মেঘমেদুর_দিনে লেখনীতে: #মাশফিত্রা_মিমুই [পর্ব:১৪]

0
1

#মেঘমেদুর_দিনে
লেখনীতে: #মাশফিত্রা_মিমুই
[পর্ব:১৪]

ঢাকা থেকে কক্সবাজার পৌঁছাতে পৌঁছাতে রাত হলো শিথিলদের। চারিদিক থেকে ঠান্ডা হাওয়া এসে কাঁপন ধরিয়ে দিলো দেহে। হামিদুল হক গায়ের চাদরটা টেনে নিলেন। হারুন চাচা আনন্দে আত্মহারা হয়ে বলে উঠলেন,“সমুদ্দের গর্জন না এইডা?”

স্বাধীন মাথা নাড়ল,“হ্যাঁ, ভিউটা সুন্দর না? আসেন চাচা কয়েকটা ছবি তুলি।”

হারুন চাচা সবকিছুতেই উৎসুক আর মিশুক লোক। ট্রেনে বসেও স্বাধীনের সাথে অনেক ছবি তুলেছেন।মুড়ি খেতে খেতে গল্প করেছেন। স্বাধীন কাঁধের ব্যাগ থেকে ক্যামেরা বের করল। ক্যামেরাটা শিথিলের। তবে এই মুহূর্ত থেকে ক্যামেরা ব্যবহারের গুরু দায়িত্ব পালন করছে স্বাধীন।

সমুদ্রের নীল জলরাশি বাতাসের তালে ঢেউ খেলছে। ক্ষণে ক্ষণে ভেসে আসছে পানির গর্জন। হামিদুল হক মুগ্ধ চোখে চেয়ে দেখছেন সেসব। বিয়ের এক মাসের মাথায় স্ত্রী আসমাকে নিয়ে একবার এখানে ঘুরতে এসেছিলেন তিনি। মাত্র ত্রিশ বছরে কিনা এতোটা পরিবর্তন ঘটেছে চারিদিকে?

সবাইকে সমুদ্রের পাড়ে রেখে শিথিল গিয়েছিল অটো ভাড়া করতে। এখান থেকে তারা যাবে নুনিয়ারছড়ার বিআইডব্লিউটি ঘাটে। ওখান থেকেই জাহাজে করে পৌঁছে যাবে সেন্টমার্টিন দ্বীপে। তবে ফিরে এলো খালি হাতে। হামিদুল হক জিজ্ঞেস করলেন,“পেয়েছিস গাড়ি? এলাকার বাইরের লোক শুনলে ভাড়া কিন্তু ওরা বেশি চায়।”

“আজ বৃহস্পতিবার। ঘাটে যেতে যেতে আধ ঘণ্টার মতো লাগবে। এই সময় জাহাজ পাওয়া মুশকিল, বাবা। আর পেলেও ভিড় থাকবে বেশি। ট্রলার পাওয়া গেলেও যেতে পারে। তবে ট্রলারে যাওয়াটা একটু রিস্কি। পাশেই একটা হোটেল দেখলাম। তাই আজকের রাতটা এখানেই থেকে যাই চলো। কাল ভোরে না হয় সোজা টেকনাফে যাবো। ওখান থেকে জাহাজে উঠে সেন্টমার্টিন।”

হামিদুল হক সায় জানালেন। ছেলের সঙ্গে একমত তিনি। কথার ফাঁকে তার দিকে নজর যেতেই ধমকের সুরে জিজ্ঞেস করলেন,“গায়ে পাতলা শার্ট কেনো? সঙ্গে মোটা কোনো জ্যাকেট আনিসনি?”

“এনেছি, ব্যাগের ভেতরে।”

চোখ রাঙিয়ে শেষবারের মতো ছেলের দিকে তাকালেন হামিদুল হক। শরীরে জড়ানো চাদরটা খুলে শিথিলের কাঁধে দিয়ে হারুন চাচাকে নিয়ে রাস্তা দিয়ে হাঁটা ধরলেন। শিথিল ফ্যালফ্যাল নয়নে একপলক বাবার দিকে তাকিয়ে তাড়া দিলো স্বাধীনকে। এরপর সকলে মিলে চলে গেলো ঠিক করা সেই হোটেলে।
__________

রাতে হামিদুল হকের ঘুম হলো না। নিজের ঘর, বিছানা ছাড়া অন্য কোথাও উনি নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারেন না। অস্থির লাগে। অপরদিকে বাড়ির জন্যও চিন্তা হচ্ছে ভীষণ। অত বড়ো বাড়ি মানুষহীন পড়ে রয়েছে! যদি চোর ডাকাত ঢুকে? দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঘুমন্ত ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বারান্দায় এসে দাঁড়ালেন তিনি। নিস্তব্ধ রাতে সমুদ্রের গর্জন ঐশ্বরিক সুন্দর।

ত্রিশ বছর আগে স্ত্রী আসমার সঙ্গে এদিকেই কোনো এক হোটেলে উঠেছিলেন সম্ভবত। কাঠের তৈরি ছিল সেই হোটেল। এখন তার অস্তিত্ব নেই। থাকার কথাও নয়। তবে সব বদলালেও সমুদ্রের ঢেউ বদলায়নি। তার গর্জন বদলায়নি।সেসব সেদিনের মতোই রয়ে গিয়েছে। আজ হঠাৎ করেই আসমার কথা মনে পড়ছে হামিদুল হকের। সাধারণ কোনো দিনে যে মনে পড়ে না এমন নয়। রোজই মনে পড়ে। কিন্তু আজ একটু বেশিই মনে পড়ছে যেন।

আসমাকে হামিদুল হক প্রথম দেখেছিলেন গাজীপুরের মারতা গ্ৰামে। ওখানে ছিল উনার বড়ো বোনের শ্বশুর বাড়ি।মায়ের আদেশে বোনকে ব্যাগ ভরতি বাতাবি লেবু আর নারিকেল দিতে গিয়েছিলেন তিনি। উনার পৈতৃক নিবাসে তখন ফলাফলাদির বিশাল বিশাল বাগান! বিশেষ করে নারিকেল, বাতাবি লেবু, আমলকি, কলা, আম, জাম, কাঁঠাল, লিচু, পেয়ারাসহ আরো কত কত ফল! লিস্ট করতে বসলে লিখে বা বলে শেষ করা যাবে না।

হামিদুল হক তখন যুবক। লেখাপড়ার খাতিরে শহরে থাকেন। বেশভূষাও তাই শহুরে। গ্ৰামের দিকে তখন অত গাড়ি চলাচল করতো না। এ গ্ৰাম থেকে ও গ্ৰামে ধানের আইল কিংবা বর্ষার দিনে নৌকায় করেই যাতায়াত করতো সকলে। আর গ্ৰাম থেকে শহরে যেতে হলে তো মাইলের পর মাইল পথ হাঁটতে হতো।

তখন ছিল বর্ষাকাল। নৌকা থেকে নেমে পেয়ারা খেতে খেতে মাটির রাস্তা দিয়ে বোনের শ্বশুরবাড়ি যাচ্ছিলেন তিনি। যাওয়ার পথে হঠাৎ করেই মাথার উপর ভারি কিছু পড়ল। পথিমধ্যে থেমে দাঁড়ালেন তিনি। ব্যথায় আচমকা আর্তনাদ করে উঠলেন। হাতের তালুতে ব্যথাতুর স্থান ডলতে ডলতে হঠাৎ খিলখিলিয়ে হেসে ওঠা মেয়েলি কণ্ঠ বেজে উঠল শ্রবণালীতে। লাফিয়ে উঠলেন হামিদুল হক। বুকে থু থু দিয়ে উপরে তাকাতেই নজরবন্দি হলো গাছের ডালে পা ঝুলিয়ে বসে থাকা এক কিশোরীর।

হামিদুল হক মেয়েটির হাসি দেখে রেগে গেলেন। নিচ থেকে হাতে তুলে নিলেন গাছের শুকনো ডাল। ধমক দিলেন প্রচন্ড,“বাঁদর মেয়ে! লজ্জা করে না অন্যায় করেও এভাবে ভেটকি মেরে হাসতে? নিচে নামো। কী হলো শুনতে পাচ্ছো না? নামো বলছি।”

কিশোরীর হাসি অধর থেকে ঝট করে নিভে গেলো। অপরিচিত যুবকের মুখে শুদ্ধ বুলি আর রাগত চেহারা ভয় ধরিয়ে দিলো মনে। গ্ৰামে গঞ্জে শুদ্ধ ভাষা সে সময় দিনের বেলা আকাশে উদিত চাঁদের মতো। মেয়েটি একলাফে সেই উঁচু ডাল থেকে লাফিয়ে পড়ল মাটিতে। তবুও ব্যথা পেলো না। যেন এসব কাজে প্রশিক্ষিত। মুখ ভার করে বললো,“জাম পারতে গিয়া ডাইল পইরা গেছে। ইচ্ছা কইরা ফেলি নাই।”

“ইচ্ছে করে না ফেললে হাসছিলে কেনো? অন্যের ব্যথা পাওয়া দেখলে খুব হাসি আসে? পরিবার থেকে কোনো শিক্ষা পাওনি?”

ব্যস এই কথাটাই যেন কিশোরীর সকল নমনীয়তা, ভয় ভীতি অদৃশ্য করে দিয়ে ধারণ করল রণমূর্তি। এরপর আর দেখে কে? কি ঝগড়া! কি ঝগড়া! ওই দিনের কথা মনে পড়লে হামিদুল হকের হাসি পায়। উনার মতো মানুষ সেদিন কীভাবে এত ঝগড়া করেছিল? বহুবার এ নিয়ে ভেবেছিলেন তিনি কিন্তু উত্তর পাননি।

ঝগড়ার তালে শ্যাম বর্ণের মেয়েটির কাজল কালো ডাগর ডাগর চোখে কখন যে হারিয়ে গিয়ে এক ঝাঁক মন খারাপ নিয়ে বাড়ি ফিরেছিলেন তাও তখন তিনি বুঝতে পারেননি। যখন বুঝতে পারলেন ততদিনে আর ফিরে আসার উপায় রইল না। বেকার অবস্থাতেই লাজ লজ্জা ভুলে মায়ের কাছে বিয়ের আবদার জুড়ে দিলেন। আসমার বয়স তখন চৌদ্দ কি পনেরো হবে। সচ্ছল পরিবারের ডাঙর মেয়ে। বাড়িতে ঘটকের আনাগোনা লেগেই আছে। এটাই সেই সময়কার বিয়ের উপযুক্ত বয়স।

মা গিয়ে বাবাকে বললেন। বাবা রাজি হয়ে গেলেন সঙ্গে সঙ্গে। নিজেদের জমিজমার অভাব নেই। লেখাপড়া শেষে সরকারি চাকরির আসা কে করতো তখন? ঘটকের মাধ্যমে মেয়ের বাবার কাছে প্রস্তাব পাঠালেন। এরপর চললো একে অপরের বংশ সম্পর্কে খোঁজখবর নেওয়া। ব্যস, সবকিছু মনমতো হতেই দুই পরিবারের সম্মতিতে কোনো এক বৃহস্পতিবারে ধুমধাম করে দশ গ্ৰামের লোক খাইয়ে হয়ে গেলো বিয়ে। বিয়ের প্রথম দুই বছর গ্ৰামে শ্বশুরবাড়িতেই ছিলেন আসমা। সেই দুই বছরে হামিদুল হক লেখাপড়া শেষ করে চাকরি নিলেন ঢাকার কোনো এক কলেজে। স্ত্রীকেও গ্ৰাম থেকে নিয়ে গেলেন নিজের কাছে।

সুহাসিনী দুনিয়ার আলো দেখতেই ভাড়া বাড়ির ছোটো ছোটো দুই কামড়ায় আর মন টিকে না আসমার।গ্ৰামীণ খোলামেলা পরিবেশে বড়ো হওয়া নারীর কী আর জিঞ্জির শহরে মন টিকে? স্ত্রীর ইচ্ছা অনিচ্ছার মূল্য দিতেন ভদ্রলোক। তাই ট্রান্সফার হয়ে ফিরে এলেন গাজীপুর শহরে। এতে অবশ্য উনার বাবা ভীষণ খুশি হয়েছিলেন। গ্ৰামে না আসুক, পুত্র নিজের জেলায় তো ফিরে এসেছে! এই অনেক। সেই খুশিতে উপহার স্বরূপ লিখে দিলেন গাজীপুরের ওই বাড়িটা।

কয়েক বছর ভালোই কাটলো। সুহাসিনীর বয়স যখন সাড়ে তিন ঠিক সেই সময় ঘর আলো করে এলো শিথিল। সুখী পরিবার উনাদের। কিন্তু তার বছর ছয়েক পরেই আসমা আক্রান্ত হলেন হৃদরোগে। কীভাবে যে এমনটা হলো? কখন হলো? কে জানে?হাসপাতাল ঘুরে ডাক্তার দেখিয়েও আর বাঁচানো গেলো না নারীটিকে।

রাতের আঁধার কেটে আজ একটু তাড়াতাড়িই ভোর হলো বোধহয়। শিথিলের ঘুম ভেঙেছে সেই ফজরের আজানের শব্দে। হোটেল থেকে মসজিদটা মনে হয় বেশ কাছে। আজানের শব্দেই বুঝা গিয়েছে। ফজরের নামাজ আদায় করে নাস্তা সেরে সকলে রওনা দিলো টেকনাফে। জাহাজের টিকেট কেটে উঠে পড়ল নির্দিষ্ট বগিতে। যাত্রী নিয়ে জাহাজ ছাড়তে ছাড়তে বেলা হলো। ধরিত্রীতে নেমে এলো ঝলমলে রোদ।

প্রকৃতির মৃদুমন্দ বাতাসে সাগর উত্তাল হয়ে উঠেছে। নীল জলরাশিতে ক্ষণে ক্ষণে বইছে ছোটো, বড়ো অসংখ্য ঢেউ। বঙ্গোপসাগরের মাঝখানে অবস্থিত ছোট্ট ব-দ্বীপ হচ্ছে সেন্টমার্টিন। দ্বীপটির সঙ্গে বাংলাদেশের সড়ক পথের কোনো ধরণের যোগাযোগ না থাকায় সেখানে যাওয়ার একমাত্র উপায় জলপথ।

স্বাধীন বন্ধুদের সঙ্গে ভিডিও কলে। আড্ডা দিচ্ছে না। বরং সকলকে ভিউ দেখিয়ে অদৃশ্য খোঁচা দিচ্ছে। ক্ষণে ক্ষণে বিভিন্ন পোজ দিয়ে, চুল নাড়িয়ে ক্যামেরার সামনে গিয়ে দাঁত কেলিয়ে হাসছে। শিথিল উঁকি দিয়ে দেখলো। মাথায় চাটি মেরে ধমকালো,“এত ফাতরামি কেনো, শহরের চাচাতো ভাই?”

চোখমুখ কুঁচকে নিলো স্বাধীন। মোবাইলের অপর প্রান্ত থেকে শান্ত চেঁচালো,“হ্লারপুত! জামালপুইরা, গাজীপুইরা! তোদের মাথায় ঠাডা পড়ুক। সমুদ্রে ঝাঁপ দিয়া মর। আমাদের রেখে ঘুরতে গিয়েছিস না? আয় একবার ক্যাম্পাসে।”

মোবাইলটা কেড়ে নিলো শিথিল। বসে বললো,“এই ইতরের কথা বিশ্বাস করে তোরা গালাগালি করছিস? আমি তো ভাই ফ্যামিলি ট্যুরে এসেছি। স্বাধীন নিজের বাপের সাথে ঝামেলা করে, না বলে কয়ে হঠাৎ আমার সাথে চলে এসেছে।”

শান্ত আর সজীব থেমে গেলো। তুহিন মুখ ভার করে বললো,“স্বাধীনের মোবাইলটা পারলে ফেলে দে তো, ভাই। একটু শান্তি চাই।”

“ও আরেকবার আমাদের জ্বালালে আমি ওরে ব্লক দিমু।”—-সজীব বললো।

শিথিল হাসলো,“গত বছর আমি তোদের বলেছিলাম, চল ঘুরে আসি। কিন্তু তোরাই রাজি হসনি।”

ঝট করে নিভে গেলো সকলের তেজ। আরো কিছুক্ষণ কথা চললো একে অপরের মধ্যে। এরপর নেটওয়ার্ক না পেয়ে কল কাটলো শিথিল। মোবাইল স্বাধীনকে ফেরত দিয়ে বললো,“এই মুহূর্তগুলো এনজয় কর। কল দিয়ে ওদের বিরক্ত করার প্রয়োজন নেই।”

কিন্তু কে শোনে কার কথা? কুকুরের লেজ যেমন সোজা হয় না তেমনি স্বাধীনের মতো বাঁদর ছেলেও ঠিক হয় না। বরং শিথিলকে টেনে নিয়ে সে অগনিত ছবি তুললো। জাহাজ মাঝ সাগরে আসতেই দেখা মিললো উড়তে থাকা সহস্র গাঙচিলের। হারুন চাচা ব্যাগ থেকে পাউরুটি বের করে টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে হাত বাড়িয়ে দিলেন খোলা আকাশের নিচে। সঙ্গে সঙ্গে উড়ে এসে সরু ঠোঁট দিয়ে হাত থেকে খাবার নিয়ে গেলো চিলে।

হারুন চাচা হো হো করে হেসে উঠলেন। কি সুন্দর সেই হাসি! হামিদুল হককে উৎসুক কণ্ঠে ডাকলেন, “ভাইজান! ভাইজান! দেহেন, দেহেন চিলে আমার হাতে খাওন খাইছে।”

স্বাধীন সেই দৃশ্যগুলোও ক্যামেরাবন্দি করল। হামিদুল হক মুচকি হাসলেন। পরিবারের মানুষদের এই আনন্দ, উচ্ছ্বাস দেখে সুখ সুখ অনুভব করছেন তিনি। চলন্ত জাহাজে বাতাসের তেজ বেশি। হারুন চাচার জোরাজুরিতে রেলিং ঘেঁষে হামিদুল হকও দাঁড়ালেন।

জাহাজের অপরপ্রান্তে গোল হয়ে বসে আছে ছেলেদের দল। একজনের হাতে গিটার, একজনের হাতে ছোট্ট ঢোল, আরেকজনের হাতে একতারা। সম্ভবত বন্ধু হবে। সাগরের বুকে চলন্ত জাহাজে হঠাৎ করেই তারা গলা ছেড়ে গেয়ে উঠল সমুদ্রের গান,

‘আমি শুনেছি সেদিন তুমি
সাগরের ঢেউয়ে চেপে নীল জল দিগন্ত ছুঁয়ে এসেছ
আমি শুনেছি সেদিন তুমি
নোনাবালি তীর ধরে বহুদুর বহুদুর হেঁটে এসেছ

আমি কখনও যাই নি জলে কখনও ভাসিনি নীলে
কখনও রাখিনি চোখ ডানা মেলা গাংচিলে
আবার যেদিন তুমি সমুদ্র স্নানে যাবে
আমাকেও সাথে নিও নেবে তো আমায় বল নেবে তো আমায়……

এই গানটা হামিদুল হকের ভীষণ প্রিয়। তিনিও মুগ্ধ হয়ে শুনলেন। এমন একটি পরিবেশে এই গানেরই যেন খুব প্রয়োজন ছিল। উনি চোখ বন্ধ করে স্মরণ করেন নিজ ছাত্রজীবন। এমন বন্ধুদের দল তো উনারও ছিল এক সময়! কিন্তু এখন তারা কোথায়? নেই। কোথাও নেই। সময়ের সাথে সাথে আমরা কত কাছের মানুষ যে হারিয়ে ফেলি! তার হিসেব কোথায়?

গন্তব্যে পৌঁছাতে পৌঁছাতে দুপুর হলো। গুগল থেকে এখানকার কোথায় কি আছে সব ভালোভাবেই জেনে নিয়েছিল শিথিল। তাই কোনো সমস্যা হচ্ছে না তার। সবাইকে নিয়ে কাছেপিঠেই এক রাতের জন্য একটা হোটেলে উঠল। বিকেলে বা সন্ধ্যার পর ভালো মানের হোটেল খুঁজে দেখবে না হয়।

হোটেলে গিয়ে একে একে গোসল সারলো সকলে। ক্লান্ত শরীর নিয়ে বিছানায় হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে পড়ল শিথিল। ভীষণ ঘুম পাচ্ছে তার! এই মুহূর্তে খাওয়ার চেয়ে ঘুমটাই গুরুত্বপূর্ণ। হামিদুল হক আশেপাশে দৃষ্টি ঘুরিয়ে বললেন,“হারুন কই? এই আহাম্মক আবার কোথায় চলে গেলো?”

“মনে হয় হোটেলের রুফটপ ঘুরে দেখছে। স্বাধীনের সাথে উনার যা ভাব হয়েছে না!”

“স্বাধীন ওর ঘরে শুয়ে আছে। তোর মতোই ক্লান্ত ও।”

প্রত্যুত্তর করল না শিথিল। হামিদুল হকের চিন্তা হলো। হারুন চাচা চঞ্চল মানুষ। এক জায়গায় বেশিক্ষণ টিকতে পারেন না। নিশ্চয়ই পাকনামি করে কোথাও গিয়েছেন। একবার আসুক সে। আচ্ছামতো ব্যাটাকে ধমকাবেন হামিদুল হক।

হারুন চাচা এলেন ঘণ্টা খানেক পর। দু হাতে দুটো বিশাল সাইজের বাজারের ব্যাগ। এর মধ্যে শিথিল না খেয়েই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। স্বাধীন নিজের ঘর ছেড়ে বন্ধুর ঘরে চলে এসেছে। হামিদুল হক যতটা না রাগ আর চিন্তা নিয়ে বসে ছিলেন তার চেয়েও বেশি অবাক হলেন। জিজ্ঞেস করলেন,“কোথায় গিয়েছিলি হঠাৎ? আর এই ব্যাগগুলো কীসের?”

ঘরে খোলা লাগোয়া একটা বারান্দা রয়েছে। হারুন চাচা নিজের কাপড়ের ব্যাগ থেকে আরেকটা চটের ব্যাগ নিয়ে বারান্দার পাশ ঘেঁষে বসলেন। বাজারের প্রথম ব্যাগ থেকে বের করলেন তিনটি ডাব। এরপর চটের ব্যাগ থেকে বের করলেন একটা ধারালো বঁটি আর ছুরি। অল্প সময়ের মধ্যে দুইটা ডাব কেটে একটা হামিদুল হক আর অপরটি ধরিয়ে দিলেন স্বাধীনের হাতে। এরপর পুনরায় গিয়ে পূর্বের স্থানে বসে শেষ ব্যাগ থেকে বের করলেন ছোটো ছোটো চারটা রূপচাঁদা মাছ।

উনার এসব কর্মকাণ্ড স্বাধীন আর হামিদুল হক বিস্ময় নিয়ে দেখলেন। বললেন,“এসব কোত্থেকে নিয়ে এলি? আর এই বঁটি, ছুরি?”

“বঁটি, ছুরি বাড়ি থাইক্কা আওয়ার সময় লগে আনছি। আর এই মাছ কেয়ারটেকারের লগে বাজার থাইক্কা গিয়া আনছি। দোকানদার ব্যাডা আমারে বলদ ভাইবা শুরুতে অনেক দাম চাইছিল। এরপর আমিও শুরু কইরা দিলাম দামদর। আর না পাইরা কমে দিয়া দিছে। শিথিল বাজানের কাছে হুনছিলাম, এনে নাকি সোনার মতো দেখতে চান্দা মাছ পাওয়া যায়! আর ডাব আনছি পাড় থাইক্কা।”

বিস্ময় ভাব কাটলো না কারো। স্বাধীন বললো,“কিন্তু দুপুরের খাবার তো হোটেল থেকেই দিবে, চাচা। এখানে তো রান্নার কোনো ব্যবস্থা নেই।”

“তুমি চিন্তা কইরো না। এই বঁটি দেখতাছো না? এইডা দিয়া এনেই সব কাটাকাটি করমু। আর রান্না করমু নিচে গিয়া। এক কর্মচারীর লগে কথা হইছে।”

দীর্ঘশ্বাস ফেললেন হামিদুল হক। হতাশ কণ্ঠে বললেন, “তাই বলে তুই সঙ্গে করে ছুরি বঁটি আনবি, হারুন? কেউ যদি চেক করতো? তাহলে তো ধরা পড়ে যেতি। তোর জেল হয়ে যেতো।”

হারুন চাচার মুখশ্রীতে ক্ষণকালের জন্য কিছুটা ভয়ের দেখা মিললো। আসার পথে তো এমনটা তিনি ভাবেননি!

চলবে ________

(কপি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here