ধূপছায়া #নূপুর_ইসলাম #পর্ব_ ২৫

0
2

#ধূপছায়া
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব_ ২৫

আয়না ছাদ থেকে নামলো বেশ কিছু সময় পরে। ধীরে ধীরে। মুখ জুড়ে বিষাদের আলপনা। শরীর নিস্তেজ। সেই নিস্তেজ হওয়া শরীরটা বলতে গেলে টেনে হিঁচড়ে’ই নামালো। তবে নিচে গেলো না। যাওয়ার ইচ্ছাও হলো না। তাই রুমের দিকে যাবে, তখনই আম্বিয়া পেছন থেকে ডেকে বললো, — আয়না, গামছা লুঙ্গি নিয়ে নদীর ঘাটে যাও তো। পানি তুলে রেখেছে , না মহাশয়ের এখন এই ভরসন্ধ্যায় নদীতে নামার ইচ্ছে হয়েছে।

কোন মহাশয়ের নদীতে নামার ইচ্ছে হয়েছে আয়না বুঝতে পারলো না। তাই শূন্য দৃষ্টিতে আম্বিয়ার দিকে তাকালো। আম্বিয়া বিরক্ত মুখে বললো,– এই বাড়িতে তারছেঁড়া একজনই আছে, যার গলা ধরে তুমি এ বাড়িতে হাজির হয়েছো। এখন যাও, তাড়াতাড়ি সেই তারছেঁড়ার ফরমাইশ পালন করো।

আয়না বুঝতে পারলো কে? বুঝে অবশ্য তেমন হাবভাবের পরিবর্তন হলো না। বরং আগের মতোই ধীরে ধীরে রুমের দিকে গেলো। তখন উঠান থেকে কোন কারণে একবার তাকিয়েছিল। তাকিয়ে নিজের মতো ভেতরে চলে গেছে। আয়নাও আর কিছু ভাবেনি, শয়তানটাও আর কোন শয়তানগিরি করেনি। তাই নিজের মতো ছিল। এখনোও নিজের মতোই রুমের দিকে এগুলো। এগুলেও শয়তানটার কাপড় টাপড় কোথায়, জানেও না। শুধু জানে ঐ যে বৃহৎ রুমের টানা লম্বা দেয়াল ঘেরা আলমারি, এর এক সাইড তার জন্য বরাদ্দ হইছে। যেখানে তার নামে জায়গা নিয়েছে অসংখ্য রং, বেরঙের কাপড়। আরো কতো কিছু। সব আম্বিয়াবুবু দুপুরে রাখলো। রাখতে রাখতে তাকে দেখালো।

আয়না রুমে এসে পা ঝুলিয়ে খাটে চিত হয়ে কিছুক্ষণ শুয়ে রইল। তার দৃষ্টি ঐ যে উপরে ফ্যান তার দিকে। এখন অবশ্য ঘুরছে না। ঐ যে দেওয়ালে লাগানো কালো বোতামগুলো, তার মধ্যে একটাকে ঠেলে উপরের দিকে দিলেই ঘুরে। সে দেয়নি, তাই ঘুরেনি।

আম্বিয়ার কণ্ঠ আবার শোনা গেলো। “ও আয়নামতি, কি হলো তোমার? পরে এসে বাড়ি শুদ্ধ মাথায় নেবে বলে দিলাম। ”

আয়না উত্তর দিলো না। তবে উঠল! কাপড় কোথায় থাকে না জানলেও রুমে আলনা আছে, সেখানেই থাকার কথা। তাই আয়না আলনার কাছে গেলো। হলোও তাই। আলনার মধ্যেই সব রাখা, গুছিয়ে। এগুলোও সব আম্বিয়াবুর কাজ। কী সুন্দর এক হাতে পুরো সংসার গুছিয়ে রাখে।

আয়না আলনা থেকে লুঙ্গি আর গামছা নিলো। নিয়ে বেরিয়ে এলো। নিচে আসতেই জয়তুন দেখে বললো,
— বাপের বাড়ির মানুষ দেখলে তো হুঁশ থাকে না। দৌড়ে চলো রেল গাড়ির মতো। আর আমার নাতির বেলা খবর থাকে না ক্যা? আসতে আসতে তো বিয়ানের সূর্য উঠে যাবে।

আয়না এবারো উত্তর দিলো না। সোজা বেরিয়ে এলো। ঘাটের বাতি নেভানো। অন্ধকারে শয়তানটা করছে টা কী? আয়না ধীরে ধীরে এগোলো। চাঁদ উঠেছে। চাঁদের জোছনায় পানি ঝিকিমিকি করছে। সেই ঝিকিমিকি পানির মধ্যে কোথাও কাউকে দেখা গেলো না। চারদিক নিস্তব্ধ,সুনসান। গোসলের কথা বলে কোথায় চলে গেছে কে জানে? আয়না ফিরে যেতে লাগলো।

তখনই একটা শিসের শব্দে থমকে দাঁড়ালো। দাঁড়াতেই শাহবাজ বললো, — এই যে সারেং বাড়ির সুন্দরী কালনাগিনী, এদিকে।

আয়না ফিরে তাকালো। এবারও কাউকে দেখলো না। বরং ভীতু চোখেই আশপাশে তাকালো। একতো বাতি নেভানো তার মধ্যে গাছগাছালির জন্য কেমন গা ছমছমে ভাব।

শাহবাজ বিরক্তের বড় একটা শ্বাস ফেললো! এতোক্ষণ একা একা এতো বড় ছাদে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে ছিলো। তখন ভয় করেনি। এখন চারপাশ ভরা মানুষ। এখন ভয়ে গলা শুকিয়ে ফেলছে। এই মেয়ের হাবভাব তো কিছু’ই মাথায় ঢোকে না। তাই শ্বাস ফেলে’ই বললো, — ফণাটা নিচের দিকে নামান কালনাগিনী, এইতো একটু নিচে।

আয়না ভীতু ভাবেই আরো দু’কদম এগুলো। এগিয়ে নিচে দিকে তাকালো। সিঁড়ির একেবারে শেষ ধাপে, হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে আছে। এক হাত পানিতে, আরেক হাত মাথার নিচে।

আয়না একটু বিরক্ত মুখেই দেখলো। শয়তান সাধে বলে। স্বয়ং ইবলিশ শয়তানও একে দেখলে মাথায় হাত দেবে। বলেই মুখ গোঁজ করে ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো। শাহবাজ যেখানে শুয়ে আছে তার দুই সিঁড়ির ওপর গামছা লুঙ্গি রাখলো। রেখে নিজের মতোই আবার চলে যেতে নিলো।

শাহবাজ তুড়ি বাজালো। আয়না শুনলো, ভালো ভাবেই শুনলো। তবে আজ না দাঁড়ালো, না ফিরে তাকালো। নিজের মতোই এগিয়ে গেলো। শাহবাজ হাসলো! হেসে ঝট করে উঠে দাঁড়ালো। বড় বড় পা ফেলে, দুটো সিঁড়ি ডিঙিয়ে আয়নাকে ধরতে লাগলো তার এই হাফ সেকেন্ড।

আয়না অবশ্য কিছুই বুঝে উঠতে পারলো না। শুধু বুঝলো শয়তানটা ঝাপটে কোলে তুলে নিয়েছে। নিয়ে দুটো সিঁড়ি ঝড়ের গতিতে নামলো। নেমেই কয়েক সেকেন্ডের মাঝে হাওয়ায় ভেসে ধপাস করে সে নদীর পানিতে পড়লো।

পড়তেই জয়তুনের সব লোক দৌড়ে এলো। শাহবাজ দেখে নির্বিকার চিত্তে বললো, — তোদেরও গোসল করার ইচ্ছে। তাহলে আয়! কোলে তুলে পানিতে ছুঁড়ে মারি।

সবাই যে ভাবে এসেছিল, সেই ভাবেই আবার উল্টো চলে গেলো। তারছেঁড়া এটা। পরে দেখা যাবে সত্যি সত্যি এই ভর সন্ধ্যায় নদীতে ছুঁড়ে মারবে। তার চেয়ে ভালো, রুমে গিয়ে আরামছে বসা যাক। আহারে! কি মিষ্টি বউ। এমন বউটারে কেউ এমন প্যারায় রাখে?

শাহবাজ আগের মতোই হাসলো। হেসে মাথার এলোমেলো চুলগুলো গুছিয়ে পেছনে নিতে নিতে নিচের দিকে নামলো।

আয়না ততক্ষণে নিজেকে সামলে নিয়েছে। পানির নিচে থাকা সিঁড়িতেই গলা ডুবিয়ে দাঁড়ালো। হঠাৎ পড়ায় ভয় পেয়েছে, তবে ছোট থেকে বড় হয়েছে পানিতে পানিতে। এই আর কী! তবে কাপড়ের জন্য বেকায়দায় পড়েছে। পুরো খুলে উপরের দিকে উঠে আসছে। তাই আঁচল ঠিক করে কোমরে পেঁচালো। কুঁচি গুলো নিচের দিকে ঢেলে শক্ত করে দাঁড়ালো।

শাহবাজ কাছাকাছি গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসলো। ঠোঁটে সেই চিরচেনা বাঁকানো হাসি। তবে শাহবাজ নিজেও জানে না ঠোঁটে বাঁকানো হাসি থাকলেও, চোখ তার নিজের আয়ত্তে নেই। কেনানা সেই চোখের আনাচে কানাচে মুগ্ধতার ছড়াছড়ি।

সেই মুগ্ধটা নিয়েই চিকচিকে পানির দিকে তাকালো। সেই পানিতে গায়ের কাপড়ের সবুজ রঙটা ফুটে আছে অন্য জগৎতের অপার সৌন্দর্য নিয়ে। সেই সৌন্দর্যের মাঝে ফর্সা গোলগাল মুখটা পানিতে ভেসে আছে পদ্ম ফুলের মতো। চুলগুলো ঢেউ খাচ্ছে। শাহবাজের কাছে মনে হলো, এটা কোনো মানবী না। ঐ যে গল্প-কিচ্ছায় থাকে, মৎস্যকন্যা নামের কি যেন? ঠিক সেই রকম। তবে সব সময়ের মতো আজ চোখে ভয় নেই, উৎকণ্ঠা নেই। পানিতে পড়েও আগের মতো ডাটে দাঁড়িয়ে আছে। তেজ! তাও আবার শাহবাজের সাথে! ভালো! বলেই শাহবাজ হাসলো। হেসে বললো,– ভালো লেগেছে বউ?

আয়না উত্তর দিলো না। এই শয়তানের মুখে বউ শুনলেই তার কলিজা কেঁপে উঠে। অবশ্য হাবভাবে কিছুই বুঝালো না। বরং কাপড় ঠিক থাকলে উঠে চলে যেতো । তবে যে ভাবে মুখের সামনে বসে আছে, উঠা সম্ভব না।

— সাহস বেশি দেখাচ্ছো না? ডাকলাম সাড়া নেই, আবার কথার উত্তরও নেই?

আয়না এবারো উত্তর দিলো না। আগের মতোই নির্ভয়ে সোজা তাকিয়ে রইল। তার এমন ভাব যা খুশি বলেন, আমার কিছু আসে যায় না।

শাহবাজ দাঁতে দাঁত চেপে বললো, — যদি আমি পানিতে নামি। গুণে গুণে একশোবার পানিতে চুবাবো।

হুমকিতেও কোন পরির্বতন আয়নার মাঝে দেখা গেলো না। বরং সে নিজের মতোই নদীর দিকে ঘুরে দাঁড়ালো। তারা সবসময় পুকুরে সাঁতার কেটেই গোসল করে। তবে সারেং বাড়ির মেয়েদের জন্য নিয়ম ভিন্ন। তাদের জন্য ভেতরে ব্যবস্থা আছে। উপরেও, নিচেও। কাজের লোক দুবেলা নিয়ম করে চৌবাচ্চা ভর্তি করে রাখে।

আয়না দু’হাত ছড়িয়ে একটা ডুব দিলো। তার ভালো লাগছে। ইচ্ছে করছে সাঁতরে নদীর ওপারে যেতে। যাওয়া তার জন্য কোন ব্যাপার না। বরং ইচ্ছে করলেই পারবে। তবে রাতের বেলা, ভয় করবে। তবে ছোট বেলা থেকে’ই পানি তাকে টানে। সেই টানের চক্করেই একবার ছাল চামড়া তুলে নিয়েছিল। মনে আছে এই শয়তানের। অবশ্য না থাকার’ই কথা। যাদের পিঠে পড়ে তার যতোটা মনে থাকে, যারা ফেলে তাদের ততোটা কি আর মনে থাকে?

শাহবাজ এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। সারেং বাড়ির ছেলেদের যতো বদনাম’ই থাক। মেয়ে বাজের বদনাম নেই। তবে ভাগ্যের জোরে পাওয়া বউ। সেই বউয়ের অপার সৌন্দর্যে ঘায়েল ঠিক হয়ে গেলো। আর হতেই মোহাচ্ছন্নের মতো পা ডুবিয়ে সিঁড়িতে বসলো। বসে বললো, — শাস্তি তো মনে হচ্ছে ফুলের মালা হয়ে গেছে।

আয়না ফিরে তাকালো না। তবে এবার উত্তর দিলো। পানি হাত দিয়ে হালকা ছুঁয়ে ছুঁয়ে বললো, — জোর যার, মল্লুক তার। তাই আপনাদের মল্লুকে যা খুশি করেন। আমার কাছে এখন ফুলের মালাও যা, লোহার শেকলও তা।

,– ওরে বাবা! জবান ফুটছে।

— না।

— তাহলে?

— বিষের ছোঁয়ায় নিঃশেষ প্রাণ, বশীকরণে হৃদয় হান।

— বাবা! আমার বউ আবার শব্দে শব্দে তাল মেলাতেও পারে। এদিকে আমি ভোলা ভালা ভেবে বসে আছি।

— দাদির মুখে শুনতাম। এতোদিন মানে বুঝিনাই, তয় আজ বুঝলাম।

— আচ্ছা?

— হুম?

— তা কি অর্থ?

— সময় এলে ঠিক বুঝিয়ে দেবো।

— শাহবাজের এতো খারাপ দিনও আসে নাই।

আয়না আর কিছু বললো না। নিজের মতোই রইল। শাহবাজও কিছুক্ষণ নিশ্চুপ বসলো। তারপর বললো, — এক্ষুনি, এই মুর্হুত্বে যদি সাঁতরে ওপারে যেতে পারো, যা চাইবে তাই দেবো। মুক্তি চাইলে মুক্তি। বাপের বাড়ি চাইলে বাপের বাড়ি।

আয়না অবাক হয়েই শাহবাজের দিকে তাকালো। শাহবাজের অবশ্য হেলদোল নেই। সে দু’হাত পেছনে দিয়ে আরো আয়েশ করে বসলো।

আয়না নিশ্চুপ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর আর কোন টু শব্দ করলো না। ধীরে ধীরে শাহবাজের সামনে দিয়েই উঠে এলো। সবুজ কাপড় আয়নার বাঁকানো কোমর, শরীরে লেপটে আছে। সব সময়ের মতো শাহবাজের চোখ ফিরিয়ে নেওয়ার কথা, তবে আজ ফেরালো না। বরং পেছনের সাইডে না যাওয়া পর্যন্ত এক পলকেই তাকিয়ে রইল।

আয়না আজ লজ্জা পেলো না। কোনো আড়ষ্টতা দেখা গেলো না। বরং এগিয়ে গিয়ে দু’হাত নাড়িয়ে চাড়িয়ে ভেজা চুলে খোঁপা করলো। করে শাহবাজের গামছা নিয়ে গায়ে পেঁচালো। পেঁচিয়ে স্বাভাবিক ভাবেই হেঁটে বাড়ির দিকে গেলো।

শাহবাজ পেছন থেকে বললো, — এই সুযোগ দ্বিতীয় বার আর আসবে না।

আয়না থামলো না, নিজের মতোই এগিয়ে গেলো। যেতে যেতে বললো, — আসবো, আরো হাজার বার আসবো। তবে আয়নামতি আর আপনাদের কাছে কিছু চায় না।

শাহবাজ আগের মতোই বসে রইল। তার সাথেই রইল, এই যে শান্ত নদী, চাঁদের জোছনা, আর এক থমকে যাওয়া সময়। যেই সময়ে শাহবাজ নদীতে ডুব না দিলেও, আয়নাতে ঠিক দিলো।

আয়না ভেজা কাপড় নিয়ে স্বাভাবিক ভাবেই ভেতরে এলো। আম্বিয়া দেখে ঠোঁট টিপে হাসলো। জয়তুন তো বলতে গেলে ঝটকা খেলো। ঝটকা খেয়ে চোখ-মুখ কপালে তুলে বললো, — লাজ শরম সব বেইচা খাইছো? বাড়ি ভরা জোয়ার মর্দ মানুষ! কোন আক্কেলে তুমি ভরসন্ধ্যায় নদীতে নামলা?

আয়না আগের মতোই উপরে গেলো। যেতে যেতে শুধু বললো, — আপনার নাতি ঝাপটে ধরে টেনে নামালো। না নামলে তো আবার বলতেন, বাপের বাড়ির দুঃখে দিশেহারা, নাতির আবদার রাখলাম না।

জয়তুন হুঙ্কার ছেড়েই শাহবাজকে ডাকলো। হারামজাদা! নিজের লাজ-লজ্জার মাথা খাইয়া থুইছে কেটা কালে! এখন বউয়ের টা খাইবার নামছে।

পৃথিলা বারান্দায় এসে বসলো। গায়ে মাখন রঙের কাপড়। সেই কাপড়ের আঁচলটা আট পাট করে গুছিয়ে নিজেকে ঢেকে সুন্দর করে বসলো। রাতের বেলা এখানে নিয়ম করে কারেন্ট যায়। কখনো সন্ধ্যায়, কখনো শোয়ার আগে, আবার কখনোও মধ্য রাতে । সময় যেটাই থাক, একবার অন্তত যাবেই। এইতো কিছুক্ষণ আগেই টুপ করে চলে গেলো।

পৃথিলার শরীরটা ভালো নেই। না, দেখার মতো কোন অসুখ না। ব্যস! ভালো নেই। দুপুরে বাসায় ফিরে কিছু খেতেও পারেনি, না পেরেছে রাতে। সেই যে শুয়েছিল, এখন উঠল। দু’চোখের পাতায় ঘুমের ছিটেফোঁটাও নেই। পৃথিলা বারান্দায় বসেই আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল। কাঠফাটা রোদ যাচ্ছে। তাই ভীষণ গরম। একটা বৃষ্টি হলে মানুষেরা একটু স্বস্তি পেতো। তবে কোন কারণে এবার বৃষ্টির পরিমাণটা একটু কম। তাই তো সন্ধ্যার পর পর’ই থালার মতো এক বিশাল চাঁদ আকাশে খিলখিল করে হাসে । তার সাথে মিটিমিটি করে হাসে অজস্র তারার রাশি। সেই অজস্র রাশির দিকেই পৃথিলা তাকিয়ে রইল।

পৃথিলা অবশ্য জানে না। তার ঠিক বরাবর অন্ধকারে এরশাদ দাঁড়িয়ে। তার বের হওয়ার কিছুটা আগে বাড়িতে ফিরেছে, ফিরে বাড়ির দিকে যায়নি। এখানে এসে দাঁড়িয়েছে! কেন দাঁড়িয়েছে বলার অপেক্ষা রাখে না। পৃথিলা সময়, অসময় বারান্দায় বসে। কখনো বই হাতে, কখনো এমনিই, কখনোও জুঁইয়ের সাথে। তবে ভেবেছিল আজকে বের হবে না। তবে তাকে অবাক করে দিয়ে ঠিক চলে এসেছে। এসে উদাস চোখে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। এই উদাস কেন জানি এরশাদের সহ্য হলো না। ইচ্ছে হলো হনহনিয়ে এগিয়ে যেতে। গিয়ে এই উদাস মুখটা দু’হাতের আজলায় নিয়ে কঠিন একটা শাস্তি দিতে। এতো বুদ্ধি, এতো জ্ঞান, এতো বুঝ। তবুও কেন ভুল মানুষকে বেছে নিয়েছে। তখন বুঝি সব সিন্দুকে তুলে রেখেছিল। এখন এরশাদের বেলা সব এসে হাজির।

হাজিরের গুষ্টির ষষ্ঠী, বলেই এরশাদ সিগারেট ঠোঁটে রাখলো। পৃথিলার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়েই দেয়াশলাই জ্বালালো। জ্বালিয়ে সিগারেটে ছোঁয়ালো।

আর ছোঁয়াতে পৃথিলা চমকে উঠল। চমকে অন্ধকারের দিকে তাকালো। তাকাতেই জ্বলজ্বল করা আগুনের সাথে জ্বলজ্বল করা চোখটাও দেখলো। দেখে অবশ্য বুঝতে অসুবিধা হলো না কে? কেননা এই গ্রামে এমন অদ্ভুত চোখ সে একজনের’ই দেখেছে। আর দেখেছে বলেই ভ্রু কুঁচকে তাকালো। এই সময় এখানে কি?

এরশাদ সেই কুঁচাকে যাওয়া চোখের দিকে তাকিয়ে একটু হাসলো। হেসে তার স্বভাব মতো সিগারেটটা মুঠোয় নিলো। নিয়ে তার সেই চিরচেনা সুন্দর, মার্জিত, শান্ত স্বরে বললো, — ইমরানের কাছে এসেছিলাম। আসলে সেই দিন রাতে যে ঘটনা হলো। তাই এই বাড়িরও আশ পাশে দেয়াল টানা হবে। কাল থেকে লোক আসবে। সেই ব্যাপারে কথা বলতে এসেছিলাম।

পৃথিলা শান্ত চোখেই উঠে দাঁড়ালো। সে এতোটাও ধ্যানে ছিল না যে, কেউ এগিয়ে আসবে আর সে বুঝতে পারবে না। তাহলে? সে চোখে মুখে কিছুটা বিরক্ত নিয়েই বললো, — আপনি বসুন! আমি ডেকে দিচ্ছি। বলেই ভেতরে গেলো।

এরশাদ অবশ্য এগুলো না। আগের জায়গায়’ই দাঁড়িয়ে রইল। মুঠো করা সিগারেট ঠোঁটে রেখে লম্বা টান দিলো। দিয়ে আপন মনে বললো, — আমাকে বিরক্ত দেখিও না মেয়ে। এটা আমি সহ্য করতে পারি না। মাথা বিগড়ে গেলে তোমার’ই সমস্যা।

জাফর এসে দাঁড়ালো সারেং বাড়ির দোতালার বারান্দায়। অতি দরকার ছাড়া তার রুম থেকে বেরোনোর অভ্যাস নেই। তবে আজকাল এই বারান্দায় তার আসা যাওয়া সময় অসময়। কেননা এই বারান্দায় দাঁড়ালেই, মেয়েটার এক ঝলক দেখা যায়। এখন অবশ্য নেই। দুপুরে ফিরেছে দেখেছে। তারপর আর রুম থেকে বের হয়নি। কেন হয়নি সে জানে। রোজ করে তার জন্য পত্রিকা এই বাড়িতেও আসে। তাই তো মনটা বিক্ষপ্ত হয়ে আছে।

জাফর বারান্দায় কিছুক্ষণ পাইচারি করলো। সে অপেক্ষা করছে এরশাদের। কখন ফিরবে কে জানে?

অবশ্য তার অপেক্ষা বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। তখনি উঠান পেরিয়ে এরশাদকে আসতে দেখা গেলো। সে জানে এরশাদ দাদির সাথে দেখা করে তার কাছেই আসবে। তাই বারান্দায় রাখা চেয়ারে চুপচাপ বসলো। বসে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল পৃথিলার জানালার দিকে। মেয়েটার জানালা সব সময় খোলা থাকে। এমনকি রাতেও। নিচু ঘর, কেউ দুশমনি করে কিছু যদি ছুড়ে মারে? তাই এরশাদ যে দেয়াল টানার সিন্ধান্ত নিয়েছে, ভালোই করেছে। গেইট থাকলে সচারচর আর কেউ আসতে পারবে না।

তার চিন্তার মাঝেই এরশাদ এসে বসলো। বসে তার সুন্দর, শান্ত কণ্ঠে বললো — দুনিয়া সাইডে ফেলে কি এমন ভাবছো?

জাফর ফিরে তাকালো। তাকিয়ে নিশ্চুপ কিছুক্ষণ তাকিয়েই রইল। তাকিয়ে রইল এই যে ভয়ংকর দেখতে মুখটা, এই মুখের দিকে। এই মুখটা দেখতে যতো ভয়ংকর তার চেয়েও ভয়ংকর এই মুখের ভেতরের মানুষটা। আর কেউ না জানুক। সে জানে। ঐ যে সারেং বাড়ির এক ভয়ংকর রাত, সেই রাতে শুধু সারেং বাড়ির বড় ছেলে, বড় বউ, ছোট বউ মরেনি। মরেছে এরশাদ নামক ছেলেটার আবেগ, মন, ভালোবাসা, মানুষের প্রতি মায়া।

এরশাদ হেসে বললো, — কি দেখছো?

— তোকে?

— কেন?

— তুই আমাকে কথা দিয়েছিলি এরশাদ। আর কারো রক্ত যেন তোর হাতে না লাগে।

— উঁহুম! তুমি ভুলে গেছো। আমি কথা দিয়েছিলাম আমার প্রতিশোধ শেষ হবে, তারপর। তারপর আর কোন রক্ত আমার হাতে লাগবে না।

— এখনো শেষ হয়নি?

— না! দু’জনের খোঁজ আমি এখনো পাইনি।

— সেই ঘটনার অনেকটা বছর হয়ে গেছে এরশাদ।

— হোক! আমার মৃত্যুর আগেও যদি তাদের পাই। আমি তাদের শেষ করবো।

— তারেক নিশ্চয়’ই সেই একজনদের মধ্যে পড়ে না।

— তুমি না বললে শাস্তি দিতে চাও।

— শাস্তি আর মৃত্যু এর ফারাক বোঝো?

এরশাদ হাসলো! হেসে বললো, — আমার কথা আমাকেই ফেরাচ্ছো?

— তোমরা জয়তুনের ঔরসজাত না। তবুও তোমাদের চিন্তা ধারণা সব এক। তার যেমন কোন নীতি নেই, তোমারও নেই।

এরশাদ আবারো হাসলো! জাফর বড় একটা শ্বাস ফেললো! ফেলে করুন সুরে বললো, — আমি তোমার কাছে এটা আশা করিনি এরশাদ।

এরশাদ উত্তর দিলো না। চোখ ফিরিয়ে অন্য পাশে তাকালো। তার নিজেরও মারার ইচ্ছে ছিল না। কুত্তা বিছানায় শোয় একজনের সাথে, বুকে রাখে আমার পৃথিলাকে। একচোট ছেচা মার খাওয়ার পরও হেসে বলে, — যেই পৃথিলাকে আমি চিনি, দুনিয়ার কেউ চিনে না। তাই তোমার মতো মানুষের সে কখনও হবে না। ঘৃণা থাক ভালোবাসা। তার হৃদয়ে একজন’ই থাকবে, তারেক।

ব্যস,মাথা বিগড়ে গেলো। ওমন নোংরা হৃদয়ে সে বুঝি পৃথিলাকে ছেড়ে আসবে। তাই তো ছুরি দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে জন্মের মতো পৃথিলাকে বের করলো।

জাফর বলতে গেলে একটু অবাক হয়েই এরশাদের দিকে তাকিয়ে রইলো। এরশাদ চোখ ফিরিয়ে নিয়েছে, এমন কখনোও হয় নি। বরং হেসে হেসে সব বলে ফেলে। কেননা এরশাদ আর তার মাঝে কোন পর্দা নেই, লুকোচুরি নেই, নেই কোন আলাদা ছন্দ। তবে? জাফর তার সামনে বসা এরশাদকে, কেন জানি আজ চিনতে পারলো না। তার মনে হলো এরশাদ বদলে যাচ্ছে?

চলবে…….

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here