বৈরি_হাওয়া #পর্ব_১৮

0
6

স্বর্ণার কথা শেষ হওয়ার আগেই ফোনটা কেড়ে নিলো সাজেদা বেগম। ফোনের দিকে একবার তাকিয়ে কেটে দিলেন। রাতের ছিমছাম আলোতে তাদের দু’জনের ছায়া স্পষ্ট। আশপাশে একবার তাকিয়ে স্বর্ণার হাত শক্ত করে ধরে বাগানের পেছনের দিকে নিয়ে গেলেন তিনি।
হঠাৎ হাতটা ঝাড়া মেরে ছেড়ে দিলেন। তেজি কণ্ঠে আওয়াজ তুললেন,

“আমার বাবা একটা কথা বলত, জানিস? চোরের দশ দিন, গৃহস্থের এক দিন। কতদিন নিজেদের আড়াল করবি? একদিন অবশ্যই ধরা পড়বি। আমার চোখে যতই ধুলো উড়ানোর চেষ্টা করিস, আমি সত্য বের করেই ছাড়বো। আর সেদিন হবে তোর শেষ দিন, স্বর্ণা।”

খানিকটা সামনে এসে ভ্রু সামান্য কুচকালেন তিনি। কণ্ঠ নামিয়ে ফিসফিস করে বললেন,

“মাগিগিরি অন্য কোথাও করতে পারবি, কিন্তু এই বাড়িতে একদম না।”
স্বর্ণা কিছুটা নড়েচড়ে উঠলো। হাতে ভালোই ব্যথা পেয়েছে। শক্তপোক্ত মহিলার থাবায় ব্যথা তো পাবেই। হাতের স্পর্শে ব্যথা কমানোর ব্যর্থ চেষ্টা করলো। ব্যথাতুর মুখে বলল,

“কাকি, তুমি বেশি বেশি করছো। একটা ভুলের জন্য আর কত শাস্তি দেবে? সবাই যেভাবে পারছো আমাকে অপমান করছো। দিন দিন তোমাদের উগ্রতা বেড়েই চলেছে।”

“ভুল?”—চোখ কুঁচকে তাকালেন সাজেদা বেগম।

“তোর কাজগুলোকে ভুল বলিস? তোর কাজ পাপ। তুই শুধু একা পাপি না—আমার ছেলেটাও পাপি। যে পাপ করে আর যে পাপ ঢাকার চেষ্টা করে—দু’জনই পাপি।”
কিছুক্ষণ থেমে আবার বললেন,

“ও যেই কারণেই হোক তোর পাপ লুকানোর চেষ্টা করছে, খুব বড় ভুল করছে।”
আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই হনহন করে চলে গেলেন তিনি। পেছনে পড়ে রইলো স্বর্ণা। রাগী চোখে তাকিয়ে আছে ফোনটার দিকে। এই মহিলার জন্য কথাটা শেষ করা গেল না।
উফফ! কী এক ঝামেলা! কপালে আবার ফুটে উঠলো চিন্তার ভাঁজ।

________________

“একতা পান বানাই তামির দননো,
পান দিবো, থুপারি দিবো, তুন দিবো সামান্য।
একতা পান বানাই তামির জন্য—”

সাজেদা দেওয়ান থমকে গেলেন। অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন স্বামী আর নাতনির দিকে। মিমি গামছা দুই কানের নিচ দিয়ে নিয়ে মাথায় পেঁচিয়ে রেখেছে। এমদাদ সাহেবের হাঁটুর পাশে বসে পান বানাচ্ছে আর অস্পষ্ট সুরে গাইছে। পাশ থেকে নিঝুম দাদার মাথায় ঝুঁটি বেঁধে দিচ্ছে।
মিমির গানের আসল মানে বুঝতে খানিকটা সময় লাগলো। বুঝতে পেরে আপনা-আপনিই কপালের ভাঁজ শিথিল হলো। ঠোঁটে ফুটে উঠলো সামান্য হাসি। কোনো এক অজানা অদ্ভুত কারণে মেয়েটাকে মন থেকে আদর করতে পারেন না তিনি, অথচ মেয়েটাকে ছাড়া থাকতেও পারেন না।

যেদিন তিনি সব রহস্য ভেদ করতে পারবেন, সেদিনই শান্তি পাবেন। তবে যাই হোক, মেয়েটাকে তিনি ছাড়বেন না। এই একটা ব্যাপারে একমাত্র ঊর্মিই সাহায্য করতে পারতো—কিন্তু মেয়েটা কারও কথা শোনলে তো। ঘাড়ত্যাড়া মেয়ে।ভালোই হয়েছে গেছে। কিছুদিন বাস্তবতা বুঝে আসুক।

“ও বুলী!”

মিমির কণ্ঠে ধ্যান ভাঙলো। প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকালেন নাতনির দিকে।

“বুলী তুনো, আমি বিয়ে করবো।”

“বিয়ে করবি? ভালো কথা। আমার স্বামীর সাথে তোর কী?”

মিমি যেন আশকারা পেয়ে গেল। এক আঙুল তুলে নাকের ডগায় ছুঁইয়ে চোখ ছোট করে অভিনয় করে বলল,

“এহ্! আমার তামি। দাদাভাইকে তামি বলবা না!”

দাদি-নাতনির এই দুষ্টু-মিষ্টি তর্ক দেখে হেসে উঠলেন এমদাদ দেওয়ান। নিঝুম পাশ থেকে বলে উঠলো,

“তুই বিয়ে করবি কিভাবে, মিমু? স্বামীকে তামি বলিস! তোকে বিয়ে করবে কে? একে তো বাবা তোকে কুড়িয়ে এনেছে, তার মাঝে কথাও ঠিকমতো বলতে পারিস না। তোর তো ভবিষ্যৎ অন্ধকার রে, মিমু!”
এই হলো—হাসিখুশি মুহূর্তটা মুহূর্তেই কানে খিল ধরানোর পর্যায়ে পৌঁছালো। সারা বাড়ি চিৎকারে মুখরিত হয়ে উঠলো। এ যেনো স্বাভাবিক অবস্থা। বাচ্চাদের বাড়িতে চেঁচামেচি হবে না এটা কি হয়।

_________

শীতল, স্নিগ্ধ সকাল। নিশ্ছিদ্র নীরবতা ভেঙে দিচ্ছে ভোরের আলো। চারদিকে কুয়াশা নেই, তবু বাতাসে একটা হালকা শীতের ছোঁয়া। ঊর্মি টিউশনে যাচ্ছে।ষষ্ঠ শ্রেণীর একটা ছেলে—ইংরেজি সাবজেক্ট পড়ায় সে।

মাস শেষে তিন হাজার দেবে বলেছে। এটাই যেন তার কাছে সোনার হরিণ পাওয়ার মতো। এই একটা টিউশনি আটকানোর জন্য সময়ের আগেই পৌঁছায় সে। টাকা তুলনামূলক ভালোই পাচ্ছে বাকিগুলোর তুলনায়।
কিছু কিছু অভিভাবক খুব স্ট্রিক হয়। বেতন ত
খুব পেঁচায়। যতই পড়ানো যায়, তাদের কাজ ভুল ধরা। উনাদের মতে যত বেশি পড়াবে তত লাভ। তবে সে এতদিনে এতটুকু বুঝে গেছে—শুধু পড়ালেই হয় না, ভালো মতো বুঝাতে হয়। যেই স্টুডেন্ট বোঝার অল্পতেই বুঝে। আর যেগুলো দুর্বল টাইপের, তাদের যতই প্রেশার দেওয়া হোক—বুঝবে না। তাই উচিত ওদেরকে ওদের মতো করে বোঝানো।

কিন্তু তারা বুঝলে তো! নিজেরা বাচ্চাদের পাশে বসবে না। বাচ্চাটা কি পড়ছে না পড়ছে সেটা দেখবে না। কিন্তু শিক্ষক কতক্ষণ পড়িয়েছে, কিভাবে পড়িয়েছে—এগুলো অবশ্যই দেখবে। হতাশার শ্বাস বেরিয়ে আসলো। বাবা নামক ব্যক্তিটা আর যাই করুক, এতটুকু উপকার করেছে—লেখাপড়াটা করিয়েছিল। না হলে এই সমাজে চলা যে খুব কঠিন হয়ে যেত।
লেখাপড়া ছাড়া যে কারোরই দাম নেই। যেভাবেই হোক, যতই হোক—টিউশনি করে তো নিজেকে চালাতে পারবে। হোক সেটা ক্ষণস্থায়ী, কোনো ভবিষ্যৎ নেই। তাকে একটু পরিশ্রম করতে হবে—তাতে কী এসে যায়। পরিশ্রম ছাড়া তো ভাত নেই। জীবনে সফল হতে হলে পরিশ্রম অবশ্যই করতে হবে।

ঊর্মিলা ঘড়ির দিকে তাকালো। সকাল সাতটা দশ বাজে। ভালোই দেরি হয়েছে। সামান্য চিন্তা অনুভব করলো। রাহাদের আম্মু কেমন ব্যবহার করে কে জানে।
ওকে পড়িয়ে এসে আবার কিছু স্টুডেন্ট পড়াতে হয়। ওরা মধ্যবিত্ত ফ্যামিলির। অল্প কিছু টাকাতেই পড়াতে রাজি হয়েছে। এতে তার কিছুটা হলেও লাভ হবে। বাচ্চাগুলোরও উপকার হবে। তবে বাচ্চাগুলোর পিছনে প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত শ্রম দিতে হয়। কিছু বাচ্চা আছে—উঁচু ক্লাসে পড়ে, কিন্তু অক্ষরজ্ঞান নেই।
ঊর্মিলা প্রায় গন্তব্যের কাছাকাছি চলে এসেছে। চারতলা ভবনটির সামনে দাঁড়ালো। সেখানে গেইটে ঝুলছে ‘টু-লেট’। হয়তো কোনো ঘর ভাড়া দেওয়া হবে। সেখানে একবার তাকিয়ে নজর সরিয়ে ফেললো। এটা দেখে তার কাজ কী? মাস শেষে দশ হাজার টাকা হয় কোনোমতে। তা দিয়েই কোনো মতে চলতে হবে।
পাশাপাশি অ্যাডমিশনের প্রিপারেশন নেই। তবুও এক্সামগুলো দেবে। অ্যাডমিশনের বইগুলো এনেছে। বাড়িতে বসে নিজে নিজেই চেষ্টা করছে। বাকিটা আল্লাহর ইচ্ছা। উনি যা ভালো মনে করেন। সেখানেও তো খরচ হবে।
আরও পরিশ্রম করতে হবে—যাতে ঐ দেওয়ান বাড়ির মুখোমুখি হতে না হয়।

“এই তুমি দেওয়ান বাড়ির বউ না?”
ঊর্মিলা হাঁটা থামিয়ে দিলো। মাঝামাঝি সিঁড়িতে আছে সে। কী আশ্চর্য! ঐ বাড়িটা বাঁচবে অনেকদিন। যেই ভাবনায় আনলাম—কোথা থেকে কে টপকে আসলো! দেওয়ান বাড়ির সো-কল্ড আত্মীয়।

হাসি মুখে তাকালো সেদিকে। মিথ্যা হাসির অভিনয় করে বলল,

“জি আন্টি। আপনাকে তো চিনলাম না?”

“আমি তোমাদের প্রতিবেশী। তুমি হয়তো খেয়াল করনি। করবে কিভাবে—নতুন বউ। ধীরে ধীরে চিনবে।”

“জি আন্টি।”

“কোথায় যাচ্ছো?”
ঊর্মি কোনোমতো কথা কাটালো।

“আন্টি, আমি আমার এক আত্মীয়ের বাসায় এসেছি। আসুন, যাই।”

“না না, পরে একদিন যাবো। এখন আমি যাই—ঠিক আছে।”

কোনোমতো বিদায় জানিয়ে কেটে পড়লো ঊর্মি। যেই তাদের ঘরে প্রবেশ করবে, তখনই চোখ গেলো—একটা ছেলে ব্রাশ মুখে নিয়ে উদ্ভটভাবে তাকিয়ে আছে। এমন ছেলের সাথে এই আচরণ কোনোভাবেই যাচ্ছে না। মুখের চারপাশে ফেনা মেখে আছে। চোখের কেতর স্পষ্ট ভেসে উঠছে। বাচ্চা হলে মানা যেত। তাই বলে পঁচিশ কি ছাব্বিশ বছরের ছেলের সাথে এটা যায়?
আর ভাবলো না ঊর্মি। চলে গেলো তার গন্তব্যে। পিছনে পড়ে রইলো সেই উদ্ভট ছেলে। ঊর্মিকে যেতে দেখে মাথা সামান্য চুলকে হেসে উঠলো।
“স্যার, ঊর্মি ম্যামের গতিবিধি বুঝতে পারছি না। উনাকে মাঝে মাঝে মনে হয় খুব সহজ-সরল। তবে মাঝে মাঝে এমন সব কাজ করে—মনে হয় উনি যেমনটা দেখায়, তেমন নয়।”
কায়সার মনোযোগ দিয়ে শুনলো। কোনো উত্তর করলো না। এতে যেন ইয়াছিনের খুসখুস ভাবটা গেলো না। উদ্বিগ্ন হয়ে সরল চোখে, দ্বিধাগ্রস্তভাবে বলল,

“স্যার, একটা কথা বলি?”

কায়সার ইয়াছিনের দিকে সরাসরি দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো। দুই ভ্রু সামান্য উঁচু করে জানতে চাইলো–

কি?

স্যারের সায় পেয়ে নিজমনে বলতে শুরু করলো,
“স্যার, আপনার না উচিত—ম্যামের টিকার কার্ড দেখা। ম্যামের বয়স আসলে কত? কেমন যেন গোলমেলে মনে হয়। বয়সের তুলনায় অতিরিক্ত বুঝদার মনে হয়। আর কাজগুলো করে উদ্ভট উদ্ভট। তার ক্ষতি মানুষ কি করবে—ক্ষতি করতে যাওয়া ব্যক্তি ভুলে যায় কী করতে গিয়েছিল। আর উনিও কি ঠান্ডা মস্তিষ্কে সবকিছু ধরে ফেলে?”
কায়সারের কোনো অভিব্যক্তি নেই। সে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলে উঠলো—

চলবে,,

#বৈরি_হাওয়া
#পর্ব_১৮
#ফারজানা_প্রণয়_চৌধুরি

যারা নতুন অবশ্যই পেজটিতে ফলো দিয়ে রাখবেন।

গল্প নিয়ে আলোচনা এবং সমালোচনা করতে যুক্ত হন এই গ্রুপে:www.facebook.com/profile.php?id=61576318845162

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here