ধূপছায়া #নূপুর_ইসলাম #পর্ব_৩৬

0
2

#ধূপছায়া
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব_৩৬

আলাউদ্দিনের দোয়ার আয়োজন শুরু হলো ভোর রাত থেকে। বেলা বাড়লো তার সাথে বাবুর্চিদের ডেগচির বাড়ি, কথা, আয়োজন, হাসি, খাবারের ঘ্রাণ সব কিছুতে সারেং বাড়ির উঠান মুখোরিত হয়ে রইল।

দোয়া পড়ানো হবে যোহরের নামাজের পরে। দোয়ার পরেই খাওয়ার আয়োজন। পুরো গ্রামের মানুষের দাওয়াত। তাই মহিলা, পুরুষদের বসার জায়গা করা হয়েছে ভিন্ন।

এমন আয়োজনে বলতে গেলে সারেং বাড়িন তিন পুরুষ’ই ব্যস্ত থাকার কথা। তবে দু’জন মহাব্যস্ত হলেও জাফর রইল কালকের মতোই। না রুম থেকে বের হলো, না সকালের নাস্তা করলো। না করার অবশ্য কারণ আছে। সকালে ঘুম থেকে উঠেই ইমরানকে ডেকেছিল সে। মেয়েটার খবর জানা দরকার। সামনে দাঁড়াবে সেই মুখ কোথায়? তাই কাজের লোক পাঠিয়ে ইমরানকে ডেকে আনলো।

আর আনতেই তার ভেতরের অস্থিরতা বেড়ে চারগুণ হলো। মেয়েটা কাল থেকে না খাওয়া। হাসপাতালে সে নিজে নাস্তার কথা বলেছিল। বলল বাসায় ফিরে খাবে। বাসায় ফিরে নাকি শুধু একগ্লাস পানি খেয়েছে। খেয়ে গোছগাছ করতে করতে বলেছে স্টেশন থেকে কিছু কিনে ট্রেনে খেয়ে নেবে।

আর স্টেশন! তারপর যা হলো। সেই থেকে মেয়েটা একেবারে না খাওয়া। ইমরান, সাবিহা বলছে তবে সে আছে একেবারে চুপচাপ শান্ত। না খেয়েছে, না তেমন কথা বলছে। শুধু নাকি পত্রিকার কথা বলেছে। পত্রিকা গত কয়েকদিন তার কাছেও আসছে না। একজন লোক ঠিক করা। সদর থেকে সেই কিছু কিছু জায়গায় পৌঁছে দেয়। তবে তার নাকি শরীর ভালো না। কিছুদিন আসতেও পারবে না।

এমন প্রায়’ই হয়। গ্রামের নিম্নবিত্ত মানুষ। সুযোগ পেলেই শুরু করে ফাঁকিবাজ। দেখা গেলো হালকা জ্বর এসেছে। খবর পাঠিয়ে বলবে, দুনিয়ার জ্বর, মাথা দাঁড় করাতে পারছে না, তাই আসতেও পারবে না। জাফর মাথাও ঘামায়নি। এখনও যে ঘামালো তেমন না, তবে ইমরান কে বলল, — সদর থেকে আনিয়ে দিচ্ছি।

ইমরান কোন উত্তর করেনি। সে নিজেই সদর থেকে আনতে পারে। পৃথিলাকে আটকানো হয়েছে তাদের তো না। তাদের আটকানো হয়েছে হুমকিতে। তাই জাফর চাচা না জানলেও, ইমরান ভালো করেই জানে পত্রিকা কেন আসছে না। আর আসবেও না, যেই পর্যন্ত এরশাদ ভাই না চাইবে।

ইমরান চলে গেছে। জাফর আগের মতোই পড়ে রইল। সব কিছু থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে অনেক আগেই। ঘর থেকে বলতে গেলে তেমন বের’ই হন না। তাই কি করা উচিত, কাকে ভরসা করা উচিত, তার মাথায় আসছে না। কেননা তার চোখ, কান, মুখ সব ছিল এরশাদ। তার চোখেই তো ঘরে বসে বসে মিঠাপুকুর দেখতো। অথচ এই ছেলেটাই কি সুন্দর করে চোখ বন্ধ করে ফেললো। আর এখন সে অন্ধকার ছাড়া কিছুই দেখতে পারছেন না। হাতড়ে হাতড়ে কোন দিবে যাবে সেটাও বুঝতে পারে না।

তখনি বীণা উঁকি দিলো। এরশাদ ভাইয়ের কীর্তি বীণা শুনেছে। তার ভাইদের একেক কীর্তি দেখে দেখেই সে বড় হয়েছে। তাই এই কীর্তি তাকে অবাক করেনি। তবে বড় ভাই কাউকে পছন্দ করে এটা জেনে যেমন ভালো লাগছে তেমনি পৃথিলা আপার জন্য খারাপও লাগছে। অন্তত নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধে কিছু হলে কেমন লাগে এখন সে জানে। তাই তার ঝামেলা একটু শেষ হলেই আপার সাথে দেখা করতে যাবে। অবশ্য এখন আর আগের মতো কথা বলবে কি না, জানে না। কেননা হাজার হলেও শত্রু পক্ষের সাইডে পড়ে গেছে। তবুও যাবে। পৃথিলা আপার কাছে যেতে, কথা বলতে তার ভালো লাগে। কেমন আদর মাখা কণ্ঠে সব বুঝিয়ে বলে। আর যখন বলে সমস্যা গুলোকে আর সমস্যা মনে হয় না।

বীণা উঁকি দিয়েই অবাক হলো। ছোট চাচা রুম থেকে বের না হলেও, খুব ভোরে উঠেন। সারেং বাড়িতে প্রথম জানালার কপাট টা হয়তো এই রুমেরটাই খুলে। তবে আজ চাচা বিছানা ছাড়েন নি। বাসি কাপড় এখনো গায়ে। পর্দা জানালা সব বন্ধ। সকালের আধো আলো আধো ছায়া রুমে বিরাজ করছে। বিরাজ করলেও রুম জুড়ে গুমোট একটা ভাব।

বীণা নির্দ্বিধায় এগিয়ে গেলো। এই বাড়ির প্রতিটা কোণায় সে নিজের মতোই ঘুরতে পারে। কোন বারণ নেই, নিষেধাজ্ঞা নেই। অথচ জীবনের সবচেয়ে বড় বিষয়েই একেকজন নিষেধাজ্ঞার শক্ত দেয়াল তুলে বসে আছে।

বীণা এগিয়ে প্রথমে পর্দা সরালো, জানালা খুললো। খুলতেই জাফর চোখে হাত রাখলো। বীণা তাকিয়ে দেখলো। তার নিজের চিন্তায় সারা রাত ঘুমোতে পারে নি। আজকে দুপুরে আজিজ চাচা তার পুরো পরিবার নিয়ে আসবে। তাই অস্থির লাগছে। সেই অস্থির নিয়ে উঠানে পা রাখতেই আবার দেখলো ফরহাদ ভাই কে। তার আসা এমন কিছু না। ভাইয়ের সব কিছুতেই ফরহাদ ভাই থাকে। তাই এই অনুষ্ঠানে থাকবে না, এমন আশা করা বোকামি। তবুও তার কেমন জানি লাগলো। তাই তো যেমন টুপ করে বাইরে গিয়েছিল তেমনি তার অগোচরে টুপ করেই আবার চলে এসেছে।

এসে আর নিজের রুমে যায়নি। নিজের রুমে গেলে তার আরো অস্থির লাগছে। দাদি একগাদা গহনা আর শাড়ি স্তুপ করে রেখেছে। গায়ের রং শ্যামলা, তাই কোনটা ভালো মানাবে তা তো জানে না। তাই সব বের করে ফেলেছে। গায়ে দিয়ে দিয়ে দেখতে বলেছে।

সে ছুঁয়েও দেখেনি। কালো জেনে, দেখেই তো নিচ্ছে। তো কোন দরকার এতো সুন্দর হওয়ার। তবে আম্বিয়াবুর কোন কারণে মেজাজ খুব খারাপ। তাই তাকে তো আর কিছু বলতে পারছে না। অকারণে কাজের লোকদের একচোট ঝাড়লো। বীণা দেখেও দেখিনি। নিজের মতো ছোট চাচার রুমে চলে এসেছে। ছোট চাচার সাথে কথা বলতে তার ভালো লাগে। বলার মতো তো আর মানুষ নেই। একমাত্র ছোট চাচাই সব কিছু মনোযোগ দিয়ে শুনেন। বুঝতে চেষ্টা করেন।

তবে আজ চাচার কোন কিছুই তার ঠিক মনে হলো না। কিছু কি হয়েছে? চাচা ভাতিজার দ্বন্দের কারণ তার জানার কথা না। জানলোও না, তবে বুঝতে পারলো বড় কিছু একটা হয়েছে। তা না হলে এমন ভেঙে পড়তো না।

তাই বীণা এগিয়ে এলো। এসে কোমল সুরে বললো,, — তোমার শরীর খারাপ ছোট চাচা?

জাফর চোখের উপর থেকে হাত সরালেন। মলিন মুখ তবুও একটু হাসলেন। হেসে আস্তে করে দু’পাশে মাথা নাড়লেন।

— তাহলে উঠছো না কেন?

— ভালো লাগছে না মা।

বীণা সাথে সাথে কপালে হাত রাখলো। না জ্বর নেই। হাত সরিয়েই বললো, — কিছু খেয়েছো?

জাফর আগের মতোই মাথা নাড়লো। বীণা অবাক হয়েই বললো, — কতো বেলা হয়ে গেছে। কাল রাতেও তো খাওনি। ওঠো, তাড়াতাড়ি ওঠো। বলে’ই হাত ধরে বীণা টানলো।

জাফর আগের মতোই হাসলো। হেসে আস্তে করে উঠে বসলো। বসতে’ই বীণা বললো, — কিছু কি হয়েছে ছোট চাচা?

জাফর বড় একটা শ্বাস ফেললো! ফেলে বললো, — নারে মা, কি হবে।

— তাহলে তোমার মন খারাপ কেন?

জাফর উত্তর দিলো না। বীণা দেখলো। তবে আর কিছু জিজ্ঞেস করলো না। তবে তাড়া দিয়ে বললো, — ওঠো তো! তাড়াতাড়ি ওঠো। ওঠো হাত মুখ ধুয়ে নাও। আমি খাবার এখানেই নিয়ে আসছি। বলেই বীনা বেরোতে গেলো।

জাফর হাত ধরে ফেরালো। ফিরিয়ে টেনে কাছে বসালো। বসিয়ে মাথায় হাত রেখে বললো, — জীবনে অনেক বড় হও মা।

বীণার চোখে পানি চলে এলো। জাফর আগের মতোই মলিন মুখে হেসে বললো, — বাবাদের অনেক সমস্যা থাকতে পারে। তবে এক সন্তানের কষ্টে, আরেক সন্তানকে কখনও অবহেলা করে না। চিন্তা করো না, আমি আজিজ ভাইয়ের সাথে কথা বলবো।

আরেক সন্তান বলতে কাকে বুঝিয়েছে বীণা খেয়াল করলো না। তবে চোখে পানি নিয়েই হাসলো। হেসে বললো, — তার আগে খেয়ে টেয়ে সুস্থ তো থাকো। না থাকলে সন্তানের জন্য যুদ্ধ করবে কি করে? ওঠতো!

জাফর উঠল! উঠতে উঠতে বললো, — মেয়েটা না খেয়ে আছে। একটু কি দেখবি মা।

বীণা বুঝতে পারলো না। ভ্রু কুঁচকে বললো, — কোন মেয়েটা?

— পৃথিলা।

বীণা অবাক হলো! পৃথিলা আপার প্রতি জাফর চাচা যেন একটু বেশি’ই অন্যরকম। সেইদিন জ্বর, হাসপাতাল, এখন, এই যে এতো চিন্তা, এতো মলিনতা। সব কি পৃথিলা আপার জন্য?

বীণা মনে খটটা লাগে। তবে বুঝতে দেয় না। আগের মতোই হেসে বলে। আমি দেখছি চাচা, তুমি চিন্তা করো নাতো।

জাফর বেরিয়ে হাত মুখ ধুতে গেলো। বীণা বালিশ জায়গা মতো রাখলো। চাদর ঠিক করলো। করে খাবারের জন্য নিচে যেতেই দেখলো, ছোট ভাই সিঁড়ির ওখানে দাঁড়িয়ে। হাতের প্লাস্টারের অবস্থা কাহিল। ময়লা হলে এক কথা, এই রকম হলুদ হলো কি করে? তাই এগিয়ে বললো, — প্লাস্টারে কি হয়েছে ছোট ভাই ?

শাহবাজ একবার প্লাস্টারের দিকে তাকালো। তাকিয়ে হাসলো। হেসে বললো, — প্লাস্টার মনে রং লেগেছে।

— কিসের রং?

— কালনাগিনীর রং।

বীণা চোখে মুখে বিস্ময় নিয়েই বললো, — কিসের রং?

শাহবাজ কটমটিয়ে তাকায়! বীণা আগা মাথা কিছুই বুঝলো না। কাল রাতে খাবারের আগেও তো ঠিক দেখলো। এর মধ্যে কি করেছে কে জানে। সে কথা বাড়ালো না। ছোট চাচাকে খাবার দিয়ে এক্ষুনি একবার পৃথিলা আপার কাছে যাবে। তাই এগুতে চাইলো! আর তখনি শাহবাজ বললো, — একটা কাজ করতে পারবি ?

বীণা দাঁড়ালো! দাঁড়িয়ে স্বাভাবিক ভাবেই বললো, — হ্যাঁ বলো।

একটা কাগজ বাড়িয়ে বললো, — এটা তোদের পৃথিলা ম্যাডামের কাছে দিবি। একদম চুপিচুপি।

বীণা দেখলো! দেখে জিজ্ঞাসা দৃষ্টিতে তাকালো। শাহবাজ তার মতোই বললো, — আমি বা অন্য কেউ গেলে ভাইয়ের সন্দেহ হবে। তোর উপরে হবে না।

— কিসের কাগজ?

— সেটা জেনে তোর কাজ কি? দিবি কিনা বল। তা না হলে আমি অন্য রাস্তা দেখছি।

বীণা হাত বাড়িয়ে নিলো। নিতে নিতে বললো, — ভাবিকে নিয়ে যাই?

শাহবাজ আর দাঁড়ালো না। নামাজের সময় হচ্ছে। গোসল করবে । কালনাগিনীকে সকাল থেকে একবারও দেখেনি। কোন কোণায় গিয়ে ফুসফুস করছে, কে জানে। তাই যেতে যেতে একটা শব্দ’ই বললো, — না।

বীণা কিছু বললো না, তবে আড়াল থেকে আয়না ঠিক মুখ বাঁকালো। বাঁকিয়ে বিরবির করে বললো, হতোচ্ছাড়া শয়তান। এক্ষুনি জান খাওয়ার জন্য ঠিক ডেকে উঠবে।

চারিদিক থেকে যোহরের আজান ভেসে আসছে। পৃথিলা শুনলো, শুনে কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়ালো। তারপর কল চেপে চোখে মুখে, মাথায় পানির দিলো। সেই দিনের বৃষ্টির পরে আর বৃষ্টির দেখা মিলেনি। উজ্জল নীল আকাশ। সাথে শুভ্র সাদা পেঁজা তুলোর মতো মেঘ, রং তুলিতে আঁকা ছবির মতো ভেসে আছে। এই ভেসে যাওয়া চোখের সৌন্দর্য বাড়ায় তবে বৃষ্টি ঝড়ায় না। ঝড়ায় না বলেই গরমে হাসফাস শুরু হয়।

পৃথিলা চোখে মুখে পানি দিয়ে কল পাড় থেকে বের হতেই দেখলো সাবিহা মলিন মুখে তাকিয়ে আছে। পৃথিলা দেখলো! দেখে বললো, — দিনরাত মুখ যদি এমন করে রাখিস। অপরাধ বোধে আমি আরো আগে মরে যাবো। আমার জন্য তোদের স্বাভাবিক জীবনে ব্যাঘাত ঘটছে।

— তাহলে খাচ্ছিস না কেন? তুই না খেলে আমাদের গলা দিয়ে খাবার নামে?

পৃথিলা উত্তর দিলো না। উঠান থেকে গামছাটা টেনে বারান্দায় পেতে রাখা কাঠের টুলটার উপরে বসলো। তার শরীর কিছুটা কাঁপচ্ছে। না খাওয়া, জ্বরের রেশ কাটেনি। তার মধ্যে সারা রাত দু’চোখের পাতা এক করেনি। এক হলো ফজরের আযানের একটু আগে। আর হতেই আজব একটা স্বপ্ন দেখলো। সে আর আলাউদ্দিন ফকির একটা গাছের নিচে বসে আছে। সেই দিনের ছেলেটা তাদের সামনে ধূলো বালি মাখিয়ে হুটোপুঁটি খাচ্ছে। সেই ধূলো বালি মাঝে দেখলো এরশাদ এগিয়ে আসছে। গায়ে কালো শার্ট, হাতের মুঠোয় সব সময়ের মতো সিগারেট। কালো শার্ট, শ্যামলা গায়ের রং, তার মধ্যে পোড়া। স্বপ্নে এতো ভয়ংকর লাগলো।

আলাউদ্দিন ফকির তার মুখ দেখে হাসলেন। হেসে কিছু একটা বললেন। কি বললেন, পৃথিলা বুঝতে পারলো না। তবে তখনই ঘুম ভাঙলো। ভাঙতেই তার অস্থির লাগা শুরু হলো। সেই অস্থির এখনো বুক থেকে নামছে না। তাই চোখে মুখে মাথায় একটু পানি দিলো। যদি ভালো লাগে।

তাই গামছা দিয়ে মুখটা আঁলতো চাপে মুছতে মুছতে বললো, — যখন কিছুই আর করার থাকে না, তখন মানুষ নিজেকে শাস্তি দেয়। মনে কর আমিও দিচ্ছি।

— মরে যাবি পৃথিলা। অন্তত নিজের প্রতি রহম কর।

— মানুষ এতো সহজে মরে নারে। আর আমি তো আরো মরবো না। মুক্তি আমার এতো সহজে হবে না।

তখনই দেখলো সারেং বাড়ির গলি দিয়ে দু’জন এগিয়ে আসছে। তাদের হাতে কি পৃথিলার বুঝতে বাকি রইল না। আর সেই বোঝার মাঝেই দেখলো তাদের পেছনে এরশাদ আসছে। আসবে সেটাতো পৃথিলা জানেই। তবে সে কিছুটা চমকালো, অবশ্য কারণ আছে। এরশাদের গায়ে কালো শার্ট, হাতের মুঠোয় সিগারেট। আসার ভঙিটাও যেন স্বপ্নের সাথে হুবুহু মিল।

পৃথিলা সাথে সাথে’ই নিজেকে সামলে নিলো। এই লোক সব সময়’ই এমন। এমন ভাবেই চলাফেরা করে। তাই মস্তিষ্ক স্বপ্নে এমন ভাবেই সব মিলিয়ে চড়িয়ে উপস্থাপন করেছে। আর কিছু না। আর কিছু না হলেও, পৃথিলা মনে মনে স্বপ্নটা মনে করার চেষ্টা করলো। শেষের কথাগুলো কি ছিল? সে মনে করতে পারে না। তাই আরো অস্থির লাগে। লাগতেই আস্তে করে মাথায় হাত দিয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলে।

আর ফেলতেই বুঝতে পারে এরশাদ তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। হাতে সিগারেট, আর সিগারেটের গন্ধে তার খালি পেট আরো মুড়িয়ে উঠলো।

অবশ্য তাকে দেখে বোঝার উপায় নেই। বরং স্বাভাবিক ভাবেই আবার সোজা হয়ে বসলো। গামছা ছড়িয়ে সুন্দর করে কোলের উপরে রাখলো। রেখে শান্ত চোখে এরশাদের দিকে তাকালো। এই দৃষ্টিতে কোন ভয় নেই, জড়তা নেই, সংকোচ নেই। না আছে কোন রকম দ্বিধা।

এরশাদ দেখে হালকা হাসলো! এই না হলে এরশাদের বাঘিনী। সে হেসে’ই সিগারেট পায়ে পিষলো। সিগারেট ছাড়া তার চলে না, আর এদিকে তার গন্ধ সহ্য হয় না। কত কিছু ছাড়তে হবে কে জানে?

মনের কথা মনে বলেই এরশাদ উঠান থেকে নিজেই একটা মোড়া এগিয়ে নিলো। নিয়ে বসতে বসতে সাবিহার উদ্দেশ্য বললো, — খাবার গুলো ভেতরে নাও সাবিহা। দাদি তোমাকে সকাল থেকে থাকতে বলেছিল। যাও নি কেন?

সাবিহা উত্তর দিলো না। তবে লোকগুলোর হাত থেকে খাবার নিলো। নিয়ে ভেতরে গেলো। তাদের সাধ্য আছে ছুঁড়ে ফেলার?

লোকগুলো চলে গেলো। যেতেই এরশাদ সব সময়ের মতো মার্জিত ভাবে বললো, — না খেয়ে আছেন কেন, পৃথিলা?

পৃথিলাও তার মতো স্বাভাবিক ভাবেই উত্তর দিলো, — আমার ইচ্ছে।

— ঠিক! তবে জেদ তো দেখাচ্ছেন আমাকে।

— ভুল! রাগ, জেদ, অভিমান মানুষ তার আপন জনদের দেখায়। আপনি আমার এমন কেউ নন।

— ঠিক! আসুন খাবেন।

পৃথিলা উত্তর দিলো না। চোখ ফিরিয়ে সামনের দিকে নিলো। এরশাদ সেই ফেরানো শুকনো মুখটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। কথা বলে স্বল্প তবে হাবভাবে অবহেলা, তিরস্কার, বিরক্তি ঠিক বুঝিয়ে দেয়। এই যে যেমন এখন দিলো।

এরশাদ ঠিক এই জিনিসগুলোই নিতে পারে না। না নেওয়ার কারণ আছে। এই পোড়া মুখ। নিজের মুখ দেখে কেউ ভয়ে থরথর করে কাঁপচ্ছে। চোখে মুখে ভয়, আতঙ্ক, তিরস্কার। এসব দেখতে দেখতে ভেতরে আগুনের মতো জ্বলে। প্রথম প্রথম কষ্ট পেতো, রাগ হতো, সবাই কে জ্বালিয়ে দিতে ইচ্ছে করতো। এখনোও হয়, তবে হজম করা শিখে গেছে। আর তাই তো এই যে ভয়ংকর মুখ। এই মুখটা এখন আর খারাপ লাগে না, বরং ভালো লাগে। ফরহাদ কতো বলেছে, চল ঢাকায় গিয়ে কিছু করি। তার ইচ্ছে’ই হয় নি। মানুষ যখন ভয় পায় তার ভালো লাগে। আসলেই লাগে।

তবে পৃথিলাম কথা ভিন্ন। সবাই তার দিকে তাকালেই প্রথমে পোড়ার সাইডটার দিকে তাকায়। আর পৃথিলা তাকায় চোখে। তাই আগের মতোই শান্ত ভাবে বললো, — আমাকে জোর করতে বাধ্য করবেন না পৃথিলা। বিশ্বাস করুন আপনার সাথে জোর করতে আপনার চেয়ে আমার’ই কষ্ট বেশি হবে ।

পৃথিলা হালকা হাসলো! তাচ্ছিল্যের হাসি। হেসে বললো, — আপনার যা খুশি করুন।

— বুঝে বলছেন তো?

পৃথিলা ফিরে তাকায়! আগের মতোই বলে, — আমি কোন সাহসী মেয়ে না। বলতে পারেন ভীতু’ই। এই যে শান্ত ভাবে হুমকি দিচ্ছেন। সবার মতো আমিও ভয় পাচ্ছি। তবে সত্য কি জানেন? পৃথিলাকে আপনি আটকাতে পারবেন, ভয় দেখাতে পারবেন। হয়তো আরো অনেক কিছুই করতে পারবেন তবে ভাঙতে পারবেন না। ভাঙার হলে তারেকের ধোকায় ভেঙে যেতাম। ভেঙে তার সাথে চুপচাপ সংসার করতাম। ভালোবাসার ক্ষেত্রেই ভাঙিনি। আর কি ভাঙবে আমায়?

— এরশাদ।

— চেষ্টা করে দেখুন।

এরশাদ আর কিছু বললো না। আবার পকেট থেকে সিগারেট বের করলো। করে ঠোঁটের ভাজে রাখতে রাখতে বললো, — খেয়ে নিন পৃথিলা। আপনার জন্য অনেকেই খেতে পারছে না। আর এবার অসুস্থ হলে, আমি কোলে করে হাসপাতালে নেবো না। সোজা সারেং বাড়ি নেবো।

পৃথিলার শান্ত মুখটা কঠিন হলো। সেই রাতে যে এমন কিছুই হয়েছিল, অনুমান করেছিল। তাই কিছু ভাবতে চায়নি, কারো কাছে কিছু জানতে চায়নি। তবে তাকে ঠিক জানিয়ে দেওয়া হলো। অবশ্য এটা জানানো না, এটাও হুমকি, ঠান্ডা মাথার হুমকি। কথা না শুনলে, তুলে নেওয়ার হুমকি।

এরশাদ পৃথিলার কঠিন মুখটা দেখলো! দেখে হেসে বললো, — আপনার বুদ্ধিতে আমি মুগ্ধ হই পৃথিলা। বার বার হই। তবে বুদ্ধির সাথে আপনার আবেগও বেশি। তাই বার বার ভুল করে বসেন। এই যে অযথা জেদ, এগুলোও ভুল।

পৃথিলা উঠে দাঁড়ালো! বসে বসে তর্কের মানে হয় না। এরশাদ সিগারেটে টান দিয়ে বললো, — আপনার এই অযথা ভুলের জন্য সাবিহারা বিপদে পড়বে।

পৃথিলা শুনলো। শুনে পাশ কেটে যেতে যেতে বললো, — সাবিহা, ইমরান, জুঁই। তারপর কি? বিশ্বাস করুন! তারা আছে বলেই পৃথিলা এখনোও আপনার সাথে স্বাভাবিক ভাবে কথা বলছে, চুপচাপ বসে আছে। তা না হলে মৃত্যুর ভয় পৃথিলার জীবন থেকে মিঠাপুকুরে পা রাখার আগেই মুছে গেছে।

চলবে……

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here