Soulmate_to_Enemy #পর্ব_১৪

0
2

#Soulmate_to_Enemy
#পর্ব_১৪
লেখনীতে: #মিফতাহুল_জান্নাত_জেমিম

নূরশাদ ইন্ডাস্ট্রিজের প্রতিটি কোণ এখন অত্যাধুনিক সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায়। আগে কেবল নিরাপত্তার জন্য এগুলো ব্যবহৃত হতো, কিন্তু গত কয়েকদিন ধরে জেনিন নূরশাদের জন্য এই ক্যামেরাগুলো হয়ে উঠেছে নোবারাকে ‘স্পাই’ করার প্রধান অস্ত্র। জেনিন তার বিশাল কেবিনের দেয়াল জুড়ে থাকা বড় স্ক্রিনে নোবারার প্রতিটি নড়াচড়া পর্যবেক্ষণ করে। নোবারা কখন কফিতে চুমুক দিচ্ছে, কখন কলম ঘোরাচ্ছে, কার সাথে কথা বলতে গিয়ে সামান্যতম হাসছে, সবই জেনিনের তীক্ষ্ণ নজরে বন্দি।

আজ সকাল থেকেই জেনিনের মেজাজ সপ্তমে। সে লক্ষ্য করেছে অফিসের নতুন জয়েন করা ইন্টার্ন ছেলেটি বারবার নোবারার ডেস্কে গিয়ে ফাইল রেখে আসছে। জেনিন নিজের চেয়ারে বসে দাঁতে দাঁত চেপে স্ক্রিনটা দেখছে। তার ভেতরের সেই পজেসিভ দানবটা যেন ডানা ঝাপটাচ্ছে।

হঠাৎ জেনিনের কানে ভেসে এল একটা মৃদু সুর। সে অবাক হয়ে দেখল নোবারা তার ডেস্কে বসে গুণগুণ করে কিছু একটা গাইছে। সে নিজের মনেই মগ্ন। জেনিন তার ডেস্কে থাকা গোপন লিসেনিং ডিভাইসটা অন করল। নোবারার কণ্ঠস্বর স্পষ্ট হয়ে উঠল তার স্পিকারে।

নোবারা গাইছে,

“তুই ফর্সা সকালের রেশ!
তুই আমার ঘুমের বেশ!
তুই চাদরে মোড়ানো রাত!
তোকে চিনতে পেয়েছি হঠাৎ।
দিয়েছে, কি হওয়া , হয়েছি, উড়ো খই,
রয়েছি , আমাতে আমি কই ।।
দিয়েছে, কি হওয়া , হয়েছি, উড়ো খই
রয়েছি , আমাতে আমি কই?”

গানের প্রতিটি শব্দ জেনিনের বুকে তীরের মতো বিঁধল। জেনিন স্থবির হয়ে গেল। পনেরো বছর আগের সেই বিকেলে নোবারা ঠিক এই সুরেই গুনগুন করত। জেনিনের চোখ ভিজে আসতে চাইল, কিন্তু সে দ্রুত নিজেকে সামলে নিল। তার ইগো তাকে শাসালো—’ও কার কথা ভাবছে? এই গানটা কি ও আমার জন্য গাইছে, নাকি সেই জাভিয়ান বা অন্য কারোর কথা ভেবে?’

জেনিন ইন্টারকমে সজোরে চাপ দিল। “মিস আকারি! এখনই ভেতরে আসুন!”

নোবারা চমকে উঠে গান থামাল। সে ফাইলগুলো গুছিয়ে নিয়ে জেনিনের ঘরে ঢুকল। জেনিন তার চেয়ার ঘুরিয়ে জানালার দিকে মুখ করে বসে আছে। ঘরের আবহাওয়া থমথমে।

“স্যার, ডেকেছিলেন?” নোবারা খুব প্রফেশনাল গলায় বলল।

জেনিন চেয়ারটা ঘুরিয়ে ঝড়ের বেগে উঠে দাঁড়ালো। সে নোবারার খুব কাছে এসে থামল। জেনিনের নিশ্বাস নোবারার কপালে লাগছে। তার চোখ রক্তবর্ণ।

“অফিস কি আপনার মিউজিক স্কুল? আপনি কি মনে করেন আমি আপনাকে এখানে গান গাওয়ার জন্য বেতন দিই?” জেনিনের গর্জন সারা রুমে প্রতিধ্বনিত হলো।

নোবারা শান্তভাবে জেনিনের চোখের দিকে তাকালো। “আমি কাজ করতে করতেই গাইছিলাম। কারো ডিস্টার্ব হয়নি স্যার।”

“আমার ডিস্টার্ব হয়েছে!” জেনিন নোবারার বাহু ধরে তাকে দেয়ালের সাথে চেপে ধরল। তার হাতের কব্জি শক্ত হয়ে আছে। “কার কথা ভেবে গাইছিলেন ওটা? কার জন্য আপনার মন চঞ্চল হচ্ছে?”

নোবারা ব্যথায় একটু কুঁকড়ে গেল, কিন্তু তার চোখে পরাজয় নেই। সে জেনিনের বুকের ওপর হাত রেখে তাকে হালকা ধাক্কা দিল। “আপনি কেন এত রিঅ্যাক্ট করছেন? আমি কার জন্য গান গাইছি সেটা আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার।”

“ব্যক্তিগত?” জেনিন অট্টহাসি হাসল। সে নোবারার চিবুকটা উঁচিয়ে ধরল। “আপনার নিঃশ্বাস থেকে শুরু করে আপনার চিন্তা, সবই আমার। আমি চাই না আপনার মুখে আমার নাম ছাড়া অন্য কারো নাম আসুক।”

জেনিন নিজের অজান্তেই মনের কথাগুলো বলে ফেলল। নোবারা স্তব্ধ হয়ে জেনিনের দিকে তাকিয়ে রইল। সে দেখল জেনিনের চোখের গভীরে এক সমুদ্র হাহাকার। জেনিন তাকে ঘৃণা করতে চায়, কিন্তু তার প্রতিটি কোষ নোবারাকে নিয়ে পাগলপ্রায়।

“আপনি যদি এতই আমাকে নিজের ভাবেন, তবে কেন এত নিষ্ঠুরতা করেন?” নোবারার কণ্ঠে ক্রোধ ঝরে পড়ল।

জেনিন হঠাৎ নোবারার কানের কাছে মুখ নিয়ে গেল। তার কণ্ঠস্বর এখন ফিসফিসে কিন্তু তীব্র। “প্রশ্ন করা আমার পছন্দের নয় মিস আকারি।”

নোবারা জেনিনের বুকের ধকধকানি শুনতে পাচ্ছিল। সে বুঝতে পারল জেনিন আসলে এক ভয়ংকর পজেসিভ নেশায় আক্রান্ত। সে তাকে ভালোবাসে ঠিকই, কিন্তু সেই ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ এক মরণফাঁদের মতো।

জেনিন নোবারাকে ছেড়ে দিয়ে নিজের ডেস্কে ফিরে গেল। সে একটা রিমোট চেপে দেয়ালের সব স্ক্রিন অফ করে দিল।

“যান নিজের ডেস্কে। আর মনে রাখবেন, কালকের প্রেজেন্টেশনে যদি কোনো ভুল হয়, তবে আমি আপনাকে পুরো অফিসের সামনে কান ধরে দাঁড় করিয়ে রাখব।”

নোবারা ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় দেখল জেনিন আবার তার ল্যাপটপ নিয়ে ব্যস্ত। কিন্তু জেনিনের হাত কাঁপছে। নোবারা বুঝতে পারল জেনিন মুখে যাই বলুক, সে আসলে নোবারার সুরেই বন্দি।

অফিসের কাজ শেষ করে জেনিন যখন পার্কিং লটে এল, সে দেখল নোবারা একা দাঁড়িয়ে আছে। বৃষ্টি পড়ছে। জেনিন তার কালো ছাতাটা নিয়ে নোবারার মাথায় ধরল।

“গাড়িতে উঠুন।”

“আমি ট্যাক্সিতে চলে যাব স্যার,” নোবারা একগুঁয়েমি করল।

জেনিন এক ঝটকায় নোবারার কোমরে হাত দিয়ে তাকে নিজের দিকে টেনে নিল। ছাতাটা দুজনকে আগলে রাখল বাইরের জগত থেকে। “আমি বলেছি না, আমার অনুমতি ছাড়া এক পা-ও নড়বেন না। গাড়িতে উঠুন নতুবা আমি এখানেই আপনাকে কোলে করে তুলে নিয়ে যাব।”

জেনিন নিজেই গাড়ির দরজা খুলে দিল। নোবারা বুঝতে পারল এই লোকটার ইগোর কাছে হার মানাই এখন তার নিরাপত্তা।

<><><><><><><><><>

নূরশাদ ভিলার রাতগুলো আজ আর শান্ত নেই। জেনিন নূরশাদের স্টাডি রুমে আজ ল্যাপটপের বদলে টেবিলের ওপর ছড়ানো রয়েছে আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্রের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ। জেনিন খুব শান্ত হাতে তার কাস্টম-মেড রিভলভারটি পরিষ্কার করছে। তার পরনের সাদা শার্টের হাতা গুটানো, কপালে চিন্তার রেখা। গত কয়েকদিন ধরে আন্ডারওয়ার্ল্ডে এক অদ্ভুত গুঞ্জন শোনা যাচ্ছেহ ‘জেনিন নূরশাদের সাম্রাজ্যে ফাটল ধরেছে’।

হঠাৎ দরজায় নক না করেই ঘরে ঢুকল কালা মানিক। তার চেহারায় আতঙ্কের ছাপ স্পষ্ট।
“বস, খবর ভালো না। সাউথ জোনের তিনটে গোডাউনে একসাথে হামলা হয়েছে। আমাদের সাতজন লোক স্পটেই শেষ। আর সবচেয়ে বড় কথা, সবগুলো ড্রাগস এবং অস্ত্রের চালান পুলিশ সিজ করেছে। এটা সাধারণ রেইড ছিল না বস, কেউ আমাদের একদম ভেতরের খবর লিক করেছে।”

জেনিন রিভলভারের ম্যাগাজিনটা সশব্দে লোড করল। তার চোখ দুটো এখন বরফশীতল। “ভেতরের খবর? তার মানে আমার খুব কাছের কেউ বিশ্বাসঘাতকতা করছে।”

সে জানালার পর্দাটা সামান্য সরালো। বাইরে পাহারারত লোকগুলোর দিকে তাকিয়ে তার মনে হলো, প্রতিটি ছায়াই এখন তার শত্রু। ঠিক এই মুহূর্তেই তার মনে পড়ল নোবারার কথা। নোবারা এখন এই প্রাসাদেরই অন্য একটি রুমে ঘুমিয়ে আছে। জেনিনের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। যদি শত্রুরা তার এই দুর্বলতার কথা জেনে ফেলে?

“মানিক, ভিলার সিকিউরিটি ট্রিপল করো। নূরশাদ ভিলার আশেপাশে কোনো মাছি যেন না গলে। আর শোনো,” জেনিন মানিকের কলার চেপে ধরল, “মিস আকারি যেন এই বিষয়ে এক বিন্দুও টের না পায়। ওর জন্য আজ থেকে একজন পার্সোনাল গার্ড থাকবে যে সবসময় ওর ছায়ার সাথে মিশে থাকবে।”

মানিক চলে যাওয়ার পর জেনিন চেয়ারে ধপ করে বসল। তার ইগো আজ এক বিশাল ধাক্কা খেয়েছে। সে ভাবত সে অজেয়, কিন্তু আজ তার নিজের সাম্রাজ্যেই আগুন লেগেছে।

রাত তখন তিনটে। জেনিন একা তার ব্ল্যাক এসইউভি নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। সে কাউকে সাথে নেয়নি। তাকে যেতে হবে শহরের এক পরিত্যক্ত ডকইয়ার্ডে, যেখানে তার গোপন আস্তানায় তার সেকেন্ড-ইন-কমান্ড তার জন্য অপেক্ষা করছে।

ডকইয়ার্ডের অন্ধকার গুদামে প্রবেশ করতেই জেনিন দেখল চারজন লোককে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে। এরা জেনিনেরই লোক ছিল, যারা গোডাউন পাহারায় ছিল।

“কে দিয়েছিল খবর?” জেনিন খুব নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল। সে তার রিভলভারের নলটা একজনের কপালে ঠেকাল।

“বস, খোদার কসম! আমরা কিছু জানি না! হঠাৎ করে পুলিশ এর টিম এসে আমাদের ঘিরে ফেলেছিল—ষ,”

জেনিনের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।
“পুলিশ…” জেনিন বিড়বিড় করল।

জেনিন যখন ভিলাতে ফিরল, তখন ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। সে ক্লান্ত পায়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠছিল, এমন সময় দেখল নোবারা করিডোরে দাঁড়িয়ে আছে। নোবারার পরনে তার সেই সাদা কামিজ, চোখে একরাশ উদ্বেগ।

“কোথায় ছিলেন আপনি এত রাত পর্যন্ত?” নোবারার কণ্ঠে আজ আর অধিকারের অভাব নেই। সে জেনিনের শার্টে বারুদের কড়া গন্ধ পেল।

জেনিন নোবারাকে পাশ কাটিয়ে যেতে চাইল।
“আমার ব্যক্তিগত কাজে ছিলাম। আপনি এখনো ঘুমাননি কেন?”

নোবারা জেনিনের হাতটা চেপে ধরল। সে দেখল জেনিনের হাতে কালচে রক্তের দাগ।
“আপনার হাত থেকে রক্ত পড়ছে কেন? আবার কি কোনো ঝামেলায় জড়িয়েছেন?”

জেনিন এক ঝটকায় নোবারার হাতটা সরিয়ে দিল। তার ইগো আর পজেসিভনেস আবার একাকার হয়ে গেল। “বিপদ আমার বন্ধু। আমি আপনাকে বলেছি না, আপনি শুধু আমার অফিসের কাজ করবেন। আমার ব্যক্তিগত জীবনে নাক গলাবেন না।”

“ব্যক্তিগত জীবন?” নোবারা চিৎকার করে উঠল। “আপনি যখন মাঝরাতে অস্ত্র হাতে বাড়ি ফেরেন, তখন সেটা আর ব্যক্তিগত থাকে না। আপনি কি মনে করেন আমি কিছুই বুঝি না?”

জেনিন নোবারার খুব কাছে এগিয়ে এল। সে নোবারার দুই কাঁধ শক্ত করে ধরল। জেনিনের চোখের মণি দুটো এখন ভয়ংকর কালো। “আমি এক অন্ধকার জগতের রাজা। আর সেই জগতের রানী হওয়ার যোগ্যতা আপনার নেই। আমি চাই না আপনি এই রক্তের গন্ধে অভ্যস্ত হোন। আপনি কেবল আমার নূরশাদ ভিলার সেই সাজানো পুতুল হয়ে থাকবেন। এর বাইরে এক কদম নড়লে আপনিও রেহাই পাবেন না।”

নোবারা জেনিনের চোখের দিকে তাকিয়ে শিউরে উঠল। সে দেখল জেনিনের ভেতরে এক ভয়ংকর সংঘাত চলছে। জেনিন তাকে ভালোবাসে বলেই দূরে সরিয়ে রাখতে চাইছে, কিন্তু তার এই উগ্রতা নোবারাকে আরও বেশি সন্ধানী করে তুলছে।

“আপনি আমায় পুতুল ভাবছেন? তবে জেনে রাখুন, এই পুতুলই একদিন আপনার এই সাম্রাজ্যের পতন দেখবে,” নোবারা শান্ত গলায় বলল এবং নিজের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল।

জেনিন দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে গুমরে উঠল। সে জানে পতন তার খুব কাছে চলে এসেছে। শত্রুপক্ষ যদি নোবারাকে তার সাথে দেখে ফেলে, তবে তারা নোবারাকে জেনিনের বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করবে। জেনিন তা হতে দিতে পারে না।

<><><><><><><><><>

নূরশাদ ভিলার বিশাল বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে নোবারা। বাইরে ঝমঝম করে বৃষ্টি পড়ছে। গতরাতের সেই রক্তমাখা হাত আর জেনিনের ওই বিষাক্ত উগ্রতা নোবারার ভেতরে এক প্রচণ্ড ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সে আর জেনিনের এই দম্ভ সহ্য করবে না। জেনিন তাকে পুতুলের মতো ব্যবহার করবে আর সে চুপচাপ তা মেনে নেবে, তা আর সম্ভব নয়।

জেনিন ঘরে ঢুকল। তার পরনে হালকা ধূসর রঙের একটি ক্যাজুয়াল টি-শার্ট। কাঁধের ব্যান্ডেজটা এখনো আছে, কিন্তু তার চাউনিতে আজ সেই পরিচিত রুক্ষতা নেই। সে দেখল নোবারা তার দিকে পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

“নোবারা, ডিনার রেডি। চলুন,” জেনিন খুব শান্ত গলায় বলল।

নোবারা ফিরল না। তার কণ্ঠস্বর ছিল বরফের মতো শীতল। “আমি খাব না। আর আজ থেকে আমি আপনার পার্সোনাল কোনো কাজও করব না। কাল সকালেই আমি ভিলা ছেড়ে দিচ্ছি।”

জেনিন এক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে রইল। সে জানত নোবারা রেগে আছে, কিন্তু তার চলে যাওয়ার কথা শুনে জেনিনের বুকের ভেতরটা যেন কেউ মুচড়ে ধরল। সে ধীর পায়ে নোবারার কাছে এগিয়ে গেল। সে আজ নোবারাকে ধমক দিল না, বরং খুব আলতো করে নোবারার কাঁধে হাত রাখল। নোবারা ঝটকা দিয়ে তার হাত সরিয়ে দিল।
“ছুঁবেন না আমাকে!”

জেনিন এবার নোবারার সামনে এসে দাঁড়ালো। সে দেখল নোবারার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। জেনিনের হৃদয়ে এক প্রচণ্ড অপরাধবোধ জেগে উঠল। সে অনুভব করল, তাকে রক্ষা করার নামে সে আসলে নোবারার আত্মাকেই ক্ষতবিক্ষত করে ফেলেছে।

জেনিন খুব নিচু স্বরে বলল, “আমি জানি আমি ভুল করেছি। কাল রাতের ওই ব্যবহার… ওটা আমি ছিলাম না। ওটা ছিল আমার ভেতরের সেই দানবটা যে সারাক্ষণ হারানোর ভয়ে কাঁপে।”

নোবারা অবাক হয়ে জেনিনের দিকে তাকালো। জেনিন নূরশাদের মুখে ক্ষমা? এটা তো অকল্পনীয়!
জেনিন নোবারার দুহাত নিজের হাতের মুঠোয় নিল। তার হাতের স্পর্শ আজ অনেক বেশি কোমল, অনেক বেশি সম্মানে ভরা। সে নোবারার চোখের জল নিজের বুড়ো আঙুল দিয়ে মুছে দিল।

নোবারা স্তব্ধ হয়ে গেল। জেনিনের এই কোমল রূপ তাকে মুহূর্তের মধ্যে গলিয়ে দিল। সে জেনিনের বুকে মাথা রাখল। জেনিন তাকে জড়িয়ে ধরল, কিন্তু খুব আলতো করে, যেন সে কাঁচের তৈরি কোনো দামী জিনিস ভেঙে ফেলার ভয়ে আছে।

“আপনি কি সবসময় এমন থাকতে পারেন না?” নোবারা ফিসফিস করে বলল।

জেনিন কোনো উত্তর দিল না। সে শুধু নোবারার চুলে মুখ গুঁজে রইল। সেই রাতে ডাইনিং টেবিলে জেনিন নিজেই খাবার বেড়ে দিল নোবারার পাতে। সে নোবারার প্রতিটি ছোট জিনিসের খেয়াল রাখছিল, খাবার বেশি গরম কি না, পানির গ্লাস পূর্ণ আছে কি না। পুরোটা সময় তাদের মধ্যে এক মায়াবী নীরবতা ছিল। নোবারার মনে হলো, হয়তো জেনিন বদলে যাচ্ছে। হয়তো তাদের মাঝখানের সেই কাঁচের দেয়ালটা ভেঙে পড়ছে।

কিন্তু এই মায়া ছিল কেবল একটি রাতের বিভ্রম। জেনিন নুরশাদ তো জেনিন নুরশাদই! সে কখন কি করে, কখন কি ভাবে তা বোঝা দায়!

পরদিন সকাল। নোবারা খুব সুন্দর একটা মেজাজ নিয়ে নিচে নেমে এল। সে ভেবেছিল আজ হয়তো জেনিন তাকে হাসি মুখে অভ্যর্থনা জানাবে। কিন্তু ড্রয়িংরুমে পা রাখতেই তার সব স্বপ্ন চুরমার হয়ে গেল।

জেনিন ডাইনিং টেবিলে বসে আছে। তার পরনে সেই কঠোর ব্ল্যাক স্যুট। মুখটা পাথরের মতো কঠিন। সে খবরের কাগজ পড়ছে, আর তার চারপাশে চার-পাঁচজন বডিগার্ড অস্ত্র হাতে দাঁড়িয়ে আছে। জেনিন একবারও নোবারার দিকে তাকালো না।

“স্যার, আপনার কফি…” নোবারা মৃদু স্বরে বলল।

“কফিটা টেবিলের ওপাশে রাখুন,” জেনিনের কণ্ঠস্বর ছিল কর্কশ এবং নির্লিপ্ত। গতরাতের সেই কোমল জেনিন যেন এক পলকে ভস্মীভূত হয়ে গেছে।

নোবারা থতমত খেয়ে গেল। সে এক পা এগিয়ে গেল। “আপনার শরীর এখন কেমন?”

“মিস আকারি!” জেনিন টেবিল চাপড়ে উঠল। তার চোখের মণি এখন আবার সেই বরফশীতল নিষ্ঠুরতায় ভরা। “মনে রাখবেন, আপনি এখানে আমার কর্মচারী। কাল রাতে আমি হয়তো একটু বেশি উদার ছিলাম, কিন্তু সেটাকে আমার দুর্বলতা ভাবার ভুল করবেন না। আপনার প্রতিটি মুভমেন্ট সিসিটিভিতে মনিটর করা হচ্ছে। এখন যান!”

নোবারা বিস্ময়ে আর অপমানে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। একি সেই মানুষ যে কয়েক ঘণ্টা আগে তাকে জড়িয়ে ধরে ক্ষমা চেয়েছিল? জেনিন আবার তার ইগোর সেই সুউচ্চ প্রাচীর তুলে নিয়েছে। তার রুডনেস এখন আগের চেয়েও অনেক বেশি তীব্র।

নোবারা বুঝল, জেনিন আসলে এক অদ্ভুত খেলায় মেতেছে। সে যখন তাকে কাছে টানে, তখন সে দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ প্রেমিক; আর যখন সে নিজের সাম্রাজ্য রক্ষা করতে চায়, তখন সে এক নির্দয় সম্রাট।

নোবারা চোখ মুছে ফাইলটা হাতে নিয়ে বেরিয়ে গেল। জেনিন কাগজের আড়াল থেকে আড়চোখে দেখল নোবারার প্রস্থান। তার হাতটা কাঁপছে। সে জানে সে নোবারার মন ভেঙেছে, কিন্তু কাল রাতের সেই ‘ভালবাসার মানে’ শেখানো জেনিনকে সে আর সামনে আসতে দেবে না। কারণ আজ রাতেই তাকে একটি বড় ডিল ফাইনাল করতে হবে, যেখানে কোমলতার কোনো স্থান নেই।

সে তার আপনমনে বিড়বিড় করলো,
“কাল রাতে ও আমায় ছুঁয়েছিল। আমি আবার মানুষ হতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আজ সকালে যখন আয়নায় তাকালাম, দেখলাম আমার পেছনে হাজারটা লাশের ছায়া। নোবারা, তুমি আমাকে ঘৃণাই করো, কারণ ঘৃণাই তোমাকে আমার থেকে দূরে রাখবে, আর দূরে থাকলেই তুমি নিরাপদ।”

চলবে ইংশাআল্লাহ।।।।।।।।।।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here