#Soulmate_to_Enemy |৬৩|
লেখনীতে: #মিফতাহুল_জান্নাত_জেমিম
ভোরের আলো ফোটার আগেই পুরো দেশ যেন এক তীব্র ভূকম্পনে জেগে উঠল। তবে এ কম্পন মাটির নয়, এ কম্পন সংবাদের। টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর ব্রেকিং নিউজ স্ক্রল, অনলাইন পোর্টালের লাল নোটিফিকেশন আর ভোরের কাগজের প্রধান শিরোনাম, সব একবিন্দুতে এসে মিশেছে। একটি নাম, যা প্রায় গত এক দশক ধরে দেশের আন্ডারওয়ার্ল্ড থেকে শুরু করে প্রশাসনের উচ্চমহল পর্যন্ত ত্রাসের সঞ্চার করেছিল, সেই নামটির আজ অবসান ঘটেছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
“মাফিয়া ডন জেনিন নুরশাদ ওরফে জেড পুলিশের গুলিতে নিহত।”
প্রতিটি নিউজ চ্যানেলের স্টুডিওতে তখন তুমুল উত্তেজনা। স্ক্রিনে বারবার দেখানো হচ্ছে সেই ব্রিজের ঝাপসা ফুটেজ, যেখানে ধোঁয়ার কুণ্ডলী আর পুলিশের সাইরেনের মাঝে এক পুরুষ এর লুটিয়ে পড়ার দৃশ্য দেখা যাচ্ছে। সংবাদ পাঠিকারা উত্তেজিত কণ্ঠে বলে চলেছেন,
“দর্শক, এই মুহূর্তের সবচাইতে বড় খবর। প্রায় এক দশক ধরে প্রশাসনের ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকা দুর্ধর্ষ মাফিয়া সম্রাট জেনিন নুরশাদ গতকাল সন্ধ্যায় কর্ণফুলী ব্রিজের ওপর এক শ্বাসরুদ্ধকর অভিযানে নিহত হয়েছেন। ডিবি এবং সিটিটিসি-র সমন্বিত এই অভিযানে নেতৃত্ব দিয়েছেন আলোচিত পুলিশ অফিসার নানামি জায়দান। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, জেনিন নুরশাদকে আত্মসমর্পণ করতে বলা হলেও তিনি পালানোর চেষ্টা করেন এবং এক পর্যায়ে ইন্সপেক্টর নানামির গুলিতে তিনি লুটিয়ে পড়েন। তবে নাটকীয়ভাবে তার সহযোগী ইউজি জেনিনের দেহ নিয়ে নদীতে ঝাঁপ দেন। পুলিশ দীর্ঘক্ষণ তল্লাশি চালিয়েও এখনো লাশ উদ্ধার করতে পারেনি। তবে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের দাবি, অত উচ্চতা থেকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় নদীতে পড়ে বেঁচে থাকা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।”
শহরের মোড়ে মোড়ে চায়ের দোকানে তখন লোকে লোকারণ্য। খবরের কাগজের প্রথম পাতায় বড় করে জেনিনের রহস্যময় ছবিটা ছাপা হয়েছে, কালো চশমা আর সাদা শার্টের সেই অবয়ব। হেডলাইনগুলো যেন একেকটা তীরের মতো বিঁধছে সাধারণ মানুষের চোখে!
“বন্ধুর হাতেই ইতি ঘটল মাফিয়া জেডের রাজত্বের।”
“বীরত্ব না বিশ্বাসঘাতকতা? ইন্সপেক্টর নানামির গুলিতে লুটিয়ে পড়ল ছোটবেলার বন্ধু।”
সংবাদপত্রগুলোর সম্পাদকীয় পাতায় বিশদ বিশ্লেষণ শুরু হয়েছে। কেউ বলছেন এটি আইনের বিজয়, কেউ আবার সন্দেহ প্রকাশ করছেন লাশের অনুপস্থিতি নিয়ে। কোনো কোনো পত্রিকা তো সরাসরি প্রশ্ন তুলেছে,
“লাশ কই? যদি জেনিন নুরশাদ সত্যিই মারা গিয়ে থাকে, তবে তার নিথর দেহটা কোথায়?” কিন্তু পুলিশ সদর দফতর থেকে আসা প্রেস রিলিজ বলছে অন্য কথা। সেখানে স্পষ্টভাবে লেখা হয়েছে, জেনিনের রক্তমাখা শার্টের অংশ এবং ব্রিজের ওপর পড়ে থাকা রক্তের ডিএনএ জেনিনের প্রোফাইলের সাথে মিলে গেছে। অর্থাৎ, শারীরিকভাবে তার বেঁচে থাকার সম্ভাবনা শূন্য শতাংশ!
এদিকে পুলিশ হেডকোয়ার্টারে তখন এক থমথমে এবং উৎসবমুখর পরিবেশের অদ্ভুত মিশেল। আইজিপি থেকে শুরু করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বড় বড় কর্তারা আজ হাজির হয়েছেন। কারণ, জেনিন নুরশাদকে খতম করার মাধ্যমে দেশ এক বিশাল কালিমামুক্ত হয়েছে বলে তারা মনে করছেন। আর এই বিশাল অর্জনের একক কারিগর হিসেবে ইন্সপেক্টর নানামিকে আজ বিশেষ সম্মাননা ও পদোন্নতি দেওয়া হচ্ছে।
কনফারেন্স রুমের বিশাল ওক কাঠের টেবিলের চারপাশে বসে আছেন জাঁদরেল সব কর্মকর্তারা। রুমের এক কোণে নানামি দাঁড়িয়ে আছে। তার পরনে ইস্ত্রি করা নিখুঁত ইউনিফর্ম, কিন্তু তার মুখটা আজ শবের মতো ফ্যাকাশে। চোখের নিচে কালি জমেছে, গত রাতে সে এক মুহূর্তের জন্যও চোখ বন্ধ করতে পারেনি। তার কানে এখনো জেনিনের সেই শেষ শব্দগুলো বাজছে!
নানামির এই নিস্তব্ধতাকে উপস্থিত কর্মকর্তারা বিজয়ীর গাম্ভীর্য বলে ভুল করছেন। আইজিপি সাহেব গদগদ হয়ে নানামির পিঠ চাপড়ে বললেন, “ওয়েল ডান নানামি! তুমি যা করেছ, তা এদেশের ক্রাইম হিস্ট্রিতে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। জেড-কে ধরা মানে একটা জীবন্ত আগ্নেয়গিরিকে শান্ত করা। আজ থেকে তুমি আর অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার নও, তোমাকে সরাসরি ডিপুটি কমিশনার (DC) হিসেবে প্রমোট করা হচ্ছে। কংগ্রাচুলেশনস ম্যান!”
চারপাশে তালি বাজল। কিন্তু নানামির কানে তালির শব্দ যেন বিষের মতো বাজছে। সে শুধু যান্ত্রিকভাবে মাথা নিচু করল।
সভার এক পর্যায়ে সিআইডির ডিআইজি সাহেব গলা পরিষ্কার করে মূল প্রসংগে এলেন। তার চোখেমুখে এবার কুটিল চাউনি। তিনি টেবিলের ওপর একটি ফাইল ছুড়ে দিয়ে বললেন,
“এবার আসা যাক অন্য একটি স্পর্শকাতর বিষয়ে। জেনিন নুরশাদ তো শেষ। কিন্তু এই সাম্রাজ্যের সাথে জড়িয়ে আছে আমাদেরই এক অফিসারের নাম। অফিসার নোবারা, এনএ।”
পুরো রুমে নীরবতা নেমে এল। নোবারার নামটা আসতেই নানামির শরীর শক্ত হয়ে গেল।
ডিআইজি সাহেব বলতে লাগলেন,
“অফিসার নোবারা আমাদের সিআইডির একজন দক্ষ এজেন্ট ছিলেন। মাহিতোর বিশেষ মিশনে তিনি জেডের কাছে গিয়েছিলেন। কিন্তু তদন্ত রিপোর্ট বলছে, তিনি মিশনের চেয়ে জেডের ‘বউ’ হিসেবেই বেশি পরিচিতি পেয়েছেন। প্রশ্ন হচ্ছে, একজন দেশের আইন রক্ষাকারী হয়ে তিনি কীভাবে একজন মোস্ট ওয়ান্টেড অপরাধীর শয্যাসঙ্গিনী হলেন? তিনি কি আমাদের সাথে বেইমানি করেছেন? নাকি তিনি স্টকহোম সিনড্রোমে আক্রান্ত?”
অন্য একজন অফিসার ফোড়ন কাটলেন,
“স্যার, ব্যাপারটা কিন্তু সাধারণ নয়। জেনিনের মতো লোক কাউকে এমনি এমনি বিশ্বাস করে না। নোবারা নিশ্চয়ই জেনিনকে আমাদের ইন্টারনাল অনেক ইনফরমেশন দিয়েছেন। আমাদের তো উচিত নোবারাকে রাজদ্রোহিতার অপরাধে গ্রেপ্তার করা।”
নানামি এবার মুখ খুলল। তার কণ্ঠস্বর শীতল কিন্তু তীক্ষ্ণ।
“স্যার, জেনিন নুরশাদ একজন সাইকোপ্যাথ লেভেলের বুদ্ধিমান লোক ছিলেন। হতে পারে অফিসার নোবারা নিজেকে বাঁচানোর জন্য ওই বিয়ের অভিনয় করেছিলেন।”
“অভিনয়?” ডিআইজি সাহেব তাচ্ছিল্যের হাসি হাসলেন। “অভিনয় আর বাস্তবের সীমা তিনি অতিক্রম করে ফেলেছেন। আমাদের গোয়েন্দা সংস্থার কাছে খবর আছে, নোবারা জেনিনের জন্য সিআইডির পরিচয় ত্যাগ করতেও রাজি ছিলেন। তিনি এখন কোথায়? তাকে খুঁজে বের করা আমাদের এখনকার প্রধান কাজ।”
নানামি শান্ত গলায় বলল,
“জেনিন মারা যাওয়ার পর নোবারা মানসিকভাবে বিধ্বস্ত হবেন নিশ্চয়ই। তাকে গ্রেপ্তার করলে ডিপার্টমেন্টের ইমেজের ক্ষতি হবে। কারণ তিনি এখনো আমাদের খাতায় একজন আন্ডারকাভার এজেন্ট। জনসমক্ষে যদি প্রকাশ পায় যে আমাদের অফিসার একজন মাফিয়ার স্ত্রী ছিলেন, তবে জনগণের আস্থা কমে যাবে।”
রুমের মধ্যে গুঞ্জন শুরু হলো। নানামির যুক্তিটা ফেলনা নয়। তবে প্রশাসনের উচ্চমহল নোবারাকে নিয়ে বড্ড দুশ্চিন্তায়। তারা জানে, নোবারার কাছে এমন অনেক তথ্য আছে যা বাইরে এলে অনেক বড় বড় মাথা কাটা পড়বে।
আইজিপি সাহেব টেবিল চাপড়ে বললেন,
“ঠিক আছে। নোবারাকে এখনই গ্রেপ্তার করার দরকার নেই। তবে তাকে নজরবন্দি রাখতে হবে। নানামি, তুমি যেহেতু জেনিনের কেসটা সলভ করেছ, নোবারার দায়িত্বও আমি তোমার ওপর দিচ্ছি। তাকে খুঁজে বের করো। তাকে বুঝিয়ে শুনিয়ে আমাদের সেফ-হাউসে নিয়ে আসো। সে যেন কোনোভাবেই সংবাদমাধ্যমের সামনে না যায়। তাকে দিয়ে আমাদের ড্যামেজ কন্ট্রোল করতে হবে।”
নানামি স্যালুট দিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে এল। করিডোর দিয়ে হাঁটার সময় তার মনে হলো পায়ের নিচের মেঝেটা দুলছে। পুরো দেশ আনন্দ করছে জেনিনের মৃত্যুতে, আর নানামি জানে সে তার নিজের হৃদপিণ্ডটা ছিঁড়ে রাস্তায় ফেলে এসেছে। এখন তার সামনে আরও বড় চ্যালেঞ্জ, নোবারা।
নোবারা যখন জানবে জেনিন নেই, আর তার খুনি খোদ নানামি, তখন সে কী করবে? নোবারা কি নানামিকে ক্ষমা করবে? নাকি এই ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে শুরু হবে এক নতুন প্রতিহিংসার গল্প? নানামি তার গাড়িতে গিয়ে বসল। ড্রাইভারকে নির্দেশ দিল চট্টগ্রামের বাইরে রাঙামাটির দিকে রওনা হতে। তার পাশে রাখা ফাইলে নোবারার ছবিটা হাসছে। নানামি মনে মনে বলল,
“নোবারা, নুরশাদ তোমাকে আমার কাছে আমানত রেখে গেছে। আমি জানি তুমি আমাকে ঘৃণা করবে, কিন্তু তোমাকে বাঁচিয়ে রাখাটাই এখন আমার একমাত্র প্রায়শ্চিত্ত! আশা করি তনুজাও এতে আপত্তি করবে না।”
শহরের দেওয়ালে দেওয়ালে তখনো জেনিনের পোস্টারগুলো ছিঁড়ে ফেলা হচ্ছে। একটি যুগ শেষ হয়েছে, কিন্তু যন্ত্রণার যে নতুন অধ্যায় শুরু হতে যাচ্ছে, তার খবর এখনো কেউ জানে না। নিউজ চ্যানেলগুলো তখনো জেনিনের লাশের সন্ধানে ডুবুরিদের তৎপরতা লাইভ দেখাচ্ছে, অথচ আসল সত্যটা তখনো কর্ণফুলীর গভীর অন্ধকারেই চাপা পড়ে আছে!
<><><><><><><><><>
বাইপাস ভিলার চারপাশটা আজ অস্বাভাবিক নিস্তব্ধ। পাহাড়ের বুক চিরে বয়ে যাওয়া ঝরনার শব্দটাও যেন আজ কোনো এক অশুভ কান্নায় রূপ নিয়েছে। বকুলতলার ভেজা মাটির গন্ধ আর সাগরের লোনা হাওয়া মিলেমিশে পুরো প্রাসাদে এক গুমোট শোকের আবহাওয়া তৈরি করেছে। নোবারা জানালার পাশে বসে ছিল। তার কোলে জেনিনের ফেলে যাওয়া ডায়েরিটা, যা সে কাল রাতে পড়ার সুযোগ পায়নি। তার মনটা আজ সকাল থেকেই কু ডাকছে। বাম চোখটা এখনো থেমে থেমে কাঁপছে। জেনিন দুই ঘণ্টার কথা বলে গিয়েছিল, অথচ বারো ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে। ভোরের আলো ফুটেছে অনেক আগে, কিন্তু জেনিন ফেরেনি!
ইউজির ফোনটাও বন্ধ। জেনিনের বডিগার্ডদের কারোর সাথে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। নোবারা বারবার বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াচ্ছে, যদি সেই পরিচিত এসইউভি গাড়ির হর্ন শোনা যায়। কিন্তু না, পাহাড়ের আঁকাবাঁকা রাস্তায় কেবল ধূসর কুয়াশা খেলা করছে।
নোবারা ধীর পায়ে ড্রয়িংরুমে এসে বসল। তার হাত-পা বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে আসছে। এক অজানা আতঙ্কে তার দম আটকে আসছে। সে কাঁপা কাঁপে রিমোটটা তুলে নিয়ে টিভিটা অন করল। সে ভেবেছিল হয়তো ট্রাফিক জ্যাম বা অন্য কোনো ছোটখাটো ঝামেলার খবর পাবে। কিন্তু স্ক্রিনটা জ্বলে উঠতেই যা দেখল, তাতে তার হৃদপিণ্ডের গতি এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল।
নিউজ চ্যানেলের স্ক্রিনজুড়ে তখন লাল রঙের বড় বড় হরফে লেখা,
“ব্রেকিং নিউজ: মাফিয়া সম্রাট জেনিন নুরশাদ ওরফে জেড মৃত।”
নোবারার চোখের মণি স্থির হয়ে গেল। সে ভাবল হয়তো সে ভুল দেখছে। তার মস্তিষ্ক এই তথ্যটা গ্রহণ করতে অস্বীকার করল। সে রিমোটটা শক্ত করে ধরল, তার আঙুলের কড়াগুলো সাদা হয়ে এল। স্ক্রিনে তখন কর্ণফুলী ব্রিজের ফুটেজটা দেখানো হচ্ছে। ধোঁয়া, রক্ত আর সাইরেনের চিৎকার। সংবাদ পাঠিকার কণ্ঠস্বর নোবারার কানে গরম সীসার মতো বিঁধতে লাগল,
“দর্শক, আমরা নিশ্চিত হয়েছি যে পুলিশের স্পেশাল অপারেশনে জেনিন নূরশাদ নিহত হয়েছেন। অপারেশনটি লিড করেছেন ইন্সপেক্টর নানামি জায়দান। জেডের দেহটি নদীতে পড়ে নিখোঁজ থাকলেও ব্রিজের ওপর পাওয়া রক্তের নমুনা বলছে, তার বেঁচে থাকার কোনো সম্ভাবনা নেই। জেনিন নুরশাদ নামের অধ্যায়ের চিরতরে অবসান ঘটল…”
নোবারার হাত থেকে রিমোটটা ফ্লোরে পড়ে গেল। ঝনঝন করে ব্যাটারিগুলো বেরিয়ে এল। নোবারা স্থাণুর মতো বসে রইল। তার চোখ দিয়ে এক ফোঁটা জলও পড়ল না, কিন্তু তার বুকের ভেতরটা যেন কেউ জীবন্ত অবস্থায় চিরে আলাদা করে ফেলছে। সে চিৎকার করতে চাইল, কিন্তু গলা দিয়ে কোনো স্বর বের হলো না। শুধু একটা অদ্ভুত ঘড়ঘড়ে শব্দ হলো।
“না…” নোবারা ফিসফিস করে বলল।
“না, এটা হতে পারে না। ও… ও আমাকে কথা দিয়েছে ও ফিরে আসবে!”
সে টলতে টলতে টিভির স্ক্রিনের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। স্ক্রিনে তখন জেনিনের সাদা শার্টের রক্তমাখা অংশটা দেখানো হচ্ছে। নোবারা স্ক্রিনে হাত রাখল। তার মনে হলো সে জেনিনের শরীরের সেই ওম অনুভব করতে পারছে। হঠাৎ তার চোখের সামনে ভেসে উঠল জেনিনের হাসিমুখ, সেই পজেসিভ চাহনি, সেই আদুরে জেদ।
“নূরা, আপনি কি আমাকে বিশ্বাস করেন না? আমি জেনিন নুরশাদ। আমি হারতে শিখিনি।”
জেনিনের কণ্ঠস্বরটা যেন পুরো ঘরে প্রতিধ্বনি হতে লাগল।
নোবারা এবার চিৎকার করে উঠল। এক আদিম, বুক চেরা আর্তনাদ যা ভিলার দেয়ালগুলোতে আছড়ে পড়ল। “জেনিইইইইইইইইন!”
তার সারা শরীর থরথর করে কাঁপতে লাগল। সে মেঝেতে বসে পড়ল। তার নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। ফুসফুস যেন বাতাস টানতে পারছে না। একেই কি প্যানিক অ্যাটাক বলে? নোবারার মনে হলো তার চারদিকের দেয়ালগুলো সংকুচিত হয়ে আসছে। সে দু হাতে নিজের গলা চেপে ধরল। তার মনে হচ্ছে কেউ তার অক্সিজেন কেড়ে নিয়েছে।
“নানামি…” নোবারা দাঁতে দাঁত চিপে নামটা উচ্চারণ করল। তার প্রিয় বন্ধু, তার জেনিনের বেস্ট ফ্রেন্ড জেনিনকে মেরে ফেলেছে? যে জেনিন নানামির জন্য আত্মসমর্পণ করতেও রাজি ছিল, সেই জেনিনকে নানামি গুলি করল? যে জেনিন সিআইডি পুলিশ রেব পুরো প্রসাশন কে ধোঁকা দিয়ে পালিয়ে আসতে পেরেছে এতোদূর! সে কি না নিজের দুর্বলতার কাছে মৃত্যুবরণ করলো?
নোবারার চোখের সামনে জেনিনের মুখটা ঝাপসা হয়ে আসছে। তার চোখের কোণ দিয়ে এবার রক্তের মতো লাল অশ্রু ঝরতে শুরু করল। মেয়েটা এবার কান্না শুরু করলো! তার ফর্সা গাল বেয়ে টপ টপ করে ঝরতে লাগল তপ্ত অশ্রু!
“জেনিন, আপনি ফিরে আসুন। আমি আর হিংসে করব না। মায়া কেন, দুনিয়ার সব মেয়ে আপনার কাছে আসুক, আমি কিচ্ছু বলব না। শুধু একবার এসে বলুন যে আপনি বেঁচে আছেন। জেনিন, আমি আপনার নূরা বলছি! আপনার আমানতকে আপনি এভাবে ফেলে যেতে পারেন না!”
নোবারার শরীরটা ধনুকের মতো বেঁকে গেল। তার খিঁচুনি শুরু হয়েছে। সে বাতাসের জন্য ছটফট করছে, কিন্তু তার গলা দিয়ে শুধু অস্ফুট কান্নার আওয়াজ বেরোচ্ছে। তার মনে হলো জেনিন তাকে ডাকছে। ওই ব্রিজের নিচে, কর্ণফুলীর শীতল জলের নিচ থেকে জেনিন তাকে ডাকছে!
“আসছি জেনিন… আমি আসছি আপনার কাছে…” নোবারার কণ্ঠস্বর একদম ক্ষীণ হয়ে এল।
তার চোখের মণি দুটো ওপরের দিকে উঠে গেল। শরীরের সমস্ত শক্তি নিমিষেই কর্পূরের মতো উড়ে গেল। সে নিথর হয়ে মেঝের ওপর পড়ে রইল। তার ফর্সা মুখটা নীল হয়ে গেছে। ড্রয়িংরুমের বিশাল এলইডি টিভিতে তখনো জেনিনের মৃত্যুর খবরটা লুপে চলছে, আর পাশে পড়ে আছে জেনিনের ফেলে যাওয়া সেই ডায়েরিটা, যার পাতাগুলো বাতাসে উড়ছে।
নোবারা অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তে একটা দৃশ্য দেখল, জেনিন সাদা শার্ট পরে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে, তার হাতে একটা বেলী ফুলের মালা। জেনিন হাসছে। জেনিন বলছে,
“নূরা, আমি তো বলেছিলাম আমি পালাব না। আমি তো এসেছি।”
কিন্তু বাস্তবে সেখানে কেউ নেই। আছে শুধু এক নিঃসঙ্গ নারী, যার পৃথিবীটা এক নিমেষে ধ্বংসস্তূপ হয়ে গেছে। আছে শুধু এক আধফোটা ভালোবাসা, যা পূর্ণতা পাওয়ার আগেই ঝরে গেল!
ভিলার বাইরে তখন বৃষ্টি শুরু হয়েছে। হালিমা মায়ের কবরের ওপর বকুল ফুলগুলো ঝরে পড়ছে। পুরো বাইপাস ভিলা আজ এক বিশাল শ্মশান, যেখানে মৃতদেহের চেয়েও ভয়ংকর এক জীবন্ত লাশের আর্তনাদ গুমরে মরছে।
নোবারার নিস্তেজ হাতটা ডায়েরির একটা পাতায় পড়ে আছে, যেখানে জেনিন লিখেছিল,
“প্রিয়তমা, যদি কোনোদিন আমি না থাকি, তবে বুঝে নিও আমি তোমার প্রতিটা নিশ্বাসে আছি।”
কিন্তু নোবারার নিশ্বাসই তো আজ বন্ধ হওয়ার উপক্রম! জেনিনুনূরশাদকে ছাড়া যেন এই অক্সিজেন আজ তার কাছে বিষ! সে জ্ঞান হারাল এক অখণ্ড অন্ধকারের মাঝে, যেখানে আর কোনো জেনিন নেই, কোনো ভালোবাসা নেই, আছে শুধু এক অনন্ত হাহাকার।
<><><><><><><><><>
ড্রয়িংরুমের শীতল মেঝেতে দীর্ঘক্ষণ অচৈতন্য হয়ে পড়ে থাকার পর, নোবারা যখন প্রথম চোখ মেলল, তার মনে হলো সে কোনো এক অন্ধকার অতল গহ্বর থেকে ফিরে আসছে। কিন্তু চেতনার আলো ফোটার সাথে সাথেই এক তীব্র যন্ত্রণার ঢেউ তার মস্তিষ্কে আছড়ে পড়ল। সে হাত নাড়াতে চাইল, কিন্তু পারল না। তার শরীরের বাম পাশটা যেন অসাড়, কোনো বোধ নেই। প্যানিক অ্যাটাকের প্রচণ্ড অভিঘাত নোবারার স্নায়ুতন্ত্রে এক গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছে, এক ধরণের সাময়িক প্যারালাইসিস তাকে গ্রাস করেছে।
নোবারার চোখের মণি জোড়া শুধু এদিক-ওদিক ঘুরছে। সে দেখল তার মাথার কাছে মায়া বসে আছে। মায়ার চোখে আজ সেই আগের চপলতা বা পেশাদারী রুক্ষতা নেই; তার বদলে আছে এক করুণ সহানুভূতি। মায়া পরম মমতায় নোবারার কপালে ভেজা তোয়ালে ছোঁয়াচ্ছে।
“ম্যাম… শান্ত হোন। আমি আছি,” মায়া খুব নিচু স্বরে বলল। তার কণ্ঠস্বরও ভাঙা।
নোবারা কথা বলার চেষ্টা করল, কিন্তু তার মুখ দিয়ে কেবল এক অস্পষ্ট গোঙানি বের হলো। তার ঠোঁট কাঁপছে। চোখের কোণ দিয়ে অবিরত নোনা জল গড়িয়ে পড়ে বালিশ ভিজিয়ে দিচ্ছে। সে তার ডান হাতটা একটু নড়াতে পারল। মায়া দ্রুত সেই হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিল।
“আপনি নড়াচড়া করবেন না ম্যাম। ডাক্তার এসেছিলেন। তিনি বলেছেন আপনার মস্তিষ্কে প্রচণ্ড রক্তচাপ সৃষ্টি হয়েছিল। কিছুদিন বিশ্রাম নিলে আর ফিজিওথেরাপি দিলে আপনি আবার ঠিক হয়ে যাবেন। জেনিন বস আপনাকে এই অবস্থায় দেখলে বড় কষ্ট পেতেন।”
জেনিন নামটা শুনতেই নোবারার পুরো শরীর আবার কেঁপে উঠল। সে ডুকরে কাঁদতে চাইল, কিন্তু তার অবশ হয়ে যাওয়া বুক থেকে সেই কান্নার আর্তনাদ বেরিয়ে আসার পথ পেল না। মায়া নোবারার অবস্থা বুঝতে পেরে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে জানে, এই যন্ত্রণার কোনো ঔষধ নেই। তবে জেনিন নূরশাদ যাওয়ার আগে কিছু একটা রেখে গেছে, একখণ্ড অন্ধকার আলো, যা হয়তো নোবারাকে নতুন করে বাঁচতে শেখাবে!
মায়া তার পকেট থেকে একটা ছোট্ট মখমলের পাউচ বের করল। সে নোবারার খুব কাছে এসে বসল। তার নিজের চোখ দুটোও আজ কেমন যেন আর্দ্র, কন্ঠস্বরে এক ভারী বিষণ্ণতা। পাউচটার ভেতর থেকে সে একটা ভাঁজ করা প্রাচীন ধাঁচের অফ-হোয়াইট রঙের কাগজ বের করল। কাগজটার চারপাশ কিছুটা হলদেটে হয়ে এসেছে, যেন অনেক যত্ন করে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল এটিকে!
নোবারার চোখের দিকে তাকিয়ে মায়া অত্যন্ত মৃদুস্বরে বলল, “বস অনেকদিন আগে আমাকে এই চিঠিটা দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, যদি কোনোদিন কোনো চূড়ান্ত বিপদ ঘটে, তবে এই চিঠিটা যেন আপনার হাতে তুলে দেওয়া হয়। বস জানতেন… তিনি সম্ভবত আগে থেকেই জানতেন যে এই পথটা বড্ড পিচ্ছিল, বড্ড অনিশ্চিত!”
নোবারার চোখ দুটো বড় বড় হয়ে উঠল। বুকের ভেতরটা যেন এক লহমায় ফাঁকা হয়ে গেল। জেনিন… জেনিন তার জন্য কিছু রেখে গেছে? যে মানুষটা নিজের আবেগ প্রকাশ করতে এতটা কার্পণ্য করতো, সে তার জন্য নিজের হাতে কিছু লিখে গেছে!
নোবারা কাঁপতে থাকা হাত দুটো বাড়িয়ে কাগজটা নিল। ভাজ খুলতেই তার চোখের সামনে ভেসে উঠল জেনিনের পরিচিত, ধারালো আর সুনিপুণ হাতের লেখা। কাগজের বুক থেকে এখনো জেনিনের ব্যবহার করা সেই পরিচিত চন্দন আর মৃদু তামাকের সুবাস পাওয়া যাচ্ছে। এই সুবাসটা নোবারার বড্ড চেনা, কত রাতে এই সুবাস বুকে মেখে সে ঘুমিয়েছে! এক লহমায় নোবারার পুরো পৃথিবীটা যেন আবার সজীব হয়ে উঠল, আবার ওলটপালট হয়ে গেল।
চিঠির পাতায় নোবারা চোখ বুলালো, জেনিনের অবাধ্য শব্দগুলো যেন তার চোখের সামনে কথা বলে উঠল,
“হে আমার প্রিয়তমা স্ত্রী,
যদি এই শব্দগুচ্ছ কখনো তোমার দৃষ্টিগোচর হয়, তবে বুঝে নিও, যে মানুষটি অবাধ্য ধূমকেতুর মতো তোমার জীবনে আচমকা এসে আবার হারিয়ে গিয়েছিল, সে আজ সত্যিই মহাকালের গর্ভে বিলীন! তুমি কাঁদছো, তাই না? কাঁদবে না নূরপরী। জেনিন নুরশাদ হয়তো কাউকে ভয় পায়না, কিন্তু নোবারার চোখের একফোঁটা তপ্ত অশ্রুও তার মস্তিষ্ক নিশ্চল করে দেয়!
আমি জানতাম আমার মৃত্যুটা কোনো সাধারণ মৃত্যু হবে না। আমার মতো মানুষরা কোনোদিন বার্ধক্যের কোলে শুয়ে মরে না। তবে আমি প্রস্তুত ছিলাম নূরা। আমি শুধু প্রার্থনা করতাম, যেন মৃত্যুকে বরণ করার আগে তোমার চোখের এক পলক হাসি আমি দেখে যেতে পারি!
আমি জানি, তুমি হয়তো আমায় খুঁজবে, হয়তো তীব্র অভিমানে আকাশ-পাতাল এক করে অভিশাপ দেবে এই ভেবে যে, কেন আমি কোনো বিদায়বার্তা না রেখে, কোনো এক গোধূলিলগ্নে এভাবে হারিয়ে গেলাম! কিন্তু বিশ্বাস করো, কিছু বিদায় এতখানি আকস্মিক আর নির্মম হয় যে, সেখানে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ‘ভালো থেকো’ বলার মতো স্পর্ধা বা শক্তি, কোনোটাই বিধাতা আমায় দেননি!
কাপুরুষ ভেবো না আমায়, তোমার চোখে অশ্রুর এক ফোঁটা জল দেখার চেয়ে, নিজের বুকে এক হাজারটা তলোয়ারের আঘাত সয়ে নেওয়া আমার কাছে অনেক বেশি সহজ মনে হয়েছিল। তাই মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও তোমাকে জানানোর সাহসটুকু জোগাড় করতে পারিনি!
হে আমার অনন্যা,
আমি জানি, আমি সেই মানুষ নই যাকে তুমি তোমার প্রার্থনায় চেয়েছিলে। আমার হাত রক্তে রাঙানো না হলেও, আমার আত্মা হয়তো এক গভীর দহনে দগ্ধ। তবুও আজ সব আড়াল সরিয়ে তোমাকে কিছু বলতে চাই।
আমি জানি আমি কলুষিত, আমি জানি আমি সেই আলোর অযোগ্য যা তোমার দু-চোখে খেলা করে। কিন্তু সত্য এটাই যে, আমার প্রতিটি নিশ্বাস কেবল তোমার নামেই সমর্পিত। আমার হৃদপিণ্ডের প্রতিটি স্পন্দন তোমার অস্তিত্বের জানান দেয়। যেখানে শব্দেরা এসে তাদের পরিধি হারিয়ে ফেলে, ঠিক সেখান থেকেই তোমার প্রতি আমার ভালোবাসার উৎপত্তি!
বিচারের দিনে যদি আমাকে জিজ্ঞেস করা হয় আমার অপরাধ কী, আমি মাথা উঁচু করে বলব যে আমি তোমাকে অসম্ভবরকম ভালোবেসেছিলাম! আমার সমস্ত ক্রটি, সমস্ত অন্ধকার আর সমস্ত বিষণ্ণতা নিয়ে আমি কেবল তোমারই থাকতে চাই।
কিন্তু নিয়তি বড় অদ্ভুত, বড় নির্মম। সে আমাদের মেলাতে ভালোবাসে শুধু আবার আলাদা করে দেওয়ার এক পৈশাচিক আনন্দে মেতে ওঠার জন্য! আমি আজ এমন এক চৌকাঠে দাঁড়িয়ে আছি, যেখান থেকে পেছনে ফেরার কোনো পথ নেই। আমার এই জরাজীর্ণ শরীর আর ক্লান্ত মন হয়তো আর কটা দিন পরেই স্তব্ধ হয়ে যাবে। আমি তোমাকে কোনো মিথ্যে আশার আলোয় বাঁচিয়ে রাখতে চাইনি, তাই নিজের এই আসন্ন সমাপ্তির কথা কখনো তোমার সম্মুখে উচ্চারণ করার সাহস পাইনি।
জানি, আমার চলে যাওয়ার পর এই বিশাল পৃথিবীতে তুমি হয়তো বড্ড একা হয়ে পড়বে। কিন্তু একটা কথা মনে রেখো, মৃত্যু কেবল নশ্বর শরীরের হয়, আত্মার কোনো লয় নেই। যখনই কোনো শান্ত সন্ধ্যায় মৃদু বাতাস এসে তোমার চুল স্পর্শ করে যাবে, ভেবে নিও ওটা আমার শেষ চুম্বনের পরশ। যখন কোনো গভীর রাতে একাকী জানালার গ্রিল ধরে আকাশের দিকে তাকাবে, জেনো ওই দূর নক্ষত্রের আলো হয়ে আমি কেবল তোমাকেই অবলোকন করছি।
হে আমার হৃদয়িনী,
আমার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি আর সবচেয়ে বড় অনুশোচনা, দুই-ই তুমি! প্রাপ্তি এই কারণে যে, এই নশ্বর জীবনে তোমার মতো এক অনন্য মানবীকে ভালোবাসার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। আর অনুশোচনা… অনুশোচনা একটাই, তোমাকে নিজের করে আগলে রাখার জন্য যে পরম আয়ুষ্কালের প্রয়োজন ছিল, বিধাতা আমায় তা থেকে বঞ্চিত করেছেন! মানুষ যখন মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়ায়, তখন নাকি তার সমস্ত জাগতিক মোহ কর্পূরের মতো উড়ে যায়, শুধু অবশিষ্টাংশ হিসেবে পড়ে থাকে খাঁটিতম অনুভূতিটা। আমার সেই অনুভূতির নাম…তুমি।
আমি কোনো প্রতিশ্রুতি দিয়ে তোমাকে বেঁধে যাব না নূরা। কারণ আমি জানি, ভালোবাসার কোনো বন্ধন হয় না, ওটা এক মুক্ত চেতনা। শুধু একটা শেষ অনুরোধ রইল, আমায় মনে রেখে নিজের বর্তমান-ভবিষ্যতকে বিষাদময় করে তুলো না। তুমি বাঁচবে, হাসবে এবং জীবনের প্রতিটা মুহূর্তকে উপভোগ করবে, আমার হয়ে বাঁচবে তুমি।
হ্যাঁ, আমার কণ্ঠ হয়তো আর কখনো তোমার কানে প্রতিধ্বনিত হবে না, আমার হাত হয়তো আর কখনো তোমার শীতল চেহারাকে উষ্ণতা দিতে এগিয়ে আসবে না, আমার বুকের ওম নিয়ে তুমি হয়তো আর ঘুমাতে পারবে না! কিন্তু মহাকালের কোনো এক বাঁকে, যেখানে সমস্ত আলো এসে এক হয়ে যায়, সেখানে আমি ঠিক অপেক্ষা করব তোমার জন্য। তুমি আমাকে দু’হাতে আগলে নিবে তো সেদিন?
হে আমার নিকষ আঁধারের ধ্রুবতারা,
আমার আর সময় নেই। আলো নিভে আসছে, ফুসফুস বাতাস খুজছে ব্যর্থতায়। কিন্তু আমার আত্মা তোমার চারপাশেই রয়ে যাবে। শরতের শিউলি ঝরার শব্দে, শ্রাবণের প্রথম বৃষ্টির গন্ধে কিংবা গোধূলির ওই বিষণ্ণ আলোয় যদি কখনো তোমার মন ব্যাকুল হয়, জেনে নিও, ওটা আমি। আমি তোমার অনুমতি ছাড়াই তোমার স্মৃতির ক্যানভাসে চিরস্থায়ী আসন নিয়ে নিলাম।
আজ তবে এই পর্যন্তই নূরা…আমার চারপাশের আলো ফুরিয়ে আসছে, নিকষ কালো আঁধার আমায় গ্রাস করতে বড্ড তাড়া দিচ্ছে। এই নশ্বর পৃথিবীর মোহ ত্যাগ করতে আমার এক পলকও দ্বিধা হচ্ছে না, শুধু বুকটা ছিঁড়ে যাচ্ছে তোমাকে এই মহাসমুদ্রে একা ফেলে যেতে! ফুরিয়ে আসা নিশ্বাসের শেষ স্পন্দন আর আমার নয়নের অন্তিম অশ্রুবিন্দুটি তোমার ওই পবিত্র নামে উৎসর্গ করে, আমি এক চিরন্তন শূন্যতার দিকে পা বাড়ালাম! বিদায়… চিরবিদায়, নোবারা নুরশাদ।
ইতি,
জেনিন নুরশাদ”
চলবে ইংশাআল্লাহ…….
(…………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………….)

