#বৈরি_হাওয়া_২১
স্বর্ণাকে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তারপর থেকেই পরিবেশটা গুমোট। রেহেনা দেওয়ানের জ্ঞান ফিরেছে। যখন শুনেছে কায়সার সবটা সামলে নিয়েছে । তখন তিনি চিন্তামুক্ত হলেন। স্বর্ণাকে থানায় নিলেও চিন্তা নেই।কোনো না কোনো উপায়ে কায়সার ঠিক ছাড়িয়ে আনবে। হয়তো সবার চোখে সে খারাপ মহিলা হিসেবে প্রমাণিত হবে। কিন্তু কী করার?
মাতৃত্ব যে সবকিছুর ঊর্ধ্বে।
ওই মেয়েটা যে তাঁকে ‘মা’ ডাক শোনার অনুভূতি দিয়েছে। মিমির মতো তো স্বর্ণাও ছোটবেলায় খুব দুষ্টু ছিল। আধো আধো বুলিতে কত দুষ্টুমি স্মৃতি র পাতায় জমা আছে। চাইলেও তো মেয়ের খারাপ চাইতে পারে না।
প্রচলিত কথাই তো আছে—সন্তান যেমনই হোক, মায়েরা তাদের ফেলতে পারে না। তাই তো মায়ের অন্ধ দৃষ্টিতে আকাশসম পাপও ধরা পড়ে না।
— কী ভাবছ? মেয়ের কথা? আনন্দ পাচ্ছ এটা ভেবে—মেয়ের ধ্বংস দেখতে হবে না, তাই তো?
কায়সারের কণ্ঠে চকিতে মাথা তুলে দরজার দিকে তাকালেন তিনি। যেখানে দাঁড়িয়ে আছে কায়সার। দুই হাত ভাঁজ করে দেয়ালের সঙ্গে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে। শ্যামবর্ণের, বলিষ্ঠ চোয়ালের ছেলেটির মাঝে এক আলাদা আকর্ষণ কাজ করে। ওদের তিনটি ভাই অদ্ভুত সুন্দর—তিনজন তিন রকমের। তবে তাঁর সামনে দাঁড়ানো এই দেওয়ানের সৌন্দর্য তাঁকে আকর্ষিত করতে পারছে না। ছেলেটার মুখে ফুটে উঠেছে অদ্ভুত কঠোরতা। কেন যেন স্বাভাবিক মনে হলো না। প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকালেন তিনি।
প্রত্যুত্তরে এগিয়ে এলো কায়সার। বিছানায় উঠে চাচির কোলে মাথা রাখল। বাইরে না তাকিয়েই গলা উঁচিয়ে ডাকল—
— মা, ওখানে না দাঁড়িয়ে ভেতরে আসো।
রেহেনা দরজার দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকালেন। সাজেদা দেওয়ান ধীর কদমে এগিয়ে আসছেন। এসে তাদের পাশেই বসলেন।
কায়সার চাচির হাত নিজের মাথায় রাখল। বুঝিয়ে দিল মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে। রেহেনা দেওয়ান তাই করলেন।
বড় হওয়ার পর থেকে দূরত্ব অনেকটাই বেড়েছে। ঠিক অনেক বছর পর এই আবদার নিয়ে এসেছে ছেলেটা।
কায়সার উপরে ঝুলন্ত সিলিং ফ্যানের দিকে তাকিয়ে আছে। চোখে অদ্ভুত নীরবতা। ঘরের ভেতরের পিনপতন নীরবতাকে গ্রাস করে ফেলল কায়সারের কাতর কণ্ঠে করা প্রশ্ন—
— মা, তোমার কেন মনে হয় মিমি আমার সন্তান না?
উনি যেন এই প্রশ্নের আশাই করেছিলেন। খানিকটা উঁচু কণ্ঠে বললেন—
— কেন মনে করব না বলো তো? তুমি দিনের পর দিন ওই নষ্ট মেয়েটার পাপ নিজের ঘাড়ে চাপাতে চাইছ। আমি সেই পাপ কীভাবে তোমার হতে দিই? এসবের পেছনে পড়ে নিজের চরিত্রে দাগ লাগাচ্ছ। সংসারটাও করতে পারছ না।
রেহেনা দেওয়ানের যেন আজ অবাক হওয়ার পালা। সকাল থেকে শুধু অবাকের ওপর অবাক হচ্ছেন। একবার কায়সারের দিকে তাকাচ্ছেন তো একবার জায়ের দিকে।
কায়সার এবার সরাসরি মায়ের দিকে তাকাল। দৃষ্টি আগের মতোই নীরব। ওই চোখে তাকিয়ে বুঝার উপায় নেই । অদ্ভুত শীতলতা। কিছুটা গম্ভীর কণ্ঠে বলল—
— মা, মিমিকে দ্বিতীয়বার কখনো পাপ বলবে না। ও পবিত্র একটা ফুল । আমার ফুল, যদিও অনাকাঙ্ক্ষিত।
কিছুক্ষণ থেমে পুনরায় বলতে লাগল—
আজ দুজনকে একসাথে বসানোর কারণ একটাই—মনের সংশয় দূর করা। যদি তোমাদের সঙ্গে এসব কথা বলতে বিবেকে বাঁধে, তবু বলছি। আমি নিরুপায়। তোমাদের সন্দেহ আর সন্তানের প্রতি অন্ধ দরদ অসহ্য লাগছে।
রেহেনা দেওয়ান আর সাজেদা দেওয়ান একে অপরের দিকে তাকালেন। চোখে কৌতূহল। কায়সার নীরবে দেখল।
— চাচি,,
বলতে গিয়েও থেমে গেল কায়সার। কণ্ঠ কেমন যেন জড়িয়ে এলো। তবু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলতে লাগল,
— তোমার আর চাচার ভিডিও ছিল স্বর্ণার কাছে। কেমন ভিডিও ছিল, সেটা আলাদা করে বলার দরকার নেই। আশা করি কথার ধরনেই বুঝে নিয়েছ। শুধু তোমরাই না—মা–বাবা, ভাইয়া–ভাবি—সবারই ছিল। তোমাদের প্রত্যেকের রুমে গোপনে স্পাই ক্যামেরা লাগিয়েছিল।
রেহেনা দেওয়ানের হাত থেমে গেল। কায়সারের কথাগুলো যেন রুমে বজ্রপাত করল।কায়সার সেই দৃষ্টির তোয়াক্কা করল না। আর কত করবে? সে যে ক্লান্ত। মেয়ে এত এত অন্যায় করার পরও মেয়েকে বাঁচাতে মরিয়া এরা । নিজে দিনের পর দিন যন্ত্রণা সহ্য করেছে। অদ্ভুত অস্থিরতায় থেকেছে সবসময়। চায়নি তারা চিন্তা করুক, এসব লজ্জাজনক ব্যাপার সামনে আসুক। এটাই ছিল তার ভুল। আর সে ভুল করল না।
নিরেট কণ্ঠে বলতে লাগল,
— তোমার মেয়ে খারাপ সঙ্গের কারণে পুরোই নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। সন্তান প্রীতি না দেখিয়ে তখন যদি একটু শাসন করতে, তাহলে এমনটা হতো না। বন্ধুদের সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপ আর মেসেঞ্জারে একের পর এক গ্রুপে অ্যাড ছিল । যার অনেকগুলোই ছিল সেক্সুয়াল। সোসাল মিডিয়ার অশ্লীলতার মাঝে পুরোপুরি মিশে গিয়েছিল। ধীরে ধীরে এগুলো নেশার মতো হয়ে যায়। লাইক, কমেন্ট, শেয়ারের আশায় ছাড়তে থাকে অশ্লীল কনটেন্ট। একাধিক ফেক পেজের সমাহার। বিভিন্ন অশ্লীল ভিডিও ছাড়া।
হঠাৎ ওর মনে হলো,এগুলোতে হচ্ছে না। তখন ঘরের সবার ভিডিও করা শুরু করল। তবে ছাড়ার সাহস পাচ্ছিল না। ভিডিও করে রেখে দিয়েছিল। এর মাঝেই ঘৃণ্য খেলায় মেতে উঠে। একের পর এক হোটেলে যাওয়া । যার অধিকাংশই গেছে তোমাদের কাছে কলেজের গুরুত্বপূর্ণ কাজ বলে। নতুন নতুন বয়ফ্রেন্ড। ওর চোখে তখন এক রঙিন পৃথিবী। এগুলো একসময় অভ্যাসে পরিণত হয়।
গার্লফ্রেন্ড–বয়ফ্রেন্ড খেলার মাঝেই পছন্দ হয়ে যায় আরিয়ান রহমানকে। ছেলেটা মেডিকেল স্টুডেন্ট ছিল। বড়লোক ঘরের মেয়ে পেয়ে ভালোই ব্যবহার করতে থাকে। দিনের পর দিন তোমাদের কাছ থেকে বেহিসেবি টাকা নেওয়া—সেগুলো আরিয়ান আর বন্ধুদের আড্ডায় খরচ করাই ছিল নিত্যদিনের কাজ।
তার মাঝেই আরিয়ানের সঙ্গে বিয়ে করে নেয় স্বর্ণা। একসময় আরিয়ানের কাছে স্বর্ণাকে বিরক্ত লাগতে শুরু করে। লুকিয়ে বাইরে যাওয়ার পাঁয়তারা করছিল ।যা স্বর্ণা জানত না। হঠাৎ জানতে পারে স্বর্ণা কনসিভ করেছে। এটা আরিয়ানকে বলার পর সে কোনোভাবেই মানতে নারাজ । আরিয়ান বুঝাতে লাগল বাচ্চাটাকে নষ্ট করার।
গর্ভপাত করেও ফেলে সে। এই বয়সে বাচ্চার ঝামেলা চায়নি। আবার আরিয়ানকেও হারাতে চায়নি। কিন্তু লাভ তো কিছুই হলো না। ফলস্বরূপ আরিয়ান আমেরিকা চলে গেল।
যখন জানতে পারল, স্বর্ণা প্রায় পাগল। আমি তখন এত কিছু না জানলেও ওর বাচ্চা নষ্ট করার কথা এক বন্ধুর কাছে জানতে পেরেছিলাম। তখন থেকেই এক আলাদা অনীহা ছিল। ওকে নিয়ে ভাবার রুচি নষ্ট হয়ে যায়। তাই তো ওই দিন হাত কাঁটার পরেও শান্ত ছিলাম। আমি জানতাম—ও আরিয়ানের জন্যই পাগলামি করেছে।
এত কিছু জানার পরেও জানো, চাচি…আমি পাগলটা পাগলামি করেছিলাম। তখনো জানতাম না ওর বিয়েটা হয়ে গেছে। ভেবেছিলাম, একটা মেয়ের নষ্ট হওয়ার পেছনে শুধু মেয়েটাই নয়—তার পরিবারও সমান দায়ী। সেই হিসেবে তো আমরাও অপরাধী। আমরা যদি সঠিক শিক্ষা দিতাম, তাহলে তো এমন হতো না। ও না হয় একটা ভুল করেছে।আমাদের উচিত ছিল ক্ষমা করে সুযোগ দেওয়া।
ওকে চেয়েছিলাম একটা সুযোগ দিতে। মেডিক্যাল থেকে আসার পর প্রথমে অবজ্ঞা করলেও, পরে মায়া জন্মায়। হাজার হোক, ছোটবেলা থেকে আলাদা এক অদ্ভুত টান ছিল। তার মাঝে দাদির বলা বিয়ের কথা। অনুভূতিটা তো ঠুনকো ছিল না। এড়িয়ে চলতে চাইলেও পারিনি। ভাবলাম, সুযোগ না হয় দিই।
দিয়েও ফেললাম, চাচি। বাবা বলার পরই রাজি হয়ে গেলাম। তোমরা ভেবেছিলে হয়তো বাবা জোর করাতে রাজি হয়েছি। কিন্তু সেটা ছিল ভুল। আমি নিজের আবেগের কাছেই সেদিন ধরা খেয়ে গিয়েছিলাম।
বিয়ে করে নিয়েছিলাম। প্রথমে স্পর্শ করতে পারিনি। কেমন যেন একটা ফিলিংস হতো। দূরেও সরাতে পারছিলাম না, কাছেও টানতে পারছিলাম না। তবে কতদিন? একটা মেয়ে আর একটা ছেলে একসাথে থাকবে, কিন্তু কিছু হবে না—এটা কি হয়?
তার মাঝে পবিত্র কালেমা পড়ে কবুল বলা। সবকিছু ভুলে পবিত্র সম্পর্কে পূর্ণতা দিয়েছিলাম। মেয়েটাও কত সুন্দর করে দিনের পর দিন মিথ্যা মায়ায় আমাকে জড়িয়েছে। কী নিখুঁত তার অভিনয়।
এভাবেই হঠাৎ জানতে পারলাম—আমার অংশ ওর পেটে। এত খুশি হয়েছিলাম। বাচ্চার ইচ্ছা তখন না থাকলেও কী যে আনন্দ লেগেছিল সেদিন।
কিন্তু যেদিন জানতে পারলাম আমার অংশ পৃথিবীতে আসছে, সেদিন আরেকটা দুঃসংবাদ অপেক্ষা করছিল।
বাচ্চার সুখ স্থায়ী হলো না। পায়ের নিচে মাটি সরে যাওয়ার জোগাড়। স্বর্ণা ঘর থেকে বের হওয়ার পর ওর ফোন এলো। একটু অবাক হলাম। আমার দেওয়া ফোনটা ওটা না। বিয়ের পর সিম কার্ডসহ ফোন আমি দিয়েছিলাম। তাহলে এটা কার ফোন?
সন্দেহ বশত ফোনটা ধরলাম।
অপর প্রান্তের মানুষের কথা শুনে আমার শরীর বেয়ে ঘাম নামতে লাগল। নিজেকে আর সামলাতে পারলাম না। সেদিন স্তব্ধ হয়ে বসে পড়েছিলাম বিছানার ওপর।
আরিয়ান ফোন দিয়েছিল। ছেলেটা দেশে এসেছে। দেশে এসে বিয়ের কথা জানতে পেরে উত্তেজিত হয়ে স্বর্ণাকে ফোন দেয়। অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে। সে জানতই না ওটা স্বর্ণা না, আমি ছিলাম।
সেদিন কিছু বলিনি। আমার বাচ্চাটার জন্য ভয় হতে লাগল। কোনোমতে নিজেকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করলাম। মনে কেমন একটা খচখচানি। নেমে পড়লাম স্বর্ণা সম্পর্কে পুরোটা জানার।
যখন জানতে গেলাম, সামনে এলো একের পর এক বিকৃত ঘটনা।
ওর ফোন ঘেঁটে পেলাম কিছু পেজ—যেগুলোর সবই পর্ন সাইট। এর মাঝে এক পেজে কিছুক্ষণ স্ক্রল করার পর একটা ভিডিও সামনে এলো। সেটা দেখে আমার সেদিন চারদিক অন্ধকার লাগতে শুরু করল। তোমার আর চাচ্চুর ভিডিও। যদিও মুখটা ঢাকা ছিল, তবু ঘরের কিছু অংশ দেখেই চিনতে আমার অসুবিধা হলো না।
সেদিন নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারিনি। স্বর্ণা আমার সঙ্গে সংসার করার অবস্থাতেও পাল্টায়নি। ভালোবাসার দোহাই দিয়ে চালিয়ে গেছে নিষিদ্ধ কাজ।
এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলাম ফোনের দিকে।তখনই স্বর্ণা আসে।সেদিন যেন আমার ভেতর দানব ভর করেছিল। নিজেকে আর সামলাতে পারিনি। একের পর এক চড় মারতে থাকি। সাইকো টা যেন তখন নিজের মধ্যেই ছিল না। বিকৃত মস্তিষ্কে হাসতে থাকে। ইশারা করে পেটের দিকে।
ওইদিকে তাকিয়েই থেমে গিয়েছিলাম। আমি ছিলাম নিরুপায়। ওই বাচ্চাটা যে নিষ্পাপ। ওকে যে আমার চাই।
সেদিন এক চুক্তি হয়েছিল।
বাচ্চাটাকে ও জন্ম দেবে, বিনিময়ে ওকে এখান থেকে বের করে দিতে হবে। ওকে ওর মতো করে বাঁচতে দিতে হবে। আর সব ধরনের ব্যবস্থা করে দিতে হবে। মেনে নিয়েছিলাম। আমার লক্ষ্য তখন একটাই আমার বাচ্চা। ও কোথায় গেল, সেটা নিয়ে মাথাব্যথা ছিল না।
ভয়ে ভয়ে বাচ্চাটা এলো। আমার এক নরম, তুলতুলে মেয়ে। খুব যত্নে বুকে আগলে নিলাম। তবু এই ভেবে কষ্ট হচ্ছিল মেয়েটা মায়ের দুধ পাবে না।
দশ দিনের মাথায় আমি ওকে পালাতে সাহায্য করি। সঙ্গে ওর আর আরিয়ানের একসঙ্গে থাকার সব ব্যবস্থা করে দিই। আরিয়ান ভুয়া সার্টিফিকেট নিয়ে ডাক্তার হয়। দুজন মিলে একের পর এক অনৈতিক কাজে জড়াতে থাকে। ওসব আমি পাত্তা দিইনি।
হঠাৎ এসব ব্যাপারে চাচ্চু জানতে পারে। টেনে–হিঁচড়ে বাড়িতে নিয়ে আসে। জানি না চাচ্চু কী বুঝিয়েছে, তবে হঠাৎ করেই ও সংসার করতে মরিয়া হয়ে ওঠে।
আমি পারছিলাম না তোমাদের বলতে। মেয়েটাকে ওর থেকে দূরে রাখতে শুরু করলাম। একদিন চাচ্চু কসম দেওয়ায়—কাউকে কিছু না বলতে। সেদিনও চুপ করে গিয়েছিলাম।তবে থেমে যাইনি।তোমাকে দিয়ে কৌশলে ডিভোর্সটা করিয়ে নিয়েছিলাম। এতে ওর পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। ওর উদ্দেশ্য ছিল কোনোভাবে আমার কাছ থেকে কোম্পানিটা নিয়ে নেওয়া। তবুও ও হাল ছাড়েনি। একদিন আমি গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিলাম। সেই সুযোগে আমার টিপসই নেওয়ার চেষ্টা করছিল। হঠাৎ মেয়ের কান্নার শব্দে ঘুম ভাঙে। তখনই স্বর্ণার কাজ দেখে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারিনি। চুলের মুঠি ধরে সবার সামনে আনতে চেয়েছিলাম। সেদিনও তোমার স্বামী আটকে দেয়।
ওই লোকটা ঠান্ডা মাথার খুনি। অতীতে যেমন নিজে পাপ করেছে, বর্তমানে মেয়েকেও পাপ করার সুযোগ করে দিয়েছে।
সেই ঘটনার পর থেকেই স্বর্ণা মিমিকে সহ্য করতে পারে না। ওর ধারণা মিমির জন্যই ওর কাজ হতে গিয়েও হয়নি। মিমিকে ভাবতে শুরু করে নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী। আর তার সঙ্গে যোগ হয় ঊর্মি।
সেই ক্ষোভেই সেদিন মিমিকে মারতে চেয়েছিল। আর দোষ চাপিয়েছিল ঊর্মির ওপর।তারপরের কাহিনি তোমরা জানোই।
কায়সার একটানে কথা বলে থামল। নিঃশ্বাস ভারী হয়ে এলো। চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ল দু’ফোঁটা জল।
হঠাৎ শরীরে পানির ফোঁটার স্পর্শ পেয়ে বাস্তবে ফিরলেন রেহেনা দেওয়ান। এতক্ষণ যেন ঘোরের ভেতর ছিলেন তিনি। মনে হচ্ছিল স্বপ্ন দেখছেন। ঘুম ভাঙলেই সব শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু না, এটা স্বপ্ন নয়। কায়সারের চোখের জল ছিল জ্বলন্ত প্রমাণ।
— আমার দোষ কী, চাচি? ভালোবাসা? আমি তো জানতাম ভালোবাসলে নাকি সুযোগ দিতে হয়। সুযোগ না দিলে নাকি সেটা ভালোবাসা না। কই, আমি তো দিয়েছিলাম সুযোগ। কিন্তু আমি তো বারবার ঠকেছি।
কায়সারের কাতর কণ্ঠে পরিবেশটা আরও গুমোট হয়ে উঠল।
— ভালোবাসা বলতে কিছুই নেই। সবই মিথ্যা আবেগ। আর আমি হলাম সেই আবেগে গা ভাসানো তুচ্ছ পথীক। নিজের ব্যক্তিত্বকে বিসর্জন দিয়েছি। মিথ্যা আবেগে ভেসে সাপের বিষাক্ত ছোবল ছাড়া কিছুই পাইনি।
কি আশ্চর্য! এই ছেলেটা কাঁদছে কেন? তাকে তো শক্ত বলেই জানত সবাই। ছেলেরা কাঁদে নাকি? ছেলেদের তো কাঁদতে নেই! আচ্ছা, আজ একটু কাঁদুক। হয়তো বহুদিনের জমে থাকা অব্যক্ত কথাগুলো উগরে দিচ্ছে।
রেহেনা দেওয়ান পারলেন না ছেলেটাকে সান্ত্বনা দিতে। চোখ সরিয়ে জায়ের দিকে তাকালেন। সাজেদা বেগম তার দিকেই তাকিয়ে আছেন । ঘৃণার দৃষ্টিতে। হঠাৎ মনে পড়ে গেল সেদিনের কথা।
সাজেদা বেগম বারবার বারণ করেছিলেন। বলেছিলেন
—কার সঙ্গে যেন সব সময় ফোনে কথা বলতে দেখছেন। উশৃঙ্খল চলাফেরা সম্পর্কে বারবার সতর্ক করেছিলেন। কিন্তু তিনিই তো সেদিন কিছুই আমলে নেননি। উল্টো যা নয়, তা বলে অপমান করেছিলেন।
ইশশ! সেদিন যদি একটু তার কথা শুনতেন!
পিতা-মাতা সন্তানকে ভালোবাসবেন । এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তাই বলে কি অন্ধ ভালোবাসা? আমাদের কি উচিত নয়,তারা কী করছে?কোথায় যাচ্ছে? কার সঙ্গে মিশছে?এসব খেয়াল রাখা।
সন্তান জন্ম দিয়ে, কিছুটা বড় হওয়ার পর স্বাধীনতার নামে ছেড়ে দিলেই কি দায়িত্ব শেষ? এই বয়সে এসব করবেই । এই ভ্রান্ত ধারণাগুলো কবে বদলাবে?
আমরা খুব সহজেই মানুষকে “নষ্ট” বলে দাগিয়ে দিই। ঘৃণা করি। কিন্তু আমার প্রশ্ন,তারা কি জন্ম থেকেই খারাপ হয়ে আসে?
না। তারা জন্ম থেকে খারাপ হয় না। আমরা কখনো সুযোগ দিই,বা কখনো নিজেরাই তৈরি করি।
সন্তানকে ভালোবাসার বিপক্ষে আমি নই। অবশ্যই ভালোবাসা থাকবে। কিন্তু সেই ভালোবাসার মাঝেই থাকতে হবে সীমাবদ্ধতা।
কিন্তু হায়! এ সমাজ যদি মানত। আর মানছে না বলেই—স্বর্ণার মতো হাজার হাজার স্বর্ণা তৈরি হচ্ছে।
—————-
–আচ্ছা, তোমার কি মনে হয় না।তুমি এত রেয়ার তথ্য খুব সহজেই পেয়েছো?
এসআই মিনহাজের প্রশ্নে কোনো ভাবান্তর হলো না ঊর্মির। সে নির্বিকার ভঙ্গিতে বসে রইল। কিছুক্ষণ পর স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল—
–সে নিজেই জানতে দিয়েছে বলেই আমি এত সহজে পেয়েছি। কিছুক্ষণের জন্য ভেবেছিলাম দেওয়ানরা বুঝি পুরনো অভ্যাস ভুলে গিয়েছে। কিন্তু না, এভাবেই আবারও তার পুনরাবৃত্তি করল।
আজকের ঘটনায় আমি একটা বিষয় খুব গভীরভাবে উপলব্ধি করেছি,
ওদের রক্ত বিষাক্ত। পাল্টিবাজি যে তাদের পূর্ব পরিচিত।তবে যাই হোক ঊর্মি তো ছেঁড়ে দেওয়ার নয়।তার মুখে ফুটে উঠলো বাঁকা হাসি।
চলবে,,,
#ফারজানা_প্রণয়_চৌধুরি

