Soulmate_to_Enemy #পর্ব_৪৮

0
1

#Soulmate_to_Enemy
#পর্ব_৪৮
লেখনীতে: #মিফতাহুল_জান্নাত_জেমিম

নূরশাদ ভিলার বিশাল বাগানে আজ বসন্তের এক মাতাল হাওয়া বইছে। ভোরের শিশিরভেজা ঘাসের ওপর রোদের ঝিলিক যেন হিরে কুচির মতো জ্বলজ্বল করছে। জেনিন আজ অফিসে যায়নি। তার পরনে এক সাধারণ সাদা টি-শার্ট আর ট্রাউজার। হাতে বাগান করার কাঁচি আর এক বালতি জল। জেনিনের মতো এক দুর্ধর্ষ মাফিয়া সিইও-কে এভাবে হাঁটু গেড়ে মাটির সাথে সখ্যতা করতে দেখে যে কেউ অবাক হতে পারে, কিন্তু নোবারার কাছে এটিই জেনিনের আসল রূপ।

নোবারা এক হালকা হলদে রঙের সুতির শাড়ি পরেছে, চুলগুলো অবিন্যস্তভাবে পিঠের ওপর ছড়ানো। সে জেনিনের পাশে বসে চারাগাছগুলোর গোড়ায় মাটি আলগা করে দিচ্ছে। তাদের মধ্যে কোনো কথা হচ্ছে না, কিন্তু এই নীরবতার মাঝেও এক অদ্ভুত প্রশান্তি কাজ করছে। জেনিন যখন ঘেমে যাচ্ছে, নোবারা নিজের আঁচল দিয়ে আলতো করে জেনিনের কপাল মুছে দিচ্ছে। ঠিক তখনই ভিলার গেটে একটি পরিচিত গাড়ির শব্দ শোনা গেল।

গাড়ি থেকে নামল নানামি আর তনুজা। নানামির পরনে পুলিশের জাঁদরেল ইউনিফর্ম নেই, বরং এক সাধারণ শার্ট। কিন্তু তাঁর মুখটা আজ বড্ড ফ্যাকাসে। তনুজা তাঁর পেছনে হাঁটছে এক ছায়ার মতো। তনুজার চোখে সেই আগের মতোই এক গভীর বিষাদ, যা সে লুকানোর চেষ্টা করেও পারছে না। নানামি আর তনুজার সম্পর্কটা এখনো সেই ‘দায়িত্ব’ পালনের গণ্ডিতেই আটকে আছে। নানামি আজও তনুজার দিকে তাকিয়ে মন থেকে হাসতে পারেন না, আর তনুজা সেই অব্যক্ত যন্ত্রণায় তিল তিল করে পুড়ছে।

জেনিন আর নোবারা দুজনেই কাজ থামিয়ে উঠে দাঁড়াল। নোবারা যখন তনুজাকে দেখল, তার বুকের ভেতরটা হু হু করে উঠল। সে বুঝতে পারল, এই মেয়েটি এক আকাশ শূন্যতা নিয়ে বেঁচে আছে।

“আরে জায়দান! হঠাৎ এই সকালে?” জেনিন হাত বাড়িয়ে নানামিকে জড়িয়ে ধরল।

“ভাবলাম বন্ধুত্বের সেই কফিটা আজ তোর ওখানেই খাই,” নানামি একটু ম্লান হেসে বলল। তাঁর দৃষ্টি একবার নোবারার দিকে গিয়ে আবার তনুজার দিকে ফিরে এল।

নোবারা দ্রুত এগিয়ে গেল তনুজার দিকে। তনুজা একটু ইতস্তত করছিল, কারণ সে জানে নোবারাই নানামির হৃদয়ের সেই আদি ও অকৃত্রিম ভালোবাসা। কিন্তু নোবারার চোখে আজ কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা নেই, আছে শুধু একরাশ আপন করে নেওয়ার ব্যাকুলতা।

“তনু! তুমি আসবে জানলে আমি তো আগেই কিছু নাস্তা রেডি রাখতাম,” নোবারা তনুজার হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিল।

তনুজা অবাক হয়ে নোবারার দিকে তাকাল। ‘তনু’ সম্বোধনটা তার কানে যেন অমৃতের মতো শোনাল। এই নামে তাকে তার বড় বোন ডাকে। নোবারার এই সহজ সম্বোধন তনুজার সব জড়তা ভেঙে দিল।

“আমি…আসলে উনি আসছিলেন, তাই আমিও চলে এলাম। আপনাকে বিরক্ত করলাম না তো?” তনুজা খুব নিচু স্বরে বলল।

“একদম না! এসো আমার সাথে,” নোবারা জেনিন আর নানামিকে বাগানে রেখে তনুজাকে প্রায় টেনে নিয়ে গেল ভিলার ভেতরের দিকে।

নোবারা তনুজাকে নিয়ে তার নিজের ব্যালকনিতে এল। সেখানে বসে পুরো বাগান দেখা যায়। নোবারা তনুজাকে সোফায় বসিয়ে নিজে তার পাশে বসল। তনুজা তখনো কেমন যেন জড়োসড়ো হয়ে আছে।
“তনু, আমার দিকে তাকাও,” নোবারা তনুজার মুখটা নিজের হাতের ওপর উঁচিয়ে ধরল। “তোমার এই ম্লান মুখ কেন?”

তনুজার বাঁধ ভেঙে গেল। সে এতদিন যার সামনে নিজেকে শক্ত করে রাখার চেষ্টা করেছে, সেই নোবারার এক মুহূর্তের স্পর্শে তার সবটুকু ধৈর্য ধুলোয় মিশে গেল। তনুজা ডুকরে কেঁদে উঠল নোবারার কাঁধে মাথা রেখে।

নোবারা তনুজার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগল। মাত্র কয়েকদিনের পরিচয়, অথচ তনুজা অনুভব করল—এই পৃথিবীতে যদি কেউ তাকে বুঝতে পারে, সে এই নোবারাই। নোবারার শরীরের সেই পবিত্র ঘ্রাণ আর তার হাতের কোমলতা তনুজাকে এক পরম নিরাপত্তা দিল। সে যেন এক বড় বোন বা বান্ধবীর আশ্রয় পেল।

“কেঁদো না। আমি জানি নানামি ভাইয়া একটু একরোখা। কিন্তু ও মানুষটা খারাপ নয়। ও শুধু নিজের ইগোর সাথে যুদ্ধ করছে,” নোবারা শান্ত গলায় বলল।

“আমি আর পারছি না নোবারা,” তনুজা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলল। “আমার মনে হয় আমি আপনার আর উনার মাঝখানে একটা দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে আছি। উনি যখনই আমাকে দেখেন, উনার চোখে অপরাধবোধ জাগে। আমি এই দায়ভার আর নিতে পারছি না।”

নোবারা তনুজার চোখের জল মুছে দিল। “তুমি ভুল ভাবছ। তুমি নানামি ভাইয়ের বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ। আমি তো কেবল একটা পুরোনো স্মৃতি, যা সময়ের সাথে সাথে ধূসর হয়ে গেছে।”

নিচে বাগানে বসে কফি খেতে খেতে জেনিন আর নানামি ওপরে ব্যালকনির দিকে তাকাল। তারা দেখল দুই নারী নিবিড়ভাবে কথা বলছে। জেনিন অবাক হয়ে দেখল নোবারা কীভাবে অবলীলায় তনুজাকে নিজের বুকে টেনে নিয়েছে। যে তনুজা নানামির কাছে আসতে ইতস্তত করে, সে আজ নোবারার কাঁধে মাথা রেখে শান্তি খুঁজছে।

“তোর নূরাটা বড্ড অদ্ভুত নুরশাদ” নানামি কফির কাপে চুমুক দিয়ে বলল। “ও কীভাবে সবাইকে এত সহজে আপন করে নেয়? তনুজা তো আমার সামনেও ওভাবে কাঁদতে পারে না।”

জেনিন হাসল। তার চোখে আজ এক গর্বের ঝিলিক। “সেটাই তো ওর জাদু। নূরা সবসময় সবাইকে আগলে রাখতে ভালোবাসে।”

নানামি মাথা নিচু করল। সে বুঝতে পারল, সে জেনিন আর নোবারার প্রেমের উচ্চতার চেয়ে অনেক নিচে পড়ে আছে। জেনিন যে উদারতা দেখিয়ে নোবারাকে নিজের করে নিয়েছে, নানামি সেই উদারতা দেখাতে পারছে না তনুজার প্রতি। সে আজও নিজের অতীতকে আঁকড়ে ধরে বর্তমানকে কষ্ট দিচ্ছে।

“তোর কি মনে হয় নুরশাদ, আমি তনুজাকে খুশি রাখতে পারব?” নানামি খুব অসহায়ভাবে জিজ্ঞেস করল।

“তুই যদি চাস, তবে অবশ্যই পারবি,” জেনিন গম্ভীর গলায় বলল। “নোবারাকে দেখ। ও আজ তনুজাকে কাছে টেনে নিয়েছে। ও যদি পারে, তুই কেন পারবি না?”

নোবারা আর তনুজার গভীর আলাপচারিতা করতে করতে নিচে নেমে এলো। তখনই তাদের মাঝে হঠাৎ করেই সেখানে হাজির হলো ইউজি আর নীলিমা।

ইউজি আজ তার চিরচেনা হুডি ছেড়ে একটা হালকা চেক শার্ট পরেছে, যাতে তাকে বেশ মার্জিত লাগছে। তার পাশে নীলিমা…পরনে একটি কালো রঙের কামিজ, চোখেমুখে এক ধরণের লাজুক আভা। ইউজি নীলিমাকে তার বাসা থেকে এক প্রকার জোর করেই নিয়ে এসেছে। যদিও তারা এখনো একে অপরকে আনুষ্ঠানিকভাবে ভালোবাসি্যবলেনি, কিন্তু তাদের পাশাপাশি দাঁড়ানো ভঙ্গি আর নীলিমার দিকে ইউজির চুরিকৃত চাহনি বলে দিচ্ছিল…মন দেওয়া-নেওয়ার কাজটা প্রায় শেষ পর্যায়ে।

ইউজি নীলিমাকে নিয়ে নোবারার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। “ম্যাম, আপনার দেওয়া অ্যাসাইনমেন্ট কমপ্লিট। নীলিমাকে নিয়ে এসেছি।”

নোবারা খুশিতে নীলিমাকে জড়িয়ে ধরল। “খুব ভালো করেছ। এসো নীলিমা, পরিচয় করিয়ে দিই। ও তনুজা, নানামি ভাইয়ার স্ত্রী। আর তনুজা, ও নীলিমা
..ইউজির বিশেষ কেউ।”

নীলিমা আর তনুজা একে অপরের দিকে তাকিয়ে ম্লান হাসল। তনুজা নীলিমার চোখের সেই মুগ্ধতা দেখে নিজের পুরনো দিনের কথা মনে করল। নোবারা তনুজাকে নীলিমার সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার সময় এমন এক পরিবেশ তৈরি করল যে, তনুজা এক মুহূর্তের জন্যও নিজেকে বহিরাগত মনে করল না। নোবারার এই যে আগলে রাখার ক্ষমতা, তা দেখে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা জেনিন আর নানামি দুজনেই স্তব্ধ হয়ে রইল।

“জেনিন,” নোবারা হঠাৎ ঘুরে জেনিনকে ডাকল। “অনেক তো বাগান করা হলো। আজ কি আমাদের শ্যুটিং শেখাবেন না? তনুজা আর নীলিমাও কিন্তু শিখতে চায়।”

“ঠিক আছে,” জেনিন গম্ভীর অথচ কোমল গলায় বলল। “সবাই রেঞ্জে চলো। ইউজি, সেফটি গিয়ারগুলো বের করো।”

শ্যুটিং রেঞ্জে এসে জেনিন নিজের প্রিয় কাস্টমাইজড পিস্তলটি হাতে নিল। সে নোবারার পেছনে গিয়ে দাঁড়ালো। নোবারার কাঁধের ওপর দিয়ে হাত বাড়িয়ে সে পিস্তলটা ধরার কায়দা শিখিয়ে দিতে লাগল। জেনিনের শরীরের উষ্ণতা আর তার ঘন নিশ্বাস নোবারার ঘাড়ে লাগছিল। জেনিন নোবারার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“আপনার নিশানা যেন আজ বিচ্যুত না হয়। আমার ট্রেনিং এর উপর প্রশ্ন উঠবে নাহয়!”

নোবারা হাসল। সে ট্রিগার টিপল..সরাসরি বুলস-আই! জেনিন নোবারার কপালে একটা আলতো চুমু খেল।

অন্যদিকে, নানামি তনুজাকে শেখানোর চেষ্টা করছিল। সে তনুজার হাত ধরল ঠিকই, কিন্তু তাদের মাঝে সেই জড়তা রয়েই গেল। নানামি যখন তনুজাকে পজিশন ঠিক করে দিচ্ছিল, তনুজা অপলক দৃষ্টিতে জেনিন আর নোবারার দিকে তাকিয়ে ছিল। সে দেখছিল জেনিন কীভাবে নোবারার প্রতিটি চুল ঠিক করে দিচ্ছে, কীভাবে তাকে সাহস দিচ্ছে। তনুজার দীর্ঘশ্বাসটা আবার বেরিয়ে আসতে চাইল, কিন্তু এবার নোবারা তাকে ইশারা করল।

“তনুজা, ভয় পেও না! নানামি ভাইয়া তোমাকে খুব ভালো শেখাবে,” নোবারা উৎসাহ দিল।

নানামি এবার একটু সচেতন হলো। সে তনুজার কোমরে হাত দিয়ে তাকে একটু সোজা করে দাঁড় করিয়ে দিল। “স্রেফ সামনের টার্গেটটা দেখো।” তনুজা প্রথমবারের মতো নানামির স্পর্শে এক ধরণের অধিকারবোধ খুঁজে পেল। সে গুলি ছুড়ল…লক্ষ্যভ্রষ্ট হলো ঠিকই, কিন্তু নানামি এবার বিরক্ত না হয়ে হেসে ফেলল।

“প্রথমবার সবারই এমন হয়। আবার চেষ্টা করো,” নানামি খুব নরম গলায় বলল।

ইউজি আর নীলিমা একপাশে দাঁড়িয়ে ছিল। ইউজি নীলিমাকে একটা ছোট রিভলভার এগিয়ে দিল। “নীলিমা, এটা ধরো। আমি আপনাকে শিখিয়ে দিচ্ছি।” ইউজি নীলিমার খুব কাছে গিয়ে দাঁড়ালো। নীলিমা লজ্জায় লাল হয়ে গেল। জেনিন একবার আড়চোখে ইউজিকে দেখল এবং মৃদু হাসল। তার রাইট হ্যান্ড এর প্রেমলীলা দেখতে ভালোই লাগছে।

পুরো সময়টাতে একটা বিষয় খুব স্পষ্ট ছিল…জেনিন নূরশাদের দৃষ্টি। নীলিমা যখন ভুল করে জেনিনের দিকে তাকিয়ে সাহায্যের ইঙ্গিত দিল, জেনিন স্রেফ মাথা নিচু করে নোবারার পিস্তলের ম্যাগাজিন লোড করতে থাকল। সে নীলিমার দিকে তাকালোই না। এমনকি তনুজা যখন জেনিনকে একটা টেকনিক নিয়ে প্রশ্ন করল, জেনিন খুব সংক্ষেপে উত্তর দিয়ে আবার নোবারার আঁচল ঠিক করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।

তনুজা মনে মনে ভাবল, ‘এমন ভালোবাসা কি সত্যিই সম্ভব? যেখানে পৃথিবীর অন্য সব নারী তার কাছে অদৃশ্য?’ সে দেখল নোবারা যখন হাসছে, জেনিন স্রেফ সেই হাসির দিকে তাকিয়ে থাকছে, যেন ওই হাসিটাই তার বেঁচে থাকার রসদ।

নোবারা হঠাৎ পিস্তলটা নামিয়ে জেনিনের গলা জড়িয়ে ধরল। “আমি জিতেছি জেনিন! এবার বলুন আমার পুরস্কার কী?”

জেনিন নোবারার কোমর জড়িয়ে ধরে সবার সামনেই তাকে একটু উঁচিয়ে ধরল। “পুরস্কার? জেনিন নূরশাদের সাম্রাজ্যের চাবি তো আপনার কাছেই আছে। এর চেয়ে বড় পুরস্কার আর কী হতে পারে?”

ইউজি হাততালি দিয়ে উঠল। নানামিও ম্লান হাসল। আজ এই শ্যুটিং রেঞ্জে কেবল গুলি চলল না, চলল হৃদয়ের মেলবন্ধন। নোবারার সেই অকৃত্রিম সরলতা আর সবাইকে আগলে রাখার ক্ষমতা আজ তনুজাকে এক নতুন দিশা দিল। তনুজা অনুভব করল, সে আর একা নয়। এই ভিলাতে তার একজন বড় বোন আছে, যে তাকে জীবনকে নতুন করে ভালোবাসতে শেখাবে।

দুপুর গড়িয়ে আসছে। জেনিন নোবারার হাত ধরে রেঞ্জ থেকে বেরিয়ে আসছিল। নানামি তনুজার হাতটা একটু শক্ত করে ধরল—হয়তো জেনিনকে দেখেই সে আজ একটু সাহস সঞ্চয় করল।

<><><><><><><><><>

বিকেল চারটা। ডাইনিং রুমের মধ্যাহ্নভোজ শেষ করে সবাই এখন বিশাল লিভিং রুমে এসে জড়ো হয়েছে। এই রুমটি জেনিন নিজের একান্ত সময়ের জন্য বানিয়েছিল…চারপাশে বইয়ের তাক, নরম ভেলভেটের সোফা আর ঘরের এক কোণে রাখা একটি পুরোনো আমলের গ্রামোফোন। বাইরে রোদের তেজ বাড়লেও ঘরের ভেতরে এক স্নিগ্ধ শীতলতা বিরাজ করছে।

নোবারা সবার জন্য কফি নিয়ে এল। সে নীলিমা আর তনুজাকে নিজের দুই পাশে বসিয়েছে। জেনিন আর নানামি মুখোমুখি দুটো সোফায় বসা, আর ইউজি নীলিমার কাছাকাছি একটা কুশনে মেঝের ওপর বসে আছে। জেনিন আজও অবাক হয়ে দেখছে নোবারার এই রূপ। সে মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে তনুজা আর নীলিমাকে এমনভাবে আপন করে নিয়েছে যেন তারা বহু বছরের চেনা।

“এভাবে গম্ভীর হয়ে বসে থাকলে চলবে না,” নোবারা কফির কাপ নামিয়ে রেখে বলল। “চলুন, আমরা একটা গেইম খেলি।”

জেনিন ভ্রু কুঁচকে তাকাল। “নূরা, আপনি জানেন আমি এসব একদম পছন্দ করি না। তার চেয়ে বরং আমরা বিজনেস বা শহরের অবস্থা নিয়ে কথা বলি?”

“উহু!” নোবারা জেনিনের ঠোঁটে আঙুল দিয়ে থামিয়ে দিল। “এসব নয়। চলুন, আমরা স্মৃতি রোমন্থন খেলি। ছোটবেলার কোনো একটা মজার ঘটনা বলতে হবে যা অন্য কেউ জানে না। যার গল্প সবচাইতে ভালো হবে, সে আজ বিকেলের চা বানানোর দায়িত্ব থেকে মুক্তি পাবে।”

ইউজি হাততালি দিয়ে উঠল। “ম্যাম, আইডিয়াটা দারুণ! আমি শুরু করতে পারি?”

নীলিমা লাজুক হেসে ইউজির দিকে তাকাল। ইউজি খুব সহজভাবে নিজের শৈশবের একটা গল্প বলতে শুরু করল…কীভাবে সে একবার স্কুলের টিফিন পিরিয়ডে স্যারের সাইকেলের চাকার হাওয়া ছেড়ে দিয়েছিল শুধু এক বন্ধুর অপমানের শোধ নিতে। তার বলার ভঙ্গিতে তনুজাও শব্দ করে হেসে ফেলল। তনুজার অকৃত্রিম হাসি দেখে নানামি এক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে রইল। সে মনে মনে ভাবল, ‘এই মেয়েটি তো হাসলে কত সুন্দর লাগে, অথচ আমি এতো দিন ধরে ওকে শুধু কাঁদিয়েছি।’

এবার তনুজার পালা। তনুজা প্রথমে একটু ইতস্তত করছিল, কিন্তু নোবারা তার হাতটা আলতো করে চেপে ধরে সাহস দিল। তনুজা খুব ধীর স্বরে তাঁর ছোটবেলার এক বর্ষা বিকেলের গল্প বলল, যখন সে তাঁর বাবার সাথে বৃষ্টিতে ভিজে ফুটবল খেলেছিল।

গল্পটা খুব সাধারণ হলেও তনুজার বলার মাঝে এক ধরণের আবেগ ছিল। সে যখন কথা বলছিল, নানামি অপলক দৃষ্টিতে তাঁর দিকে তাকিয়ে ছিলেন। জেনিন লক্ষ্য করল, নানামির চোখের কঠোরতা একটু একটু করে গলে যাচ্ছে। গলতেই হবে। তনুজার মতো এতো মিষ্টি একটা মেয়েকে আর কত কষ্ট দিবে!

“এবার আপনার পালা,” নোবারা জেনিনের বাহুতে ধাক্কা দিল।

জেনিন একটু ম্লান হাসল। “আমার শৈশবের গল্প তো জায়দান সব জানে। তবে একটা কথা বলি…আমি হাইস্কুলে থাকতে একবার নোবারার জন্য স্কুল ফাঁকি দিয়ে দুই মাইল হেঁটে এক বিশেষ ধরণের কলম কিনতে গিয়েছিলাম। কারণ নোবারা বলেছিল, ওই কলম ছাড়া সে ভালো নোট নিতে পারে না।”

নানামি হেসে উঠল। “হ্যাঁ, আর সেই চক্করে তুই স্যারের কাছে বেত খেয়েছিলি, কিন্তু নোবারাকে সেটা কোনোদিন জানতে দিসনি।”

নোবারা অবাক হয়ে জেনিনের দিকে তাকাল। “আপনি তো আমায় এটা কোনোদিন বলেননি!”

জেনিন নোবারার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে খুব নিচু স্বরে বলল, “কিছু স্মৃতি নিজের কাছে রাখতেই বেশি ভালো লাগে নূরা।”

খেলার মাঝপথেই দেখা গেল ইউজি নীলিমার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে কিছু একটা বলছে। নীলিমা লজ্জায় লাল হয়ে মাথা নিচু করে হাসছে। তারা এখনো কোনো সম্পর্কে জড়ায়নি ঠিকই, কিন্তু তাদের এই মৌন সম্মতি আর চোখের ভাষা বলে দিচ্ছিল যে জেনিন নূরশাদ আর নানামির পর এই ভিলার পরবর্তী প্রেমের গল্পটা তাদেরই হবে।

নীলিমা তনুজাকে খুব সহজভাবে বোন সম্বোধন করে কথা বলছিল। তনুজা এই প্রথম নিজেকে এক বিশাল পরিবারের অংশ মনে করল। সে দেখল নোবারা কীভাবে নীলিমাকে আগলে রাখছে, কীভাবে তাঁর চুলের কাঁটা ঠিক করে দিচ্ছে। নোবারার এই যে কোনো ভেদাভেদ ছাড়া সবাইকে আপন করে নেওয়ার ক্ষমতা, তা আজ এই চারজন মানুষের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিল।

“চলুন, এবার একটু গান শোনা যাক,” নোবারা উঠে গিয়ে সেই পুরোনো গ্রামোফোনটি চালু করল।

ঘরটি একটি মায়াবী সুরে ভরে উঠল। জেনিন উঠে গিয়ে নোবারার হাত ধরল। তারা দুজনে খুব ধীর ছন্দে নাচতে শুরু করল। নানামিও আজ সাহস সঞ্চয় করে তনুজার দিকে হাত বাড়িয়ে দিল। তনুজা বিস্ময়ে নানামির দিকে তাকাল, তারপর খুব ধীরে নিজের হাতটি নানামির হাতের ওপর রাখল।

ইউজি আর নীলিমা একপাশে দাঁড়িয়ে এই দৃশ্য দেখছিল। ইউজি নীলিমার দিকে তাকিয়ে মৃদু স্বরে বলল, “আমাদের জীবনটাও কি এমন সুন্দর হবে?”

নীলিমা উত্তর দিল না, শুধু ইউজির চোখের দিকে তাকিয়ে ম্লান হাসল। সেই হাসিতেই লুকিয়ে ছিল হাজারো উত্তর।

সূর্য যখন পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়ছে, তখন সবাই মিলে ভিলার ছাদে গিয়ে দাঁড়ালো। ঢাকার আকাশটা আজ বড্ড স্বচ্ছ। জেনিন নোবারার পেছনে দাঁড়িয়ে তাঁকে জড়িয়ে ধরে আছে। নানামি আর তনুজা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে বিকেলের হাওয়া উপভোগ করছে। নীলিমা আর ইউজি একটু দূরে দাঁড়িয়ে খুনসুটি করছে।

আজকের এই দিনটি কেবল একটি সাধারণ পুনর্মিলন ছিল না। এটি ছিল ভাঙা হৃদয়ের জোড়া লাগার দিন। নোবারার সরলতা আর নিঃস্বার্থ ভালোবাসা আজ নানামির মনের দীর্ঘদিনের জট খুলে দিয়েছে। তনুজা আজ প্রথমবার নিজের স্বামীর চোখে হারানো মায়া ফিরে পেয়েছে।

জেনিন নোবারার কানে ফিসফিস করে বলল, “নূরা, আপনি সত্যিই এক জাদুকরী। আপনি আজ শুধু তনুজাকে আশ্রয় দেননি, আপনি নানামিকে ওর নিজের কাছে ফিরিয়ে দিয়েছেন।”

নোবারা জেনিনের কাঁধে মাথা রেখে বলল, “ভালোবাসা তো এভাবেই কাজ করে। এটা কাউকে একা করে না, বরং সবাইকে এক সুতোয় বেঁধে ফেলে।”

চলবে ইংশাআল্লাহ।।।।।।।

(খুব ভালো লাগছে না ওদের এতো সুন্দর সুন্দর মুহূর্ত পড়তে??? হুঁ?? ৫০ পর্বের পর প্রতিটা পর্ব পড়ার সময় নিঃশ্বাস আটকে রাখবেন এই বলে রাখলাম। হিহি)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here