#কথা_দিলো_রোদ্দুর (৯)
#তুসিকা
খালামনিরা থাকায় অর্থিদের সেই রাতটা ভালোই কাটলো,, কিন্ত তারা পরদিন সকাল সকাল ই বাসার উদ্দেশ্যে রওনা দিল। লাবিব ভাইয়ের অফিস আছে তিনি অর্থিদের বাসা থেকে গিয়েই অফিস করবেন। তাই অর্থির মা রেবেকা বেগম সকালে উঠে তাদের জন্য রান্না করে দিলেন।
সাজেদা বেগম মানা করলেন, কিন্ত রেবেকা বেগম শুনলেন না, তারা দুপুরে কোন সময় বাসায় পৌছাবেন, তখন গিয়ে সব গুছিয়ে রান্না করবেন, খেতে খেতে দেরী হয়ে যাবে
তাই রেবেকা বেগম রান্না করে গুছিয়ে দিলেন সবকিছু। যেন তাদের কোনো সমস্যা না হয়।
——
অর্থিদের বাসা থেকে যাওয়ার সময় সবাই যখন ব্যাগ সামনে রাখছিল তখন ছোট্ট লুবান কি বুঝলো কে জানে, কিন্ত তার কি কান্না, সে অর্থ র কোল থেকে নিজের মা মাহিয়ার কাছে ও যেতে চাইলো না।
লুবানের এমন কান্ডে অর্থির একটু মন খারাপ হলো,
ছোট থেকেই বাসায় মেহমান আসলে তার কি যে ভালো লাগে, বাসায় মেহমান আসলে বাসা টা গমগমে থাকে, বেশ ভালো লাগে অর্থির। কিন্ত খালামনিরা এত তাড়াতাড়ি চলে যাচ্ছে দেখে মনটা আরো খারাপ হলো অর্থির। অর্থি সাজেদা বেগম কে বলেছে তারা যেন আরো দুদিন থাকে, কিন্ত যার যার সংসারের কাজের তাড়নায় তারা ও চলে গেল,,
অর্থির সে বেলাটা মন খারাপের মধ্যেই গেল, কোনো কাজ ই করতে ইচ্ছে হলো না, তাই মন ভালো করার জন্য সুন্দর শুয়ে শুয়ে মোবাইলে কার্টুন দেখছিল,, অর্থ ও ছিল তার পাশে। দুই ভাই বোন বাসায় থাকলে বিনা কারনে খোঁচাখুচি করবেই, কিন্ত এই মোবাইল দেখার সময় কোনও টু শব্দ থাকবে না কারো মুখে।
রেবেকা বেগম রান্না ঘরে তার হাতের কাজ করছিলেন, ঘরটা এমন শান্ত দেখে তার মনেই হচ্ছিল, হয়ত দুই ভাই বোন কোনো আকাম করছে আর না হয় মোবাইল দেখছে,,, তাই তিনি হাতের কাজ রেখে প্রথমে গেলেন অর্থির রুমে,,, গিয়েই দেখলেন মানিকজোড়া দুজন কি সুন্দর মোবাইল দেখছে,, ধমক দিলেন সাথে সাথে। আর অর্থ কে কান মলে তুলে আনলেন অর্থির পাশ থেকে।
অর্থকে নিজের প্রাইভেটের পড়া গুলো করানো জন্য পাঠালেন, আর অর্থিকে বললেন তার সপ্তাহের যে ময়লা জামা কাপড় গুলো জমেছে সেগুলো যেন ধুয়ে ছাদে দিয়ে আসে। কিন্ত অর্থি তার কথা শুনলো না দেখে রেবেকা বেগম আবারো বললেন;
—”আমাকে দিয়ে বেশি কথা বলাস না অর্থি,, তাড়াতাড়ি গিয়ে জামা কাপড় গুলো ধুয়ে দে,,, আরেক বার যদি এসে দেখি এখনো শুয়ে আছিস তাহলে কিন্ত ভালো হবে না,,,,
অর্থির রুম থেকে বের হতে হতে রেবেকা বেগম এবার বলতে থাকলেন;
–”কিভাবে ইচ্ছে করে এভাবে শুয়ে থাকতে, এভাবে শুয়ে থাকিস বলেই তো ওজন টা নিয়ন্ত্রণে আসছে না,, এইভাবে অলসতা করে থাকলে তো মস্তিষ্কে ও জং ধরে, আর এটা তো তোর শরীর! সারাদিন শুয়ে বসে থাকলে কারো ওজন কোনোদিন কমে শুনেছিস! ওই যে শাম্মী, আসমা ভাবীর মেয়ে! দেখেছিস ওকে, কি স্বাস্থ্য ছিল মেয়েটার,, আর এখন একদম তারের মতো শরীর হয়ে গেছে, দেখতে এখন কি সুন্দর লাগে।
রান্নাঘরে বাসনপত্রের টুকটাক শব্দ শোনা যাচ্ছে, রেবেকা বেগম যে এখন রেগে গেছে তা তার গলার শব্দ শুনেই বোঝা যাচ্ছে। আর এই ক্ষীণ কন্ঠে তিনি আবারও বললেন;
“কষ্ট করতে হয়, হাটাচলা করতে হয়, হাত পা নাড়াতে হয়, খাওয়া দাওয়ার দিকে বিশেষ নজর দিতে হয় তবেই না ওজন টা শিথিল হবে। দেখতে সুন্দর লাগবে। কি হলো কথা কানে গেল! না এখনো শুনতে পাসনি!!
রেবেকা বেগম রান্না ঘর থেকেই কথা গুলো বলল, কিন্ত প্রত্যেক টা বাক্য অর্থি স্পষ্ট ই শুনতে পেল,, সবগুলো কথাই তার কানে এলো,, আর ভীষণ কষ্ট ও লাগলো। মা যে কেন সব সময় এই কথা গুলো বলেন, তিনি কি জানেন না এই কথা গুলো শুনলে অর্থির কি যে খারাপ লাগে। আর সবচেয়ে খারাপ লাগে অন্যের সাথে তুলনা দিয়ে কথা বললে। তারা তো জানে অর্থি কেমন, তবু ও কেন তারা অর্থিকে অন্যের সাথে তুলনা করে!
তারা কি জানে এগুলো করলে অর্থির কষ্ট লাগে!! হয়ত জানে! কিন্ত তবুও রেবেকা বেগম এই কথা গুলো ই বলবে।
অর্থি দীর্ঘশ্বাস নিল, আর ময়লা জামা কাপড় গুলো ধুয়ে দিল, আজ তো কলেজ নেই কিন্ত কাল আছে তাই কলেজ ড্রেস টি ও ধুয়ে দিল। আর একা ই কাপড় গুলো নিয়ে ছাঁদে গেল।
জ্বলমলে রোদ উঠেছে, পুরো আকাশ নীল, মাঝে মাঝে সাদা মেঘ ভেসে বেরাচ্ছে,, গরম ও পড়েছে প্রচুর কিন্ত অর্থির কাছে এই নীল আকাশ, এই সাদা সুভ্র তুলোর মতো মেঘ গুলো ভীষণ ভালো লাগে। আর ভালো লাগে মেঘেদের কাছে নিজের মনের কথা বলতে।
এই যে এই মেঘ চলে যাচ্ছে অজানায়, এটা দেখে অর্থির মনে হয় এই মেঘ গুলো মানুষের সুখ দুঃখ কাঁধে নিয়ে যায়। আর যখন ই মানুষের সুখের থেকে দুঃখ বেশি হয় মেঘ গুলো এর ভার বইতে না পেরে বৃষ্টি স্বরূপ ধরনীতে নেমে আসে।
তাই সুন্দর সুন্দর মেঘ গুলো চলে যাওয়ার আগে অর্থি বিরিবির করে নিজের মনের কথা বলল, আর অনেক অভিযোগ ও করলো।
কিন্তু তখন আবার নিচ থেকে রেবেকা বেগমের ডাক পড়ল,, অর্থি দেরী করছে দেখে তাকে তাড়াতাড়ি ই নিচে আসতে বলল।
—”উফ এখানে ও শান্তি নেই, কোথায় গেলে যে মন খুলে একটু সময় কাটাতে পারবো!
কথাটা বিরবির করে বিরক্তি নিয়ে অর্থি জামা গুলো মেলে নিচে চলে গেল। আর নিচে গিয়ে দেখলো রত্না চাচি এসেছে।
বাসায় মেহমান আসলে অর্থির ভালো লাগে, তবে কিছু অযাচিত মেহমান আছে, তাদের আগমন একদমই ভালো লাগে না, এখন রত্না চাচি কে দেখে অর্থির অবস্থা ও ঠিক তেমনি হয়েছে,, উনি এসেছে জানলে অর্থি এত তাড়াতাড়ি বোধ হয় ছাঁদ থেকেই নামতো না। তবে ওনার সামনে যখন পড়েছে সৌজন্য ভাবে সালাম দিল। তিনি সালামের উওর নিলেন ঠিকই তবে বললেন;
—” কিরে ওজন কত এখন তোমার! কমেছে না বেড়েছে! দেখে তো মনে হয় না কমছে! কি ভাবী খাওয়া দাওয়া একটু কন্ট্রোল এ রাখতে পারেন না ওর!
ঠিক এই কারনেই অর্থির ওনার সামনে পড়তে ইচ্ছে করে না,, অন্যের শরীর গত দিক নিয়ে যে ব্যাক্তি কটাক্ষ করে শুদ্ধ ভাষায় তাকে কি নামে সম্বোধন করে অর্থির জানা নেই। তবে অর্থির কাছে সেসব ব্যাক্তি কে অভদ্র আর খ’বিশ বলা যায়,,, কিন্ত উনি গুরুজন, তাই আপাতত তার কথা গুলো অর্থি গ্রোগাসে গিলতে লাগলো।
—” ভাত এক বেলা দিবেন ভাবী, আর দুই টা করে রুটি দেবেন পারলে, আর এখন মানুষ ওজন কমানোর জন্য লেবু পানির সাথে কত রকমের গ্রিন টি খায় সেগুলো দিবেন, আর অর্থি শোনো,ব্যায়াম করবে, সকাল বিকাল দুই বেলা দৌড়াবে, দেখবে ওজন কমে যাবে,,
রত্না চাচি প্রত্যেক বারই এমন করে কথা বলে, তার ভাষ্য মতে তিনি অর্থির জন্য অনেক চিন্তা করে, তাই তো যার উদ্দেশ্য কথা গুলো বলছে তার ভালো লাগলো কিনা তা আর যাচাই করেন না।
—” জ্বি চাচি!
বলেই অর্থি সেখান থেকে চলে এলো,, জানে না আর কার কত ভাবে এসব কথা শুনতে হবে,, কিন্ত অর্থি তো যথেষ্ট চেষ্টা করছে,, প্রতিদিন তো গ্রিন টি, গরম পানির সাথে লেবু, জিরা পানি এসব খায়, সাথে এখন ভাত খাওয়া টা ও কমিয়ে দিয়েছে। তো আর কি করবে, হাওয়া খেয়ে বেঁচে থাকবে!!
অর্থি শান্ত শুধু বাইরের এই খোলশ যুক্ত মানুষের সামনের কিন্ত ভেতর ভেতর তার রাগ, চাপা অভিমান তুখোড়,, তবে অর্থির মতো মেয়েরা তা হয়ত জিনিসপত্র ভেঙে, অন্যের উপর চেঁচামেচি করে সেসব দেখাতে পারে না, তাই রাগ কমানোর একমাত্র পান্থ হলো কান্না। বালিশ চেপে কান্না করা,, গুমড়ে গুমড়ে মরবে তবুও এই কান্না বাইরের মানুষ শুনবে না। শুনবে না অকপটে অপমানিত হওয়া অর্থির মতো মেয়েদের আর্তনাদ!!
_________
পার হলো গোটা একটা রাত, পরদিন সকালে ও অর্থির মুখে থমথমে ভাব গেল না,,, সেই যে আগের দিন দুপুর থেকেই মনটা বিষন্নতায় কাটলো, সেভাবেই রইল সে,,, রাতের ও ঠিক করে খেলো না,, আর আজ যখন সকালে কলেজে যাবে তখন শুধু এক গ্লাস পানি খেয়েই বেরিয়ে গেল,,, অর্থি যখন বাসা থেকে বের হবে রেবেকা বেগম পেছন থেকে ডেকে অনেক বার বললেন নাস্তা না করে যেন বাসার বাইরে বের না হয়,,
কিন্ত অর্থি শুনলো না,, সেই না খেয়ে কলেজ চলে গেল,,
কলেজে এসে বান্ধবীর সঙ্গ পেয়ে মন একটু হালকা হলো অর্থির,, আরো খুশি লাগলো যখন দেখলো অর্থির বান্ধবী ফেরদৌসের কাছে নতুন ফোন আসলো। এতদিন সে মায়ের ফোনেই কথা বলতো সবার সাথে,, কিন্ত এখন যখন তার নিজের ফোন হয়েছে তখন ইচ্ছা মতো কথা বলবে, সিক্রেট কথা গুলো শেয়ার করবে,,,
তবে ক্লাসে স্যার চলে আসায় তাদের কথার ইতি ঘটলো সেখানেই। কিন্ত ফেরদৌসের ফুসুর ফুসুর বন্ধ হলো না, সে সারা ক্লাস জুড়ে কথা বলে কাটালো, আর শেষে যখন স্যারের নজরে আসলো তখন তো তাকে স্যার পড়া জিজ্ঞেস করলো। কিন্ত ফেরদৌস একটা পড়া ও পারলো না,,, তাই দাঁড়িয়ে রইল শেষের সারা সময় টুকু।
ফেরদৌস স্যারের নামে নানা কথাই বলল, কিন্ত অর্থি কেমন চুপ করে রইল,, তার শরীর টা ভালো লাগছে না, কেমন দূর্বল লাগছে, মনে হয় না খেয়ে থাকার কারনেই এমন টা হচ্ছে। তাই কলেজ শেষে যখন ফেরদৌস ফুচকা খেতে বলল প্রথমে তো অর্থি বললো সে খালি পেটে আছে তাই এখন ফুচকা খাবে না।
কিন্ত ফেরদৌসের বারবার বলার কারনে খেল চার পাঁচটা। কিন্ত ফুচকা খেয়ে যেন শরীর খারাপ লাগাটা আরো বাড়ল,,, হেটে যাওয়ার সাধ্য হলো না, রিকশা করেই বাসায় গেল, কিন্ত যত সময় যাচ্ছে তত যেন টিকে থাকা দায় হয়ে পড়েছে। তল’পেটের বাম পাশটায় প্রচন্ড ব্যাথা করছে সাথে বমি বমি ভাব লাগছে।
এর মধ্যে এখন যদি রেবেকা বেগম কে বলেন ফুচকা খাওয়ার পর থেকেই এমনটা হচ্ছে তাতে তিনি একগাদা কথা শোনাবেন,, তাই বাসায় ফিরে কোনো রকম জামা পাল্টে লুটিয়ে পড়ল বিছানায়।
রেবেকা বেগম অনেক বার খেতে ডাকলো কিন্ত অর্থির থেকে সাড়া পেলেন না,, তিনি হয়ত ভাবলেন জিদের কারনে অর্থি এমনটা করছে, তাই কয়েকবার ডেকে তিনি ও আর ডাকলেন না। কিন্ত এদিকে রুমের ভেতর অর্থির মরি মরি অবস্থা, শেষে না টিকতে পেরে জোরে জোরেই কান্না দিল পেটে ব্যাথা কারনে।
রেবেকা বেগম তো খাবার টেবিলেই ছিলেন,
কান্নার স্বর তার কানে আসতেই তিনি ছুটে আসেন অর্থির রুমে,,, এসে দেখেন অর্থি এলোমেলো ভাবে বিছানায় শুয়ে কান্না করছে।
রেবেকা বেগম চিন্তিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন;
–” কি রে কি হয়েছে তোর! এমন করছিস কেন! কি হলো কথা বলছিস না কেন!
অর্থি শুধু মুখ থেকে উচ্চারণ করলো;
–”পেটে ভীষণ ব্যাথা করছে আম্মু,,, আমি আর পারছি না,,,
আর কিছুই বলতে পারলো না,, গল গল করে ব’মি করলো কয়েকবার, রেবেকা বেগম পরিষ্কার ও করলেন সাথে সাথে। কিন্ত অর্থির অবস্থা তো খারাপ থেকে খারাপ হচ্ছে,, তাই তিনি ফোন করে জাবের সাহেব কে অর্থির খবর জানালেন আর তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরতে বললেন। কিন্ত অর্থির পেটের ব্যাথা এতটাই তীব্র হলো যে জ্ঞান হারালো তখনই।
চলবে।
একটু খানি স্পয়লার।
( অর্থি জোরেই হাসলো মিষ্টির এমন কথা শুনে,, তবে এখন বুঝছে, তার জীবনে সাম্য নামক ব্যাক্তি হলো সেই ঝড় তুফানের মতো,, না না ঝড় তুফান নয়, সিডর, আইলা, এক্কেবারে দশ নম্বর বিপদ সংকেত। যখন তখন আসে আর পুরো জীবন টা এলোমেলো করে দিয়ে যায়। আর কিছু একটা যেন খালি করে দিয়ে যায়। )
____
কি বুঝছেন সামনে কি হবে,,, আপাতত আগ্রহ যেন না হারান তাই এই ছোট লেখাটি দিলাম,,, কিন্ত আমি বলেছি কিছু পর্ব অর্থিকে নিয়ে লিখবো, সেখানে বাড়তি কোনো চরিত্র থাকবে না,, তাই পরবর্তী পর্বের জন্য বেশি বেশি কমেন্ট করুন,, রেসপন্স না পেলে একদমই লিখতে ইচ্ছে হয় না,, মনে হয় গল্প বুঝি কারো পছন্দ হচ্ছে না!!
তাই গল্প তো হাজারের বেশি মানুষ জন পড়েন, আপনারা একটু হলে ও লাইক কমেন্ট করবেন,,, আর কমেন্টবক্স দেখুন।

