কথা_দিলো_রোদ্দুর (৩) #তুসিকা

0
3

#কথা_দিলো_রোদ্দুর (৩)
#তুসিকা
ফারিশের এমন কান্ড কিছুই বুঝলো না অর্থি,, ফারিশ তাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে, সে জিজ্ঞেস করলো, তবে ফারিশের থেকে উওর এলো;

—”এত কথা বলছিস কেন! তোকে কি গায়েব করে দেব। না মুজ্জা পাগলের সাথে জোর করে বিয়ে দিয়ে দিব।

অর্থিদের এলাকায় ডিজিটাল পাগল হলো মুজ্জা পাগল। ইংরেজি তে কথা বলে পাগল টা। অর্থির আবার ভীষণ ভয় লাগে পাগলটা কে। একবার তাড়া ও খেয়েছিল, তাই ফারিশের এমন কথায় নাক মুখ কুঁচকে বলল;
—”এই.. মুজ্জা পাগল কে টানছিস কেন। আমি তো এমনিতেই জিজ্ঞেস করছি,,,

ফারিশ সন্দিহান দৃষ্টিতে তার দিকে তাকায়,, আর বিরক্ত মাখা কন্ঠ নিয়ে বলে;
—”তো কি বলবো, তুই যে রিয়েক্ট করছিস!
এই বলে অর্থির হাতে একটা কাগজের ঠোঙা ধরিয়ে দিলো।অর্থি জিজ্ঞেস করলো এতে কি আছে,, কিন্ত ফারিশ আবারো বিরক্ত হয়ে কিছু বলল না, নিজেই ঠোঙা থেকে জিনিস খানা বের করলো। বেলী ফুলের গাজরা,, বাকিদের হাতে তো গোলাপ ফুলের গাজরা দেখেছিল, তাহলে বেলী ফুলের.. আর এখন তো বেলী ফুলের সিজন ও না। বেলীর সিজন সামনে আসছে… । তাই অর্থি অবাক হয়ে তাকালো ফারিশের দিকে।

মাহা আপু, নিপা এরা তো মনে থাকলে ও অর্থির জন্য কখনো আনবে না,, লাবিব ভাইয়ের বিয়ের সময় সবাই হাতে গাজরা পড়েছে, কিন্ত অর্থির জন্য তারা আনেনি। তাই এটি দেখে ফারিশ কে বলল;
—”আমার জন্য এনেছে!,, কে এনেছে?

—'”না পেত্নীর জন্য এনেছি,,, উফ আজকাল তুই বড্ড বেশি কথা বলিস,, এত কথা বললে মুজ্জা পাগলের মতো হয়ে যাবি,,, এখন দে হাতটা একা তো পড়তে পারবি না।

এই বলে ফারিশ অর্থির হাতটি বাড়িয়ে নিল গাজরা পড়াতে। তখন ফারিশের নজরে আসলো অর্থির হাতে কালচে দাগ পড়া জায়গাটি। সুন্দর হাতে সেটি যেন ভালো করে দেখা যাচ্ছে। তাই ফারিশ ভ্রু জোড়া সংকুচিত করে জিজ্ঞেস করলো এমন কালচে দাগ কিভাবে হলো।

উওরে অর্থি শুধু বলল;——পড়ে গিয়েছি তাই…
এই কথা শুনে ফারিশ তার এই কান্ডে বকা দিল, আর সুন্দর করে তার হাতে গাজরা টি পরিয়ে দিতে লাগলো,,

অর্থির বেলী ফুল অনেক পছন্দ, কিন্ত বেলীর সিজন মানে বর্ষাকাল তার একদমই পছন্দ নয়। বৃষ্টি দেখলেই অর্থির বিরক্ত লাগে, মন খারাপ হয়। তাই অসময়ে এই ফুল দেখে অর্থি জিজ্ঞেস করলো,

—” বেলী ফুলের মালা কোথায় পেলি!

—”আসার সময় দোকান একটাতে দেখলাম, হাইব্রিডের ফুল, তা ও তোর জন্য নিয়ে এলাম।
দেখ সুন্দর লাগছে না,,,,

—” হ্যাঁ… বলেই অর্থি হাতের দিকে তাকালো, ভালো লাগছে,, তবে ফুল শুকে ঘ্রাণ নেবার আগে সিঁড়ি কাছ থেকে কারো কথা আর হাসির শব্দ শুনতে পেয়ে সে দিকটায় তাকালো তারা।

মেহেদী ভাই সহ তার ফ্রেন্ড রা এখানে আসছে,, আর তাদের সাথে মেজো খালার ছেলে মানে তিশা আপুর ভাই তানভীর ভাই ও আছে। একেকটা হিরোর মতো সেজে গুছে কথা বলতে বলতে আসছে,, তারা সিঁড়ি পেরিয়ে ছাদের দিকে প্রবেশ করবে তখন তারা অর্থি আর ফারিশ কে দেখতে পায়,,সন্দিহান ভাবে তাকায় তাদের দিকে। অনুষ্ঠান ভেতরে চলছে, কিন্ত তারা দুজন এখানে কি করছে?? তাই মেহেদী জিজ্ঞেস করলো;

—” তোরা দুজনে এখানে কি করিস,, অনুষ্ঠান তো ওখানে চলছে।
অর্থি কাচুমাচু করলে ও চুপ করে রইল, এখন সে কিছু বললেই মেহেদী নিশ্চয়ই তাকে কথা শোনাতে এক চুল ও ছাড়বে না, তাই ফারিশ ই বলল;
—”ওর সাথে আমার দরকার ছিল, তাই ও আমার সাথে আছে।

—” তোর সাথে ওর আবার কি দরকার!!
মেহেদীর কথায় ফারিশ কথা বাড়ালো না, শুধু বলল;
—” ছিলো এক দরকার, তোমাদের জানতে হবে না,,
এই বলে ফারিশ আবারো অর্থির হাত ধরে সেখান থেকে নিয়ে গেল,, সবার সামনে হাত ধরে নিয়ে যাওয়ার কারনে অর্থির একটু অস্বস্তি ই হচ্ছিল,, তবে ভালোই হলো,, না হলে মেহেদী ভাই “ভুতুম” বলে সবার সামনে আবার অপমান করতো। এমনিতেই মোবাইলের স্ক্রিন নষ্ট হওয়ায় তাকে বিনা কারনে কত কথাই না শোনালো।

তারা চলে যেতে বাকিরা একজন আরেকজনের দিকে তাকালো, কি হলো ব্যাপার টা কারোরই বোধ গম্য হলো না,, তবে এত কিছু মাথায় আনলো না, তারা তো কাজিন, হতেও পারে আসলেই দরকারি কাজ ছিল। এই ভেবে তারা ও হলুদের প্রোগ্রামে ওখানে গেল।

_________

হলুদের প্রোগ্রাম জমজমাট হয়েছে গান, নাচের কারনে,,, প্রথমেই তিশা আপু কে তার ভাই রা মাথায় ওড়না দিয়ে স্টেজে নিয়ে বসালো। বড়রা একে একে হলুদ ছোঁয়ালো। ছোটরা ও ছোঁয়ালো। শুধু গেল না অর্থি নিজে।

মাহা, নিপা, ফারিন, ফাহা আর তিশা আপুর ফ্রেন্ড রা যখন গ্রুপ ডান্স করছিল তখন ও অর্থি এক পাশে চুপচাপ বসে দেখছিল তাদের। নাচ, গানের প্রোগামে সবাই এতটা মত্ত, অর্থি যে কোনো কিছুতে অংশগ্রহণ করে নি, এটা কারো খেয়াল হলো না। আর খেয়াল হবেই বা কেমন করে, জনসমক্ষে বসলে ই না তাকে নজরে আসতো, অর্থি বসেছে একদম কোনায়!

অবশ্য এটাই অর্থির জন্য ভালো,,, মায়েদের কাছে ও বসে নি, তাদের কাছে বসলেই তারা সবার সাথে গিয়ে নাচ, গানে অংশগ্রহণ করতে বলতো। বড়দের কাছে না থেকে অর্থি যেন নিপা, মাহা এদের সাথে থাকে, বড়রা এটাই বলতো।

বিশেষ করে তার মা রেবেকা বেগম। তিনি অর্থির এমন ঘরকুনো স্বভাবের জন্য সবার সামনেই তাকে বকা দিতেন। অর্থি যে সবার সাথে মিশে না, এমন চুপচাপ থাকে, এটার জন্য ও বকা দিতেন। আর কথায় কথায় মাহা, নিপা, এবং কি তার থেকে ছোট ফাহার সাথে ও তার তুলনা দিতেন আর বলতেন।

—”দেখ তো তুই কেমন আর ওরা কেমন,, দেখেছিস ওরা কেমন স্মার্ট, সুন্দর, ওদের স্বাস্থ্য কতো ভালো,, দেখে কিছু তো শিখা দরকার তাদের থেকে। অবশ্য কাকে কি বলবো, ওদের সাথে ও তো ঠিক করে মিশতে দেখি না তোকে,,, সামাজিকতা আছে নাকি তোর মাঝে,,, নিজের মতো করে থাকিস সবসময় একঘেয়ে হয়ে, তোর আর উন্নতি কি হবে বল।

শুধু এগুলো না, আরো নানা কারনে অর্থি এসব ভীড়ভাট্টা এড়িয়ে চলে,, সব থেকে বেশি এড়িয়ে চলে যখন তাকে নিয়ে সমালোচনা করা হয় তখন।

তাই তো সবার থেকে আলাদা হয়ে পুরো প্রোগ্রাম দেখছে। মাঝে সাঝে একটা দুটো ছবি তুলছে, নিজের থেকে প্রোগ্রামের ছবি ভিডিও বেশি তুলছে। পরে বাসায় দেখবে বলে।

“সবাই এখন গ্রুপ ফটো তুলছে,, তিশা আপুর সাথে স্লোমো ভিডিও করছে, কিন্ত এখন ও তার কথা কারো স্মরণে নেই। ফারিশ কে দেখা যাচ্ছে না, সে থাকলে তার এমন কান্ডে ধমক দিত। তবে বাকিরা যে যার যার মতো ব্যস্ত।

তবে একটু পর ফাহা আসলো তার কাছে,, উৎসুক ভাবে বলল;
—” অর্থি আপু এভাবে বসে আছো কেন! চল আমরা একসাথে ছবি তুলবো,, সবাই গ্রুপ ফটো তুলছে তিশা আপুর সাথে,, আর তুমি এখানে বসবে থাকবে কেন,,, তুমি ও চলো।

—” না ফাহা আমি এখানেই ঠিক আছি,, তোমরা যাও!

—” আরে না,, চলো। — অর্থি তবু ও রাজি হলো না দেখে ফাহা বলল;
—” আচ্ছা গ্রুপ তুলতে যখন এত সমস্যা, আমরা নিজেরাই কয়েকটা ছবি তুলি। স্মৃতি হিসেবে থাকবে,, চলো।

তারা গেল, কিন্ত ফটোগ্রাফার খালি নেই। তারা ও ব্যস্ত সবার ছবি তুলতে। তারা এখন আলাদা ছবি তুলতে পারবে না। তবে ফাহা রাগ হলে ও অর্থি শান্ত থাকলো,, তার কাছে এসব রং ঢং করে ছবি তোলা বিলাসিতা। ইচ্ছে থাকলে ও তার বাড়তি ওজনের কারণে এসব করে না। নিজের কাছে নিজেরই কেমন লাগে। ছবি তুললে সবার থেকে ও তাকে বেশি নজরে লাগে তাই।

অর্থি চলে যেতে নিবে, তখন তাকে আবারও আঁটকে দিল ফাহা,,,
–” কোথায় যাচ্ছো,, ওনারা ছবি না তুলে দিলে কিচ্ছু হবে না, সাম্য ভাইয়ের কাছে ক্যামেরা আছে, ওনাকে বললে ওনি তুলে দিবে।

—”সাম্য কে??

—” মেহেদী ভাইয়ের ফ্রেন্ড, তুমি তো আমাদের সাথে তেমন থাকো না, তাই বলতে পারবে না, ভাইয়া খুব ভালো ছবি তুলে, বললে আমাদের ও তুলে দিবে।

অর্থি এখন আরো সায় দিল না,, অচেনা একজন মানুষের ক্যামেরায় ছবি তুলবে। ফাহা, ফারিন এরা অভ্যস্ত। কিন্ত অর্থি তো চেনে না লোকটা কে। কিন্ত ফাহার কথার কাছে হার মেনে গেল ছবি তুলবে বলে।

সাম্য নামের লোকটা তার ফ্রেন্ড দের ছবি তুলে দিচ্ছিল, সেখানে মেহেদী ভাইয়ের ফ্রেন্ড, তানভীর ভাইয়ের ফ্রেন্ড রা সবাই ছিল। এতজনের মাঝেই ফাহা বলল তাদের ছবি তুলে দিতে। অর্থির ভীষণ লজ্জা লাগছিল। সে চোখ উপরে করে তাকাতেই যেন মরি মরি অবস্থা।

সাম্য নামের লোকটা ভীষণ চটপটে, তার কথায় বোঝা যাচ্ছিল,, প্রথমে তো সে বলল তুলবে না, কিন্ত মুসাব ভাই গম্ভীর কন্ঠে বলল;

—”বলছে যখন তুলে দে,, না হলে ক্যামেরা দে আমি তুলে দিচ্ছি।

মুসাবের কথায় সাম্য কিছু বলল না, হাসলো আর ফাহা কে উদ্দেশ্য করে বলল;

—”ছবি তুলবি,, আচ্ছা পোজ দে, কিন্ত ছবি তৎক্ষণাৎ ছবি দিতে পারবো না, চার পাঁচদিন সময় লাগবে।

সাম্যের কথায় ফাহা রাজি হলো,

যেমনটা ভেবেছিল সবাই হয়ত হাসবে তাকে নিয়ে,, এমনটা কিছুই হলো না। সে শুধু ছবি তোলার সময় চোখ উপর করে দু তিনটা ছবি তুলল, এরপর আবারো চলে গেল সেখান থেকে।

কিন্ত যত বিপত্তি বাধলো খাবার সময়। ফাহার ডাকে অর্থি সবে মাত্রই খেতে বসলো,, বাকিরা খেতে বসেছে আগেই। কারো খাওয়া মাঝ পথে, কারো খাওয়া শেষের দিকে। বাড়ির লোকেরা আর ছেলে মেয়ে বাকি থাকা বাড়ির মহিলা রাই পরিবেশ করে দিচ্ছিলেন। পোলা ও রোস্টের গন্ধের পুরো জায়গাটা তখন মৌ মৌ করছে, আর এমন গন্ধ খিদে পাওয়াটাই স্বাভাবিক।

কিন্ত অর্থি কে খেতে দেখে নিপা বলে ওঠলো;
—” কি রে অর্থি এখন খেতে বসছিস! তোর কি কোনো খেয়াল আছে,, জানিস না রাতে দেরী করে খেলে ওজন বাড়ে,, এমনিতেই ফুলে উঠছিস, আর এসব তেল যুক্ত খাবার খেলে আরো ওজন বাড়বে।

নিপার কথায় সবার নজর তখন অর্থির দিকে যায়,, কিছু মানুষ তার দিকেই তাকিয়েই ছিল। অর্থির মনে হলো নিপার কথায় অনেকে তার দিকে তাকিয়ে হাসছে। তাই সে মাথা নিচু করে নিল। আর একটা দানা ভাত ও গিলতে পারলো না।

নিপা আবারো বলল;
—” তুই এসব ওয়েলি খাবার এভয়েট করতে পারিস না অর্থি,, এই বুঝি তুই ডায়েট করবি,,, এভাবে চললে তোর ডায়েট কখনো হবে না, আর তোর চিকন হবার স্বপ্ন, স্বপ্নই থেকে যাবে।

বলেই নিপা হাসা শুরু করলো,, কিন্ত ফাহা, ফারিশ তার এমন কথায় মোটেও খুশি হয়নি। সে সবার সামনে কেন অর্থিকে ছোট করছে,, তারা কিছু বলবে কিন্ত এর আগেই অর্থি হাতে থাকা লোকমা টা রেখে আসছি বলেই সেখান থেকে ছুটে চলে গেল,,

চলবে।

গল্প নিয়ে কিছু লিখে যাবেন কেমন লাগছে,,

আর একটা কথা,, দুদিন ছুটি নেবে গল্প থেকে। কাল, পরশু আমার পরীক্ষা আছে। এই দুদিন কি একটু অপেক্ষা করতে পারবেন প্লিজ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here