#Soulmate_to_Enemy
#পর্ব_১৩
লেখনীতে: #মিফতাহুল_জান্নাত_জেমিম
নূরশাদ ইন্ডাস্ট্রিজের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কাঁচের দালানটি আজ যেন একটু বেশিই হিমশীতল। সকাল ন’টা বাজার সাথে সাথে জেনিন নূরশাদের ব্ল্যাক মার্সিডিজ এসে থামল অফিসের সামনে। জেনিন গাড়ি থেকে নামল এক ঝড়ের বেগে। তার পরনে আজ কালো রঙের থ্রি-পিস স্যুট, চোখে গাঢ় সানগ্লাস।
নোবারা তার ঠিক পেছনে। তার হাতে জেনিনের ল্যাপটপ ব্যাগ আর আজকের প্রয়োজনীয় ফাইলপত্র। জেনিন লিফটের দিকে হাঁটতে হাঁটতে একবারও পেছনে ফিরে তাকালো না। সে জানে নোবারা আছে, সে অনুভব করতে পারছে নোবারার সেই হালকা চন্দন কাঠের সুবাস।
জেনিন তার কেবিনে ঢোকার আগে থমকে দাঁড়ালো। তার ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে সেখানে উপস্থিত থাকা অন্য কর্মীদের দিকে তাকিয়ে সে গর্জে উঠল,
“এই ফ্লোরে এত লোক কেন? আমি কি এখানে মাছের বাজার বসাতে বলেছি? এভরিওয়ান, গেট ব্যাক টু ইয়োর ডেস্ক! আর মিস আকারি, আমার কেবিনে আসুন। এক্ষুনি!”
জেনিন ঝড়ের মতো নিজের কেবিনে ঢুকে চেয়ারে বসল। নোবারা ভেতরে ঢুকে দরজাটা আলতো করে বন্ধ করে দিল। সে দেখল জেনিন তার আহত বাম কাঁধটা একটু অস্বাভাবিকভাবে ধরে রেখেছে। ব্যথায় জেনিনের কপাল কুঁচকে আছে, কিন্তু তার চোয়ালের কাঠিন্য বলছে সে এটা স্বীকার করবে না।
“আপনার পেইনকিলার খাওয়ার সময় হয়েছে স্যার। আমি পানি নিয়ে আসছি,” নোবারা কথা শেষ করার আগেই জেনিন টেবিল চাপড়ে উঠল।
“আমি আপনাকে এখানে আমার নার্সিং করার জন্য ডাকিনি! আমি এখানে কাজ করতে এসেছি। ডিনারের সেই ক্যাজুয়াল মুডটা অফিসের বাইরে ফেলে আসুন। এখন থেকে আমি যখন কথা বলব, আপনি শুধু নোট নেবেন। কোনো বাড়তি উপদেশ বা যত্ন দেখানোর চেষ্টা করবেন না। ক্লিয়ার?”
নোবারা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। পনেরো বছর আগের সেই জেনিন আর এই জেনিনের মধ্যে ব্যবধানটা কত বিশাল, তা সে প্রতি মুহূর্তে অনুভব করছে। কিন্তু নোবারা তার আত্মসম্মানবোধ হারালো না। সে খুব শান্তভাবে তার নোটব্যাড খুলল।
“ক্লিয়ার স্যার। আজকের মিটিং শিডিউলগুলো বলছি!”
নোবারা পড়তে শুরু করল। জেনিন শুনছে ঠিকই, কিন্তু তার পুরো মনোযোগ নোবারার ঠোঁটের নড়াচড়ার ওপর। সে লক্ষ্য করল নোবারার গলার কাছে একটা ছোট লাল দাগ, রাতের ধস্তাধস্তির সময় কোনোভাবে লেগেছে। জেনিনের ভেতরে আবার সেই পজেসিভনেস মাথা চাড়া দিয়ে উঠল। সে ভাবল,
“কেমন করে ওই দাগটা লাগল? আমার উপস্থিতিতে ওর গায়ে আঁচড় লাগল কী করে?” কিন্তু মুখে সে বলল অন্য কথা।
“আপনার প্রেজেন্টেশন স্কিল বড্ড বাজে। এরপর থেকে আমি যখন কথা বলব, আপনি মাঝপথে কথা বলবেন না।”
নোবারা কলমটা থামিয়ে জেনিনের চোখের দিকে তাকালো। জেনিন শব্দ করে হাসল। এক নিষ্ঠুর হাসি। সে জানে নোবারাকে কষ্ট দিচ্ছে, কিন্তু এই কষ্ট দেওয়াটাই এখন তার একমাত্র আনন্দ। কারণ সে মনে করে নোবারা যত বেশি তাকে ঘৃণা করবে, জেনিন তত বেশি তাকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবে।
পুরো দুপুর জুড়ে জেনিন নোবারাকে দিয়ে অমানুষিক খাটুনি খাটালো। প্রতিটি ছোট ছোট ভুলের জন্য সে নোবারাকে পুরো অফিসের সামনে অপমান করল। অফিসের কর্মীরা অবাক হয়ে দেখল, যে নোবারা কাল পর্যন্ত জেনিনের সবচাইতে ঘনিষ্ঠ ছিল, আজ জেনিন তাকেই তুচ্ছতাচ্ছিল্য করছে। কিন্তু জেনিন আড়ালে যা করছিল, তা কেউ দেখেনি।
দুপুর দুইটার দিকে জেনিন দেখল নোবারা লাঞ্চ করতে যায়নি। সে তার ডেস্কে মাথা নিচু করে ফাইল দেখছে। জেনিন তার কেবিনের সিসিটিভি ক্যামেরায় নোবারার প্রতিটি মুভমেন্ট দেখছিল। সে দেখল নোবারা ক্লান্তি আর ক্ষুধার চোটে বারবার কপালে হাত দিচ্ছে। জেনিনের কলিজায় টান পড়ল। সে সাথে সাথে তার পিয়নকে ডাকল।
“যাও, এই খাবারগুলো মিস আকারিকে দিয়ে এসো। বলবে এটা অফিসের একস্ট্রা অর্ডিনারি পারফরম্যান্সের জন্য বোনাস। খবরদার, আমার নাম যেন না আসে। বলবে এইচআর থেকে পাঠানো হয়েছে।”
খাবারগুলো ছিল নোবারার সবচাইতে প্রিয় রেস্টুরেন্টের পাস্তা আর ফ্রেশ জুস। জেনিন নিজে না খেয়ে আড়াল থেকে দেখল নোবারা খাবারগুলো দেখে একটু অবাক হলো, তারপর খাওয়া শুরু করল। জেনিনের মুখে তখন এক টুকরো বিজয়ী হাসি। সে তাকে মুখে গালাগাল করছে ঠিকই, কিন্তু তার প্রতিটি কোষ চাইছে নোবারাকে আগলে রাখতে।
বিকালে জেনিন লক্ষ্য করল একজন পুরুষ কলিগ নোবারার ডেস্কে এসে খুব হাসাহাসি করে কথা বলছে। ছেলেটি নোবারার কম্পিউটার স্ক্রিনে কিছু একটা দেখাচ্ছিল আর মাঝে মাঝে নোবারার কাঁধে হাত দেওয়ার চেষ্টা করছিল। জেনিনের কেবিনের ভেতর কাঁচের গ্লাসটা সশব্দে ভেঙে পড়ল জেনিনের হাতের চাপে। তার রক্ত গরম হয়ে উঠল।
সে সাথে সাথে ইন্টারকমে নোবারাকে ডাকল।
“মিস আকারি, এখনই আমার রুমে আসুন! উইথিন টেন সেকেন্ডস!”
নোবারা ভেতরে ঢুকতেই জেনিন তার দিকে একটা ফাইল ছুড়ে মারল। “ওই লোকটার সাথে আপনার কী এত কথা? অফিস কি আপনার রোমান্স করার জায়গা? আমি কি আপনাকে এখানে প্রেম করতে নিয়োগ দিয়েছি?”
নোবারা থতমত খেয়ে গেল। সে বুঝতে পারল না জেনিন কেন এত উত্তেজিত। “স্যার, উনি শুধু প্রজেক্টের আপডেট দিচ্ছিলেন। এখানে প্রেমের কিছু নেই—”
“চুপ!” জেনিন গর্জে উঠল। সে টেবিল পার হয়ে নোবারার কাছে এসে তার দুই বাহু ধরে ঝাঁকুনি দিল। “আমি পছন্দ করি না কোনো লোক আপনার তিন ফুটের মধ্যে আসুক। এর আগে যদি কাউকে দেখি আপনার আশেপাশে ঘুরঘুর করতে, তবে তার ক্যারিয়ার আমি ধ্বংস করে দেব। গট ইট?”
নোবারা জেনিনের এই রুপ দেখে হতবাক হয়ে গেল। সে বুঝতে পারছে না জেনিন তাকে ঘৃণা করে নাকি পাগলের মতো ভালোবাসে। জেনিনের চোখে এখন এক ধরণের উন্মাদনা। সে নোবারাকে ছেড়ে দিয়ে জানালার দিকে ফিরে দাঁড়ালো।
“যান এখান থেকে। আর ওই লোকটাকে বলবেন কাল থেকে যেন অন্য ডিপার্টমেন্টে জয়েন করে। আমি ওকে আমার ফ্লোরে দেখতে চাই না।”
নোবারা কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল এক বুক বিস্ময় নিয়ে। সে ভাবছে,
“কেন এই লোকটা আমার ওপর এত অধিকার খাটায়? কেন সে আমার হাসিতেও হিংসে করে? ও কি সত্যিই সেই জেনিন যাকে আমি চিনতাম?”
জেনিন একা কেবিনে দাঁড়িয়ে হাঁপাচ্ছিল। সে জানে সে সীমা লঙ্ঘন করছে। সে জানে নোবারা তাকে এখন একজন নিষ্ঠুর মানুষ হিসেবে দেখছে। কিন্তু জেনিনের ভেতরের সেই পসেসিভ দানবটা কিছুতেই শান্ত হচ্ছে না।
<><><><><><><><><>
শহরের সবচেয়ে ব্যয়বহুল এবং অভিজাত হোটেলের গ্র্যান্ড বলরুম আজ চাঁদের আলোর চেয়েও বেশি উজ্জ্বল। নূরশাদ ইন্ডাস্ট্রিজের বার্ষিক বিজনেস সাকসেস পার্টি। চারদিকে আতর আর দামী পারফিউমের ঘ্রাণ, টুংটাঙ শব্দের সাথে মিশে যাচ্ছে হালকা জ্যাজ মিউজিক। শহরের রাঘববোয়াল ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, সবার উপস্থিতি এখানে। কিন্তু সবার নজর দরজার দিকে, কারণ জেনিন নূরশাদ এখনো এসে পৌঁছাননি।
একটি কালো লিমোজিন এসে থামল হোটেলের পোর্টিকোয়। জেনিন নূরশাদ গাড়ি থেকে নামল। পরনে তার নেভি ব্লু রঙের টাক্সিডো, চুলে নিখুঁত স্টাইল। তার ব্যক্তিত্বে এমন এক অভিকর্ষজ বল আছে যে চারপাশের মানুষগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে তার জন্য পথ ছেড়ে দিল। কিন্তু জেনিন একা নয়। তার হাত ধরে গাড়ি থেকে নামল নোবারা আকারি।
নোবারাকে আজ চেনা দায়। জেনিন জোর করে তাকে একটি এমেরাল্ড গ্রিন রঙের সিল্কের গাউন পরিয়ে নিয়ে এসেছে। সাথে হীরের একটি সূক্ষ্ম চোকার। নোবারার চোখের কাজল আজ একটু বেশি গাঢ়, যা তার চোখের তেজকে আরও বেশি রহস্যময় করে তুলেছে। জেনিন নোবারার হাতটা এত শক্ত করে ধরে আছে যে মনে হচ্ছে নোবারা তার হাত থেকে ফসকে গেলেই পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে।
“আপনার হাতটা একটু শিথিল করুন স্যার, আমার ব্যথা লাগছে,” নোবারা ফিসফিস করে বলল।
জেনিন তার কানের কাছে মুখ নিয়ে ঠান্ডা গলায় বলল, “ব্যথা পাওয়া ভালো মিস আকারি। এটা আপনাকে মনে করিয়ে দেবে যে আপনি কার সাথে আছেন।” এক সেকেন্ড থেমে সে আবারো বললো, “আজ রাতে আমার অনুমতি ছাড়া আপনি কারো সাথে এক মিনিটের বেশি কথা বলবেন না। আর কোনো পানীয় স্পর্শ করবেন না যা আমি পরীক্ষা করিনি।”
নোবারা মনে মনে হাসল। জেনিনের এসব পাগলামি এখন আর তাকে অবাক করে না। সে জানে, জেনিন নূরশাদ আসলে এক নিঃসঙ্গ রাজা যে তার প্রিয়তমাকে নিয়ে সারাক্ষণ আতঙ্কে থাকে।
পার্টিতে ঢোকার সাথে সাথেই শত শত ক্যামেরা তাদের দিকে ঝলসে উঠল। জেনিন খুব আভিজাত্যের সাথে নোবারাকে নিজের বাহুবন্দী করে সবার সাথে পরিচিত করিয়ে দিচ্ছে। সে নোবারাকে পরিচয় দিচ্ছে তার ‘পিএ’ হিসেবে, কিন্তু তার শরীরী ভাষা বলছে নোবারা তার ‘ব্যক্তিগত কেউ’।
পার্টির মাঝপথে একজন তরুণ ব্যবসায়ী, নাম জাভিয়ান, নোবারার দিকে এগিয়ে এল। জাভিয়ান জেনিনের দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক প্রতিদ্বন্দ্বী। সে নোবারার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “মিস্টার নূরশাদ, আপনার রুচি সবসময়ই চমৎকার।”
জেনিনের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। সে দেখল জাভিয়ানের নজর নোবারার উন্মুক্ত কাঁধের ওপর স্থির হয়ে আছে। জেনিন তার গ্লাসটা সশব্দে টেবিলের ওপর রাখল।
“ধন্যবাদ। তবে আমার রুচি শুধু চমৎকার নয়, বড্ড দামিও বটে। আর যা দামী, তা ধরা ছোঁয়ার বাইরে রাখাই শ্রেয়,” জেনিনের কণ্ঠে চাপা সতর্কতা।
জাভিয়ান সেটা পাত্তা না দিয়ে নোবারার দিকে তাকিয়ে বলল, “হেই মিস, আমার নতুন প্রজেক্টে আপনার মতো একজন ট্যালেন্টেড মানুষের প্রয়োজন। আপনি কি আমার সাথে এক রাউন্ড ড্যান্স করবেন?”
নোবারা কিছু বলার আগেই জেনিন মাঝখানে দাঁড়িয়ে গেল। সে জাভিয়ানের চোখের দিকে এমনভাবে তাকালো যে আরিয়ান এক পা পিছিয়ে গেল। মনে হৃঝ যেন জেনিন চোখ দিয়েই গিলে খাবে তাকে!
“আমার সেক্রেটারি ড্যান্স করতে আসে না মি: জাভিয়ান। ও এখানে আমার কাজ ম্যানেজ করতে এসেছে। এখন যান, গিয়ে ড্রিঙ্ক এনজয় করুন,” জেনিন প্রায় তাকে তাড়িয়ে দিল।
জাভিয়ান চলে যাওয়ার পর নোবারা জেনিনের দিকে ঘুরে দাঁড়ালো। “আপনি কি একটু বেশি করছেন না স্যার? ওটা শুধু একটা সৌজন্যমূলক অফার ছিল।”
“সৌজন্য?” জেনিন নোবারার কোমরে হাত দিয়ে তাকে এক কোণায় টেনে নিয়ে গেল। “ওর চোখে আপনার জন্য যে লোলুপতা ছিল, তা আপনি বোঝেননি। আমি কোনোদিন চাই না অন্য কোনো পুরুষের স্পর্শ আপনার ওপর পড়ুক। আপনি আমার নোবারা…আপনি শুধুই আমার।”
“আমি আপনার নই স্যার!” নোবারা এবার একটু কড়া গলায় বলল। “আমি আপনার কর্মচারী। আপনি আমাকে এভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না।”
জেনিন হঠাৎ নোবারার খুব কাছে এল। তাদের নিশ্বাস একে অপরকে স্পর্শ করছে। “নিয়ন্ত্রণ আমি অলরেডি করে ফেলেছি। আপনি যদি মনে করেন আপনি স্বাধীন, তবে সেটা আপনার ভুল।”
***পার্টির খাবার যখন পরিবেশন করা হলো, জেনিন নিজের হাতে নোবারার প্লেটে খাবার তুলে দিল। সে নিজে এক টুকরো খাবার মুখে নিয়ে পরীক্ষা করল, তারপর নোবারাকে খেতে দিল। পুরোটা সময় সে নোবারার এক ইঞ্চিও দূরে যায়নি। কেউ যদি নোবারার সাথে কথা বলতে চাইত, জেনিন তার রুক্ষ চাউনি দিয়ে তাকে থামিয়ে দিচ্ছিল।
হঠাৎ ড্যান্স ফ্লোরে রোমান্টিক মিউজিক বাজতে শুরু করল। জেনিন নোবারার হাত ধরল। “চলুন।”
“আমি ড্যান্স করব না,” নোবারা প্রতিবাদ করল।
“এটা আপনার চাকরির অংশ,” জেনিন তাকে এক প্রকার টেনেই ফ্লোরের মাঝখানে নিয়ে এল।
দুজনে যখন ড্যান্স করছিল, পুরো হলরুম নিস্তব্ধ হয়ে গেল। জেনিনের এক হাত নোবারার কোমরে, অন্য হাত নোবারার হাতের তালুর সাথে ইন্টারলক করা। জেনিন নোবারাকে খুব নিবিড়ভাবে নিজের সাথে জড়িয়ে ধরল। সে অনুভব করল নোবারার হৃদস্পন্দন। নোবারা যখন জেনিনের চোখের দিকে তাকালো, সে সেখানে এক অতল সমুদ্রের হাহাকার দেখল।
“কেন করছেন এসব? কেন নিজেকে এমনভাবে উপস্থাপন করছেন?” নোবারা ফিসফিস করে বলল।
“কারণ আমি চাই সবাই দেখুক জেনিন নুরশাদ কাকে নিজের করে রেখেছে,” জেনিন নোবারার কপালে নিজের কপাল ঠেকাল। “তোমার ক্ষেত্রে আমি কোনো লজিক মানি না। এটা সারাজীবন মাথায় রাখবে নোবারা।”
<><><><><><><><><>
নূরশাদ ভিলার ড্রয়িংরুমে এখন এক শ্মশান নীরবতা। জানালার বাইরে বৃষ্টির একটানা শব্দ ঝিঁঝিঁ পোকার ডাককে ছাপিয়ে যাচ্ছে। জেনিন নূরশাদ পার্টি থেকে ফিরে তার বিশাল লাইব্রেরি ঘরে বসে আছে। ঘরের আলো ম্লান, শুধু টেবিল ল্যাম্পের একফালি আলো তার গম্ভীর মুখমণ্ডলকে দ্বিখণ্ডিত করেছে। তার পরনে এখনো সেই পার্টির দামী টাক্সিডো, কিন্তু টাইটা অনেক আগেই আলগা করে ছুড়ে ফেলেছে সে। তার হাতে এক গ্লাস কড়া ব্ল্যাক কফি, আজ সে ড্রিঙ্ক ছুঁয়েও দেখেনি। কিসের বাঁধা আসছে তার ভেতর থেকে সেটাই ভাবছে সে।
দরজার কাছে একটা ছায়া স্থির হলো। নোবারা আকারি দাঁড়িয়ে আছে। তার পরনের সেই সবুজ গাউনটা বদলে সে এখন সাদা রঙের একটি ঢিলেঢালা কামিজ পরেছে। মুখটা ধোয়া, কাজল ধুয়ে চোখের কোলটা একটু ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। সে ভেতরে ঢুকল না, শুধু দরজার ফ্রেম ধরে দাঁড়িয়ে রইল।
“অফিস আওয়ার তো অনেক আগে শেষ হয়েছে স্যার। আপনি এখনো ঘুমাননি কেন?” নোবারার কণ্ঠে আজ সেই বিদ্রূপ নেই, বরং আছে এক ধরণের গভীর কৌতূহল।
জেনিন কফির কাপটা নামিয়ে রাখল। সে ইশারায় নোবারাকে ভেতরে আসতে বলল। নোবারা ধীর পায়ে এগিয়ে এল এবং জেনিনের টেবিলের উল্টো দিকের সোফাটায় বসল। জেনিন তার দিকে তাকালো। তার চোখে সেই চেনা ইগো আর রুক্ষতা থাকলেও ভেতরের শূন্যতাটা আজ যেন দেয়াল ভেদ করে বেরিয়ে আসতে চাইছে।
“আপনার ঘুম আসেনি কেন?” জেনিন পালটা প্রশ্ন করল। তার কণ্ঠে সেই বস-সুলভ রাশভারী ভাবটা এখনো অটুট।
নোবারা একটু ম্লান হাসল। “পনেরো বছর আগের কথা ভাবছিলাম। তখন তো আর সবসময় আপনার পারমিশন এর অপেক্ষায় থাকতে হতো না।”
জেনিন একটু স্তব্ধ হয়ে রইল। তারপর চেয়ারে হেলান দিয়ে বলল, “সময় বদলে যায় মিস আকারি। পনেরো বছর আগে আমি ছিলাম এক সাধারণ কিশোর, আর আজ আমি এই শহরের নিয়ন্তা।”
নোবারা সরাসরি তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল। “আচ্ছা, আপনি কি সত্যিই বদলে গেছেন? নাকি এই রুক্ষতার আড়ালে সেই পুরনো জেনিনটা আজও লুকিয়ে আছে? আপনার বাবা-মা… তারা কোথায়? তাদের কথা কি আপনার মনে পড়ে না?”
‘মা-বাবা’ শব্দটা শুনতেই জেনিনের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। তার চোখে এক মুহূর্তের জন্য এক ভয়ংকর অন্ধকার খেলে গেল। সে ডায়েরিটা বন্ধ করে সশব্দে টেবিলের ওপর রাখল।
“আমার কোনো পরিবার নেই। মা মারা গেছেন অনেক বছর আগে। আর বাবা?” জেনিন একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। “বাবা বেঁচে আছেন। কিন্তু তাকে আমি শহরের এক গোপন বাড়িতে কড়া পাহারায় লুকিয়ে রেখেছি। আপনি হয়তো ভাবছেন আমি কত বড় কুসন্তান, তাই না?”
নোবারা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। “লুকিয়ে রেখেছেন? কেন?”
“কারণ আমার শত্রুরা জানে জেনিন নূরশাদের একমাত্র দুর্বলতা তার রক্ত,” জেনিন উঠে দাঁড়িয়ে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ালো। তার দীর্ঘ অবয়বটা অন্ধকার জানালার কাঁচে প্রতিফলিত হচ্ছে। “আমার বাবাকে নিয়ে আমাকে ব্ল্যাকমেইল করার চেষ্টা হয়েছিল অনেকবার। আমার এই অন্ধকার জগতে টিকে থাকতে হলে মায়াকে বিসর্জন দিতে হয়। তাকে আমি এমন এক জায়গায় রেখেছি যেখানে আমার অনুচর ছাড়া কেউ পৌঁছাতে পারবে না। এমনকি তাকে আমি নিজেও দেখতে যাই না, পাছে আমার কোনো শত্রু তার ঠিকানা জেনে ফেলে। এটাই আমার ভালোবাসা নোবারা, কাউকে রক্ষা করতে হলে তাকে নিজের থেকেও দূরে সরিয়ে রাখতে হয়।”
নোবারার বুকটা ধক করে উঠল। সে জেনিনের এই পসেসিভনেসের আসল কারণটা আজ প্রথম অনুভব করল। জেনিন যাকেই ভালোবাসে, তাকেই সে খাঁচায় বন্দি করে রাখে, সেটা তার বাবা হোক কিংবা নোবারা নিজে। জেনিনের কাছে নিরাপত্তা মানেই হলো বন্দিত্ব।
“আর আপনার পরিবার?” জেনিন এবার ঘুরে নোবারার দিকে তাকালো। “আপনি তো এখন বেশ স্ট্যাবল। নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছেন। আপনার মা-বাবা, ভাই-বোন… তারা তো সবাই বেঁচে আছে। তবে আপনি কেন একা থাকেন? কেন আপনি এই বিষাক্ত জেনিন নূরশাদের অধীনে কাজ করছেন?”
নোবারা শান্তভাবে বলল, “আপনি স্কুল ছেড়ে চলে যাওয়ার পর আমিও এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে গ্ৰামে ফিরে যাই। আমার বাবা-মা চায় আমি তাদের সাথে থাকি। আমার ভাই বিদেশে সেটলড। কিন্তু আমি ছোটবেলা থেকেই একটু আলাদা। আমার পরিবার আছে, কিন্তু তাদের ছায়ার নিচে থাকলে আমি কোনোদিন নিজেকে চিনতে পারতাম না। তাই আমি একা থাকি। একাকীত্ব আমাকে শক্তি দেয়।”
নোবারা মিথ্যে বলল না, কিন্তু সে তার আসল পরিচয়টা কৌশলে আড়াল করে গেল। সে যে জীবন বাজি রেখেছে, তা সে নিজের আত্মার কাছেও যেন আজ স্বীকার করতে চাইছে না। জেনিনের এই অসহায়ত্ব তাকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
জেনিন হঠাৎ টেবিলের ওপর দিয়ে ঝুঁকে এল। তার চোখ দুটো এখন শিকারে উন্মুখ বাঘের মতো। “একা থাকা আপনার নেশা, নাকি একাকীত্ব আপনার মুখোশ? আমার মনে হয় আপনি কিছু লুকাচ্ছেন। পনেরো বছর পর হুট করে আপনার আমার পিএ হয়ে আসা… এটা কি কেবলই কাকতালীয়?”
নোবারা এক মুহূর্তের জন্য ঘাবড়ে গেল, কিন্তু পরক্ষণেই সে তার ইগোটা ফিরিয়ে আনল। সেও চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। জেনিনের মুখের খুব কাছে মুখ নিয়ে সে বলল,
“সবকিছু যদি আপনার হুকুমেই হতো স্যার, তবে পৃথিবীটা বড্ড একঘেয়ে লাগত। আর আপনি যদি আমাকে এতই সন্দেহ করেন, তবে কাল সকালেই আমাকে টার্মিনেট করুন। আমার সততা নিয়ে প্রশ্ন তোলার অধিকার আপনার নেই।”
জেনিন নোবারার এই তেজ দেখে মুগ্ধ হলো। জেনিন তার ইগো বজায় রেখে বলল,
“আপনাকে টার্মিনেট করার ক্ষমতা আমার নেই নোবারা। কারণ আমি চাইলেও আপনাকে আমার চোখের আড়াল হতে দেব না। আজ থেকে আপনি জানবেন, আপনার এই নিঃসঙ্গ জীবনে কেবল জেনিন নূরশাদই একমাত্র ধ্রুবক।”
“আমি আপনার প্রপার্টি নই স্যার!” নোবারা গর্জে উঠল।
“আপনি আমার প্রপার্টি নন, আপনি আমার ‘অবসেসন’ নোবারা আকারি। ,”
জেনিন আবার তার ডেস্কে ফিরে গিয়ে ফাইল খুলে বসল। সে বুঝিয়ে দিল যে আলাপচারিতা শেষ। নোবারা যখন ঘর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে, জেনিন পেছন থেকে বলল,
“কাল সকাল আটটায় আমার কফি রেডি রাখবেন। আর ওই জাভিয়ান নামক লোকটার সাথে আজ যে হাসিটা হেসেছিলেন, ওটা যেন আর না দেখি। আপনার হাসি কেবল আমার সামনেই বরাদ্দ।”
নোবারা ফিরে তাকালো না। সে দ্রুত নিজের ঘরে চলে এল। নিজের বিছানায় শুয়ে সে অনুভব করল তার সারা শরীর কাঁপছে। জেনিনের পসেসিভনেস তাকে যেমন শ্বাসরুদ্ধ করে তুলছে, তেমনি এক অদ্ভুত আকর্ষণে তাকে টেনে রাখছে। তবে কি সে জেনিনের প্রেমে পড়ে গেল! না, এটা হতে পারেনা। তার উদ্দেশ্য আলাদা, তাকে সামনে অনেক বড় কাজ করতে হবে। এই নিষিদ্ধ অনুভূতি কে সে শীঘ্রই চাপা দিয়ে মেরে ফেলবে! কিন্তু জেনিন? জেনিন কি তাকে ছেড়ে দিবে?
চলবে ইংশাআল্লাহ।।।।।।।।।।

