#Soulmate_to_Enemy
#পর্ব_১৫
লেখনীতে: #মিফতাহুল_জান্নাত_জেমিম
নূরশাদ ইন্ডাস্ট্রিজের সদর দপ্তরের বিশতলায় সাধারণের প্রবেশাধিকার নেই। এমনকি কোম্পানির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদেরও সেখানে যাওয়ার জন্য বিশেষ বায়োমেট্রিক পারমিশন লাগে। এই ফ্লোরটিই হলো জেনিন নূরশাদের আসল ‘ওয়ার রুম’। এখান থেকেই সে তার বিশাল ক্ষমতার জাল বুনেছে, যা দেশের সীমান্ত পেরিয়ে আন্তর্জাতিক মহলেও বিস্তৃত।
জেনিন তার বিশাল কালো গ্লাস দিয়ে ঘেরা চেম্বারে দাঁড়িয়ে আছে। জানালা দিয়ে নিচের শহরটাকে খেলনার মতো মনে হচ্ছে। তার ঠিক পেছনে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে চারজন মানুষ, এরা সাধারণ বডিগার্ড নয়। এরা হলো জেনিনের ‘এলিট ফোর’। প্রত্যেকে বিশ্বের সেরা স্পেশাল ফোর্স থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এবং জেনিনের জন্য প্রাণ দিতে বা নিতে এক মুহূর্তও দ্বিধা করবে না। তাদের পরনে ব্ল্যাক স্যুট, কানে ছোট ব্লুটুথ ডিভাইস, আর হাতের কব্জিতে একটি বিশেষ হাবলট ব্র্যান্ড এর ঘড়ি, যা জেনিনের অনুগত বাহিনীর প্রতীক।
“বস, সাউথ জোনের পরিস্থিতি এখন শান্ত। যারা আপনার মালামাল আটকানোর চেষ্টা করেছিল, তারা এখন মাটির গভীরে।” কালা মানিকের কণ্ঠস্বর আজ অতিরিক্ত বিনয়ী।
জেনিন একটা লম্বা চুরুট ধরালো। ধোঁয়ার কুন্ডলী তার গম্ভীর মুখের চারপাশে এক রহস্যময় বলয় তৈরি করল। “মানিক, আমি শান্তি পছন্দ করি না। আমি চাই পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ। পুলিশ ইদানিং বেশি এগোচ্ছে। ওদের অফিসের প্রতিটি ফাইলের কপি যেন আজ রাতের মধ্যে আমার টেবিলে থাকে।”
জেনিনের ক্ষমতার দাপট কেবল অস্ত্রের শক্তিতে নয়, তার রয়েছে এক বিশাল ইনফরমেশন নেটওয়ার্ক। শহরের প্রতিটি থানায়, প্রতিটি সরকারি দপ্তরে এমনকি প্রতিযোগী কোম্পানিগুলোতেও জেনিনের নিজস্ব ‘স্লিপার সেল’ ছড়িয়ে আছে। তারা জেনিনকে এমন সব তথ্য দেয় যা সাধারণ গোয়েন্দা সংস্থারও অগোচরে থাকে।
হঠাৎ টেবিলের ওপর রাখা একটি লাল রঙের ফোন বেজে উঠল। এই ফোনটি কেবল তখনই বাজে যখন কোনো আন্তর্জাতিক ‘ডিল’ বা বড় ধরনের সংকট দেখা দেয়। জেনিন ফোনটা তুলল।
“বলো।” জেনিনের কণ্ঠস্বর পাথরের মতো শক্ত।
ওপাশ থেকে আসা সংবাদের পর জেনিন শুধু বলল, “অর্ডার কনফার্ম করো। বন্দরে আজ রাতে যে জাহাজটা ভিড়বে, ওটা যেন কেউ চেক করার সাহস না পায়। কাস্টমস কমিশনারকে বলে দাও তার পরিবারের ছুটি যেন ভালো কাটে।”
ফোনটা রেখে জেনিন তার ডেস্কে থাকা একটি গোপন সুইচ টিপল। সাথে সাথে দেয়ালের বিশাল ম্যাপটি সরে গিয়ে আটটি বড় এলইডি স্ক্রিন বেরিয়ে এল। সেখানে জেনিনের নিজস্ব স্যাটেলাইট ফিড দেখা যাচ্ছে। শহরের আটটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টের লাইভ ফুটেজ।
জেনিনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা কোনো রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতির চেয়েও শক্তিশালী। তার বাড়ির চারপাশে তিনটি স্তরে পাহারা দেওয়া হয়। প্রথম স্তরে থাকে প্রশিক্ষিত কুকুর এবং হাই-টেক সেন্সর। দ্বিতীয় স্তরে জেনিনের নিজস্ব কমান্ডো বাহিনী। আর তৃতীয় স্তরটি হলো ‘ইনভিজিবল গার্ডস’, যারা সাধারণ মানুষের বেশে আশেপাশে ঘুরে বেড়ায় কিন্তু আসলে তারা পেশাদার খুনি।
নোবারা যখন তার ডেস্কে বসে কাজ করছিল, সে লক্ষ্য করল অফিসের করিডোরগুলোতে আজ বডিগার্ডের সংখ্যা বেড়ে গেছে। প্রত্যেকেই সতর্ক, কারো মুখে কথা নেই। সে খেয়াল করলো, জেনিন যখন হেঁটে যায়, তার চারপাশের মানুষগুলো মাথা নিচু করে দাঁড়ায় কেবল ভয়ে নয়, এক ধরণের অবর্ণনীয় শ্রদ্ধার কারণে, যা কেবল একজন শক্তিশালী একনায়কই অর্জন করতে পারে।
বিকালে জেনিন তার কেবিন থেকে বের হলো। সাথে তার বডিগার্ডের বহর। জেনিন যখন করিডোর দিয়ে হাঁটছে, তখন মনে হচ্ছে কোনো সম্রাট যুদ্ধজয়ের পর তার প্রাসাদে ফিরছেন। তার প্রতিটি পদক্ষেপের শব্দে পুরো ফ্লোর যেন কেঁপে উঠছে। সে নোবারার ডেস্কের সামনে এসে থামল।
নোবারা জেনিনের চোখের দিকে তাকালো। গতরাতের সেই প্রেমিক জেনিনকে এখানে খুঁজে পাওয়া অসম্ভব। এখন যে দাঁড়িয়ে আছে, সে কেবলই এক দোর্দণ্ড প্রতাপশালী অধিপতি।
“মিস আকারি, আজ রাতে একটা অপারেশন আছে, আমি বলতে চাইছি একটা ইম্পর্ট্যান্ট মিটিং আছে। আপনি ভিলাতেই থাকবেন। আমার বডিগার্ডদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে আপনি যেন আপনার ঘরের বাইরে না বেরোন। আপনার কোনো কিছুর প্রয়োজন হলে মানিককে জানাবেন।”
জেনিনের আদেশ পালনের পর আর কোনো কথা বলার সুযোগ থাকল না।
নোবারা কিছু বলতে চাইল, কিন্তু জেনিনের সেই বরফশীতল চাউনি তাকে থামিয়ে দিল। জেনিন তার দলবল নিয়ে লিফটের দিকে এগিয়ে গেল। লিফটের দরজায় দাঁড়িয়ে সে শেষবার নোবারার দিকে তাকালো। তার চোখে এখন কোনো মায়া নেই, আছে কেবল এক পৈশাচিক ক্ষমতা আর অধিকারবোধ।
জেনিন নূরশাদ আজ প্রমাণ করে দিল কেন তাকে এই শহরের অন্ধকার আর আলোর ‘সেতুবন্ধন’ বলা হয়। সে এমন এক স্তরের মানুষ যাকে ধরা যায় না, ছোঁয়া যায় না, কেবল অনুভব করা যায় এক বিভীষিকার মতো।
জেনিন গাড়িতে বসে তার এজেন্টদের উদ্দেশ্যে একটি মেসেজ পাঠালো,
“Clean sweep within two hours. No witnesses.”
গাড়ি যখন দ্রুতগতিতে অন্ধকার রাজপথ দিয়ে ছুটছে, জেনিন তার হাতের রিভলভারটার নলে একবার চুমু খেল। তার মনে পড়ল নোবারার কথা। সে বিড়বিড় করে বলল, “তোমার জন্য আমি এক পবিত্র পৃথিবী বানাতে চেয়েছিলাম বার্বিডল, কিন্তু সেই পৃথিবী গড়তে গিয়ে আমার হাত আজ রক্তে ভেসে যাচ্ছে!”
<><><><><><><><><>
শহরের উপকণ্ঠে পরিত্যক্ত একটি কন্টেইনার টার্মিনাল। রাত এখন আড়াইটে। চারদিকে কুয়াশার আস্তরণ আর লোনা জলের গন্ধ। বিশাল বিশাল ক্রেনগুলো অন্ধকারের দানবের মতো দাঁড়িয়ে আছে। এই নির্জন স্থানে এখন কেবল জেনিন নূরশাদের অঘোষিত শাসনের প্রতিধ্বনি শোনা যাচ্ছে।
টার্মিনালের মাঝখানে চারটি কালো এসইউভি গোল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, যাদের হেডলাইটের তীব্র আলোয় মাঝখানের জায়গাটা দিনের মতো পরিষ্কার। সেখানে হাঁটু গেড়ে বসে আছে তিনজন লোক, যাদের হাত পেছনে বাঁধা। তাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে জেনিনের ‘এলিট ফোর’, তার সবচাইতে বিশ্বস্ত চার এজেন্ট। তারা জেনিনের ইশারার অপেক্ষায় পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
গাড়ির দরজা খুলে বের হলো জেনিন। তার পরনে এখন আর সেই টাক্সিডো নেই, বরং সে পরেছে একটি ব্ল্যাক ট্যাকটিক্যাল জ্যাকেট আর কার্গো প্যান্ট। তার কোমরে বাঁধা বিশেষ হোলস্টারে চিকচিক করছে তার প্রিয় কাস্টম-মেড পিস্তল। জেনিন যখন ধীর পায়ে এগিয়ে এল, তার বুটের শব্দে চারপাশের নিস্তব্ধতা যেন বিদীর্ণ হয়ে গেল।
“আমি বলেছিলাম আমার বন্দর দিয়ে কোনো ভেজাল মাল ঢুকবে না,” জেনিনের কণ্ঠস্বর সাপের হিসহিসের মতো শোনাল। সে নিচু হয়ে এক বন্দির চুল ধরে মাথাটা উঁচিয়ে ধরল। “কে তোমাদের সাহস দিয়েছে আমার সিল মারা কন্টেইনারে ড্রাগস ঢোকানোর?”
“বস… ক্ষমা করুন… আমরা জানতাম না..”
লোকটির আর্তনাদ শেষ হওয়ার আগেই জেনিন তার মুখে এক প্রচণ্ড লাথি মারল। লোকটা ছিটকে পড়ল রক্তমাখা সিমেন্টের ওপর।
জেনিন তার হাত থেকে গ্লাভসটা খুলে পাশের দাহ্য পদার্থের ড্রামে ছুঁড়ে মারল। সে আজ কোনো করুণা দেখানোর মেজাজে নেই। আজ তার আভিজাত্য আর অহংকার এক বিশাল চ্যালেঞ্জের মুখে। সে জানে, এই লোকগুলো আসলে পুলিশ এর সেট করা ‘টোপ’। পুলিশ চাচ্ছে জেনিনকে প্ররোচিত করতে যাতে সে ভুল করে বসে।
“মানিক!” জেনিন হাঁক দিল।
কালা মানিক অন্ধকারের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল। তার হাতে একটি ট্যাবলেট কম্পিউটার। সে জেনিনকে কিছু ডিজিটাল ম্যাপ আর সিগন্যাল দেখালো। “বস, পুলিশের টিম এখান থেকে মাত্র তিন কিলোমিটার দূরে। ওরা ভাবছে আমরা এখানে মাল আনলোড করছি। কিন্তু আমরা যদি এখন মুভ না করি, তবে ওরা আমাদের পিন করে ফেলবে।”
জেনিন একটু হাসল। এক পৈশাচিক হাসি। “প্ল্যান বি অ্যাক্টিভেট করো। এই টার্মিনালের উত্তর দিকের গোডাউনটা উড়িয়ে দাও। পুলিশ যখন আগুনের পেছনে ছুটবে, তখন আমাদের আসল মাল পশ্চিম দিকের খাল দিয়ে বের হয়ে যাবে।”
জেনিনের এজেন্টরা মুহূর্তের মধ্যে পজিশন নিল। এরা একেকজন ‘স্লিপার এজেন্ট’। দিনের আলোয় এরা কেউ হয়তো ট্যাক্সি ড্রাইভার, কেউ অফিসের পিয়ন, কিন্তু এই রাতে এরা একেকজন দক্ষ ঘাতক। জেনিন তার ইশারা দিল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে পুরো টার্মিনাল এক প্রচণ্ড বিস্ফোরণে কেঁপে উঠল। আকাশে আগুনের লেলিহান শিখা দেখে মনে হলো যেন সূর্য মাঝরাতে উদিত হয়েছে।
জেনিন শান্তভাবে তার গাড়ির বনেটে হেলান দিয়ে একটি চুরুট ধরালো। আগুনের সেই কমলা আভা তার চোখে প্রতিফলিত হচ্ছে। সে জানে, এই মুহূর্তে পুলিশের ফোর্স নিয়ে ওই আগুনের দিকেই ছুটছে। জেনিন তার বুদ্ধিমত্তা দিয়ে আইনকে বারবার খেলনা বানিয়ে ছাড়ে। তার নেটওয়ার্ক এতটাই গভীরে যে, পুলিশ পৌঁছানোর আগেই অপরাধের সব চিহ্ন ছাই হয়ে যায়।
“জেড স্যার, কন্টেইনারগুলো নিরাপদে মুভ হয়েছে,” জনৈক এজেন্ট রিপোর্ট করল।
“গুড। এই তিনজনকে নিয়ে কী করতে হবে জানো তো?” জেনিন ধোঁয়ার কুন্ডলী ছেড়ে নির্লিপ্তভাবে বলল। “আমার সাম্রাজ্যে বিশ্বাসঘাতকদের জন্য কোনো কবর নেই। ওদের সাগরের গভীরে পাঠিয়ে দাও।”
জেনিন গাড়িতে উঠে বসল। সে যখন গাড়ি ড্রাইভ করছে, তার চোখেমুখে কোনো ক্লান্তি নেই। সে কেবল ভাবছে তার ক্ষমতার পরিধি নিয়ে। এই শহরটা তার হাতের তালুর মতো। কার বাড়িতে আজ রাতে বাতি জ্বলবে আর কার জীবন আজ প্রদীপ হয়ে নিভে যাবে, সেটা কেবল জেনিন নূরশাদই ঠিক করে। তার রয়েছে অগণিত বডিগার্ড, এজেন্ট আর অর্থ, যা দিয়ে সে যেকোনো সত্যকে মিথ্যে আর যেকোনো মিথ্যেকে সত্য বানাতে পারে।
গাড়ি যখন হাইওয়ে দিয়ে দ্রুতগতিতে ছুটছে, জেনিনের পাশে সিটে রাখা ল্যাপটপটি বিপ করে উঠল। সেখানে নূরশাদ ভিলার সিসিটিভি ফুটেজ দেখা যাচ্ছে। জেনিন এক মুহূর্তের জন্য ফুটেজটা দেখল। নোবারার ঘরের দরজা বন্ধ। সে জানে নোবারা সেখানে নিরাপদ।
জেনিনের ভেতরে আবার সেই অদ্ভুত সংঘাত শুরু হলো। সে এই রাতে যে দানবীয় তাণ্ডব চালাল, তার ছিটেফোঁটাও যদি নোবারা জানতে পারে, তবে সে জেনিনকে ঘৃণা করবে। কিন্তু নোবারার ক্ষেত্রে তার করার কিছুই নেই।
জেনিন নূরশাদ তার এজেন্টদের হেডকোয়ার্টারে একটি ভয়েস মেসেজ পাঠালো,
“Clean-up done. Monitor Police’s next move. I want them frustrated.”
<><><><><><><><><>
রাত তখন প্রায় শেষ হতে চলেছে। ভোরের আজান ধ্বনিত হওয়ার আগে আকাশের সেই গাঢ় নীলচে রঙটা নূরশাদ ভিলার চারপাশকে এক অদ্ভুত মায়ায় জড়িয়ে রেখেছে। জেনিন নূরশাদ যখন ভিলার গেট দিয়ে প্রবেশ করল, তার এসইউভির টায়ার ভেজা পিচের ওপর এক মৃদু হাহাকার তুলল। বাইরের সেই বারুদের গন্ধ, আর্তনাদ আর রক্তের শীতলতা জেনিন নিজের স্যুটের পকেটে পুরে নিয়ে এসেছে। কিন্তু ভিলার মূল দরজায় পা রাখতেই এক স্নিগ্ধ, সুবাসিত নীরবতা তাকে গ্রাস করল।
জেনিন তার কাঁধের ট্যাকটিক্যাল হোলস্টারটা আলতো করে খুলে ফেলল। তার সারা শরীরে অবসাদ, কিন্তু চোখের মণি এখনো সেই শিকারি বাঘের মতো উজ্জ্বল। সে যখন সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠছিল, তার প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল অত্যন্ত সতর্ক। সে চায় না এই প্রাসাদের নিস্তব্ধতা ভাঙুক। তার বডিগার্ডরা নিচতলায় ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে আছে, তাদের অস্ত্রগুলো প্রস্তুত, কিন্তু জেনিনের জন্য এই মুহূর্তটা একান্তই ব্যক্তিগত।
সে সোজা তার নিজের ঘরে না গিয়ে নোবারার ঘরের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। দরজাটা সামান্য ফাঁক হয়ে আছে। জেনিন ভ্রু কুঁচকালো। সে তো নোবারাকে কঠোর নির্দেশ দিয়েছিল ঘরের বাইরে না বেরোতে এবং দরজা লক করে রাখতে।
জেনিন খুব ধীরে দরজাটা ঠেলে ভেতরে ঢুকল।
ঘরের ভেতরে কোনো আলো জ্বলছে না, কেবল জানালার পর্দাটা একটু সরে থাকায় বাইরের সেই ম্লান নীলচে জ্যোৎস্না এসে পড়েছে মেঝের ওপর। আর সেই আলোর রেখার ঠিক শেষ প্রান্তে, জানালার পাশের ইজি চেয়ারে হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে আছে নোবারা আকারি।
জেনিন থমকে দাঁড়ালো। তার হৃদস্পন্দন এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। সে দেখল নোবারার কোলে একটা মোটা ফাইল পড়ে আছে, হয়তো অফিসের কাজ করতে করতে সে অপেক্ষা করছিল। জেনিন ধীর পায়ে এগিয়ে গেল।
নোবারার মুখটা জ্যোৎস্নার আলোয় এক অপার্থিব সৌন্দর্যে উদ্ভাসিত। তার চোখের পাতাগুলো শান্ত, ঠোঁটের কোণে এক মৃদু ক্লান্তির ছাপ। সে কি জেনিনের ফেরার অপেক্ষায় ছিল? নাকি এই নিঃসঙ্গ বিশাল অট্টালিকায় ভয় পেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে?
জেনিন নিঃশব্দে নোবারার পায়ের কাছে হাঁটু গেড়ে বসল। পনেরো বছর আগে এভাবেই সে নোবারার দিকে তাকিয়ে থাকত যখন সে ক্লাসের ফাঁকে টেবিলে মাথা রেখে ঘুমাত। আজ জেনিন একজন খুনি, একজন মাফিয়া সম্রাট, যার হাতে কত মানুষের রক্ত লেগে আছে তার হিসেব নেই। কিন্তু এই ম্লান আলোয়, নোবারার সামনে সে কেবল সেই হাহাকার ভরা কিশোর, যে চিরকাল ভালোবাসার কাঙাল ছিল।
জেনিন খুব সন্তর্পণে তার একটা হাত বাড়িয়ে নোবারার কপালে এসে পড়া একগুচ্ছ চুল সরিয়ে দিল। জেনিনের আঙুলগুলো কাঁপছিল। সে কি এই পবিত্রতাকে স্পর্শ করার যোগ্য? জেনিন অনুভব করল নোবারার নিশ্বাস, অত্যন্ত ধীর আর ছান্দিক। নোবারার গায়ের সেই চন্দন কাঠের সুবাস জেনিনের নাকে আসতেই তার ভেতরের সেই পৈশাচিক উত্তেজনা নিভে গেল। জেনিনের চোখ ভিজে আসতে চাইল।
“কেন অপেক্ষা করো বার্বিডল?” জেনিন খুব নিচু স্বরে ফিসফিস করল। “কেন এই দানবটার জন্য নিজের ঘুম নষ্ট করছো? তুমি জানো না আজ রাতে আমি কজনকে চিরতরে ঘুম পাড়িয়ে এসেছি?”
জেনিনের মনে পড়ল কয়েক ঘণ্টা আগের সেই দৃশ্য, টার্মিনালের আগুনের লেলিহান শিখা আর তার নির্দয় নির্দেশ। আর এখন সেই একই হাত দিয়ে সে নোবারার গাল ছুঁয়ে দেখছে। জেনিনের মনে হলো সে এক দ্বিচারী জীবন যাপন করছে। সে নোবারাকে আগলে রাখতে চায় পৃথিবীর সব নোংরামি থেকে, অথচ সে নিজেই সেই নোংরামির কেন্দ্রবিন্দু।
নোবারা ঘুমের ঘোরে একটু নড়ে উঠল। সে বিড়বিড় করে জেনিনের নামটা উচ্চারণ করল। জেনিন স্তব্ধ হয়ে গেল। তার নামটা নোবারার ঠোঁটে এত কোমল শোনাল যে জেনিনের বুকটা অভিমানে আর ভালোবাসায় ফেটে যেতে চাইল। সে নোবারার হাতের তালুটা নিজের গালে চেপে ধরল। নোবারার হাতটা ঈষৎ উষ্ণ, আর জেনিনের গালটা তখনো বাইরের সেই হিমশীতল হাওয়ায় ঠান্ডা হয়ে আছে।
সে ভাবল, সে যদি তাকে নিয়ে এই দেশ ছেড়ে দূরে কোথাও চলে যেতে পারত? যেখানে কোনো নূরশাদ ইন্ডাস্ট্রিজ থাকবে না, কোনো পুলিস-সিআইডি থাকবে না, থাকবে শুধু এক নীল আকাশ আর সমুদ্রের গর্জন। কিন্তু জেনিন জানে, তার নিয়তি রক্তের পিচ্ছিল পথে লেখা। সে এই শিকল ভাঙতে পারবে না।
জেনিন হঠাৎ অনেক বেশি আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ল। সে নোবারার হাতের পিঠে একটা দীর্ঘ চুমু খেল। তার ঠোঁটের স্পর্শে এক ফোঁটা লোনা জল নোবারার ত্বকে মিশে গেল।
“আমি তোমাকে কোনোদিন মুক্তি দেব না নোবারা” জেনিন ধরা গলায় বলল। “কিন্তু আমি তোমাকে কোনোদিন আমার অন্ধকারের আঁচও লাগতে দেব না। তুমি আমাকে ঘৃণা করলেও আমি তোমাকে আগলে রাখব, কারণ তুমি ছাড়া জেনিন নূরশাদ কেবল একটা প্রাণহীন দেহ।”
বাইরে ভোরের প্রথম আলো ফুটতে শুরু করেছে। জেনিন বুঝল তাকে এখন উঠতে হবে। সে খুব সাবধানে নোবারাকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিল। নোবারার মাথাটা জেনিনের চওড়া কাঁধে এলিয়ে পড়ল। জেনিন অনুভব করল নোবারার শরীরের ওম। সে তাকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে গায়ে একটা পাতলা কম্বল টেনে দিল।
যাওয়ার আগে জেনিন শেষবারের মতো নোবারার দিকে তাকালো। তার চোখে এখন এক অদ্ভুত সংকল্প। সে জানে, আজকের দিনটা আরও কঠিন হবে। কিন্তু জেনিনও প্রস্তুত। সে তার বডিগার্ডদের নেটওয়ার্ক আরও শক্ত করবে।
জেনিন তার নিজের ঘরে ফিরে এল। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখল। তার স্যুটে এখনো ধুলো আর ধোঁয়ার দাগ। সে দ্রুত শাওয়ার নিয়ে তৈরি হয়ে নিল। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে সে আবার সেই ইগোইস্টিক, রুড আর গম্ভীর সিইও হয়ে উঠল। তার চোখের সেই জল, সেই আবেগ, সবই সে শাওয়ারের পানির সাথে ধুয়ে মুছে ফেলেছে।
সকাল আটটা। জেনিন ডাইনিং টেবিলে বসে কফি খাচ্ছে। তার সামনে রাখা আজকের খবরের কাগজ, যেখানে লিড নিউজ, ‘টার্মিনালে ভয়াবহ বিস্ফোরণ, পুলিশের অভিযানে ৩টি লাশ উদ্ধার’। জেনিন খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে কফিতে চুমুক দিচ্ছে।
নোবারা নিচে নেমে এল। তার চোখমুখ এখনো ঘুমের রেশ কাটেনি। সে জেনিনকে দেখেই থমকে দাঁড়ালো। কাল রাতের সেই অপেক্ষার কথা তার মনে পড়ল।
“আপনি কখন ফিরেছেন?” নোবারা একটু ইতস্তত করে জিজ্ঞেস করল।
জেনিন কাগজ থেকে চোখ সরাল না। তার কণ্ঠস্বর এখন পাথরের মতো কঠিন। “কখন ফিরেছি তা জানার দায় আপনার নেই মিস আকারি।”
নোবারা হতভম্ব হয়ে গেল। একি সেই জেনিন যার গায়ের ঘ্রাণ সে ঘুমের ঘোরেও পাচ্ছিল? নোবারার মনে হলো কাল রাতে যেন কেউ তাকে বিছানায় শুইয়ে দিয়েছিল, কেউ যেন তার কপালে হাত রেখেছিল। কিন্তু এই মুহূর্তে জেনিনের এই রুক্ষতা তাকে সব মায়া থেকে দূরে সরিয়ে দিল।
“আমি আপনার জন্য অপেক্ষা করছিলাম…” নোবারার গলাটা ছোট হয়ে এল।
“আমি আপনাকে অপেক্ষা করতে বলিনি,” জেনিন দাঁড়িয়ে পড়ল। তার উচ্চতা আর গাম্ভীর্য নোবারাকে ছোট করে দিল। সে তার বডিগার্ডদের ইশারা দিল গাড়ি বের করার জন্য। “আমার জীবনে অপেক্ষার কোনো স্থান নেই। এখন যান, ফাইলগুলো গুছিয়ে গাড়িতে আসুন।”
জেনিন গটগট করে বেরিয়ে গেল। নোবারা ডাইনিং টেবিলের চেয়ারটা ধরে দাঁড়িয়ে রইল। তার দুচোখ ফেটে জল আসতে চাইল, কিন্তু সে নিজেকে সামলাল। সে বুঝতে পারল জেনিন নূরশাদ এক ধাঁধা। যখন তাকে কাছে পাওয়া যায়, সে মরীচিকার মতো হারিয়ে যায়।
জেনিন গাড়িতে বসে তার রিভলভারটা চেক করল। সে জানে সে নোবারার মন ভেঙেছে, কিন্তু এটাই তাকে বাঁচিয়ে রাখার একমাত্র উপায়। জেনিন বিড়বিড় করে বলল, “তোমার এই অভিমানই আমার রক্ষাকবচ নোবারা। তুমি যত বেশি আমাকে ঘৃণা করবে, তত বেশি তুমি জেনিন নূরশাদের শত্রুদের নজর থেকে দূরে থাকবে।”
নূরশাদ ভিলার গেট পেরিয়ে জেনিনের কনভয় যখন বের হলো, তখন পুরো শহর জেগে উঠেছে। জেনিন নূরশাদ আবার তার সাম্রাজ্য শাসনের পথে, তার পাশে কেবল সেই নিঃসঙ্গতা আর একমুঠো জ্যোৎস্নার স্মৃতি।
চলবে ইংশাআল্লাহ……..

