ধূপছায়া #নূপুর_ইসলাম #পর্ব- ৩৫

0
2

#ধূপছায়া
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব- ৩৫

এরশাদ জাফরের রুমে এলো কিছু সময় পরে। ইচ্ছে করেই আসেনি। যে কোন ধাক্কায়’ই হজম করার জন্য কিছুটা সময় দরকার। ছোট চাচাকে বলতে গেলে হজম করার জন্যই দিলো। এই কিছুটা সময় সে তাদের উপরের টানা বারান্দায় দাঁড়িয়ে একটা সিগারেট খেলো। দৃষ্টি কোথায় সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। অবশ্য বারান্দা খালি, তবে জানালা খোলা।

সেই খোলা জানালার দিকে তাকিয়েই পুরো সিগারেট শেষ করল। করে জাফরের রুমের দিকে গেলো। জাফর ততক্ষণে নিস্তেজ ভাবে খাটে শুয়ে পড়েছে। চোখ বন্ধ, সেই বন্ধ চোখের উপরে হাতটা উল্টো করে রাখা। মাথার ওপরে ফ্যান ঘুরছে ফুল স্পিডে।

এরশাদ এসে চেয়ার টেনে বসল। বসতে বসতে বলল,
— বলো, কী বলবে?

জাফর যেভাবে আছে, সেই ভাবেই শুয়ে রইল। শুধু ঠোঁট দু’টো নাড়িয়ে বলল, — বলার জন্য কিছু বাকি রেখেছিস?

— তাহলে তো সব চুকেই গেলো। চলে যাই। কাল অনুষ্ঠান, কাজ আছে আমার।

জাফর চোখ থেকে হাত সরালো। সরিয়ে আস্তে করে উঠে বসলো। বসতে বসতে বলল, — আম্মা কী বলেছে, কি চাচ্ছে সেটা আমার জানার দরকার নেই। তবে এরশাদ, আমি বেঁচে থাকতে, আমার মেয়ের সাথে কোনো অন্যায় আমি দেখতে পারবো না।

— আমি বুঝি এতই খারাপ? নাকি দেখতে ভয়ংকর বলে মেয়ের হাত দিতে চাইছ না? কোথায় গেলো এতো স্নেহ? নাকি ঘুরে ফিরে আদরে এসে চাচার গলা জড়িয়ে ধরেছি। চোখের সরমে শুধু হাতটা ছাড়িয়ে নিতে পারোনি। হাজার হলেও পালক ভাইয়ের ছেলে।

জাফর নিশ্চুপ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। এই এরশাদকে তিনি চেনেন না। এটা শুধু জয়তুন আরার নাতি। জয়তুন আরাও কথায় কথায় ভালোবাসায় আঙুল তুলেন। অথচ এরা এটা বুঝে না, ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, স্নেহ মানে এই না, সব কিছু চোখ বন্ধ করে মেনে নিতে হবে। মেনে নিয়েছো তো ভালোবাসো, না নিয়েছো তো ভালো’ই বাসোনি। অথচ এই ছেলেটা জানে না, তাকে সে কতোটা স্নেহ করে। এই যে অন্যায় করছে জেনেও যেমন নিজের রক্তের জন্য কষ্ট হচ্ছে, তেমনি এই যে ভয়ংকর মুখের ভয়ংকর এরশাদ। যার হাজার অন্যায় জেনেও কখনও মুখ ফিরিয়ে নেয়নি। বরং ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছে, স্নেহের হাত সরিয়ে নেয়নি। সে আজ কত অবলীলায় বলছে, স্নেহের নাটক করেছে। এজন্যই হয়তো সবাই বলে ভালোবাসা অন্ধ। সে বড় একটা শ্বাস ফেলে বলল,

— এখানে খারাপ ভয়ংকরের কথা না। কথা আমার মেয়ের ইচ্ছের। এখন বল, আছে আমার মেয়ের ইচ্ছে ?

— তোমার মেয়ের বেঁচে থাকারও ইচ্ছা নেই। তো যাচ্ছ না কেন গলা টিপে ধরতে?

— এরশাদ…

— চেঁচিয়ে তো লাভ নেই। আমি পিছু হাঁটবো না।

— ভালো! তবে আমি পৃথিলাকে কাল নিজে ঢাকায় পৌঁছে দেব। এখন তোর ইচ্ছে, তোর চাচাকে কি করবি। মানুষকে মারতে তো তোর হাত কাঁপে না। মেরে ফেলিস। তবে আমি বেঁচে থাকতে এসব দেখতে পারবো না।

এরশাদ চোখের কোণা রক্তিম হলো। রাগে না কষ্টে জাফর বুঝতে পারলো না। তবে তাকে অবাক করে এরশাদ এগিয়ে এলো। বসলো জাফরের পায়ের কাছে। বসে কিছুটা আদ্র কণ্ঠে বললো, — কখনোও তো আবদার করিনি চাচা। আজ করছি। পৃথিলাকে আমাকে দাও। কথা দিচ্ছি কোন কষ্ট তাকে ছুঁতে দেবো না। নাকি পায়ে ধরতে হবে? তাও রাজি, তবুও দাও।

জাফর হতভম্ব হয়েই তাকিয়ে রইলেন। সে ভালো করেই জানে, ভালোবাসার জন্য হাজার বছরের প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন নেই কোন শক্ত কারণের। ব্যস! একটা অনুভূতি। যেই অনুভূতি যাকে দেখে যার জন্য জন্মায়। তবে এরশাদের অনুভূতিতে তিনি যেমন ভালোবাসা দেখলেন, তেমন দেখলেন পাগলামি। ভালোবাসা আর পাগলামি। দু’টো শব্দ কখনও ভালো বয়ে আনে না। তা না হলে এরশাদের মুখে এমন কথা, ভাবা যায়!

জাফর পা গুটিয়ে বসলেন। এরশাদ দেখে হাসলো। হেসে বললো, — গলা থেকে হাত ছাড়িতে নিতে পারোনি, পা থেকেও পারবে না। তাই বুঝি সরিয়ে নিলে?

— আমি তোর ভালোবাসাকে সম্মান করি এরশাদ। তবে অন্যায় অন্যায়’ই। পৃথিলাকে যেতে দে। বিশ্বাস কর, পৃথিলার বিন্দু পরিমাণ ইচ্ছে যদি আমি দেখতে পেতাম। তাহলে তোর আবদারে আমার কোন সমস্যা হতো না।

— ইচ্ছের সময় হলো কোথায়? তার আগেই গন্ডগোল।

— সময় হলেও হতোটা। তোরা দু’জন সম্পূর্ণ ভিন্ন জগতের মানুষ।

— হ্যাঁ, ভিন্ন জগতের তো হবেই। শিক্ষা নেই, সৌন্দর্য নেই। সে শহরের আলোতে মোড়ানো, আর আমি গ্রামের কাদা মাটির গেঁয়ো ভূত। যেই ভূতের পুরো দুনিয়াই অন্ধকার। বিশ্বাস করো এই ভূতের এতোদিন মনটাও ছিল না।

— এতো কথা ভালো লাগছে না রে এরশাদ। আর ঝামেলা বাড়াস না। আমি কাল ওকে নিয়ে যাবো।

— যাও, নিয়ে যাও। মানুষ মারতে হাত না কাঁপলেও এরশাদের প্রিয় মানুষের গায়ে টোকার কথা ভাবতেও কাঁপে। তবে এটাও মাথায় রেখো গেলেই পুলিশ সাদরে তোদের মেয়েকে জেলে ঢুকাবে।

জাফর বিস্ময় চোখে মুখে বলল, — আমার মেয়েকে কেন জেলে ঢুকাবে?

— খুনের পালাতক আসামি তোমার মেয়ে।

— আমার মেয়ে কেন হবে, খুন তো করেছিস তুই।

— হ্যাঁ, তো! প্রমাণ আছে কোনো?

— আমি বলবো।

এরশাদ হো হো করে হাসলো! হেসে বললো,– দেখিয়ে দিলে তো রক্ত, রক্ত’ই।

জাফরের ভেতর ভেঙে আসে। এরশাদ দেখে। দেখে বলে, — বলবে যখন, পুলিশকে এটাও বলো। শাস্তিটা তুমিই দিতে চেয়েছিলে। কেন চেয়েছিলে? কারণ তোমার মেয়ের সাথে অন্যায় হয়েছে। মেয়ে কে? খুনির প্রাক্তন স্ত্রী। স্ত্রী কে? পৃথিলা। পৃথিলা কে, শায়লার মেয়ে। শায়লা কে? জাফর নামের শায়লার এক ধোঁকাবাজ প্রাক্তন। আর প্রাক্তন কে? তারেকের খুনির প্রিয় চাচা। আর খুনি কে? তোমার মেয়ের আশিক। যে সুন্দর মতো বয়ান দেবে। প্রতিশোধ নিতে বাবা, মেয়ে তাকে সুন্দর মতো ব্যবহার করেছে। তা না হলে খুন করে কোন লাভ আমার?

জাফরের অসহায় মুখে কথা আসে না। এরশাদ কাতর চোখে প্রিয় চাচা মুখটা দেখে। দেখে আগের মতোই বলে।- ” তুমি জেলে, আমি জেলে, তোমার মেয়েও জেলে। খারাপ না। যাও, নিয়ে যাও। তবে তোমার সাথে যাবে বলেও মনে হয় না। কেননা, সাবিহাদের ঘর থেকে সে বেরুবে তার রক্তের পরিচয় জেনে। আর তাছাড়া জয়তুন আরাও জানুক কার বিরুদ্ধে সে দাঁড়িয়ে আছে। নিজেদের রক্ত। আপন রক্ত। যেই সারেং বাড়ি নিয়ে এতো গর্ব। সেই গর্বের একমাত্র রক্ত। তখন এরশাদের সাইডেই না এলেও দুনিয়া জানে, জয়তুন বাড়ির সম্মান আর বংশের জন্য কতোটা দেওয়ানা। তাই পৃথিলা এমনিতেও এই গ্রাম থেকে বের হতে পারবে না, ওমনিতেও পারবে না। মাঝে থেকে বেচারির কষ্টে পাল্লাটা আরো ভারী হবে।

জাফর নিস্তেজ কণ্ঠে ডাকে,– এরশাদ… আমি তোকে বিশ্বাস করেছিলাম।

— আমি মূল্য রাখবো। এরশাদ ক্ষয়ে যাবে তবুও এই জবান দিয়ে এই বিষয়ে একটা শব্দও বের হবে না। তবে যেই পর্যন্ত তুমিও মুখ বন্ধ রাখবে। আর এই রাখায় এটায়ও মাথায় রেখো। এতো এতো কাহিনীতে তোমার মেয়ে বাঁচতে পারবে না। হাজার শান্ত থাকুক। এতো ধাক্কা হজম করার মতো শক্তি তোমার মেয়ের নেই।

জাফর সিধেসাদা মানুষ। এত প্যাঁচ বোঝেন কোথায়। যদি বুঝতো। তাহলে ঠিক বুঝে যেতো। চাচার সাথে সে শক্তিতে যাবে না, যাবে বুদ্ধিতে। আর বুদ্ধি দিয়েই তার ব্রেইন ওয়াশ চলছে। আর চলছে বলেই হতবাক হয়ে বসে রইলেন।

এরশাদ উঠল। উঠতে উঠতে বলল,– মিঠাপুকুরে’ই তোমার মেয়ে সবচেয়ে নিরাপদ চাচা। এখানে কোন কিছু ছোঁয়ার আগে এরশাদকে ছুঁতে হবে। ঢাকায় যাবে, কোথায় যাবে? পুলিশে না ধরলেও রাস্তায় রাস্তায় ঘুরবে। সেখানে এরশাদের চেয়েও আরো ভালো মানুষের হাতে পড়বে। তাই ভাবো চাচা, ভেবে দেখো। এরশাদের ধরণ খারাপ হতে পারে, তবে এতে তোমার মেয়ের কোন খারাপ নেই। সব কিছু’ই শুরুটা একটু এলোমেলো হয়। তবে শেষটা সব সময়’ই সুন্দর। শুধু একটু সময় দরকার। আর আমি সেই সময়টুকু চাই। বলেই বেরিয়ে গেলো।

অনুমতি চাইল, না শুধু জানিয়ে গেলো জাফর বুঝতে পারলো না। তবে আগের মতোই বসে রইল। কি করবে, কিছুই তার মাথায় এলো না। তবে এরশাদের কথা ফেলেও দিতে পারলো না। এখানে সে আর এরশাদ ছিলো বলে সব সুন্দর মতো হয়েছে। তা না হলে একা একটা মেয়ে কোথাও সম্মান নিয়ে টিকতে পারে? আর এখন ঢাকায় তো আরো পারবে না। তালাক প্রাপ্ত মেয়ে, তার মধ্যে স্বামী হয়েছে খুন। খুনের পরে লাপাতা। সেই মেয়ে হঠাৎ উদয় হলে, কে ভালো চোখে দেখবে। চরিত্রের উপরেও আঙুল উঠাতেও দু’বার ভাববে না। তাছাড়া ঢাকায় যাবেটা কোথায়, থাকবে কোথায়? মেয়েদের জন্য যে এই দুনিয়া বড়’ই কঠিন।

জাফর রাতে আর খেতে নামেনি। আয়না একবার উঁকি দিয়ে আস্তে করে জিজ্ঞেস করলো। জাফরও আস্তে করে বললো, ” আজ খাবো না রে মা। তোমরা খেয়ে শুয়ে পড়ো”

আয়না আর ভেতরে যায়নি। বাড়িটা পুরো থমকে আছে। এরশাদ ভাই বেরিয়ে গেছেন তখনি।। শয়তান বুড়িও খেলো আজ নিজের ঘরে। আয়না নিজেই সব এগিয়ে গুছিয়ে দিলো। এই যে দিলো, কেন দিলো? একবার জিজ্ঞেসও করলো না। নিজের মতো খেলো। খেয়ে আরামে কিছুক্ষণ পান চিবুলো। আয়না ততোক্ষণে সাদা সোনালি অল্প কয়টা চুলে একটা বেনি তুলে দিলো। দিতেই বাথরুমের কাজ টাজ সেরে নিজের মতো শুতে গেলো। অথচ তার যাবতীয় কাজ আম্বিয়াবু করে।

আম্বিয়াবুও আর রুম থেকে আর বের হয়নি । আয়না গিয়েছিলো ডাকতে। বললো শরীর ভালো না। আয়না আর কি করবে, নিজের মতোই সব গোজগাছ করলো। বাড়ির প্রতিটা জানালা লাগালো। কাজের লোক নিয়ে ছাদের কাপড় তুললো। এতো ঝামেলায় আজকে বাড়ির বসার ঘর ছাড়া কোন জায়গায় সন্ধ্যার বাতি দেওয়া হয়নি। সব বাতি জালালো।

জ্বালিয়ে’ই দাদির সব কাজ করলো। করে নিজেই খাবার বাড়লো। খেতে এলো শুধু শাহবাজ, আর বীণা। বীণাকে দেখে আয়না স্বস্তি পেলো। যাক এ বেলা আর জ্বালিয়ে মারবে না। তবে স্বস্থির বারোটা বাজিয়ে শাহবাজ নিজের মতোই বললো, — কি হলো। হাত পা গুটিয়ে বসে আছো কেন? খাওয়াবে কে? নাকি একদিনেই স্বামীর সেবা করে হয়রান।

আয়না কি বলবে ভেবে পেলো না, তবে বীণার দিকে একবার তাকালো। তার এতো লজ্জা লাগলো। অবশ্য বীণা নিজের মতো খাচ্ছে। তবুও! সে মুখ গোঁজ করেই একটু শাহবাজের দিকে চেপে বসলো। বসে প্লেট তুলে নিলো। যত কথা বলবে, ততো লজ্জায় পড়তে হবে। তার চেয়ে ভালো চুপচাপ খাইয়ে দেওয়া।

অবশ্য চুপচাপ চাইলে’ই বুঝি চুপচাপ হয়। এক লোকমা মুখে পুরে আয়না বসে আছে তো আছেই। আরেক লোকমা নেওয়ার আর খবর নেই। ভাতকে চিবিয়ে মনে হয়, মুখেই হজম করে ফেলবে। দেখতো! এভাবে ভাতে হাত ডুবিয়ে বসে থাকতে কার ভালো লাগে?

আয়নার ভালো লাগুক আর না লাগুন, তাতে শাহবাজের কি? সে বেশ সময় নিয়ে দ্বিতীয় লোকমা নিলো। আয়নার মনে হলো তার বাকি জীবন এই ভাতের প্লেট নিয়েই কেটে যাবে। ততক্ষণে বীণার খাওয়া শেষ। তার খাবার এমনিতেই অল্প। তার মধ্যে নতুন ভাবি, আর ভাই তাই একটু তাড়াতাড়ি’ই খেলো। খেয়ে বললো, — কিছু করতে হবে ভাবি?

আয়না দু’পাশে মাথা নাড়লো। এই বাড়ির অর্ধেক কাজটাজ কাজের লোক’ই করে। বান্ধা কাজের লোক। রাতে অবশ্যই ভেতর বাড়িতে থাকে না। তাদের পেছনে আলাদা ঘর তুলে দেওয়া হয়েছে। থাকার মধ্যে শুধু আম্বিয়া বুবু থাকে। সে’ই বাকি কাজটাজ করে। আজ আম্বিয়া বদলে সে করে ফেলেছে।

বীণা আর দাঁড়ালো না, নিজের মতো চলে গেলো। যেতেই আয়না তৃতীয় লোকমা তুলে দিলো, বলতে গেলে জোর করে ঠেলে’ই ঢুকিয়ে দিলো। তার ইচ্ছে করছে এই প্লেট দিয়েই এই শয়তানটার মাথায় এক বাড়ি মারতে। সেইটা আর কি সম্ভব, তাই জোর করে ঠেলে, আপন মনেই বড় একটা শ্বাস ফেললো।

ফেলতেই শাহবাজ বললো, — মুখে কামড় লাগলো কেন?

আয়না বিরক্তের চরম পর্যায় আছে। তবুও নিজেকে ঠান্ডা রেখে আস্তেই বললো, — আপনার মুখে কামড় লাগলো না কাটা লাগলো। আমি বলবো কেমনে? ভাতের প্লেটে হাত ডুবাইয়া বসে আছি।

— ওরে বাবা! মেজাজ?

— কোথায় মেজাজ? কিছু বললেই দোষ।

— দোষ মানে? বসে বসে মনের ভেতরে আমার গোষ্ঠী উদ্ধার করছো। তাই তো কামড়টা লাগলো। এখন আবার চাপা চালাচ্ছো।

— বাজে বকবেন নাতো, নিন তাড়াতাড়ি খাওয়া শেষ করেন।

— যদি না করি।

আয়না হাল ছাড়লো! ছেড়ে আরেক লোকমা উঠালো। এবার অবশ্য আয়নার ঠেলে দিতে হলো না। শাহবাজ নিজে থেকেই এগিয়ে নিলো। আর বেশ কয়দা করেই নিলো।

আর নিতেই আয়না ঝট করে দাঁড়িয়ে গেলো।শাহবাজ ঠোঁট টিপে হাসলো! হেসে ঝেড়ে বললো, — হয়েছে কি?

— কিছু না।

— তাহলে তাল গাছের মতো সামনে দাঁড়িয়ে গেছো কেন?

— আমি আপনাকে খাওয়াতে পারবো না।

— তাহলে কে খাওয়াবে?

— আমি জানি না। বলেই প্লেট সামনে রাখলো। রেখে অন্য সাইডে চলে গেলো। হাত ধুলো। সে নিজেও খায়নি। তবুও সব গোছগোছ করতে লাগলো।

শাহবাজ পানির গ্লাস এগিয়ে নিলো। নিয়ে খেতে খেতে বললো, — উরের ভাত স্বামীর মুখে দাও না। পরে আবার কাহিনী শুনবা, স্বামী ভাগিদার নিয়ে আইছে।

— আনলে আনেন! তবুও আমি পারুম না। খেতে ইচ্ছে করলে হাত দিয়ে খান।

— স্বামীর মুখের উপরে, না। বউয়ের আমার ভালোই উন্নতি হয়ছে। চাপা সামলে রেখো।

— পারেন কি আর?

শাহবাজ হাসলো। হেসে বলল — কি পারি দেখাতেই তো চাইছিলাম। তার আগেই ঝট করে তাল গাছের মতো দাঁড়িয়ে গেলে।

আয়না উত্তর দিলো না। মুখ গোঁজ করলো। আয়না অবশ্য জানে না। এই গোঁজ মুখটাই শাহবাজকে টানে। তাই তো হেসে বললো, — গোছাচ্ছো কেন? ভাত খাবে না?

— না।

— কেন?

— এমনিই।

— নাকি গামলা ভরে ভাত খাও সেটা দেখাতে চাইছো না?

আয়নার নিজের মাথা নিজের ফাটাতে ইচ্ছে করলো। গামলা ভরে খাই, বালতি ভরে খাই তোর কি রে শয়তান। এখন ঘাড় থেকে নাম, নেমে শান্তি দে। সারাদির মন্দিরের ঘন্টার মতো মাথার উপরে ঢং ঢং করে বেজেছে। আর কত? আল্লাহ ধৈর্য্য দাও।

শাহবাজ আয়নার চোখে মুখে বিরক্তি নিয়ে অসহায় মুখটাও দেখলো। দেখে আগের মতোই বললো, — ভাত খাও।

— আমি খাবো না।

— না খেলে এখান থেকে নড়তে পারবে না।

আয়নার বিরক্তি আর চেপে রাখতে পারলো না। কিছুটা ঝাজিয়ে বললো — এতো জ্বালিয়ে মারেন কেন? কোন বাড়া ভাতে ছাই দিয়েছি আপনার?

— বাড়া ভাতে ছাই দাওনি ঠিক আছে, তবে পানি তো ঠিকিই দিয়েছো। ঐ যে দেখো প্রমাণ সামনে।

— কিসের প্রমাণ, আর পানি দিলাম কখন?

— এই যে মুখের সামনে ঠাস করে রেখে চলে গেছো। এটা পানি ঢালার চেয়ে কম নাকি?

আয়না আগের মতোই মুখ গোঁজ করে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। ভাত না খেয়ে এই শয়তান এখান থেকে নড়বে না। বরং আরামছে তার মাথা চিবিয়ে চিবিয়ে খাবে। তাই গোঁজ মুখে আবার এগিয়ে গেলো। ফট করে যেমন দাঁড়িয়ে গিয়েছিল তেমনি কিছুটা ঠাস করেই বসলো। বসে প্লেট হাতে তুলে নিলো। নিয়ে শাহবাজ কিছু বলার আগেই মুখের চেয়েও বড় এক লোকমা ঠেলে মুখে পুরে দিলো। দিয়ে মনে মনে বললো, — নে কত খাবি খা। আমার জান, শান্তি খেয়ে তো মন ভরে না। এই ভাত খেয়ে অন্তত কলিজাটা ঠান্ডা হোক।

শাহবাজ ঘাড় কাত করে তাকালো। আয়না দেখেও দেখলো না। বরং আরেক লোকমা বানালো। বানিয়ে দেবে তখনি শাহবাজ হাত ধরে ফেললো। ভালো ভাবেই ধরলো।

আয়না অবশ্য কিছু বললো না। সে ভেবেছে মুখে ভাত, কথা বলার অবস্থা তো সে রাখেনি। তাই হয়ত হাত ধরে থামিয়েছে। কিন্তু সে কিছু বোঝার আগে’ই শাহবাজ দিলো এক টান।

আয়না এমনিই বসে ছিলো, শরীর ছেড়ে। তার মধ্যে ছোট খাটো মানুষ। এক টানেই শাহবাজের উপরে চলে গেলো। হাতের ভাতের প্লেট উলটে শাহবাজের উপড়ে পড়লো। শরীর, প্লাস্টার, মাদুর সব মাখামাখি।

আয়না মাগো বলে চিৎকার দিতে’ই যাচ্ছিলো। কিন্তু আগেই তার চিৎকার গলায় আটকে গেলো। শুধু কি চিৎকার। ভাত তরকারি সব তার মুখে। কিভাবে এলো। সেটা ভাবতেই তার শরীর ঠান্ডা হয়ে এলো।

শাহবাজ হাসলো! হেসে মুখের কাছে মুখ রেখেই বললো, — আরো খাবে বউ? আমি তোমার মতো এতো নিষ্ঠুর নাগো। খাইলে বলো, হাত নেই তো কি হইছে। আরো কত ব্যবস্থা আছে? আর বিশ্বাস করো, আমি তোমার মতো ঢেলে ধাক্কিয়ে খাওয়াবো না। খুব আদর, সোহাগে খাওয়াবো।

আয়না উত্তর দিলো না। তার বমি আসছে। একবার তো ওয়াক’ই করে ফেললো। আর ফেলতেই মুখে হাত চেপে এক দৌড় দিলো। আর শাহবাজ হো হো করে হাসলো। নিস্তব্ধতার চাদরে মোড়ানো সারেং বাড়িটার দেয়ালে দেয়ালে সেই হাসিটা ঝংকার তুলে ফেললো।

চলবে ….

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here