সকাল সকাল বাড়িতে পুলিশের উপস্থিতি দেখে সকলে খানিকটা ভড়কে গেল। দেওয়ান বাড়ির ইতিহাসে এটা যেন দ্বিতীয়বার। সকলে অস্থির হয়ে জানতে চাইছে ,কি হয়েছে ?
ঠিক তখনই এসআই মিনহাজ সার্চ ওয়ারেন্টের কাগজ দেখাল। কাগজটি দেখে সকলে অবাকের শেষ সীমায় পৌঁছায়।
স্বর্ণা ঘুমঘুম, ফোলা চোখে ড্রইংরুমে এলো। আশেপাশে না দেখেই সে বলে উঠল,
—“উমম, কী হয়েছে এতো… চেঁচা—”
কথাটা সম্পূর্ণ করতে পারল না। সামনের ব্যক্তিদের দেখে তার মুখ থেকে শব্দ যেন হারিয়ে গেল। পুরনো সেই কথাটার অর্থ মুহূর্তেই উপলব্ধি করল সে।
একেই বুঝি বলে—চোরের মন, পুলিশ পুলিশ।
স্বর্ণা ঢোক গিলতে চাইলো। আশ্চর্যজনকভাবে গলাটা কেমন শুকিয়ে গেছে । উত্তপ্ত মরুভূমির মতো। শীতের এই শীতল সকালেও তার পুরো শরীর ঘেমে উঠল।
সবটাই মিনহাজের ধারালো দৃষ্টি এড়াল না। তিনি দাম্ভিকতার সঙ্গে পাশের কনস্টেবলকে হুকুম দিলেন,
—“আজিজ সাহেব, ঘরগুলো খুব ভালো করে তল্লাশি নেবেন। বিশেষ করে স্বর্ণা ম্যাডামের ঘরটা।”
এই একটি কথায় স্বর্ণা যেন জমে গেল। সে ঠিকই সন্দেহ করেছিল। এত কষ্টে গড়া পরিকল্পনা চোখের সামনে ভেঙে যেতে দেখে নিজের চুল নিজেই ছিঁড়তে ইচ্ছে করল।
হঠাৎ উপরের দিকে তাকাল সে। কায়সার দাঁড়িয়ে সব দেখছে। সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকিয়ে মনে মনে বিড়বিড় করল—
—“কিভাবে সম্ভব? ওর মুখ খুলবার সব পথ তো বন্ধ ছিল। তাহলে?”
স্বর্ণার এমন সন্দেহভরা দৃষ্টি দেখেও কায়সারের মুখে কোনো ভাবান্তর দেখা গেল না। সে আগের মতোই নির্বিকার। আর স্বর্ণা—চিন্তায় বিভোর।
—“স্যার, বাকিদের ঘরে বিশেষ কিছু পাওয়া যায়নি। তবে—”
কনস্টেবল মারিয়ার কথায় স্বর্ণার ধ্যান ভাঙল। চোখে ফুটে উঠল ভয়। সে বুঝে গেল ,পরের কথাটা কী হতে যাচ্ছে। কে জানত এমন হবে! নইলে তো কিছু একটা ব্যবস্থা করতে পারত। তার সন্দেহ যে ঠিক, সেটাই প্রমাণ হতে চলেছে।
মারিয়া বলল,
—“স্বর্ণার ঘরে বেআইনি দ্রব্য পাওয়া গেছে।”
হাতের দিকে ইশারা করে যোগ করল,
—“এখানে গাঁজা আছে। দুই পলিথিন।”
পাশ থেকে রফিক সাহেব একে একে টেবিলের ওপর রাখলেন আরও কিছু নিষিদ্ধ বস্তু। সাজানো সেই ঘৃণ্য জিনিসগুলো দেখে সবার চোখ কোটর থেকে বেরিয়ে পড়ার জোগাড়। কখনো সেগুলোর দিকে, কখনো স্বর্ণার দিকে তাকাচ্ছে সবাই।
এটা যে তাদের বাড়াবাড়ি সুযোগ দেওয়ার ফল । এই উপলব্ধিটা এখনই হচ্ছে। কিন্তু বুঝতে অনেক দেরি হয়ে গেছে।
আয়াশ দ্রুত মিমি আর নিঝুমকে নিয়ে ঘরে ঢুকে গেল। বাচ্চা দুটো কৌতূহলী চোখে সব দেখছিল, যেতে চাইছিল না। জোর করেই নিয়ে যেতে হলো।
দূর থেকে হুমায়ূন দেওয়ান শান্ত দৃষ্টিতে সব পরখ করলেন। মানুষ যতই বদলাক, পাপের রাস্তা ছেড়ে দিক—পূর্বের করা ঘৃণ্য পাপ কোনো না কোনোভাবে ঠিকই ফিরে আসে। চোখের সামনেই তার প্রমাণ।
প্রতিক্রিয়া কী দেবেন ? বুঝতে পারলেন না। পাহাড়সম পাপের ফল যে তিনি এখন তিলে তিলে পাচ্ছেন।
মনীষীরা ঠিকই বলেছেন—যেমন গাছ রোপণ করবে, ভবিষ্যতে তেমন ফলই পাবে। আজ তার ফল চোখের সামনে।
তিনিও মেয়ের মতো উপরের দিকে তাকালেন। কায়সারের কঠোর দৃষ্টি ঠিক তার দিকেই নিবদ্ধ। সেই দৃষ্টির দিকে তাকানোর সাহস পেলেন না।
তার জন্যই তো ছেলেটা এতদিন চুপ ছিল, সহ্য করে গেছে একের পর এক অসহনীয় অত্যাচার। তাহলে আজ হঠাৎ এমন করল কেন?
কাকার দিকে তাকিয়ে কায়সার বুঝে ফেলল তার মনের ভেতরের চলমান দ্বন্দ্ব। তবু সে নিরেট। প্রশ্নের উত্তর তার জানা। তবুও কাকার চোখের ভাষা তাকে ছাড়ছিল না। সেগুলো খুব করেই পিছু নিয়েছিল।
দাদার পর এমদাদ দেওয়ান সবকিছু থেকে তাকে বের করে এনেছিলেন ঠিকই। কিন্তু আগের পাপগুলো গিয়ে পড়েছে মেয়ের ওপর।
মনে কাকার জন্য মায়া অনুভব হল।লোকটা যেমনি হোক কাকা তো। জরিয়ে আছে কত অনুভূতি। কাঁধে চড়ে বেড়ানো। ছোটো বেলা বন্ধুর মতোই চলেছে তারা। আয়াশ খুব একটা আদর না পেলেও কায়াস এবং সে ভালোই আদর পেয়েছে।তখন কে জানতো এই লোক ঠান্ডা মস্তিষ্কের অপরাধি। একের পর এক বিপদ থেকে ক্ষমতা দিয়ে বাঁচিয়েছে দাদা। দাদা মারা যাবার পর শান্ত হলেও। আগের পাপ যে কোনোভাবেই যাচ্ছিল না। সেগুলো যে খুব করে পিছু নিয়েছিল। দাদার পরে এমদাদ দেওয়ান। খুব ভালোভাবেই তিনি সবকিছু থেকে বের করে এনেছিলেন।তবে তার আগের করা পাপগুলো মেয়ের উপর দিয়ে গেছে। বাবা আর দাদা পাপ ঢেকেছে, আর সে বড় হয়ে তার মেয়ের একের পর এক অন্যায় লুকিয়েছে —অনিচ্ছা আর অনীহার মাঝে।
কিন্তু এবার আর উপায় নেই। কাকার বাঁচার রাস্তা বন্ধ। শুরু হয়েছে মেয়েকে দিয়ে, শেষ হবে তাকেই দিয়ে। এখান থেকে মুক্তি নেই।
কাকাকে বাঁচাবে । কিন্তু কিভাবে?
প্রতিদ্বন্দ্বী যে হার মানার নয়।
হঠাৎ বাড়ির ভেতরে একের পর এক ব্যক্তি প্রবেশ করল। এত মানুষের উপস্থিতিতে বাড়ির মহিলারা ঘাবড়ে গেল। কায়াস চোখের ইশারায় সবাইকে ভেতরে যেতে বলল। একে একে সকলে মুখ ঢেকে ঘরের দিকে সরে যাচ্ছে।
মা–চাচিদের দেখাদেখি স্বর্ণাও ভেতরে যেতে উদ্যত হয়েছিল। ঠিক তখনই কনস্টেবল মারিয়া তার হাত চেপে ধরল। মুহূর্তেই চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে গেল। সবার চোখে কৌতূহল, কিন্তু কোনো উত্তর নেই।
পরমুহূর্তেই স্বর্ণাকে টেনে–হিঁচড়ে বাড়ির বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়।
রেহেনা দেওয়ান ভয় আর উৎকণ্ঠায় দৌড়ে এলেন কায়সারের কাছে। একমাত্র এই ছেলেটাই পারবে ।এই বিশ্বাসটাই তখন তাকে টিকিয়ে রেখেছে। তার তীক্ষ্ণ বুদ্ধিতেই তো এতদিন মেয়েটা আড়ালে ছিল।
কান্নাভেজা কণ্ঠে বললেন,
—“বাবা, দেখ না কী হয়েছে! সমাজে যে আর মুখ দেখাতে পারবো না। আমার মেয়েটাকে ওরা যেভাবে নিয়ে গেল…”
আর কিছু বলার আগেই তার কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে এলো। চোখের সামনে অন্ধকার নেমে এলো। মুহূর্তের মধ্যেই তিনি ঢলে পড়লেন।
কায়সার নীরবে চাচিকে আগলে ধরল। বুকের ভেতর থেকে আপনাআপনি বেরিয়ে এলো এক দীর্ঘশ্বাস। চোখের ইশারায় মাকে ডাকল সে। আলতো করে চাচিকে মায়ের হাতে তুলে দিয়ে, একটি কথাও না বলে দ্রুত সরে গেল।
—“আপনি কতদিন ধরে এই কাজে জড়িত?”
—“নাকি পরিবারের সবারই হাত আছে?”
—“দেওয়ানদের উন্নতির রহস্য কি তাহলে এটাই?”
একের পর এক প্রশ্নে চারপাশ মুখরিত হয়ে উঠল। প্রতিটি নিউজ চ্যানেল এখন দেওয়ান কন্যাকে ঘিরে ব্যস্ত। বাড়ির সামনে সাংবাদিকদের ভিড়। আশেপাশের মানুষের কৌতূহল পরিবেশটাকে আরও গুমোট করে তুলেছে।
এমদাদ দেওয়ান নীরবে সব দেখছিলেন। পাশে হুমায়ূন দেওয়ানের উপস্থিতি টের পেলেও কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালেন না। কীই বা বলবেন? এটা তো প্রথম নয়—আগেও এমন হয়েছে। পার্থক্য একটাই, তখন বাবা ছিলেন।
এখন দেওয়ানদের বটগাছ হিসেবে তিনি দাঁড়িয়ে থাকলেও, এই পরিস্থিতি সামলানোর মতো তীক্ষ্ণ বুদ্ধি তার নেই। আর কতটাই বা সামলাবেন?
মানুষ কত সহজেই মনগড়া কাহিনি বানিয়ে ফেলে। বছরের পর বছর পরিশ্রমে গড়ে তোলা ব্যবসা আজ কুৎসিত প্রশ্নের মুখে।
ঠিক তখনই ভিড়ের মাঝখান থেকে স্পষ্ট, দৃঢ় এক কণ্ঠ ভেসে এলো—
—“এটা সম্পূর্ণ সাজানো নাটক। আপনাদের কি সত্যিই মনে হয়, যারা এসব ব্যবসা করে তারা নিজের ঘরেই নিষিদ্ধ জিনিস রেখে দেবে? যেখানে সে জানে—এগুলোই তার সর্বনাশ ডেকে আনতে পারে?
যদি স্বর্ণা অপরাধী প্রমাণিত হয়, তাহলে আমি নিজেই তার শাস্তির জন্য আদালতে দাঁড়াব। কিন্তু তার আগে—দয়া করে মনগড়া গল্প বানাবেন না।”
তীক্ষ্ণ সেই কণ্ঠে চারপাশ আপনা-আপনি স্তব্ধ হয়ে গেল।
চকিতে মাথা তুলে তাকালেন এমদাদ দেওয়ান। অবাক দৃষ্টিতে ছেলের দিকে চাইলেন। কিছুক্ষণ আগেও তিনি ভেবেছিলেন ,সবকিছুর পেছনে এই ছেলেটার হাত আছে। কিন্তু কায়সারের বাচনভঙ্গি বলছে ভিন্ন কথা।
তাহলে যদি তার হাত না থাকে । নেপথ্যে কে?
কায়সার চোখের ইশারায় বাবাকে শান্ত থাকতে বলল। তাতে এমদাদ দেওয়ান যেন খানিকটা ভরসা পেলেন।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর কায়সার দিচ্ছে হিসাব করে, নিখুঁতভাবে। পুরো পরিস্থিতিটা সে বুদ্ধির সঙ্গে ঘুরিয়ে দিচ্ছে। যদিও কিছু চ্যানেল যেন তিলকে তাল বানানোর অপেক্ষায়।
ঠিক তখনই এক তরুণ প্রতিবেদক ক্যামেরার সামনে অনর্গল বলতে শুরু করল—
—“পুলিশের যৌথ অভিযানে কিশোরগঞ্জের দেওয়ান বাড়ি থেকে উদ্ধার করা হয়েছে চার কেজি গাঁজাসহ একাধিক নিষিদ্ধ মাদক। প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা যায়, এসবের সঙ্গে দেওয়ান কন্যা স্বর্ণা দেওয়ানের সম্পৃক্ততা রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি দীর্ঘদিন ধরে এই চক্রের সঙ্গে জড়িত ছিলেন।
সাম্প্রতিক সময়ে এলাকায় শিশু-কিশোরদের মধ্যে মাদকাসক্তি বেড়ে যাওয়ায় পুলিশের কাছে একাধিক অভিযোগ জমা পড়ে। জানা যায়, লালচে, কমলা ও সবুজ রঙের ছোট আকারের ক্যান্ডির আড়ালে ‘WY’, ‘R’, ‘OK’, ‘SY’ লোগোযুক্ত ইয়াবা শিশুদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া হতো। এসব মাদক সেবনে প্রথমে অতিমানবিক শক্তির অনুভূতি এলেও পরবর্তীতে দেখা দেয় ভয়াবহ প্রত্যাহারজনিত প্রতিক্রিয়া, যা অনেক ক্ষেত্রে আত্মহত্যা পর্যন্ত ডেকে এনেছে।
এছাড়াও অভিযোগ উঠেছে, স্বর্ণা দেওয়ানের সঙ্গে তার সাবেক প্রেমিক আরিয়ানের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। বিয়ের আগেই অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে গর্ভধারণ, গর্ভপাত। পরবর্তীতে তার চাচাতো ভাই এর সাথে বৈবাহিক বন্ধনে আবদ্ধ হন।সংসার জীবনের দুই বছর শেষ না হতেই দুধের শিশু রেখে সংসার ভেঙে পালিয়ে যান । এমন আরো একাধিক বিতর্কিত ঘটনাও সামনে এসেছে। দেওয়ান পরিবার তাকে বারবার সুযোগ দিয়েছে । আর সেই সুযোগকেই কাজে লাগিয়ে সে চালিয়ে গেছে একের পর এক নাশকতা। অপরাধ এখানেই শেষ নয়। নিজে যখন প্রথম বাচ্চা নষ্ট করল, তখন বুঝে ফেললো তার মতো সমাজে অবৈধ প্রেম চালিয়ে যাওয়ার মতো অনেকে আছে। তাদের মধ্যে যারা অপ্রত্যাশিত গর্ভধারণ করে, তাদেরকে বেআইনিভাবে গর্ভপাতের ব্যবস্থা করে দেন। এই কাজে স্বয়ং তার প্রেমিক ডাক্তার আরিয়ান সাহায্য করেছে। এতকিছু চোখের সামনে দেখেও যেহেতু দেওয়ানরা নিশ্চুপ। এবং এগুলোকে ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করছে কায়সার দেওয়ান এবং কায়াস দেওয়ান। তাহলে কি ধরে নিবো এগুলোর পিছনে তাদের সম্পৃক্ততা রয়েছে?”
ছেলেটির প্রশ্ন মনোযোগ দিয়ে শুনলো কায়সার। ছেলেটির কানে ইয়ারপড। চুল দিয়ে ঢাকা থাকলেও তার নজর এড়ায়নি। একে যে সম্পূর্ণ ট্রেনিং দিয়ে পাঠানো হয়েছে। তার তীক্ষ্ণ মস্তিষ্ক ধরতে বেশি সময় লাগলো না। ছেলেটি ভালোই দিকনির্দেশনা পাচ্ছে। আর এগুলোর পিছনে যে আছে, তাঁকেও নজর এড়ালো না। ঐ তো দূরে দাঁড়িয়ে আছে। সাধারণ বোরকা পড়া। একের পর এক অস্থিরতা। সাধারণ কারো চোখে পড়লে চিনার উপায় নেই।
মনে মনে বাহবা না দিয়ে পারলো না। এতটুকু সময়ে খুব ভালোই ইনফরমেশন জোগাড় করেছে। কে বলবে এই সাধারণ দেখতে নারীটি এতো ধুরন্ধর হবে।
সেখান থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নজর দিলো মাইক হাতে ফরফর করতে থাকা ছেলের দিকে। উপহাসের সাথে বলে উঠলো,
—“এর জন্যই জ্ঞানীরা বলে, অল্প বিদ্যা ভয়ঙ্কর। প্রমাণ না নিয়ে এতো কিছু বলে ফেললেন। খুব ভালোই ইনফরমেশন জোগাড় করেছেন দেখা যায়। খুব ভালো দিক এটা।
আপনি যেহেতু এত কিছু জেনেছেন, অবশ্যই প্রমাণ আছে?”
ঘাবড়ে গেল ফয়সাল। সে যেনো ফেঁসে গেছে। উর্মিলার কথা মতো এখানে এসে খুব ভুল হয়ে গেছে। প্রমাণ তো নেই, এখন কি হবে?
হাসলো কায়সার। তাকে পাত্তা না দিয়ে সকলের উদ্দেশ্যে বলল,
—“আপনাদের কাছে আমি অনুরোধ করছি ভুল তথ্যে বিভ্রান্ত হবেন না। আমি কথা দিচ্ছি, এটার সঠিক বিচার আমরা করব। যদি ও এসবের পিছনে দায়ি থাকে, তাহলে অবশ্যই বিচার হবে।”
দৃঢ় কণ্ঠের সেই আশ্বাসে সাময়িকভাবে পরিস্থিতি ঠান্ডা হলেও ভেতরের আগুন নিভল না। সাংবাদিকদের ভিড় ধীরে ধীরে ছত্রভঙ্গ হতে শুরু করল। কিন্তু ফিসফিস থামল না। ক্যামেরা বন্ধ হলো, প্রশ্ন থামল।
দূর থেকে ঊর্মিলা চোখে ফুটে উঠল অজানা তেজ। আবারও ঐ ইবলিশটার জন্য তীড়ে এসে তড়ি ডুবলো। এত পরিশ্রমের ফল বৃথা। ঐ ইবলিশ কোনো না কোনো উপায়ে ওকে ছাড়িয়ে আনবেই।
কায়সার বাঁকা হাসলো। সরাসরি ঊর্মিলার দিকে তাকালো।চোখে ফুটে উঠল দুষ্টু হাসি। ঊর্মি একবার শক্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে নিজ গন্তব্যে চলে গেল। যাওয়ার আগে চোঁখেই যেন বলে গেল—
“পরেরবার আরও ভয়ংকর কিছু আছে। তখন সামলান কিভাবে দেখে নিবো।”
দেওয়ান বাড়ির চার দেয়ালের ভেতরে ঝড় তখনও চলছেই।
পুলিশের গাড়ির ভেতরে বসে স্বর্ণা জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল। হাতকড়া পরানো হলেও চোখে কোনো পানি নেই। ঠোঁটের কোণে এক ফোঁটা বিদ্রুপ। সে জানতো শেষ মুহূর্তে কায়সার বাঁচাবে। যতই হোক, পুরনো ভালোবাসা বলে কথা।
স্বর্ণা চোখ বন্ধ করল। মাথার ভেতরে একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—কে ফাঁস করল?
হিমধরানো শীতল কণ্ঠের ফিসফিস আওয়াজে ধ্যান ভাঙলো—
—“ভাবিস না, আগের ভালোবাসার খাতিরে তোকে বাঁচিয়েছি। নেহাৎ পরিবারের এবং ব্যবসার কারণে এই উটকো ঝামেলায় নিজেকে জড়িয়েছি। এবার এখান থেকে বাঁচালেও পরবর্তী তো নিজেকে বাঁচাবি কি করে?
বাপ-মেয়ের ধ্বংস যে অনিবার্য।
ভালোবাসার প্রতিধানে বিষ ছাড়া কিছুই পাইনি।কত সুন্দর তোদের নারী সমাজের চিন্তাভাবনা।
পুরুষ ভালোবাসলেও দোষ, না বাসলেও দোষ।
পুরুষের ভালোবাসা যেমন গভীর,
তেমনি সেই ভালোবাসা যদি একবার ঘৃণায় পরিণত হয়
তা ভয়ঙ্করের চেয়েও ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে।
আমার ভয়ঙ্কর রূপটা আরও আগেই দেখতি।
কিন্তু পরিবারের জন্য বেঁচে গেলি।
আর একটা কথা , তর করা নিকৃষ্ট ভিডিওটা অনেক আগেই মুছে ফেলেছি।
বিজয়ের আনন্দে ভুলে বসেছিলি।
তাই ভুলেও ভাববি না, ঐ ভিডিওর দোহাই দিয়ে বেঁচে যাবি।
ঊর্মির ছোট্ট একটা ভুলের জন্য এবার হয়তো বেঁচে গেলি,
কিন্তু পরবর্তীতে কী অপেক্ষা করছে, তা তোর কল্পনারও বাইরে।
আরও একবার বলছি ,
পুরুষের ঘৃণা উত্তপ্ত আগুনের মতো।
—আচ্ছা, ঐ পুরুষ মনে কয়জনকে ভালোবাসা যায়?
তোমার কথা মতে, তুমি আমাকে ভালোবাসতে।
তাহলে সেই মনের ভালোবাসা এতটাই ঠুনকো কেন,
যে ঊর্মিকে নিয়ে টানাটানি করছে?
কায়সার স্বাভাবিকই রইল।
স্বর্ণার উসকানিমূলক কথাগুলো তাকে নাড়াতে পারল না।
দৃঢ় কণ্ঠে বলল—
“ভালোবাসা সুন্দর, তবে সেটা যদি হয় সঠিক মানুষকে নিয়ে।
তুই কখনোই আমার জন্য সঠিক ছিলি না।
আমাদের প্রত্যেকেরই উচিৎ,একজন ঠকালেই সেই শোক পালন না করা।বরং দেখিয়ে দেওয়া, তাকে ছেড়ে তারা কত বড় ভুল করেছে।
ঊর্মি আমার ওয়াইফ ।জানি না, মেয়েটা কতটুকু মানবে ।
মানাতে পারব কি না ?
তবুও চেষ্টা করলে ক্ষতি কী?”
কিছুটা অন্যমনস্ক হয়ে গেল সে।
সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে সামলে চাপা স্বরে বলে উঠল—
— পরবর্তী পদক্ষেপের জন্য তৈরি তো মিসেস আরিয়ান?
চলবে,,,,,,,
#বৈরি_হাওয়া
#পর্ব_২০
#ফারজানা_প্রণয়_চৌধুরি
এতো বড় একটা পর্ব দিলাম।আশা রাখি আপনাদের গঠনমূলক মন্তব্য রেখে যাবেন।
এবং যারা নতুন অবশ্যই পেজটিতে ফলো দিয়ে পাশে থাকবেন।
গল্প সম্পর্কে আলোচনা এবং আড্ডা দিতে যুক্ত হয়ে নিন এই গ্রুপে ⬇️
https://facebook.com/groups/777129281464382/

