#কথা_দিলো_রোদ্দুর (১২)
#তুসিকা
প্রাইভেট হসপিটালের নিট এন্ড ক্লিন পরিবেশে, শীততাপ নিয়ন্ত্রিত অপেক্ষামান কক্ষের সামনে বসে আছে অর্থি আর রেবেকা বেগম। সামনে গা’ইনি ডক্টরের নাম দিয়ে ব্যানার লাগানো;
ডা: নন্দা চৌধুরী। (কাল্পনিক)
এমবিবিএস(ঢাকা), বিসিএস(স্বাস্থ্য)
কনসালটেন্ট (গা’ইনী এন্ড অ’বস্)
নিজের দুশ্চিন্তা দূর করতে এই ডাক্তারের পরিচয় পত্র অর্থি বোধ হয় বিশ বারের মতো পড়ে নিয়েছে, তবু ও তার দুশ্চিন্তার শেষ নেই। চারিদিকে শীতল বাতাস দিচ্ছে তবু ও অর্থির এমন ভয়ে রেবেকা বেগম ক্ষিপ্ত কন্ঠ নিয়ে বললেন;
–’এই ডাক্তার কি বাঘ না ভাল্লুক হ্যাঁ! এমন ভয় পাচ্ছিস কেন, তুই ভেতরে যাবি তোর যেখানে যেখানে সমস্যা হচ্ছে তাই বলবি, আর আমি তো সেখানে থাকবো ই তাহলে।
অর্থি নুইয়ে যাওয়া গলায় বলল;
—” সমস্যার কথা কিন্ত তুমি বলবা! বলবে ডানদিকে তল’পেটের নীচের দিকে ব্যাথা, মাঝে মাঝে পেট ফুলে যায়, কেমন জানি ভারী ভারী লাগে।
—” আচ্ছা বলবো, আগের আমাদের সিরিয়াল আসুক।
মিনিট পনেরো মত বসে থাকার পর অর্থির ডাক পড়ল। আর একটু ভয় নিয়েই অর্থি গেল ডক্টরের রুমে। বেশ পরিপাটি দেখতে আর বেশ মার্জিত ভাবে নরম সুরে কথা বলেন ডাক্তার নন্দা চৌধুরী,,
অর্থি সেখানে গিয়ে বসতেই ডক্টর জিজ্ঞেস করলেন কি সমস্যার জন্য সে এখানে এসেছে।
অর্থি কাচুমাচু করে রেবেকা বেগমের দিকে তাকালেন, এতে রেবেকা বেগম হালকা করে চোখ রাঙানি দিলে অর্থি নরম সুরে ডক্টর কে বলে;
—”আসলে তল’পেটে প্রচন্ড ব্যাথা করে,,
এই টুক বলে অর্থি চুপ করে গেলে বাকি সমস্যার কথা রেবেকা বেগম ই বলেন,, অর্থি যে অসুস্থ হয়ে হসপিটালে ভর্তি ছিল তাও বলেন।
সব শুনে ডক্টর অর্থি কে জিজ্ঞেস করে;
—”আচ্ছা মা তোমার মা’সিক কি নিয়মিত হয়,,
—” না! মাঝে মাঝে তিন চার মাস গ্যাপ হয়ে থাকে!
অভিজ্ঞতায় ডক্টরের মুখে যেন আলাদা ভাব ভঙ্গি ফুটে উঠলো,, আর অর্থির কথায় ডক্টর প্রেস্কিপশনে কিছু একটা লিখলেন,, এরপর অর্থির মা রেবেকা বেগম কে উদ্দেশ্য করে বললেন;
–” দেখুন ওর যে যে সমস্যা হচ্ছে, বা যে সমস্যার কথা বলছেন এটা সাধারণ pcos, pcod এর লক্ষণ। আর আমার কাছে এমন রোগীর সংখ্যা ই এখন অহরহ আসে। এখন ওর আগের রিপোর্ট এ হর’মোন এর সমস্যা আছে বলেছে, তাও নতুন করে কিছু পরীক্ষা নিরীক্ষা দেব, সেগুলো করান তারপর না হয় আমরা ওষুধ দেব, আর যা যা লাগে তা করতে বলবো।
এই কথা গুলো শুনে রেবেকা বেগম চিন্তিত হয়ে ডক্টরকে জিজ্ঞেস করলেন;
—” বড় কোনও সমস্যা নেই তো ডক্টর! আজ কয়েক মাস থেকেই বলছে সমস্যা হচ্ছিল!
—” না.. না.. এত ভয়ের কিছু নেই, আগে পরীক্ষা গুলো করান, কাল রিপোর্ট নিয়ে আসলে বুঝবো, আর সে মতে ঔষধ ও দেব।
–’আচ্ছা!
——
অর্থি আর রেবেকা বেগম ডক্টরের রুম থেকে বেরিয়ে আসলো,, রিসেপশনে গিয়ে পরীক্ষা গুলো করানো কথা বললে, সেখানে থাকা মহিলাটি সব পরীক্ষা গুলোর নাম লিখে বিল কাটলো,, বিল প্রায় সাড়ে আট হাজার টাকা এসেছে। এটা শুনে রেবেকা বেগম একটু অবাকই হলেন,, এত টাকা বিল হয়েছে,, কিন্ত তার কাছে উপস্থিত এখন প্রায় দুই হাজারের মতো আছে,, আর এই টেস্ট গুলো করাতে এত টাকা বিল এসেছে দেখে রেবেকা বেগম চিন্তিত হয়ে জাবের সাহেব কে ফোন দিয়ে আসতে বললেন। টেস্ট গুলো যে এত গুলো বিল হবে তিনি চিন্তা ও করেনি।
এই তো চার দিন আগে হসপিটালে ত্রিশ হাজার টাকা বিল এসেছে সেগুলো জাবের সাহেব দিয়েছে,, জাবের সাহেব বলেন নি কিন্ত রেবেকা বেগম ঠিকই ধরতে পেরেছেন অর্থির বাবা, জমানো ছিল সেখান থেকে টাকা ভেঙেছে।
আর এখন এত টাকা এসেছে, কাল ডাক্তার নিশ্চয়ই ঔষধ দেবেন, তখনও অনেক টাকা লাগবে,, এই ভেবে রেবেকা বেগম চিন্তিত হলেন।
তবে কিছুক্ষণ বাদে জাবের সাহেব এলেন, জিজ্ঞেস করলেন ডাক্তার কি বলেছেন,,
উওরে রেবেকা বেগম বললেন এখন টেস্ট দিয়েছেন কাল রিপোর্ট দেখে বলবেন কি সমস্যা হয়েছে। কিন্ত রেবেকা বেগম জিজ্ঞেস করলেন;
–” টাকা আছে তোমার কাছে,,
—” হ্যাঁ আছে!
জাবের সাহেব আর কিছু বললেন না, কাউন্টারে গিয়ে টাকা জমা দিয়ে দিলেন, এটা দেখে অর্থির কেমন জানি খারাপ লাগছে, তার জন্য কত গুলো টাকা দিতে হচ্ছে তার মা বাবা কে। এই যে সে ঋণ ভারী করে রাখছে এই গুলো কিসের বিনিময়ে সে শোধ করবে তা সে জানে না,, এই ভালোবাসার মূল্য কিভাবে দেবে সে,, হয়ত পারবে না,, তবে যদি পারে নিজের ভালো অর্জন গুলোর মধ্যেই তাদের মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা করবে।
—–
সেই দিন তারা কয়েকটা পরীক্ষা করিয়েছে,, বাকি গুলো খালি পেটে থাকায় পরদিন এসেছে আবার। আর শেষে সব টেস্ট শেষে অপেক্ষা করছে রিপোর্ট গুলোর জন্য,,
রিপোর্ট গুলো আসে এক ঘন্টা পর, আর সেগুলো নিয়ে আবারো যায় ডক্টর নন্দা চৌধুরীর কেবিনে। সব রিপোর্ট দেখে ডক্টর বলেন;
—” হ্যাঁ রিপোর্ট এ (PCOS) ধরা পড়েছে,, এটা বিশাল কিছু এমনটা নয়,, এটা সাধারণত ওভারি তে ছোট ছোট পানি থলি। মাঝে মাঝে আপনা আপনি চলে আবার ঔষধের মাধ্যমে ও চলে যায়,,
রেবেকা বেগম ভয়ার্ত কন্ঠ নিয়ে বলেন;
—” ম্যাম এটা কেন হয়েছে, ওর তো ছোট থেকে তেমন কোনো রোগ বালাই ছিল না,,
—” দেখুন এগুলো হয় হর’মোনের ভারসাম্যহীনতার কারনে,, বাড়তি ওজন, আর অনিয়মিত মা’সিকের কারনেই এমনটা হয়,, আর এখন প্রায় রোগী এমন রোগ নিয়ে আসে,, ভয়ের কিছু নেই, আমি ঔষধ দিচ্ছি, প্রথম তিন মাস, এর পর আরো তিন মাস কন্টিনিউ নিয়ম মেনে চললে আশা করি এটা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
রেবেকা বেগমের চোখে পানি আসলো,, কিভাবে কি হবে, কিভাবে এই মেয়েকে তিনি ঠিক করবেন, এই চিন্তা যে তার মস্তিষ্কে চেপে ধরেছে, তাই তিনি ডাক্তার কে বললেন;
—” ম্যাম ঠিক করে যাবে তো! আর এই ওজন কিভাবে কমাবে!
—” হ্যাঁ ঠিক হয়ে যাবে,, আর ওজন ও চেষ্টা করলে কমে যাবে। শুধু ওকে একটু আত্মবিশ্বাসী হতে হবে,, এসব হর’মোনের কারনে মাঝে মাঝে দেহের সাথে মনে ও প্রভাব পড়ে, তাই ওকে শক্ত থাকা হবে, আর বিশেষ কথা নিজের যত্ন নিতে হবে ভালো করে।
এরপর অর্থি কে উদ্দেশ্য করে বলল;
—” দেখো টিনেজার মেয়েদের এসব সমস্যা হয়,, তুমি ওজন টা একটু নিয়ন্ত্রণ করো, ঠিক করে খাওয়া দাওয়া করো, ব্যায়াম করো, স্ট্রেস বেশি নিও না, মানসিক ভাবে সুস্থ থাকো, দেখবে সব ঠিক হয়ে যাবে।
অর্থি মাথা নাড়লো,, সেই ঘুরে ফিরে সকল সমস্যা তার ওজনের কারনেই গিয়ে ঠেকলো,, এসব যে সে আর নিতে পারছে না,, তবে নিজের সুস্থ তার জন্য চেষ্টা করতে ক্ষতি নেই, তাই আগের থেকে একটু বেশি কেয়ার ফুল হলো,,, দামী দামী সব ঔষধ দিয়েছেন ডক্টর। পনেরো দিনের ঔষধ আনতেই প্রায় তিন হাজারের মতো খরচ যায়,, এই সব দেখে অর্থির আরো বেশি কান্না পায়।
সে কিভাবে কি করবে, রেবেকা বেগম কে ও মন খুলে কিছু বলতে পারেন না,, নিজের মতোই চেষ্টা করে চলেছে প্রতিদিন। তবে জাবের সাহেব খুব করে সাহস দেন মেয়েকে।তার কন্ঠে সব সময় একরাশ ভরসা থাকে
—” কিছু হবে না আমার আম্মার,, আমার মেয়ে ঠিক হয়ে যাবে ইনশাল্লাহ!
এই কথা গুলোই যেন অর্থির বেঁচে থাকার সাহস জোগায়!
কিন্ত রেবেকা বেগমের মুখে যেন অন্য একটা ভাব লেগে থাকে সর্বদা। তিনি অর্থির জন্য চিন্তা করেন, কিন্ত নানা পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়ে ভালো মন্দ নানা কথাই অর্থিকে বলে দেন,,, আর তার কন্ঠে এই কঠিন আর তিরস্কারের মতো কথা গুলো শুনে অর্থির মন ভীষণ ভার হয়ে থাকে!
অর্থির ইচ্ছে নিজের সাথে নিজেই যেন হেরে যাক, সকল বাধা থেকে যেন মুক্তি মিলুক।
এই যেমন আজ!
অর্থর সাথে তার সামান্য একটু বিবাদ লেগে যায়,, ভাই বোনের এই বিবাদ নতুন কিছু নয়, কিন্ত চেঁচামেচির এক পর্যায়ে মা’রামা’রি বেঁধে যায় দুটো তে! আর ভাই বোনের এই তান্ডব দেখে রেবেকা বেগমের সকল আক্রোশ গিয়ে ঠেকে অর্থির উপর। জাবের সাহেব অফিসে চলে গেছেন অনেক আগেই। তিনি থাকলে হয়ত ভাই বোনের বিবাদের সমাধান করে দিতেন শান্ত ভাবে। কিন্ত রেবেকা বেগম তেড়ে আসেন,,, তিনি রান্না করা মসলা যুক্ত খুন্তি টা নিয়ে এগিয়ে আসেন সামনে।
—” এই কি শুরু করেছিস দুটো তে,, আমাকে না জ্বালিয়ে তোদের শান্তি মিলে না,, প্রতিদিন তোদের সাথে চিল্লাচিল্লি করাই লাগবে তাই না,,, আর অর্থি! অর্থ না হয় ছোট তুই ও কি ওর সাথে সাথে ছোট হয়েছিস,, একটু মানিয়ে নিলে তোর কোথায় সমস্যা হয় বলতো,, তুই একটু চুপ থাকলে ই তো হয়!
এর মাঝে অর্থ অর্থি কে জ্বিভ দিয়ে মুখ ভেঙ্গায় এতে রেগে গিয়ে সে অর্থ কে মা’রতে যায়, এতে রেবেকা বেগম যেন আরো রেগে যায়!
—” আমি সামনে আমি তারপর ও তোদের কোনো ভয় ডর নেই,, আর তুই! এত বড় মেয়ে নিজের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে পারিস না,, তোর জন্য আমরা কত কিছু করছি, আর তুই দিনদিন যেন উশৃঙ্গল হচ্ছিস,, মনে নেই ডাক্তার কি বলেছেন,,, তোর চিন্তায় শেষ নেই আমাদের, মাসে কত গুলো টাকা যায় তোর পেছনে, কোথায় থেকে পাই এই টাকা জানিস!
ক্ষিপ্ত কন্ঠে রেবেকা বেগম আরো বললেন;
–” জানিস কিভাবে তোর বাপ এই টাকা নিয়ে আসে,, রাত পোহাতে গেলে কত চিন্তা মাথায় আসে,, কিভাবে সংসার চালাবো, কিভাবে তোদের খাইয়ে পড়িয়ে রাখবো,, তোদের জন্য আমরা কত কিছু ত্যাগ করি!!
এই টুক চিন্তা করে ও তো শান্ত থাকতে পারিস,, তা না করে বেয়াদপ হচ্ছিস দিন দিন,,
—’ আমাকে কেন কথা শোনাচ্ছো,, অর্থ কে তো কিছু বলতে পারো না,, ও কি করেছে আগে ওকে জিজ্ঞেস করো,, তারপর আমাকে কথা শোনাও!
রেবেকা বেগম আর নিজের রাগ সংবরন করতে পারলেন না,, এক ঘা বসিয়ে দিলেন অর্থির পিঠে। আর বললেন;
–”মুখে মুখে এখনো তর্ক করিস,, এত জ্বালা যন্ত্রনা না দিয়ে কিছু খাইয়ে মে’রে ফেলতে পারিস আমাদের। অন্তত তোদের এসব থেকে রেহাই পাবো,,, শান্তিতে থাকবি তোরা।
রেবেকা বেগমের এলোমেলো কথা গুলো শুনে অর্থির গলায় কি যেন কাটার মতো বিঁধে গেল,, গলা ভার হয়ে আসলো,,, চোখে জল টইটুম্বর করছে,, যেন এক পলশা পলকে ঝরে পড়বে বারি ধারা হয়ে,, কিন্ত না অর্থি কারো সামনে কাঁদবে না,, রেবেকা বেগমের এই তিক্ত কথা গুলো মনের ভেতর জমা করে ধীর পায়ে রুমে চলে গেল,, দরজায় খিল দিল। রেবেকা বেগম তখনও চেঁচামেচি করছেন,,, এবার হয়ত অর্থের সাথে চেঁচামেচি করছেন,, কিন্ত অর্থির কানে সেসব আসছে না,,
রেবেকা বেগম তাকে যে কথা গুলো বলেছে সে গুলো যেন তার কানে বাজতে লাগলো,, প্রতিবার তার মেজাজ খারাপ হলে তিনি একই কথা বলেন অর্থির জন্য তারা দুশ্চিন্তায় শেষ হয়ে যান,, তার জন্য কত টাকা খরচা করেন,,,
আচ্ছা সে কি ইচ্ছে করে এমন অসুখ বাধিয়েছে!! সে তো নিজের ইচ্ছেতে মোটা হয়নি,, আর এমনটা করেনি,, নিজের হাতেই যদি সব থাকতো তবে তো তার মা বাবার অসুবিধে হবে এমন কাজ সে জীবনেও করতো না,,
তাহলে মা কেন বোঝে না, তার কথা গুলো অর্থির অন্তরে কিভাবে প্রভাব ফেলে। কিভাবে দিন কে দিন নিজেকে ছোট মনে এমন এমন কথায়,,, সে দেখে সবার মা বন্ধুর মতো পাশে থাকে,, কিন্ত সে তো তার মাকে বন্ধুর মতো পাশে পায় না, আর না মন খুলে নিজের মনের কথা গুলো বলতে পারে!!!
বালিশে মুখ চেপে কাদলো অর্থি,, যে শব্দ তার মাঝেই সীমাবদ্ধ। এই শব্দ সে কাউকেই শোনাতে পারবে না,,, আর না কাউকে দেখাতে পারবে,,, হ্যাঁ মা তার ভালো চান,, তবে সেই ভালো তার তিক্ত কথা গুলোর মাঝেই যেন হারিয়ে যায়,,
______________
দিন যেতে থাকে,,, সব কিছুই চলতে থাকে নিজের সময়ে,, এই যেমন রাত গড়িয়ে দিন আসে তেমনি গ্রীষ্মের শেষে ধরনীতে জুড়ে নেমে আসে এখন বর্ষার নরম ছোঁয়া।
নীল আকাশে জায়গা দখল করে নেয় ধূসর বা কালচে রঙা মেঘ পুঞ্জি। দুপুরের তীব্র রোদ যেন হঠাৎ করে স্লান হয়ে আসে আর বাতাসে ভেসে বেড়ায় অচেনা এক সুবাস। দূরে কোথাও মেঘ গর্জন করে ওঠে, আর ধরনী তলে নিজের আধিপত্য বিস্তার করতে নেমে আসে বৃষ্টি। প্রথমে টুপটুপ লাজুক, এরপর এর ছন্দ বেড়ে ঝুম বরষায় ঢেকে যায় চারিপাশ।
গরমের ক্লান্তির শেষে ওই বৃষ্টি ই যেন ভরসা,,
চালের উপর ওই যে টুপটুপ শব্দ যেন নৃত্যের মতো বেজে থাকে কানে, আর ধরনীতে তৈরি করে এক নতুন রূপ।
ঠিক যেমন টা অর্থির মতো। দিন যেভাবেই যাক না কেন অর্থির ভেতরে ও সূক্ষ্ম একটা পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়,, সে এমনিতেই একটু চুপচাপ স্বভাবের কিন্ত এখন আগে থেকেও একটু গম্ভীর হয়েছে,, বাসায় থাকে তবে তার অস্তিত্ব জানার জন্য রেবেকা বেগম কে সচক্ষে তার রুমে এসে দেখে যেতে হয়,, সবার সাথেই দূরত্ব তৈরি করেছে, একা একা থাকে, নিজের মতো।
তার এই পরিবর্তন সবারই নজরে পড়েছে,, জাবের সাহেব বাসায় যতটা পারেন অর্থির সাথে থাকার চেষ্টা করেন,, কিন্ত অভিমানের পাল্লা এতটা ভারী তা ভাঙতে ও তিনি পারেন নি।
এই তো আজকের কথাই বলা যাক,, ভোর থেকেই গুড়িগুড়ি বৃষ্টি হচ্ছে দেখে রেবেকা বেগম খিচুড়ি রান্না করলেন সকালের নাস্তা হিসেবে। অর্থ ও দু তিন দিন বায়না করছিল,, তাই করলেন,, কিন্ত অর্থি এক লোকমা ও খেল না,,, ওটস আর ডিম খেয়ে উঠে পড়ল,, আর তৈরি হয়ে বেরিয়ে পড়ল কলেজের উদ্দেশ্য।
রেবেকা বেগম সেই দেখে জাবের সাহেবের সাথে রাগ দেখালেন, জাবের সাহেব শান্ত ভাবে হেসে বললেন;
—” না খেলে জোর করো না,, ওর ইচ্ছে হলে ও নিজেই খাবে!! আর সময় যাক দেখবে সব ঠিক হয়ে যাবে!
রেবেকা বেগম এরপর আর কিছু বলতে পারেন না,, অথচ অর্থির খিচুড়ি কতটা পছন্দ তিনি জানেন,, তার উপর জিদ ধরে অর্থি এমন টা করছে এটা তিনি ও জানেন,, তাই তো একবার ধমক দিয়ে দ্বিতীয়বার আর কোনো শব্দ উচ্চারণ করতে পারেন না,, মেয়েটা তার থেকে কেমন করে দূরত্ব তৈরি করে নিচ্ছে সেটা তিনি ভালো বুঝতে পারেন। এসব বুঝে ও তিনি চুপ করে থাকেন,, কিন্ত তিনি জানেন তার অন্তরের খবর।
এই যাওয়ার সময় তিনি কত করে বললেন ছাতা নিয়ে যেতে,, প্রয়োজনে রেইনকোট টা সাথে রাখতে,, কিন্ত অর্থি শুনলো না,, ব্যাগ গুছিয়ে বের হবার সময় বলল;
—” দুই তিন ঘন্টা পর বাসায় চলে আসবো ছাতা লাগবে না।
কিন্ত অর্থির এই জেদ সম্পূর্ণ ভুল হলো। কলেজে গেল ঠিকই, কিন্ত ফেরার আকাশ ভারী হয়ে আসলো,, প্রচন্ড বেগে বাতাস ও বইতে লাগলো,,,
কাল বৈশাখী শুরু হলে বলে, কিন্ত অর্থি কোনোদিন এমন ঝড়ের কবলে পড়েনি, হঠাৎই এমন ঝড়ে সে ও হতবিলম্ব। ফেরদৌস থাকলে এতটা চিন্তা থাকতো না,, কিন্ত এই মাঝ রাস্তায় কি করবে সে যেন দিশেহারা হয়ে পড়ল।
কোথাও ঠাঁই নেওয়া ছাড়া উপায় নেই। দোকান পাটের সার্টার নিচে নামিয়ে রেখেছে, লোকজন ও নেই রাস্তায়,, আর কোনো ক্যাফে ও নেয় যে যাবে। তাই অচেনা একটি বাসার নিচে দাঁড়ালো,, কিন্ত প্রকৃতির এমন তান্ডব নৃত্যে ভয় হতে থাকলো ক্ষণে ক্ষণে। অর্থির বৃষ্টি কোনো কালেই পছন্দ নয়,, এই বৃষ্টিতে রয়েছে তার শত ভয়, কৈশোরের একটি দুঃস্বপ্ন ময় ঘটনা। যার ছায়া যে আজ ও তার পিছু টান হয়ে দাগ কাটে অন্তরে।
তাই এমন ভয়াবহ বৃষ্টিতে কান্না পেল,, বৃষ্টির ছিটেফোটা ছিটকে এসে গা ভিজিয়ে দিচ্ছে,, সাদা কলেজ ড্রেস টি সামনে দিয়ে ভিজে যাচ্ছে,, তাই কাঁধে থাকা ব্যাগটা বুকের কাছে জড়িয়ে নিল,, মেঘের গর্জনে আকাশ বুঝি এখুনি ফেটে পড়বে মনে হচ্ছে,, কিন্ত এই মুহুর্তে তো কিছুই করার নেই, বাইরে কোনো যানবাহন নেই, যে সে বাসার দুয়ার পর্যন্ত পৌছাবে।
এর মধ্যে আবার বেশ কিছুক্ষণ যাবত পাশে অন্য কারো উপস্থিতি টের পেলো। আগন্তুক টি বোধ হয় বৃষ্টি থেকে বাঁচতে ই এখানে আশ্রয় নিয়েছে,, কিন্ত তার যেন সেসবের খেয়াল নেই,, মেঘের গর্জন যতটা ভারী হতে থাকলো সে ভয়ে সিকুডে গেল,, আর কানে দু হাত দিয়ে নিচে বসে পড়ল দেয়ালের পাশ ঘেঁসে। তবে কিছুক্ষণ বাদে গায়ের উপর আস্তরণ এর মতো মনে হলো,, কি হয়ে না বুঝতে পেরে হুড়মুড় করে উঠলো, আর উঠতে সামনে নজরে পড়ল পরিচিত এক অবয়ব।
আর মুখ থেকে বেরিয়ে আসলো………
চলবে
(বোনাস পার্ট……..
রেসপন্স বেশি হলে কাল সকালে একটি ছোট করে বোনাস পার্ট দেব,,, যদি চান একটি কমেন্ট করে যাবেন,, শুধু রেসপন্সের উপর ভিত্তি করে,, )
( আর গল্প নিয়ে আজ আর আমি কিছু বলবো না,, দেখি আপানারাই আজ প্রশ্ন করুন,, আর আমি প্রতিদিনের মতো আপনাদের উদ্দেশ্য কোনো নোট ও রেখে যাবো না, আমার নোট আপনারা কেউ পড়েন ই না,, 🥹)

