#Soulmate_to_Enemy |৬০|
লেখনীতে: #মিফতাহুল_জান্নাত_জেমিম
বাইপাস ভিলা, চট্টগ্রাম। পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত এই প্রাসাদে সাগরের গর্জন পৌঁছায় কেবল এক দূরবর্তী গুঞ্জনের মতো। গতরাতের বিভীষিকাময় রক্তপাত, বিস্ফোরণ আর বেইমানির ধুলোবালি ভোরের শিশিরে ধুয়ে মুছে গেছে। পুব আকাশে সূর্য উঠছে ধীর পায়ে, তার কমলা আভা ভিলার কাঁচের দেয়ালে আছড়ে পড়ে এক মায়াবী প্রতিচ্ছবি তৈরি করছে। কিন্তু এই সৌন্দর্যের ভেতরেও এক জমাটবদ্ধ বিষাদ আর গুমোট অভিমান পাহাড়ি কুয়াশার মতো থমকে আছে।
জেনিন নূরশাদ তার ব্যালকনির রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে ছিল। তার পরনে একটা ঢিলেঢালা কালো পাজামা আর গ্রে কালারের টি-শার্ট। ব্যান্ডেজের নিচ দিয়ে তার ঘাড়ের ক্ষতটা এখনো মাঝে মাঝে চিনচিন করে উঠছে, কিন্তু সেই শারীরিক যন্ত্রণার চেয়েও মনের গহীন কোণে যে ক্ষতটা আজ চাড়া দিয়ে উঠেছে, তা অসহ্য। নোবারা, তার নূরা, একজন সিআইডি অফিসার। যে মানুষটাকে সে নিজের প্রাণ দিয়ে আগলে রেখেছিল, যার চোখের এক ফোঁটা জলের জন্য সে পুরো শহর জ্বালিয়ে দিতে পারত, সেই মানুষটা আসলে তার সাম্রাজ্যের ভিত উপড়ে ফেলতে এসেছিল। জেনিন এখন জানে নোবারা তাকে ভালোবাসে, কিন্তু এই যে পরিচয়ের বিভেদ, এই যে পেশাদারী মিথ্যের দেয়াল, তা জেনিনের মতো একরোখা পুরুষের আত্মসম্মানে এক গভীর আঘাত দিয়েছে। নোবারা কেন এতো দিন সবটা আড়াল করে রেখেছিল? নিজ থেকে এসে বললে কি জেনিন ক্ষমা করতো না? হয়তো এটা জেনিনের অভিমান, বা হয়তো রাগ, যা তার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে।
পেছন থেকে খুব মৃদু পায়ের শব্দ পাওয়া গেল। জেনিন না ফিরেই বুঝতে পারল ওটা কে। এই হাঁটার ছন্দ, এই নিশ্বাসের ঘ্রাণ তার পরিচিত।
নোবারা ধীর পায়ে ব্যালকনিতে এসে দাঁড়াল। তার পরনে সাধারণ একটা সুতির সালোয়ার কামিজ, চুলগুলো পিঠের ওপর ছড়ানো। গত কয়েকদিনের ধকল তার মুখটাকে ফ্যাকাশে করে দিয়েছে, চোখের নিচে কালচে ছায়া। সে জেনিনের থেকে হাত তিনেক দূরে দাঁড়িয়ে রইল। জেনিন নড়ল না, ফিরেও তাকাল না। সে যেন আকাশের নীলিমার মধ্যে নিজের হারানো বিশ্বাস খুঁজছে।
নোবারা অনেকক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকার পর কাঁপা গলায় ডাকল, “জেনিন?”
জেনিন কোনো উত্তর দিল না। তার চোয়াল শক্ত হয়ে এল। সে রেলিংয়ের ওপর রাখা তার হাত দুটো মুষ্টিবদ্ধ করল। জেনিন নিজেকে শাসন করছে। সে জানে, যদি সে এখন নোবারার দিকে তাকায়, তবে তার সব রাগ জল হয়ে যাবে। তার দুর্ধর্ষ মাফিয়া ব্যক্তিত্ব নোবারার ওই অসহায় চোখের কাছে হাঁটু গেড়ে বসে পড়বে। আর জেনিন সেটা চায় না। সে চায় নোবারা বুঝুক, মিথ্যে দিয়ে ঘর বাঁধা যায়, কিন্তু বিশ্বাস গড়া যায় না।
নোবারা আরও এক কদম এগিয়ে এল। তার কণ্ঠস্বর এবার কান্নায় বুজে এল। “আপনি কি আমার সাথে কথা বলবেন না? প্লিজ কথা বলুন, রাগ দেখান, বকুন, শাসন করুন, চাইলে মারতেও পারেন।”
জেনিন এবার ঘুরে দাঁড়াল। তার চোখে এক ঠান্ডা, তুষারশুভ্র রাগ। সে নোবারার চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে শান্ত কিন্তু তীক্ষ্ণ গলায় বলল, “অফিসার এনএ, আপনার মিশন তো সফল। জেনিন নুরশাদ এখন ঘরছাড়া, তার সাম্রাজ্য ধ্বংসস্তূপ, তার বাবা কবরে। আর কী চান আপনি? আমার এই অবশিষ্ট জীবনটা? সেটা তো আপনি অনেক আগেই নিয়ে নিয়েছেন।”
নোবারা ডুকরে কেঁদে উঠল। “ওভাবে বলবেন না জেনিন! আমি জেনেশুনে কিছু করিনি। আমি মাহিতোর আদেশে এসেছিলাম ঠিকই, কিন্তু আমি তো আপনাকে ধরিয়ে দিইনি। বরং আমি নিজের জীবন বাজি রেখে আপনাকে বাঁচাতে চেয়েছি। মা… আমার মা মারা গেলেন এই লড়াইয়ে। আপনি কি মনে করেন আমি এখনো কোনো মিশনের কথা ভাবছি?”
জেনিন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। হালিমা মায়ের মৃত্যুটা জেনিনের হৃদয়েও এক বড় ক্ষত। কিন্তু তার অভিমান আজ পাহাড়ের চেয়েও অটল। সে নিজেকে সামলে নিয়ে এক পা পিছিয়ে গেল। সে চায় না নোবারার এই কান্না তাকে দুর্বল করুক।
“আপনার মা আমারও মায়ের মতোই ছিলেন নোবারা। তার জন্য আমার শ্রদ্ধা আর শোক কোনোদিন কমবে না। কিন্তু আপনার আর আমার মাঝখানে যে বিশাল মিথ্যের পাহাড় আপনি দাঁড় করিয়েছেন, তা এক রাতের কান্নায় ধুয়ে যাবে না। আমি আপনাকে কষ্ট দিতে চাই না, তাই দয়া করে আমার সামনে আসবেন না। এই বাইপাস ভিলায় আপনার কোনো অভাব হবে না, কিন্তু আমাকে আমার মতো থাকতে দিন।”
জেনিন গটগট করে হেঁটে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। নোবারা মেঝের ওপর বসে রইল একা। জেনিনের এই দূরত্ব তাকে তিলে তিলে শেষ করে দিচ্ছে। সে বুঝতে পারছে জেনিন তাকে ঘৃণা করছে না, বরং প্রচণ্ড অভিমান করে আছে। জেনিন নূরশাদের মতো পুরুষ যখন অভিমান করে, তখন সে এক দুর্ভেদ্য দেয়াল তুলে নেয় নিজের চারদিকে।
নোবারা চোখের জল মুছে উঠে দাঁড়াল। সে মনে মনে ঠিক করল, সে হার মানবে না। জেনিন যদি তাকে দূরে সরিয়ে দেয়, সে জেনিনের আরও কাছে যাবে। সে তার জেনিনকে ফিরিয়ে আনবেই।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামল। পাহাড়ের গায়ে মেঘেরা এসে ভিড় জমিয়েছে। জেনিন ভিলার লাইব্রেরি ঘরে বসে কিছু পুরনো ফাইল দেখছিল। আসলে সে কিছুই পড়ছিল না, কেবল নোবারার চিন্তা থেকে নিজেকে দূরে রাখার চেষ্টা করছিল। হঠাৎ দরজায় টোকা পড়ল। জেনিন ভাবল হয়তো ইউজি এসেছে।
“ভেতরে এসো ইউজি।” জেনিন মাথা না তুলেই বলল।
কিন্তু কোনো উত্তর এল না। তার বদলে নাকে এল গরম কফির আর বেলী ফুলের সেই চেনা সুবাস। জেনিন চোখ তুলে দেখল নোবারা দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতে একটা ট্রে, তাতে এক মগ কালো কফি। নোবারার চুলে আজ একটা সাদা বেলী ফুল গোঁজা। জেনিন বুঝতে পারল এটা সেই টব থেকে নেওয়া ফুল যেটা সে এত কষ্ট করে নিয়ে এসেছে।
নোবারা ট্রে-টা টেবিলের ওপর রেখে নিচু গলায় বলল, “আপনি দুপুর থেকে কিছু খাননি। মাথা ধরবে। কফিটা খান।”
জেনিন রুক্ষ স্বরে বলল, “আমি বলেছি না আমার সামনে আসবেন না? ইউজিকে দিয়ে পাঠাতে পারতেন।”
নোবারা এবার একটু অবুঝের মতো ঠোঁট ফুলিয়ে বলল, “ইউজি ব্যস্ত। আর আমি আপনার স্ত্রী, আপনার চাকর নই যে আপনার হুকুম মেনে দূরে থাকব।”
নোবারার এই অবুঝপনা জেনিনকে অপ্রস্তুত করে দিল। সে দেখল নোবারার চোখে এখনো পানি টলমল করছে, কিন্তু সে জেদ ধরে দাঁড়িয়ে আছে। জেনিন কফির মগটা হাতে নিল, কিন্তু তাতে চুমুক দিল না। সে নোবারার দিকে তাকিয়ে দেখল তার হাতের আঙুলে একটা ব্যান্ডেজ।
“আঙুলে কী হয়েছে?” জেনিন অনিচ্ছাসত্ত্বেও জিজ্ঞেস করল।
নোবারা একটু হাসল, তবে সেই হাসিতে কান্না মেশানো। “আপনার জন্য কফি বানাতে গিয়ে গরম পানি লেগেছে। আপনি পাশে থাকলে তো ফুঁ দিয়ে দিতেন, এখন তো আমি একাই…”
জেনিন আর পারল না। সে ঝট করে উঠে দাঁড়িয়ে নোবারার হাতটা টেনে ধরল। “স্টুপিড! সাবধানে থাকতে পারেন না?” সে ড্রয়ার থেকে একটা অয়েন্টমেন্ট বের করে নোবারার আঙুলে লাগিয়ে দিতে লাগল।
নোবারা জেনিনের খুব কাছে দাঁড়িয়ে তার শান্ত মুখটার দিকে তাকিয়ে রইল। সে দেখল জেনিন যখন তার যত্ন নেয়, তখন তার চোখের নিষ্ঠুর মাফিয়া ভাবটা উধাও হয়ে যায়। জেনিন ওষুধ লাগানো শেষ করে যখন মুখ তুলল, দেখল নোবারা খুব নিবিড়ভাবে তার দিকে তাকিয়ে আছে।
“জেনিন,” নোবারা ফিসফিস করে বলল, “আমি আর সিআইডিতে ফিরব না। আমি রিজাইন লেটার পাঠিয়ে দেব যদি সম্ভব হয়। আর যদি না হয়, তবে আমি আপনার সাথে এই পাহাড়েই থেকে যাব। আপনি যেখানে থাকবেন, সেটাই আমার জগত। আমাকে ক্ষমা করা যায় না?”
জেনিন নোবারার হাতটা ছেড়ে দিয়ে আবার জানালার দিকে মুখ ফিরিয়ে নিল। তার বুকটা ধক করে উঠল। নোবারার এই সমর্পণ জেনিনকে নিঃস্ব করে দিচ্ছে। কিন্তু সে গম্ভীর গলায় বলল,
“সময় সব ঠিক করে দেয়। তবে এখন নয়। আপনি যান, বিশ্রাম নিন।”
নোবারা বুঝল জেনিনের অভিমান এখনো গলেনি, কিন্তু তার বরফটা একটু হলেও নরম হয়েছে। সে আর কথা বাড়াল না। যাওয়ার সময় শুধু বলে গেল, “আমি আপনার অপেক্ষায় ডাইনিং টেবিলে বসে থাকব। আপনি না এলে আমি আজ সারারাত না খেয়ে থাকব। এই বলে দিলাম কিন্তু হাবি!”
নোবারা চলে যাওয়ার পর জেনিন কফির মগটা হাতে নিয়ে এক চুমুক দিল। কফিটা একদম নিখুঁত হয়েছে, যেমনটা সে পছন্দ করে। জেনিন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে জানে নোবারা বড্ড জেদি। সে না গেলে আসলেই না খেয়ে থাকবে। মেয়েটাকে সামালানো তার কাছে মাফিয়া সাম্রাজ্য সামলানোর চেয়েও কঠিন মনে হয়! সে নিজেও কম নয়। এই যে তার এখন ভীষণ রাগ লাগছে, তবুও ইচ্ছে করছে গিয়ে বউকে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে থাকতে। তবুও সে নিজের জেদ চেপে বসে আছে।
রাত দশটা। ডাইনিং টেবিলের বাতিগুলো খুব মৃদু করে জ্বালানো। ইউজি একপাশে বসে তার ল্যাপটপে কাজ করছে, আর নোবারা চুপচাপ বসে আছে জেনিনের জন্য। জেনিন যখন ডাইনিং রুমে ঢুকল, ইউজি একটু মুচকি হাসল। সে জানে তার বস শেষ পর্যন্ত হার মানবেই। ইতোমধ্যেই সে নোবারাকে ড্রামা কুইন থেকে লিযার্ড কুইন নাম দিয়ে দিয়েছে, গরিগিটির মতো এতো রুপ পাল্টানোর কারণে। যদিও নোবারা তার বেজিটার কথায় কিছু মনে করেনি।
জেনিন নিঃশব্দে নোবারার উল্টো দিকের চেয়ারে বসল। নোবারা দ্রুত উঠে জেনিনের প্লেটে খাবার বেড়ে দিল। আজ কোনো রাজকীয় আয়োজন নেই, সাধারণ ডাল-ভাত আর পাহাড়ি মুরগির মাংস। কিন্তু জেনিনের মনে হলো এটাই তার জীবনের সবচাইতে তৃপ্তিদায়ক খাবার। তারা কেউ কোনো কথা বলল না। নিস্তব্ধতার মাঝে কেবল চামচের ঠুনঠুন শব্দ শোনা যাচ্ছিল।
খাওয়া শেষ করে জেনিন যখন উঠে যাচ্ছে, নোবারা তার পেছন থেকে শার্টের হাতা টেনে ধরল। জেনিন থামল, তবে পেছনে ফিরে তাকালো না। পাছে তার রাগ গলে যায় নোবারার মিষ্টি মুখখানি দেখে!
“জেনিন, আমাকে….আমাকে মা’য়ের কাছে একটু নিয়ে যাবেন? শেষ দেখাটা তো দেখতে পাইনি আমি!” বলতে বলতেই নোবারা কান্নায় ভেঙে পড়ল।
জেনিনের হৃদয়ের সবটুকু কঠোরতা এক মুহূর্তে ধূলিসাৎ হয়ে গেল যেন! সে নোবারার দিকে ফিরল এবং তৎক্ষণাৎ তাকে নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে নিল। আসলেই তো! নোবারাকে শেষ দেখা না দেখিয়েই মা হালিমাকে দাফন করা হয়েছে। মেয়েটার তো হক ছিদ মা’কে দেখার। রাগ অভিমান এর হিসেবে মেলাতে গিয়ে জেনিন যে কবে কথাটা ভুলেই গিয়েছিল! নোবারা জেনিনের বুকে মাথা রেখে অঝোরে কাঁদতেই আছে। জেনিন তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল অনেকবার করে।
কিন্তু তাতে কোন কাজ হলো না। নোবারার হাত ধরে নিয়েই জেনিন হালিমা মায়ের কবরের দিকে এগোতে লাগলো। ইউজি অবশ্য যেতে চেয়েছিল, কিন্তু জেনিন মানা করেছে বিধায় আর গেল না।
বাইপাস ভিলার পেছনের অংশটা ঘন অরণ্যে ঘেরা। পাহাড়ের ঢালু বেয়ে নিচে নেমে গেলে একটা সমতল জায়গা, যেখানে পুরনো কয়েকটা বকুল গাছ যুগের পর যুগ ধরে দাঁড়িয়ে আছে। আকাশে মেঘের আড়ালে লুকানো একফালি চাঁদ মাঝেমধ্যে উঁকি দিচ্ছে, যার ক্ষীণ আলোয় জঙ্গলটা আরও রহস্যময় আর শোকাতুর মনে হচ্ছে।
জেনিন একটি চার্জার লাইট হাতে নিয়ে ধীর পায়ে হেঁটে যাচ্ছিল। তার অন্য হাতে নোবারার হাতটা শক্ত করে ধরা। নোবারার হাত আজ বরফের চেয়েও শীতল। সে যেন এক জ্যান্ত রোবট, যার নিজের কোনো চেতনা নেই। জেনিন অনুভব করতে পারছে, নোবারার শরীরের সমস্ত ভার যেন তার হাতের ওপর এসে পড়েছে। নোবারা শান্ত, অতিরিক্ত শান্ত। আর এই শান্ত ভাবটাই জেনিনকে সবচাইতে বেশি ভাবিয়ে তুলছে। সে জানে, এই স্তব্ধতা আসলে এক বিশাল ঝড়ের পূর্বলক্ষণ।
সুড়ঙ্গপথ আর পাথুরে রাস্তা পার হয়ে তারা যখন সেই নির্দিষ্ট বকুল গাছটার নিচে পৌঁছাল, জেনিন হাতের আলোটা মাটির দিকে নামাল। টাটকা ভেজা মাটির একটা ঢিবি। চারপাশে কোনো পাথরের ফলক নেই, কোনো আড়ম্বর নেই। জেনিনের নির্দেশে ইউজি অতি সংগোপনে হালিমাকে এখানে সমাধি দিয়েছে। মাটির ওপর এখনো বকুল ফুলের ঝরা পাপড়ি পড়ে আছে, যেন প্রকৃতি নিজেই এই ভিনদেশী মাকে বরণ করে নিয়েছে।
জেনিন লাইটটা পাশে একটা পাথরের ওপর রাখল। নোবারা স্থির দাঁড়িয়ে আছে। তার দৃষ্টি ওই মাটির ঢিবির ওপর নিবদ্ধ। সে যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না, যে মা কয়েকদিন আগেও তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিত, তার পছন্দের পিঠা বানিয়ে দিত, সেই মা আজ এই কয়েক হাত মাটির নিচে চিরতরে হারিয়ে গেছে। ভেবেছিল, নুরশাদ ভিলায় তার সংসার এ মা’র শেষ বয়সটায় অনেক যত্ন করবে। তার সংসার ও গেল, সাথে মা ও! তার অফিসার পরিচয়টাও তো তার মা’কে বলা হয়নি। পাছে তার মা মানা করে দেয়, তাকে ট্রেনিং নিতে। তবে আজ…আজ এসব কি হয়ে গেল তার সাথে?
জেনিন নিচু স্বরে বলল,
“নূরা… আমরা পৌঁছে গেছি।”
নোবারা কোনো উত্তর দিল না। সে ধীর পায়ে মাটির ঢিবির কাছে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসল। সে খুব সাবধানে তার আঙুল দিয়ে মাটিটা স্পর্শ করল। তার মনে হচ্ছে, জোরে চাপ দিলে পাছে তার মা ব্যথা পায়। নোবারা বিড়বিড় করে বলতে লাগল, “মা? তুমি কি শুনতে পাচ্ছো? দেখো, তোমার মেয়ে এসেছে। তুমি তো অন্ধকারে ভয় পেতে মা, এখন একা এখানে কেমন করে আছো?”
নোবারার কণ্ঠস্বর স্বাভাবিক। সে কাঁদছে না। সে শুধু মাটির সাথে কথা বলছে। জেনিন একটু দূরে দাঁড়িয়ে নোবারাকে দেখছিল। তার বুকের ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে। সে চায় নোবারা চিৎকার করে কাঁদুক। এই গুমোট নিস্তব্ধতা নোবারার মস্তিষ্ক বিকল করে দেবে।
নোবারা আবার বলল, “জেনিন, মা কি ঘুমিয়ে আছে? ওনাকে ডাকুন না। মা-কে বলুন উঠে আসতে। এখানে বড্ড ঠান্ডা!”
জেনিন এগিয়ে এসে নোবারার কাঁধে হাত রাখল। “নূরা, নিজেকে সামলান। মা আর নেই। তিনি এখন শান্তিতে আছেন।”
আর নেই….এই শব্দ দুটো নোবারার কানে আছড়ে পড়তেই তার শরীরের ভেতরে যেন এক প্রচণ্ড বিস্ফোরণ ঘটল। এতক্ষণ ধরে চেপে রাখা সমস্ত পাথর যেন এক নিমিষে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেল।
নোবারা হঠাৎ মাটির ওপর আছড়ে পড়ল। সে তার দু হাত দিয়ে মাটি খামচে ধরতে শুরু করল।
“না! মা! তুমি আমাকে ছেড়ে যেতে পারো না!”
নোবারার গলার স্বর চিরে এক অমানুষিক আর্তনাদ বেরিয়ে এল। এই চিৎকার পাহাড়ে প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে আসতে লাগল।
সে পাগলের মতো মাটি খুঁড়তে লাগল। সে যেন চায় এই কবর খুঁড়ে তার মাকে আবার বের করে আনতে। তার নখগুলো মাটির ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে, আঙুল দিয়ে রক্ত বের হচ্ছে, কিন্তু তার কোনো হুশ নেই। সে ডুকরে কেঁদে উঠল। তার কান্নার শব্দে রাতের পাখিরা ডানা ঝাপটে উড়ে গেল।
“মা! ও মা! ওঠো না! আমি তোমার ছোট্ট মেয়ে! দেখো আমার হাত কেটে গেছে মা, তুমি এসে ফুঁ দিয়ে দাও না! তুমি না থাকলে আমি কার কাছে যাব? এই পৃথিবীতে আমার আর কে আছে মা?”
নোবারার শরীরটা ধনুকের মতো বেঁকে যাচ্ছে। সে মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। কান্নার তোড়ে তার দম বন্ধ হয়ে আসছে। জেনিন দ্রুত তাকে জাপটে ধরার চেষ্টা করল, কিন্তু নোবারা তাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল। সে এখন এক উন্মাদিনী!
“ছেড়ে দিন আমাকে! আপনি কেন আমাকে বাঁচালেন? কেন ওই আগুনেই আমাকে পুড়িয়ে মারলেন না? মাকে ছাড়া আমি কেন বেঁচে থাকব? এই জীবন দিয়ে আমি কী করব?”
নোবারার হাহাকার বকুলতলার অন্ধকারকে বিদীর্ণ করে দিচ্ছে। তার চোখ দুটো রক্তবর্ণ হয়ে গেছে, মুখ দিয়ে লালা আর নোনা জল মিশে একাকার। সে এক পর্যায়ে মা হালিমার কবরের ওপর শুয়ে পড়ল। সে তার কানটা মাটির সাথে ঠেকিয়ে রাখল, যদি মা ভেতর থেকে কিছু বলে।
“মা… তুমি কি রাগ করেছো? আমি সিআইডিতে গিয়েছিলাম বলে? আমি বেইমানি করেছি বলে তুমি চলে গেলে? ফিরে এসো মা, আমি আর কোনোদিন বাইরে যাব না। আমি সারাদিন তোমার পাশে বসে থাকব। ও মা… একবার কথা বলো…”
নোবারার অবস্থা এখন অর্ধমৃত মানুষের মতো। সে বারবার মূর্ছা যাচ্ছে আবার জ্ঞান ফিরতেই ডুকরে উঠছে। জেনিন এবার জোর করে নোবারাকে নিজের বুকের সাথে চেপে ধরল। নোবারা জেনিনের বুকে কিল-ঘুষি মারতে লাগল, কামড় দিতে চাইল, কিন্তু জেনিন নড়ল না। সে পাথরের মতো স্থির হয়ে নোবারার এই সমস্ত আক্রমণ সহ্য করে গেল।
“নূরা… শান্ত হোন। আমাকে দেখুন।” জেনিন নোবারার মুখটা নিজের হাতের তালুতে তুলে ধরল।
নোবারা হাপাতে হাপাতে জেনিনের চোখের দিকে তাকাল। তার চোখে তখন কোনো দৃষ্টি নেই, কেবল এক বিশাল শূন্যতা। সে ফিসফিস করে বলল, “মা… মা কি আর আসবে না?”
জেনিন নিজের চোখের জল সামলাতে পারল না। সে নোবারার কপালে নিজের কপাল ঠেকাল। “না নূরা। আপনার মায়ের সাথে সাথে আমার বাবা ও তো আমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছে। দেখুন, আমি কতটা শক্ত আছি, শুধুমাত্র আপনার মুখ চেয়ে। এখন আপনি এমন করলে আমি কোনদিকটা সামলানো নূরা?”
নোবারা এবার জেনিনের শার্টের কলার খামচে ধরে তার বুকে মাথা রাখল। তার শরীরের কাঁপুনি কমছে না। সে বিড়বিড় করে বলতে লাগল, “সব আমার দোষ জেনিন। আমি সিআইডিতে না গেলে মাহিতো আমাদের খুঁজে পেত না। মাহিতো না আসলে নুরশাদ ভিলা পুড়ত না। আর নূরশাদ ভিলা না পুড়লে মা… মা বেঁচে থাকতেন।”
জেনিন নোবারার চুলে হাত বুলিয়ে দিতে লাগল। “না নূরা। এসব নিয়তি। আমরা কেউ জানি না আমাদের কপালে কী লেখা আছে। আপনি নিজেকে দোষ দেবেন না।”
নোবারা আর কোনো কথা বলতে পারল না। তার শরীরের সমস্ত শক্তি শেষ হয়ে গেছে। সে জেনিনের কোলেই নিস্তেজ হয়ে এলিয়ে পড়ল। তার চোখের কোণ দিয়ে তখনো অবিরাম জল গড়িয়ে পড়ছে। জেনিন আকাশের দিকে তাকালো। রাতের শেষ প্রহর শুরু হয়েছে।
বকুলতলার এই সিক্ত মাটিতে আজ এক মেয়ের শৈশব আর এক মেয়ের সমস্ত নির্ভরতা সমাধি হয়েছে। জেনিন অনুভব করল, নোবারা এখন কেবল এক প্রাণহীন দেহ। তার ভেতরের সেই চঞ্চল, জেদি মেয়েটি আজ এই কবরের সাথে মিশে গেছে।
জেনিন নোবারাকে পাজাকোলা করে তুলে নিল। সে যখন পাহাড়ের ঢাল বেয়ে ওপরে উঠছে, তখন ভোরের প্রথম আলো বকুল গাছের ডগায় এসে পড়েছে। কিন্তু নোবারার জীবনে যে অন্ধকার নেমে এসেছে, তা দূর করার ক্ষমতা পৃথিবীর কোনো সূর্যের নেই। সে শুধু জেনিনের বুকে মুখ লুকিয়ে সিক্ত হতে লাগল। পাহাড়ের বাতাসে তখনো হালিমা মায়ের চেনা স্নেহের সুবাস ভেসে বেড়াচ্ছে।
রুমে ফিরে এসে জেনিন নোবারাকে সাবধানে বিছানায় শুইয়ে দিল। নোবারার শাড়ি কাদা আর শুকিয়ে যাওয়া রক্তে মাখামাখি, ফর্সা মুখটা মাটির ধুলোয় ধূসর। সে অসার হয়ে পড়ে আছে, যেন শরীরের সমস্ত চেতনা বকুলতলার ওই মাটির নিচেই ফেলে এসেছে।
জেনিন একটি তোয়ালে ভিজিয়ে নোবারার হাত-মুখ মুছে দিতে লাগল। তার নিজের হাত কাঁপছে। গত কয়েকদিনের প্রতিটি মুহূর্ত জেনিনের চোখের সামনে চলচ্চিত্রের মতো ভেসে উঠছে। প্রতিটি দৃশ্য রক্তে রাঙানো, প্রতিটি স্মৃতি আগুনের শিখায় দগ্ধ।
নোবারা হঠাৎ চোখ মেলল। তবে সেই চোখে কোনো চঞ্চলতা নেই। সে ছাদের দিকে তাকিয়ে নির্লিপ্ত গলায় বলল, “সব শেষ হয়ে গেল না?”
জেনিন তোয়ালেটা রেখে নোবারার পাশে বসল। তার কণ্ঠস্বর আজ বড্ড ভারী। “সব নয়। আমরা বেঁচে আছি।”
নোবারা একটু হাসল, মৃত মানুষের হাসির মতো। “ওই রাতে… গোডাউনে যখন বিস্ফোরণ হলো, তারপর কী হয়েছিল? আমার কিছু মনে পড়ছে না কেন?”
জেনিন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে জানালার বাইরের পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে বলতে শুরু করল, “ইউজি না থাকলে আজ আমরা কেউ এই আলো দেখতাম না। ওই নরককুণ্ড থেকে ও আমাদের বের করে এনেছে। যখন গোডাউনটা ধসে পড়ছিল, ও নিজের জীবনের তোয়াক্কা না করে আমাদের টেনে বের করেছে। ও না থাকলে আমি আপনাকে হারাতাম।”
নোবারা কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালো না। তার দৃষ্টি স্থির। জেনিন বলতে লাগল, “তারপর ভিলা… আমার বাবার আস্তানা…ওরা কাউকে ছাড়েনি নোবারা। আমার বাবাকে ওরা নৃশংসভাবে মেরেছে। আপনি যখন অজ্ঞান ছিলেন, আমি একা হাতে বাবার নিথর দেহটা মাটি দিয়েছি। আমার সাম্রাজ্য, আমার সংসার, সব ওই আগুনে পুড়ে শেষ হয়ে গেছে।”
নোবারা এবার জেনিনের দিকে মুখ ফেরাল। “আ…আমার মা-কে কীভাবে আনলেন?”
জেনিনের চোখের কোণ চিকচিক করে উঠল। “আপনাকে এক হাতে আর মা-কে অন্য হাতে নিয়ে আমি হেলিকপ্টারে উঠেছি। আমি জানতাম, আপনাকে নিয়ে ফিরলে আপনি সবার আগে মা-কে খুঁজবেন। আমি আপনাকে খালি হাতে ফেরাতে চাইনি!”
নোবারা ফুঁপিয়ে উঠল। জেনিন তার হাতটা চেপে ধরে আবার বুকের মাঝে মিশিয়ে নিল।
ঘরে আবার নীরবতা নেমে এল। জেনিন বলতে বলতে থেমে গেল। তার গলা ধরে আসছে। সে অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে রইল। “আমি আপনার সবটুকু কেড়ে নিয়েছি নোবারা। আমার ছায়া মাড়াতে এসে আপনি আপনার পৃথিবী হারিয়েছেন।”
নোবারা উঠে বসার চেষ্টা করল। জেনিন তাকে সাহায্য করল। নোবারা জেনিনের কাঁধে মাথা রাখল। এবার আর চিৎকার নেই, কেবল নিরবচ্ছিন্ন অশ্রুপাত। জেনিন অনুভব করল তার শার্টটা আবারো নোবারার চোখের জলে ভিজে যাচ্ছে।
“ইউজি এখন কোথায়?” নোবারা খুব নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল।
“ও বাইরে আছে। নীলিমার বেইমানি ওকে ভেতর থেকে পুড়িয়ে দিচ্ছে, তবুও ও আমাদের জন্য লড়ছে। ও-ই এখন আমাদের শেষ শক্তি।” জেনিন উত্তর দিল।
জেনিন নোবারার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। তার ভেতরে এক অদ্ভুত দন্দ্ব কাজ করছে। একদিকে নোবারার এই চরম শোক, আর অন্যদিকে তার পেশাদারী সত্তার প্রতি জেনিনের এক চাপা কৌতূহল। সে নোবারার কপালে চুমু খেয়ে তাকে নিজের বুকের ওপর আগলে রাখল। ঘরটা নিস্তব্ধ, কেবল বাইরের পাহাড়ের বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ শোনা যাচ্ছে।
হঠাৎ জেনিন নোবারার চিবুকটা আলতো করে উঁচিয়ে ধরল। তার চোখের দৃষ্টিতে এখন আর আগের মতো রুক্ষতা নেই, বরং এক ধরণের বিচারকসুলভ গাম্ভীর্য। সে খুব শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল,”নূরা, একটা কথা বারবার মাথায় ঘুরছে। আপনি যদি সিআইডি অফিসার হয়েও থাকেন, তবে আমার সামনে আপনি এতোটা অবুঝ, এতোটা অসহায় কীভাবে থাকতেন? আপনার উপর কতবার অ্যাটাক হলো, আপনি তো পাল্টা আক্রমণ করতে পারতেন। কেন করেননি? কেন সবসময় আমার আড়ালে লুকাতেন?”
নোবারা একটু হাসল। সেই হাসিতে কোনো ছলনা নেই। সে মেঝের দিকে তাকিয়ে বলল, “শিকারিকে ধরার জন্য যখন কেউ শিকার সেজে আসে, তখন তাকে সেই চরিত্রেই মিশে যেতে হয়। আমি যদি পাল্টা গুলি চালাতাম, তবে আপনি আমার ওপর সন্দেহ করতেন। আমি চেয়েছিলাম আপনি আমাকে আপনার অস্তিত্বের অংশ ভাবুন, কোনো প্রতিপক্ষ নয়।”
জেনিন ভ্রু কুঁচকে তাকাল। “তার মানে এতো দিন এর এতো কান্না, ওই ভয় পাওয়া, সবই কি অভিনয় ছিল?”
নোবারা জেনিনের চোখের দিকে সরাসরি তাকাল। এবার তার কণ্ঠে গভীর আবেগ। “শুরুতে হয়তো ছিল। কিন্তু যেদিন থেকে আপনার মায়ায় পড়লাম, সেদিন থেকে ভয়টা সত্যি হয়ে গেল। আমি পাল্টা আক্রমণ করিনি কারণ আমি চাইতাম আপনি আমাকে বাঁচান। আপনার ওই আগলে রাখার নেশাটাই আমাকে আপনার প্রতি দুর্বল করে দিচ্ছিল। আমি সিআইডি অফিসার পরিচয়টা ভুলে আপনার ‘নূরা’ হয়ে থাকার স্বাদ পেতে শুরু করেছিলাম। ওটা আর অভিনয় ছিল না জেনিন, ওটা ছিল আমার নিজের কাছে নিজের আত্মসমর্পণ।”
জেনিন এক মুহূর্ত নীরব রইল। বাতাসের শব্দে বকুলতলার সেই করুণ সুর যেন এখনো ভেসে আসছে। সে আবার প্রশ্ন করল, “আমার খোঁজ পেলেন কীভাবে? আমি যে মাফিয়া জেড, সেটা জানলেনই বা কীভাবে? আমাদের নেটওয়ার্ক তো সাধারণ কোনো এজেন্সির পক্ষে ভেদ করা সম্ভব ছিল না।”
নোবারা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে পেছনে হেলান দিল। “সিআইডির কাছে জেড ছিল একটা ছায়া। কিন্তু ছায়ারও তো একটা উৎস থাকে। জেনিন আর জেড একই ব্যক্তি হওয়ার সম্ভাবনা থাকায় অফিস থেকে আমাকেই পাঠানো হয়েছিল। কারণ আপনার সাথে আমার ছোটবেলার কানেকশন ছিল সেটা ওনারা জানতেন। তাই আপনার অফিসে পিএ হয়ে ঢুকেছিলাম।”
জেনিন তিক্ত হাসল। “আর সিআইডির কাছে কতটুকু তথ্য পাঠিয়েছেন? আমার কতটুকু ক্ষতি করেছেন আপনি?”
নোবারা এবার জেনিনের হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিল। তার হাতের ছোঁয়ায় এক ধরণের আর্তি। “বিশ্বাস করুন, শুরুতে আপনার লোকেশন আর কিছু পে-রোল লিক করেছিলাম ঠিকই, কিন্তু যেদিন আমি বুঝলাম, আমি আপনার প্রেমে পড়েছি, আপনাকে ছাড়া আমার জীবন অচল! সেদিনের পর আমি সিআইডিকে ভুল তথ্য দিতে শুরু করেছিলাম যাতে আপনি নিরাপদে থাকেন। আমি আমার পেশা, আমার দায়িত্ব, সবকিছু আপনার জন্য বিসর্জন দিয়েছি।”
জেনিন নোবারার হাতের দিকে তাকাল। যে হাতটা একদিন পিস্তল চালাত, আজ সেই হাতটা তাকে আঁকড়ে ধরে ক্ষমা চাইছে। জেনিনের বুকের ভেতরের পাথুরে অভিমানটা এবার সত্যিই গলতে শুরু করল। সে বুঝতে পারল, নোবারা তার সাথে বেইমানি করেনি, বরং নিজের সত্তার সাথে যুদ্ধ করে জেনিনকে বেছে নিয়েছে।
জেনিন হঠাৎ একটু রহস্যময় হাসি হাসল। সে নোবারার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “আচ্ছা, তো মাফিয়া জেড এর বউ একজন সিআইডি অফিসার? তো আপনার স্কিলগুলো কি এখনো আছে? নাকি আমার নূরা হতে গিয়ে সব ভুলে গেছেন?”
নোবারা একটু অবাক হয়ে তাকাল। “মানে?”
জেনিন পকেট থেকে একটা ছোট্ট কয়েন বের করে বাতাসের দিকে ছুঁড়ে দিল। “এই কয়েনটা মাটিতে পড়ার আগে আপনাকে ওটা ক্যাচ করতে হবে, কিন্তু শর্ত হলো আপনার চোখ বন্ধ থাকবে। আপনি শুধু শব্দের উৎস থেকে ওটা ধরবেন। পারবেন?”
নোবারা চ্যালেঞ্জটা গ্রহণ করল। সে চোখ বন্ধ করল। জেনিন কয়েনটা উল্টো দিকে ছুঁড়ে দিল। কয়েনটা যখন বাতাসের বুক চিরে নিচের দিকে পড়ছিল, নোবারা এক অসামান্য ক্ষিপ্রতায় হাত বাড়াল। ঠিক মাটি ছোঁয়ার এক ইঞ্চি আগে কয়েনটা নোবারার দুই আঙুলের মাঝখানে বন্দি হলো।
নোবারা চোখ খুলে জেনিনকে কয়েনটা দেখালো। তার চোখে এখন সেই হারানো আত্মবিশ্বাস। জেনিন মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। সে বুঝতে পারল, তার নূরা যেমন কোমল, তেমনি সে প্রয়োজনে বজ্রের মতো কঠিন হতে পারে।
কিন্তু এরপরেও যেন তার ভেতরের সেই খুঁতখুঁতে মাফিয়া বস মনটা যেন এখনো পুরোপুরি শান্ত হয়নি। সে নোবারার চোখের দিকে তাকিয়ে একটা বাঁকা হাসি দিল।
“কয়েন ধরাটা কেবল রিফ্লেক্স অফিসার। সিআইডির স্পেশাল এজেন্ট হওয়ার জন্য এর চেয়েও বেশি কিছু লাগে। বিশেষ করে অবজারভেশন আর সাইলেন্ট মুভমেন্ট। আপনি কি পারবেন আপনার জেনিন নুরশাদকে বিট করতে?”
নোবারার চোখে এখন এক চিলতে চ্যালেঞ্জের ঝিলিক। সে জেনিনের চ্যালেঞ্জটা বেশ উপভোগ করছে। “কী করতে হবে বলুন?”
জেনিন ঘরের সব কটি বাতি নিভিয়ে দিল। পুরো ঘর এখন নিশ্ছিপ্ত অন্ধকারে ডুবে আছে। শুধু বাইরের জানালার কাঁচ দিয়ে পাহাড়ের কুয়াশাচ্ছন্ন ম্লান আলো ভেতরে আসছে। জেনিন নোবারাকে লক্ষ্য করে বলল,
“আমি আপনাকে এক মিনিট সময় দেব। আপনাকে নিঃশব্দে আমার পেছন থেকে এসে আমার পকেটে থাকা এই মেমোরি চিপটা সরাতে হবে। শর্ত হলো, আপনি যখন নড়বেন, তখন আপনার পায়ের কোনো শব্দ হওয়া চলবে না, আর আপনার নিশ্বাসের শব্দও আমি যেন শুনতে না পাই। আমি যদি একবারও আপনাকে ধরে ফেলি, তবে বুঝব আপনার অফিসার পরিচয়টা কেবলি কাগুজে!”
নোবারা কোনো কথা বলল না। সে নিজের পরনের সালোয়ারের শাড়ির আঁচল টা কোমরে শক্ত করে বেঁধে নিল। সে চোখ বন্ধ করল। জেনিন ঘরের মাঝখানে একদম স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। জেনিনের কান তখন সজাগ, সে সামান্যতম কাপড়ের ঘর্ষণ বা পায়ের তলার শব্দ শোনার অপেক্ষায়।
প্রথম বিশ সেকেন্ড জেনিন কিছুই শুনতে পেল না। ঘরটা এতটাই নিস্তব্ধ যে ঘড়ির কাঁটার শব্দও যেন কামানের গোলার মতো বাজছে। জেনিন ভাবল নোবারা কি তবে দাঁড়িয়ে আছে? কিন্তু হঠাৎ সে অনুভব করল তার ঠিক পেছনের বাতাসে সামান্য পরিবর্তন। কোনো শব্দ নেই, কোনো ঘ্রাণ নেই, কেবল বায়ুমণ্ডলের এক সূক্ষ্ম বিচ্যুতি।
জেনিন ক্ষিপ্র গতিতে পেছনে ঘুরে হাত বাড়াল, কিন্তু তার হাত কেবল শূন্য বাতাসকে জাপটে ধরল। নোবারা সেখানে নেই! জেনিন মনে মনে হাসল, “বাহ! বেশ তো!”
পরের মুহূর্তে জেনিন অনুভব করল তার বাঁ কাঁধের ওপর খুব সূক্ষ্ম একটা স্পর্শ। সে বাঁ দিকে ঘুরতেই দেখল নোবারা সেখানেও নেই। নোবারা ঠিক যেন বাতাসের সাথে মিশে গেছে। সে জেনিনের চারপাশে এক মায়াজাল তৈরি করছে। হঠাৎ জেনিন অনুভব করল তার পকেটের ছোট মেমোরি চিপটা আলতো করে কেউ সরিয়ে নিল। সে সাথে সাথে নোবারার হাতটা ধরতে চাইল, কিন্তু ততক্ষণে এক মিনিট সময় পার হওয়ার নোবারা বাতি জ্বালিয়ে দিয়েছে।
জেনিন চোখ পিটপিট করে দেখল নোবারা তার থেকে পাঁচ হাত দূরে দাঁড়িয়ে আছে। তার ডান হাতের দুই আঙুলের মাঝখানে সেই মেমোরি চিপটা। নোবারার মুখে এক বিজয়ীর হাসি, অথচ তার নিশ্বাস এখনো স্বাভাবিক।
“হলো তো হাবি?” নোবারা একটু ভ্রু নাচিয়ে বলল।
জেনিন এবার সত্যিই মুগ্ধ। সে এগিয়ে গিয়ে নোবারার কোমর জড়িয়ে ধরল।
“আমি জানতাম আমার নূরা সেরা, কিন্তু অফিসার এনএ যে এত বিপদজনক, তা আগে জানলে আপনাকে হয়তো সিআইডি থেকেই চুরি করে আনতাম!”
নোবারা জেনিনের বুকে মাথা রাখল। “চুরি তো আপনি অনেক আগেই করেছেন। আমার মন, আমার পরিচয়, সব তো আপনার কাছেই বন্দি।”
জেনিন হো হো করে হেসে উঠল। গত কয়েকদিনের মধ্যে এই প্রথম তার মুখে এমন অকৃত্রিম হাসি দেখা গেল। সে নোবারাকে নিজের কাছে টেনে নিল। “অফিসার এনএ, আপনি সত্যিই অসাধারণ। আপনার এই দক্ষতা দেখে আমি এখন নিশ্চিত যে, আমার অগোচরে আপনি আমার রাজত্ব ঠিকই সামলাতে পারবেন।”
নোবারা জেনিনের বুকে মাথা রাখল। “আমি কোনো রাজত্ব চাই না জেনিন। আমি শুধু আপনার পাশে থাকতে চাই। আমাদের মাঝে আর কোনো লুকোচুরি থাকবে না তো? ক্ষমা করছেন আমায়?”
জেনিন নোবারার কপালে একটা দীর্ঘ চুমু খেল।
“না নূরা। আজ থেকে আমাদের এক নতুন শুরু। পুরো ভুবনে আমরাই সাক্ষ্য দেবো যে, ভালোবাসা সব বেইমানি আর মিথ্যের ওপর জয়ী হয়।”
চলবে ইংশাআল্লাহ………
(কি পাঠকবিচ্ছুরা, জেনিনের মতো আপনাদের ও বিশ্বাস হলো তো, নোবারা সাধারণ কোন মেয়ে নয়, সে সিআইডি অফিসার এবং ভবিষ্যতের মাফিয়া জেড এর মাফিয়া কুইন?!💅🏻)
(ওহ হ্যাঁ, আজকের পর্বটা ইয়াআআআ বড় হইছে। আজ যদি মন্তব্য না করেছেন সবাই, আমি বিরতি নিয়ে নিব বলে দিলাম। সুন্দর সুন্দর মন্তব্য করুন! এখনই, ফাস্ট রিডার😾🔪)

