সন্ধ্যার ধূসর আলো। সূর্য পশ্চিম দিকে হেলে পড়েছে। লাল সেই সূর্যের অদ্ভুত সুন্দর আভা চারপাশে ছড়িয়ে আছে । কী অদ্ভুত খোদার সৌন্দর্য! রক্তিম সূর্যটি ডুবে গিয়েও কী সুন্দর, কী শান্ত শীতল আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে। ধীরে ধীরে পরিবেশের গুমোট ভাব যেন হালকা হয়ে আসছে। মনে হচ্ছে কেউ সাদা-কালো ফিল্টারে চারপাশটা রাঙিয়ে তুলছে। অথচ এখানে কোনো কৃত্রিমতার ছোঁয়া নেই—আছে শুধু অপার মুগ্ধতা আর নিঃশব্দ প্রশান্তি।
এই দৃশ্য একমনে অবলোকন করছে ঊর্মি। খেলার মাঠের পাশে বিশাল অংশ জুড়ে দাঁড়িয়ে আছে একটি পুরোনো বটগাছ। বটগাছের নিচের অংশটুকুতে বসার জন্য সিঁড়ির মতো করে বাঁধানো। আশেপাশে হকারদের আনাগোনা, কারো ডাক, কারো হাঁক—সব মিলিয়ে জীবনের কিছু চেনা শব্দ। সামনের দিকে বড় একটা পুকুর, যার পানিতে পড়ে আছে শেষ বিকেলের আলো।
হাঁটুতে থুতনি ঠেকিয়ে নিজের কাজেই ব্যস্ত সে।
আশেপাশের মানুষের বাঁকা দৃষ্টি একবারের জন্যও পাত্তা দিল না ঊর্মি। তার মতে, যখন যা করতে ইচ্ছে হয়, করে ফেলাই উচিত। লোকের সব কথা কানে নিলে নিজের সত্তা বলতে আর কীই বা অবশিষ্ট থাকে?
ধীরে ধীরে নেমে আসছে ঝাপসা অন্ধকার। চারপাশে একে একে জ্বলে উঠছে কৃত্রিম আলো। যানবাহনের শব্দে এবার বিরক্তির ছাপ ফুটে উঠল তার অবয়বে। ঠিক তখনই, তার সাতপাঁচ ভাবনার মাঝখানে, পাশে এসে বসল কেউ।
ঊর্মি খানিকটা ঘাড় বাঁকিয়ে তাকাল। বলা নেই, কওয়া নেই—একজন অপরিচিত লোককে পাশে বসতে দেখে সে একটু অপ্রস্তুত হলো। সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে সামলে সোজা হয়ে বসল। ছিমছাম গড়নের কালচে শরীরের লোকটি তার মতোই সামনের দিকে তাকিয়ে, একেবারে স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল—
ফ্লার্ট করতে আসিনি। দূর থেকে দেখছিলাম, অনেকক্ষণ ধরেই আপনি এখানে বসে আছেন। ভালো লাগছিল, তাই এসে বসলাম। কিছু মনে না করলে বসতে পারি?
“পাবলিক প্লেস—বসতেই পারেন। অনুমতির প্রয়োজন পড়ে না। তাছাড়া, বসার সময় তো অনুমতি নেননি। এখন নিলেই বা কী হবে? বসেই তো পড়েছেন।”
স্ট্রেট ফরোয়ার্ড মেয়েদের আমার ভালো লাগে। আপনার কথাগুলো ভালো লাগল।
কার পছন্দ হলো বা না হলো—আমি এগুলো খুব কমই দেখি। কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে এলে সরাসরি বলুন। মেয়ে মানেই যে বোকা—এই ধারণাটা কবে পাল্টাবেন?
অজ্ঞাত লোকটি খানিকটা হকচকালো। তবে সেটা প্রকাশ করল না। ঊর্মির দিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটি গাড়ির দিকে তাকাল । দূর থেকেও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে—কায়সারের ছুড়ে দেওয়া উপহাসের হাসি।
ব্যাক্তি টির চোয়াল শক্ত হয়ে এল। হাত মুষ্টিবদ্ধ করে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করল। কিছুক্ষণ পর সে সফলও হলো। কিন্তু ততক্ষণে উঠে দাঁড়িয়ে গেছে ঊর্মি। সামনের দিকে এক পা এগিয়েও আবার থেমে গেল। ঠিক সেভাবেই পেছনে তাকিয়ে সরাসরি লোকটার দিকে দৃষ্টি মেলে ধরল। ভাবলেশহীন, ঠান্ডা কণ্ঠে বলল,
জানি না কেন আমার পিছু লেগেছেন। শান্তিপ্রিয় মানুষ আমি। অশান্তি খুব কম পছন্দ করি। তবে যেচে পড়ে আসলে ছাড় পাবেন—এটা ভাববেন না।
ঐ যে গাড়িতে বসে থাকা লোকটা—ও আর আপনার মাঝের বোঝাপড়া আপনারাই বুঝে নেবেন। অযথা আমাকে টানবেন না।
আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই চলে গেল ঊর্মিলা।
পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটি মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে রইল সেই দিকেই। শ্যামবর্ণের, মোটামুটি স্বাস্থ্যবতী মেয়ে। হাঁটুসমান গোল জামা, মাথায় পরিপাটি হিজাব, পায়ে স্নিকার। হাঁটার মাঝেও অদ্ভুত এক শালীনতা। কী অদ্ভুত সুন্দর মেয়ে!
কায়সারের সেই মুগ্ধ দৃষ্টি একেবারেই পছন্দ হলো না। কোনোরকমে নিজেকে সামলে সে নিজের কাজে চলে গেল। পেছনে পড়ে রইল সেই অজ্ঞাত ব্যক্তি । যান্ত্রিক এই সহরটাকে যেন উপভোগ করার ব্যর্থ চেষ্টা করতে ব্যাস্ত।
______________
ঊর্মি এত লেট কেন? রাতবিরেতে বাইরে থাকাটা আমি সাপোর্ট করছি না।
আপু, টিউশনি করে আসার পথে বটতলায় একটু বসেছিলাম। তাই দেরি হয়ে গেছে। প্লিজ, কিছু মনে করো না।
মনি খানিকটা শান্ত হলো। তারপর হঠাৎ অস্থির কণ্ঠে বলল—
উফ্! বলতে তো ভুলেই গিয়েছি। একজন দেখা করতে এসেছিল তোমার সঙ্গে। সম্ভবত তোমার বাবা। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করছিল। তুমি আসছ না দেখে একটু আগেই চলে গেছে।
ঊর্মি একেবারেই স্বাভাবিক। তার অভিব্যক্তি দেখে বোঝা যায়, সে আগে থেকেই এমনটা অনুমান করেছিল। মনি পরতে পরতে অবাক হচ্ছে। মেয়েটা যেন প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি কঠোর। অথচ অদ্ভুতভাবে মায়াও লাগছে।
নরম কণ্ঠে বলল—
জানি না, তোমার জায়গায় থাকলে আমি কী করতাম। হয়তো এতটা স্ট্রং থাকতে পারতাম না। তোমার সিদ্ধান্তকে আমি সত্যিই অ্যাপ্রিসিয়েট করছি। তবে বড় বোন হিসেবে একটা পরামর্শ দিচ্ছি—ভালো করে আরেকটু ভেবে দেখা যায় না?
ঊর্মি নিশ্চুপ রইল। এখানেই যেন তার উত্তর পাওয়া হয়ে গেছে। মনি আর ঘাঁটাল না। রান্নাঘরের দিকে চলে গেল।
ঊর্মি সোজা জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। চাঁদের স্নিগ্ধ আলো তাকে রাঙিয়ে দিচ্ছে। বাইরের হাওয়ায় চোখ বন্ধ করে ফেলল সে। চোখের পাতা কেঁপে উঠছে। ঠান্ডা লাগলেও জায়গা থেকে নড়ল না। একমনে স্মরণ করল সেই মুহূর্ত । বাবাকে দেখেই সে ভেতরে ঢোকেনি।
কেন জানি সেই বাড়ির কারো প্রতিই আর কোনো অনুভূতি আসে না। অথচ একটা সময় ছিল—একটু আদর, একটু ভালোবাসার জন্য সে মরিয়া হয়ে উঠত। যেচে পড়ে কত কিছুই না করত। আর এখন—ভেতরের কোথাও যেন কেউ হেসে উঠল। তারপরই যেন এক নিঃশব্দ হাহাকার।
আচ্ছা, তার মা দেখতে কেমন ছিল? মায়ের আদর কেমন হয়? তার গায়ের গন্ধটা কেমন ছিল? কী এমন হতো, যদি তার মা বেঁচে থাকত? যদি বাবা নামের অধ্যায়টাই তাদের জীবনে না থাকত? মা কি তখন তাকে নিয়ে একটু সুখে থাকতে পারত না?
চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ল দু’ফোঁটা জল। গ্রিল ধরে মাথা ঠেকাল সে।
সে জানতেও পারল না—কারো তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে সে বন্দি। তার চোখের জল না দেখলেও, তার বিষণ্নতায় কেউ যেন নিজেকেই ভাসাচ্ছে।
___________________
দেওয়ান বাড়ির বাগানের এক পাশে দাঁড়িয়ে আছে স্বর্ণা। অস্থিরভাবে একের পর এক কাউকে ফোন করে চলেছে। কিন্তু বিপরীত পাশ থেকে কোনো উত্তর নেই। এতে তার ক্ষোভ আরও বাড়ছে। ফোন না ধরা পর্যন্ত সে ক্ষান্ত হবে না—এমনই জেদ চেপেছে।
একসময় ওপাশ থেকে ভেসে এল রাগী কণ্ঠ—
হয়েছে কী? কে মারা গেছে? এভাবে ফোন দিচ্ছ কেন?
স্বর্ণা তেতে উঠল—
গর্দভ কোথাকার! এবার অন্তত মাথাটা কাজে লাগা। নিজে তো ডুববি, সঙ্গে তোর জন্য আমাকেও ডোবাচ্ছিস।
কিছুক্ষণ থেমে, এবার ভীত কণ্ঠে বলল—
কায়সার কিন্তু উল্টো সুর গাইছে। ওর মাথায় কী চলছে, ধরতে পারছি না। আমি নিশ্চিত—কায়সারের মাথায় কিছু একটা চলছে। কাল আমাকে অদ্ভুত কিছু কথা বলেছে। যেগুলোর মানে আমার মাথার ওপর দিয়ে গেছে।
কি বলেছে?
ও বলেছে—
ঠিক তখনই তার হাত থেকে ফোনটা কেউ কেড়ে নিল।
চলবে,,,,
#বৈরি_হাওয়া
#পর্ব_১৭
#ফারাজানা_প্রণয়_চৌধুরি
সারাদিনের ব্যস্ততার মাঝে সময় বের করে নিয়মিত আপনাদের জন্য গল্প দেওয়ার চেষ্টা করি।
কিন্তু দুঃখের বিষয়, প্রত্যাশিত রেসপন্স খুব একটা পাই না।
অনেকে নীরব পাঠক হয়ে থাকেন ,রিচ কম, রিয়েক্ট কম । তবুও আমি আশা ছাড়ি না।
আশা রাখি, যারা আমার লেখাগুলো পড়ছেন তারা ভবিষ্যতে আমার পেইজটাকে ফলো দিয়ে পাশে থাকবেন। আপনাদের একটি লাইক, কমেন্ট বা শেয়ারই আমাকে আরও লিখতে অনুপ্রেরণা দেয়। 🤍✍️
“ফারজুর কুঁড়েঘর” 🌿
এখানে থাকবে আমার লেখা গল্পের পর্ব,
গল্প নিয়ে আলোচনা,
এবং পাঠক–লেখিকার সরাসরি যোগাযোগ।
গল্প ভালোবাসলে আপনিও যুক্ত হতে পারেন 🤍
গ্রুপ লিংক: ⬇️
https://facebook.com/groups/777129281464382/

