#Soulmate_to_Enemy
#পর্ব_৬২ (বন্ধুর হাতে বিষাদ-সিন্ধু!)
লেখনীতে: #মিফতাহুল_জান্নাত_জেমিম
বাইপাস ভিলার পরিবেশটা আজ সকাল থেকেই ভারি হয়ে আছে। আকাশটা মেঘলা, পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে ধূসর কুয়াশাগুলো যেন কোনো অশুভ বার্তার মতো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। জেনিন নুরশাদ তার ড্রেসিং রুমের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের শার্টের হাতা ঠিক করছিল। তার চোখের চাউনি আজ বড্ড বেশি ধারালো এবং স্থির। গত কয়েকদিন সে নিজেকে গুটিয়ে রেখেছিল ঠিকই, কিন্তু বাইরের জগৎ তাকে শান্তিতে থাকতে দিচ্ছে না। মাহিতো মারা যাওয়ার পর সিআইডির কমান্ড এখন চলে গেছে নানামির হাতে। নানামি, জেনিনের ছোটবেলার সেই বন্ধু, যার আদর্শ আর নৈতিকতা জেনিনের অপরাধ জগতের সম্পূর্ণ বিপরীত। তবে সেদিন শত শত পুলিশ সিআইডি রেব সবাই তাকে ধরার জন্য যে অপারেশনটা চালু করেছিল, সেটাতে নানামি কেন ছিল না? নানামির মতো একজন হাই লেভেলের অফিসার কে ছাড়াই তারা অপারেশন লিড কিভাবে করলো? তবে কি নানামি চাইছিল জেনিন পালিয়ে যেতে পারে! কারণ ছোটবেলায় সে নানামিকে বলেছিল, যদি কোনদিন নানামি পুলিশ হয়ে তাকে ধরতে আসে, সে পালাবে না! তবে এখন তো তাকে ধরার কমান্ড নানামির হাতে দেওয়া হয়েছে! সে কি এইবার তাকে অ্যারেস্ট করবে? এই সব কল্পনা জল্পনা করতে করতেই জেনিন রেডি হচ্ছিল।
জেনিন তার বিশেষ হোলস্টারটা কোমরে পরল। ইউজি দরজার গোড়ায় এসে দাঁড়িয়েছে। ইউজির মুখে সবসময়কার সেই চপলতা আজ উধাও। সে গম্ভীর গলায় বলল,
“বস, সব রেডি। তবে আমার মন বলছে আজ না বের হওয়াই ভালো। নানামি এবার শহরের প্রতিটি পয়েন্টে চেকপোস্ট বসিয়েছে!”
জেনিন বেল্টটা শক্ত করে টেনে বলল,
“জানি। কিন্তু আমার ওই ডকুমেন্টগুলো দরকার ইউজি। মাহিতো মরার আগে যে ফাইলগুলো ডার্ক ওয়েবে সিঙ্ক করে গেছে, সেগুলো নানামির হাতে পড়া মানে আমাদের সবার মৃ’ত্যু। আমাকে আজ বের হতেই হবে।”
ঠিক সেই মুহূর্তে নোবারা ঘরে ঢুকল। তার হাতে এক কাপ গরম কফি ছিল, কিন্তু জেনিনকে পূর্ণ প্রস্তুতিতে দেখে তার হাত কেঁপে উঠল। কফির কাপটা টেবিলের ওপর রাখতে গিয়ে সামান্য চলকে পড়ল। নোবারার বুকটা দুরুদুরু করে কাঁপছে। গতরাতের খুনসুটি আর হাসাহাসি, জেনিনের আদর সব এখন সুদূর অতীত মনে হচ্ছে!
“আপনি কোথাও যাচ্ছেন না।” নোবারা শান্ত কিন্তু দৃঢ় গলায় বলল।
জেনিন নোবারার দিকে না তাকিয়েই নিজের জ্যাকেটটা গায়ে চড়ালো। “নূরা, আমার কাজ আছে।”
নোবারা জেনিনের সামনে এসে তার পথ আগলে দাঁড়াল। তার চোখে জল টলমল করছে, কেন হঠাৎ চোখ দিয়ে পানি বের হতে চাইছে সে বুঝতে পারলো না! কিন্তু সে নিজেকে সামলে নিয়েছে।
“কী কাজ? আবার সেই রক্তপাত? আবার সেই লুকোচুরি? মাহিতো নেই, রায়ান নেই, এখন আর কার সাথে লড়াই আপনার? জেনিন, আপনি কি দেখতে পাচ্ছেন না? পুলিশ আপনাকে হন্যে হয়ে খুঁজছে। বিশেষ করে নানামি ভাইয়া। ও আপনার ছোটবেলার বন্ধু হতে পারে, কিন্তু আইনের সামনে ও কাউকে চেনে না।”
জেনিন এবার নোবারার চোখের দিকে তাকালো। তার চাউনি বরফের মতো ঠান্ডা। “সেটা আমি ওর চেয়ে ভালো জানি নূরা। নানামি আমাকে ধরতে পারলে এক মুহূর্ত দেরি করবে না। কিন্তু আমাকে যেতেই হবে। ওই ফাইলগুলোতে আমার বাবার মৃত্যুর পেছনের আরও বড় কোনো ষড়যন্ত্রের তথ্য থাকতে পারে।”
নোবারা এবার জেনিনের জ্যাকেটের কলার খামচে ধরল। তার কণ্ঠে এবার আর্তি।
“যুক্তি দেবেন না জেনিন! আমি সিআইডি অফিসার ছিলাম, আমি জানি এই মুহূর্তে শহরের সিচুয়েশন কী। আপনি বের হওয়া মানেই আত্মহ’ত্যার সামিল। আপনি কি চান আমি আবার একা হয়ে যাই? মা চলে গেছে, বাবা চলে গেছে, এখন আপনিও যদি…”
জেনিন নোবারার হাত দুটো আলতো করে ধরল। “নূরা, আপনি কি আমাকে বিশ্বাস করেন না? আমি জেনিন নূরশাদ। আমি হারতে শিখিনি।”
নোবারা এবার এক অদ্ভুত যুক্তি দিল। সে জেনিনের হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে খাটে গিয়ে বসে পড়ল।
“ঠিক আছে, আপনি যাবেন? তবে আমাকে সাথে নিয়ে চলুন। আপনি যদি মরেন, তবে আমরা একসাথেই মরব। আর যদি না নেন, তবে আমি এখান থেকে বের হয়ে সোজা পুলিশের কাছে গিয়ে বলব, আমি সিআইডি অফিসার নোবারা, আমি মাফিয়া জেডকে প্রশ্রয় দিয়েছি। আমাকে অ্যারেস্ট করুন।”
জেনিন থমকে দাঁড়াল। সে জানত নোবারা জেদি, কিন্তু সে এভাবে ব্ল্যাকমেইল করবে তা ভাবেনি। সে একটু রেগে গিয়ে বলল,
“কী আজেবাজে বকছেন নূরা? পুলিশ আপনাকে পেলেই রিমান্ডে নেবে। আপনি কি সেই কষ্ট সহ্য করতে পারবেন?”
“আপনার বিরহ সহ্য করার চেয়ে পুলিশের রিমান্ড অনেক সহজ জেনিন।” নোবারা জেদ ধরে বসে রইল। “আপনি জানেন, আজ আমার সকাল থেকেই বাম চোখটা কাঁপছে। দাদি বলত এটা কোনো বড় বিপদের লক্ষণ। প্লিজ জেনিন, আজ অন্তত বের হবেন না। কাল যান, পরশু যান, আমি বাধা দেব না। শুধু আজকের দিনটা আমার পাশে থাকুন।”
জেনিন আকাশের দিকে তাকালো। মেঘের ঘনঘটা বাড়ছে। সে জানে নোবারা তাকে ভালোবাসে বলেই আটকাচ্ছে, কিন্তু তার মাথার ভেতরে এখন শুধু ওই গোপন চিপের চিন্তা। জেনিন এগিয়ে গিয়ে নোবারার কপালে একটা চুমু খেল।
“নূরা, ভয় পাবেন না। ইউজি আমার সাথে আছে। আমরা কোনো ঝুঁকি নেব না। দুই ঘণ্টার মধ্যে আমি ফিরে আসব। আপনার জন্য ওই প্রিয় ডার্ক চকলেটটা নিয়ে আসব, যেটা আপনি খুব পছন্দ করেন।”
নোবারা জেনিনকে জড়িয়ে ধরল। সে কিছুতেই ছাড়তে চাইছে না। তার মনে হচ্ছে, জেনিন আজ এই দরজা দিয়ে বের হওয়া মানেই চিরতরে হারিয়ে যাওয়া! কিন্তু জেনিন কে মানানো অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে!
“কথা দিন আপনি ফিরে আসবেন। কথা দিন আপনি আমাকে এসে শায়েরি শুনাবেন।”
জেনিন একটু ম্লান হাসল। “আমি কথা দিচ্ছি নূরপরী। তবে নানামি যদি আমাকে ধরতে আসে, আমি পালাব না। আমি ওকে ছোটবেলায় কথা দিয়েছিলাম, ও যদি কোনোদিন আইনের পোশাকে আমার সামনে দাঁড়ায়, আমি ওকে সম্মান জানাব। কিন্তু আজ আমাকে যেতেই হবে।”
নোবারার সব বাধা, সব যুক্তি আর সব চোখের জল উপেক্ষা করে জেনিন ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। ইউজি জেনিনের পেছনে পেছনে গেল, তবে যাওয়ার আগে নোবারার দিকে তাকিয়ে একটা আশ্বস্ত করার ইঙ্গিত দিল।
নোবারা বারান্দায় এসে দাঁড়াল। সে দেখল জেনিনের কালো এসইউভি গাড়িটা পাহাড়ের বাঁক নিয়ে নিচের দিকে নেমে যাচ্ছে। বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দটা যেন নোবারার কানে এক বিষাদময় সুর বাজাচ্ছে। নোবারা বিড়বিড় করে বলল,
“ফিরে আসুন জেনিন। আপনার ইমেজ, আপনার অহংকার, কিছুর দরকার নেই আমার। শুধু আপনাকে চাই।”
বাইপাস ভিলার গেটটা যখন বন্ধ হলো, তখন আকাশের মেঘ চিরে এক তীব্র বজ্রপাত হলো। নোবারা চমকে উঠল। প্রকৃতিও যেন আজ জেনিন নুরশাদের বিদায়ের গান গাইছে! জেনিন জানে না, শহরের মোড়ে মোড়ে নানামি তার বিশেষ ফোর্স নিয়ে আজ এক মরণফাঁদ পেতে বসে আছে। আজ আর কোনো পালানোর পথ নেই, আজ কেবল সত্যের মুখোমুখি হওয়ার পালা!
<><><><><><><><><>
শহরের বুক চিরে চলে যাওয়া দীর্ঘ হাইওয়েটা আজ যেন এক বিষাক্ত সাপের মতো ফণা তুলে আছে। জেনিন নূরশাদের কালো এসইউভি গাড়িটা বাতাসের বেগে গর্জন করে ছুটছে। স্টিয়ারিংয়ের ওপর জেনিনের দুই হাত পাথরের মতো স্থির, কিন্তু তার মস্তিষ্কের প্রতিটি নিউরন এখন সজাগ। পাশের সিটে ইউজি তার প্রিয় স্নাইপার রাইফেলটা লোড করে রেখেছে, তার দৃষ্টি বাইরের রিয়ার-ভিউ মিররে।
হঠাৎ ড্যাশবোর্ডের বিশেষ সিগন্যাল ডিভাইসটি লাল হয়ে জ্বলে উঠল। ইউজি আঁতকে উঠে বলল, “বস! আমাদের এনক্রিপ্টেড লোকেশন লিক হয়েছে! কীভাবে সম্ভব? এই সিস্টেম তো কেবল আপনার আর আমার এক্সেসে ছিল!”
জেনিন কোনো কথা বলল না। তার চোখের চাউনি আরও ধারালো হয়ে উঠল। সে জানে, এই জগতে কোনো দেওয়ালই নিরাপদ নয়। রায়ান মারা গেলেও তার তৈরি করা কোনো লুপহোল হয়তো পুলিশ খুঁজে বের করেছে। অথবা নানামি, তার সেই বন্ধু, যে জেনিনের মগজের অলিগলি সবচেয়ে ভালো চেনে।
“বস! পেছনে দেখুন!” ইউজির চিৎকারে জেনিন আয়নায় তাকালো।
চারটি সাদা-কালো পুলিশের ইন্টারসেপ্টর গাড়ি সাইরেন বাজিয়ে তেড়ে আসছে। ওপর থেকে শোনা যাচ্ছে হেলিকপ্টারের পাখার ঝাপটানি। পুরো শহর যেন এক মুহূর্তে জেনিন নুরশাদকে গিলে ফেলার জন্য জাগ্রত হয়ে উঠেছে।
“ইউজি! ব্যারিকেড ভাঙার প্রস্তুতি নাও!” জেনিন দাঁতে দাঁত চিবিয়ে গিয়ার পাল্টালো।
ইঞ্জিনের গর্জন কয়েক গুণ বেড়ে গেল। জেনিন আজ সাধারণ ড্রাইভিং করছে না, সে যেন বাতাসের সাথে জুয়া খেলছে! সামনের ট্রাফিক সিগন্যাল লাল হওয়া সত্ত্বেও সে গাড়ি থামালো না, বরং দুই লেনের মাঝখানের সামান্য ফাঁক দিয়ে বিদ্যুৎগতিতে গাড়ি বের করে নিয়ে গেল। পেছনের পুলিশের গাড়িগুলো জটলা পাকিয়ে গেল, কিন্তু ওপরের হেলিকপ্টার তাকে ছায়ার মতো অনুসরণ করছে।
“বস, ওরা সামনে বড় ব্যারিকেড দিয়েছে! অন্তত দশটা গাড়ি রাস্তা ব্লক করে দাঁড়িয়ে আছে!” ইউজি রাইফেলটা জানালার বাইরে তাক করল।
“গুলি চালাবে না ইউজি! টায়ার টার্গেট করো!” জেনিন চিৎকার করে আদেশ দিল।
ইউজির হাত কাঁপল না। প্রফেশনাল শ্যুটারের নিখুঁত নিশানায় পুলিশের প্রথম সারির একটি গাড়ির টায়ার পাংচার হয়ে গেল। জেনিন সেই সুযোগে গাড়িটি এক ঝটকায় ফুটপাতে উঠিয়ে দিয়ে ব্যারিকেড পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে গেল। ঝনঝন করে কাঁচ ভাঙার শব্দ আর সাইরেনের চিৎকার পেছনে পড়ে রইল।
কিন্তু শান্তি বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। শহরের শেষ সীমানায়, ব্রিজের ওপর পৌঁছাতেই জেনিন দেখল এক ভয়াবহ দৃশ্য। ব্রিজের দুই মুখ সিল করে দেওয়া হয়েছে। সামনে নীল বাতি জ্বালানো পুলিশের বিশাল বহর। আর ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে একজন মানুষ, ইন্সপেক্টর নানামি। তার গায়ে পুলিশের ইউনিফর্ম, চোখে সেই পুরনো গম্ভীর চাউনি, আর হাতে ধরা তার সার্ভিস রিভলভার। ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম এ তাকে শিফট করে দেওয়া হয়েছে শুধুমাত্র জেড কে ধরার জন্য! ভাগ্য কি এক নিষ্ঠুর খেলা খেলছে! সে গতবার জেনিনকে পালানোর সুযোগ করে দেওয়ার পরও এবার আর ছাড় দিতে পারলো না, তাকে ছাড় দিতে দেওয়াই হলো না!
জেনিন সজোরে ব্রেক কষল। টায়ারের ঘর্ষণে রাস্তা থেকে ধোঁয়া আর পোড়া গন্ধ বের হতে লাগল। গাড়িটা ঠিক নানামির থেকে দশ ফিট দূরে গিয়ে থামল।
ইউজি চিৎকার করে উঠল, “বস! রিভার্স নিন! আমরা ব্রিজের রেলিং ভেঙে নিচে ঝাঁপ দেব! এখনো সময় আছে! আমি ওদের কভার দিচ্ছি, আপনি বেরোন!”
জেনিন নড়ল না। তার হাত স্টিয়ারিং থেকে আলগা হয়ে এল। সে কাঁচের ওপাশে নানামিকে দেখছিল। সেই ছোটবেলার টিফিন ভাগ করে খাওয়া বন্ধু, যে একদিন জেনিনের সাথে স্কুল পালিয়েছিল, সে আজ তাকে হাতকড়া পরাতে দাঁড়িয়ে আছে।
জেনিনের মনে পড়ে গেল সেই বৃষ্টির দিনের কথা, যখন নানামি পুলিশে জয়েন করার আগে বলেছিল—”নুরশাদ, যদি কোনোদিন তুই ভুল পথে যাস, তবে আমিই তোকে রুখব।”
জেনিন সেদিন হেসে বলেছিল
—”তুই এলে আমি পালাব না রে জায়দান!”
“বস! কী করছেন? ওরা ঘিরে ফেলছে!” ইউজি জেনিনের কাঁধ ধরে ঝাকুনি দিল। “এদের দয়া করবেন না! নানামি এখন আপনার বন্ধু নয়, ও আপনার মৃত্যুদূত!”
জেনিন ধীর হাতে গাড়ির দরজা খুলল। সে গাড়ি থেকে বাইরে বেরিয়ে এল। চারপাশ থেকে অন্তত বিশটি পিস্তল তার বুক লক্ষ্য করে তাক করা। লাল লেজার লাইটগুলো জেনিনের কপালে আর বুকে স্থির হয়ে আছে।
নানামি এক পা এগিয়ে এল। তার কণ্ঠস্বর কাঁপছে না, কিন্তু চোখের কোণটা লাল।
“হাত ওপরে তোলো জেড! আর কোনো পালানোর পথ নেই। সারেন্ডার করো!”
জেনিন একটা ম্লান হাসি হাসল। সে দু হাত ওপরে তুলল না, সে বীরদর্পে হেঁটে সামনে এগোচ্ছে!
“জায়দান, তুই কি আসলেই বিশ্বাস করিস আমি তোকে শ্যুট করতে পারব না? আমার ইশারা পেলে ইউজি তোকে এক সেকেন্ডে উড়িয়ে দিতে পারে।”
“আমি জানি তুই পারবি,” নানামির গলায় অদ্ভুত এক তৃষ্ণা। “কিন্তু তুই করবি না। কারণ তুই আজও আমার পুরনো নুরশাদ-ই আছিস, যে বন্ধুত্বের জন্য নিজের সাম্রাজ্য বিলিয়ে দিতে পারে।”
ইউজি গাড়ি থেকে নেমে জেনিনের পাশে এসে দাঁড়াল, তার রাইফেল নানামির বুক বরাবর।
“বস! অর্ডার দিন! আমি রাস্তা পরিষ্কার করে দিচ্ছি! আপনি বাঁচলে তবেই নোবারা ম্যাম বাঁচবেন!”
জেনিন ইউজির দিকে তাকালো। তারপর নানামির দিকে। একপাশে তার প্রিয় বন্ধু, অন্যপাশে তার বাঁচার শেষ অবলম্বন। জেনিনের চোখে আজ জল নেই, কিন্তু বুকে এক তীব্র দহন। সে নানামির বিশ্বাসঘাতকতা মেনে নিতে পারছিল না, আবার তাকে আঘাত করার ক্ষমতাও তার নেই।
“ইউজি, গান ডাউন করো।” জেনিন ফিসফিস করে বলল।
“বস!” ইউজি অবিশ্বাসে চিৎকার করল।
“এটা আমার অর্ডার!” জেনিন গর্জে উঠল।
পুরো ব্রিজের ওপর এক শ্মশানের নীরবতা নেমে এল। জেনিন নূরশাদ আজ তার শত্রুর কাছে নয়, তার বন্ধুত্বের কাছে হেরে যেতে রাজি হয়েছে। সে জানে এর পরিণাম কী, সে জানে নোবারা বাড়িতে তার জন্য অপেক্ষা করছে। কিন্তু জেনিনের ভেতরের সেই আদিম আবেগ আজ তার টিকে থাকার নেশাকে হারিয়ে দিয়েছে।
নানামি তার বন্দুকটা আরও শক্ত করে ধরল। সে জানে জেনিন এখন নিরস্ত্র, কিন্তু সে এটাও জানে জেনিন নুরশাদকে জীবিত গ্রেফতার করা মানে তাকে তিলে তিলে মরতে দেখা। নানামির আদর্শ আর জেনিনের আবেগ আজ এক সংঘাতের মোহনায় এসে দাঁড়িয়েছে।
জেনিন নূরশাদ তার দু হাত দু পাশে ঝুলিয়ে দিয়ে শান্ত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে। তার সাদা শার্টের ওপর এখন পুলিশের ডজনখানেক লেজার লাইটের লাল বিন্দু খেলা করছে, ঠিক যেন তার মৃত্যুর ক্ষণ গণনা শুরু হয়েছে।
ইউজি জেনিনের পেছনে পজিশন নিয়ে ফিসফিস করে বলল, “বস, আপনি যা করছেন তা সুই’সাইড! নানামি আজ আপনাকে ছেড়ে দেবে না। ওর চোখে আইন ছাড়া আর কিছু নেই। এখনো সময় আছে, আমার কাভার নিয়ে গাড়িতে উঠুন। আমি ল্যান্ডমাইনগুলো ডিটোনেট করে দিচ্ছি!”
জেনিন কোনো উত্তর দিল না। তার দৃষ্টি স্থির হয়ে আছে নানামির ওপর। নানামির হাতের রিভলভারটা কাঁপছে। প্রফেশনাল ট্রেনিং আর কয়েক বছরের সার্ভিস নানামিকে একজন নিখুঁত অফিসার বানিয়েছে ঠিকই, কিন্তু আজ তার ভেতরের সেই স্কুলপড়ুয়া ছেলেটা হাহাকার করে উঠছে। নানামি জানে, জেনিন নূরশাদকে সে আজ হাতকড়া পরাতে পারবে না। কারণ জেনিন কোনোদিন পরাজয় মেনে নিয়ে কারাগারে পচবে না। জেনিন আজ এসেছে তার বন্ধুর হাতে মুক্তি পেতে।
“নুরশাদ!” নানামির কণ্ঠস্বর কান্নায় বুজে এল। সে চিৎকার করে বলল, “সারেন্ডার কর! কেন তুই আমাকে এই দোলাচলে ফেলছিস? আমি আইন মানতে বাধ্য! আমার ওপর ওপরতলার প্রচণ্ড চাপ আছে। তুই একটুও নড়বি না!”
জেনিন এক পা এগিয়ে এল। সাথে সাথে অন্য পুলিশ অফিসাররা ট্রিগারে আঙুল বসাল।
“থামুন সবাই! কেউ ফায়ার করবেন না!” নানামি চিৎকার করে উঠল। কিন্তু জেনিন থামল না। সে দ্বিতীয় পদক্ষেপটা নিল। জেনিনের ঠোঁটে এক অদ্ভুত তৃপ্তির হাসি। সে জানে নানামি তাকে মারতে চায় না, কিন্তু নানামির আদর্শের সামনে আজ জেনিন নূরশাদ এক বিরাট বাধা।
“জায়দান” জেনিন খুব নিচু স্বরে বলল, যা কেবল বাতাসের টানে নানামির কান পর্যন্ত পৌঁছাল।
“তুই তো জানিস, এই দুনিয়ায় আমার জেদের চেয়ে বড় আর কিছু নেই!”
নানামি আর নিজেকে সামলাতে পারল না। জেনিনের তৃতীয় কদমটা পড়তেই এক প্রচণ্ড শব্দের প্রতিধ্বনি হলো ব্রিজের ওপর।
‘ঠাস!’
বাতাসে বারুদের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল। জেনিন নূরশাদ এক মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়াল। তার সাদা শার্টের বাঁ পাশে, ঠিক হৃদপিণ্ডের একটু নিচে লাল একটা গোলাপ ফুটতে শুরু করেছে। রক্তটা খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। জেনিনের পা দুটো টলে উঠল। সে এক হাত দিয়ে বুকের ক্ষতটা চেপে ধরল, অন্য হাতটা বাতাসের দিকে বাড়িয়ে দিল যেন সে কিছু ধরতে চাইছে।
জেনিন ধীরগতিতে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। তার মাথাটা পাথুরে রাস্তার ওপর আছড়ে পড়ার আগেই নানামি সমস্ত প্রোটোকল ভেঙে দৌড়ে এসে জেনিনকে জাপ্টে ধরল। সে জেনিনের মাথাটা নিজের কোলের ওপর তুলে নিল।
“নুরশাদ! তুই এটা কেন করলি? কেন তুই নড়লি?” নানামি ডুকরে কেঁদে উঠল। তার দু হাত এখন জেনিনের রক্তে ভেজা। সে পাগলের মতো চিৎকার করতে লাগল, “অ্যাম্বুলেন্স ডাকুন! কেউ একজন হেল্প করুন!”
ইউজি তখন পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সে তার রাইফেলটা বাগিয়ে ধরেছে ঠিকই, কিন্তু তার নিজের চোখের সামনে বসকে এভাবে লুটিয়ে পড়তে দেখে সে যেন বাকরুদ্ধ হয়ে গেছে। তার প্রফেশনাল শ্যুটার সত্তা আজ শোকের কাছে হার মেনে নিয়েছে!
জেনিন খুব কষ্টে চোখ মেলল। তার নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে, ঠোঁট দুটো নীল হয়ে আসছে। সে নানামির রক্তমাখা হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিল। জেনিনের কণ্ঠস্বর এখন বড্ড ক্ষীণ, যেন সুদূর কোনো জগত থেকে ভেসে আসছে।
“আমি… আমি জীবনে কোনোদিন মন খুলে হাসিনি। সারাজীবন শুধু রক্তের সাগরে সাঁতার কেটেছি। কিন্তু আজ… আজ আমার বড্ড হালকা লাগছে।”
জেনিন একটু থামল। তার নিশ্বাস এখন খুব ছোট ছোট হয়ে আসছে। সে নানামির কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“আমার নূরাকে…নোবারাকে বলে রাখিস, ওকে আমি বড্ড ভালোবাসি। ও যেন নিজেকে দোষ না দেয়। আর আমার বন্ধু…আমার বেস্ট ফ্রেন্ড জায়দান… ওর ওপর আমার কোনো রাগ নেই। ও শুধু ওর দায়িত্ব পালন করেছে।”
জেনিন যখন কথাগুলো বলছিল, তার চোখের কোণ দিয়ে এক ফোঁটা লোনা জল গড়িয়ে পড়ল। তার দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসছে। সে দূরে আকাশের দিকে তাকাল, যেখানে একটা পাখি একাকী উড়ছে। জেনিন অনুভব করল তার শরীরের সমস্ত শক্তি ফুরিয়ে আসছে। সে ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করে ফেলল।
নানামি জেনিনের নিথর দেহের ওপর ঝুকে পড়ল। সে জেনিনের কানের কাছে মুখ নিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়া গলায় ফিসফিস করে বলল,
“নূরশাদ… জেনিন নূরশাদ… তুই আমার বন্ধু নয়, তুই আমার আত্মার অংশ। আমার বেস্ট ফ্রেন্ড!”
ঠিক সেই মুহূর্তে জেনিনের নিস্তেজ ঠোঁটের কোণে এক চিলতে মিষ্টি হাসি ফুটে উঠল। এক মরণাপন্ন মানুষের মুখে এমন স্বর্গীয় হাসি নানামি কোনোদিন দেখেনি। জেনিন যেন এই শব্দগুলো শোনার জন্যই এতক্ষণ তার শেষ প্রাণটুকু ধরে রেখেছিল!
জেনিনের হাতটা নানামির হাতের ওপর থেকে ঝুলে পড়ল। চারপাশটা যেন এক লহমায় নিস্তব্ধ হয়ে গেল। সাগরের ঢেউয়ের শব্দ আর সাইরেনের আওয়াজ, সবই যেন থমকে দাঁড়িয়েছে এই বিয়োগান্তক দৃশ্যের সামনে।
নানামি জেনিনের মৃতদেহটা বুকে জড়িয়ে ধরে আকাশবিদারী চিৎকার করে উঠল। পুলিশের অন্য অফিসাররা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। এক দুর্ধর্ষ মাফিয়া ডন নয়, আজ তারা একজন হারানো বন্ধুর বিলাপ দেখছে!
কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই রণক্ষেত্রের নিস্তব্ধতা ভেঙে গেল। ইউজি বুঝতে পারল, এটা শোক করার সময় নয়, এটা জেনিন নূরশাদকে উদ্ধার করার সময়। জেনিন মরেনি, সে জেনিনকে মরতে দিতে পারে না। সে নিজের জীবন দিয়ে দিবে, তবুও জেনিনকে সুরক্ষিত রাখবে!
ইউজি এক ঝটকায় তার পকেটে থাকা স্মোক গ্রেনেডগুলো ব্রিজের চারদিকে ছুড়ে মারল। মুহূর্তের মধ্যে সাদা ধোঁয়ায় পুরো ব্রিজটা ছেয়ে গেল। কেউ কাউকে দেখতে পাচ্ছে না।
ব্রিজের পেছনের পুলিশের গাড়িগুলোর নিচে রাখা ল্যান্ডমাইনগুলো বিস্ফোরিত হলো। ধোঁয়া আর আগুনের লেলিহান শিখার মাঝখানে ইউজি বিদ্যুৎগতিতে এগিয়ে এল। সে নানামির কোল থেকে জেনিনের দেহটা ছিনিয়ে নিল। নানামি ধোঁয়ার কারণে কিছু দেখতে পাচ্ছিল না, সে শুধু অনুভব করল তার কোল থেকে জেনিনকে কেউ নিয়ে গেছে।
“নুরশাদ! জেনিন!” নানামি চিৎকার করতে লাগল।
ইউজি জেনিনের দেহটা ঘাড়ে নিয়ে ব্রিজের রেলিংয়ের দিকে দৌড়াতে লাগল। পেছনে পুলিশের বুলেট বৃষ্টির মতো আছড়ে পড়ছে, কিন্তু ধোঁয়ার কারণে কারো নিশানাই ঠিক নেই। ইউজি আগে থেকেই ব্রিজের নিচে একটি স্পিডবোট প্রস্তুত রেখেছিল। সে জেনিনকে নিয়ে সরাসরি রেলিংয়ের ওপর দিয়ে বিশ ফুট নিচে সাগরের লোনা পানিতে ঝাঁপ দিল।
পানির প্রচণ্ড ঝাপটায় ইউজি আর জেনিন তলিয়ে গেল। ওপরে তখন পুলিশের চিৎকার আর আগুনের তান্ডব। নানামি ধোঁয়ার ভেতর দিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে রেলিংয়ের কাছে এল, কিন্তু সাগরের বুক চিরে একটি স্পিডবোট ততক্ষণে তীরের মতো দূরে চলে যাচ্ছে।
ইউজি স্পিডবোটের ড্রাইভিং সিটে বসে এক হাতে স্টিয়ারিং ধরল, অন্য হাতে জেনিনের বুকের ক্ষতটা চেপে ধরল। জেনিন তখনো অজ্ঞান, তার মুখটা ফ্যাকাশে সাদা।
“বস! আপনাকে মরতে দেব না! আপনি ম্যামকে কথা দিয়েছিলেন আপনি ফিরে আসবেন!”
ইউজির চোখে জল, কিন্তু তার হাত কাঁপছে না। সে স্পিডবোটের গতি বাড়িয়ে দিল সর্বোচ্চ সীমানায়।
শহরের আকাশে তখন রাত নামছে। পুলিশের হেলিকপ্টারগুলো সাগরের ওপর সার্চলাইট ফেলছে, কিন্তু ইউজির সেই বিশেষ স্পিডবোট তখন রাডার ফাঁকি দিয়ে অনেক দূরে চলে গেছে। নানামি ব্রিজের ওপর দাঁড়িয়ে সাগরের দিকে তাকিয়ে রইল। সে জানে না জেনিন বেঁচে আছে কি না, কিন্তু সে এটা জানে যে, আজ থেকে তার পৃথিবীটা চিরতরে বদলে গেছে।
নোবারা তখন বাইপাস ভিলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। হঠাৎ করে তার বাম চোখের কাঁপুনি থেমে গেল। কিন্তু তার বুকটা এক অদ্ভুত ভয়ে খাঁ খাঁ করে উঠল। সে জানে না, তার জেনিন আজ এক নতুন জীবনের যুদ্ধে লিপ্ত, যেখানে মৃত্যু আর জীবনের মাঝে কেবল এক সূক্ষ্ম সুতোর ব্যবধান।
চলবে ইংশাআল্লাহ…….
(জেনিনকে মেরে দিলাম! রাগ করলা?🫢)

