ধূপছায়া #নূপুর_ইসলাম #পর্ব_ ২৯

0
2

#ধূপছায়া
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব_ ২৯

ফরহাদের ঘুম ভাঙলো কিছুটা হইচই এ। তাদের বাড়িতে হইচই হয় বড় ভাই, তাদের ছেলে মেয়ে এলে। তা না হলে বাকি সময় বেশিভাগ’ই নিশ্চুপ, চুপচাপ। বাচ্চা কাচ্চা নেই, মানুষ মাত্র তিনজন। কাজের লোক অবশ্য আছে, তবে তারা নিশ্চয়’ই হইচই করে বাড়ি মাতিয়ে রাখবে না। তাই হঠাৎ এই হইচই এর কারণ তার মাথায় এলো না। অবশ্য মাথা যে বিশেষ ভাবে ঘামালো তেমনও না। বরং নিজের মতোই ঘুম থেকে উঠলো। উঠে গোসল করে একেবারে স্কুলের জন্য তৈরি হলো। হতে হতে সে বুঝলো বাড়িতে শুধু হইচই না, কোন খুশির আমেজ চলছে। ফাতিমা তো যেমন তেমন আবদুল আজিজও দেখলো খুশিতে ঝিলমিল করছে। তার মা সব সময়’ই এমন। ছোট ছোট যে কোন কারণেই গা ভাসিয়ে খুশি হতে পারে। তবে তার বাবার কারণ কি?

সেটা ভাবতে না ভাবতেই ফাতিমা মিষ্টি নিয়ে এলো। ফরহাদ সেই মিষ্টি আর মা দু’জনের দিকেই ভ্রু কুঁচকে তাকালো।

ফাতিমা হাসলো! দুটো ছেলে পেটে রেখেছেন। দু’টোই হয়েছে দুই’রকম। বড়টা নরম, কোমল। ছোটটা হয়েছে আগুন গরম। আগুন গরম হলেও মনটা খুব ভালো। এতোটাই ভালো সবাই কিন্তু দেখলেই চট করে বুঝতে পারে না। এটা বোঝার জন্য তার ছেলের কাছে আসতে হবে। তাকে বুঝতে হবে।

ফাতিমা হেসেই মিষ্টি তুলতে গেলেন। ফরহাদ দেখেই বিরক্ত মাখা কণ্ঠে বললো, — সাত সকালে মিষ্টি খাবো না।

— একটা খা।

— অর্ধেকও না।

— আমার জন্য খা।

— তোমার জন্য হলে তো কথায়’ই ছিল না। তবে এই মিষ্টি তোমার জন্য না।

— তাহলে বল কার জন্য?

— আমার কোন দরকার এতো বলাবলির। সরো তো। আমি বেরোবো।

ফাতিমা সরলেন না। বরং মিষ্টির কোণা ভাঙলেন। ভেঙে বলতে গেলে জোর করেই ছেলের মুখে পুরলেন। পুরে বললেন, — ছেলে পর হবে সেই খুশির মিষ্টি।

ফরহাদ শুনলো! শুনে তেমন ভাবান্তর হলো না। এমন হবে আগেই অনুমান করেছে। তার বাবা কিছু চাইবে আর হবেনা এটা খুব কম’ই হয়েছে। তাই মিষ্টিটুকু স্বাভাবিক ভাবেই গিললো। গিলে এগিয়ে পানি খাবে তখনি কেন জানি বীণার সেই দিন সকালের মুখটা ভেসে উঠল। যে ঝরঝরিয়ে কেঁদে বলছে, ” ফরহাদ ভাই আমি পরীক্ষা দিতে চাই।”

ফরহাদ পানি খেলো না। গ্লাস রাখলো। রেখে মায়ের হাতের বাটি থেকে নিজেই বাকি মিষ্টিটুকু নিয়ে খেলো। ফাতিমা খুশি হয়ে গেলো। খুশিতে ঝিলমিল করতে করতে বললো, — তোদের স্কুলের নতুন শিক্ষক কি যেন নাম। ওর তো অবস্থা নাকি ভালো না। এরশাদরা নাকি রাতে সদরে নিয়ে গেছে।

ফরহাদ আবারো ভ্রু কুঁচকে তাকালো। তাকিয়ে বললো, — কাকে নিয়ে গেছে?

— ঐ যে নতুন মহিলা ম্যাডাম।

— কেন?

— কি জানি বাপু। এতো খবরতো জানি না। সাত সকালর দই মিষ্টি নিয়ে সারেং বাড়ি থেকে খবর এলো। দাওয়াত এলো। তখন শুনলাম।

ফরহাদ আর কিছু বললো না। এই মেয়ে তো দেখা যায় ঝামেলার গোষ্ঠী নিয়ে ঘুরে। এসেছে পর থেকে একটার পর একটা লেগেই আছে।

ফাতিমা মিষ্টির বাটিটা টেবিলে রাখলো। সেই ছোট বেলায় একবার দেখেছিল বীণাকে। বাসা আর স্কুল ছাড়া তেমন বেরোয় না। সে নিজেও তেমন বেরোয় না। তাই আর দেখাও হয়নি। তবে শুনেছে গায়ের রং খুব একটা পাকা না। তাদের বড় বউ আবার বিশ্বসুন্দরী। সেই সুন্দরের দেমাগে শ্বশুর বাড়ি টিকতে পারে না। শ্বশুর বাড়ি লাগে ক্ষ্যাত, ঝামেলা। তাই জাতের মেয়ে কালো হলেও ভালো, তাছাড়া ফরহাদও যে এখনো কোন বিরক্ত দেখাচ্ছে না এই’ই অনেক। তাই রেখেই বললো, — দাওয়াতে সবাই মিলেই যাবো। বড় বউকে আজ’ই খবর পাঠাবো। তোর আব্বা বললো, টুকটাক কথা বলার সেই দিন বলবে। আর আমরাও এই সুযোগে একটু দেখে আসলাম।

ফরহাদ এবারো উত্তর দিলো না। সে বরং মোজা নিয়ে খাটে বসলো। কালকে সারেং বাড়ি যায়নি। স্কুল থেকে সোজা জানাজায় গিয়েছে। এমন বৃষ্টি তাই সোজা আবার সেখান থেকেই বাড়িতে এসেছে।

ফাতিমা ছেলের দিকে তাকালের। তাকাতেই মনে মনে বললেন, — মাশাআল্লাহ! স্কুলের জন্য পরিপাটি ভাবে এই যে যখন তৈরি হয়। কি সুন্দর যে লাগে। মনে হয় বিলেত থেকে ফেরা সাহেব। সে সাথে সাথেই চোখ ফিরিয়ে নিলো। সন্তানের দিকে মায়েদের মুগ্ধ চোখে তাকাতে নেই। নজর লাগে। সে চোখ ফিরিয়ে বললো, — বীণাকে তোর পছন্দ তো ফরহাদ?

ফরহাদ এ কথা শুনেই হেসে ফেললো! হাসার অবশ্য কারণ আছে। তার আবার বীণার সেই দিনের কথা মনে পড়েছে। যে চোখ মুখ ফুলিয়ে বলছে, তাছাড়া আপনাকে আমার পছন্দও না। ”

সে হেসেই দেয়াল ঘড়ির দিকে একবার তাকালো। এখন বেরুলে একবার সদর ঘুরে আসা যাবে। অবশ্য যেহেতু এরশাদ আছে। কোন সমস্যা হওয়ার কথা না। তবুও উঠল! মেয়েটার সমস্যা হবে না জানে। তবে এরশাদের খবর কি? তাই ঝট করে বাকি তৈরিটুকু হতে লাগলো। ফাতিমা দেখে অবাক কণ্ঠে বললো,– কি বলছি তোর কানে যাচ্ছে?

— না।

— না মানে?

— না মানে নায়’ই হয় মা।

— ফাজলামি করছিস?

— আমি কখনও ফাজলামি করি না ।

ফাতেমা হাল ছাড়লো। ছেড়ে বললো, — নাস্তা খেয়ে যা অন্তত।

ফরহাদ জুতা পড়লো। পড়ে বের হতে হতে আগের মতোই বললো, — না।

ফরহাদ সদর যখন পৌঁছালো ঘড়ির কাটা নয়টার উপরে। এরশাদ হাসপাতালে নেই। সে অবাক’ই হলো! তার চেয়েও অবাক হলো, ছোট চাচাকে দেখে। পৃথিলা বেহুঁশের মতো ঘুমাচ্ছে। কালকের চেয়ে অনেকটা ভালো। এখনো অবশ্য কারো সাথে কথা বলেনি। তবে ঠিক আছে। সেই ঠিক আছে মেয়েটার পাশে অক্লান্তভাবে ছোট চাচা বসে আছে। সারা রাত নির্ঘুম দেখেই বোঝা যাচ্ছে। একদিনে’ই দেখে মনে হচ্ছে বয়স দ্বিগুণ হয়ে গেছে।

ছোট চাচা নরম মনের মানুষ। ভেতরে মায়া মহব্বতে ভরপুর। তবুও অচেনা একটা মেয়ের জন্য এতোটা কাতর চোখে লাগার মতোই। আর তার চোখেও বলতে গেলে ভালো ভাবেই লাগলো। আর লাগলো বলেই খুব সহজে বুঝলো এখানে শুধু এরশাদ না, অন্য কোন ঘটনা আছে। অবশ্যই আছে। তবে সেটা কি, ফারহাদ বুঝতে পারছে না। তাই আর কিছু না পেলও, ইমরানের দিকে ঠিক চোখ পাকিয়ে তাকালো। বাচ্চা আছে তাই হয়ত রাতে সাবিহা আসতে পারেনি। তুই বেটা দূরে দূরে কেন? তোর বউয়ের সখী। বাড়িতে গেঁথে রেখেছিস। দায়িত্বের বেলায় সারেং বাড়ির ঘাড় কেন?

ইমরান অবশ্য দেখেও দেখলো না। সে আছে মাইনকার চিপায়। না কিছু বলতে পারে, না কিছু করতে। তবে এই মেয়ের কপালে ভোগান্তি আছে । ছোট চাচার অবস্থা না বোঝার কিছু নেই, তবে এরশাদ ভাই ? শান্ত, নিশ্চুপের মাঝেও যে পাগলামি কাল রাতে তারা দেখেছে। এতো বছরে এই রকম পাগলামি এরশাদ ভাইয়ের মাঝে কখনো দেখেনি। ঝড় বৃষ্টিকেও সে হার মানিয়েছে। সাবিহাকে সাবধান করতে হবে। আর সবচেয়ে ভালো হয় মিঠাপুকুর থেকে পৃথিলা চলে গেলে। কেননা জয়তুন সব মানবে, সারেং বাড়ির দিকে আঙুল উঠবে এমন কিছু সে কখনো হতে দেবে না। তাই পৃথিলার হাজার গুণ থাক, তার সব গুণ ঢাকা পড়বে তার তালাকে। গ্রাম গঞ্জে তালাম প্রাপ্ত মেয়েকে সবাই বাঁকা, নিচু চোখেই দেখে।

ফরহাদ ইমরানের দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে জাফরের কাছে এগিয়ে গেলো। গিয়ে বলল — অসুস্থ হয়ে যাবে তো। তুমি বরং বাসায় চলে যাও। আমি কিছুক্ষণ আছি। তাছাড়া ইমরান তো আছেই।

জাফর হাসলো। হাসিটা অবশ্য মলিন। মলিন ভাবেই বললো, — মেয়েটা এখনো কথা বলেনি। কথা বলুক। তারপর দেখি ডাক্তার কি বলে।

— ভয় নেই। তুমি বাসায় যাও। আমরা আছি তো।

— না! আমি থাকি। বাসায় গিয়ে শান্তি পাবো না।

ফরহাদ জাফরের মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তার সন্দেহ পাকাপোক্ত’ই হলো। তাই হেসে বললো, — এরশাদ কই?

— এক ছেলে এসে কি যেন বললো । তারপর ডাকঘরের দিকে গেলো। আমাকে শুধু বলে গেলো। যাবো আর আসবো।

ফরহাদ ভ্রু কুঁচকে তাকালো। এই ছেলের মাথায় আসলে চলছে কি? সে তাকিয়ে বাইরে এসে দাঁড়ালো। গতকাল টানা পুরো দিন রাত বৃষ্টি হয়ে আজ আকাশ বড় ক্লান্ত। কান্ত হলেও সূর্য এখনো উঁকি দেয়নি। নিভু নিভু অন্য রকম একটা কোমল আলোয় চারপাশ আচ্ছাদিত হয়ে আছে। সেই আচ্ছাদিত আলোয় এরশাদকে আসতে দেখা গেলো। হাতে মুঠোয় সব সময়ের মতো সিগারেট। গায়ে কুঁচানো সাদা শার্ট, কালো প্যান্ট। যার অর্ধেক কাদায় মাখামাখি। খোঁচা খোঁচা ছোট ছোট চুলগুলো এলোমেলো।

মুখটা ভয়ংকর, গায়ের রং শ্যামলা হলেও এরশাদের শরীর বেশ শক্ত সামর্থ্য। আসলে তাদের দু’ভাইয়ের গড়নই একরকম। তাদের বাবা মানে জসিম চাচার গড়নও এমন ছিল, শক্তপোক্ত। তবে জাফর চাচা আলাদা ধাঁচের মানুষ। তিনি শুধু স্বভাবে নরম কোমল না, দেখতে গড়নেও কোমল।

তবে আশ্চর্যের বিষয় এই শক্ত সামর্থ্য শরীর নিয়ে এরশাদকে কখনো মারামারি বা ঝগড়ায় জড়াতে দেখা যায়নি। সে শান্ত, মার্জিত। আজ পর্যন্ত গ্রামের কেউ এরশাদকে মারধর, রাগ, জেদ করতে দেখেনি। বরং ছোটবেলা থেকেই মারামারি, কাটাকাটিতে সবার পরিচিত ছিল ফরহাদ আর শাহবাজ। গ্রামের কোণায় কোণায় এমন অনেক গল্প’ই আছে ।

তবে কলেজের পরে ঢাকায় থাকার সুবাধে তারটা ঢাকা পড়ে গেছে। শাহবাজেরটা এখনো পুরোদমে চলছে। তবে এরশাদ, তাকে ফরহাদ এখন আর পুরোপুরি বুঝতে পারে না। ডাকাতের ঘটনার পর থেকে সে অন্য রকম।

এরশাদ এসে স্বাভাবিক ভাবেই ফরহাদের পাশে দাঁড়ালো। স্বাভাবিক ভাবে দাঁড়ালেও আজ সিগারেট এগিয়ে দিলো না। নিজের মতো শুধু বললো, — কখন এসেছিস?

— এইতো এখনি।

— স্কুলে যাবিনা?

— যাবো।

— ওর ব্যাপারে হেড স্যারের সাথে কথা বলিস।

— বলবো।

— তাহলে যা।

ফরহাদ হেসে ফেললো! হেসে বললো, — তাড়িয়ে দিচ্ছিস মনে হয়।

এরশাদও হাসলো। হেসে বললো, –.হ্যাঁ দিচ্ছি।

— জানতে পারি কেন?

— কাউকে সহ্য হচ্ছে না।

ফরহাদ আবারো হাসলো। হেসে নিজেই এরশাদের হাত থেকে সিগারেট টেনে নিলো। নিতে নিতে বললো, — কার চিঠি এসেছে?

— ছোট চাচা ।

— প্রেরক কে ?

— সাবিহার বাবার।

— চিঠি আছে না হাওয়ায় উড়িয়ে দিয়েছিস।

এরশাদ নির্বিকার ভাবে পকেট থেকে চিঠি বাড়িয়ে দিলো। ফরহাদ ঠোঁটে ভাঁজে সিগারেট রেখে হাতে নিলো। নিয়ে ভাঁজ খুলে চোখ বুলালো।

জাফর,

কেমন আছিস? অবশ্য মেয়ে আছে এখন মনে হয় না খারাপ আছিস। তবে শুনেছিস হয়তো তারেক খুন হয়েছে, আর পুলিশ পৃথিলাকে খুঁজছে। খোঁজা টা সমস্যা না। এসে কথা বললেই মিটমাট হয়ে যাবে। তবে সমস্যা হলো। কেসটা মনে হয় শায়লার বর্তমান স্বামী হাতে নিচ্ছে। এমনকি পৃথিলার সব বন্ধু -বান্ধবীদের খুঁজে বের করছে। শায়লা সাবিহাকে চিনতো। আমার মেয়ে হিসেবে না চিনলেও ওর বান্ধবী হিসেবে চিনতো। যে কোন সময় আমার বাড়িতে আসবে। এখন তুই বল আমার কি করা উচিত। শায়লা যদি জানে পৃথিলা মিঠাপুকুরে, আগুন লাগিয়ে ফেলবে। আর যেই সত্য পৃথিলা আজ পর্যন্ত জানে না, তা জানবে। আর জানতে পারলে পৃথিলা মিঠাপুকুরে একসেকেন্ডও থাকবে না। এখন তোদের যা ভালো মনে হয় কর। করে আমাকে অতি শীঘ্রই জানা।

ইতি
ইমদাদুল হোসেন

ফরহাদের ঠোঁটের ভাঁজ থেকে সিগারেট পড়ে গেলো। পড়তেই অবাক হয়ে তাকালো। এরশাদ অবশ্য স্বাভাবিক। স্বাভাবিক ভাবেই বললো, — সারেং বাড়ির আসল রক্ত।

ফরহাদ কথা বলতে পারলো না। সব তার মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে। সব গেলেও সেই প্রথম দিনের চিঠির শায়লার রহস্য বুঝলো। ভালো ভাবেই বুঝলো। তাইতো থমকে দাঁড়িয়ে রইল। ছোট চাচার এমন কাহিনী আছে সে তো ভাবতেই পারছেনা।

এরশাদ অবশ্য ফরহাদের ভাবা না ভাবা নিয়ে মাথা ঘামালো না। সে টেনে ফরহাদের হাত থেকে চিঠি নিলো। নিয়ে বললো, — নাস্তা করেছিস?

ফরহাদ থমকে দু’পাশে মাথা নাড়লো। এরশাদ দেখে তার মতো বললো, — আমিও না। চল করে আসি।

ফরহাদ নাস্তা করতে করতে সবই শুনলো। শুনে কি প্রতিক্রিয়া দেখাবে বুঝতে পারলো না। তবে এরশাদ সেই চিঠিটা বের করে টুকরো টুকরো করলো, করে হোটলের চুলার আগুনে জ্বালালো। জ্বালিয়ে সুন্দর করে নিজ হাতে দু’টো চিঠি লিখলো।

একটা তার অতি প্রিয় চাচার জন্য। যেখানে সব বক্তব্যে ঠিক রেখে মূল জায়গায় লিখলো,” ঢাকার অবস্থা খারাপ। অনেক খারাপ! পৃথিলাকে সবাই খুনি ভাবছে। তাই কোন ভাবেই পৃথিলা যেন এখন ঢাকার দিকে না আসে। সব একটু ঠান্ডা হোক। তারপরে ওকে একবার নিয়ে এসে মিটমাট করে ফেললেই হবে। ”

আর দ্বিতীয় সাবিহার বাবাকে। যেখানে খুব দরদ দিয়ে লিখলো, — পৃথিলা এখানে ভালো আছে। আমিও ভালো আছি। অনেক অনেক দিন পরেই একটু ভালো আছি।আর কেউ না জানুক তুই তো জানিস? তাই বন্ধু হয়ে বন্ধুর কাছে হাত পাতলাম। শায়লা বা শয়লার বর্তমান স্বামী কেউ যেন জানতে না পারে পৃথিলা এখন কোথায় আছে। বিশ্বাস কর, এটা আমাদের জন্য ভালো। সবার জন্যই ভালো। শেষ বয়সে এসে মেয়েটার ঘৃণা নিয়ে আমি বাঁচতে পারবো না। তাই বন্ধু হয়ে বন্ধুর প্রতি এই দয়াটুকু কর। এতে আমরা সবাই’ই ভালো থাকবো।

জয়তুন বসে আছে চুপচাপ। সব সময়ের মতো বসার ঘরে। সব সময়ের মতো বসলেও, সব সময়ের মতো অবস্থা তার নেই। উপরে যতোই শক্ত দেখাক, আলাউদ্দিনের মৃত্যু জয়তুনকে ভেঙেছে। ভালো ভাবেই ভেঙেছে। আর কেউ না বুঝুক, আম্বিয়া বুঝে। এই যে সকাল থেকে একা একা হাঁটতে পারছে না। দাঁড়ালেই শরীর কাঁপছে। আম্বিয়া বলতে গেলে একেবারে জড়িয়ে ধরে বসার ঘরে এনে বসিয়েছে। তার মধ্যে সকাল গড়িয়ে দুপুর গড়িয়ে এলো। না ছোট চাচা বাড়ি ফিরেছে, না এরশাদ। এমনকি কোন খবর পর্যন্ত নেয়নি। অথচ জয়তুনের একটু মুখের রং বদল হলেও এরা দুনিয়া লুটিয়ে ফেলতো।

অবশ্য আম্বিয়া নিজেও অবাক হয়ে আছে। ছোট চাচা যেমন তেমন, তবে এরশাদ ভাই, সে তার প্রিয় দাদিকে ভুললো কি করে? অসুস্থ ছিল বুঝেছে। রাত বিরাত, পাশাপাশি থাকে বিপদে ডেকেছে গেছে। তাই বলে মাথায় করে নিয়ে বসে থাকতে হবে? কিছু একটা ঠিক নেই, কি নেই?

তখনই সাবিহা এলো। পৃথিলার টেনশনে চোখ মুখ শুকিয়ে আছে। অবশ্য ইমরান সকালে খবর পাঠিয়েছে। তবুও সে তো যেতে পারছে না। বাড়িতে তো কেউ নেই। মেয়েটাকেও কার কাছে রাখবে? এর মধ্যে আবার জয়তুন দাদি ডেকে পাঠালো।

সাবিহা ভাবলো আলাউদ্দিন ফকিরের জন্য দোয়া পড়াবে। হয়তো তাকেও থাকতে বলবে। কিন্তু সাবিহাকে অবাক করে জয়তুন শান্ত ভাবে বললো, — তোর কি মাথা গেছে রে সাবিহা?

সাবিহা বুঝতে পারে না। তাই একটু হেসেই বললো, — কি হইছে দাদি?

জয়তুন ইশারায় বসতে বললো। সাবিহা স্বাভাবিক ভাবেই এগিয়ে বসলো। বসতেই জয়তুন বললো, — স্বামী ছাড়া মাইয়া নিজের মায়ের পেটের বোন হলেও বিশ্বাস করতে নাই। বোন জামাইয়ের সাথে ইটিশ পিটিশের কতো নজির আছে। আর এখানে কোথাকার কোন সখী। আক্কেল কি বেইচা খাইছোস নি?

সাবিহা মুখে কথা আসে না। স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। আল্লাহ! কি নোংরা কথা। পৃথিলাকে না চিনুক, ইমরানকে তো তারা ছোট বেলা থেকে চেনে।

জয়তুন হালকা হাসলো!হেসে আম্বিয়াকে ইশারা দিলো পান বানাতে। দিয়ে বললো, — সুখে থাকলে ভূতে কিলায়। তোকে দেখে আমায় এইটাই মাথায় আইল। আচ্ছা ঠিক আছে। ইমরানরে আমরা চিনি, তয় এলাকার মানুষরা ভালো চোখে দেখবো? ও তো সারেং বাড়ির জন্য এখনো কেউ আঙুল তুলে নাই। তাহলে এমন মাইয়া, তার মধ্যে নাই মুরব্বি মাথার উপরে । একই ছাদ, একই ঘর। তুই বল কেমন দেখায়?

সাবিহার মনে হলো কেউ তার গলা চেপে ধরেছে। তবুও অনেক কষ্টে বলতে চাইলো। পৃথিলা ওমন মেয়ে না। তবে জয়তুন শুনলে তো। সে হাত উঠিয়ে ফেরালো। ফিরিয়ে বললো — যাই হোক। তোদের আমি কখনোও আলাদা ভাবি নাই। আমার কাছে বীণা যেমন, তুইও তেমন। এরশাদ, শাহবাজ যেমন ইমরানও তেমন। তাই সোজা’ই বলছি। এই সব ব্যাপারে আঙুল উঠলে ভাই জয়তুনরে পাবা না। কেলেঙ্কারির ঘটনায় জয়তুন নাই। তাই যত তাড়াতাড়ি পারো ব্যবস্থা নাও। পরে বইলো না, সময় থাকতে সাবধান করলাম না।

সাবিহা শূণ্য দৃষ্টিতে জয়তুনের দিকে তাকিয়ে রইল। সে প্যাচ বুঝে না, তবুও জয়তুনের সোজা ইঙ্গিত ঠিক বুঝলো। বুঝে শান্ত ভাবেই উঠে দাঁড়ালো। দাঁড়াতেই জয়তুন বললো, — আমার কোন কথা মনে নিও না। ভালো চাই, তাই বললাম। যাগগে, আলাউদ্দিনের জন্য দোয়া পড়াবো। তুমি কিন্তু সেইদিন চুলায় আগুন দিও না। বিয়ান হইতে এখানেই থাইকো। সবাই মিলাই থাইকো।

সাবিহা হ্যাঁ, না কিছুই বললো না। তার ভেতর থেকে কেন জানি কাঁপুনি আসছে। বিয়ের পরে গ্রামের সারেং বাড়ি নিয়ে কতো কিছু শুনেছে। তবে তাদের কোন প্রকোপে তাকে পড়তে হয়নি। বরং ভালো সম্পর্ক’ই ছিল। তবে আজ ঘৃণায় গা গুলিয়ে উঠল। সেই ঘৃণা নিয়ে আর দাঁড়ালো না, চুপচাপ চলে গেলো।

সেই চলে যাওয়া জয়তুন চুপচাপই বসে দেখল। দেখলো আয়নাও। সাবিহার কাছে পৃথিলার খোঁজ জানতে এসেছিল, অথচ এসে এক নিকৃষ্ট জগতের নিকৃষ্ট মানুষদের দেখলো। যারা কতো সহজে মানুষকে দুমড়ে মুচড়ে ফেলে। কিছু দৃশ্য, কিছু অনুভব, যেন চুপিচুপি বলে গেল অনেক কিছু’ই। কথায় আছে না, বয়স মানুষকে শেখায় না, শেখায় সময়। এই যে আয়না কয়দিনেই কতোকিছু শিখছে। তাইতো, ঐ যে শান্ত মুখে বসে থাকা জয়তুন আরা, তার দিকে তাকিয়ে রইল সে নিজেও। সমান নীরবে, সমান গভীরে।

চলবে……

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here