#ধূপছায়া
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব_২৪
পৃথিলা কিছুক্ষণ নিশ্চুপ বসলো। তার অবস্থা সেই আগের মতো’ই শান্ত, নিস্তব্ধ। ভেতরের ভাঙন সে কখনও প্রকাশ করতে পারে না। আজও পারলো না। যতো ভাঙে ততো শান্ত হয়। তবে শুষ্ক চোখ দুটোতে বিশাল এক শূণ্যতা। সেই শূণ্যতার গভীরতা বোঝার সাধ্য কারো নেই। সাধ্য নেই বোঝার ভেতরের এই ক্ষতবিক্ষত, রক্তাক্ত ভেঙে গুঁড়ো গুঁড়ো হওয়া পৃথিলাকে।
তারেক যেমন থাক, তার সাথে একটা অধ্যায় তার ছিল। যেটা হাজার চেষ্টা করলেও পৃথিলার মুছে ফেলা সম্ভব না। যেটার শুরু হয়েছিল ভালোবাসার স্নিগ্ধ চাদরে আর শেষ কলুষিত ঘৃণায়। মানুষের রুপ বদলে যায়, কিন্তু এই যে হৃদয়, যাকে দিয়ে একবার ভালোবাসা হয়, সেই হৃদয় কি বদলানো যায়? যায় না। তাই হয়ত ঘৃণা করেছে, তবে মৃত্যু কামনা কখনোও করেনি।
ফরহাদ বিরক্ত নিয়ে আগের জায়গায় গেলো। পৃথিলা শূণ্য চোখেই তাকিয়ে দেখলো। সেও সব সময়ের মতো চোখ, মুখ কুঁচকে আছে। আর এই কুঁচকে যাওয়া মুখ যেন স্পষ্ট বলছে, ” মরার আর জায়গা পায় না, সব তার ঘাড়ের উপরেই। ”
পৃথিলা পুরোপুরি জ্ঞান হারায়নি। এক চক্করে অন্ধকার দেখেছে । সব কিছু এতো তাড়াতাড়ি হয়েছে তাই তাল সামলাতে পারে নি। তবে এই যে বিরক্ত মুখের লোকটাই কিছুক্ষণ আগে সাহায্যের চূড়ান্ত করেছে। সাথে সাথে’ই ধরে তুলেছে। তুলে নিজের বোতল খুলে মাথায় পানি দিয়ে ফ্যানের নিচে বসিয়েছে। অবশ্য বলতে গেলে সবাই করেছে। একমাত্র নারী শিক্ষিকা, সবাই একটু অন্য চোখেই দেখে। তার মধ্যে শহরের। সবার ধারণা মমের গুড়িয়া টাইপ। তাই হয়তো গ্রামের কাঠফাটা দুপুরের গরমে মাথা চক্কর দিয়েছে। অথচ তাদের অজানা, ভাগ্যের নির্মম চাকায় পিষে পিষে ক্ষয় হয়ে ভেতরের সব নিঃশেষ হয়ে গেছে।
টিফিনের সময় শেষ। হেডস্যার পৃথিলাকে ছুটি দিলেন। আজ আর ক্লাস করার দরকার নেই। কিছুক্ষণ বসে আরাম করুক। তারপর ধীরে সুস্থে বাসায় যেতে বললেন।
সবাই যে যার ক্লাসে যাওয়ার জন্য এগিয়ে গেলো। তবে ফরহাদ আগের জায়গায় আগের মতোই বসলো। বসে সেই পত্রিকা আবার তুলে ধরলো। ধরে এক পলক পৃথিলার দিকে তাকিয়ে পত্রিকার দিকে তাকালো। এতো বড় দুনিয়া থাকতে তার ঘাড়ের উপরে এসে এমন কি হলো যে মাথা ঘুরে গেলো।
অসংখ্য নিউজের মাঝে এই পাতায় একটাই হাই লাইট করা। খুন,পরকীয়া। এসব নিউজ তাকে টানে না। বরং এক হিসেবে বলতে গেলে দেখলে গা জ্বালা করে। তার ধারণা এইসব পরকীয়া হয় সব মেয়েদের উসকানিতে। তাই হেডলাইন টুকু পড়ে বিস্তারিত কখনো পড়া হয় না। তবে আজ নিচে চোখ রাখলো।
” শহরের এক অভিজাত আবাসনের চতুর্থ তলায় পাওয়া গেল এক যুবকের রক্তাক্ত নিথর দেহ। নাম আবদুল তারেক। পেশায় একটি বেসরকারি সংস্থার উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। ঘটনাস্থলে পুলিশ পৌঁছালে দেখে, ঘরের মেঝেতে পড়ে আছে মৃতদেহ, চারপাশ রক্তে ভেসে গিয়েছে। পাশেই পড়ে ছিল এক ধারালো ছুরি।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, সম্প্রতি ডিভোর্স হয় এক সিনিয়র মহিলা সহকর্মীর সঙ্গে অবৈধ সম্পর্কের জেরে। অফিস মহলে বিষয়টি নিয়ে কম কানাঘুষো হয়নি। ডিভোর্সের কিছুদিনের মধ্যেই ঘটে এই ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড।
এই মুহূর্তে তদন্তের মূল সন্দেহভাজন হিসেবে উঠে এসেছে সেই সিনিয়র মহিলার স্বামীর নাম। তাঁকে ইতিমধ্যেই জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডেকে পাঠানো হয়েছে।
অন্যদিকে, তদন্তে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় খুন হওয়া আবদুল তারেকের প্রাক্তন স্ত্রী নিখোঁজ। পুলিশ জানাচ্ছে, ডির্ভোসে পর থেকে তাঁর কোনও খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। আত্মীয়স্বজনের কেউই জানে না তাঁর বর্তমান অবস্থান। তদন্তকারীরা মনে করছেন, এই ঘটনার সঙ্গে তাঁর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ যোগ থাকতে পারে।
ঘটনাটি ঘিরে গোটা এলাকায় চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, খুনটি হয়েছে অত্যন্ত নির্মমভাবে বারবার ছুরির আঘাতে, যার থেকে পরিষ্কার রাগ ও প্রতিহিংসা ছিল গভীর।
ফরহাদ পত্রিকা থেকে চোখ না সরাতেই পৃথিলা শান্ত ভাবে বললো, — এখানে ডাকঘরটা কোথায়?
ফরহাদ মুখ বাঁকিয়ে হাসলো! হেসে বললো, — ঢং বেশি হয়ে যাচ্ছে না।
— আমরা সবাই কিছু না কিছু বেশি করি। আমি হয়ত ঢংটাই বেশি করি।
— বুঝলাম, তবে সবাই বলতে কাকে বুঝালেন?
— আপনি বুদ্ধিমান মানুষ।
— সেটা তো দেখে আপনাকেও মনে হয়। তো টেনে ঘাড়ে ঝামেলা আনার মানে কি?
— আমি নিশ্চয়’ই খুনি না।
— তো কি দরকার অযথা ধোকাবাজদের জন্য ঝামেলায় জড়ানোর।
— তবুও, খোঁজ যেহেতু হচ্ছে। সাহায্য করা আমার দায়িত্ব।
— বাবারে! বেগম রোকেয়া।
— হ্যাঁ! আপনার মতো সব দেখেও তো না দেখার ভান করে থাকতে পারি না।
ফরহাদ ভ্রু কুঁচকে তাকালো। পৃথিলা আর কিছু বললো না। তার গলা শুকিয়ে আসছে। সেই শুকনো গলায় ঢোক গিলে কাগজ কলম টেনে নিলো। তার হাত থরথরিয়ে কাঁপছে। সেই কাঁপা কাঁপা হাতেই লিখলো। ঠিকানা দিলো। তার এখানে আসা, চাকরির ব্যাপারে যতোটুকু দরকার লিখলো। কবে নাগাদ ঢাকা যেতে হবে, সেটা যেন তাকে জানানো হয়, সেটাও লিখলো।
লিখে ভাঁজ করতেই দেখলো ফরহাদ আবার তার পাশে অবশ্য দূরত্ব রেখেই এসে দাঁড়িয়েছে। সেখান থেকেই পানির একটা গ্লাস হালকা ঠেলে এগিয়ে দিলো। পৃথিলা চোখ তুলে তাকালো। তাকাতেই ফরহাদ বললো, — চিঠিটা আমার কাছে দিন। ডাকঘর সদরে। এই অবস্থায় নিশ্চয়’ই সদরে যাবেন না।
— এতো সদয় হওয়ার কারণটা জানতে পারি?
— হ্যাঁ।
— কি?
— ভেবে দেখলাম সব ছেলেরা ধোয়া তুলসি পাতা না। আবার সব মেয়েরা কুচুরমুখিও না।
পৃথিলা মলিন ভাবে হাসলো! হেসে চিঠিটা বাড়িয়ে বললো, — ধোকাবাজের কোন জাত হয় না। সেটা মেয়ে হোক আর ছেলে।
পৃথিলাকে অবাক করে দিয়ে ফরহাদও হালকা হাসলো। হেসে চিঠিটা নিয়ে বললো, — জেনে ভালো লাগলো। তবে বিশ্বাস করুন, খুনটা যে’ই করুক, করা আপনার দরকার ছিল।
— না! মৃত্যু কখনোও শাস্তির মধ্যে পড়ে না। মৃত্যু হচ্ছে সব কিছুর সমাপ্তি। সে বেঁচে থেকে যদি অনুতাপের আগুনে জ্বলতো। তাহলে সেটা হতো শাস্তি। আর তাছাড়া যে কোন অপরাধের শাস্তি নিজের হাতে নিতে নেই। তাহলে তার আর আমার মাঝে তফাত কি? সে নিকৃষ্ট, আমিও কেন সেই নিকৃষ্টের পথ বেছে নেবো। আইন আছে, উপরে আল্লাহ আছেন। আইনের চোখ ফাঁকি দিতে পারলেও, উপরে যে আছেন তারটা কখনোও ফাঁকি দেওয়া সম্ভব না।
— নীতি থাকা ভালো। তবে অতিনীতিবান হওয়া ভালো কথা না।
— আপনার কথা সত্য। তবে আপনিতো অতিনীতিবান না। আপনি ভালো আছেন?
— আমি সব সময়’ই ভালো থাকি।
— তাহলে কিসের এতো বিরক্ত?
— আপনার বুদ্ধি ভালো। এটা কি কেউ আপনাকে বলেছে?
— হ্যাঁ! আমার বাবা সব সময় বলতো।
— কথার মায়ায় সবাই ফেলতে পারে না। আপনি পারেন। ভালো ভাবেই পারেন।
— আপনাকে পেরেছি?
— না! তবে কারণটা অনুমান করে ফেলেছেন।
— করেছি যখন, আমি কি সহকর্মীর বাইরে গিয়ে একটা কথা বলতে পারি?
ফরহাদ ভাঁজ করা চিঠিটা পকেটে পুরলো। আগের রুপে ফিরে ক্লাসে যেতে যেতে সোজা বললো, — না।
পৃথিলা সেই যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বড় একটা শ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়ালো। দাঁড়াতেই ভ্যানওয়ালা বারান্দায় থেকে উঁকি দিয়ে বললো, — আপা হেঁটে রাস্তা পর্যন্ত যাইতে পারবেন, না টেনে এখানেই আনবো?
পৃথিলা চমকে উঠল। উঠে আবাক হয়ে তাকালো। ভ্যানওয়ালা এখানে’ই বসে থাকে নাকি?
তার অবাক হওয়া দেখে ভ্যানওয়ালা তার পানখাওয়া ঠোঁটে হেসে বললো, — আমি ছুটির হওয়ার আগ পর্যন্ত আশে পাশেই থাকি আপা। এরশাদ ভাইয়ের হুকুম। তাছাড়া বীণা আপা মাঝে মাঝে টিফিনে বাড়িত যায় তো তাই।
পৃথিলা আর কিছু বললো না। মন মস্তিষ্ক সব এলোমেলো। তবুও আশে পাশে থাকা আর স্কুলের বারান্দায় থাকা এক কথা না। এটা কেন জানি মনে অন্য ভাবেই বাঁধলো। তাই আগের মতোই শান্ত ভাবে শুধু বললো, — আপনি যান, আমি একটু পরে আসছি।
ফরহাদ বেরুলো একেবারে ছুটির পরে। বাড়ির দিকে গেলো না, এলো সদরে। ডাকঘরের দিকে যাবে তখনি দেখলো, এরশাদ এগিয়ে আসছে। হাতে সব সময়ের মতো সিগারেট। অবশ্য মুঠোয়! খেয়াল না করলে ধরা যায় না। মুখটা দেখতে ভয়ংকর হলেও কাপড়, হাঁটা- চলা, কথায় সে পুরো দমে ভদ্র মহাসয়। তাই ভদ্র ভাবেই শান্ত প্রিয় হাসি নিয়ে এগিয়ে পাশে দাঁড়ালো। দাঁড়িয়ে সিগারেট এগিয়ে দিলো।
ফরহাদ স্বাভাবিক ভাবেই নিলো। সে সিগারেট খায় না। এরশাদ জানে, তবুও তাদের হিসেব আলাদা। তাই নিয়ে টান দিয়ে বললো, — এখানে কি?
এরশাদ তার স্বভাব মতো শান্ত ভাবেই বললো, — চিঠি।
ফরহাদ ভ্রু কুঁচকে বললো, — কিসের?
— যেটা তোর পকেটে।
— আমার পকেটের চিঠির সাথে তোর কাজ কি?
— বন্ধু তুই, তুই বল।
ফরহাদ কিছু বললো না। আগের মতোই ভ্রু কুঁচকে সিগারেটে টান দিলো। দিয়ে বললো, — ক্যাচালটা কিভাবে বাঁধলো।
এরশাদ ফরহাদের হাত থেকে সিগারেট নিয়ে নিলো। নিয়ে শেষ টান দিয়ে পায়ে পিষতে পিষতে বললো, — ব্যস, বেঁধে গেলো।
— কিভাবে?
— কি জানি?
ফরহাদ ঠোঁট টিপে হাসলো। হেসে পকেট থেকে চিঠি বের করতে করতে বললো, — মানুষ আর পেলিনা। পটাতে পটাতে থোবড়ানো চেহেরা বাকিটুকুও থুবড়ে যাবে।
এরশাদও হাসলো! হেসে চিঠিটা নিয়ে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করতে করতে বললো — এই ক্ষমতা আছে বলেই তো, ক্যাচালটা বেঁধে গেলো।
— এখন?
— কি?
— সেটাই তো জানতে চাইছি।
— কোন কিছু নেই। সেধে এসেছে। বুকের ধুকপুকানি বাড়িয়েছে। এখন প্রেমে পড়ে গেলে আমার কি দোষ?
— আগে থেকে চিনতি?
— না।
— তো?
— তো আবার কি?
ফরহাদ হো হো করে হাসলো! হাসতে হাসতে বন্ধুর কাঁধে হাত রেখে বললো, — চারাগাছ যত্ন করলে অতি সহজেই ফুল ফোটে। তবে মরা গাছে সাধনা লাগে।
— আমার গাছ হলেই চলবে। ফুল লাগবে না।
— এই গাছও এতো সহজে হবে বলে মনে হয় না।
ভালোবেসে যারা ধোকা খায়, তারা সহজে আর এই পথে এগোয় না।
— দরকারও নেই। আমার ভালোবাসায় আমিই যথেষ্ট। তাছাড়া কে সেধে ভালোবাসবে আমায়?
— ভালোবাসা কখনো সৌন্দর্যে কিছু যায় আসে না। প্রমাণ তোর সামনে। ঠিক লাথি মেরে চলে গেছে। শালা, মেয়েজাত।
এবার এরশাদও হো হো করে হাসলো। হেসে বললো, — তুই এবার সত্যিই বিয়ে করছিস নাকি?
— হ্যাঁ।
— কেন?
— কোন কারণ নেই। বাবা চাইছে তাই।
— জেনে খুশি হলাম। তবে বোন আমার, সেটা যেন মাথায় থাকে। আমি বন্ধু হয়ে কিছুটা ছাড় দিলেও শাহবাজ মাথা ফাটাতে একবারও ভাববে না।
ফরহাদ মুখ বাঁকিয়ে হাসলো! হেসে বললো, — নিজের চিন্তা কর।
— কেন?
— এ তোর হবে না।
— কেন, ভয়ংকর দেখতে বলে?
— না। অন্য কিছু। বাহ্যিক সৌন্দর্যে এই মেয়ের কিছু যাবে আসবে না।
— অন্য কিছুটা কি?
— আমি জানি না। কিছু কিছু মানুষ অন্য রকম হয়। তাদের ভেতরের গভীরতা কখনোও আঁচ করা যায় না। এই মেয়েটা ঠিক সেই রকম।
এরশাদ কিছু বললো না, তবে আগের মতোই হাসলো। হেসে ডাকঘরের দিকে এগিয়ে গেলো। ফরহাদ দেখে বললো, — সেখানে আবার কি?
এরশাদ এবারো উত্তর দিলো না। পকেট থেকে সিগারেট বের করে আবার ধরালো। রাতে তার এমনিতেও ঘুম হয় না। যাও হয় শেষ রাতে। কিন্তু সমস্যা হলো এতো বারো চিন্তায় সেই ঘুমটুকুও এখন হচ্ছে না।
সে ধরিয়ে পোস্ট মাস্টারের ঘরের দিকে এগিয়ে গেলো। এগিয়ে যাওয়ার কারণ, মিঠাপুকুর গ্রামে পৃথিলা নামের কোন মেয়ে আসেনি। এমনকি ঢাকা থেকে বা এখান থেকে যে কোন চিঠি, সেটা পৃথিলার হোক, তার ছোট চাচার হোক, হোক সাবিহার। সব যাবে আগে এরশাদের কাছে। কেননা পৃথিলা মিঠাপুকুরে এসেছেতো নিজের ইচ্ছায়, এখন যদি কখনোও বের হয় সেটা হবে এরশাদের ইচ্ছায়।
মোমেনা ভয়ে ভয়ে সারেং বাড়ির সদর দরজার সামনে এসে দাঁড়ালো। দাঁড়িয়ে একবার উঁকি ঝুঁকিও মারলো। এত বড় বাড়ি, এতো বড় মানুষের সামনে তারা ধুলিকণা। ভয় তো লাগবেই। তাছাড়া সে বউ মানুষ। কখনোও উঠান পেরিয়ে রাস্তায় নামা হয়নি। আর আজ কোথা থেকে কোথায় দাঁড়িয়ে আছে। অবশ্য তার শাশুড়ির বদলৌতে।
কেননা তার ছেলেকে তো আশে পাশে ঘেষতেও নিষেধ করেছে। তার মধ্যে তার শাশুড়ির আবার গোড়ালিতে বাতের ব্যথা। আগের মতো হাঁটতেও পারে না। তাই তাকেই ঠেলে পাঠালো। এখন সে কি করবে দিশে পাচ্ছে না।
মোমেনার এক হাতে নারিকেলের নাড়ু, গাছের কয়টা পেয়ারা। আয়না খুব পছন্দ করতো। তাই তার শাশুড়ি হাতে গুজে দিলো। সেই নাড়ু আর পেয়েরার ছোট্ট ব্যাগটা এক হাতে নিয়ে, আরেক হাতে তার গায়ের মলিন কাপড়ের ছোট্ট আঁচলটা টেনে মুখ বরাবর আনলো। এনে অনেক সাহস জুগিয়ে আরেকটু এগুলো। দরজায় টোকা দেবে কি দেবেনা ভেবে পাচ্ছে না।
সন্ধ্যা নামো নামো করছে। আয়না এসেছে ছাদে, কাপড় তুলতে। অবশ্য একা না, সঙ্গে কাজের লোক আছে। কাপড় কাজের লোক তুললেও আয়না ঘুরে ঘুরে দেখছে। এত বড় বাড়ি এই এলাকায় কমই আছে। ছাদটাও কত বিশাল। আয়না উৎফুল্ল মনেই আশেপাশে ঘুরে ঘুরে দেখল। আসার পর থেকে তো আর ঘর থেকে বের হয়নি, তাই উঁকি-ঝুঁকি দিয়েই দেখল।
কী বিশাল বাড়ি! কী সুন্দর নদীর ঘাট! ঘাট ছাড়াও পেছনে বিরাট পুকুর আছে। আগে এই পুকুরের পানিই গ্রামের মানুষ খেত, এখন টিউবওয়েল হয়েছে। তাছাড়া, আগে বাড়ি ছিল খোলা, এখন চার দেয়ালে আবদ্ধ।
আয়নার ঘোরা ফেরার মাঝেই সদর গেইটের দিকে নজর পড়ল। আর পড়তেই থমকে গেল। গেট বরাবর ছাদে গিয়েই ভালো করে তাকাল। বড় মা! বড় মা এসেছে তাকে দেখতে? আয়নার কিশোরী মন নেচে উঠল। উঠল বলেই স্থান-কাল সব ভুলে গেল, আর এক দৌড়ে ছুটল। সিঁড়ি দিয়ে নামল জলফড়িংয়ের মতো নেচে নেচে । সবুজ রঙের শাড়ির আঁচল মাথা থেকে হাওয়ায় লুটোপুটি খেল। পিঠ ছোঁয়া লালচে কালো মিশেলের চুলগুলো নদীর টেউয়ের মতো দোল খেতে লাগলো।
জয়তুন সব সময়ের মতো বসার ঘরেই বসা। তার সামনে দিয়ে বিনা অনুমতিতে আয়না, মাছরাঙা পাখির মতো ফুরুৎ করে উড়ে গেল। জয়তুনের তাতে কোনো হেলদোল হলো না। সে তার মতোই পানের পাতা থেকে আঙুল দিয়ে পান মুখে দিল।
আয়না গেটের সামনে এসে হাপাতে হাপাতে বলল,
— গেট খুলেন।
গেটের সামনে জয়তুনের লোক। আর এ বাড়িতে জয়তুনের কথা ছাড়া গাছের পাতাও নড়ে না। তাই নতুন বউয়ের কথায় কি বলবে দিশে পেলো না। তবে কালাম এগিয়ে এলো, এসে বলল,
— বুবুর কাছে যান ভাবি। বুবুর অনুমতি ছাড়া মহিলাদের জন্য গেট খোলা যাবে না।
আয়নার খুশিতে ভাটা পড়ল না। সে খুশিতে ঝিকিমিকি করতে করতেই বলল,
— আমি তো বাইরে যাবো না। আমার বড় মা আইছে, তাকে ভেতরে আনবো।
— আপনি বুবুর কাছে যান ভাবি।
— বড় মা অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে আছে।
কালাম আর উত্তর দিল না। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল।
আয়না তবুও দমল না। যেভাবে এসেছিল, সেইভাবেই আবার ভেতরে দৌড়ে গেল। জয়তুনের সামনে গিয়ে হাপাতে হাপাতে বলল,
— আমার বড় মা আইছে।
জয়তুন স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই তাকাল। স্বাভাবিক গলায় বলল,
— এই ভর সন্ধ্যায় তোমার মাথার কাপড় কই? চুল বাতাসে উড়ে ক্যা? তার মধ্যে আবার নয়া বউ! ঘাড়ে একটা জুটে গেলে দায় নেবে কে?
আয়না সাথে সাথে’ই খোঁপা করল, মাথায় ঘোমটা টানল। টানতে টানতেই আবার কিছু বলতে যাচ্ছিল, জয়তুন হাত তুলে থামিয়ে দিল। দিয়ে আগের মতোই বলল, — এটা মিঠাপুকুর গ্রামের ধানের ক্ষেত না, মন চাইলেই আইল ধরে উড়াউড়ি করবে। এটা সারেং বাড়ি। সারেং বাড়ির বউরা নেচে নেচে উড়ে বেড়ায় না। আর তোমাকে তোমার চাচার বাড়ি থেকে সম্মানে বউ করে তোলা হয় নি। আমিতো ভাই সেই রকম’ই চেয়েছিলাম। তবে কুত্তার পেটে যেমন ঘি হজম হয় না, তোমার গায়েও সম্মান হজম হয়নি। তাই বারো ঘাটের পানি খাওয়ার জন্য ডুপ দিছালা।
যখন দিছো, তখনই বাপের বাড়ির পাট শেষ। আমার বাড়ির বউ হইছো ব্যাটাগো মজলিশ থেকে। সেখান থেকে যদি আমার নাতি তুলে না আনতো। এত ফলক ফলক করার মতো এখনো বেঁচে থাকতে না। না বাঁচিয়ে রাখতে পারতো তোমার বাপের বাড়ি। আর আমার নাতির ওপরে হামলা হয়েছে, এটা চাট্টিখানি কথা না। যতোক্ষণ না বের হচ্ছে কে করেছে, ততোক্ষণ কারো সঙ্গে যোগাযোগ হবে না।
এখন যাও, ভেতরে যাও। নাতি আমার বাড়িত আসার সময় হইছে। আর কখনোও যেন আমার নাতির ঘর ছাড়া অন্য কোথাও ঘুমাতে না দেখি। আর একটা কথা ভালো করে মাথায় ঢুকাইয়া লও। এখন তুমি সারেং বাড়ির বউ। এই সারেং বাড়িই তোমার সব।
আয়নার চোখের টলমলো পানি গাল গড়িয়ে পড়ল। পড়তে পড়তেই সদর দরজার দিকে বড় আকুলতা নিয়ে তাকালো। তার আবার ছুটে যেতে ইচ্ছে করল। ইচ্ছে করল এই গেইট, এই অদৃশ্য লোহার শেকল ভেঙে গুড়িয়ে দিতে। কিন্তু সেই শক্তি তার কই?
চোখের পানি নিয়েই আয়না আবার বড় আশা নিয়ে জয়তুনের দিকে তাকালো। যদি একটু মায়া হয়।
জয়তুনের মায়া হয় না। বরং ধমকে বলে, — খাম্বার মতো দাঁড়ায় আছো ক্যা? যাও! যে কাজ করছিলে সেইটাই করো। আমি আবারো কইতাছি নয়া বউ, এত ফলক ফলক আমার পছন্দ না। আর মুখে মুখে চাপা চালানো তো একদম না। আমি কবরে যাই, দুই চারটা বংশের বাতি আনো। তার পরে যা খুশি তাই কইরো।
আয়না আর কিছু’ই বললো না। ধীরে ধীরে আবার ছাদে ফিরে এলো। এসে দাঁড়ালো সেই ঠিক আগের জায়গায়।
সন্ধ্যা নেমে গেছে, অন্ধকারে স্পষ্ট কিছু দেখা যায় না। তবুও যতক্ষণ দেখা যায়, আয়না তাকিয়ে রইল। তাকিয়ে থাকতে থাকতে’ই দেখলো, তার বড় মা অনেক সাহস করে গেটে একবার মৃদু টোকা দিলো। সেই টোকায় এপারের কারো কোনো হেলদোল দেখা গেলো না। যে যার কাজে ব্যস্ত।
দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে এক সময় ছোট ছোট পা ফেলে বড় মা চলে গেলো। যেতে যেতেও কয়েকবার ফিরে দরজার দিকে তাকালো।
আয়না নিশ্চুপ, শান্ত চোখে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সব দেখল। এই দেখার মাঝে এক ফোঁটা চোখের পানিও আর গাল গড়িয়ে পড়ল না। চোখদুটো শুষ্ক, শান্ত, নীরব। সেই নীরব চোখে তাকিয়ে থাকতে থাকতে’ই অন্ধকার ঘনিয়ে এলো। সারেং বাড়ির বিদ্যুতের লাল বাতিগুলো জ্বলে উঠল। আয়না তবুও নড়ল না। আগের মতোই দাঁড়িয়ে রইল।
সেই দাঁড়িয়ে থাকার মাঝেই গেট খুলল। না, আয়নার বড় মার জন্য না। সারেং বাড়ির ছোট নাতি ফিরেছে। ফিরতেই উঠান পেরিয়ে যেতে যেতে কী মনে করে যেন একবার উপরের দিকে তাকালো। অন্ধকারে স্পষ্ট দেখা যায় না, দেখা যায় শুধু একটা আবয়ব। আর এটা কার শাহবাজের কেন জানি এবারো বুঝতে এক সেকেন্ডও লাগলো না।
চলবে…..
ঈদ মোবারক আমার প্রিয় মানুষেরা।

