#ধূপছায়া
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব_ ২৭
শাহবাজের ঘুম ভাঙলো ভ্যাপসা গরমে। কারেন্ট নেই, ফ্যান বন্ধ। তার মধ্যে টিনের দোকান। সেই দোকানের নিচে সারা রাত শোয়ায় শরীর ব্যথায় টো টো করছে। তার মধ্যে খেয়েছিল তাড়ি। মাথাটা এখনো হালকা ঝিমঝিম করছে।
সেই ঝিমঝিমে মাথা নিয়ে আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে শাহবাজ বাইরে এলো। এখনো ভালো করে আলো ফুটেনি। যাও ফুটতো মেঘের কারণে তা পারেনি। চারিদিক অন্ধকার হয়ে আছে। এমন ভাব এক্ষুনি আকাশ ভেঙে নামবে। তবে শাহবাজ জানে, দুপুরের আগে এই বৃষ্টি হবে না। থম মেরে থাকতে থাকতে, শরীরের সব পানি গরমে চিপড়ে বের করে তারপর গিয়ে স্বস্থির বৃষ্টি হবে।
তাই শাহবাজ নিশ্চিন্তেই স্টেশনের চায়ের দোকানে বসলো। দোকানদার হাসি মুখে চায়ের গ্লাস এগিয়ে দিলো। শাহবাজ নিলো, নিয়ে চমুক দিতেই তার চেলাপেলার দু’ জন সামনে হাঁটু মুড়ে বসলো। বসে বললো, — কালকে মনিরের বাড়িত গেছিলাম ভাই। আপনের মাথা গরম ছিল। তার মধ্যে খাইলেন তাড়ি। তাই আর বলার সুযোগ পাই নাই।
শাহবাজ স্বাভাবিক ভাবেই চায়ে আবার চমুক দিলো। দিয়ে বললো, — তারপর?
— ব্যাটারে তো যমে ধরে টানাটানি করছে। এই যায় তো সেই যায়। বয়সতো কম না, তাই অনেক কষ্টে বাহার উদ্দিনরে চিনলো।
— কি বললো?
— বলার মতো কিছু নাই। সব লেবার যেমন সেও তেমন।তবে কাহিনী তো তার বউরে নিয়া।
শাহবাজ ভ্রু কুঁচকে তাকালো। সে তাকাতেই মান্না বললো, — পুরো এলাকায় রটাইছে, ইটের ভাটায় কাজ নিছে। তবে কাজ করছে হাতে গোনা কিছু দিন। তারপরে আর আসে নাই।
— আসে নাই মানে?
— তা তো ভাই জানি না। তবে গায়েব হওয়ার আগতরি ইটের ভাটার নাম করেই বের হইছে।
শাহবাজ আর কিছু বললো না। চুপচাপ চা শেষ করলো। করে বললো, — আয়নামতির এক খালা আছে না শহরে।
— জ্বি ভাই।
— তার খোঁজ রাখ। মাঝে মাঝে গ্রামে আসে। দুনিয়ায় হাজার মানুষ থাক। দুঃখ রাখার জন্য বাপের বাড়ির মানুষকে’ই মেয়েরা খোঁজে। আর যদি মায়ের পেটের বোন হয়। তাহলে তো সোনায় সোহাগা।
— জ্বি ভাই।
— খোঁজ পেলেই আমাকে বলবি। আমি এবার নিজে কথা বলতে চাই।
শাহবাজের চ্যালারা মাথা নাড়লো। শাহবাজ চায়ের গ্লাস রাখলো। রেখে বাড়ির দিকে রওনা দিলো। ঘুম হারাম করে, আমার বাড়ি, আমার ঘরে শান্তিতে ঘুমাচ্ছে। ভাবা যায়?
জয়তুন এখনো ঘুম থেকে উঠেনি। সবার আগে আম্বিয়া উঠে। তাই সেই উঠেছে। উঠে দরজা খুলতেই শাহবাজ সোজা উপরে এলো। আর এসেই বন্ধ দরজায় ধরাম করে একটা লাথি মারলো।
আয়না ধড়ফড়িয়ে উঠল। সে ভেবেছিল শান্তিতে বুঝি ঘুমাবে। তবে এতো বড় রুমে কখনো একা থেকেছে? তাই ভয়ে সারা রাত দু’ চোখ এক করতেই পারে নি। ঘুমালো এই তো কিছুক্ষণ আগে। তাও দরজা জানালা সব ইচ্ছে মতো লাগিয়ে। হাওয়া বাতাসতো ভালো সকালের আলোর ছিটেফোঁটাও এখনো রুমে ঢুকেনি।
তখনই দরজায় আরেকটা পড়ল। গরমে আয়না গায়ে কাপড় রাখেনি। সব নতুন ভাঁজ ভাঙা কাপড়। খসখসে, মচমচে। এই গরমে গায়ের মধ্যে ফোসকার মতো জ্বলে। তাই খুলে রেখেছে।
সেই কাপড়’ই ফট করে উঠে গায়ে জড়াতে লাগলো। হয়েছে কি তার মাথায় ঢুকছে না। তার মধ্যে নতুন কাপড়। আয়না বলতে গেলে গায়ে কোন রকম পেঁচালো। পেঁচিয়ে হন্তদন্ত হয়ে যেই দরজা খুলবে তখনি বুঝতে পারলো কে? কেননা এমন শয়তানগিরি এই বাড়িতে একজন’ই করে। তাই আর কোন চিন্তা হলো না। আরামছে দরজার কাছে গেলো, গিয়ে দরজা খুললো। খুলে শাহবাজ দাঁত চিবিয়ে কিছু বলবে, তার আগেই আয়না তার স্বভাব মতো আস্তে করে বললো, — রাতে কোথায় ছিলে? আমি না ভয়ে ঘুমাতেই পারি নাই। এতো বড় রুমে কি কখনো একা থাকছি?
শাহবাজের বুক ধক করে উঠল। কোন মেয়ে আজ পর্যন্ত এভাবে তার সাথে কথা বলেছে বলে মনে পড়ে না। তাই একটু অন্য রকম’ই লাগলো। অবশ্য সেই লাগা গোনায় ধরল না। বরং মেজাজ দেখিয়ে গলা চেপে এক ধাক্কা দিলো। দিয়ে দেয়ালের সাথে একেবারে মিশিয়ে ফেললো। ব্যান্ডেজ এখন আর নেই। ঘা শুকিয়েছে। তবুও ব্যথা পেলো । সাথে সাথে চোখ মুখও কুঁচকে ফেললো।
শাহবাজ সব’ই দেখলো! তবে হাত ঢিলে হলো না। বরং আরো শক্তি দিয়ে চেপে ধরলো। ধরে দাঁত চিবিয়ে বললো, — নাটক করিস আমার সাথে? চিপড়ে তোর নাটক বের করে ফেলবো। শালীর ঘরের শালী।
আয়না ফুঁপিয়ে উঠল। দম বন্ধ হয়ে আসছে। গোলাপি ঠোঁটটা তিরতির করে কাঁপে। কাঁপতে কাঁপতে আস্তে করে বলে, — তো কি করবো? বিয়ে হয়েছে মানিয়ে নেওয়া চেষ্টা করছি। তাতেও দোষ?
শাহবাজের সেই চিরচেনা হাসি ঠোঁটে আসে। আসতেই গলা থেকে হাত সরায়। সরিয়ে বুকটা সোজা করে আয়নার সামনে দাঁড়ায়। দাঁড়িয়ে বলে, — জড়িয়ে ধরো।
আয়না ফট বড় বড় চোখ করে তাকাল। শাহবাজ সেই চোখের দিকে তাকিয়ে বলে, — শুধু মুখে তুমি তুমি এগুলো হবে? আসল মানিয়ে নেওয়াও তো এটা। আসো! বিসমিল্লাহ্ বলে শুরু করি।
আয়না নিষ্পলোক দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। শাহবাজ সেই নিষ্পলোক চোখের দিকে তাকিয়ে তার তেজ নিয়েই বললো, — শাহবাজ বাইরেও যা, ভেতরেও তা। নাটক, মিথ্যা শাহবাজে নাই। তাই এরপর থেকে যা করবি চিন্তা ভাবনা করে করবি।
আয়না পলক ফেললো! শাহবাজ ভেবেছিল ভয়ে সেই দিনের মতোই কিছু করবে। তবে শাহবাজকে পুরো অবাক করে দিয়ে আস্তে করে শাহবাজের বুকে শুধু গালটা হালকা ছুঁয়িয়ে রাখলো। শুধু গাল! শরীর দু’জনের দু’জায়গায়। সেই দুই জায়গায় এক জায়গা থেকে আয়নাও তার মতো আস্তে করে বললো, — কবুল।
আলাউদ্দিন রাস্তায় নামলো তার হাতের মোটা লাঠি নিয়ে। গায়ে গেরুয়া আলখেল্লা, মাথার এলোমেলো চুলগুলো যেন আজ অন্য রকমের রুক্ষ, শুষ্ক, এলোমেলো। সব সময়ের মুখের অমায়িক হাসিটা আজ কিছুটা ম্লান। সেই ম্লাল মুখেই আবার ফিরে তার কুঁড়েঘটার দিকে তাকালো। মায়া, আহা মায়া। যার কিছু নেই, সে তার গায়ের একটা সুতোর মায়ায় হলেও পড়বে। আর এই মায়া ধরেই বুকটা চিনচিন করবে, হাহাকার করবে। এই দুনিয়ায় হাহাকার ছাড়া এমন একটা মানুষও নাই।
আলাউদ্দিন তার হাহাকার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। এই দুনিয়ায় চোখের দেখার বাইরেও অনেক কিছু আছে। ছোট বেলায় আলাউদ্দিন একবার হাত, মুখ ধুতে সন্ধ্যায় পুকুর ঘাটে গেলো। গিয়ে তার মতো হুবুুহু একটা ছেলেকে দেখলো। ব্যস, চিৎকার দিয়ে দাঁত দু’পাটি সেখানেই লেগে গেলো। সবাই ধরাধরি করে উঠানে আনা হলো। মাথায় পানি টানি দিয়ে জ্ঞান ফেরানো হলো। জ্ঞান ফিরলেও তার জীবন আর স্বাভাবিক হয়নি। হয়নি বলেই আজ বুঝলো তার এই হাহাকার আর কখনও মিটবেনা।
আলউদ্দিন মুখ ফিরিয়ে সোজা হাঁটা ধরলো। তার উদ্দেশ্য এখন সারেং বাড়ি। তার সখী তাকে ডেকেছে, সে না গিয়ে পারে? তবে যেই উদ্দেশ্য ডেকেছে, সেটা নিষেধ করতে হবে, কড়া ভাবেই করতে হবে। এখন কোন বিয়ে সারেং বাড়ির জন্য ভালো বয়ে আনবে না।
তবে সমস্যা হলো শরীরটা তার ভালো নেই। এই জীবনে হেঁটে গ্রামের পর গ্রাম ঘুরেছে, কখনও ক্লান্ত হয়নি। তবে আজ শরীর ঝিমিয়ে আসছে। অবশ্য ঝিমানোর কারণ আছে। গতরাতে অনেক দিন পর মাকে খোয়াবে দেখেছে। উঠানে গাল ফুলিয়ে বসে আছে। তাকে দেখে বললো, — কত বললাম বিয়ে কর। কি ছায়ের ঝাড়ফুঁক শুরু করলি। এখন বল, ভিটায় বাতি দেবে কে?
তখনই ঘুমটা ভেঙে গেল। ভেঙে দেখে ফজরের আজান পড়ছে। এই সময় খোয়াব দেখা ভালো কথা না। সে যেমন জানে, দুনিয়ার সবাই জানে। ব্যস, তখন থেকেই মনটা বিক্ষপ্ত, আর মনের প্রভাব শরীরে পড়বে না, তা হয় নাকি?
আলাউদ্দিন আপন মনেই হেঁটে চললো । মিঠাপুকুরের সকালটা আজ যেন আর পাঁচ দশটা সকালের মতো না। খরখরে রোদের বদলে আকাশজুড়ে ছায়া ফেলছে কালো মেঘের দল। সোনালি রোদ্দুর উঁকি দিয়েও হার মেনেছে মেঘেদের ঘনঘটায়। সেই ঘনঘটায় চারিদিকে ভ্যাপসা গরম। যেই গরম’ই বলে দিচ্ছে, আজ মিঠাপুকুরকে ভাসিয়ে দেবে দূর অজানায়।
আর তখনই আলাউদ্দিন একটা ধাক্কার মতো খেলো। মনে হলো কলিজাটা কেউ মুঠো করে ধরেছে। সে বুকে হাত রেখেই ধীরে ধীরে রাস্তার সাইডে গিয়ে বসলো।
পৃথিলার গায়ে আজ কুসুম রঙা কাপড়। সেই কাপড়ের আঁচলটা ভালো করে টেনে ব্যাগটা কাঁধে ফেললো। ফেলে হাতে ছাতা নিয়ে বেরিয়ে এলো । সাবিহা তখন তড়িঘড়ি করে খড়িগুলো ভেতরে তুলে রাখছে। বৃষ্টিতে ভিজলে আর চুলোয় তোলা যায় না। পচে গলে পড়ে। তারচেয়ে ভালো একটু কষ্ট করে তুলে রাখা। সেই রাখতে রাখতে পৃথিলাকে দেখে বলল — এই ঝড় বৃষ্টি মাথায় করে না যা পৃথিলা। ঘরের কোণায় তো না। তাছাড়া সারা রাত দুচোখের পাতা এক করিসনি।
পৃথিলা হালকা হাসলো। সাবিহাদের বাকি বেড়া খোলার লোক এসেছে। তারাই নিজেদের মতো কাজ করছে। মেঘ না এলে মনে হয় ইট বালুও এসে পড়বে। বাড়িটার যে মায়াময় একটা ভাব ছিল সেটা আর থাকবেনা। পৃথিলা হেসেই বললো, — সমস্যা নেই। তাছাড়া কালকেও পুরো ক্লাস করিনি।
— হেড স্যার জানে তুই অসুস্থ। কিচ্ছু হবেনা।
পৃথিলা এবারো শুধু হাসলোে। বাসায় বসে বসে ঝিমানের চেয়ে ব্যস্ত থাকা ভালো। অন্তত হাবিজাবি চিন্তা মাথায় জেঁকে বসে না। তাই হেসে আকাশের দিকে একবার তাকালো। তাকিয়ে সাবিহাকে বিদায় জানিয়ে বাইরে এলো। ভ্যানওয়ালা দাঁড়িয়ে আছে। আজকে অবশ্য বীণা নেই। খালি ভ্যান। ভ্যানওয়ালা বসে বসে পান চিবুচ্ছে।
পৃথিলা এগিয়ে গেলো তবে ভ্যানে উঠল না। সে আর ভ্যানে যাবে না। কোন কিছু একটা ঠিক নেই। কি নেই সে ধরতে পারছে না। এই ভ্যান ওয়ালার আচরণও তার কাছে স্বাভাবিক লাগেনি। তাই দাঁড়িয়ে বললো, — বীণা স্কুলে যাবে না?
— না আপা।
— কেন?
— তা তো আমি জানি না আপা। শুধু বললো আর নাকি যাবে না।
পৃথিলা বুঝতে পারলো কেন? তার খারাপ লাগলো। সে ঠিক করলো বিকেলে স্কুল থেকে ফিরে জাফর চাচার সাথে কথা বলবে। তার ধারণা এই বাড়িতে কথা বলার মতো একজন’ই আছে। সেটা তিনি। বাকি গুলো প্রত্যেকটার মাথায় সমস্যা আছে।
তাই বড় একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে পৃথিলা বলল,
— তাহলে আপনাকেও আর আসতে হবে না। আমি ব্যবস্থা করে নেবো।
ভ্যানওয়ালার পান চিবানো বন্ধ হয়ে গেছে। সে মুখে একটু আতঙ্ক এনেই বলল, — আমি থাকতে আপনি ব্যবস্থা করবেন কেন আপা?
— আপনি তো বীণার জন্যই আসতেন। তাই আমি রাজি হয়েছিলাম। এখন যেহেতু ও যাবে না, আমার আর প্রয়োজন নেই।
ভ্যানওয়ালা তাড়িঘড়ি করে বলল,
— না না, এইডা কেমন কথা। এরশাদ ভাই তো আমাকে বলেছেন, আপনার যাওয়া-আসার সব দায়িত্ব আমার।
পৃথিলা ব্যাগ থেকে টাকা বের করল। কাল ভাড়া দেয়নি, ভেবেছে মাসকাবারি। আর যেহেতু যাবেনা তাই টাকাটা ভ্যানের ওপর রেখে তার স্বভাব মতো হালকা হেসে শান্ত ভাবে বলল, — আপনার এরশাদ ভাইয়ের কথা শুনে ভালো লাগলো। তবে আমার দায়িত্ব অন্য কাউকে দেওয়ার আপনার এরশাদ ভাই কেউ না, ভালো থাকবেন। বলেই পৃথিলা এগুলো। এগুতে এগুতে হাতের কালো ফিতের ঘড়িটার দিকে একবার তাকালো। ইমরান ভাইকে দিয়ে ঠিক করিয়েছে। এখন বেশ চলছে। বেশ চললেও তার সময় খারাপ’ই যাবে। কেননা এই মেঘ বৃষ্টির মাথায় হাতে গোনা কয়েকটা ভ্যানের একটাও পাওয়া যাবে না। তাই হেঁটে যেতে হবে। এখন সময় মতো পৌঁছুতে পারবে কি না সন্দেহ আছে।
সেই সন্দেহ নিয়ে পৃথিলা বলতে গেলে দ্রুত’ই পা চালালো। কাপড়, গরম সব কিছু নিয়ে অল্পতেই নেয়ে ঘেমে একাকার হলো । একাকার হতেই খেয়াল করলো, ছাতা নিতে নিতে পানির বোতল নিতে ভুলে গেছে। ধুর!
তখনই তার পাশ ঘেঁষে ছোট্ট এক ছেলে দৌড়ে গেলো। ছোট্ট মানে অনেকটা ছোট। খালি গা, নিচে কালো মলিন হাফ প্যান্ট। পৃথিলা বলতে গেলে একটু চমকে’ই উঠল। কেননা ছেলেটা বলতে গেলে অনেকটা গা ঘেঁষে গেছে। এমন ঘেঁষে যেতে যেতে মনে হলো আঁচলা টেনে নিয়ে গেছে। যেদিকে গেছে পৃথিলা তাকাতেই দেখলো, বৃদ্ধ এক লোক হাত পা ছড়িয়ে তপ্ত রাস্তার মধ্যেই শুয়ে আছে। বুকে হাত। স্বাভাবিক যে নেই পৃথিলা দেখার সাথে সাথেই বুঝলো, তাইতো হন্তদন্ত হয়ে এগিয়ে গেলো। গিয়ে সামনে হাঁটু ভেঙে বসে কোমল সুরে বললো, — আপনি ঠিক আছেন?
আলাউদ্দিন সব সময়ের মতো অমায়িক হাসেন। হেসে বলে, — ঠিক থাকলে তো মা, রাস্তায় পড়ে থাকি না।
— আমাকে ধরে উঠে বসুন।
আলাউদ্দিন পৃথিলার হাত ধরে। ধরতেই একটা ঝটকার মতো খেলো। এতোটাই যে আবার পড়ে যেতে নিচ্ছিল। পৃথিলা বলতে গেলে ঝাপটে ধরলো। ধরতেই আলাউদ্দিন বললো, — কে তুমি?
— আমি পৃথিলা। হাই স্কুলের শিক্ষক। আপনি কষ্ট করে একটু সোজা বসুন তো। বসে জোরে জোরে শ্বাস ফেলুন।
আলাউদ্দিন সোজা বসতে চায়। তবে শরীরে কুলোয় না। পৃথিলা বুঝে। বুঝে বলেই চিন্তিত ভাবে আশে পাশে তাকায়। বয়স্ক মানুষ, গরমে ডিহাইড্রেশন হয়েছে নয়ত স্ট্রোক করেছে। এখন সে কি করবে?
আলাউদ্দিনের চোখে মুখে অবশ্য চিন্তার রেশ নেই। যা আছে তা একটু যন্ত্রণার। সেই রেশ নিয়েই বলে — সত্যি করে বলতো মা, কে তুমি?
পৃথিলা ফিরে তাকায়। তাকিয়ে হালকা হেসে বলে — আমি সব সময় সত্যিই বলি চাচা।
আলাউদ্দিন আবার কিছু বলতে চায়। তবে পারে না। সে অবাক চোখে পৃথিলার পেছনে তাকায়। তার পেছনে ছোট আলাউদ্দিন দাঁড়ালো। ঠোঁটে হাসি। যেন খুব মজা পাচ্ছে। সেই হাসিতে আলাউদ্দিনও হাসে। কারণ সে বুঝতে পারছে, এই মেয়েটা কে?
পৃথিলা আলাউদ্দিনের চোখ দেখে একবার নিজের পেছনে ফিরে তাকালো। শূণ্য ধূ ধূ রাস্তা। দেখে আবার ফিরে বললো, — আপনার কি অনেক খারাপ লাগছে?
আলাউদ্দিন পৃথিলার দিকে তাকায়। তাকিয়ে সুন্দর করে আবারো একটু হাসেন। এই দুনিয়া সব হজম করতে পারে তবে পাপ না। সেটা একদিন না একদিন বের হবেই। মানুষ যতো পর্দা ফেলুক, না থাকুক কোন প্রমাণ। ঐ যে উপরে যিনি আছেন, সে জানে। জানে বলেইতো কথায় আছে, তিনি ছাড় দেন, তবে ছেড়ে দেন না।
তখনই পৃথিলা ভ্যানের শব্দ পেলো। এই ভ্যান দেখলে অন্য সময় হলে পৃথিলা মুখ ফিরিয়ে নিতো। তবে এখন দেখেই ডেকে উঠলো, — এরশাদ…
এরশাদ সাথে সাথে সাইডে তাকালো। তাকাতেই কুসুম রাঙা শাড়িতে পৃথিলাকে দেখলো। দেখলো আলাউদ্দিনকেও। যাকে পৃথিলা ঝাপটে ধরে বসে আছে। এরশাদ সাথে সাথে’ই ভ্যান থামার জন্য বললো। অবশ্য বললেও ভ্যান থামার আগেই সে লাফিয়ে নামলো। আর নামতে গিয়ে দেখলো তার বুক ধড়ফড় ধড়ফড় করছে। ঐ যে প্রথম দিন পৃথিলাকে ঝাপটে ধরে নদীর পাড়ে নিল। সেই দিনের মতো। আর মাথায় ঝিঁঝিঁপোকার মতো বেজে চলছে — এরশাদ।
আলাউদ্দিন ফকির মারা গেলেন রাস্তায়, ভ্যানে পৃথিলার কোলে মাথা রেখে। মিঠাপুকুরের সদর হাসপাতাল পর্যন্ত যাওয়ার সময় সে দেয়নি। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত পৃথিলার দিকে এক ধ্যানে তাকিয়ে রইল। ঠোঁটে সব সময়ের মতো হাসি। সেই হাসির দিকে পৃথিলা শক্ত হয়ে বসে তাকিয়ে রইল। কেননা এতো গরমের মাঝেও তার মনে হলো, কিছুক্ষণ আগে হালকা একটা শীতল বাতাস তাকে ছুঁয়ে গেলো। আর যেতেই প্রথম যেই কথাটা মাথায় এলো, সেটা হলো সেই ছোট্ট ছেলেটা কোথায় গেলো?
দুপুরের পরে আকাশ বাতাস ভেঙে বৃষ্টি নামলো। এই বৃষ্টি মাথায় করেই মিঠাপুকুর গ্রামের অলি গলিতে আলাউদ্দিনের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে গেলো। আল্লাউদ্দিন যেমন সারেং বাড়ির জন্য সম্মানের ছিল তেমনি তার নিজের কারণে ভালোবাসারও ছিল। সেই ভালোবাসার ফল হিসেবেই সারেং বাড়ির উঠানে মানুষের ঢল নামলো। এতো এতো মানুষের ভিরে জয়তুন বসে রইল পাথরের মূর্তির মতো। তার যে সবচেয়ে ভরসার স্থান ছিল। সেই স্থান নদীর পাড় ভাঙার মতো ভেঙে আজ হারিয়ে গেলো।
এই মেঘ বৃষ্টি মাথায় করেই বাদ আছর আলাউদ্দিনের জানাজা হলো। হতেই প্রত্যেক মানুষ কাকভেজা হয়ে নিজ নিজ গৃহে ফিরলো।
গৃহে ফিরলো সারেং বাড়ির তিন পুরুষ। গায়ে শুভ্র পাঞ্জাবি, মাথায় টুপি। ফিরেই জয়তুনের পাশে বসে। দুনিয়া যেমন জানে, তেমনি তারাও জানে জয়তুনের কাছে আলাউদ্দিন কি ছিল। তাই তো এতোক্ষণ নিশ্চুপ বসলেও, প্রিয় মানুষেরা পাশে বসতেই জয়তুন হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। সারেং বাড়ির প্রতিটা কোণা আজ অনেক অনেক দিন পরে জয়তুনের চোখের পানিতে ভিজলো।
চলবে…..

