#মেঘমেদুর_দিনে
লেখনীতে: #মাশফিত্রা_মিমুই
[পর্ব:১৩]
মাঝারি আকারের একটি লাগেজ হাতে রাতের বেলা শিথিলদের গাজীপুরের বাড়িতে এসে হাজির হয়েছে স্বাধীন। হঠাৎ অসময়ে বন্ধুর আগমন যেন দুঃস্বপ্নেও কল্পনা করেনি শিথিল। তাই মুহূর্তেই সে অবাক হলো ভীষণ। বিস্ময়ে মুখ দিয়ে উচ্চারণ করতে পারলো না কোনো শব্দ। তাকে দেখে দরজার বাইরে দাঁড়িয়েই হাসলো স্বাধীন। হাত নাড়িয়ে মশা তাড়াতে তাড়াতে বললো,“বাইরেই দাঁড় করিয়ে রাখবি নাকি? চারিদিকে কি মশা রে, ভাই!”
শিথিল সরে দাঁড়িয়ে ভেতরে আসার জন্য জায়গা করে দিলো। লাগেজ টানতে টানতে প্রবেশ করল স্বাধীন। ঘামে নেয়ে পরনের শার্টটা হয়ে গিয়েছে স্যাঁতস্যাঁতে। হামিদুল হক হাত ধুয়ে এলেন। হাঁক ছেড়ে জিজ্ঞেস করলেন,“কার সাথে কথা বলিস? কে এসেছে?”
তখনি স্বাধীনকে দেখতে পেলেন। লম্বা সালাম দিয়ে হাস্যোজ্জ্বল মুখে স্বাধীন জিজ্ঞেস করল,“কেমন আছেন, আঙ্কেল?”
“আলহামদুলিল্লাহ ভালো। তুমি স্বাধীন না?”
দরজা আটকে এগিয়ে এলো শিথিল। বাবার উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করল,“তুমি ওকে চিনলে কীভাবে? আগে কখনো দেখা হয়েছে বলে তো মনে হয় না।”
“বলেছিলাম না, ও আমার ফেসবুক ফ্রেন্ড।”
স্বাধীন মাথা নাড়িয়ে সোফায় বসলো। শার্টের উপরের বোতাম দুটো খুলে সহজভাবে বললো,“আঙ্কেল বলেছিলেন, সময় সুযোগ পেলে যেন এখানে চলে আসি। আজকে সময় পেলাম তাই চলে এসেছি। ঠিক করেছি না, আঙ্কেল?”
হামিদুল হক প্রথমে অপ্রস্তুত হলেন। তারপর নিজেকে সামলে নিলেন। অমায়িক হেসে সোফায় বসতে বসতে বললেন,“একদম ঠিক করেছো। বাড়ি চিনতে কোনো অসুবিধে হয়নি তো?”
“তা একটু হয়েছিল। কমলাপুর রেলস্টেশনে গিয়েই পেয়ে গেলাম একটা ট্রেন। ট্রেন থেকে জাংশনে নেমে তো আর কিছু চিনি না। শিথিলকে কল দিলাম কিন্তু সেও কল ধরল না। এরপর মনে পড়ল আঙ্কেল তো একজন টিচার! সঙ্গে সঙ্গে রিক্সা নিয়ে কলেজের সামনে চলে এলাম। আশেপাশে জিজ্ঞেস করতেই এক লোক বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে গেলেন।”
শিথিল নিজের মোবাইল চেক করল। অগত্যা মিউট করা ছিল তার মোবাইল। হামিদুল হক আর কিছু জিজ্ঞেস করলেন না। স্বাধীন ছেলেটা বছর দুয়েক আগে নিজ থেকেই ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়ে ম্যাসেজ দিয়েছিল উনাকে। ছেলের সাথে গ্ৰুপ ফটোতে দেখে চেহারা চিনতে অসুবিধা হলো না হামিদুল হকের। তাই ছেলের পরিচিত ছিল বিধায় ম্যাসেজের রিপ্লাই দেন। এরপর থেকে ছেলের যত খোঁজ খবর স্বাধীনের থেকেই নেওয়া হয়।
স্বাধীনকে নিয়ে নিজের ঘরে এলো শিথিল। ছেলেটা ভীষণ ক্লান্ত। ঘরে এসেই দ্রুত পোশাক বদলে বিছানায় হাত-পা ছড়িয়ে আরাম করে শুয়ে পড়ল।শিথিল সন্দেহ ভরা দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে রইল। বললো,“বলা নেই কওয়া নেই হঠাৎ এখানে কী করতে এসেছিস? যা বলবি সত্য বলবি বলে দিলাম।”
মুখে বিরক্তি নেমে এলো স্বাধীনের। উঠে বসলো। দুই হাতে বিছানায় ভর দিয়ে বললো,“আর বলিস না। বাপের সাথে ঝামেলা হয়েছে।”
“ঝামেলা?”
“দাঁড়া ডিটেইলসে বলি। গতরাতে টাকা চেয়েছিলাম কিন্তু দেয়নি। তাই মাঝরাতে পকেট মেরেছিলাম। সেটা আবার জানতে পেরেছে আজ সকালে। তখন তো আমি বাসায় ছিলাম না। বিকেলে যেতেই শুরু করে দিলো ঝামেলা। ওদিকে উনার টাকা-পয়সার আবার অভাব নেই। কালো টাকা বলে ব্যাংকেও রাখতে পারে না। তো আমায় দিলে সমস্যা কোথায়? এসবের মালিক তো আমি আর নিশু, তাই না? এরপর এলো ফুফু। ফুফুকে আবার আমার মা একদম সহ্য করতে পারে না। ব্যস লেগে গেলো বাবা-মায়ের কথা কাটাকাটি। আমার ভাই এসব ঝামেলা ভালো লাগে না। আমি শান্তিপ্রিয় মানুষ। তাই তোর কাছে চলে এলাম। তুই ছাড়া আমার আছেটাই বা কে?”
শেষ কথাটা মুখ ভার করে বললো স্বাধীন। শিথিল প্রশ্ন করল,“কতদিন থাকার প্ল্যান?”
“যতদিন তুই থাকবি।”
“কাল বিকেলে সবাই মিলে ট্যুরে যাবো।”
“কোথায়?”
“সেন্টমার্টিন।”
“তু তো শ্লা মির জাফর নিকলা! ঘুরতে যাওয়ার প্ল্যান করেছিস অথচ আমাদের জানাসনি?”
“তোদের সাথে গত বছর সাজেক গিয়েছিলাম। এবার ভেবেছিলাম ফ্যামিলি ট্যুর দিবো। বর্তমানে ফ্যামিলির সবাই আমরা ব্যাচেলর কিনা!”
“তাহলে আমিও যাবো, আমিও ব্যাচেলর। হে হে।”
“কিছু খেয়েছিস নাকি নিয়ে আসবো?”
“আনলে তো ভালোই হয়। আসার পথে হোটেলে খেয়েছিলাম কিন্তু আবার খিদে পেয়ে গেছে।”
“নুডলস ছাড়া কিছু পারবো না কিন্তু।”
“ব্যাপার না, নুডলস আমার প্রিয়।”
শিথিল আর কিছু বললো না। তার বন্ধুরা অভিনয়ে ভীষণ পাকা। তা সে জানে। তার উপর স্বাধীনকে না করেও লাভ হবে না। এরপর সব ক্লান্তি ভুলে নুডলস খেয়ে ক্ষুধা নিবারণ করে ওই রাতের বেলাতেই স্বাধীন বসে পড়ল ঘুরতে গিয়ে কি কি করবে সেসব নিয়ে শলা পরামর্শ করতে। খানিক বাদে কাজ শেষ করে হারুন চাচা এসেও যোগ দিলেন তাদের সঙ্গে।
___________
সকাল নয়টা থেকে দুপুর বারোটা পর্যন্ত সময়টা শাহিনূরের নিরিবিলি শান্তিতেই কাটে। বাড়িতে তখন তিনি আর মিতা ছাড়া কেউ থাকে না। ছেলে-মেয়েদের দুষ্টুমি সহ্য করতে হয় না। তবে সকাল থেকে মাথাটা ভীষণ ধরেছে উনার। রাতে ঠিকমতো ঘুম হয়নি। তাই চায়ের কাপ হাতে সোফায় বসে আছেন তিনি। চা উনার প্রিয়। সর্বনিম্ন চার কাপ তো দিনে অন্তত লাগেই। তবে চা টাও এই মুহূর্তে বিষাদ ঠেকছে।
টিভিতে নাটক চলছে। নাটকটা মিতার প্রিয়। গতকাল রাতে কাজের ব্যস্ততায় দেখা হয়নি। তাই সকালের সব কাজ শেষ করে আজকে দেখে নিচ্ছে। দেখতে দেখতে বললো,“আপনার কী হ্যাডেচ, আন্টি?”
“হ্যাডেচ কী?”
“মাথা ব্যথা।”
“এসব ইংরেজি তুমি শিখেছো কোথায়, মিতা? কতদূর লেখাপড়া করেছো?”
মিতা লজ্জা পেলো। ওড়নার আঁচল কামড়ে মোচড়া মুচড়ি করতে করতে বললো,“শরমের কথা কীভাবে যে বলি?”
ভ্রু কুঁচকে নিলেন শাহিনূর। কণ্ঠস্বরে নমনীয়তা এনে বললেন,“লজ্জা কীসের? বলে ফেলো।”
“সেভেন পর্যন্ত, আন্টি। এরপর আর লেখাপড়া করা হয়নি। ফ্যামিলি প্রবলেমের কারণে।”
চমকান শাহিনূর,“তারপরেও এত শুদ্ধ ভাষা, সাথে আবার ইংরেজিও!”
“আমি পনেরো বছর বয়স থেকেই আম্মার সাথে বাড়ি বাড়ি কাজ করি। আগে যেই তিন বাসায় কাজ করেছি সেই বাসার ছেলে-মেয়েরা অনেক শিক্ষিত। তাদের থেকেই টুকটাক শেখা আরকি।”
“ওহ!”
এবার ব্যাপারটা ধরতে পারলেন শাহিনূর। এটাই তবে আসল কাহিনী! মিতা পুনরায় বললো,“মাথা টিপে দিবো, আন্টি? আমি আবার এসব খুব ভালো পারি।”
“দাও তবে।”
টিভিতে চোখ রেখেই উঠে গেলো মিতা।সোফার পেছনে দাঁড়িয়ে লেগে পড়ল কপাল মালিশের কাজে। আবেশে চোখ বুজলেন শাহিনূর। কিছু সময় অতিক্রম হতেই বুঝতে পারলেন বাঁচাল হলেও মেয়েটা ভীষণ কাজের।
বেলা এগারোটা বাজতেই কলিং বেল বেজে উঠল। মিতার হাতটা সরিয়ে দিলেন শাহিনূর। বললেন,“দেখো তো কে এসেছে? আগে লুকিং গ্লাসে দেখে নিবে। পরে গিয়ে দরজা খুলবে।”
আচ্ছা বলে দরজা খুলতে চলে গেলো মিতা। কয়েক মিনিট বাদে আবার ফিরেও এলো। চেঁচিয়ে বললো, “একটা বুড়ি দাঁড়িয়ে আছে, আন্টি। খুলবো?”
“বুড়ি?”
নিজেই এবার উঠে এলেন শাহিনূর। লুকিং গ্লাসে দেখে দ্রুত খুলে দিলেন দরজা। উৎফুল্ল হয়ে সালাম দিলেন, “আসসালাম আলাইকুম, মা।”
সাবেরা বিবি ভ্রু জোড়া কুঁচকে নিলেন। মেয়েকে সরিয়ে ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে বললেন,“সামনে থাইক্কা সর। এত দেরি লাগে ক্যান দরজা খুলতে? আমার পা দুইডা বিষ করতাছে।”
দ্রুত মায়ের হাত থেকে ব্যাগটা নিয়ে নিলেন শাহিনূর। মিতাকে ইশারা করলেন বাইরে থাকা বাকি ব্যাগগুলো নিয়ে আসার জন্য। সাবেরা বিবি সোফায় এসে বসলেন। মাথা থেকে কাপড় সরিয়ে শ্বাস ছাড়লেন। কি গরম বাইরে! শাহিনূর মায়ের জন্য নিজে গিয়ে ঠান্ডা পানি নিয়ে এলেন।হাতে ধরিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি যে আজ আসবে বললে না তো, মা? একা একা এসেছো?”
“সোহেল গেইট পর্যন্ত দিয়া গেছে। এরপর আজিজে সব ব্যাগ লইয়া দরজা পর্যন্ত রাইখা গেছে।”
“তা সোহেল ভেতরে এলো না কেনো? তুমি আসতে বলোনি?”
“বাদ দে ওইগুলার কথা। কোন মুখে আইবো? বাপে সেই মুখ রাখছে? দুই দুইডা ঢ্যামনা পোলা থাকতে মাইয়ার বাড়ি পইড়া থাকতে হয়। দেখবি ওর পোলাও ওর লগে এমন করবো। দুইদিনের চাঁন দুয়ারে দেহা যায়।”
শাহিনূর এ বিষয়ে কথা বাড়ালেন না। বছরের নয় মাস তিন মেয়ের বাড়িতে ভাগ বাটোয়ারা করে থাকেন সাবেরা বিবি। বাকি তিন মাস ঘুরে বেড়ান বিভিন্ন আত্মীয়-স্বজনদের বাড়ি। ছেলে অবশ্য দুইটা আছে তবে নিজের কাছে মাকে রাখতে তারা অপারগ। বৃদ্ধা মায়ের জন্য রোজ রোজ স্ত্রীর সাথে কে ঝগড়া করতে চায়?তাই জন্মদাত্রীকেই তারা পাঠিয়ে দিলো একেবারে বৃদ্ধাশ্রমে। এরপর খবর পেয়ে স্বামীর থেকে অনুমতি নিয়ে শাহিনূর গিয়েই ওখান থেকে মাকে নিয়ে আসেন নিজের কাছে। বোনদের নিয়ে বৈঠক বসান। এরপর থেকে বৃদ্ধা মেয়েদের উপরেই নির্ভরশীল।
মিতাকে দিয়ে মায়ের পছন্দের সব রান্নাবান্না করালেন শাহিনূর। দুপুরের দিকে এসে হাজির হলেন মোজাম্মেল হোসেন। ভদ্রলোক ডায়াবেটিসের রোগী। শুধু উনি একা নন। সাথে স্ত্রীও আছেন। তাই ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী তিনবেলা বাসায় এসেই খান।শাশুড়িকে দেখে বেজায় খুশি হলেন। মাকে হারিয়েছেন বহু বছর আগে। তাই শাশুড়িকে ভীষণ সম্মান করেন ভদ্রলোক। শাফিন এসেই দৌড়ে গিয়ে নানীকে জাপটে ধরে আহ্লাদী হয়ে উঠল। স্বতঃস্ফূর্ত কণ্ঠে ডাকল,“নানু!”
সাবেরা বানু হাসলেন। নাতির মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন,“নানাভাই, কেমন আছেন?”
“ভালো আছি। তুমি কেমন আছো?”
“আমিও বালা আছি। ইসকুল থাইক্কা আইছেন?”
“হ্যাঁ।”
“যান আগে গিয়া কাপড় চোপড় পাল্টান। গায় গোসল দিয়া তাপ্পরে খাইতে আহেন।”
একমাত্র নানীর কথাই বিনা বাক্যব্যয়ে শাফিন শোনে। তাই দৌড়ে চলে গেলো ঘরে। এবার সে ক্লাস থ্রিতে পড়ে। ইংলিশ মিডিয়ামে। মিতাকে টেবিলে খাবার বাড়ার নির্দেশ দিয়ে ছেলেকে গোসল করাতে গেলেন শাহিনূর। এই ছেলেকে একা একা গোসল করতে দেওয়া মানে জ্বর বাঁধানো। বাথরুমে ঢুকেই পানি নিয়ে খেলা করে সে। গত বছর শপিং মলে গিয়ে দুটো ছোটো ছোটো খেলনা হাঁস কিনে এনেছিল। সুইচ অন করে পানিতে ছেড়ে দিলেই প্যাক প্যাক করে সাঁতার কাটে সেই হাঁস। সেগুলো থেকে একটা নষ্ট হয়ে গিয়েছে। বাকি যেটা ঠিক আছে সেটা নিয়েই রোজ গোসলের নাম করে বাথরুমে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা খেলা করে শাফিন।
মাকে দেখে মুখ ভার হলো তার। গোল গোল চোখে তাকিয়ে অভিযোগের সুরে বললো,“আমি বড়ো হয়ে গেছি, আম্মু। আজ একা একা গোসল করবো।”
বাথটাবের কল বন্ধ করলেন শাহিনূর। ছেলেকে টেনে কৃত্রিম ঝর্নার নিচে দাঁড় করিয়ে ধমকের সুরে বললেন, “কত বড়ো হয়েছো তা তো দেখতেই পাচ্ছি। যেদিন খেলনা ছাড়া বাথরুমে ঢুকে ঠিকমতো গোসল করে দশ মিনিটের মধ্যে বের হতে পারবি সেদিন বুঝবো বড়ো হয়েছিস।”
“রাতুল একা একা গোসল করে। ওর আম্মু কখনো ওকে জোর করে গোসল করিয়ে দেয় না।”
“রাতুলের রোল এক। তোর কত?”
মাথা নত করে নিলো শাফিন। মিনমিনে স্বরে প্রত্যুত্তর করল,“নয়।”
“যেদিন এক নাম্বারে যেতে পারবি সেদিন রাতুলের সাথে নিজের তুলনা দিস।”
ঠোঁট উল্টালো শাফিন। তার কোনো যুক্তি আর খাটলো না। সব কথাতেই মা শুধু রোল নাম্বার আর পরীক্ষার রেজাল্ট টেনে আনে। যা তার একদম ভালো লাগে না।
বৃহস্পতিবারের দিনটি অন্যান্য দিনের চেয়ে একটু আলাদাই যেন। বিকেলের দিকে একে একে এসে হাজির হলো বাড়ির মেয়েরা। মিশমির সাথে তার নানীর সম্পর্ক একেবারে দুই সতীনের মতো। সারাক্ষণ এদের মধ্যে দুষ্টু মিষ্টি ঝগড়া লেগে থাকবে। সাবেরা বানু সঙ্গে করে অনেক কিছুই নিয়ে এসেছেন। যেমন ফলমূল, শাকসবজি, পিঠা, নাড়ু, খাজা ইত্যাদি। নাড়ু আর পিঠা মিশমির পছন্দ। অপরদিকে সুশ্রী নাড়ু খেলেও পিঠা খায় না। খাবার নিয়ে তার যত তালবাহানা।
নানীর হাত থেকে নাড়ুর বয়ামটা নিয়ে খেতে লাগলো মিশমি। তিন পদের নাড়ু আছে। নারিকেলের নাড়ু, তিলের নাড়ু আর গুড়ের নাড়ু। মিশমির সবচেয়ে বেশি পছন্দ নারিকেলের নাড়ু। তৃপ্তি করে খেতে খেতে বললো,“কি মজা! কার থেকে বানিয়ে এনেছো, বলো? তোমায় দিয়ে তো এসব সম্ভব নয়।”
সাবেরা বানু মুখ বাঁকালেন,“আমি তোর মতো অকর্মা নাকি? জামিলের বউরে লইয়া বানাইছি।”
“এই জন্যই তো তোমার মেয়ে রাঁধতে জানে না। একটা কথা জানো তো? মা যেমন হয় মেয়েও তেমনি হয়।”
“আমার নূরে রান্না পারে না? সব পারে। আমি নিজে ওরে শিখাইছি। তোর বাপেরে জিগা গিয়া। বিয়ার পর আমার নূরেই সবাইরে রান্না কইরা খাওয়াইছে।”
“তাইলে এহন পারে না ক্যান?”—নানীর মতো করেই বললো মিশমি।
“তোরা হওনের পর পেট লইয়া রানবো কেমনে? তহন থাইক্কা না রানতে রানতে সব ভুইল্লা গেছে।”
“হয়েছে, মেয়ের নামে আর গুণগান করতে হবে না।”
তীর্যক দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ নাতনির দিকে তাকিয়ে থেকে হেসে ফেললেন সাবেরা বানু। আবৃত্তিকে দেখে ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলেন,“ওই মাইয়াডা কেডা?”
মিশমি খেতে খেতে উত্তর দিলো,“ওইটা আবৃত্তি আপু।আমার ফুফাতো বোন।”
“বেড়াইতে আইছে?”
“না, এখানেই থাকে। চার মাস প্রায় হতে চললো।”
“এইখানে ক্যান থাকবো? বাপ-মা কই?”
“তুমি জানো না? ছোটো ফুপি অনেক আগেই মারা গিয়েছেন। তখন আবৃত্তি আপু ছোটো ছিল। এরপর থেকে বড়ো ফুপির কাছে থাকতো। বাকিটা আম্মুর কাছ থেকে জেনে নিও।”
মস্তিষ্কে প্রশ্নরা নাড়া দিচ্ছে। তাই উঠে মেয়ের ঘরে চলে এলেন সাবেরা বানু। শাহিনূর চুলে তেল দিচ্ছেন। মাকে দেখে হাসলেন। ইশারায় বসতে বললেন। সাবেরা বানু বসলেন। বিছানায় ভর করে বললেন,“তুই তো আমারে কিছু জানাইলি না।”
“কী ব্যাপারে, মা?”
“এই যে তোর মরা ননদের মাইয়া এহন থাইক্কা এনেই থাকবো। প্রত্যেকদিন ফোনে কথা কইছি এরপরেও কইলি না?”
“বলবো বলবো করেও বলা হয়নি।”
“এতদিন তো খরচ দিতাছিলি এইডাই ঠিক আছিল। অযথা বাড়তি ঝামেলা এনে আইনা রাখতে হইবো ক্যান? বাকি মামারা কই?”
“হঠাৎ করেই মেয়েটা চলে এসেছে। ওর খালা এখন আর ওকে নিজেদের কাছে রাখতে চান না। তাই সবাইকে নিয়ে বৈঠক বসেছিল। ওখানে সুশ্রীর বাবাই হঠাৎ করে সব দায়িত্ব নিজের ঘাড়ে নিয়ে নিলো। আমি আর কী বলবো? সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আমার পরামর্শ পর্যন্ত নেয়নি।”
“এত বছর কীসের সংসার করলি তাইলে?”
“মেয়েটা ভালো। খুব কাজের।এতিম মেয়ে তাই থাকছে যখন থাকুক। এটা সওয়াবের কাজ।”
কিছু একটা ভেবে পরক্ষণেই মেয়ের বিপরীতে মাথা নাড়লেন সাবেরা বানু।
_________
আজ অনেকদিন বাদে গ্যারেজ থেকে মোটরসাইকেল বের করল শিথিল। এইচএসসিতে এ+ আর এডমিশনে বুয়েটে চান্স পাওয়ায় উপহার হিসেবে বাবা তাকে কিনে দিয়েছিলেন। কিন্তু সঙ্গে নিতে দেননি। হামিদুল হকের ভাষ্যমতে,“একটামাত্র ছেলে আমার। পথে ঘাটে কোনো দুর্ঘটনা ঘটে গেলে? আমার কী হবে তখন? দরকার নেই। এলাকা দিয়ে চালাবি।”
শিথিল অনেকবার বুঝানোর চেষ্টা করেছিল কিন্তু হামিদুল হক নিজের কথায় অনড়। তাই স্বাধীন আসার উসিলায় আজ সেটা বের করল। সকালের নাস্তা না করেই বন্ধুকে নিয়ে চললো ঘুরতে। সবার প্রথমে গেলো হানকাটা ব্রিজে। এই ব্রিজটা গাজীপুরে একটু বেশিই বিখ্যাত। কেনো যে বিখ্যাত তা শিথিলের জানা নেই। গাজীপুরে এরচেয়েও সুন্দর সুন্দর অসংখ্য দর্শনীয় স্থান রয়েছে। তবুও আশেপাশে মানুষের ভিড়। একেকজন ফটোশুটে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে কলেজ ইউনিফর্ম পরিধেয় ছেলে-মেয়ের সংখ্যা যেন একটু বেশিই!
ওখানে বেশি একটা স্বস্তি পেলো না শিথিল। তাই স্বাধীনকে নিয়ে এবার এলো কানায়া। কানায়া আবার বেলাই, শাপলা বিল, নান্দনীয় রিসোর্টের জন্য বেশ বিখ্যাত। এর আগে এসব জায়গায় সশরীরে ঘুরা হয়নি স্বাধীনের। বেশ কতগুলো ছবি তুললো সে। স্থানটির, নিজের এবং শিথিলের। এরপর সর্বপ্রথম ফেসবুকে গিয়ে শিথিলকে ট্যাগ করে ছবিগুলো আপলোড দিয়ে ক্যাপশন লিখলো,“শহর থেকে বহুদূরে। বন্ধুর সঙ্গে তার এলাকায় সুন্দর কিছু সময় কাটানো। কানায়া, গাজীপুর।”
ছবি আপলোড দিতে না দিতেই কমেন্টের ঝড় উঠল। জুনিয়রদের কত তেলতেলে ম্যাসেজ! সিনিয়রদের হাহাকার। আর মেয়েদের আফসোস,“আহ কত সুন্দর জায়গাটা! আজ কেউ নেই বলে!”
স্বাধীনের দৃষ্টি মেয়েদের কমেন্টের উপরে নিবদ্ধ। মুচকি মুচকি হাসছে সে। হঠাৎ করেই কমেন্ট বক্সে জ্বলজ্বল করে উঠল শান্ত নামের আইডিটা। কমেন্টটা দেখেই মেজাজ খারাপ হলো,“হ্লারপুত আমগো রাইখা আমার এলাকায় গিয়া একলা একলা মজা করো? জীবনেও বিয়া হইবো না তোর। একবার আসিস খালি। মাঠে ফালাইয়া পিডামু।”
দীর্ঘশ্বাস ফেলল স্বাধীন। শিথিলের দিকে তাকিয়ে বললো,“এই শান্তডা আমারে একটু শান্তি দেয় না। কত সুন্দর সুন্দর মেয়েরা কমেন্ট করছে তার মধ্যে ও এসে আজাইরা প্যাঁচাল পারে।”
“কেনো? কী লিখেছে?”
“তুই নিজেই দেখ।”
সেই কমেন্ট দেখে শিথিল হাসলো। স্বাধীন পুনরায় বললো,“তুইও বাকিগুলো আপলোড দে।”
“পরে।”
“না, এখনি দিবি। রাত থেকে তো আবার ট্রেন, সমুদ্র, সেন্টমার্টিনের ফটো ছাড়তে হবে।”
বন্ধুর জোরাজুরি আর যুক্তিতে অতীষ্ঠ হয়ে শেষমেশ ছবিগুলোর মধ্য থেকে বাছাই করে সুন্দর সুন্দর চারটা ছবি আপলোড দিলো শিথিল। গতকাল রাতে তারা ঘুমায়নি। প্রয়োজনীয় সবকিছু হারুন চাচাকে নিয়ে গুছিয়ে রেখেছে। এরপর দুপুরের দিকে বাড়ি ফিরে ফ্রেশ হয়ে খাবার খেলো। বেরিয়ে পড়ল একটু আগে আগেই। সর্বপ্রথম কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে যেতে হবে। তারপরে সোজা কক্সবাজারে যাওয়ার ট্রেন।
চলবে _________
(কপি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।)

