললাম,”ডায়নোসরটা আজকেও অফিসে?”
________________
মুখে ফেসপ্যাক লাগিয়ে বসে আছি। রুদ্রের সাথে ইতিমধ্যে কথা হয়েছে। ছেলেটা সকাল থেকে প্রচুর খাটছে। এসব নিয়েই ভাবছিলাম তখন ঘরে প্রবেশ ঘটে তৃষার।
আমি অবাক হয়ে হেসে বললাম,
“আরে তুই? কি খবর?”
তৃষা বলল,”এইতো সব ঠিকঠাক। ”
আমি বললাম,”তা কি মনে করে? ”
তৃষা বলল,”ঐ আসলে তোকে আমার সাথে একটু যেতে হবে।”
আমি ভ্রু কুঁচকে বললাম,”কোথায়?”
তৃষা বললো,”পারভিউ রোড।”
আমি ভ্রু কুঁচকে বললাম,”কিন্তু ঐ রোডতো অনেক নিরব থাকে। আর এখন তো যেতে পারবো না। গায়ে হলুদ সন্ধ্যায় জানিসই তো। ”
তৃষা মুখ লটকে বলল,”জানি । কিন্তু আমার তোকে দরকার। আসলে আমি বিপদে পড়েছি।।
কিছুটা চিন্তিত হয়ে বললাম,
“কী হয়েছে? এমন মুখ করে আছিস কেন?”
তৃষা চারপাশে একবার তাকিয়ে ধীরে ধীরে আমার পাশে এসে বসল। ওর চোখেমুখে কেমন যেন অস্থিরতা। হাত দুটোও কাঁপছে সামান্য। আমি ফেসপ্যাক লাগানো অবস্থাতেই কপাল কুঁচকে তাকিয়ে রইলাম।
“বল না তৃষা, কি হয়েছে?”
তৃষা ঠোঁট কামড়ে বলল,
“আমি আসলে কারো সাথে এসব শেয়ার করতে পারছি না। তুই না গেলে আমি একা যেতে পারবো না।”
আমি এবার একটু সিরিয়াস হলাম।
“কোথায় যেতে হবে বললি? পারভিউ রোড? সেখানে কেন?”
তৃষা নিচের দিকে তাকিয়ে বলল,
“একটা জিনিস আনতে হবে। খুব জরুরি।”
“কি জিনিস?”
তৃষা বিরক্ত হয়ে বলল,
“উফফ আনি, এত প্রশ্ন করিস না তো। প্লিজ! শুধু একটু আমার সাথে চল। আধাঘন্টার বেশি লাগবে না। আমার খুব দরকারি জিনিস টা। ”
আমি দ্বিধায় পড়ে গেলাম। একদিকে আজ আমার গায়ে হলুদ, পুরো বাড়ি মানুষে ভর্তি। অন্যদিকে তৃষাকে দেখেও কেমন যেন লাগছে। ও সত্যিই ভয় পেয়েছে মনে হচ্ছে।
আমি ধীরে বললাম,
“মাকে কি বলবো?”
তৃষা সঙ্গে সঙ্গে বলল,
“বলবি আমি এসেছি, একটু বাইরে যাচ্ছিস। প্লিজ আনি, খুব দরকার।”
আমি দীর্ঘশ্বাস ফেললাম।
“ঠিক আছে, কিন্তু বেশি দেরি করা যাবে না।”
তৃষার মুখে সাথে সাথে হাসি ফুটে উঠলো।
“থ্যাংক ইউ! তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নে।”
আমি উঠে ওয়াশরুমে গেলাম ফেসপ্যাক ধুতে। তৃষা একবার আমার যাওয়ার দিকে তাকালো। তারপর ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো বিছানার উপর আমার ফোনের দিকে। মুখে একটা চতুর হাঁসি ফুটে উঠলো ওর।
________________
মা কাজ করছিলেন। পাশে খালামণি হাতে হাতে মাকে সাহায্য করছে। অনেকেই ইতিমধ্যে এসে পড়েছে বিয়ে উপলক্ষ্যে। বাড়ির অর্ধেকই মানুষে গিজগিজ। হঠাৎ মায়ের হাত লেগে কিচেন কেবিনেট থেকে একটা কাঁচের গ্লাস পড়ে গেল। নিচে পড়ে তা টুকরো হলো মুহূর্তেই। মা ভীত হলো খানিক। খালামণি বলল,
“এটা কি করলি? সাবধানে কাজ কর।”
মা স্থির দৃষ্টিতে কাঁচের ভাঙ্গা গ্লাসটিতে তাকিয়ে রইলো। মনে কু ডাকছে তার। মনে হচ্ছে আজ কোনো খারাপ কিছু হবে। কিন্তু কি? এই শুভ দিনে কাঁচ ভাঙ্গা কি কোনো অশুভ কিছুর ইঙ্গিত করছে?
তখনই আমি এসে দাঁড়ালাম। আমাকে দেখেই মা ভ্রু কুঁচকে তাকালো, কারণ আমি রেডি হয়ে দাঁড়িয়ে আছি, কাঁধে আড়াআড়িভাবে ব্যাগ ঝোলানো। আমি বললাম,
“মা একটু বাইরে যাচ্ছি তৃষার সাথে।”
মা বলল,”এখন এইসময় বাইরে যাওয়া ঠিক না। এখন কোথাও যাওয়ার দরকার নেই।”
আমি বললাম,”মা বোঝার চেষ্টা করো, এটা খুব আর্জেন্ট, নাহলে আমি যেতাম না। আমি এসে পড়বো তাড়াতাড়ি। চিন্তা করো না। আল্লাহ হাফেজ।”
এই বলে বেরিয়ে গেলাম। মা বুকে হাত রেখে ঢলল খানিক, খুব চিন্তা হচ্ছে তার । বুকে সূক্ষ্ম ব্যাথা অনুভব হচ্ছে।
___________
” রুদ্র, পারভিউ রোড এ তাড়াতাড়ি আসুন, জলদি প্লিজ”
অফিস থেকে বের হতেই দেখতে পেলো রুদ্র আনিকার মেসেজটা। ভ্রু কুঁচকে বলল,
“মেয়েটাকে বলেছিলাম তুমি করে বলতে। তবে ডাকছে কেন? দেখি গিয়ে। ”
রুদ্র আশেপাশে তাকিয়ে রওনা দিলো গাড়ি নিয়ে।
__________
পারভিউ রোড:::
আরফান মির্জা এখানে এসে দাঁড়িয়েছে। মেয়ে তাকে মেসেজে এখানে আসতে বলেছে। হাতের ঘড়িতে একবার সময় দেখলো। রাস্তটা বলতে গেলে ফাঁকা। আগে মানুষজন চলাচল করতো। তবে অন্যপাশে আরেকটা রাস্তা হয়েছে যেটা এটার থেকে শর্টকাট, তাই মানুষ যাতায়াতের জন্য এখন ঐ রাস্তায় বেছে নেয়। আরফান মির্জা বিয়ের জন্য সেন্টার বুক করেছিল, সেখানে কিছু কাজ ছিলো তাই সেখানেই গিয়েছিল। আসার পথে মেয়ের মেসেজ দেখে এখানে এসে দাঁড়িয়েছে। আরফান মির্জা এসবই ভাবছিলেন তখনই তার পিছন হতে আওয়াজ এলো,
“কেমন আছেন মিস্টার মির্জা?”
আরফান মির্জা পেছনে তাকালো এবং তার সঙ্গে সঙ্গেই আগন্তুক তার পেট বরাবর ছুরি গেথে দিলো চোখের পলকে। রক্ত ঝরছে অবিরত। আরফান মির্জা বিস্ফারিত চোখে সামনে দাঁড়ানো মানুষটার দিকে তাকিয়ে রইলেন। ঠোঁট কাঁপছে তার, কিন্তু শব্দ বের হচ্ছে না। লোকটা ধীরে ধীরে ছুরিটা টেনে বের করতেই আরফান মির্জা কেঁপে উঠে হাঁটু গেড়ে বসে পড়লেন রাস্তায়।
চারপাশ নিস্তব্ধ।শুধু বাতাসে কাঁপছে শুকনো পাতার শব্দ।
লোকটা ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল, “অনেক দিন পর দেখা হলো, মিস্টার মির্জা।”
আরফান মির্জার দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসছে। তিনি কষ্ট করে বললেন, “কে… তুমি…?”
লোকটা হেসে উঠলো।
“এত তাড়াতাড়ি ভুলে গেলেন?”
আগন্তুকের মুখ কাপড় দিয়ে ঢাকা ছিলো। কাপড় টেনে সরাতেই আরফান মির্জা বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলেন। অস্ফুট স্বরে আওড়ালেন,
“অ,,অয়ন?”
অয়ন বাঁকা হেঁসে বলল,,”মনে আছে তাহলে? আমাকে অপমান করে পাড় পেয়ে যাবেন মিস্টার মির্জা? তাও আপনাকে আমি ছাড় দিতাম কিন্তু আপনি আমার আনির সাথে অন্য কারো বিয়ে ঠিক করেছেন? এটা তো আমি সহ্য করবো না। আপনি আমার দাবার গুটি, যা দিয়ে চাল দেয়া হয়ে গেছে। এখন শুধু ফাঁদে পা পড়ার পালা আপনার আদরের রুদ্রের। তারপরই চেকমেট। ”
এই বলে পা দিয়ে তাকে রাস্তায় ফেলে দিলো অয়ন। বসা থেকে এবার ধুপ করে পড়ে গেল আরফান মির্জা রাস্তায়। অয়ন হাঁটু মুড়ে বসে বাঁকা হেঁসে বলল,
“আপনার পরকাল যাত্রা শুভ হোক মিস্টার মির্জা।”
এই বলে গ্লাভস্ পড়া হাতে ছুরিটা নিয়ে আবারও একই জায়গায় গেঁথে দিলো অয়ন । শোনা গেল একজন বাবার এক করুণ চিৎকার।
#চলবে
( রেসপন্স করবেন রিডার্স 🖤 🖤 আজকের ধামাকা কেমন লাগলো?)

