প্রেম_বর্ণহীন #তোনিমা_খান #পর্বঃ১৩

0
2

#প্রেম_বর্ণহীন
#তোনিমা_খান
#পর্বঃ১৩

পুরো ঘরময় থমথমে হয়ে গেল হঠাৎ বিবাহের প্রস্তাব। প্রস্তাব হলেও মানা যেত! এ যেন বিনা বর্তায় আঁছড়ে পড়া কোন সুনামি। সিদ্দিকী সাহেব থমথমে মুখে নত শির বসে আছেন। পাড়ার মানুষজন এসেছিলেন কৃষ্ণ বরনের মেয়েটির অভিশপ্ত জীবনে অকাল ঝড়ে পড়ার গল্প শুনতে। এক দুপুর কারা আঁটকে রেখেছিল সহিসালামত ভাবে ফেরত তো দেয়নি। কিন্তু আসামাত্র নতুন যুক্ত হওয়া এই চমৎকার দৃশ্যে আপাতত বসার ঘরেই তারা স্থায়ী ঘাঁটি স্থাপন করেছেন। শেষ না দেখে নড়বেন না এই তাদের দৃঢ় প্রত্যয়। সিদ্দিকী সাহেব বাঁক হারা হয়ে শুধায়,
–“এসব তুমি কি বলছ, মোত্তাকিন? ইন্দুবালা বিয়ের জন্য রাজি হয়েছে?”

মোত্তাকিন নির্বিকার ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে বলল,
–“জি আঙ্কেল, ও বলেছে আমি মানসম্মত একটা চাকরি পেলেই ও আমায় বিয়ে করবে। এই যে চাকরির জয়েনিং লেটার, এই যে বিয়ের সব সরঞ্জাম আর এই যে কাজী! এখন আমার বউ আমায় শরিয়ত মোতাবেক বুঝিয়ে দিলেই হচ্ছে!”

ইনসিয়া বিস্ফোরিত নয়নে পর্যবেক্ষণ করছে আপাদমস্তক দৃঢ়তায় আবৃত ছেলেটিকে। হঠাৎ করেই নিজের জিনিস বুঝে নেয়ার প্রবল দৃঢ়তায় সকলের ন্যায় সেও বাঁক হারা। সে চাকরির লেটারটা ছিনিয়ে নিয়ে আপাদমস্তক চোখ বুলায়। আরেকদফা চমকালো ইরতেজা কোম্পানির বড় একটা পজিশনে জবের জয়েনিং লেটার। তারমানে মোত্তাকিন তার বাবার সম্পত্তি বুঝে নিচ্ছে। ইনসিয়া এবার অস্থির হয়ে পড়ল। সে এক ছুটে ছুটলো মা এর কাছে। চড় খেয়ে মা সেই সন্ধ্যা থেকে বেহুঁশের মতো ঘুমাচ্ছে। সিদ্দিকী সাহেব টি টেবিলের উপর থেকে চাকরির লেটারটা তুলে নিয়ে মনোযোগ সহকারে দেখলেন। অতঃপর ছেলেকে বললেন,
–“ইন্দুকে ডেকে নিয়ে আসো তো!”

ইনসিয়ার নানু এবার বড় নাতনির কির্তীকলাপে বেশ ক্ষুব্ধ হলেন।
–“বাহ্! একটা ঝামেলা থেকে মুক্তি পেতে না পেতে, পথেই সে নিজের ব্যবস্থা করে এসেছে। আবার সেই মেয়েকে নিয়ে তোমার এত আহ্লাদ জামাই। তা দেখলে তো মেয়ের আসল রূপ? তোমার এই মেয়ে যেভাবে সকলের নাকে দড়ি দিয়ে ঘুরায়, তার থেকে তো আমার ইনসু আরো বেশি শান্ত আর নম্র। আর তুমি বলো কি-না আমার মেয়ে তোমার মেয়ের জীবন ঝাঁঝরা করে দেয়।”

মোত্তাকিন কপাল কুঁচকে তাকায় পৌঢ় মহিলার দিকে। তীক্ষ্ম স্বরে খোঁচা মেরে বলে,
–“আপনি এই বয়সে এসেও এত কুটনীপনা করতে পারলে ইন্দুবালা যৌবনের তেজে সবাইকে একটু নাকে দড়ি দিয়ে ঘুরাতে পারবে না, নানু? আপনার ছত্রচ্ছায়ায়-ই তো বড় হয়েছে। নিশ্চিত যৌবন কালে আপনিও পাড়া ভেঙে বেরিয়েছেন?”

পান চিবুতে থাকা পৌঢ় ভদ্রমহিলা সকলের মাঝে এহেন কথায় রাগে লাল হয়ে গেলেন। তেতে উঠে বললেন,
–“কি বললে তুমি মোত্তাকিন? আমি কুটনীপনা করি? আমার ছত্রছায়ায় বড় হলে ও নিশ্চিত ও সভ্য হত। অসভ্যের মত এর সাথে, ওর সাথে ফষ্টিনষ্টি করে বেড়াত না। দেখো না আমার নাতনি ইনসিয়াকে? কত নম্র ভদ্র। কারোর গায়ে পড়ে না। আর ও তো পুরুষ মানুষ দেখলেই গায়ে পড়ে যায়।”

মোত্তাকিনের মেজাজ বিগড়ে গেল। সে এমন ধরণের কথা শুনতেই পারে না। সে দাঁত খিচে বলল,
–“ফষ্টিনষ্টি আপনার আর আপনার নাতনি ইনসিয়ার থেকে ভালো কে জানে? আপনারা তো এগুলোর সরদারনি। কে কার গায়ে পড়ে তা আমার থেকে ভালো কেউ জানে না, নানু্। তাই ঘরে বসে এত প্রেশার নিয়েন না, কখন কুটনামী করতে করতে দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করে যান।”

–“মোত্তাকিন! বড়দের সাথে এমন করে কেউ কথা বলে?”, মধুমিতা ধমকে উঠলেন ছেলেকে।

মোত্তাকিন পাল্টা গর্জে উঠল মায়ের উপর।
–“তো উনি না জেনে উল্টাপাল্টা কথা বলছে কেন? উনি দেখেছে ইন্দুবালা ফষ্টিনষ্টি করেছে নাকি? কত খারাপ খারাপ ওয়ার্ড ইউজ করছে তা দেখছ না? আমায় না বলে ওনাকে বলো।”

মোত্তাকিন ফোঁস ফোঁস করছে। ইনসিয়ার নানু এবার চুপসে গেল সেই গর্জনে। সেও থমথমে মুখে বসে রইল। সিদ্দিকী সাহেব নিগুঢ় চোখে ছেলেটিকে পর্যবেক্ষণ করতে করতেই স্মিত হাসলেন। ছেলেটি উগ্র, স্পষ্টবাদী সে জানে। কিন্তু আগে কখনো তো তার মেয়ের জন্য এমন করে পাশে দাঁড়াতে দেখেনি। হঠাৎ কেমন দায়িত্বপরায়ন হয়ে গেল! তার পরে জীবনে প্রথমবার কেউ তার মেয়েটার জন্য অওয়াজ তুলেছে। ছোটবেলা থেকে তার মেয়েটার সাথে বেশ বন্ধুত্বপূর্ণ খোটাখুটির সম্পর্ক! সে বহুদিন দেখেছে দু’জনকে ঝগড়া করতে, চুল টানাটানি করতে। আবার কোনদিন এটাও দেখেছে দু’জনে পাশাপাশি বসে নীরবে হেসেখেলে গল্প করছে। ঘুমু ঘুমু চোখে ইন্দুবালা দোদুল্যমান দেহে বসার ঘরে আসে। আসতেই তার চোখ থেকে ঘুম ছুটে যায় সোফায় মোত্তাকিনকে দেখে। সে আশেপাশে তড়াক দৃষ্টি ফেলে মোত্তাকিনের দলবল সহ অপরিচিত মানুষের অভাব নেই। সে অপ্রস্তুত হয়ে বাবার উদ্দেশ্যে শুধায়,
–“আব্বু, কি হয়েছে?”

মোত্তাকিন চোয়াল শক্ত করে দেখে মেয়েটির আপাদমস্তক। একটা সুতির থ্রিপিস তাও আলুথালু অবস্থা। ইচ্ছে করে না একটা কানের নিচে দিতে? কত করে বলে দিয়েছিল বাড়ি ফিরে যেন নিজের হুলিয়া ঠিক করে কিন্তু নাহ, মহারানী ঘুমিয়ে ছিল!

সিদ্দিকী সাহেব মেয়েকে কাছে ডেকে বসালেন। মোত্তাকিনকে দেখিয়ে বললেন,
–“মোত্তাকিন যা বলছে তা সত্যিই?”

–“কি বলছে?”, ইন্দুবালা কপাল কুঁচকে শুধায়।

–“ও একটা মানসম্মত চাকরি পেলে নাকি তুমি ওকে বিয়ে করতে রাজি হবে।”

ইন্দুবালা চোখ পাকিয়ে তাকায় ছেলেটার পানে। রেগে বলে,
–“এগুলো সব ওর নিজের মনগড়া…

ইন্দুবালা কথা সম্পূর্ণ করতে পারল না তার আগেই মোত্তাকিন ব্যগ্র কণ্ঠে বলল,
–“এই ইন্দুবালা মোটেও মিথ্যা কথা বলবি না। আমি নিজের মনগড়া কথার প্রেক্ষিতে গিয়ে হন্য হয়ে চাকরি খুঁজতে যাব না এটা সবাই ভালো করে জানে। এখন ঢং করবি না মোটেই!”

–“মোত্তাকিন থামো!”, সিদ্দিকী সাহেব তাকে থামিয়ে বললেন,
–“আম্মা, তুমি বলো। আমিও জানি, ও কোন ভিত্তিহীন কথার প্রেক্ষিতে এসব করবে না।”

সিদ্দিকী সাহেব টেবিলের উপর সাজিয়ে রাখা গহনা বিয়ের শাড়ি ফুল মিষ্টি দেখিয়ে বললেন। ইন্দুবালা ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
–“আব্বু, আমি বলেছিলাম কিন্তু…”

মোত্তাকিন এবারো তাকে থামিয়ে দিলো।
–“দেখেছেন? ও বলেছে। এখন তো সব ক্লিয়ার! এই নে তোর চাকরি আর এই নে বিয়ের সরঞ্জাম। এখন রেডি হয়ে আয় তাড়াতাড়ি।”

–“কিসের বিয়ে কার সাথে বিয়ে?”, তহমিনা হম্বিতম্বি করে ছুটতে ছূটতে বসার ঘরে আসল। অস্থির দৃষ্টিতে সবাইকে পর্যবেক্ষণ করে বজ্রকণ্ঠে শুধায়,
–“কার সাথে কার বিয়ের কথা চলছে?”

মোত্তাকিন দাঁত কেলিয়ে বলল,
–“বিয়ের কথা চলছে না, কাকি; বিয়েই হচ্ছে। ”

–“মানে?”

–“মানে, আমার আর ইন্দুবালার বিয়ে হচ্ছে। আপনার না আসলেও চলত। একচুয়েলি কারোর না আসলেই চলত। শুধু কাজী, আমি আর ইন্দুবালা থাকলেই হতো। কিন্তু নাহ..”, মোত্তাকিন ভীষণ মেজাজ খারাপ অচিরেই দমিয়ে নিলো দীর্ঘশ্বাসের আড়ালে। মধুমিতা সেই থেকে ছেলেকে পর্যবেক্ষণ করে যাচ্ছে। ছেলের সাথে একদফা বাকবিতন্ডার পরেই এই পর্যন্ত এসেছে। তাকে জোরপূর্বক শতভাগ সম্মতির সাথে ছেলেপক্ষ বানিয়ে বসিয়ে দিয়েছে তার নিজেরই ছেলে। তার এখন মনে হচ্ছে সে নয়মাস পেটে একটা কালসাপ পুষেছে। বিয়ে করবে বলে চাকরি, শপিং সব না-কি হালাল টাকায় করে এনেছে। অথচ এই বুড়ো মা? মধুমিতার বুক ভেঙে আসল ছেলে রূপে আস্ত এক কালসাপ পুষে।

–“তুমি এইটা করতে পারো না, মোত্তাকিন। আমার এক মেয়ের মন ভেঙে আরেক মেয়েকে বিয়ে করতে পারো না। আমি এই বিয়ে হতে দেব না। তুমি তো ইনসিয়াকে ভালোবাসো।”, তহমিনা গর্জে উঠল। সবাই অবাক হয় আরেকটা গরম গরম চমৎকার সংবাদ পেয়ে। মোত্তাকিন ডানে বামে মাথা নাড়লো, এতটুকুর বুঝি অভাব ছিল। সে সোজাসুজি সিদ্দিকী সাহেবের চোখে চোখ রাখে। থমথমে মুখে ভীষণ গাম্ভীর্যের সাথে বলে,
–“আঙ্কেল এখানে দশ জনে দশ কথা বলবে। কেউ ভালো চাইবে তো কেউ ক্ষতি। আমার হাতে সময় কম। আপনি বিজ্ঞ মানুষ! ছোটবেলা থেকে আমায় দেখেছেন। আমি আপনার মেয়েকে স্বসম্মানে বিয়ে করে ঘরে তুলতে চাই। আপনার মেয়ের চাহিদা মোতাবেক একটা মানসম্মত চাকরিও আছে। তাকে হালাল পয়সায় ভরণপোষণ করতে পারব। আপনি কি আমার হাতে তাকে তুলে দিতে রাজি?”

মধুমিতার শ্বাস উঠে গেল ছেলের এমন বদলে যাওয়া আশ্চর্য রূপ দেখে। সে সিদ্দিকী সাহেবের থমথমে মুখ দেখে বুকে হাত চেপে হায় হায় করে উঠল। লম্বা লম্বা শ্বাস ফেলতে ফেলতে বিড়বিড় করে বলে,
–“ওরে বাবু! তুই যত তাড়াতাড়ি খোলস বদলাতে পারিস, তত তাড়াতাড়ি সাপ ও খোলস বদলায় না। গিরগিটির থেকেও তুই বেশি খারাপ! আহারে কালসাপ আর গিরগিটির সংমিশ্রণে একটা গুঁইসাপ জন্ম দিয়েছি আমি।”

–“ইনসিয়ার আব্বু, তুমি এই বিয়েতে রাজি হবে না। এখানে তোমার আরেক মেয়েও জড়িয়ে আছে। মোত্তাকিন ইনসিয়াকে ভালোবেসে ইন্দুকে কি করে বিয়ে করতে পারে?”

সিদ্দিকী সাহেব মোত্তাকিনের দিকে প্রশ্নবিদ্ধ নয়নে তাকায়। মোত্তাকিন তা দেখে হাঁফ ছেড়ে বলে,
–“আপনারা প্রতিবেশী হলেও আমি আপনাদের আপন ভাবি আঙ্কেল। তাই, ছোট বোন ভেবে দুদিন ভালো মন্দ নিয়ে কথা হয়েছে ফেসবুকে। তাতে যদি আপনার শাশুড়ির নাতনি গায়ে পড়া মেয়েদের মতো আমার পিছে পড়ে যায়, তাতে আমার কি দোষ বলুন?”

শেষের কথাটিতে থাকা ছোট্ট খোঁচাটি ইনসিয়ার নানু সন্তপর্ণে নত শির গিলে নিলো। ইনসিয়ার মুখ লাল হয়ে গেল অপমান, লজ্জায়। সিদ্দিকী সাহেব কঠোর চোখে তাকালেন তহমিনার দিকে। স্বামীর সেই চাহনিতে তহমিনার হাতটি আপনাআপনি গালে চলে গেল। সে চুপ হয়ে গেল। তবে অন্তঃস্থল অস্থির! কোনক্রমেই সে ইন্দুবালাকে সিটি মেয়রের পুত্রবধূ হতে দেখতে পারবে না সে।

সিদ্দিকী সাহেব এবার সোজা তাকায় মধুমিতার দিকে। ঢাকা শহরে এসেছে পর থেকে এই মানুষটাকে নিজের প্রতিবেশী হিসেবে পেয়েছে, দেখছে একা একা লড়তে। ছেলের অধঃপতনে কিভাবে গুমড়ে গুমড়ে মরেছে সেটাও দেখেছে। সে নরম স্বরে বললেন,
–“ভাবি আজকের ঘটনার পর আমার কাউকে বিশ্বাস করতে ভয় করে। মানুষ ভয়ঙ্কর! তাদের বদলে যেতে সময় লাগে না। আমি আপনাকে আজ থেকে চিনি না কিন্তু মোত্তাকিন যে মারামারি, গুন্ডামি করে বেড়ায়। এটা একটা বিপদজনক জীবন। আমি আপনার ভরসায় আমার মেয়েটাকে এমন জীবনের দিকে কি ঠেলে দিতে পারি?”

মধুমিতা যেন এমন মুহুর্তের ই অপেক্ষায় ছিল। সে ইন্দুকে ভীষণ ভালোবাসে কিন্তু সে এটাও জানে তার ছেলে সহজে শুধরানোর মতো ছেলে নয়। তাই সে হৈ হৈ করে বলল,
–“আপনি আপনার মনের কথা শুনুন, ভাইজান। আপনার মন যদি সায় না দেয় তবে কোন দরকার নেই। ঐ নালায়েকের উপর আমার নিজেরই বিশ্বাস নেই ভাইজান। আমি ইন্দুকে আমার মেয়ের মত ভালোবাসি, তাই জেনেশুনে ওর কোন ক্ষতি আমি হতে দিতে পারি না।”

মোত্তাকিন জ্বলন্ত চোখে তাকায় মায়ের পানে। চাপা স্বরে হিসহিসিয়ে বলে,
–“তোমার মতো মা থাকলে ছেলের বিয়ে ভাঙার জন্য কোন দুশমনের প্রয়োজন নেই, মামনি। নিজের ছেলের বিয়েতে এত বড় ভাঙানি দিতে পারলে?”

মোত্তাকিন ভেবেই নিলো সব শেষ! সিদ্দিকী সাহেব স্মিত হাসলেন ছেলের মায়ের এহেন কথায়। অতঃপর ঘাড় দুলিয়ে বললেন,
–“আমার তো মনে হয়, সবাইকেই সঠিক পথে আসার জন্য একটা সুযোগ দেয়া উচিত।”

সহসা মোত্তাকিনের মুখে হাসি ফুটে উঠল। সে তৎক্ষণাৎ হৈ হৈ করে বলল,
–“এই তো আঙ্কেল বিজ্ঞদের মতো একটা কথা বলেছেন।”

ইন্দুবালা কপাল কুঁচকে তাকিয়ে আছে হাতে থাকা জয়েনিং লেটারটির দিকে। যেখানে ইরতেজা কোম্পানির নাম লেখা। মোত্তাকিনের তার বাবার সাথে কি যোগাযোগ আছে?
–“কিন্তু সেটা ইন্দুবালা যদি চায় তবেই হবে।”

–“আমি আমার কথা রেখেছি ইন্দু, এবার তুই তোর কথা রাখবি।”

ইন্দুবালার প্রসঙ্গ আসতেই সে চোখ তুলে তাকায়। মোত্তাকিন চোখ পাকিয়ে কঠোর দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মেয়েটির পানে। দৃষ্টির মানে এটাই বলছে যে, না বললে তুলে নিয়ে বিয়ে করব।
ইন্দুবালা মধুমিতার দিকে তাকাতেই মধুমিতা ইশারায় বলল,
–“কোন চাপ নেই, তোর যা ইচ্ছা! আমি তোর সাথে আছি।”

অন্যদিকে ছেলে ইশারায় হ্যাঁ বলার জন্য একপ্রকার চাপ দিতে লাগল। মা ছেলের বিস্তর ফারাকের এই মতবাদের এক প্রকার প্রশান্তি এনে দেয় ইন্দুবালার সিদ্ধান্ত।
–“আমি রাজি।”

মোত্তাকিন বুক ভরা নিঃশ্বাস ফেলে কাজীকে টেনে নিজের পাশে বসায়। ছেলেটির সবকিছুতে হম্বিতম্বি ! জীবনযাপনে হম্বিতম্বি, আচার আচরণে হম্বিতম্বি এমনকি বিয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও হম্বিতম্বি ।সিদ্দিকী সাহেব খানিক গম্ভীর গলায় বললেন,
–“আচ্ছা ঠিক আছে। কিন্তু এতো তাড়াহুড়োর কি আছে? আমরা সময় নেই। আমার বড় মেয়ের বিয়ে একটু আয়োজন না করতে পারলে মন মানছে না।”

–“আঙ্কেল কোন মানুষদের নিয়ে আনন্দ করবেন যারা এতদিন বিয়ে হয় না বলে বলে আপনার মেয়েকে একঘেয়ে করে রেখেছে তাদের? এত মানুষ খাইয়ে কথা ছাড়া কিছু হবে না। তার চেয়ে আপনি আমার বউ আমায় এভাবেই বুঝিয়ে দিন তাতেই হবে।”
সিদ্দিকী সাহেব মুগ্ধ হন ছেলেটির কথায়। তার পরামর্শ নেয়ার মতো কেউ নেই, সেই সবকিছু। অতঃপর ক্ষণিকের মাঝেই ঘরটি বিয়ের আমেজে রমরমা পরিবেশে পরিণত হলো। স্ত্রীর অগোচরে যেটুকু পেরেছে জোগাড় করে রেখেছেন সিদ্দিকী সাহেব। সেগুলোই মেয়ের হাতে তুলে দিলেন। স্বামী আর বাবার দেয়া ঐ স্বল্পকিছু ভালোবাসায় মেয়েটি মুহুর্তেই অসম্ভব সুন্দর এক নজর কাড়া বধূরূপে সেজে উঠল। কালো কুচকুচে গায়ের রঙ একটুও ম্লান করতে পারল না মেয়েটির বধূসাজ।
মধুমিতা নিজেই নিজের পুত্রবধূকে সাজিয়ে নিয়েছে। সাজিয়ে নিজেই হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন। দু’হাতে মেয়েটিকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে আহ্লাদী সুরে বলে ওঠে,
–“আমার সখী এখন আমার পুত্রবধূ। সারাজীবন আমার সাথে থাকবে। আমার ছেলেটা তোকে সুখ দিক বা না দিক আমি তোকে সবসময় আগলে রাখব। এই কথা দিলাম। কখনো কোন দুঃখ পেতে দেব না। ঐ অপদার্থ গোল্লায় যাক তুই আর আমি সারাজীবন সখী হয়ে কাটিয়ে দেব।”

সারাদিনের বিদঘুটে অভিজ্ঞতার পর এই মুহূর্তে এসে প্রাণখোলা হাসি হেসে উঠল। মধুমিতা চোখের পানি মুছে গহনা গুলো পড়াতে পড়াতে বলল,
–“দেখেছিস ছেলেটা আমার অপদার্থ হলেও তোর জন্য বুজে বুঝে কি সুন্দর শপিং করে এনেছে? আমি তো ভেবেছিলাম আমার পুত্রবধূকে আমার খালি হাতে ঘরে তুলতে হবে। সোনাদানা দেয়ার মতো সামার্থ্য আমার নেই। কিন্তু আল্লাহ আমার সহায় হয়েছে দেখেছিস? তোকে খালি হাতে ঘরে তুলতে হলে আমি অনেক কষ্ট পেতাম। কারণ তুই রাজরানী হওয়ার হকদার।”

ইন্দুবালা বিরক্ত হয় সেই অসম্ভব কথাবার্তায়। সে বিরক্ত হয়ে বলে,
–“চাপা মেরো না, মধু। এটা বলো তোমার ছেলে চাকরি পাওয়ার সাথে সাথে এত টাকা পেল কোথায়? নাকি এগুলো ঐ গুন্ডামির পয়সায়?”

–“কসম দিয়ে বলেছে এগুলো নাকি সব হালাল পয়সার। ও খেটে শোধ করবে।”

–“তোমার ছেলের কসম ও আমার এমিটেশনের লাগে, মধু।”

মধুর হাত থেমে যায়। সে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে বলে,
–“এমিটেশন?”

–“মনে আসল না, মধু্”

–“আমার ছেলেটাকে এতো পঁচাস না, ইন্দু। আমি কিন্তু তোর সখী হওয়ার আগে শাশুড়ি। মনে থাকে যেন! আমার ছেলেটা সারা সন্ধ্যা নাকি হন্য হয়ে ঘুরেছে চাকরি খোঁজার জন্য আর পুরো মার্কেট ঘুরে এই শপিং করেছে—শুধু তোকে বিয়ে করার জন্য। আর তুই ওকে পঁচাচ্ছিস।”

–“বিয়ে হতে না হতেই তুমি সখী থেকে শাশুড়ি হয়ে গেলে, মধু?”

–“আরে নাটক করেছি, বোকা মেয়ে!”
মধু মেয়েটির পিঠে চাপড় দিয়ে বলল। ইন্দুবালা বিরক্তি নিয়ে তাকায়। ঘরে কারোর প্রবেশের আভাস পেতেই মধুমিতা ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়। ইনসিয়া আর তহমিনা থমথমে মুখে দাঁড়িয়ে আছে।
–“ভাবি, আপনি একটু বাইরে যান। বাদবাকি সাজ আমি আর ইনসিয়া করে নেব।”

মধুমিতার কপাল কুঁচকে গেল এহেন কথায়। সে তৎক্ষণাৎ বিরোধীতা করে বলল,
–“নাহ, ভাবি! আমার পুত্রবধূ আমি কারোর ভরসায় ছাড়ছি না।”

–“আমাদের কিছু কথা আছে ভাবি।”

–“যা বলার আমার সামনে বলুন।”

–“আপনি এমন করতে পারেন না ভাবি। মেয়েটা আমার।”

–“আপনি আপনার মেয়ের কেমন মা তা আমার থেকে ভালো কেউ জানে না, ভাবি। তাই আমি আর ওকে এক মুহুর্তের জন্য ও আপনি কেন দুনিয়ার কারোর কাছে ছাড়বো না।”, মধুমিতার দৃঢ় কণ্ঠে তহমিনা আর ইনসিয়ার সেখানেই গতিরোধ হলো। নিজ পরিকল্পনায় সফল হওয়ার কোনপ্রকার উপায় পেল না মধুমিতার শক্ত বাহুডোরে ইন্দুবালাকে দেখে।

সদ্য পাঞ্জাবী পড়ে আসা মোত্তাকিন ব্যস্ত কদমে ইন্দুবালাদের ঘরে ঢুকতে ঢুকতেই তার ব্যস্ততা মিলিয়ে গেল সম্মুখের বধূসাজে মেয়েটিকে দেখে। ওষ্ঠকোনা আলতো বেঁকে যায়‌। তার কল্পনার অধিক সুন্দর লাগছে মেয়েটিকে। ছোটবেলা থেকে দেখে আসছে খুব সাদামাটা রঙ ছাড়া মেয়েটির সৌন্দর্য ফোঁটে না। সে চুলে হাত গলাতে গলাতে ঘরে ঢুকে ধপ করে মেয়েটির পাশ ঘেঁষে বসে পড়ল। দীর্ঘ কটুক্তি যুক্ত রুক্ষ পথের জীবনযাত্রার ক্লেশ পাড় করে ঠিক এগারোটা ত্রিশ মিনিটে ইন্দুবালার জীবনের সবচেয়ে বিদঘুটে নিন্দার অবসান ঘটে। এমন কালো মেয়েটিকে কে বিয়ে করবে? সেই প্রশ্নের জবাবস্বরূপ আজ কেউ ভীষণ যত্নে মেয়েটিকে আগলে নিয়েছে। তাতে ছিল না কোন বাধ্যবাধকতা কিংবা জোরজবরদস্তি! কালো মেয়েটিকে বিয়ে করার জন্য ও কেউ উদগ্রীব হয়ে পড়ে, নিজে যত্ন করে সবচেয়ে বেস্টটা কিনে আনে এবং নিজের সর্বোচ্চটা দিয়ে তাকে স্ত্রীর সম্মান প্রদান করে।

ঠিক কবুল বলার পরেই মোত্তাকিন মেয়েটির হাতটি নিজের মুঠোয় নিয়ে নেই। তার ওষ্ঠকোনে অদ্ভুত এক হাসি! যেন শত বাঁধার মাঝেও জিতে যাওয়া এক মানুষ সে। ইন্দুবালা তাকিয়ে থাকে সেই হাসিমাখা মুখটির দিকে। অন্তরালে প্রশ্ন জাগে তার মতো স্বস্তা, বিদঘুটে সৌন্দর্যের কাউকে পেয়ে কারোর মুখে কেন এমন প্রাপ্তির হাসি?

সেই রাতের অন্ধকার আরেকটু ভারী হয়ে উঠল বিদায় বেলার বেদনাদায়ক মুহুর্তে। যেই বেদনা ছিল কেবল ইন্দুবালার বাবা জুড়েই। সিদ্দিকী সাহেবের আঁধার নামা মুখটির দিকে তাকিয়ে মধুমিতা বলে,
–“জানালা থেকে মেয়েকে দেখতে পারবেন ভাইজান। এতেও এত কান্না?”

সিদ্দিকী সাহেব ম্লান হেসে বললেন,
–“নাহ, ভাবিজান। কাঁদছি এর জন্য যে আমার বুক খালি করে, পুরো পৃথিবীর দুশ্চিন্তা আর নিন্দা দূর হবে এখন। সবাই সুখী হবে এখন। আর কেউ উঠতে বসতে কটু কথা বলবে না। আমার মেয়েটা যতদিন আমার বুকে ছিল ততদিন কখনো হাসিমুখে বাঁচতে পারেনি ভাবিজান। তাকে কেউ হাসিমুখে বাঁচতেই দেয়নি।”

ইন্দুবালা দেখল এই ধরণীতে তার আপন বলতে এই বাবা ছাড়া কেউ নেই। ইনসিয়া আর তহমিনা তো বের ই হয়নি পুরো বিয়ের কার্যক্রমটিতে। বারোটা বেজে গেল ইন্দুবালাকে নিয়ে ঘরে ঢুকতে। মধুমিতা আগে আগে ঘরে ঢুকে শরবত আর মিষ্টি নিয়ে আয়। সেগুলো ইন্দুবালা আর ছেলেকে খাইয়ে বলল,
–“বাবু, জীবনে কোন পুণ্য করেছিস যার কারণে এই মেয়েটা আজ তোর বউ। নয়তো তোর কোন যোগ্যতা নেই ওর মতো বউ পাওয়ার। উঠতে বসতে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবি। দুই রাকাত নফল নামাজ আদায় করিস আল্লাহর শুকরিয়া করে। আর মেয়েটাকে মাথায় করে রাখিস বুঝলি?”

মোত্তাকিন সরু চোখে চেয়ে বলে,
–“কথায় কথায় অপমান না করলে হয় না তোমার?”

–“তুই প্রশংসা পাওয়ার মতো কোন কাজ করিসনি বিয়েটা ব্যতীত। এখন তাড়াতাড়ি ঘরে ঢোক। সারাদিন মেয়েটার উপর কম ধকল যায়নি। ঘুমাবে ও।”

দু’জনে একসাথে বাড়িতে প্রবেশ করলেও এক ঘরে প্রবেশ করতে দেয়নি মধুমিতা। দু’জনকে খাইয়ে মধুমিতা সোজা ইন্দুবালাকে বগলদাবা করে নিয়ে নিজের ঘরের পথ ধরল। সদ্য জামাকাপড় বদলে আসা মোত্তাকিন সরু চোখে মায়ের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করতে করতে শুধায়,
–“কি হলো ওকে বগলদাবা করে নিয়ে চললে কোথায়?”

–“ঘরে!”, মধুমিতার থমথমে কণ্ঠ। মোত্তাকিন কপাল কুঁচকে শুধায়,
–“মানে?”

–“মানে, তোর ঐ আঁস্তাকুড়ের মাঝে ও ঢুকলে অজ্ঞান হয়ে যাবে। তাই ও আমার ঘরে ঘুমাবে।”

–“মাঝরাতে রসিকতা করো না, মামনি।”

–“কোন রসিকতা করছি না, বাবু। তুই ওর মতো বউ পেয়েছিস এটাই তোর সাত কপালের ভাগ্য, ওকে নিজের ঘরে রাখার মতো বিলাসীতার চিন্তাও করবি না।”

মোত্তাকিন হতভম্ব হয়ে যায় মায়ের কথায়। তেতে উঠে বলে,
–“আমার বউ আমার ঘরে থাকবে এটা তোমার কাছে বিলাসীতা লাগে? বিয়ে আমি করেছি না-কি তুমি করেছ যে—ও তোমার ঘরে থাকবে?”

–“ও তোকে বিয়ে করতে রাজি হয়েছে একমাত্র আমার কারণে। নয়তো তোর মতো অপদার্থকে বিয়ে করার জন্য ও রাজি হতো না।”

–“বিয়ে করেছি আমি আমার দমে মামনি। তুমি এমন হঠকারীতা করতে পারো না। আমার বউ আমায় দাও বলছি।”

–” ও আমার সখী! আমার সখী আমার কাছে থাকবে। তোর ঐ ঘরের মধ্যেও ইঁদুর ও থাকে না, ও থাকবে কি করে? আর নিজের ঘরে যে নিবি বাসর রাতে বউকে দেয়ার মতো কোন উপহার এনেছিস? আবার আমার বউ, আমার বউ করে।”

–“আমার বউয়ের উপহার আমি বুঝে নেব, তুমি আগে ওকে দাও।”

মা ছেলের লাগাতার এমন ঝগড়ায় ইন্দুবালা ডানে বামে মাথা নাড়লো। সে যে ফেঁসে গিয়েছে বাজেভাবে তা সে বেশ বুঝলো। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে মধুমিতার ঘরের দিকে পা বাড়ায়।
তা দেখে মোত্তাকিন খেকিয়ে উঠল।
–“এই মেয়ে তুই আবার ওদিকে কোথায় যাচ্ছিস?”

ইন্দুবালা ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়। শ্রান্ত স্বরে বলল,
–“ঐ আঁস্তাকুড়ের মতো নোংরা ঘরে আমি দম বন্ধ হয়ে মারা যাব।”
বলেই সে গটগট করে চলে যায়। তার পাছে পাছে মধুমিতাও ঘরে ঢুকে ঠাস করে দরজা লাগিয়ে দিল মোত্তাকিনের মুখের ওপর। মা বউয়ের এমন হঠকারীতায় মোত্তাকিন রাগে সোফায় লাত্থি মেরে ঘরে চলে গেল।
*****
তখন নিশুতি রাতের পোকারা অবমুক্ত , স্বাধীন! অমানিশা জুড়ে শুধুমাত্র তাদের ই আধিপত্য। তবে নিশুতি পোকাদের সাথে আজ আরো এক প্রাণী জেগে আছে। সেটা হলো মোত্তকিন নামক অপদার্থ ছেলেটা। যে কি-না দীর্ঘ মেজাজ খারাপের দ্বন্দ্ব মিটিয়ে রাত আড়াইটা পর্যন্ত বসে পুরো ঘর পরিষ্কার করছে। ঝাড়ু, মোছা, এলোমেলো জিনিস সঠিক জায়গায় রাখা, খুলে রাখা আধোয়া বস্ত্র সব ঠিক করে বিছানা ঝেড়ে নতুন বেডশিট বিছিয়ে মোত্তাকিন ঘেমেনেয়ে একাকার হয়ে গেল। ঝাড়ু হাতে বিশাল এক দম ফেলে চারিদিকে চোখ বুলাতেই মেজাজ আবার খারাপ হয়ে গেল। ঘরে রাখা ছোট্ট কাউচের উপর রাজ্যের কাপড় চোপড়। মাত্রই না সে একগাদা কাপড় গোছালো? সবগুলো তার ই পোশাক! যেগুলো সে বারবার এসে খুলে খুলে রাখে। রাগে মাথাটা এবার ছিঁড়ে যাওয়ার উপক্রম। যত কাজ করে ততোই যেন এলোমেলো হচ্ছে। সে রাগে গজগজ করে সব কাপড়চোপড় গুলো চেপে চেপে কাবার্ডে ঢুকালো। অতঃপর সব অগোছালো জিনিস লুকিয়ে ফেলতেই বিশাল এক দম ফেলল। মুখে হাসি ফুটে উঠল পুরো ঘর চকচক দেখে। এরপর ছুটলো মায়ের ঘরে। ভেবেছিল দরজা আটকানো পাবে কিন্তু নাহ! ভাগ্য সুপ্রসন্ন থাকায় দরজা খোলাই ছিল। সে পা টিপে টিপে ঢুকে হাতের করে আনা স্কচটেপটা ঝট করে ইন্দুবালার মুখে লাগিয়ে দিয়ে পাঁজাকোলা করে তুলে নেয়। অতঃপর অলিম্পিকের রেসারের মতো দিল এক দৌড়! ইন্দুবালা আচমকা নিজেকে শূন্যে ভাসতে দেখে চিৎকার করে উঠলেও কোন আওয়াজ বের হলো না।
আলোয়ভরা ঘরে ঢুকতেই সে অবাক হয়ে মোত্তাকিনের দিকে তাকায়। মোত্তাকিন তাকে বিছানায় রেখে ছুটে গিয়ে দরজা লক করে দেয়। ঠিক রাতে শেষ প্রহরে এসে তার হম্বিতম্বি শেষে সে বুকভরা নিঃশ্বাস ফেলে ধপ করে বিছানায় শুয়ে পড়ল। ইন্দুবালা মুখের ওপর থেকে স্কচটেপটা সরিয়ে তেতে উঠতে গেলে তাকে টেনে নিজের পাশে শুইয়ে দিল। গমগমে স্বরে বলল,
–“ঘর একদম পরিষ্কার‌, দেখ চকচক করছে। এখন চুপচাপ এখানে ঘুমাবি। রাত গভীর, চেঁচামেচি করবি না মোটেই। ভীষণ ক্লান্ত লাগছে।”

ইন্দুবালা নিজের অভিব্যক্তি দমিয়ে চারিপাশে চোখ বুলায় আসলেই ঘরটা আগের থেকে গোছানো, শ্বাস নেয়া যাচ্ছে। সে গরম চোখে ছেলেটিকে একপলক দেখে বিছানার অপরপাশে শুয়ে পড়ল। তবে কিয়ৎকাল বাদ মনে হলো তার বাহুতে কেউ মাথা ঠেকিয়েছে। সে চকিতে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালে এক অদ্ভুত চাহনি দৃষ্টি নিবদ্ধ হয়। বাহুতে ক্লান্ত অবসন্ন মাথা এলিয়ে মোত্তাকিন তাকিয়ে আছে স্থির দৃষ্টিতে। মেয়েটির বাহুতে থুতনি ঠেকিয়ে স্মিত হেসে শুধায়,
–“বাসর রাতের গিফট নিবি না?”

ইন্দুবালা থমথমে মুখে বলল,
–“চাই না আমার গিফট।”

বলেই সে আবার ঘাড় কাত করে চোখ বুঝলো। মোত্তাকিন কাঁধ ঝাঁকিয়ে নিরুদ্বেগ বলল,
–“আচ্ছা, ঠিক আছে। না নিলে নাই। আমিই রেখে দেই। আমার দারুণ সময় কাটে এটার সাথে।”

ইন্দুবালা বোঝে না তার কথা। আর না বুঝতে চায়। সে চোখ বুজে ঘুমানোর প্রয়াস করলে মিহি কণ্ঠে একটি চিরচেনা বাক্য কর্নকুহরে আন্দোলিত হলো।

–“প্রতিবেশী গুন্ডা ছেলেটা ভীষণ সুন্দর কথা বলতে জানে। পাহাড় সমান মন খারাপ দূর করার ক্ষমতা রাখা ছেলেটি সবসময় ব্যস্ততা আর উগ্রতার আড়ালে লুকিয়ে থাকে। পূর্ণ চাঁদের মতো সেও বহুদিন পরপর নিজের আবির্ভাব ঘটায়। অথচ অন্তঃস্থল তার জন্য প্রতিদিন অপেক্ষা করে!”

ইন্দুবালা ঝট করে ফিরে তাকায় ছেলেটির দিকে। মোত্তাকিন হাসছে, তার বুকের ওপর থাকা নিজের বহু মাস কয়েক পূর্বে হারিয়ে যাওয়া ডায়রিটা দেখে ইন্দুবালা এক প্রকার জংলি বিড়ালের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল ছেলেটির উপর।
–“আমার ডায়রি তোর কাছে কি করছে মোত্তাকিন?”

মোত্তাকিন হো হো করে হেসে উঠল আঁছড়ে পড়া দেহটিকে চার হাত পায়ে বক্ষমাঝে আগলে নিয়ে।

~চলবে~

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here