#ধূপছায়া
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব_২৩
লাল বেনারসি শাড়িতে বীণা। আঁচলটা কাঁধ গড়িয়ে মাটিতে লুটোপুটি খাচ্ছে। ঘোমটা টা যেন বড় অবহেলায় কোন রকম মাথায় ঝুলে আছে। সেই ঝুলে থাকা ঘোমটা টানা মুখটা ম্লান, থমথমে। হাত ভর্তি লাল রেশমি চুড়ি। সেই চুড়ি মাখানো হাতে বড় শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরা বই, খাতা। সেই বই, খাতা আঁকড়ে ধরে দাঁড়িয়ে আছে, এই যে মখমলের মতো কোমল নরম সবুজ ঘাসের উপরে মাখন রঙের স্কুলটা, তার মাঠের এক প্রান্তে । ঘন্টা পড়বে পড়বে করছে।
তখনি বীণার তনু হালকা কেঁপে উঠল। মনে পড়লো ক্লাসে যেতে হবে, কতো পড়া বাকি, পরীক্ষার ও তো সময় নেই বেশি। সে দিক বেদিক ভুলে দৌড় দিতে গেলো, কিন্তু পা আটকে গেলো কোথায় যেন। টাল সামলাতে না পেরে ধপাস করে পড়ে গেলো মাটিতে। বই, খাতা ছড়িয়ে গেলো সবুজ ঘাসের বুকে।
বীণা চিন্তিত ভাবে পেছন ফিরে তাকায়! পায়ের গোড়ালিতে জড়ানো লোহার মোটা শেকল। ভয়ে আতঙ্কে বীণার গলা শুকিয়ে আসে। আসতেই ঝটপট দু’হাতে তা খোলার চেষ্টা করে। তার ভেতর ছটফট করে উঠে, কিন্তু কিছুতেই ছাড়াতে পারে না। হঠাৎ স্কুলঘণ্টা বেজে উঠল। বীণা ছলছল চোখে স্কুলের দিকে তাকালো। তাকিয়ে আর্তনাদ করে বলে উঠে , ” কেউ আসো! কেউ আমার পায়ের শেকলটা খোলো!”
কিন্তু সেই চিৎকার যেন বাতাসে মিলিয়ে যায়। চারপাশে অসংখ্য মানুষ, ছেলে-মেয়ে, শিক্ষক, পরিচিত মুখ কেউই এগিয়ে আসে না। সবার চোখ ফাঁকা, নির্বাক। কেউ যেন তাকে দেখতেই পাচ্ছে না।
বীণার ছটফট বাড়ে, গলায় শুকিয়ে আসে। আতঙ্কে কাঁপতে কাঁপতে একসময় ফট করে চোখ খুলে ফেলে। আর খুলতেই দেখে, আয়না চোখে মুখে আতঙ্ক নিয়ে তাকিয়ে আছে।
আয়না কালকে আর উপরে যায়নি। শয়তানটা নেমেছিল খাবারের সময়। আয়না আর ও মুখো হয়’ইনি। বীণা রুমে ছিল, বীণার সাথেই ঘুমিয়েছে। দাদি অবশ্য একটু গজগজ করেছে। গজগজ করতে করতে বলেছে, ” নয়া বউ জামাই রেখে অন্য ঘরে থাকবো ক্যা? এমনিতে’ই তার নাতি বাড়িত থাকে না। বউ মানুষ আঁচল দিয়া বাঁধবো তা না, নিজের’ই মন উড়ুউড়ু। ”
অবশ্য সেই পর্যন্ত’ই! হয়তো বীণার কথা ভেবে আর বেশি কিছু বলেনি। অন্য কেউও বলেনি। সে তো হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছে। যাক বাবা, এক রাত অন্তত শান্তিতে থাকা যাবে।
বীণা ধীরে ধীরে উঠে বসল। ঘুম আর স্বপ্নের মাঝের সীমারেখাটা যেন তখনো স্পষ্ট হয়নি। ভেতরটা ধড়ফড় করছে এখনো। সে উঠে বসতে বসতে বললো, — খারাপ স্বপ্ন দেখেছি ভাবি।
আয়না না বললেও বুঝতো। ঘুমের মধ্যে’ই কেমন ছটফট করছিল। তাই সে কিছু না বলেই ঝট করে উঠে দাঁড়ালো। দাঁড়িয়ে এগিয়ে টেবিলের উপর রাখা জগ থেকে এক গ্লাস পানি এনে বীণার সামনে ধরলো। ধরে তার নরম সুরে বললো, — তোমার লেখাপড়ার খুব শখ না?
বীণা পানির গ্লাস হাতে নিলো। নিয়ে একটু খেয়ে বললো, — হুম। তোমার ইচ্ছে করেনি?
আয়না দু’পাশে মাথা নাড়লো। সে ফাইভ পর্যন্তই পড়েছে বলতে গেলে কোন রকম। প্রতিদিন নিয়ম করে যাও, নিয়ম করে পড়তে বসো। এর চেয়ে ধান শুকানো সহজ, রান্না করা সহজ, কাপড় কাচা সহজ। বাড়িতেও তেমন কোন চাপ ছিল না। চাপও নেই, টাকাও নেই, নিজের আগ্রহও নেই। তাই বন্ধ হওয়ায় তেমন কোন দুঃখও নেই।
বীণা আরেকটু পানি খেয়ে চুপচাপ বসলো! নিজেকে সামনে নিলো। নিলেও জানে এই স্বপ্নের রেশ তার পিছু ছাড়বে না।
আয়না উঠে জানালার কপাট খুলে দিলো। দিতেই রঙ বেরঙের রুমটা ঝলমল করে উঠল। বীণার রুমটা সুন্দর। একেবারে স্বপ্নের পরীর রাজ্যের মতো। সে খুলে বললো, — আমার বড় মা বলে ভোরের খোয়াব সত্য হয়। তবে ফজরের আজানের পরে শয়তানের ভেলকি।
বীণা মলিন ভাবে হাসলো! হেসে ঘড়ির দিকে তাকালো। অনেকটা বেলা হয়ে গেছে। সারারাত ঘুমাতেই পারে নি। চোখ লেগেছে শেষ রাতে। তাই হয়তো ঘুম ভাঙেনি। তা না হলে ভোরে উঠে পড়ার অভ্যাস তার আছে । সে সাইডে গ্লাস রাখতে রাখতে বললো, — শাহবাজ ভাইয়ের দু’চোখের দুশমন লেখাপড়া। অথচ তার সব সুযোগ ছিল। তবে এরশাদ ভাই, সে কিন্তু এই যে ঠিক আমার মতো। ভাইও কোন ক্লাসে দ্বিতীয় হয়নি। তবে পরিস্থিতি তাকে পড়তে দেয়নি। যা আমাদের হবে না, আল্লাহ সেই জিনিসের প্রতি আজন্মের এক তৃষ্ণা দিয়ে দেয়। আমার এই তৃষ্ণা’ই আমার শত্রু।
আয়না তাকিয়ে রইল, এতো ভারী ভারী কথা তার বোঝার কথা না। তার জীবন এতো বছর ছিল দিঘির পানির মতো একরকম। স্বচ্ছ, স্থির! আর এখন? আয়না আবার জানালার দিকে তাকালো। বাইরে সকালের রোদ ঝিলমিল করছে। সেই ঝিলমিল করা রোদে দিকে তাকিয়ে হিসেব করার চেষ্টা করে। ট্রেনের নিচে ঝাঁপিয়ে পড়া কি এর চেয়ে সহজ ছিল না?
বীণা আর কিছু বলে না। গায়ের রং না দিলেও মাথা ভর্তি কোমর সমান চুল তার। যেমন ঘন, তেমনি কালো দীর্ঘ। সেই চুল’ই টেনে হাত খোঁপা করলো। করে খাট থেকে নামলো। হাত, মুখ ধুতে হবে। ফরহাদ ভাই আসার সময় হয়ে গেছে। নাকি আসবেনা? কি জানি? তার সব কিছু এতো অসহ্য লাগছে কেন?
ফরহাদ এলো তার ঠিক সময়েই। আজও জয়তুন তাকে ডাকলো, সে দেখেও দেখলো না। বরং খুব স্বাভাবিক ভাবেই বীণার রুমে ঢুকে গেলো। আর এসে স্বাভাবিক ভাবে’ই বসলো। বীণার সাথে তার বিয়ের কথাবার্তা হচ্ছে এমন কোন লক্ষণ তার মধ্যে দেখা গেলো না। বরং তার হাতে একটা ব্যাগ, বীণা আগেই বসে ছিল। টেবিলের উপরে রেখে হালকা ঠেলে বীণার দিকে দিলো।
বীণার মন, মেজাজ সব খারাপ। স্বপ্নটা দেখার পর থেকে আরো ভয়ংকর খারাপ। সকালে না খেয়েছে খাবার, আর আয়না ছাড়া বলেছে না কারো সাথে কথা। কান্না, সারা রাত না ঘুমানোর জন্য চোখ, নাক, মুখ ফুলে আছে। সে ফোলা ফোলা চোখেই বিরক্ত নিয়ে তাকালো।
ফরহাদ অবশ্য ফিরেও তাকালো না। আজকে প্রচুর গরম। নীল রঙা শার্ট ঘামে গায়ে লেপ্টে আছে। সেই লেপটে যাওয়া শার্টের কলার পেছনে ঠেলে পানির জগ টেনে নিতে নিতে বললো, — ঘুটা দিয়ে চোখের গুটি বের করে ফেলবো ফাজিল। এভাবে ডাইনির মতো তাকিয়ে আছিস কেন? যেন কাঁচা চিবিয়ে খাবি।
বীণা চোখ ফিরিয়ে নিলো। নিয়ে ব্যাগ টেনে উঁকি দিয়ে দেখলো। কালকের শার্ট! আচার, ঝালমুড়িতে মাখামাখি হয়ে আছে। সে বড় একটা শ্বাস ফেললো। মনে মনে বললো, — আল্লাহ ধৈর্য্য দাও।
ফরহাদ পানির জগ রেখে বলল,– যদি শুনি কাজের লোকের কাছে দিয়েছিস। চামড়া তুলে নেবো। আর একটু দাগও যদি থাকে। টিফিনে নাকি কোথায় কোথায় যাস? জয়তুন আরা তো জানে না, কি পক্ষীকে খোলা ছেড়ে রেখেছে। তাই চিন্তা করিস না, আমি নিজ দায়িত্বে জানাবো।
বীণা কোন উত্তর করলো না। ব্যাগ নিয়ে সাইডে রাখলো। রেখে বই টেনে নিলো। কালকের কোন পড়াই পড়া হয়নি। অবশ্য পড়েই কোন লাভ। তাই বই খুলতে খুলতে মুখ ফুলিয়ে বললো, — কালকে আজিজ চাচা এসেছিল।
— তো?
— উনি আপনার আর আমার বিয়ের কথা বলেছে।
— তো?
বীণা চোখের মুখে বিরক্ত, আগুনে পরিণত হলো। সেই আগুন নিয়েই বললো, — তো, তো করছেন কেন? ছাত্রী আমি আপনার। ছাত্রীকে বিয়ে করবেন? তাছাড়া আপনাকে আমার পছন্দ না।
বীণা কথা শেষ করে নিশ্বাসও ফেলতে পারলো না। পরপর কয়েকটা খাতার বাড়ি মাথায় পড়লো। বীণা দাঁতে দাঁত চেপে বসলো। ফরহাদ তার মতোই বললো, — পড়ার সময় কোন হাবিজাবি কথা না। একদম না! আগেই বলেছি না।
বীণা আজ ভয় পেলো না। হজমও করলো না। তার সব ধৈর্য্য, সব হজম একমাত্র ছিল লেখাপড়ার জন্য। তো? পড়ালেখাই নেই, কিসের হজম? তাই আগের মতোই আগুন চোখে তাকালো, তেজ নিয়ে বললো, — একশো বার বললো। কি করবেন? মারবেন, মারেন। মারা ছাড়া পারেন কি?
ফরহাদ দু’সেকেন্ডের জন্য থামলো। অবাক হলো, কি না হলো, অবশ্য বোঝা গেলো না। তবে একটু হাসলো। হেসে বললো, — এই না হলো জয়তুনের নাতনি। স্বার্থে আঘাত লাগতে না লাগতেই ফণা তুলে ফেলেছে।
বীণা রাগে ফুসলো! ফরহাদ হাতের খাতাটা ইচ্ছে মতো মোড়ালো। মোড়াতে মোড়াতে বললো, — চোখ নামা বীণা।
— না।
— মেরে ভর্তা করে ফেলবো বলে দিলাম।
— আমি আর আপনার ছাত্রী না। এখন যান, যা খুশি করেন।
ফরহাদ হাতের খাতাটা রাখলো। রাখতে রাখতে খেয়াল করলো, আসলে এই ফাজিলের বেয়াদবিতে যতোটা রাগ হওয়ার কথা, ততোটা রাগ আসলে আজ আসছে না। তাই আবারো হাসলো! তার আর বীণার চেয়ারের মাঝে সবসময় অনেকটা ফারাক থাকে। আজ নিজেই এগিয়ে সেইটুকু মেটালো। মিটিয়ে বললো, — যা খুশি করলে তোকে খুঁজে পাওয়া যাবে না রে পুচকি। আর ফরহাদ কে পছন্দ করার লায়েক হতে তোর সাধনা করা লাগবে। তাই বিষ ছাড়া বিচ্ছু, ফুসফুস বন্ধ কর। পনেরো মিনিট সময় দিলাম। কি বলবি বল।
বীণা শরীরে আগুন জ্বললো, তবে শক্ত হয়ে সোজা বসে রইল। ফরহাদ ভাইকে কখনো অন্য কোন নজরে দেখা তো দূরের ভাবেওনি। তবে আজ এতো পাশে বসায়, কোথায় যেন একটু অন্য রকম লাগলো। আর লাগলো বলেই একটা শব্দও আর উচ্চারণ করতে পারলো না। আগের মতো শক্ত হয়ে’ই সোজা চুপচাপ বসে রইল।
ফরহাদও এক দৃষ্টিতে চোখ, মুখ শক্ত করে বসা বীণার দিকে তাকিয়ে রইল। পনেরো মিনিট হতেই আবার পিছিয়ে জায়গা মতো বসলো। বসতে বসতে বললো, — আমার সাথে তেজ না দেখিয়ে বাড়ির মানুষের সাথে দেখা। অবশ্য কোন লাভ হবে না। নয় ফরহাদ, নয় অন্য কেউ। পরীক্ষা তোর কপালে নেই।
বীণা এবার ঝরঝরিয়ে কেঁদে ফেললো! জানা কথা, সে বেশিক্ষণ রাগ ধরে রাখতে পারে না। কাঁদতে কাঁদতেই বললো, — ফরহাদ ভাই, আমি পরীক্ষা দিতে চাই, পড়তে চাই।
বীণা কখনো ফরহাদ কে ভাই ডাকে না। অন্তত ফরহাদের সামনে না। হাই স্কুলে গিয়েছে পর থেকে দেখেছে স্যার। বীণাকে পড়ানোর আগে এই বাড়িতে এতো আসা যাওয়াও হতো না। তাই যতোটুকু দেখা হয়েছে, স্যার হিসেবেই ডেকেছে। আজ কি বলছে না বলছে হয়তো খেয়ালও নেই।
আর নেই বলেই ফরহাদ নিশ্চুপ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর বললো, — নিজের কাজ নিজের করতে হয়। তাই এই মরা কান্না আমার সামনে কেঁদে লাভ নেই। পড়বি নাকি বল, তা না হলে চলে যাই। এতো ঢং তো ভালো লাগে না। এতোক্ষণ সহ্য করলাম, এই তো কতো।
বীণা আর কিছু বললো না। তবে উঠে গেলো। যাওয়ার আগে তার আচার ঝালমুড়ি মাখা শার্টের ব্যাগ দুমড়িয়ে মুচড়িয়ে ছুড়ে খাটে ফেলে গেলো।
ফরহাদ চুপচাপ’ই দেখলো! দেখে হাই তুলে বললো, — জমা রইল।
পৃথিলা বাড়ি থেকে বের হতেই দেখল, ভ্যান দাঁড়িয়ে আছে। ভ্যানের এক পাশে চোখ, মুখ অন্ধকার করে বীণা বসে আছে। গায়ে নীল সাদা স্কুলের ড্রেস, এলোমেলো বেনি। মুখটা আজ একটু অন্য রকম। সে বীণা আর ভ্যান, দুটো’ই অবাক চোখে দেখলো।
সাবিহা রান্না বসিয়েছে। চুলার জাল টেনে, আধখোলা খোঁপাটা খুলে আবার করতে করতে বেরিয়ে বললো, — এটা বীণার ভ্যান। ওকেই স্কুলে নিয়ে যায় নিয়ে আসে। এরশাদ ভাই বললো তোকেও প্রতিদিন নিয়ে যাবে।
পৃথিলা অবাক হয়েই বললো, — এসবের কোন প্রয়োজন নেই। এর পর থেকে আমি নিজেই সামলে থাকবো।
— সেটা থাকবি ভালো কথা। গেলে সমস্যা কি?
এমন তো না, শুধু তোর জন্য ব্যবস্থা করেছে। আগের’ই ছিল। এখন তুইও যাবি। তাছাড়া বীণাতো একাই যায়।
— তবুও, এমনিতেই অনেকটা ঋণ জমা হয়ে আছে। আর বাড়াতে চাচ্ছি না।
— কোন ঋণটিন নেই। তোর যতো বেশি ভাবনা। তাছাড়া মাস শেষ হলে এরশাদ ভাইয়েরা যা দেয়, তুইও অর্ধেক দিয়ে দিবি। ব্যস! ঝামেলা খতম।
এবারের কথা পৃথিলার পছন্দ হলো। তাছাড়া সে আর জড়াতে চাইছে না। কিছু কিছু জিনিস আছে মেয়েরা আগেই অনুমান করতে পারে। তার ধারণা অবশ্য ভুলও হতে পারে। ঘর পোড়া গরু সে, সিঁদুরে মেঘ দেখলেও আঁতকে উঠতে হয় । তাছাড়া এরশাদ লোকটার তাকানো, কথায় কিছু একটা আছে। এতোদিন মনে না হলেও, কেন জানি এখন মনে হচ্ছে। যাইহোক, ভুল হোক ঠিক আগেই দূরে থাকা ভালো।
তাই সাবিহাকে বিদায় দিয়ে বীণার পাশে উঠে বসলো। বসতে বসতে বীণার দিকে একবার তাকালো। মেয়েটাকে আজ অন্যরকম লাগছে। কিছু কি হয়েছে?
ভ্যান নিজের মতো এগুলো। সবুজ ধান ক্ষেত, আঁকা বাঁকা মেঠো পথে নিজ ছন্দে এগিয়ে গেলো। বীণা একটা শব্দও বললো না। পৃথিলা একটু অবাক’ই হলো। মেয়েটা এমন না। মিশুক! কোন কিছু নিশ্চয়’ই একটা হয়েছে। জিজ্ঞেস করা ঠিক হবে কি না বুঝতে পারছে না। হাজার মানুষ থাক, বাবা- মা নেই। আছে এমন একটা বয়সে। চাইলেই সবার কাছে সবকিছু বলা যায় না। পৃথিলা একবার ভ্যান ওয়ালার দিকে তাকালো। সে নিজের মতোই ভ্যান টেনে নিচ্ছে। তবুও ফিসফিস করে বললেও কথা কানে যাবে। তাই ডেকে বললো, — ভাই ভ্যানটা কি একটু থামানো যাবে ?
ভ্যান সাথে সাথে’ই থেমে গেলো। থামতেই পৃথিলা তার কাঁধের ব্যাগ থেকে পানির বোতলটা বের করে,এগিয়ে দিয়ে বললো, — পানি নিতে ভুলে গেছি। একটু পানির ব্যবস্থা করতে পারবেন? গরমে গলা শুকিয়ে আসছে।
লোকটা সাথে সাথেই বোতল টেনে নিলো। নিয়ে ঝট করে নেমে হন্তদন্ত হয়েই এগিয়ে গেলো। একটু দূরে একটা বাড়ি দেখা যাচ্ছে। হয়ত সেখানেই যাবে।
পৃথিলা লোকটার হাবভাবেও অবাক হলো! এতো হন্তদন্তেরও কিছু ছিল না। পানি সে এমনিতেই নেয় নি। ব্যাগে কাগজ, বই আছে। যদি পানিতে নষ্ট হয়। তাই ভেবেছে স্কুলের টিউবওয়েল থেকে নেবে। সে চোখ ফিরিয়ে বীণার দিকে তাকিয়ে বললো, — কোন সমস্যা বীণা?
বীণা উত্তর দিলো না। চোখ তুলে তাকালোও না। মাথা নত করেই দু,পাশে মাথা নাড়লো।
পৃথিলা হাসলো! মমতা মাখা, মায়াময় হাসি। হেসে এগিয়ে, মুখের সামনের গড়িয়ে পড়া এলোমেলো চুলগুলো গুছিয়ে দিতে দিতে বললো, — আমি জানি, আমি মনের কথা জমা রাখার মতো কেউ না, বলার মতোও কেউ না। বা বললেও কিছু করতে পারব এমনও কেউ না। তবে কি জানো? কথা ভেতরে জমিয়ে রাখার চেয়ে, কারো কাছে বললে বোঝা কমে। এই যে, যে কষ্ট জমাট বেঁধে দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছো সেটা হালকা হবে। ইচ্ছে না হলে বলার দরকার নেই, তবে যদি এই, এই একটুও মনে হয় বলা যায়, তাহলে নিশ্চিন্তে বলতে পারো।
বীণা হঠাৎ করেই এক কাজ করে ফেললো। পৃথিলার গলা জড়িয়ে ধরলো, শক্ত করে। যেন কতো আপন কেউ। ধরে হুহু করে কেঁদে ফেললো। পৃথিলা প্রথমে একটু থমকালো। তবে সাথে সাথে নিজেকে সামলে নিলো। নিয়ে পরম মমতায় মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো। দিতেই বীণা ধীরে ধীরে সব বললো। পৃথিলা কোন টুু শব্দ করলো না। নিশ্চুপ শুনলো। শুনে বড় একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। আহা! এই পৃথিবীতে স্বপ্ন ভাঙার চেয়ে বড় কষ্ট আর কি আছে?
স্কুলে আসতেই পৃথিলা আগে ভ্যান থেকে নামলো। নেমে নিজেই ধরে বীণাকে নামালো। গলার ওড়নাটা গুছিয়ে দিতে দিতে বললো, — বিয়ের জন্যতো এখনো হ্যাঁ বলেনি। তাই অযথা কোন চিন্তা করো না।
— বিয়ের জন্য হ্যাঁ বলুক আর না বলুক। আমার পরীক্ষা আর দেওয়া হবে না।
— কেন?
— দাদির মাথায় একবার এসেছে না, এখন কারো কথা শুনবে না।
— তোমার ভাইয়েরা বা চাচা। কাওকে বোঝাতে পারবে না?
তখনি ফট করে বীণার, ফরহাদের বলা সেই দিনের কথা মনে পড়লো। ছোট চাচা! অবশ্য মনে পড়েও খুব একটা ভরসা পেলো না। দাদি মরে যাবে তাও হেরে যাবে না। সেখানে যে’ই হোক। তার মুখের কথা থেকে সরে যাওয়া মানেই, তার কাছে হেরে যাওয়া।
পৃথিলা বীণার নিস্তেজ হওয়া মুখটা কিছুক্ষণ নিশ্চুপ দেখলো। পরীক্ষার খুব একটা দেরি নেই। এই মাস খানেক। টেস্ট পরীক্ষায় মেয়েটা খুব ভালো রেজাল্ট করেছে। বোর্ড পরীক্ষায় ও যে করবে তাতে কোন ভুল নেই। আবারো বড় একটা শ্বাস ফেলে বললো, — যাও, ক্লাসে যাও। মন খারাপ করে কখনোও কিছু হয় না। তাই যেটুকু সময় পাও প্রাণ খুলেই বাঁচো।
বীণা চলে গেলো। পৃথিলার নিজেরই মন খারাপ হয়ে গেলো। না মেয়েটা ভালো ছাত্রী এজন্য না। ভালো ছাত্রী অনেকেই হয়। লেখাপড়া অনেকেই করে। তবে লেখাপড়াকে সবাই ভালোবাসতে পারে না। এই মেয়েটা ভালোবাসে। আর এইরকম ভালোবাসার মানুষগুলো, সব সময় এমন এমন জায়গায় জন্মে। এই ভালোবাসার লেখাপড়াটুকু করতে তাদের যুদ্ধ করতে হয়।
পৃথিলা নিজেও এগিয়ে গেলো। কথা বলতে বলতে দেরি হয়ে গেছে। তাই যেতেই ঘন্টা পড়ল। পড়তেই শিক্ষকদের খাতায় সাইন করে নিজের ক্লাসে গেলো। ক্লাসে সে মন দিতে পারলো না। বার বার বীণার মুখটা ভেসে উঠল। আর উঠল বলেই, মনের আকাশটা মেঘাচ্ছন্ন হয়ে রইল। অবশ্য ভেতরে, উপরে সব সময়ের শান্ত, কোমল, নির্জীব।
টিফিনের ঘন্টা পড়তেই পৃথিলা টিচার্স রুমে এসে বসলো। স্কুল, ছাত্র-ছাত্রী হিসেবে টিচার্স খুব কম। তবুও যেই কয়জন আছে, কয়েকজন বাড়ি আশে পাশে হওয়ায় বাড়িতেই যায়। তার মধ্যে এক দু’জন জন যা থাকে একসাথে এখানেই বসে। তাই পৃথিলাও বসলো। বসে এক নজর ফরহাদের দিকে তাকালো। সে অবশ্য এখানে বসে নি। বসেছে একটু সাইডে, নিজের মতো করে । হাতে আজকের পত্রিকা। পত্রিকা পড়ছে তাও চোখ, মুখ কুঁচকে। আশ্চর্য! দুনিয়ার সব কিছুতে এতো বিরক্ত আসে কোথা থেকে?
পৃথিলা উঠে এগিয়ে গেলো। অবশ্য উঠে কোন লাভ হবে বলে মনে হয় না। লোকটা কোন কারণে মেয়েদের দেখতে পারে না। তবে বাবার প্রতি খুব দুর্বল। তাই বিয়ে নিয়ে আগ্রহ না থাকলেও, বাবার বিয়ে নিয়ে মাতামাতিতে নাকও গলায় না। এমন ভাব যা খুশি করুক, তারা ভালো থাকলেই হলো। বাবা- মায়ের বাধ্য সন্তান। জাফর চাচা লোকটাকে এজন্যই কি খুব ভালো বলে, নাকি আসলেই ভালো। শুধু উপরে নিজেকে শক্ত খোসলে ঢেকে রাখে।
পৃথিলা ফরহাদের পেছনে এসে দাঁড়িয়েই থমকে গেলো। না ফরহাদের কোন কারণে না। ফরহাদ পত্রিকা মেলে নিজের মতো বসে আছে। সেই পত্রিকায় মাঝ বরাবর বড় করে তারেকের ছবি দেওয়া। সেই ছবির এক কোণে ছোট্ট একটা বিভৎস লাশের ছবি। এই ছবির উপরে মোটা করে লেখা। অফিসের সিনিয়র ম্যাডামের সাথে পরকীয়া। নিজ ফ্ল্যাটে খুন।
পৃথিলার মাথা এক চক্কর দিলো। দিতেই ফরহাদের বসা চেয়ার আঁকড়ে ধরতে চাইলো। অবশ্য লাভ হলো না। ধরার আগেই ফরহাদের পায়ের কাছেই গড়িয়ে পড়ল।
চলবে…….

