Soulmate_to_Enemy |৬১| লেখনীতে: #মিফতাহুল_জান্নাত_জেমিম

0
3

#Soulmate_to_Enemy |৬১|
লেখনীতে: #মিফতাহুল_জান্নাত_জেমিম

পাহাড়ের চূড়ায় কুয়াশা জমে আছে, আর সেই কুয়াশার চাদর ভেদ করে সূর্যের নরম আলো জেনিনের স্টাডি রুমে এসে পড়ছে। রুমটা বেশ বড়, চারদিকে বইয়ের তাক আর মাঝখানে একটা বিশাল ওক কাঠের টেবিল। জেনিন নূরশাদ গভীর মনোযোগ দিয়ে ল্যাপটপের স্ক্রিনে কিছু ম্যাপ এবং ডেটা দেখছে। তার কপালে চিন্তার ভাঁজ। নূরশাদ ভিলা ধ্বংস হওয়ার পর তার নেটওয়ার্কের অনেকগুলো নোড বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে, সেগুলো আবার জোড়া লাগানো এখন তার প্রধান চ্যালেঞ্জ।

তার ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে আছে মায়া। মায়ার পরনে ব্ল্যাক ট্যাকটিক্যাল আউটফিট, চুলগুলো শক্ত করে পেছনে পনিটেইল করা। মায়া কেবল একজন এজেন্ট নয়, সে জেনিনের অপারেশনাল বুদ্ধির ডান হাত। জিবরান অনেক আগেই হারিয়ে গিয়েছে এক মিশনে, তারপর রায়ান এর বিশ্বাসঘাতকতা! তবে মায়ার বিশ্বস্ততা জেনিনকে মুগ্ধ করেছে। প্রতিটা মুহূর্ত এ মায়া জেনিন আর নোবারার নিরাপত্তায় কাজ করে যাচ্ছে‌।

মায়া টেবিলের ওপর ঝুঁকে পড়ে একটি ম্যাপে আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছিল।

মায়া খুব তীক্ষ্ণ গলায় বলল, “বস, চট্টগ্রামের পোর্টে আমাদের যে সাত নম্বর গোডাউনটা ছিল, ওটা এখন সিআইডি সিল করে দিয়েছে। রায়ান যেহেতু মারা গেছে, এখন আমাদের ভেতরে এমন কাউকে দরকার যে সিআইডির সিস্টেম হ্যাক করতে পারবে।”

জেনিন ভ্রু কুঁচকে মায়ার দিকে তাকালো। “রায়ান বেইমানি না করলে আজ আমাদের এই দিন দেখতে হতো না। মায়া, আমি চাই তুমি নিজে এই অপারেশনটা লিড করো। আমাদের হাতে সময় কম।”

মায়া একটু হাসল, তবে সেই হাসিতে শ্রদ্ধার মিশেল ছিল। সে জেনিনের একদম কাছে এসে নিচু স্বরে বলল, “বস, আপনি চিন্তা করবেন না। আমি আমার জান বাজি রেখে আপনার হারানো তথ্যগুলো ফিরিয়ে আনব। আপনার জন্য আমি সব করতে পারি।” কথাগুলো বলতে বলতে মায়া জেনিনের খুব কাছাকাছি চলে এসেছিল, যেন কাজের আলোচনার আড়ালে সে জেনিনের প্রতি তার অটুট আনুগত্য প্রকাশ করতে চাইছে।

ঠিক সেই মুহূর্তেই দরজার পাল্লাটা সশব্দে খুলে গেল। নোবারা দরজায় দাঁড়িয়ে। তার পরনে হালকা গোলাপী রঙের একটি সালোয়ার কামিজ, মাথার চুল এখনো আলুথালু হয়ে আছে। হাতে এক বাটি ফল। সে ঘরে ঢুকেই দেখল মায়া জেনিনের একদম গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে কথা বলছে। নোবারার বুকের ভেতরটা মুহূর্তেই মোচড় দিয়ে উঠল। গত রাতের কান্নাকাটি আর আবেগের পর সে ভেবেছিল জেনিন আজ শুধু তাকেই সময় দেবে, কিন্তু এখানে এসে দেখল জেনিন কাজে ডুবে আছে, আর সাথে এই এজেন্ট মেয়েটি!

নোবারা গম্ভীর মুখে ভেতরে এসে টেবিলের ওপর ফলের বাটিটা ধপ করে রাখল। জেনিন মুখ তুলল না, শুধু ল্যাপটপের দিকে তাকিয়েই বলল,
“নূরা, কিছু লাগবে আপনার? আমি খুব জরুরি একটা মিটিংয়ে আছি।”

নোবারার মেজাজ এবার সপ্তমে চড়ল। সে জেনিনের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে ঠান্ডা গলায় বলল, “জরুরি মিটিং না অন্য কিছু? আমি তো দেখলাম খুব মাখামাখি চলছে!”

মায়া পরিস্থিতি বুঝতে পেরে একটু সোজা হয়ে দাঁড়াল। সে নোবারার দিকে তাকিয়ে খুব মার্জিতভাবে বলল, “ম্যাম, আমরা বসের নতুন সেফ-হাউস নিয়ে আলোচনা করছিলাম। আসলে কাজটা খুব জটিল তো, তাই একটু মনোযোগ দিতে হচ্ছিল।”

নোবারা মায়ার দিকে ফিরে একচুলও ছাড় না দিয়ে বলল, “মনোযোগ টেবিলে দিলে ভালো হতো মায়া, বসের গায়ের ওপর না। জেনিন তো আবার কাজের সময় কাউকে সহ্য করতে পারে না, তাই আপনার সাহসের প্রশংসা করতে হয়।”

মায়া অপ্রস্তুত হয়ে জেনিনের দিকে তাকালো। জেনিন এবার ল্যাপটপ বন্ধ করে চোখ কুঁচকে নোবারার দিকে তাকালো। “নূরা! মায়া আমার বিশ্বস্ত এজেন্ট। ও আমাকে সাহায্য করছে!”

“ওহ! বিশ্বস্ত এজেন্ট!” নোবারা ব্যঙ্গ করে হাসল। “আর আমি তো এখানে স্রেফ ডেকোরেশন পিস, তাই না? আমি গেলে মিটিংয়ে সমস্যা হয়, মনযোগ দিতে পারেন না, আর মায়া গায়ের কাছে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করলে সেটা সাহায্য!”

মায়া এবার একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “ম্যাম, আপনার কি শরীর খারাপ? আপনি এভাবে কথা বলছেন কেন? আমি তো জাস্ট কাজের কথা বলছি।”

নোবারা মায়ার দিকে এক পা এগিয়ে গেল। তার চোখে নীল আগুন। “আমার শরীর একদম ঠিক আছে। তবে তোমার কাজের স্টাইলটা আমার পছন্দ হচ্ছে না। জেনিন এখন আমার সাথে সময় কাটাবে, তুমি এখন আসতে পারো।”

মায়া এবার জেনিনের দিকে ফিরে বলল,
“বস, মিটিং তো শেষ হয়নি। সিআইডির ব্যাপারটা এখন ডিসাইড না করলে কাল দেরি হয়ে যাবে!”

জেনিন মাথা নাড়ল। সে উঠে দুহাত দিয়ে নোবারার কাঁধটা আলতো করে ধরে নরম সুরে বললো,
“নূরা, আপনি একটু পরে আসবেন প্লিজ? আমাদের আরও আধাঘণ্টা লাগবে। তারপর আমি নিজেই যাবো আপনার কাছে, প্রমিস। এখন পরিস্থিতি ভালো না। বুঝার চেষ্টা করুন।”

নোবারার মাথায় যেন রক্ত চড়ে গেল। জেনিন তাকে বাইরে যেতে বলছে এই মেয়ের সামনে! নোবারার দীর্ঘদিনের চাপা থাকা ইগো আর রাগ জামাইয়ের প্রতি তীব্র পজেসিভনেস এবার ফেটে পড়ল। সে জেনিনের হাত ছাড়িয়ে সোজা মায়ার চোখের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠল,
“এই মেয়ে? তুমি কি সত্যিই ভাবছো তুমি জেনিন নূরশাদকে চেনো? ওর সাথে দুই-চারটা মিশনে গেলেই কি ওকে চেনা যায়? তুমি বুঝতে পারছো না, তোমার এখানে কোন প্রয়োজন নেই?”

মায়া একটু থতমত খেয়ে বলল,
“আমি বসকে যতটুকু চিনি, সেটা কাজের জন্য যথেষ্ট ম্যাম।”

“যথেষ্ট?” নোবারা পাগলের মতো হাসতে শুরু করল। “তুমি ওর ব্যাপারে কী জানো শুনি? জেনিন নূরশাদ সম্পর্কে তোমার জ্ঞান কতটুকু?”

জেনিন এবার নোবারা আর মায়ার মাঝখানে গিয়ে দাঁড়াল। “নূরা, স্টপ ইট! লিমিট ক্রস করবেন না! ওর সাথে আমার কাজের সম্পর্ক কেবল।”

কিন্তু নোবারা আজ থামার পাত্রী নয়। সে মায়ার দিকে আঙুল তুলে তার ঈর্ষার ঝাপি খুলে বসল।

ঈর্ষা এমন এক বিষ, যা মানুষের বিচারবুদ্ধি লোপ করে দেয়, সিআইডি অফিসার নোবারার ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হলো না। সে ভুলে গেল জেনিন একজন দুর্ধর্ষ মাফিয়া, সে ভুলে গেল এখানে তার নিজের নিরাপত্তা কতটুকু। তার সামনে কেবল এক প্রতিযোগী, যে তার স্বামীর কাছাকাছি দাঁড়ানোর ধৃষ্টতা দেখিয়েছে।

মায়া একটু অপ্রস্তুত হয়ে হাসল। সে নোবারাকে শান্ত করার জন্য বলল, “ম্যাম, আপনি অযথা রেগে যাচ্ছেন। বসের পছন্দ-অপছন্দ, কাজের ধরন, সবই আমার নখদর্পণে। আমি কেবল সেই অভিজ্ঞতার কথাই বলছিলাম।”

মায়ার এই অভিজ্ঞতা শব্দটাই নোবারার ধৈর্যের শেষ বাঁধটা ভেঙে দিল। নোবারা টেবিলের ওপর দুই হাত রেখে মায়ার খুব কাছে মুখ নিয়ে এল। তার কণ্ঠস্বর এখন তীক্ষ্ণ, ব্যঙ্গাত্মক এবং প্রচণ্ড আক্রমণাত্মক।

“তুমি ওকে চেনো? সত্যি চিনো?” নোবারা অট্টহাসি দিয়ে উঠল, যে হাসিতে এক ধরণের পাগলামি আছে। “আরে মায়া…..জেনিন নূরশাদ সম্পর্কে তুমি যা জানো, তা হলো কেবল ওর বাইরের খোলস। তুমি জানো ও কত বড় মাফিয়া, ও কত নিখুঁত গুলি চালায়, ও কত বড় সাম্রাজ্যের মালিক। কিন্তু তুমি কি জেনিন মানুষটাকে চেনো?”

জেনিন এবার সত্যিই শঙ্কিত বোধ করল। সে নোবারার চোখের ভাষা চেনে। এই নোবারা যখন এমন করে হাসে, তখন সে কোনো না কোনো কেলেঙ্কারি ঘটায়। জেনিন দ্রুত উঠে নোবারার হাত ধরার চেষ্টা করল।
“নূরা, যথেষ্ট হয়েছে। মায়া, তুমি এখন যাও। আমরা পরে ডিসকাস করবো।”

“না! ও যাবে না!” নোবারা জেনিনের হাত ঝটকা দিয়ে সরিয়ে দিল। সে মায়ার দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠল, “শোনো মায়া, জেনিন নূরশাদকে তুমি চিনো বললে না? তবে শোনো। এই যে দুর্ধর্ষ মাফিয়া জেড, যাকে দেখে পুরো আন্ডারওয়ার্ল্ড কাঁপে, সে এখনো গোসল করার পর বাচ্চার মতো জনসন বেবি লোশন ইউজ করে! তুমি কি তা জানো? ওর শরীরের প্রতিটি ভাঁজে এখনো ওই বাচ্চাদের প্রোডাক্টের গন্ধ লেগে থাকে কারণ ওর স্কিন বড্ড সেনসিটিভ! এই মাফিয়া ডন সবার সামনে নামি দামী ড্রিংকস আর ব্ল্যাক কফি খেলেও ওর আসল ফেভারিট হলো ব্যানানা মিল্ক শেক। এক গ্লাস কড়া কফির চেয়ে এক গ্লাস বানানা শেক পেলে ও দুনিয়া ভুলে যায়। তুমি কি কোনোদিন ওকে ওই শেকটা বানিয়ে দিয়েছ? দেখেছো কখনো খেতে? ওকে চিনো বললে কি করে?”

মায়া হাঁ করে তাকিয়ে আছে। জেনিন নূরশাদের মতো একজন ইগোস্টিক রুড মানুষের এমন কিউট অথচ গোপন তথ্য সে কল্পনাও করতে পারেনি। জেনিনের মুখটা এখন টকটকে লাল হয়ে গেছে। সে দাঁতে দাঁত চিপে বলল,
“নূরা! প্লিজ চুপ করুন! আপনি কী বলছেন এসব?”

নোবারা থামল না। সে যেন আজ জেনিনকে সবার সামনে এক্সপোজ করেই ছাড়বে! সে মায়ার দিকে আরও এক পা এগিয়ে গেল।
“তুমি কি জানো ওর এই ঠোঁটের নিচে একটা ছোট তিল আছে? ওটা খুব কাছে না গেলে দেখা যায় না। তুমি দেখেছ কোনোদিন? আর শোনো, ও যখন ঘুমায়, তখন ও ঘুমের ঘোরেই নিজের জামাকাপড় খুলে ফেলে, হাত-পা ছুঁড়ে একাকার করে। ওর ওই শার্টগুলো সকালে দলা পাকানো অবস্থায় থাকে কারণ ও ঘুমের মধ্যে একদম বাচ্চার মতো ছটফট করে। এসব জানো তুমি? এইসব না জানলে তুমি উনাকে চিনো কি করে?”

জেনিনের আত্মসম্মান এখন ধুলোয় মিশে যাচ্ছে। তার নিজের এজেন্ট, যে তাকে যমের মতো ভয় পায়, তার সামনে নোবারা তার সমস্ত ব্যক্তিগত অভ্যাস ফাঁস করে দিচ্ছে। জেনিন লজ্জিত গলায় বলল, “মায়া, তুমি এখনই বের হও! প্লিজ!”

কিন্তু মায়া নড়তে পারছে না। সে বিস্ময়ে পাথর হয়ে গেছে। ঠিক তখনই দরজার গোড়ায় উদয় গালিব এর উদয় হলো! ইউজি হাতে এক গাদা ফাইল নিয়ে ঢুকতে গিয়ে নোবারার কথাগুলো শুনতে পেয়ে থমকে দাঁড়িয়ে গেল। ইউজির মুখে এক পৈশাচিক হাসি ফুটে উঠল। সে সবসময় নোবারাকে ড্রামা কুইন বলে খ্যাপাতো, আর আজ নোবারা তার আবারো প্রমাণ পাচ্ছে।

ইউজি দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে বলল,
“আরে ম্যাম, আপনি তো অর্ধেক বলছেন! বস যে মাইক্রোওভেন কে ভয় পায় ওটা তো বলেননি।”

জেনিন এবার আর্তনাদ করে উঠল,
“ইউজি! এক মাইরে সোজা করে দিবো। চুপ থাকো।”

নোবারা ইউজির সমর্থন পেয়ে আরও উৎসাহিত হলো। সে মায়ার দিকে তাকিয়ে শেষ আঘাতটা করল, “জেনিন যখনই বিব্রত বোধ করে, তখন নিজের কান স্পর্শ করে। এসব তুমি জানো? তাহলে ওকে চিনো বললে কি করে মায়া?”

মায়া কোনোমতে ঢোক গিলল। তার চোখের সামনে থাকা জেনিন নূরশাদ নামের দানবীয় মূর্তিটা এখন ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে। সে জেনিনের দিকে তাকাতে পারছে না। জেনিন এখন ল্যাপটপের পেছনের দিকে মুখ লুকিয়ে বসে আছে, যেন সে মাটির সাথে মিশে যেতে চায়।

নোবারা এবার একটা বিজয়ের হাসি দিল। সে মায়ার খুব কাছে গিয়ে ফিসফিস করে বলল, “পরের বার যখন ওর গায়ের কাছে আসার চেষ্টা করবে, তখন মনে রেখো, তুমি যার সামনে দাঁড়িয়ে আছো, সে আসলে একটা বড় বাচ্চা যে কেবল আমার কাছেই বশ মানে। ওকে তুমি চিনতেই পারো না। এবার এসো!”

মায়া আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। সে দ্রুত পায়ে ঘর থেকে প্রায় দৌড়ে বেরিয়ে গেল। ইউজি হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরে মেঝেতে বসে পড়ল। “বস, আপনার মান-সম্মান তো ম্যাম এক নিমিষে চিবিয়ে খেয়ে নিল! এখন থেকে মায়া আপনাকে দেখলেই বেবি মাফিয়া ভাববে! হা হা হা!”

জেনিন এবার গর্জে উঠল। সে টেবিল চাপড়ে দাঁড়াল। তার চোখে এখন আগুনের হলকা। সে নোবারার দিকে তাকাল, যে এখন খুব গর্বের সাথে বুক ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। জেনিন দ্রুত হেঁটে এসে নোবারার কাঁধটা ধরলো।

জেনিন রাগে কাঁপতে কাঁপতে বলল,
“আপনি কি জানেন আপনি কার সামনে কী বলছেন? আমি মাফিয়া জেড! আমার একটা ইমেজ আছে! আপনি আমার ওয়াইফ, আমার সম্পর্কে আপনি সব জানবেন তা স্বাভাবিক। কিন্তু মায়ার সামনে এসব বলতে গেলেন কেন? এখন কি ও আমাকে সিরিয়াসলি নিবে?”

নোবারা খুব ভাবলেশহীন ভাবে বলল,
“ইমেজের গুষ্টি কিলাই! ওই মেয়ে কেন আপনার এতো কাছে আসবে? পরের বার যদি ও আসে, তবে আমি আপনার সব পোল খুলে দেব!”

জেনিন আর কথা বাড়াল না। সে নোবারাকে এক হাত দিয়ে পাঁজাকোলা করে কোলে তুলে ঘাড়ের উপর তুলে নিল। নোবারা পা ছুঁড়তে লাগল, “ছাড়ুন! জেনিন ছাড়ুন আমাকে! আমি আরও বলব! ইউজি, শোনো….”

ইউজি হাসতে হাসতে বলল,
“যান বস, এবার ঘরোয়া বিচার শুরু করুন! আমি বরং মায়াকে একটু সান্ত্বনা দিয়ে আসি! ম্যাম, গুড লাক!”

জেনিন নোবারাকে নিয়ে শোবার ঘরের দিকে হাঁটা দিল। নোবারা তখনো বলে যাচ্ছে, “আপনি জানেন জেনিন, আপনি যখন রেগে যান তখন আপনার বাম চোখটা কাঁপে! এটাও মায়াকে বলা উচিত ছিল!”

জেনিন মনে মনে ভাবল, এই মেয়েকে সিআইডি কেন নিয়েছিল? কি দেখে নিয়েছিল? ও তো সিআইডি অফিসার নয়, ও হলো একটা চলন্ত ডিনামাইট। সে দরজাটা সজোরে বন্ধ করে দিল।

সে নোবারাকে বিছানায় প্রায় ছুড়ে ফেলার মতো করে নামিয়ে দিল। তারপর দ্রুত গিয়ে দরজাটা ‘ খটাশ করে লক করে দিল। তার বুকের ভেতরটা তখনো অপমানে আর লজ্জায় ধকধক করছে। দরজার ওপাশে ইউজির অট্টহাসি এখনো শোনা যাচ্ছে, যা জেনিনের রাগের আগুনে ঘি ঢালছে। সে ঘুরে দাঁড়িয়ে নোবারার দিকে তাকালো। নোবারা বিছানায় উঠে বসে অবাধ্য ভঙ্গিতে চুলগুলো ঠিক করছে, তার চোখে এখনো সেই তেজ, যেন সে কোনো মহৎ যুদ্ধ জয় করে এসেছে।

“আপনি কি পাগল হয়ে গেছেন নূরা?” জেনিন চিৎকার করে উঠল না, কিন্তু তার নিচু কণ্ঠস্বরের মধ্যে যে হিংস্ত্রতা ছিল, তা যেকোনো মানুষের মেরুদণ্ড দিয়ে ঠান্ডা স্রোত বইয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। “আপনি জানেন মায়া কে? ও আমার সবচাইতে দক্ষ এজেন্ট। আমার সুরক্ষার অর্ধেক দায়িত্ব ওর ওপর। আর আপনি ওর সামনে আমার পার্সোনাল সব অভ্যাসের কথা ফাঁস করে দিলেন? এখন থেকে ও কি আমাকে কোনোদিন সম্মান করতে পারবে? আমার কমান্ড কি ও সিরিয়াসলি নেবে?”

নোবারা বিছানা থেকে নামল। সে জেনিনের একদম সামনে গিয়ে বুক ফুলিয়ে দাঁড়াল। তার উচ্চতা জেনিনের তুলনায় সামান্য কম, কিন্তু তার জেদ জেনিনের চেয়েও আকাশছোঁয়া। সে আঙুল উঁচিয়ে বলল, “সম্মান? যে মেয়ে আপনার সাথে কাজের নাম করে গায়ে পড়া মাখামাখি করে, তার কাছে আপনার সম্মানের এতো চিন্তা? আর কেন দেবে না সম্মান? আপনি কি বাচ্চার মতো লোশন মাখেন বলে অপরাধী হয়ে গেছেন? নাকি ব্যানানা মিল্ক শেক খাওয়া কোনো পাপ?”

জেনিন মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ল বিছানার এক কোণে। “ইটস নট অ্যাবাউট পাপ নূরা! এটা একটা ইমেজের ব্যাপার। আন্ডারওয়ার্ল্ডে মানুষ আমাকে মেনে চলে। আর এখন যদি ওরা জানে আপনার এসব বলার কথা, তবে আমার ইজ্জত থাকবে কোথায়? আপনি এতো অবুঝ কেন!”

নোবারা এবার একটু নুইয়ে জেনিনের মুখের খুব কাছে এল। সে জেনিনের চোখের দিকে তাকিয়ে ব্যঙ্গাত্মক সুরে বলল, “হেহ! কত্ত বড় সিআইডি অফিসার আমি, কত বড় বড় অপারেশন হ্যান্ডেল করেছি, কত ক্রাইম সিন ইনভেস্টিগেট করেছি, জানেন আপনি? আমার চার বছরের অভিজ্ঞতা আছে। অথচ আপনার কাছে আমি স্রেফ একজন অবুঝ মেয়ে? আপনি যখন ওই মেয়ের সাথে ফিসফিস করছিলেন, তখন আমার কেমন লাগছিল সেটা ভেবেছেন? এখন এসেছে নিজের প্রেস্টিজ নিয়ে ভাবতে। যত্তসব ডং!”

জেনিন মুখ তুলে তাকালো।
“ওটা কাজ ছিল। আমি বারবার বলছি। মায়া আমার হাই লেভেলের এজেন্ট, আমার সাম্রাজ্যেরই একটা অংশ।”

“আর আমি?” নোবারার চোখে এবার পানি চিকচিক করে উঠল। তার কণ্ঠস্বর হঠাৎ করে নরম হয়ে এল। “তাহলে আমি কে? আপনি আমাকে কাজের নাম করে দূরে সরিয়ে দেবেন, আর অন্য মেয়েদের সাথে সময় কাটাবেন, এটা আমি সহ্য করব না। আমি মরে গেলেও না! তখন ভূত হয়ে এসে হলেও আপনার পাশে আসা মেয়ে জাতকে মেরে ফেলবো।”

জেনিন নোবারার এই আকস্মিক আবেগে একটু থতমত খেয়ে গেল। সে বুঝতে পারল, নোবারার এই ঝগড়া, এই ঈর্ষা, সবকিছুর মূলে রয়েছে হারানোর ভয়। যে মেয়েটা তার মা-বাবা, তার ক্যারিয়ার, তার পরিচয়, সব হারিয়েছে জেনিনের জন্য, তার কাছে জেনিনই এখন একমাত্র অবলম্বন।

জেনিন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নোবারার হাতটা ধরল। সে আলতো করে নোবারাকে নিজের কাছে টেনে তালর কোলের উপর নিল।
“নূরা, আপনি সত্যিই একটা ড্রামা কুইন। সিআইডি আপনাকে কীভাবে নিল আমি এখনো ভাবি। একজন অফিসারের প্রথম গুণ হলো ইমোশন কন্ট্রোল করা, আর আপনি তো সামান্য ঈর্ষায় পুরো সদর দফতর জ্বালিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন!”

নোবারা জেনিনের বুকের ওপর ছোট একটা কিল মেরে বলল, “সিআইডিতে আমি যখন ছিলাম, তখন আমি পাথরের মতো ছিলাম। আপনার পাল্লায় পড়েই আমার সব ট্রেনিং ধুলোয় মিশে গেছে। আপনি আমাকে এমন এক নেশায় ফেলেছেন যেখানে আমি নিজেকেই চিনতে পারি না। আই হেইট ইউ, মি: নুরশাদ!”

জেনিন এবার একটু হাসল। সে নোবারার কপালে নিজের কপাল ঠেকাল। “ঠিক আছে, বাবা, মাফ করে দিন। আর কোনোদিন কোন মেয়ে কেই আমার কাছে আসতে দেব না। তবে একটা শর্ত আছে।”

নোবারা চোখ বড় বড় করে তাকালো। “কী শর্ত?”

জেনিন নোবারার কোমর জড়িয়ে ধরে তাকে আরও নিবিড়ভাবে নিজের সাথে মিশিয়ে নিল। তার তপ্ত নিঃশ্বাস নোবারার গলায় আছড়ে পড়ছে। জেনিন একটু বাঁকা হেসে তাকিয়ে বলল,
“আমি আপনার ওপর রেগে আছি নূরপরী। রাগ ভাঙাবেন আমার। এত বড় মানহানির জন্য যদিও আপনাকে পুলিশে দেওয়া উচিত আমার।”

নোবারা মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে তাচ্ছিল্যের সুরে বলল, “ইশশ! শখ কত! আপনার রাগ আপনি পকেটে ঢুকিয়ে বসে থাকুন। আমি কিছু করব না।”

জেনিন এবার হাল ছাড়ার ভান করল। সে নোবারার কাঁধ থেকে হাত সরিয়ে নিয়ে কিছুটা গম্ভীর হয়ে বলল, “ঠিক আছে! আমি নাহয় মায়ার কাছে যাই একটু। ও আমাকে এতটা বেপাত্তা দেবে না।”

মায়ার নাম শুনতেই নোবারার শরীরের রক্ত টগবগ করে ফুটে উঠল। সে ক্ষিপ্র গতিতে জেনিনের কলার চেপে ধরল, তার চোখ দিয়ে যেন এখন অগ্নিস্ফুলিঙ্গ বের হচ্ছে। দাঁতে দাঁত চেপে সে ফিসফিস করে বলল, “গুলি মেরে মাথার খুলি উড়িয়ে দেব আপনার আর ওই মায়ার। মনে রাখবেন, আমি নোবারা নূরশাদ। আমার জেনিনের দিকে চোখ তুলে তাকালে চোখ আর চোখের জায়গায় থাকবে না বলে রাখলাম।”

জেনিন এবার সশব্দে হেসে উঠল। নোবারার এই উগ্রতা, এই ভয়ংকর পসেসিভনেস তাকে এক পৈশাচিক আনন্দ দিচ্ছে। সে নোবারার কলার ধরা হাতটার ওপর নিজের হাত রাখল এবং ধীরে ধীরে সেই হাতটা নোবারার বুকের ওপর চেপে ধরল, যেখানে তার হৃদপিণ্ডটা পাগলের মতো ধুকপুক করছে।

জেনিন ঘাড় কাত করে নোবারার চোখের গভীরে তাকিয়ে বলল, “হঠাৎ আপনাকে মাফিয়া কুইনের মতো লাগছে যে! আমার ওয়াইফ তো সিআইডি অফিসার। যে তার মাফিয়া হাসবেন্ডকে অ্যারেস্ট করতেই এসেছিল নুরশাদ এম্পায়ার এ!”

নোবারা এবার একটু থমকে গেল। জেনিনের চোখে এখন এক গভীর নেশা। জেনিন নোবারার কলার ধরা হাতটা আলতো করে সরিয়ে দিয়ে তার আঙুলগুলো নোবারার চুলের মাঝে ডুবিয়ে দিল।
“শুনেছি, সিআইডি অফিসারদের তো অনেক ধৈর্য থাকে অফিসার এনএ” জেনিন ফিসফিস করে বলল, তার ঠোঁট এখন নোবারার কানের লতি ছুঁইছুঁই। “কিন্তু আমার সামনে এলেই আপনি কেন জানি সব প্রোটোকল ভুলে যান। এই যে এখন আপনি আমার বুকে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন, এটা কি কোনো অফিসারের কাজ? এই বুকে তো আপনার ছুরি চালানোর কথা!”

নোবারা উত্তর দিতে চাইল, কিন্তু তার গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না। জেনিন জানে নোবারাকে কিভাবে কাবু করতে হয় এবং সে এখন এটাই করছে! জেনিন নোবারার চিবুক ধরে মুখটা উপরে তুলল। জেনিনের চোখের মণি দুটো আজ অস্বাভাবিক রকমের উজ্জ্বল। সে নোবারার নিচের ঠোঁটে নিজের বুড়ো আঙুল বুলিয়ে দিতে দিতে বলল, “আপনি যখন ঈর্ষায় জ্বলেন, তখন আপনাকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সুন্দরী মনে হয়। মনে হয়, এই আগুনটা যেন কোনোদিন না নেভে।”

নোবারার রাগ এখন ধীরে ধীরে এক গভীর ভালোলাগায় রূপ নিচ্ছে। সে জেনিনের শার্টের বোতামগুলো খামচে ধরল। তার কণ্ঠস্বর কাঁপছে। “আ..আপনি আমাকে পাগল করে দেবেন কোন একদিন! আমি কোনোদিন ভাবিনি…আমি…আমি কারও জন্য এতটা বেপরোয়া হয়ে যাব!”

জেনিন নোবারাকে এক ঝটকায় আরও উঁচুতে তুলে নিল। নোবারার পা এখন জেনিনের কোমরের দুপাশে জড়িয়ে গেছে। জেনিন নোবারার কপালে নিজের কপাল ঠেকিয়ে খুব নিচু স্বরে বলল, “পাগলামি তো কেবল শুরু। আপনি যখন নিজেকে নোবারা নূরশাদ হিসেবে পরিচয় দিলেন, তখনই আপনি আপনার এই মাফিয়া হাসবেন্ডের সবটুকু দখল করে নিয়েছেন। এখন থেকে আপনার প্রতিটি নিঃশ্বাস আমার অনুমতিতে চলবে, আর আমার প্রতিটি বুলেট আপনার ইশারায় খরচ হবে।”

জেনিন নোবারার গলায় নিজের মুখ ডুবিয়ে দিল। এক তীব্র, উত্তপ্ত এবং পসেসিভ স্পর্শ। নোবারার চোখ বুজে এল এক অসীম আবেশে। সে বুঝতে পারল, সে সিআইডি অফিসার হতে পারে, কিন্তু জেনিন নূরশাদের সামনে সে কেবল এক সমর্পিত মানবী। এই মাফিয়া কিং তাকে কেবল ভালোবাসে না, তাকে নিজের অস্তিত্বে ধারণ করে!

বাইরে তখন ঝোড়ো হাওয়া বইছে, কিন্তু জেনিনের শোবার ঘরের সেই উত্তাপ যেন সব ঝড়কে হার মানাচ্ছিল। জেনিন নোবারাকে বিছানায় নামিয়ে দিয়ে তার ওপর ঝুঁকে এল। তার চোখে এখন স্পষ্ট ঘোষণা, নোবারা নূরশাদ আজ কেবল জেনিন নুরশাদ এর, আর কারও নয়।

চলবে ইংশাআল্লাহ……….

(হালকা রোমান্টিকতা দেখে খুশি হবেন না পাঠকপ্রিয়। মনে রাখবেন, আমি যখন একটু সুখের কিছু দিই, তা পরবর্তীতে খারাপ লাগা বাড়িয়ে দেওয়ায় জন্যই দিই! বুঝতে বুঝপাতা, না বুঝলে তেজপাতা! কালকে যে কি আসবে….হি হি)

(ফোনের চার্জ শেষ এর পথে, ইলেকট্রিসিটি ও নাই, তাই আটটার আগেই দিয়ে দিলাম। অগ্রিম ধন্যবাদ না দিলে আপনারা পচা। টাটা)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here