Soulmate_to_Enemy #পর্ব_১২

0
2

#Soulmate_to_Enemy
#পর্ব_১২
লেখনীতে: #মিফতাহুল_জান্নাত_জেমিম

শহরের বুকে সন্ধ্যা নামে এক মায়াবী বিষণ্ণতা নিয়ে। কিন্তু জেনিন নূরশাদের জন্য এই সন্ধ্যাগুলো হলো যুদ্ধের প্রস্তুতির সময়। নূরশাদ ইন্ডাস্ট্রিজের বিশাল কাঁচের ভবনে যখন একে একে সব আলো নিভে যাচ্ছে, তখনো সিইও চেম্বারে একটি টেবিল ল্যাম্প জ্বলছে। জেনিন তার লেদার চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আছে। তার সামনে রাখা এক গ্লাস জল, যা সে গত আধঘণ্টা ধরে স্পর্শ করেনি। তার নজর স্থির হয়ে আছে দরজার দিকে। আজ সে নোবারাকে নিয়ে বাইরে ডিনারে যাবে।

এটি কি কেবল একটি ডিনার? নাকি পনেরো বছরের জমানো হাহাকারের এক নীরব উদযাপন? জেনিন নিজের মনের সাথে লড়ছে। তার ভেতরে এক তীব্র ইচ্ছা জাগছে নোবারার হাতটা শক্ত করে ধরে বলতে, ‘আমি তোমাকে কতটা মিস করেছি’। কিন্তু তার ইগো, তার বর্তমান পরিচয় এবং তার চারপাশে ঘিরে থাকা অন্ধকার তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে। সে চায় নোবারা তাকে ভয় পাক, তাকে শাসক হিসেবে দেখুক; কিন্তু যখনই নোবারা তার সামনে আসে, জেনিন নিজেই নিজের তৈরি শাসনের জালে আটকা পড়ে যায়।

দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল নোবারা আকারি। আজ সে অফিসের সেই কঠোর ফর্মাল পোশাক বদলে পরেছে একটি কালো রঙের শাড়ি। খুব সাধারণ সুতির শাড়ি, কিন্তু নোবারার অঙ্গে তা যেন কোনো রাজকীয় পোশাকের চেয়েও বেশি উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। তার গলায় কোনো অলঙ্কার নেই, শুধু কানে ছোট দুটি কুন্দনের দুল যা ল্যাম্পের আলোয় মাঝেমধ্যে ঝিলিক দিয়ে উঠছে।

জেনিন এক মুহূর্তের জন্য নিশ্বাস নিতে ভুলে গেল। তার চোখের সামনে যেন পনেরো বছর আগের সেই কিশোরী নোবারা দাঁড়িয়ে আছে, যে একবার নীল শাড়ি পরে জেনিনের সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল।

জেনিনের হৃদপিণ্ডটা সজোরে ধক করে উঠল। কিন্তু সে সাথে সাথে মুখটা ফিরিয়ে নিল। তার চোখের সেই তীব্র আকর্ষণ সে প্রকাশ করতে চায় না। সে চায় না নোবারা বুঝুক যে জেনিন নূরশাদ আজ এই কালো শাড়ির মোহে পরাজিত।

“প্রস্তুত আপনি?” জেনিন খুব শীতল গলায় জিজ্ঞেস করল। সে নিজের গলার স্বর স্বাভাবিক রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছে।

“আমি অনেকক্ষণ আগেই প্রস্তুত ছিলাম স্যার।” নোবারা শান্ত স্বরে উত্তর দিল। তার কন্ঠে আজ কোনো তেজ নেই, বরং আছে এক ধরণের কোমল বিদ্রূপ।

জেনিন উঠে দাঁড়ালো। তার দীর্ঘদেহী অবয়বটা নোবারার ওপর এক ধরণের আধিপত্য বিস্তার করল। সে টেবিল থেকে তার কোটটা তুলে নিল। “চলুন। আমার সময় খুব দামী, আপনি জানেন।”

লিফটে নামার সময় দুজনেই নীরব। লিফটের বদ্ধ পরিবেশে নোবারার গায়ের সেই পরিচিত চন্দন আর বৃষ্টির মতো ঘ্রাণ জেনিনকে পাগল করে দিচ্ছে। সে আড়চোখে নোবারার খোলা চুলের দিকে তাকাচ্ছে। জেনিনের হাত দুটো চুলকাচ্ছে সেই চুলে একটু স্পর্শ করার জন্য। কিন্তু সে শক্ত করে লিফটের হ্যান্ডেল ধরে রইল।

নিচে জেনিনের ব্ল্যাক মার্সিডিজ অপেক্ষা করছে। জেনিন নিজেই আজ ড্রাইভ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সে চায় না তাদের এই সময়ে অন্য কোনো তৃতীয় ব্যক্তি থাকুক। নোবারা পেছনের সিটে বসতে গেলে জেনিন কড়া গলায় বলল,
“সামনে বসুন। আপনি আমার পিএ, ড্রাইভারের মালিক নন।”

নোবারা একটু হাসল। সে জেনিনের পাশের সিটে বসল। গাড়ি যখন শহরের ব্যস্ত রাস্তা দিয়ে এগোচ্ছে, জেনিন লক্ষ্য করল নোবারা জানালার বাইরে অপলক তাকিয়ে আছে। রাস্তার ধারের নিয়ন আলোগুলো নোবারার মুখে এক বিচিত্র মায়া তৈরি করছে। জেনিন বারবার স্টিয়ারিং ঘোরাচ্ছে, কিন্তু তার চোখ বারবার নোবারার দিকে চলে যাচ্ছে।

নোবারার হাতের আঙুলগুলো তার কোলের ওপর রাখা। জেনিনের মনে হলো সে যদি এখন হাত বাড়িয়ে ওই আঙুলগুলো ধরতে পারত!

গাড়ির ভেতরের নিস্তব্ধতা তখন কেবল এসির মৃদু শোঁ শোঁ শব্দে ঢাকা। রাস্তার সোডিয়াম বাতিগুলো একটার পর একটা এসে নোবারার মুখে আলো-আঁধারির খেলা তৈরি করে দিয়ে যাচ্ছে। জেনিন আড়চোখে একবার দেখল, নোবারার চুলের কয়েকটা অবাধ্য গোছা জানালার দিক থেকে আসা হালকা বাতাসে দুলছে।

জেনিনের বুকের ভেতরটা এক অদ্ভুত অস্থিরতায় কাঁপছে। সে আলতো করে মিউজিক সিস্টেমের নবটা ঘুরিয়ে দিল। পরক্ষণেই গাড়ির চারপাশের স্পিকারে বেজে উঠল একটা পরিচিত সুর। গিটারের মিষ্টি টুংটাং আর বাঁশির মূর্ছনা ছড়িয়ে পড়ল গাড়ির ছোট কেবিনে।

গানটা শুরু হতেই জেনিনের অবচেতন মন যেন মুক্তির পথ খুঁজে পেল। সে স্টিয়ারিংয়ে তাল মিলিয়ে আঙুল নাড়াতে লাগল। গলার স্বর নিচু রেখে, প্রায় ফিসফিস করে সে গুনগুন করতে শুরু করল,

“নেমে এলো চাঁদ আকাশ থেকে
ধুলো মাখা গলিতে..
রঙ চটা দিন করলো রঙ্গীন
স্বপ্নের তুলিতে..
দেখে ওই হাসি, আমি বান ভাসি
মন ডুবে যেতে চায়,
তার ওই চাওয়া, ঝোড়ো হাওয়া
কেন পাগল করে যায়…!”

নোবারা এতক্ষণ জানালার দিকে তাকিয়ে ছিল, গানের সুর আর জেনিনের গুনগুনানি শুনে সে ধীরে ধীরে মাথা ফেরাল। জেনিন তখন রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকলেও তার ঠোঁটে এক চিলতে হাসি!

গানের এই পর্যায়ে এসে জেনিন আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সে হালকা করে মাথা দুলিয়ে দরদ দিয়ে গাইতে লাগল,
“প্রেম আমার হো ও প্রেম আমার…
প্রেম আমার হো ও প্রেম আমার…”

নোবারা অপলক দৃষ্টিতে জেনিনের দিকে তাকিয়ে রইল। জেনিনের এই মুহুর্তটা তার কাছে সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত ছিল! গাড়ির ড্যাশবোর্ডের মৃদু নীল আলোয় জেনিনের চোয়ালের রেখাগুলো আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। গানে গানে যেন জেনিন তার মনের সেই কথাগুলোই বলে দিচ্ছে, যা সে সরাসরী বলার সাহস পাচ্ছিল না।

হঠাৎ জেনিন খেয়াল করল নোবারা তার দিকেই তাকিয়ে আছে। সে কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে গানের সুর থামিয়ে দিল। একটু ইতস্তত করে জেনিন এসির তাপমাত্রা আরও দু-ডিগ্রি কমিয়ে দিল।

“আপনার গরম লাগছে?” নোবারা শান্ত স্বরে প্রশ্ন করল।

জেনিন স্টিয়ারিংটা শক্ত করে ধরে গম্ভীর হয়ে বলল, “না। আমি ঠিক আছি।”

আসলে সে ঠিক নেই। এই গান, এই মায়াবী রাত আর পাশে বসে থাকা নোবারা, সব মিলিয়ে জেনিনের মনে হচ্ছে সে বাস্তবের পৃথিবী ছেড়ে অন্য কোনো স্বপ্নের জগতে গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছে।

গাড়ি এসে থামল শহরের সবচেয়ে দামী এবং আভিজাত্যপূর্ণ এক রুফটপ রেস্টুরেন্টের সামনে। এখানে সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার নেই। জেনিন আগে থেকেই পুরো রেস্টুরেন্টটা বুক করে রেখেছে। সে চায় না নোবারাকে অন্য কোনো পুরুষ দেখুক। সে চায় এই সুন্দর মুহূর্তটায় নোবারার প্রতিটি চাউনি, প্রতিটি হাসি যেন কেবল তার জন্যই বরাদ্দ থাকে।

রেস্টুরেন্টের ছাদে মৃদু সংগীত বাজছে। চারদিকে মোমবাতির আলো। জেনিন আর নোবারা মুখোমুখি বসল। মাঝখানে একটি কাঁচের টেবিল, যার ওপর দিয়ে দুজনের প্রতিচ্ছবি দেখা যাচ্ছে।

“আপনি কি সবসময়ই এভাবে একা থাকতে পছন্দ করেন?” নোবারা নীরবতা ভাঙল। “পুরো রেস্টুরেন্ট খালি করে দেওয়ার কী দরকার ছিল?”

জেনিন চুরুট ধরাল। ধোঁয়াগুলো নোবারার চোখের সামনে দিয়ে উড়ে গেল। “আমি বিশৃঙ্খলা পছন্দ করি না। আর আমি চাই না আমার পার্সোনাল এক্সিকিউটিভকে নিয়ে ডিনার করার সময় কোনো আপদ আমাদের ডিস্টার্ব করুক।”

নোবারা এবার সোজা জেনিনের চোখের দিকে তাকালো। “কিন্তু আমার মনে হচ্ছে আপনি আসলে ভয় পাচ্ছেন।”

জেনিন চুরুটটা অ্যাশট্রেতে সজোরে চেপে ধরল। তার ইগোতে আঘাত লেগেছে। সে টেবিলের ওপর দিয়ে ঝুঁকে এল। নোবারার মুখের খুব কাছে তার মুখ।
“আমি জেনিন নূরশাদ। আপনি আমার পিএ, আপনার কাজ আমাকে জাজ করা নয়। আপনি যদি আমার এই আতিথেয়তাকে ভয় মনে করেন, তবে সেটা আপনার সমস্যা।”

“তবে আপনার চোখ কেন কথা বলছে অন্যরকম?” নোবারা এক চুলও নড়ল না। “তাহলে আপনি কেন একবার বলছেন না যে আপনি আমাকে পনেরো বছর ধরে খুঁজছেন?”

জেনিনের হৃদস্পন্দন এক মুহূর্তের জন্য বন্ধ হয়ে গেল। সে স্তব্ধ হয়ে নোবারার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। নোবারার এই সরাসরি আক্রমণ সে আশা করেনি। জেনিনের ইচ্ছে করল এই মুহূর্তে নোবারাকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে বলতে, ‘হ্যাঁ, আমি তোমাকে খুঁজেছি! প্রতিটি দিন, প্রতিটি রাত আমি তোমার কথা ভেবেছি!’ কিন্তু তার মাথার ভেতরে তখন সতর্কবার্তা ঘুরছে। সে যদি আজ ভালোবাসা প্রকাশ করে, তবে সে দুর্বল হয়ে পড়বে। আর জেনিন নূরশাদ দুর্বল হতে পারে না।

সে নিজেকে সরিয়ে নিল। খুব শীতল হাসল সে। “আমি আপনাকে এখানে এনেছি কারণ আপনি আমার কাজ সহজ করেছেন। এটি একটি প্রফেশনাল রিওয়ার্ড। এর বাইরে অন্য কিছু ভাবা আপনার বোকামি।”

নোবারার চোখে এক মুহূর্তের জন্য বিষাদ ফুটে উঠল, কিন্তু সে তা ঢেকে ফেলল। “ঠিক আছে স্যার। প্রফেশনাল রিওয়ার্ডই সই। তবে আপনার এই প্রফেশনালিজমের আড়ালে যে দীর্ঘশ্বাসটা পড়ছে, ওটা কিন্তু আমি শুনতে পাচ্ছি।”

খাবার এল। জেনিন লক্ষ্য করল নোবারা খুব সামান্য খাচ্ছে। জেনিন নিজে কিছুই খাচ্ছে না। সে শুধু নোবারাকে দেখছে। নোবারা যখন কাঁটা-চামচ দিয়ে খাবার মুখে তুলছে, জেনিনের মনে হচ্ছে এটিই পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য। সে চায় এই সময়টা যেন থমকে যায়। সে চায় নোবারা সারা জীবন তার এই টেবিলের ওপারেই বসে থাকুক। সে তাকে তাকে শাসন করবে, তাকে রাগাবে, কিন্তু তাকে চোখের আড়াল হতে দেবে না।

ডিনার শেষ করে যখন তারা নিচে নামল, তখন ঝিরঝির করে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। জেনিন দেখল নোবারা বৃষ্টির দিকে হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে। বৃষ্টির ফোঁটাগুলো নোবারার হাতে পড়তেই তার মুখে এক মায়াবী হাসি ফুটে উঠল।

জেনিনের বুকের ভেতরটা তখন মোচড় দিয়ে উঠল। পনেরো বছর আগে এভাবেই নোবারা বৃষ্টিতে ভিজতে ভালোবাসত। জেনিন দ্রুত তার কোটটা খুলে নোবারার কাঁধে জড়িয়ে দিল।

“ভিজবেন না। কাল অফিসে অনেক কাজ আছে, আপনার অসুস্থ হওয়া চলবে না,” জেনিন কঠোর গলায় বলল, যদিও তার স্পর্শে ছিল গভীর মমতা।

নোবারা জেনিনের কোটের কলারটা শক্ত করে ধরল। জেনিনের গায়ের উগ্র আর পুরুষালি ঘ্রাণ তাকে আচ্ছন্ন করে দিল। সে জেনিনের দিকে তাকিয়ে বলল—
“আপনি আমাকে বৃষ্টির হাত থেকেও বাঁচাতে চান? আপনি কি ভাবেন আপনি সব নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন?”

“যা আমার, তা আমি নিয়ন্ত্রণ করতে পছন্দ করি,” জেনিন নোবারার খুব কাছে এসে দাঁড়ালো। “আর আপনি এখন আমার। সেটা অফিসে হোক কিংবা এই বৃষ্টির রাতে।”

জেনিন নোবারার হাতটা ধরল এবং তাকে গাড়ির দিকে নিয়ে চলল। তার হাতটা যখন নোবারার হাতের তালু স্পর্শ করল, তখন দুজনের শরীর দিয়েই একটা বিদ্যুতের তরঙ্গ বয়ে গেল। জেনিন হাতটা ছাড়ল না। সে শক্ত করে নোবারার হাতটা ধরে রইল যতক্ষণ না তারা গাড়িতে গিয়ে বসল।

গাড়িতে ফেরার পথে জেনিন আবার সেই পাথুরে সিইও। সে কোনো কথা বলল না। কিন্তু তার মনের ভেতর তখন হাজারটা ঢেউ আছড়ে পড়ছে। সে ভাবছে, কেন আমি ওকে জড়িয়ে ধরলাম না? কেন আমি বললাম না যে এই কালো শাড়িতে ওকে পরীর মতো লাগছে?

নূরশাদ ভিলার গেট যখন খুলল, রাত তখন গভীর। জেনিন গাড়ি পার্ক করে নোবারার জন্য দরজা খুলে দিল। নোবারা নামার সময় জেনিনের দিকে তাকিয়ে বলল,
“ধন্যবাদ স্যার। আজকের রাতটার জন্য।”

জেনিন শুধু মাথা নাড়ল। সে নোবারাকে তার রুমের দিকে যেতে দেখল। নোবারার শাড়ির আঁচলটা যখন মেঝের ওপর দিয়ে হড়কে যাচ্ছিল, জেনিনের ইচ্ছে হলো ওই আঁচলটা ধরে তাকে থামিয়ে দিতে। কিন্তু সে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

জেনিন তার অনুভূতিকে পাথরের নিচে চাপা দিয়ে রাখছে, কিন্তু তার প্রতিটি কাজ নোবারার প্রতি তার অন্ধ মোহকে প্রকাশ করে দিচ্ছে। পসেসিভ জেনিন নূরশাদ এখন এক অদ্ভুত দ্বন্দ্বে, সে কি শাসক হবে নাকি প্রেমিক?

হঠাৎ ভিলার বাইরে কুকুরের ডাক আর প্রহরীদের দৌড়াদৌড়ির শব্দ পাওয়া গেল। জেনিনের কান খাড়া হয়ে উঠল। এই বাড়িতে অনুমতি ছাড়া বাতাসও ঢুকতে পারে না, সেখানে এই অস্থিরতা কেন? ঠিক তখনই তার ফোনে একটা এনক্রিপ্টেড মেসেজ এল,
“বস, সাউথ উইং দিয়ে কেউ ভেতরে ঢুকেছে। ওরা প্রফেশনাল।”

জেনিন চুরুটটা অ্যাশট্রেতে পিষে ফেলল। তার আসল পরিচয় এখনো গোপন, কিন্তু শত্রুরা তো জানে সে কে। সে দ্রুত তার ড্রয়ার থেকে একটা সাইলেন্সার লাগানো পিস্তল বের করল। তার চোখে এখন সেই শীতল খুনে চাউনি। কিন্তু তার প্রথম চিন্তা জেনিন নূরশাদকে নিয়ে নয়, তার চিন্তা নোবারাকে নিয়ে।

সে দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠতে লাগল। ঠিক সেই মুহূর্তে পুরো ভিলার পাওয়ার কাট হয়ে গেল। ঘুটঘুটে অন্ধকারে জেনিন বিড়ালের মতো নিঃশব্দে নোবারার ঘরের সামনে পৌঁছাল। সে দরজা ধাক্কা দিয়ে ভেতরে ঢুকল।

“মিস আকারি! শব্দ করবেন না!” জেনিন ফিসফিস করে বলল।

নোবারা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। সে চমকে উঠল। “কী হচ্ছে স্যার? আলো চলে গেল কেন?”

জেনিন এক লাফে নোবারার কাছে গিয়ে তার মুখ চেপে ধরল। নোবারার শরীরটা জেনিনের শক্ত বুকের সাথে মিশে গেল। অন্ধকারে নোবারা জেনিনের চোখের মণি দুটো জ্বলতে দেখল। জেনিন তাকে টেনে নিয়ে খাটের পাশে নিচে বসিয়ে দিল।

“এখানেই থাকুন। একদম নড়বেন না। কেউ বাড়ির ভেতরে ঢুকেছে।” জেনিনের গলার স্বর এখন নিচু কিন্তু ভয়ংকর।

“পুলিশ? নাকি আপনার শত্রু?” নোবারা কাঁপা স্বরে জিজ্ঞেস করল।

জেনিন উত্তর দিল না। সে দরজার দিকে লক্ষ্য রাখছে। হঠাৎ করিডোরে কাঁচ ভাঙার শব্দ পাওয়া গেল। জেনিন বুঝতে পারল ওরা ড্রয়িং রুম পার হয়ে উপরে চলে এসেছে। জেনিন নোবারার কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল,
“আমি যা-ই করি না কেন, আপনি চোখ খুলবেন না। আর কোনো প্রশ্ন করবেন না। ইটস মাই অর্ডার মিস আকারি।”

জেনিন দরজাটা সামান্য ফাঁক করল। একটা ছায়া দ্রুত এগোচ্ছে। জেনিন ট্রিগার চাপল না, কারণ সে চায় না গুলির শব্দে নোবারা ভয় পাক বা প্রতিবেশীরা জানুক। সে অন্ধকারেই লড়াই করতে অভ্যস্ত। জেনিন এক ঝটকায় বাইরে বেরিয়ে এল। লোকটা ছুরি দিয়ে জেনিনকে আঘাত করতে চাইল, কিন্তু জেনিন তার হাত ধরে মুচড়ে দিয়ে এক ঘুষিতে তাকে মেঝেতে ফেলে দিল।

কিন্তু বিপদ আরও আছে। আরও দুজন লোক জানালা দিয়ে পাইপ বেয়ে নোবারার ঘরে ঢোকার চেষ্টা করছিল। জেনিন আবার ঘরে ঢুকল। সে দেখল একটা লোক জানালার গ্রিল কেটে ভেতরে পা রেখেছে। লোকটার হাতে একটা সাইলেন্সার লাগানো পিস্তল। তার লক্ষ্য নোবারা।

“নোবারা, নিচু হও!” জেনিন গর্জন করে উঠল।

ঠিক সেই মুহূর্তে লোকটা গুলি চালাল। জেনিন কোনো চিন্তা না করেই নোবারার সামনে ঝাঁপিয়ে পড়ল। বুলেটটা জেনিনের বাম কাঁধ ঘষে বেরিয়ে গেল। জেনিন যন্ত্রণায় কাতরে উঠল না, বরং তার ভেতরের পশুটা জেগে উঠল। সে এক লাফে লোকটার ওপর পড়ে তার গলা চেপে ধরল। অন্ধকারে কেবল ধস্তাধস্তির শব্দ আর জেনিনের ভারী নিশ্বাসের শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। জেনিন লোকটাকে এমনভাবে আঘাত করল যে সে নিস্তেজ হয়ে গেল।

“আপনার রক্ত বেরোচ্ছে!” নোবারা চিৎকার করে উঠল। সে অন্ধকারে জেনিনের শরীর স্পর্শ করতেই ভিজে আঠালো কিছুর অস্তিত্ব পেল।

“চুপ! চুপ থাকো!” জেনিন হাঁপাচ্ছে। সে দেয়াল ধরে দাঁড়ালো।

নিচে তখন জেনিনের নিজস্ব সিকিউরিটি টিম পৌঁছে গেছে। গোলাগুলির হালকা শব্দ শোনা যাচ্ছে। জেনিন জানে তার লোকেরা বাকিদের সামলে নেবে। কিন্তু এখন বড় সমস্যা হলো নোবারা। নোবারা যদি জেনিনের হাতের পিস্তল বা এই হিংস্র রূপটা দেখে ফেলে, তবে তার এতদিনের সাজানো কর্পোরেট মুখোশটা খুলে যাবে।

জেনিন দ্রুত পিস্তলটা কার্পেটের নিচে লুকিয়ে ফেলল। সে যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যাচ্ছিল, কিন্তু তার ইগো তাকে দুর্বল হতে দিচ্ছে না।
“স্যার, আলো জ্বালুন! আপনি কোথায়?” নোবারা অন্ধকারে হাতড়াচ্ছে। সে জেনিনের পিঠ স্পর্শ করল।

জেনিন দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “আমি ঠিক আছি। ওটা বোধহয় কোনো চোর ছিল। আপনি ভয় পাবেন না।

ঠিক তখনই ভিলার জেনারেটর চালু হলো। আলো ফিরে আসতেই নোবারা দেখল জেনিন দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে বসে আছে। তার সাদা শার্টটা রক্তে লাল হয়ে গেছে। ফ্লোরে একটা লোক অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে। নোবারার চোখেমুখে আতঙ্ক। সে জেনিনের কাছে ছুটে এল।

“আপনার কত রক্ত পড়ছে! আমি অ্যাম্বুলেন্স ডাকছি!”

“না!” জেনিন সজোরে নোবারার হাত ধরল। ” আমার পার্সোনাল ডাক্তার আসছে। আপনি শুধু আমার পাশে বসুন।”

নোবারা জেনিনের হাত ধরে বসে পড়লো। তার চেহারায় বিষাদ স্পষ্ট! অজান্তেই এক ফোঁটা তপ্ত অশ্রু গড়িয়ে পড়লো তার চোখ বেয়ে! জেনিনের তাকে বাঁচাতে গিয়ে গুলি খেয়েছে, এটা সে মেনে নিতে পারছে না। জেনিন তার সুস্থ হাতটা দিয়ে নোবারার চুলগুলো আলতো করে সরিয়ে দিল। সে হাসল, এক ম্লান, যন্ত্রণাদায়ক হাসি।
“আপনার মায়া তো বড় ভয়ংকর মিস আকারি। আমি গুলি খেয়েও শান্তি পাচ্ছি কারণ আপনি আমার জন্য কাঁদছেন।”

নোবারা এবার দৃঢ় হওয়ার চেষ্টা করলো। তার চোখে এখন আগুনের মতো তেজ। “আপনি কেন আমায় সত্যিটা বলেন না? এই লোকগুলো চোর ছিল না। ওরা আপনাকে মারতে এসেছিল। আপনি আসলে কে?”

জেনিনের চোখ আবার শীতল হয়ে গেল। সে তার ইগো আর রুক্ষতা ফিরিয়ে আনল। “আমি কে তা জানার অধিকার আপনার নেই। আপনি আমার পিএ, গোয়েন্দা নন।”

জেনিন নোবারাকে সরিয়ে দিয়ে টলতে টলতে উঠে দাঁড়ালো। তার এই রুড ব্যবহার আসলে নোবারাকে এই অন্ধকার থেকে দূরে রাখার একটা কৌশল। জেনিন জানে, নোবারা যত বেশি জানবে, তত বেশি সে বিপদে পড়বে।

জেনিনের সিকিউরিটি ইনচার্জ দলবল নিয়ে ঘরে ঢুকল। জেনিন চোখের ইশারায় তাদের লোকটাকে সরিয়ে নিতে বলল। নোবারা তীক্ষ্ণ নজরে এই লোকগুলোকে দেখল। এদের কারো গায়ে সিকিউরিটি ইউনিফর্ম নেই, বরং এদের প্রত্যেকের চোখে অপরাধীর ছাপ। নোবারা বুঝতে পারল, জেনিন নূরশাদ কেবল একজন সিইও নন, তার ক্ষমতার শেকড় অনেক গভীরে।

জেনিন যখন ডাক্তারের রুমে চলে গেল, নোবারা তার নিজের রুমে দাঁড়িয়ে কাঁপছিল। সে আয়নায় নিজের দিকে তাকালো। তার শাড়িতে জেনিনের রক্ত।

সেই রাতে জেনিন নূরশাদ ব্যথায় ঘুমাতে পারল না। কিন্তু তার চেয়েও বড় ব্যথা ছিল তার হৃদয়ে। সে অনুভব করল নোবারা তার আসল পরিচয়ের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। জেনিন তার ডায়েরিতে এক হাত দিয়ে লিখল,
“আজ প্রথমবার আমার রক্ত ঝরল ওর সামনে। ও ভয় পেয়েছে। আমি চাই ও আমাকে ঘৃণা করুক, কিন্তু ও আমায় ভালোবেসে ফেলছে। এটা হতে পারে না। আমি ওকে ধ্বংস হতে দেব না। কাল থেকে আমি ওর ওপর আরও বেশি কঠোর হব। ও যেন আমার মায়ার চেয়ে আমার শাসনকে বেশি ভয় পায়।”

<><><><><><><><><>

নূরশাদ ভিলার বাতাস আজ ভারী। ভোরের আলো এখনো পাইন বনের মাথা ছুঁতে পারেনি, তার আগেই পুরো প্রাসাদে এক থমথমে নীরবতা জেঁকে বসেছে। গতরাতের সেই তাণ্ডবের চিহ্নগুলো জেনিনের অনুচরেরা নিপুণভাবে মুছে ফেলেছে, কিন্তু বাতাসের বারুদ আর রক্তের গন্ধ যেন এখনো নোবারার নাসারন্ধ্রে লেপ্টে আছে।

জেনিনের বিশাল শয়নকক্ষ। ঘরের মাঝখানে রাখা কিং সাইজ বেডে জেনিন নূরশাদ আধশোয়া হয়ে বসে আছে। তার বাম কাঁধ থেকে বুক পর্যন্ত সাদা ব্যান্ডেজ জড়ানো। সেই সাদা ব্যান্ডেজের এক কোণে হালকা লাল রঙের আভা ফুটে উঠেছে, তাজা রক্ত এখনো পুরোপুরি শুকায়নি। জেনিনের মুখটা বিবর্ণ, কিন্তু তার চোখের সেই চেনা অহংকার আর কঠোরতা একবিন্দু কমেনি। সে ডান হাতে ল্যাপটপ নিয়ে কিছু ডেটা দেখছিল, যেন কাল রাতে তার ওপর কোনো প্রাণঘাতী আক্রমণই হয়নি।

দরজায় মৃদু টোকা পড়ল। জেনিন মাথা না তুলেই কর্কশ গলায় বলল, “ভেতরে আসুন।”

নোবারা ট্রে হাতে ঘরে ঢুকল। ট্রেতে এক বাটি গরম স্যুপ, কিছু ওষুধ আর এক গ্লাস জল। নোবারার পরনে আজ একটি ধূসর রঙের সাধারণ কামিজ। তার চোখ দুটো ফোলা, বোঝা যাচ্ছে সারা রাত সে এক পলকের জন্যও চোখের পাতা এক করতে পারেনি। সে ধীর পায়ে জেনিনের বিছানার পাশে গিয়ে দাঁড়ালো।

“আপনার ড্রেসিং চেঞ্জ করার সময় হয়েছে। আর এই স্যুপটা খেয়ে ওষুধগুলো নিতে হবে,” নোবারা খুব নিচু স্বরে বলল।

জেনিন ল্যাপটপ থেকে চোখ সরাল না। “আমি বলেছি না আমি ঠিক আছি? ডক্টর ব্যান্ডেজ করে দিয়ে গেছেন। আপনি নিজের কাজে যান। আমাকে ডিস্টার্ব করবেন না।”

নোবারা ট্রে-টা পাশের টেবিলে রাখল। তারপর সজোরে জেনিনের ল্যাপটপের স্ক্রিনটা নামিয়ে দিল। জেনিন অবাক হয়ে নোবারার দিকে তাকালো। তার চোখে ক্রোধের আগুন জ্বলে উঠল।
“আপনার সাহস তো কম নয় মিস আকারি! আমি আপনাকে কতবার বলেছি আমার কাজে হস্তক্ষেপ করবেন না?”

নোবারা এবার জেনিনের চোখের দিকে সরাসরি তাকালো। তার চোখে জল টলমল করছে, কিন্তু সে তা পড়তে দিল না। “সাহস আমার কম নয় স্যার, কারণ আমি আপনার পিএ। আর আপনার স্বাস্থ্য ঠিক রাখা আমার জবের অংশ। আপনি যদি অসুস্থ হয়ে অফিসে না যেতে পারেন, তবে কোম্পানির কোটি টাকার লস হবে। আপনি কি সেটা চান?”

জেনিন কিছু বলতে চাইল, কিন্তু নোবারার এই পেশাদারী যুক্তির কাছে সে এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। নোবারা সেই সুযোগে জেনিনের খুব কাছে বসল। সে খুব আলতো হাতে জেনিনের শার্টের বোতামগুলো খুলতে শুরু করল যাতে ব্যান্ডেজটা পরিবর্তন করা যায়। জেনিনের শরীরের তপ্ত নিশ্বাস নোবারার কপালে লাগছে। জেনিন পাথরের মতো শক্ত হয়ে বসে রইল। সে অনুভব করছে নোবারার আঙুলের কম্পন। পনেরো বছর পর এই প্রথম কেউ এত মায়া নিয়ে তাকে স্পর্শ করছে।

ব্যান্ডেজটা খুলতেই নোবারা শিউরে উঠল। গুলির ক্ষতটা গভীর। জেনিনের সারা শরীরে অসংখ্য পুরনো ক্ষতচিহ্ন। কোনোটা ছুরির, কোনোটা আগুনের। নোবারার হৃদপিণ্ডটা যেন কেউ মুচড়ে ধরল। সে বুঝতে পারল, এই পনেরো বছরে জেনিন নূরশাদ কেবল টাকা আর ক্ষমতা কামায়নি, সে প্রতি পদে পদে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়েছে। সে বারবার মরতে মরতে বেঁচে ফিরেছে, আর তার এই রুক্ষতা আসলে সেই যন্ত্রণার এক বর্ম।

নোবারা খুব সাবধানে ক্ষতস্থানটা পরিষ্কার করতে লাগল। তার এক ফোঁটা চোখের জল জেনিনের উন্মুক্ত কাঁধে গিয়ে পড়ল। জেনিন চমকে উঠল। সেই এক ফোঁটা তপ্ত জল যেন জেনিনের পাথুরে হৃদয়ে অ্যাসিডের মতো কাজ করল।

“কাঁদছেন কেন? আমি তো মরিনি,” জেনিন বিদ্রূপ করার চেষ্টা করল, কিন্তু তার গলায় আজ সেই ধার ছিল না।

“আপনি মরেননি, কিন্তু আপনি কি বেঁচে আছেন?” নোবারা ড্রেসিং করতে করতে ধরা গলায় বলল। “এই যে শরীরের প্রতিটি ইঞ্চি ক্ষতবিক্ষত, এই যে আপনার চারপাশে হাজারটা শত্রু, এটাই কি আপনার জীবন?”

জেনিন অট্টহাসি হাসল। এক তিক্ত, বিষাদমাখা হাসি। “এই দুনিয়ায় জেনিন নূরশাদ একাই জন্মেছে আর একাই মরবে। এই ক্ষতগুলো আমার অলঙ্কার। পনেরো বছর আগে যখন স্টেশনে আমি একা পড়েছিলাম, তখন থেকেই আমি শিখে গেছি যে রক্ত ঝরলে কেউ মুছে দিতে আসে না। আমি নিজেই নিজের রক্ত মুছতে শিখেছি।”

নোবারা ব্যান্ডেজটা শেষ করে জেনিনের খুব কাছে মুখ নিয়ে এল। “আমি তো এসেছি। আমি তো মুছিয়ে দিচ্ছি।”

জেনিন নোবারার চোখের দিকে তাকিয়ে স্তব্ধ হয়ে গেল। তাদের দূরত্ব এখন মাত্র কয়েক ইঞ্চির। জেনিনের ইচ্ছে করল নোবারাকে জাপটে ধরে তার বুকের সবটুকু হাহাকার উগরে দিতে। সে বলতে চাইল,
‘জানো নোবারা, কত রাত আমি ব্যথায় কাতরেছি কিন্তু পাশে কেউ ছিল না। কতবার আমি ভেবেছি আজই আমার শেষ রাত, আর শেষবারের মতো তোমার নামটা বিড়বিড় করেছি।’ কিন্তু জেনিনের ইগো তাকে থামিয়ে দিল। সে জানে, সে যদি এখন আবেগপ্রবণ হয়, তবে তার তৈরি এই দর্পণের সাম্রাজ্য ধুলোয় মিশে যাবে।

সে এক ঝটকায় নোবারার হাতটা সরিয়ে দিল। “নাটক বন্ধ করুন। আপনি আমার পিএ, তার বাইরে অন্য কিছু হওয়ার চেষ্টা করবেন না। আপনার এই মায়া আমার কোনো কাজে আসবে না। স্যুপটা রেখে যান, আমি খেয়ে নেব।”

নোবারা উঠে দাঁড়ালো। সে তার দীর্ঘশ্বাসটা ভেতরেই চেপে রাখল। সে বুঝতে পারছে জেনিন নিজেকে শৃঙ্খলে বেঁধে রাখতে চায়। সে জেনিনকে জোর করবে না, কিন্তু সে তাকে একা ছাড়বেও না।
“স্যুপটা ঠান্ডা হওয়ার আগে খেয়ে নেবেন। আর ওষুধের পাওয়ার অনেক বেশি, খালি পেটে খেলে স্টমাক আপসেট হবে। আমি আধঘণ্টা পর আসব ট্রে নিতে।”

নোবারা ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর জেনিন স্যুপের বাটির দিকে তাকিয়ে রইল। বাটি থেকে ধোঁয়া উঠছে। জেনিন এক চামচ স্যুপ মুখে দিল। স্বাদটা একদম স্নিগ্ধ আর মমতা মাখা। জেনিনের চোখে জল চলে এল, কিন্তু সে দ্রুত তা মুছে ফেলল।

অফিসের সময় হয়ে এল। জেনিন আহত অবস্থাতেই তৈরি হলো। সে আজ সাদা শার্টের ওপর নেভি ব্লু কালারের ব্লেজার পরেছে যাতে কাঁধের ব্যান্ডেজটা বোঝা না যায়। সে যখন নিচে নামল, নোবারা গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। নোবারা দেখল জেনিন ফ্যাকাসে হয়ে গেছে, কিন্তু তার হাঁটার ভঙ্গি এখনো সেই রাজকীয়।

“গাড়ি আমি ড্রাইভ করব স্যার,” নোবারা চাবিটা জেনিনের হাত থেকে প্রায় কেড়ে নিল।

“আমি ড্রাইভ করতে পারি। আমি কোনো পঙ্গু নই,” জেনিন গর্জে উঠল।

“আপনি পঙ্গু নন, কিন্তু আপনি রোগী। আর একজন ড্রাইভ করতে না পারা সিইও-র পাশে বসে অফিস যাওয়াটা আমার জন্য ইনসাল্টিং। গাড়িতে উঠুন।”

জেনিন অবাক হয়ে নোবারার দিকে তাকালো। এই মেয়েটি তাকে ডমিনেট করছে, আবার তার সেবায় নিজেকে উজাড় করে দিচ্ছে। জেনিন বাধ্য হয়ে পাশের সিটে বসল। পুরোটা রাস্তা নোবারা খুব স্মুদলি গাড়ি চালাল। জেনিন আয়নায় বারবার নোবারার মুখটা দেখছিল। নোবারার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম, সে খুব সতর্ক যাতে জেনিনের কাঁধে কোনো ঝাকুনি না লাগে।

চলবে ইংশাআল্লাহ।।।।।।।।।।।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here