Soulmate_to_Enemy #পর্ব_১

0
2

১৫ বছর আগের সেই বৃষ্টিভেজা রাত আমাদের আলাদা করেনি, বরং আমাদের ভেতরে থাকা সেই গোপন সত্যটাকেই উন্মোচিত করেছিল, যা আমরা বন্ধুত্বের আড়ালে লুকিয়ে রেখেছিলাম।”

জানালার কাঁচের ওপারে বর্ষার একটানা বৃষ্টির শব্দটা আজ বড্ড একঘেয়ে লাগছে। শহরটা যেন ধূসর ক্যানভাসে আঁকা কোনো বিষণ্ণ ছবি। ঘড়ির কাঁটা রাত দুটোর ঘর ছুঁইছুঁই করছে। নানামি জায়দান তার অন্ধকার স্টাডি রুমে একাকী বসে আছে। ঘরের কোণে রাখা টেবিল ল্যাম্পের ম্লান আলোয় তার চোয়ালের শক্ত রেখাগুলো স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। একজন দক্ষ পুলিশ অফিসারের চোখে যে তীক্ষ্ণতা থাকার কথা, আজ সেখানে কেবল এক রাশ ক্লান্তি আর পুরোনো দহন।

টেবিলের ওপর রাখা কফিটা অনেক আগেই জুড়িয়ে বরফ হয়ে গেছে। নানামির সেদিকে খেয়াল নেই। তার দীর্ঘ আঙুলগুলো একমনে একটা পুরোনো, জরাজীর্ণ ডায়েরির পাতা উল্টে চলেছে। ডায়েরির ভেতর থেকে বেরিয়ে এল একটা ঝাপসা হয়ে যাওয়া ছবি। ছবির রঙ চটে গেছে, কিন্তু সেখানে থাকা তিনটি মানুষের হাসি আজও যেন জীবন্ত। ছবির একদম মাঝখানে থাকা মেয়েটির হাসিতে এক অদ্ভুত মায়া ছিল, যে মায়ার টানে একসময় দুজন কিশোর তাদের পৃথিবী বাজি ধরতে পারত। কিন্তু নানামি আজ সেই মেয়েটির নাম উচ্চারণ করতেও ভয় পায়। নামটা মনে আসতেই বুকের ভেতরটা কেমন যেন শূন্য হয়ে যায়।

“১৫ বছর…” নানামি বিড়বিড় করে বলল।

দীর্ঘ ১৫টি বছর পার হয়ে গেছে। নানামি এখন আইনের রক্ষক, এই শহরের মানুষের কাছে সে এক আস্থার প্রতীক। কিন্তু এই উর্দির নিচে যে মানুষটা লুকিয়ে আছে, সে আজও সেই পনেরো বছর আগের এক বৃষ্টিভেজা রাতে আটকে আছে। যে রাতে তার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু, তার আত্মার অংশ—জেনিন নুরশাদ তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল।

নানামি চোখ বন্ধ করল। বৃষ্টির শব্দটা হঠাৎ করেই যেন তীব্রতর হতে লাগল। বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দটা তাকে বর্তমানের এই ঘর থেকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে অনেক দূরে, যেখানে আকাশটা নীল ছিল, আর বন্ধুত্বের কোনো সীমানা ছিল না।

স্মৃতিগুলো যেন একেকটা ধারালো কাঁচের টুকরো। যত নাড়াচাড়া করা হয়, তত রক্তক্ষরণ বাড়ে!

নানামির মনে পড়ল সেই শেষ দিনটার কথা। স্কুল জীবনের শেষ দিককার সেই ভয়াবহ মুহূর্ত, যা তাদের সারা জীবনের জন্য আলাদা করে দিয়েছিল। জেনিন ছিল আগুনের মতো, উচ্ছ্বল, একগুঁয়ে আর বড্ড জেদি। আর নানামি ছিল শান্ত সমাহিত জল। তারা দুজন ছিল একে অপরের পরিপূরক। অথচ সেই আগুন আর জলই একদিন একে অপরকে ছাই করে দিয়েছিল।

ঝগড়াটা খুব ছোট কোনো কারণে শুরু হয়নি।
সেটা ছিল বিশ্বাস আর অস্তিত্বের এক চরম সংঘাত। নানামি আজও স্পষ্ট দেখতে পায় জেনিনের সেই লাল হয়ে যাওয়া চোখ দুটো। জেনিন সেদিন নানামির কলার চেপে ধরে দেওয়ালে ঠেস দিয়ে ধরেছিল।
“তুই কি মনে করিস তুই একাই ওকে রক্ষা করতে পারবি? তুই কি মনে করিস আমি কিছুই বুঝি না?” জেনিনের চিৎকারটা আজও নানামির কানে বাজে।

নানামি সেদিন শান্ত ছিল। তার সেই নীরবতা জেনিনকে আরও বেশি খেপিয়ে দিয়েছিল। জেনিন মেনে নিতে পারেনি যে তার সবচেয়ে বিশ্বস্ত বন্ধুটি তার অগোচরে এমন কিছু করেছে যা তাদের বন্ধুত্বের দেওয়ালে ফাটল ধরিয়েছে। আসলে দোষটা কার ছিল? পরিস্থিতির? নাকি সেই গোপন অনুভূতির, যা তারা দুজনই লালন করত কিন্তু কেউ কাউকে বলেনি?

সেই রাতে জেনিন যখন বৃষ্টির মধ্যে বেরিয়ে যাচ্ছিল, নানামি তাকে আটকাতে চেয়েছিল। কিন্তু জেনিনের সেই চাউনি… ঘৃণায় ভরা সেই একজোড়া চোখ নানামিকে পাথর করে দিয়েছিল।

জেনিন বলেছিল, “আজ থেকে তুই আমার জন্য মৃত, নানামি জায়দান। আমাদের এই শহর ছোট, কিন্তু আমি কথা দিচ্ছি, তুই আর কোনোদিন আমার ছায়াটাও দেখতে পাবি না।”

জেনিন তার কথা রেখেছিল। সে সেই রাতেই শহর ছেড়েছিল। তার বাড়ি, তার পরিবার, তার শৈশব, সবকিছুকে এক নিমেষে তুচ্ছ করে সে হারিয়ে গিয়েছিল অন্ধকারের কোনো এক গলিতে। নানামি অনেক খুঁজেছে। প্রথম কয়েক বছর সে পাগলের মতো প্রতিটি স্টেশনে, প্রতিটি শহরে খোঁজ নিয়েছে। কিন্তু জেনিন নুরশাদ যেন কর্পূরের মতো বাতাসে মিলিয়ে গিয়েছিল।

আর সেই মেয়েটি? যার জন্য দুই বন্ধুর মধ্যে এই বিশাল মহীরুহ ভাঙনের সৃষ্টি হলো? সে-ও তো হারিয়ে গেল। জেনিনের চলে যাওয়ার সাথে সাথেই যেন সেই বসন্তের সমাপ্তি ঘটেছিল। নানামি আজও জানে না, সেদিন জেনিনের মনে ঠিক কী চলছিল। কেন সে সবকিছু এতো সহজে বিসর্জন দিল?

ডায়েরির ওপর এক ফোঁটা জল পড়ল। নানামি কি কাঁদছে? না, হতে পারে বৃষ্টির জল জানালার ফাঁক দিয়ে ঢুকেছে। নানামি নিজেকে সামলে নিল। সে এখন আর সেই দুর্বল কিশোর নয়। কিন্তু অতীতটা তার ছায়ার মতো। সে যেখানেই যায়, ছায়াটা তার পিছু ছাড়ে না।

নানামি জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। বাইরে শহরটা ঘুমাচ্ছে। কিন্তু সে জানে, এই অন্ধকারের গভীরে কোথাও হয়তো জেনিন আজও বেঁচে আছে। হয়তো সে-ও কোনো এক বৃষ্টিভেজা রাতে এভাবেই জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকে। হয়তো সে-ও মনে করে সেই পুরনো দিনের কথা, যখন তারা একসাথে স্কুল পালাত, বৃষ্টিতে ভিজত আর একে অপরের জন্য প্রাণ দেওয়ার শপথ করত।

“কোথায় আছিস তুই, নুরশাদ? কী অবস্থায় আছিস?” নানামির এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মতো কেউ নেই।

স্মৃতিগুলো এখন আরও গভীর হচ্ছে। নানামির চোখের সামনে ভেসে উঠছে তাদের ক্লাসরুমের সেই কোণের বেঞ্চটা। যেখানে বসে তারা দুজনে কত স্বপ্ন দেখত। জেনিন বলত সে অনেক বড় মানুষ হবে, আর নানামি হাসত।

সেই শেষ বিকেলের ঝগড়াটার কথা মনে পড়লে নানামির আজও গায়ে কাঁটা দেয়। জেনিন যখন চিৎকার করে বলেছিল যে নানামি তাকে ধোঁকা দিয়েছে, তখন নানামি প্রতিবাদ করেনি। কারণ সে জানত, সত্যটা অনেক বেশি জটিল। সে জানত যে জেনিন যাকে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসত, সেই ভালোবাসা রক্ষা করতেই নানামিকে কিছু কঠোর পদক্ষেপ নিতে হয়েছিল। কিন্তু জেনিন তা বোঝেনি। সে শুধু দেখেছিল তার বন্ধুর নীরবতা আর সেই ‘বিশ্বাসঘাতকতা’।

১৫ বছর আগের সেই শহর আর এই শহর এখন বদলে গেছে। নানামি এখন অনেক প্রভাবশালী। কিন্তু তার কাছে সবচেয়ে বড় অপরাধী হিসেবে ধরা পড়ে আছে তার নিজের অতীত। জেনিন নুরশাদ তাকে যে শাস্তি দিয়ে গেছে, বিচ্ছেদের এই বিষ, সেটা পৃথিবীর কোনো আইনের বইয়ে লেখা নেই।

রাত গভীর হচ্ছে। বৃষ্টির বেগ বাড়ছে। নানামি জায়দান জানে, কাল সকালে তাকে আবার ইউনিফর্ম পরে ডিউটিতে যেতে হবে। তাকে আবার কঠোর হতে হবে, অপরাধীদের মোকাবিলা করতে হবে। কিন্তু এই মাঝরাতে, সে কেবল একজন পরাজিত বন্ধু। যার কাছে তার হারানো বন্ধুত্বের স্মৃতি ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।

“যদি ফিরে আসতিস…” নানামির গলার স্বর কান্নায় ভিজে এল। “যদি একবার সুযোগ দিতি আমাকে কথা বলার…”

কিন্তু সময় ফিরে আসে না। সময় কেবল ক্ষত দেয়, আর সেই ক্ষত নিয়ে বেঁচে থাকার অভ্যাস শেখায়। নানামি ডায়েরিটা বন্ধ করল। কিন্তু তার মনের ভেতরের যে অধ্যায়টা নুরশাদের নামে লেখা, সেটা কোনোদিন বন্ধ হওয়ার নয়।

<><><><><><><><><>

১৫ বছর আগে – সেন্ট জুড হাই স্কুল

আকাশটা আজ একদম পরিষ্কার, ঠিক যেন নীল মখমলের চাদর। স্কুল মাঠের এক কোণে কৃষ্ণচূড়া গাছটার নিচে লাল ফুলের গালিচা বিছানো। ক্লাস টেনের বি সেকশনের ছাত্ররা মাঠে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। টিফিনের ঘণ্টা পড়ার সাথে সাথেই পুরো স্কুল যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে। কিন্তু মাঠের ঠিক মাঝখানে যে দৃশ্যটা সবার নজর কাড়ে, সেটা হলো জেনিন নুরশাদ এবং নানামি জায়দান।

জেনিন নুরশাদ, স্কুলের সবচেয়ে বড় বাউন্ডুলে এবং একইসাথে সবচেয়ে দাপুটে ছেলে। শার্টের উপরের দুটো বোতাম খোলা, ইন করা শার্টটা অর্ধেক বেরিয়ে আছে, আর কাঁধে ঝোলানো ব্যাগের চেইনটা সব সময় খোলাই থাকে। তার চোখে এক ধরনের অবাধ্যতা থাকে, যা এই বয়সের ছেলেদের মধ্যে কমই দেখা যায়। জেনিন পড়াশোনায় খুব একটা মনযোগী নয়, কিন্তু খেলাধুলা আর মারামারিতে তার নাম সবার আগে। তাকে স্কুলের ‘কিং’ বলা হয়। শিক্ষক থেকে শুরু করে সিনিয়র ছাত্র—সবাই তাকে একটু এড়িয়ে চলে। তার মেজাজ আগুনের মতো, একবার জ্বললে নেভানো দায়।

ঠিক তার বিপরীত মেরুর মানুষ হলো নানামি জায়দান। স্কুলের সবচেয়ে আদর্শ ছাত্র। ইস্ত্রি করা ধবধবে সাদা শার্ট, পরিপাটি করে আঁচড়ানো চুল আর চোখে চশমা। নানামি শান্ত, গভীর এবং অসম্ভব মেধাবী। সে খুব একটা কথা বলে না, কিন্তু তার উপস্থিতিতে একটা আভিজাত্য থাকে। শিক্ষকরা তাকে উদাহরণ হিসেবে দেখান।

মানুষ অবাক হয়ে ভাবে, এই দুই মেরুর মানুষের মধ্যে বন্ধুত্ব হলো কীভাবে? এদের দুজনের রসায়নটা ছিল পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্যের মতো।

“এই জায়দান! শোন!” জেনিনের চিৎকার পুরো মাঠ কাঁপিয়ে দিল।

নানামি তখন লাইব্রেরির দিকে যাচ্ছিল। জেনিনের ডাক শুনে সে একটু থমকে দাঁড়াল। পেছনে তাকিয়ে দেখল জেনিন দৌড়ে আসছে, তার পেছনে একদল ছেলে—যাদের জেনিন তার ‘বাহিনী’ মনে করে। জেনিন হাঁপাতে হাঁপাতে নানামির কাঁধে হাত রাখল। জেনিনের ঘামে ভেজা শরীর নানামির পরিষ্কার ইউনিফর্মে লাগছে, কিন্তু নানামি বিরক্তি প্রকাশ করল না। সে জানে, জেনিন এমনই।

“আবার কী করলি নুরশাদ?” নানামির গলার স্বর খুব শান্ত।

“আরে দোস্ত, দেখ না! ওই যে নতুন পিটি টিচার এসেছে না? লোকটা বেশি ভাব নিচ্ছে। ক্লাসের সবার সামনে আমাকে বলল আমি নাকি বাউন্ডুলে হব। আমি তাকে জাস্ট বলে দিলাম, স্যার, বাউন্ডুলে হওয়াটাও একটা আর্ট, সবাই পারে না।” জেনিন দাঁত বের করে হাসল।

নানামি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। “তারপর? নিশ্চয়ই তোকে প্রিন্সিপালের রুমে পাঠিয়েছে?”

“আরে না! পাঠানোর আগেই আমি ক্লাস থেকে বেরিয়ে এসেছি। চল, এখন স্কুল পালাব। পেছনের দেওয়ালটার ওপাশে একটা নতুন ক্যাফে খুলেছে, ওখানকার কোল্ড কফিটা নাকি দারুণ!”

নানামি চশমাটা একটু ঠিক করে নিয়ে বলল, “সামনে প্রি-টেস্ট পরীক্ষা নুরশাদ। আর তুই স্কুল পালানোর কথা বলছিস? আমি যাব না।”

জেনিন এক মুহূর্ত নানামির দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর হঠাৎ করেই নানামির ঘাড় চেপে ধরল, ঠিক যেন শিকারি চিতা। “যাবি না মানে? আমি বলছি যাবি। তুই যদি না যাস, তাহলে আমি গিয়ে ওই পিটি টিচারের সাইকেলের হাওয়া ছেড়ে দেব। এবার বল, যাবি কি না?”

নানামি জানে জেনিন যা বলে তা করে ছাড়ে। সে একপ্রকার বাধ্য হয়েই জেনিনের সাথে হাঁটা দিল। এই হলো তাদের বন্ধুত্বের ধরণ। জেনিন হলো সেই তুফান যে সবাইকে উড়িয়ে নিয়ে যেতে চায়, আর নানামি হলো সেই নোঙর যে জেনিনকে বিপদে পড়ার হাত থেকে বাঁচিয়ে রাখে।

স্কুলের পেছনের দেওয়ালটা বেশ উঁচু। কিন্তু জেনিনের জন্য সেটা কোনো বাধাই নয়। সে এক লাফে ওপরে উঠে গেল এবং নানামির দিকে হাত বাড়িয়ে দিল। নানামি যখন দেওয়াল টপকে নিচে নামল, তার প্যান্টে একটু কাদা লেগে গেল। সে খুব বিরক্ত হলো, কিন্তু জেনিনের সেই আকাশ ফাটানো হাসি দেখে তার বিরক্তি যেন মুহূর্তেই উবে গেল।

“দেখ জায়দান, এই যে আমরা দেওয়াল টপকালাম, এটাই হলো স্বাধীনতা। বইয়ের পাতার মধ্যে কোনো স্বাধীনতা নেই রে দোস্ত!” জেনিন রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে বুক ভরে শ্বাস নিয়ে বলল।

জেনিন নুরশাদ আসলে কোনো নিয়ম মানতে জন্মায়নি। সে ছিল এক ভবঘুরে আত্মা। তার বাবা একজন বড় ব্যবসায়ী, বাড়িতে অঢেল টাকা, কিন্তু জেনিনের টান ছিল রাস্তার ধুলোবালিতে। সে মাঝেমধ্যেই নিরুদ্দেশ হয়ে যেত। কখনো কোনো বস্তির ছেলেদের সাথে ফুটবল খেলত, কখনো আবার শহরের সবচেয়ে দামী রেস্টুরেন্টে গিয়ে বিল না দিয়ে পালিয়ে আসত, শুধু উত্তেজনার খোঁজে। আর এই সব পাগলামির একমাত্র সাক্ষী এবং রক্ষক ছিল নানামি জায়দান।

একবার জেনিন পাড়ার এক মাস্তানের সাথে ঝামেলা করে বসল। মাস্তানটা ছিল জেনিনের চেয়ে বয়সে অনেক বড় এবং দুর্ধর্ষ। জেনিন একা গিয়ে তাকে চ্যালেঞ্জ করে এসেছিল কারণ ওই মাস্তানটা এক ছোট ছেলেকে চড় মেরেছিল। খবর পেয়ে নানামি যখন ঘটনাস্থলে পৌঁছাল, দেখল জেনিন রক্তমাখা ঠোঁট নিয়ে হাসছে আর সেই মাস্তানটা মাটিতে পড়ে আছে।
“তুই পাগল হয়ে গেছিস? ও যদি তোকে ছুরি মারত?” নানামি সেদিন প্রথমবার জেনিনের ওপর চিৎকার করেছিল।

জেনিন নানামির দিকে তাকিয়ে অদ্ভুত এক চোখে তাকিয়ে বলেছিল, “মরতে তো হবেই একদিন নানামি। কিন্তু কাপুরুষের মতো মরে লাভ কী? তুই তো আমার সাথে আছিসই, আমার কিছু হলে তুই ঠিক সামলে নিবি।”

নানামি সেদিন বুঝেছিল, জেনিন তাকে নিজের জীবনের চেয়েও বেশি বিশ্বাস করে। জেনিনের এই দাপট আর বাউন্ডুলে স্বভাবের নিচে একটা নিঃসঙ্গ হৃদয় ছিল, যা কেবল নানামিই বুঝতে পারত। জেনিনের বাবা-মা তাকে টাকা দিত, কিন্তু সময় দিত না। আর সেই শূন্যতা সে পূরণ করত নানামির সাথে সারাদিন কাটানো আর রাস্তার সাথে মিতালি করে।

অন্যদিকে, নানামি ছিল এক নিঃসঙ্গ তাত্ত্বিক। তার জীবনে সবকিছু ছিল হিসাব করা। কিন্তু জেনিনের ছোঁয়ায় তার সেই হিসাবের খাতা মাঝেমধ্যেই ওলটপালট হয়ে যেত। নানামি জেনিনকে পড়াশোনা করাত, পরীক্ষার আগে নোট লিখে দিত, এমনকি জেনিনের হয়ে মিথ্যা অজুহাত দিত টিচারদের কাছে।

তাদের এই বন্ধুত্ব ছিল স্কুলের কিংবদন্তি। সবাই বলত, জেনিন আর নানামি হলো এক মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। একজন ছাড়া অন্যজন অসম্পূর্ণ।

<><><><><><><><><>

সেদিন আবহাওয়াটা ছিল একদম অন্যরকম। শরতের মাঝামাঝি, আকাশে পেঁজা তুলোর মতো মেঘ আর বাতাসে শিউলি ফুলের একটা হালকা ঘ্রাণ। সেন্ট জুড হাই স্কুলের গেট দিয়ে প্রতিদিন শত শত ছেলেমেয়ে ঢোকে, কিন্তু সেদিন যে মেয়েটি ভেতরে পা রাখল, তাকে দেখার পর স্কুলের সেই পুরনো বটগাছটার পাতারাও যেন থমকে গিয়েছিল।

নাম তার নোবারা আকারি। ক্লাস নাইনের নতুন জয়েন করা স্টুডেন্ট।

জেনিন আর নানামি তখন দোতলার বারান্দায় রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে ছিল। জেনিনের হাতে ছিল একটা আধখাওয়া আপেল, আর নানামির হাতে তার সেই চিরচেনা ফিজিক্স বই। জেনিন কথা বলছিল তার পরবর্তী কোনো এক ‘মিশন’ নিয়ে, হয়তো কোনো সিনেমা দেখতে যাওয়ার পরিকল্পনা। কিন্তু হঠাৎ করেই জেনিনের কথাগুলো থেমে গেল। তার হাতের আপেলটা মেঝেতে পড়ে গেল, কিন্তু সেদিকে তার বিন্দুমাত্র খেয়াল রইল না।

“ঐ… ঐ মেয়েটা কে রে?” জেনিনের গলার স্বর হঠাৎ করেই গম্ভীর হয়ে এল।

নানামি বই থেকে চোখ তুলে নিচের দিকে তাকালো। স্কুল গেট দিয়ে হেঁটে আসছে নীল রঙা কামিজ পরা এক কিশোরী। চুলগুলো কাঁধের ওপর ছেড়ে দেওয়া, আর কাঁধে স্কুল ব্যাগ। নোবারার গায়ের রঙ যেন শরতের সকালের নরম রোদ। সে যখন হাসছিল, মনে হচ্ছিলো চারপাশে হাজারটা রূপালি বেলুন একসাথে আকাশে উড়ছে। তার দুধে-আলতা চেহারায় এক ধরনের আভিজাত্য ছিল, যা এই বয়সের সাধারণ মেয়েদের মধ্যে দেখা যায় না।

নোবারা আকারি যেন কোনো এক রূপকথার পাতা ছিঁড়ে বাস্তবে চলে আসা এক রাজকন্যা। তার চোখের মণি দুটো ছিল অদ্ভুত বাদামী রঙের, যেখানে তাকালে মনে হয় এক গভীর হ্রদে ডুবে যাওয়া ছাড়া আর কোনো গতি নেই।

নানামি, যে সবসময় নিজেকে খুব সংযত রাখত, সে-ও কয়েক সেকেন্ডের জন্য পলক ফেলতে ভুলে গেল। তার মেপে চলা জীবনে এই প্রথম এমন কিছু ঘটল যা কোনো গাণিতিক সূত্র দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। নানামির মনে হলো, তার হৃদপিণ্ডের স্পন্দন কয়েক মুহূর্তের জন্য থমকে গিয়ে আবার দ্বিগুণ বেগে ধুকপুক করতে শুরু করেছে।

“নাম কী ওর?” নানামি নিজের অজান্তেই বিড়বিড় করে উঠল।

জেনিন এতক্ষণ পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। এবার সে একটু নড়েচড়ে বসল। তার ঠোঁটের কোণে সেই চেনা দাপুটে হাসিটা ফিরে এসেছে, কিন্তু এবার হাসিটা একটু ভিন্ন। এতে কোনো তাচ্ছিল্য নেই, বরং আছে এক অদ্ভুত প্রাপ্তির নেশা।

“নোবারা। নোবারা আকারি।” জেনিন নামটা এমনভাবে উচ্চারণ করল যেন সে কোনো মন্ত্র জপছে। “নতুন ভর্তি হয়েছে ক্লাস নাইনে। বাপের ট্রান্সফারেবল জব, এই মাসেই এসেছে।”

নানামি অবাক হয়ে জেনিনের দিকে তাকালো। “তুই এত কিছু এর মধ্যেই জেনে গেলি?”

জেনিন হাসল। এক রোমাঞ্চকর হাসি। “জেনিন নুরশাদ যা পছন্দ করে, তার আগাগোড়া সব জানতে তার এক মিনিটের বেশি সময় লাগে না। দেখ ওকে… কী অদ্ভুতভাবে হাঁটছে, তাই না? যেন মাটিও ভয় পাচ্ছে ওর পায়ের ছোঁয়ায় যদি ব্যথা লাগে।”

নোবারা তখন মাঠ পেরিয়ে অফিসের দিকে যাচ্ছিল। সে একবার উপরের দিকে তাকালো। বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা দুই বন্ধুর সাথে তার চোখাচোখি হলো কয়েক মুহূর্তের জন্য। নোবারার সেই এক চিলতে চাহনি যেন জেনিন আর নানামির মনের গহীন কোণে এক দীর্ঘস্থায়ী আঁচড় কেটে দিয়ে গেল। নোবারা একটু লাজুক হেসে মাথা নিচু করে চলে গেল। কিন্তু সেই হাসিটাই ছিল বিপদের সংকেত।

জেনিন তার কাঁধের ব্যাগটা ঠিক করে নিয়ে বলল, “জানিস জায়দান, আমি জীবনে অনেক দামি জিনিস দেখেছি। কিন্তু এই মেয়েটা… ও অন্যরকম। ও কোনো সাধারণ হীরা নয়, ও হলো সেই কোহিনূর যার জন্য যুদ্ধ করা যায়।”

নানামি কোনো উত্তর দিল না। সে আবার বইয়ের পাতায় চোখ রাখল, কিন্তু অক্ষরগুলো সব ঝাপসা হয়ে যাচ্ছিল। তার ভেতরে এক অদ্ভুত অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। সে জানত জেনিন যা বলে তা করে দেখায়। জেনিন যখন কাউকে লক্ষ্য বানায়, সে যে কোনো মূল্যে তাকে জয় করতে চায়। কিন্তু এবার নানামির নিজের মনের অবস্থাটা সে বুঝতে পারছিল না। কেন জানি না, নোবারাকে দেখে তার মনে হলো, এই মেয়েটির হাসির পাশে সে সারা জীবন কাটিয়ে দিতে পারে।

পরের কয়েকটা দিন স্কুলের পরিবেশটাই বদলে গেল। নোবারা আকারি আসার পর থেকে জেনিনের বাউন্ডুলেপনা যেন আরও বেড়ে গেল, তবে এবার তা একটু পরিপাটি। জেনিন এখন প্রতিদিন নিয়ম করে স্কুল আসে, ক্লাস ফাঁকি দেয় না, তবে ক্লাসের দিকে নয়, তার নজর থাকে নাইনের সেকশন-এ’র জানালার দিকে। সে এখন আর বাউন্ডুলেদের মতো আড্ডা দেয় না, বরং নোবারার ক্লাসের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে শুধু এক ঝলক দেখার জন্য।

নোবারা ছিল খুব সহজ-সরল। সে সবার সাথে মিশত, কিন্তু তার চোখে সব সময় একটা দূরত্ব থাকত। সে জানত জেনিন নুরশাদ কে। সে জানত জেনিনের দাপটের কথা। কিন্তু সে জেনিনকে দেখে কখনো ভয় পেত না, বরং মাঝে মাঝে তার পাগলামি দেখে মুচকি হাসত। আর সেই হাসিটাই জেনিনকে আরও বেশি পাগল করে দিত।

অন্যদিকে নানামি তার ভালোবাসা প্রকাশ করত নীরবে। সে নোবারার জন্য লাইব্রেরি থেকে বই খুঁজে আনত, কোনো জটিল অংকের সমাধান করে দিত চিরকুটে। সে কখনো জেনিনের মতো সামনে গিয়ে দাঁড়াত না। সে ছায়ার মতো নোবারাকে আগলে রাখতে চাইল। নোবারা যখন নানামির দেওয়া সমাধানগুলো দেখত, তখন তার চোখে একটা শ্রদ্ধা ফুটে উঠত।

একদিন স্কুল ছুটির পর জেনিন আর নানামি একসাথে সাইকেল নিয়ে ফিরছিল। রাস্তার ধারে কাশফুলগুলো দুলছে। জেনিন হঠাৎ ব্রেক কষে থামল।

“জায়দান, একটা কথা বলবি?” জেনিনের স্বরটা আজ খুব সিরিয়াস।

“বল।”

“নোবারা… ও কি আমাকে কখনো পছন্দ করবে? মানে, আমি তো একটু অগোছালো, রাগ বেশি। ওর মতো শান্ত মেয়ে কি আমার পাশে মানাবে?”

নানামি চমকে উঠল। এই প্রথম জেনিন নুরশাদ কে কোনো বিষয়ে আত্মবিশ্বাসের অভাবে ভুগতে দেখছে। নানামি চুপ করে রইল। সে কী বলবে? সে নিজেও কি একই কথা ভাবছে না? সে কি যোগ্য নোবারার?

“তোর পাশে তো যে কেউই মানাবে নুরশাদ। তুই তো সবার চেয়ে আলাদা,” নানামি খুব কষ্টে নিজেকে স্বাভাবিক রেখে বলল।

জেনিন নানামির পিঠ চাপড়ে দিয়ে বলল, “তুই আছিস বলেই আমি পারি দোস্ত। তুই আমাকে সাহায্য করবি তো? আমি ওকে পেতে চাই রে। ওকে না পেলে আমি বোধহয় মরেই যাব।”

নানামি বুক ফেটে যাওয়া এক দীর্ঘশ্বাস লুকালো। সে হাসল, এক ম্লান হাসি। “আছি তো। সবসময় আছি।”

সেদিন আকাশে লাল সূর্যটা ডুবছিল। আর সেই ডুবন্ত আলোর নিচে দুজন বন্ধু দাঁড়িয়ে ছিল, যাদের মাঝে এখন এক তৃতীয় ছায়া দীর্ঘতর হতে শুরু করেছে। জেনিন জানত না, তার সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী আসলে তার পাশেই দাঁড়িয়ে আছে। আর নানামি জানত না, তার প্রিয় বন্ধুর জন্য সে যে বলিদান দিচ্ছে, তা একদিন তাদের জীবনকে ছারখার করে দেবে।

নোবারা আকারি কেবল একটি মেয়ে ছিল না, সে ছিল এক অবাধ্য তুফান যা জেনিন আর নানামির জীবনের সব হিসেব ওলটপালট করতে শুরু করেছিল। জেনিনের হৃদয়ের বীজ হয়তো সেই মুগ্ধতা থেকেই জন্ম নিয়েছিল যেখানে সে শিখেছিল, যা সে ভালোবাসে, তা যে কোনো মূল্যে নিজের করে রাখতে হয়। আর নানামি শিখেছিল, ভালোবাসার আরেক নাম ত্যাগ—যে ত্যাগ শেষ পর্যন্ত তাকে একাকীত্বের এক অন্ধকার প্রকোষ্ঠে ঠেলে দেবে।

গল্প: #Soulmate_to_Enemy
#পর্ব_১
লেখনীতে: #মিফতাহুল_জান্নাত_জেমিম

চলবে ইংশাআল্লাহ……..

(আগেই বলে রাখছি, স্যাড এন্ডিং দিব না এটার। তবে পাঠক প্রতিক্রিয়া জানাবেন প্লিজ। যেহেতু রানিং অবস্থায়, তাই আমার একটু উৎসাহ প্রয়োজন লেখাটা আগাতে। এবং শতভাগ গ্যারান্টি দিলাম, সমাপ্তি তে হতাশ হবেন না। ইংশাআল্লাহ, আমি সমাপ্তিটা লিখতে পারবো। ধন্যবাদ পাঠকপ্রিয়)

(এডিট:- নানামি একজন ছেলে, নামগুলো আমার পছন্দের এনিমে থেকে নেওয়া, ওখানে নানামিকে দেখলে টাশকি খাবেন।
এনিমে:- জুজুৎসু কাইসেন।🙂🫶)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here