ধূপছায়া #নূপুর_ইসলাম #পর্ব_ ২৮

0
2

#ধূপছায়া
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব_ ২৮

পৃথিলার সারা দুপুর বিকেল বলতে গেলে গেছে চুপচাপ বসে। স্কুলে আর যাওয়া হয়নি। মৃত্যুর পরে আলাউদ্দিন ফকির কে নিয়ে সোজা আসা হয়েছে সারেং বাড়িতে। এই সখী ছাড়া তার তিন কুলে কেউ নেই। কিছু খাদেম লোক ছিল। তারা’ই দাফনের আগে এক ঝলক নিজ ভিটায় নিয়েছিল। সেখান থেকেই সোজা কবরস্তান।

কবরস্তান নিলেও সারেং বাড়ির উঠান থেকে লোকারণ্য কমেনি। এই ঝড় বৃষ্টি মাথায় করেও অনেকে এলো, অনেকে গেলো। সাথে কতো গল্প। আলাউদ্দিন ফকির এমন ছিল, ওমন ছিল। অনেক নাকি ক্ষমতাও ছিল। গরীর মানুষদের সহায় ছিল। মিঠাপুকুরের বিপদ আপদের মাথা ছিল।

পৃথিলা বসে বসে সব মনোযোগ দিয়ে শুনলো। কতোটা অন্ধ বিশ্বাস এই মানুষগুলো আলাউদ্দিন ফকিরকে করতো সারা দুপুর, বিকেল পৃথিলা তাই বসে বসে শুনলো, ভাবলো। তবে টু শব্দও করেনি। বেঁচে থাকলে হয়তো করতো। তবে যে নেই, দুনিয়ার সব হিসেব নিকেশের পাট চুকিয়ে অজানা গন্তব্যে চলে গেছে। তাকে নিয়ে তর্কে যাওয়া যায় না। কেননা তারটুকু বলার জন্য সে নেই। তর্ক দু’পক্ষের হতে হয়। একজনের অনুপস্থিতিতে তা হয় না। তাছাড়া কারো ক্ষতি তো করেনি।

সারা বিকেল সন্ধ্যায় এই রকম হাজার ভাবনা ভাবতে ভাবতেই পৃথিলার আজকের দীর্ঘ দিনটা গেলো। তবে কথায় আছে না বিপদ, মৃত্যু, কষ্ট এগুলো কখনও একা আসবে না। তারা আসবে দল বেঁধে। দল বেঁধে হোক আর ভাগ্যের অন্য কোন ইশারা, ফাঁদে পড়ে গেলো পৃথিলা। কেননা অনেক অনেক দিন পর তার মনে হলো গা গরম হচ্ছে, মাথা ভারী হয়ে আসছে। তার অসুখ বিসুখ কম। কম বলতে অনেক কম। সামান্য জ্বরও শেষ বার কবে এসেছে, পৃথিলা মনে করতে পারে না। তবে হঠাৎ আজ কি হলো?

পৃথিলা অবশ্য কাওকেই কিছু বললো না। নিজের মতো হালকা পাতলা কিছু খেলো। তার কাছে ঔষুধ ছিল। সেখান থেকে ঔষুধ খেলো। খেয়ে কাঁথা টেনে চুপচাপ শুয়ে পড়ল। এমন ঝড় বৃষ্টির রাতে কাওকে আর বাড়তি ঝামেলায় ফেলার মানে হয় না।

তবে মানুষের চাওয়া মতো হয় আর কখন? যেভাবে যা ভাগ্য আছে তা ঠিক হতে থাকে। তাই তো রাত বাড়তে লাগলো, তার সাথে পৃথিলার শরীরের তাপমাত্রাও। বাড়তে বাড়তে আসলে কতোটা খারাপ হলো পৃথিলা নিজেও বুঝতে পারলো না। তবে অনেক কষ্টে টেনে ভারী হয়ে যাওয়া চোখের পাতা দুটো খুললো। খুলে ধীরে ধীরে উঠে বসলো। মাথাটা ঘুরছে, গলা শুকিয়ে আসছে। হঠাৎ করে এমন জ্বরের আগা মাথা পৃথিলা কিছুতেই পেলো না।

তাই অনেক কষ্টে’ই উঠে বসলো। শরীর তার কাছে লাগছে পাথরের মতো ভারী। সেই ভারী শরীর নিয়েই উঠে পানি খাওয়ার চেষ্টা করলো। রাত কতো সে জানে না। তবে বৃষ্টি এখনোও থামেনি। টিনের চালে ঝুমঝুম করে পড়ছে আর গায়ে শীতে কাটা দিচ্ছে। সে কি সাবিহাকে একবার ডাকবে? পৃথিলার বিবেকে বাঁধে। সারাদিন ছোট্ট বাচ্চাটাকে নিয়ে কতো কাজ যে করে। তার মধ্যে আলাদা ঝামেলা হিসেবে ঘাড়ে সে বসে আছে। একটা মানুষের খাওয়া, রান্নার ঝামেলাতোও কম না।

তাই না ডাকার’ই সিন্ধান্ত নিলো। কোন রকম রাতটা গেলেই জ্বর কমতে শুরু করবে। জানে তো! মিথিলার দু’দিন যেতে না যেতেই জ্বর হতো। সারা রাত যেতো উথাল-পাতাল, তবে সকাল হওয়া সাথে সাথে’ই শেষ।

তারটাও নিশ্চয়’ই এমন হবে। তবে পানি মুখে নিতেই হলো আরেক বিপত্তি। পেট মুড়িয়ে এলো। যেন তেন মোড়ানি না, এমন এক মোড়ানি দিলো পৃথিলার মনে হলো, ভেতরের সব বেরিয়ে আসবে। সে তাড়াতাড়িই দরজা খুলে বারান্দায় চলে এলো। খোলা বারান্দায় বৃষ্টির ছাটে পৃথিলাকে ভিজিয়ে দিয়ে গেলো। দিতেই পৃথিরার মনে হলো রাস্তায় ওপাড়ে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। বাকি বেড়া খুলেছে। তাই বারান্দা থেকে সোজা দৃশ্যমান।

দৃশ্যমান হলেও পৃথিলা তাকালো না। নিজের মনেই বড় একটা শ্বাস ফেললো। সে বলতে গেলে ভীতু টাইপ মেয়ে। ভীতু হলেও বাস্তবতার জ্ঞান প্রখর। আর প্রখর বলেই সে জানে, সারাদিন আলাউদ্দিন ফকির নিয়ে হাবিজাবি শুনেছে। তার মধ্যে জ্বর। এমন সময় মস্তিষ্ক অনেক কিছুই কল্পনা করতে পারে। এটা আহামরি কিছু না। গ্রাম গঞ্জে এভাবেই অন্ধ বিশ্বাস ছড়ায়। আলাউদ্দিন ফকিরেরটাও কি ছড়ায়নি? তার যদি সত্যিই এমন কোন ক্ষমতা থাকতো, তাহলে এভাবে মাঝ রাস্তায় পড়ে থাকতে হতো না।

সে শ্বাস ফেলে চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। বমি ভাবটা কমেছে। বৃষ্টির পানি গায়ে লাগাতে ভালোও লাগছে। তাই কাঁপা কাঁপা শরীরে বারান্দায় রাখা স্টিলের বালতির কাছে এগিয়ে গেলো। সাবিহা বৃষ্টির পানি ধরে রাখার জন্য রেখেছে। সেই পানি চোখে মুখে দেওয়ার জন্য উপুর হতেই আর ভারসাম্য রাখতে পারলো না। ঠাস করে বালতির উপরে’ই পড়লো।

আর পড়তেই ইমরান ধড়ফড়িয়ে উঠল। কিসের শব্দ হলো প্রথমে বুঝতে পারলো না। টিনের চালে এমনিই বৃষ্টির রিমঝিম শব্দ। আলাদা শব্দ কোথায় হলো দেখার জন্যই উঠল। উঠে দরজা খুলতেই হতবাক হয়ে গেলো। সেই অবাকের মাঝেই হন্তদন্ত হয়ে দৌড়ে সাবিহাকে ডাকতে গেলো ।

জয়তুন চোখের পাতা এক করলো প্রায় মধ্য রাতে। তখনও ঝড় তুমুল বেগে নিজ গতিতে চলছে তো চলছে। এই চলার মাঝেই কিছুক্ষণ আগে সারেং বাড়ির নদীর পাড়ে বরইগাছটা বিকট শব্দে উপড়ে পড়েছে। তার মধ্যে কারেন্ট নিয়ে রেখেছে সেই দুপুরে। হারিকেনের আলোগুলো প্রায় নিভু নিভু করছে। সেই সাথে নিভু নিভু করছে সারেং বাড়ির প্রতিটা মানুষের চোখের পাতা।

এরশাদ জয়তুনের শিওরে বসা। মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো পরম যত্ন নিয়ে। বয়স হলেও এতোদিন যে ডাট বাট নিয়ে থেকেছেন তা একদিনেই যেন ভেঙে চুড়ে শেষ। মৃত্যুর ভয় এমন এক জিনিস। যেটা শুধু যার মৃত্যু হয় তাকে ছোঁয় না, তার সাথে জড়িত প্রত্যেকটা মানুষকে ছোঁয়। এই যে যেমন জয়তুনকে ছুঁয়ে গেছে। তাই তো এতোক্ষণ পাগলের মতো প্রলেপ বলেছে।

এরশাদ জয়তুনের গায়ে কাঁথাটা আস্তে করে টেনে দিলো। বৃষ্টির কারণে শীত পড়েছে। টেনে বীণার দিকে তাকালো। সেও দাদির পাশে চুপচাপ বসে আছে। মুখটা শুকিয়ে এতোটুকু। সারাদিন কারো পেটে দানা পানি পড়েনি। তাই আম্বিয়া, আয়না গেছে হারিকেন থাকতে থাকতে সবার জন্য হালকা কিছু করতে।

এরশাদ হালকা হেসেই বোনের মাথায়ও হাত বুলিয়ে দিলো। দিয়ে বললো, — কিছু খেয়ে টুপ করে দাদির পাশেই আজ শুয়ে পড়।

বীণা শুধু মাথা নাড়লো। তখনি সারেং বাড়ির দরজায় কেউ জোরে কড়া নাড়লো। ঝড় বৃষ্টির মধ্য রাতে কড়াটায় সারেং বাড়ির প্রতিটা মানুষ’ই যেন একটু চমকেই উঠল। আর সবচেয়ে বেশি চমকে উঠল আয়না। এতো রাতে আর কি করবে। তাই স্টোভে গরম দুধ আর সাদা রুটি করেছে। সেই সাদা রুটির গরম দুধটাই মাত্র নিয়ে সে বসার রুমে এসেছে। নিচু হয়ে রাখবে তখনি দরজায় কড়া পড়ল। আর পড়তেই ছলকে দুধ ফেললো তো ফেললো একেবারে শাহবাজের হাতের উপরে।

শাহবাজ অবশ্য আজকে কোন প্রতিক্রিয়া দেখালো না। তবে ঘাড় কাত করে ঠিক তাকালো। আর তাকাতেই আয়না আস্তে করে একটা ঢোক গিললো। পড়ার আর জায়গা পেলো না। সামান্য তুমি বলেছে, গলায় এমন চেপে ধরার ধরেছে, এই যে ঢোক গিলতে গেলেও এখন গলা টো টো করছে । এখন আবার গরম দুধ। মাথা যে এখনোও সেহি সালামাত আছে এ’ই তো কত?

সাইডে’ই জাফর বসা। নিভু নিভু আলো। সেই আলোতে জাফরের চোখের আড়ালে আস্তে করে আয়না আঁচল দিয়ে’ই হাত মোছার চেষ্টা করলো।

শাহবাজ আবার এতো চাচার টাচারের ধার ধরলে তো। সে বরং ঝাড়া মেরে নিজেই আঁচল টেনে নিলো। নিয়ে মুছে ঝট করে উঠে দরজার দিকে গেলো। অবশ্য এগিয়ে এলো এরশাদও। বৃষ্টি হলেও জয়তুনের সব লোক’ই সজাগ। তবুও চিন্তিত ভাবেই এগিয়ে এলো।

আর আসতেই দেখলো শাহবাজ দরজা খুলেছে। খোলা দরজার ওপারে ভিজে চুপচপে ইমরান দাঁড়িয়ে আছে। শাহবাজ দেখে বিরক্ত হলো। কোন দরকার এতো রাতে। নিজেদের জ্বালায় বাঁচে না। তাই বিরক্ত মাখা কণ্ঠে কিছু বলবে। তার আগেই ইমরান জাফরের দিকে তাকিয়ে বললো, — ছোট চাচা, পৃথিলা মানে ওনার অবস্থা খারাপ। সারা দিন সন্ধ্যা তো ভালো’ই ছিল। হঠাৎ করে কি হলো, কিছুই তো বুঝতে পারছি না। বারান্দায় বেহুঁশ হয়ে গিয়েছে। এখন জ্ঞান তো আসবে ভালো’ই, হাত পা বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।

জাফর মাত্রই পানির গ্লাস নিয়েছিল। সেই গ্লাস’ই হাত থেকে ছিটকে পড়ল। সেই পড়ার দিকে অবশ্য জাফর ফিরেও তাকালো না। হন্তদন্ত হয়ে এগিয়ে গেলো। ঝড় না বৃষ্টি সে কিছুই খেয়াল করলো না। ভিজেই ইমরানের বাড়ির দিকে দৌড়ে গেলো। তার পিছু পিছু ইমরানও গেলো।

আয়না নিজেও হতভম্ব। তার অসুখে মানুষটা কতোকিছু করলো। এখন তার বিপদে আয়না কি কিছু করবে না। সে কাচুমাচু করতে করতেই শাহবাজ আর এরশাদের দিকে তাকালো। সে যে নিজেও যেতে চায়। আলাউদ্দিনের মৃত্যুতে তার ভেতরে ভালো মন্দ কিছুই হয়নি। তার জীবনের আসল শনিটা তো সে’ই ডেকেছে। তবে পৃথিলার কথা শুনেই তার চোখে পানি চিকচিক করতে লাগলো। এমন ঝড় বৃষ্টির রাতে কে কি করবে? ভ্যানে তো দুনিয়া উল্টে গেলেও নেওয়া যাবে না।

শাহবাজ দাঁড়িয়ে আছে বিরক্ত নিয়ে। কোথাকার কে? তাদের এসে বলার কি হলো। আর চাচা’ই এমন হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে গেলো কেন? সে জাফরের মেজাজ আয়নার উপরে ঝাড়ল। এমন এক ধমক দিলো।

আয়নার সাথে সাথে’ই ঠোঁট কেঁপে উঠল। সেই কেঁপে উঠা ঠোঁটের দিকে শাহবাজ একবার তাকালো। তাকিয়ে’ই চোখ ফিরিয়ে নিলো। তবে আয়না নিলো না। যখনি মনে করে মানুষগুলো একটু ভালো। তখনই ভালোর পর্দাটা টেনে নিজেরাই সরিয়ে ফেলে। এদের নিজেদের ছাড়া আর কারো জন্য পুড়ে না। সব সার্থপরের দল।

এরশাদ সব চুপচাপই দেখলো, শুনলো। হন্তদন্ত, ঘাবড়ানো, চেঁচানো তার ধাতে নেই। বড় বড় যে কোন জিনিসও সে ঠান্ডা মাথায় হজম করতে পারে। এই যে পৃথিলার খবরে যে জাফরের মতো সে নিজেও ধাক্কা খেয়েছে। তাকে দেখে বোঝার উপায় আছে? না নেই।

বরং শান্ত ভাবেই শার্টের হাতা গুটালো। গুটিতে বাইরের দিকে যেতে যেতে বললো, — আমি না ফেরা পর্যন্ত কোথাও যাবি না। কালামকে নৌকা বের করতে বল।

শাহবাজ রাগে ফুসলো। এই ঝড় বৃষ্টির মধ্যে নৌকা! বাতাসে ঠিক উলটে ফেলবে। তাই রাগ নিয়েই বললো, — আমাদের কোন ঠেকা? তাছাড়া দাদির শরীর ঠিক নেই। তাকে ফেলে কোথাও যাবে না।

— দাদির কিছু হয়নি। ঘুম দিলেই ঠিক হয়ে যাবে। বীণা আছে তার পাশে।

— দাদির চেয়ে কোথাকার কোন রাস্তার মেয়ে বড় হয়ে গেলো তোমাদের কাছে?

এরশাদ থামলো। থেমে শান্ত চোখে শাহবাজের দিকে তাকালো। একজনের চোখ গহীন অরন্যের মতো রহস্য মাখা শান্ত। আরেকজনের জ্বলন্ত আগুন। সেই আগুনের দিকে এরশাদ একপলক তাকিয়ে চোখ ফিরিয়ে নিলো। নিয়ে আয়নার উদ্দেশ্য যেতে যেতে বললো — দরজাটা লাগিয়ে দাও তো আয়না।

আয়না অবশ্য লাগানোর সময়ও পেলো না। তার আগেই শাহবাজ দরজায় এমন এক লাথি মারলো। আম্বিয়া খাবার ঘর থেকে দৌড়ে এলো। তার চোখে মুখে বিস্ময়! হচ্ছে কি এই বাড়িতে?

এরশাদ আসতেই দেখলো জাফর পৃথিলার মাথাটা কোলে নিয়ে বসেছে। ভেজা চুলগুলো বারান্দায় ছড়িয়ে আছে। যেই মানুষের সামান্য আঁচলের আগাটাও একটু নড়চড় হয় না। সেই কাপড়’ই আধভেজা হয়ে গায়ে লেপটে আছে। কপাল কেটেছে। সেই কাটা থেকে রক্তগুলো চুইয়ে বৃষ্টির পানিতে মিশে যাচ্ছে।

এরশাদ এগুলো! এগুতে এগুতে খেয়াল করলো। তার শরীর কাঁপছে। পৃথিলার চোখ, মুখ মৃত মানুষের মতো ফ্যাকাশে। নিশ্বাস ফেলছে কিনা বোঝা যাচ্ছে না।

সাইডেই সাবিহা কাঁদছে। জাফর এরশাদকে দেখে’ই ছোট মানুষের মতো চোখে পানি নিয়ে বললো, — এই এরশাদ শরীর এমন বরফ হচ্ছে কেন?

এরশাদ উত্তর দিলো না। সে এগিয়ে ঝট করে ঘরে গেলো। খাটের বিছানো চাদর একটানে হাতে নিলো। নিয়ে পৃথিলার কাছে এসে পেঁচিয়ে ঝট করে কোলে তুলে নিলো। নিয়ে একসেকেন্ডও দাঁড়ালো না। বৃষ্টি কাঁদা পানির মধ্যেই ঘাটের দিকে দৌড়ে গেলো। তার পিছু পিছু জাফর ইমরানও গেলো।

এই ঝড় বৃষ্টি পেরিয়ে কি ভাবে নৌকা সদরের ঘাট পর্যন্ত এরশাদ আনলো, পৃথিলা জানলো না। সে তখন বাবার কোলে মাথা রেখে দিন দুনিয়া ভুলে বেহুঁশ হয়ে নৌকার ছাউনির ভেতরে। নিশ্বাস পড়ছে খুব ধীরে ধীরে। ডাক্তারা দেখেই আঁতকে উঠে বললো, — এই রোগীকে তো বাঁচানো যাবে না।

এরশাদ শাহবাজের মতো না। যদি হতো তাহলে ডাক্তারের মুখ এখনি বিগড়ে যেতো। তবে এরশাদ, এরশাদ’ই। তাই এগিয়ে ডাক্তারের সামনে সোজা দাঁড়ালো। দাঁড়িয়ে তার স্বভাবমতো শান্ত ভাবে বললো, — আপনাদের সাধ্যে যা আছে করেন। করেন আর দোয়া করেন। রোগীর যেনো কিছু না হয়। হলে এই যে আসতেই কলিজা কাঁপালেন। এর জন্য আপনার কলিজা আমি নিজ হাতে পিছপিছ করবো।

ডাক্তার আতঙ্ক নিয়েই দৌড়ে ভেতরে গেলো। সারেং বাড়ির মানুষের ধরণ এই গ্রামে কারো’ই আজানা না। তাই তো পৃথিলাকে নিয়ে মূহুর্তে পুরো হাসপাতালে হুড়তুল পড়ে গেলো।

এর মধ্যে জাফর হাসপাতের চেয়ারে’ই শরীর ছেড়ে দিল। এরশাদ এগিয়ে ধরলো। জাফর শ্বাস ফেলছে হাঁপানি রোগীর মতো। সেই ভাবেই বললো — আমার মেয়ে এরশাদ, আমার মেয়ে। কিছু কর। আমার মেয়ের কিছু হলে। আমি বাঁচতে পারবো না।

এরশাদ কিছু’ই বললো না। জাফরকে জাপটে ধরেই চুপচাপ বসে রইল। আর এই বসে থাকতে থাকতে ফজরের আজান পড়ল। আর সবাই কে অবাক করে দিয়ে পৃথিলার শরীরের তাপমাত্রা ফিরে আসতে লাগলো।

নার্স এসে দৌড়ে বলে গেলো। যেতেই জাফরের কলিজায় যেনো পানি ফিরে এলো। আর আসতেই কাঁপতে কাঁপতে এগিয়ে পৃথিলার দিকে গেলো।

তবে এরশাদ সেদিকে গেলো না। সে এলো বাইরে। এখনো গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছে। সে বৃষ্টির মধ্যেই পা ছড়িয়ে হাসপাতালের সিঁড়িতে বসলো। আর বসতেই খেয়াল করলো। তারা তো একা আসেনি। কালাম, জয়তুনের আরো লোক এসেছে। এই ঝড় বৃষ্টির রাতে একা নৌকা ঠিক রাখা সম্ভব না। তাই তারাও এসেছে। আর ছোট চাচার আহাজারি সবাই ঠিক শুনেছে। বাসায় যেতে দেরি হবে তবে জয়তুনের কানে কথা তুলতে দেরি হবে না।

তাই হাত বাড়িয়ে কালামকে কাছে ডাকলো। কালাম আসতেই বললো, — সিগারেটের ব্যবস্থা কর আর এই হাসপাতালের সব কথা এই হাসপালতালেই শেষ । যদি জয়তুনের কানে গেছে, এরশাদের আগুনের চুলা আবার জ্বলবে, ভালো ভাবেই জ্বলবে।

জয়তুন, জয়তুনের ভাবে ফিরে এলো সকালে ঘুম থেকে উঠেই। উঠে সব’ই শুনলো। শুনে স্বভাব মতো খিকখিক করে না হাসলেও, তবে হাসলো। হেসে শাহবাজকে বললো, — আজিজকে খবর পাঠা, আমরা সম্বন্ধে রাজি। আর চারদিনে আলাউদ্দিনের নামে বড় দোয়া রাখবো। তারও দাওয়াত পাঠা। গ্রামের এক ঘরও যেন বাকি না থাকে। আর ঘটককে আসতে বল। আমি এরশাদের জন্য মেয়ে দেখবো। বাঁচি কয়দিন আর ঠিক নাই। মরার আগে গলায় ঘন্টা বেঁধে যাই। তা না হলে অঘাটে ডুবে মরতে সময় লাগবে না।

জয়তুনের জয়তুনগিরিতে শাহবাজের তেমন ভাবান্তর হলো না। সে বরং আরাম করে শুতে গেলো। সারা রাত ঘুমায়নি। তাই ফট করে বিছানায় শুলো। আর শুতেই চমকে উঠল। পুরো বিছানা ভেজা। যেন তেন ভেজা না। পানিতে চুপসে আছে। সে চেঁচাবে তখনি আয়না ধীর পায়ে তার সামনে এসর দাঁড়ালো। স্বভাব মতো আস্তে কোমল সুরে বললো, — এতো ঝামেলায় জানালা লাগাতে ভুলে গিয়েছিলাম। এলোমেলো ঝড়। সব ভিজে শেষ। রোদ একটু উঁকি দিক। ঠিক ছাদে দিয়ে দেবো।

শাহবাজ ভ্রু কুঁচকে তাকালো। তার তাকানো পুরো উপেক্ষা করে আয়না আলমারি খুললো। খুলে চেয়ার টেনে কোমর বাঁকিয়ে আলমারির সামনে বসলো। ফিরোজা রঙের কাপড়ের আড়ালে কোমরের ভাঁজগুলো উঁকিঝুঁকি দিয়ে শাহবাজের চোখে ভাসলো। আর ভাসতে ভাসতে’ই আয়না নড়ে চড়ে, উঁচু নিচু হয়ে ভাঁজ করা কাপড়গুলো আবার ভাঁজ করতে লাগলো।

চলবে…….

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here