#মেঘমেদুর_দিনে
লেখনীতে: #মাশফিত্রা_মিমুই
[পর্ব:১৫]
সেন্টমার্টিন দ্বীপের পশ্চিম সৈকতে সূর্যাস্ত হয় আয়োজন করে। উত্তাল সাগরের ধারে সূর্যাস্ত দেখার দৃশ্যটা, আহা কি মনোমুগ্ধকর! হৃদয় যেন প্রশান্তিতে ভরে ওঠে। বিকেলের দিকে হোটেল থেকে বেরিয়ে এসেছে সকলে। শুধুমাত্র সূর্যাস্ত দেখার জন্যে।
চারিদিকে রাতের আঁধারের ঘনত্ব বাড়তেই স্বাধীন গিয়ে কিনে নিয়ে এলো কোরাল মাছ। বারবিকিউ করবে। সাগর পাড়ে বারবিকিউ তৈরির হিড়িক পড়েছে তখন। হারুন চাচা বিশাল সাইজের মাছটার আঁশ ছাড়িয়ে নাড়িভুঁড়ি পরিষ্কার করলেন। তারপর পর্যাপ্ত মসলা দিয়ে হামিদুল হক ভালো করে মাছটা মাখলেন। ছেলের সঙ্গে প্রতি বছর চাঁদ রাতে ছাদে বারবিকিউ করায় এসবে বেশ অভিজ্ঞ তিনি।
পরের কাজগুলো শিথিল আর স্বাধীন মিলেই করল। প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র দুজনে মিলে কিনে এনেছে এখানকারই এক দোকান থেকে। বারবিকিউ পোড়াতে পোড়াতে রাত নয়টা সাড়ে নয়টা বাজলো। হারুন চাচার জটিল একটা অভ্যাস রয়েছে। তিনবেলাই উনার ভাত লাগে। ধোঁয়া ওঠা গরম ভাত কিংবা পান্তা ভাত। ভাত উনার লাগবেই। মাঝেমধ্যে ভাতের বদলে মুড়ি কলা দিয়ে চালিয়ে দিতে পারলেও রুটি উনি খেতে পারেন না। হোটেলের দুজন কর্মচারীর সাথে উনার বেশ ভাব হয়েছে। দুপুরে রান্না করতে গিয়ে কিচেনের শেফের থেকেও শিখে এসেছেন নতুন কিছু রেসিপি।
সে যাই হোক, হারুন চাচা এক ফাঁকে গিয়ে একটা বক্সে করে ভাত আনলেন। পোড়া মাছের লেজের অংশটা তুলে নিলেন পাতে। শিথিল আবার মাছের কাঁটা বেছে ঠিকমতো খেতে পারে না। এর সম্পূর্ণ দায়ভার হারুন চাচার। ছোটো থেকে খুব আহ্লাদে বড়ো করেছেন ছেলেটাকে। সবসময় পাতে তুলে দিয়েছেন কাঁটা বিহীন পেটির অংশ।হামিদুল হক কতবার নিষেধ করেছিলেন, “আহা ছেলেটার এসব বদঅভ্যাস তৈরি করিস না তো, হারুন। সবকিছু দিয়েই খাওয়া শিখতে হবে। এত আহ্লাদ না করে কাঁটা কীভাবে বাছতে হয় সেটা শেখা।”
কিন্তু হারুন চাচা তো হারুন চাচাই। কারো কথা শোনার সময় আছে নাকি তার? সবাই গোল হয়ে বালুর ওপরে চাদর বিছিয়ে খেতে বসেছে। হামিদুল হক চাপা স্বরে বললেন,“তুই একটা আহাম্মকই রয়ে গেলি রে, হারুন। সারা জীবন বারবিকিউর সাথে খেয়ে গেলি ভাত।”
গাল ভরতি ভাত চিবোতে চিবোতে হারুন চাচা উত্তরে বললেন,“বাঙালি মানুষ, ভাইজান। ভাত ছাড়া চলে না আমার। ভাতের মতন তৃপ্তিদায়ক খাবার কী আর আছে?”
শিথিল হাসলো,“এর জন্য আপনাকে সেরা বাঙালির একটা অ্যাওয়ার্ড দেওয়া উচিত, চাচা।”
“এই দেশে ভালা মাইনষের কদর নাই। তাই বাইচাঁ থাকতে আমারে পুরষ্কার দিবো কেডায়?”
হামিদুল হক উনার কাঁধে দুটো থাপ্পড় বসিয়ে বাহবা দিলেন। নিজের প্লেট থেকে কাঁটা বেছে এক টুকরো মাছ ছেলের প্লেটে তুলে দিয়ে হাত ধুয়ে উঠে দাঁড়ালেন।
সেন্টমার্টিন ভ্রমণের দিনগুলো পরিবার, বন্ধুসহ ভালোই কাটছে শিথিলদের। সেদিন রাতটা খোলা আকাশের নিচে খেয়ে, গল্প করে, আনন্দ করেই কাটলো। যেই হোটেলে তারা উঠেছিল সেই হোটেল আর বদলানোর প্রয়োজন পড়ল না। সবদিক দিয়েই হোটেলের পরিবেশ ভালো হওয়ায় ওখানেই থাকার সিদ্ধান্ত নিলো।
পরের দিন সকালে খাবার খেয়েই সকলে মিলে চললো ছেঁড়া দ্বীপে। ছেঁড়া দ্বীপ বাংলাদেশের দক্ষিণের শেষ সীমানা। মূল দ্বীপ বা ভূখণ্ড থেকে কিছুটা আলাদা হওয়ায় স্থানটি ছেঁড়া দ্বীপ নামেই পরিচিত। সেন্টমার্টিন দ্বীপের সবচেয়ে আকর্ষণীয় জায়গা হয়তো ছেঁড়া দ্বীপকেই বলা হয়।
এখানে এসে বেশ কয়েকজনের সঙ্গে পরিচয় হলো হামিদুল হক আর হারুন চাচার। তাদের মধ্যে আবার একজনের নাম আইয়ুব আলী। ভদ্রলোক পরিবার নিয়ে দেশের বাইরে থাকেন। পৈতৃক নিবাস নরসিংদী। ছুটি কাটাতে স্ত্রী, সন্তান নিয়ে দেশে ফিরেছেন তিনদিন হয়েছে। আর ফিরেই সর্বপ্রথম এসেছেন কক্সবাজারে। সেখানে দু রাত কাটিয়ে গতকাল এসে উঠেছেন সেন্টমার্টিনের একটি হোটেলে। সন্তানদেরকে নিজস্ব জন্মভূমি সম্পর্কে না জানালে হয়? ভদ্রলোকের সঙ্গে পরিচিত হয়ে ভালো লাগলো হামিদুল হকের। ভদ্রলোক ভালো মানুষ। নইলে আজকাল নিজ জন্মভূমির প্রতি কজনেরই বা এত টান থাকে?
কথাবার্তা শেষ করে নিজ পরিবার নিয়ে সৈকতের পাড় চলে এলেন হামিদুল হক। মানুষের সাড়াশব্দ পেয়ে বালুর উপরে হাঁটতে থাকা লাল রঙের ছোটো ছোটো কাঁকড়াগুলো দৌড়ে চলে গেলো নিজেদের তৈরি ঘরে। পাড়ে ভেসে ওঠা বেশকিছু অর্ধ মৃত এবং জীবিত জেলি ফিস। সমুদ্রের ঢেউয়ের সাথে চলে এসেছে ডাঙায়। শিথিল হাতে নিলো সেসব। কি মশ্রিণ! উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বললো,“দেখো বাবা, জেলি ফিস!”
ছেলের কণ্ঠস্বর আর হাবভাবে মুচকি হাসলেন হামিদুল হক।এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো, এটা উনার সেই ছোট্ট শিথিল। যে সামান্য কিছুতেই হেসে ওঠে, চিৎকার করে বাবাকে ডাকে। এগিয়ে এসে ছেলের পাশে দাঁড়ালেন। বললেন,“এভাবে ধরিস না, হাত জ্বলবে।”
বাবার কথা শুনলো শিথিল। এগিয়ে গিয়ে দুই হাতের জেলি ফিস দুটি ছেড়ে দিলো সাগরের নীল, স্বচ্ছ, হীরের মতো চকচক করা পানিতে। এরপর আচমকাই কিছু পানি তুলে ছুঁড়ে মারলো বাবার দিকে। হামিদুল হক চোখমুখ কুঁচকে নিলেন। ধমকে উঠলেন,“বাপের সাথে বেয়াদবি করছিস? দাঁড়া ওখানে। দাঁড়া বলছি।”
খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে শিথিল। হামিদুল হক কাঁধের চাদর ওড়নার মতো গলায় প্যাঁচিয়ে দু হাত ভর্তি পানি ছেলের দিকে তেমন করেই ছুঁড়ে মারলেন। কিন্তু সেই পানি ছুঁতে পারলো না শিথিলের গা। সে এক লাফে সরে গেলো। প্রবল আত্মবিশ্বাস নিয়ে বললো,“এসব তুমি পারবে না। আমার গায়ে পানি ছোঁড়া এত সহজ?”
কথাটা গায়ে লাগলো হামিদুল হকের। দুদিনের ছোকরা কিনা বাপের সাথে ভাব নেয়?এ তো বিশাল বেইজ্জতি! তাই পুনরায় পানি নিলেন হাতে। ফের ছুঁড়লেন। পূর্বের মতো ব্যর্থ হলেন আবারো। মুহূর্তেই লেগে গেলো কে কাকে ভেজাতে পারে নামক বাপ-ছেলের হাড্ডাহাড্ডি প্রতিযোগিতা। শিথিল পারলেও হামিদুল হক একবারের জন্যও ছেলেকে ভেজাতে পারলেন না। একসময় ক্লান্ত দেহ নিয়ে ধপ করে বসে পড়লেন তীরে। বড়ো বড়ো শ্বাস ফেলতে ফেলতে বললেন,“হারুনের সাথে থাকতে থাকতে তোর আচার আচরণ একেবারে বাঁদরের মতো হয়ে গেছে।”
শিথিল এগিয়ে এসে দাঁড়াল বাবার সামনে।হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললো,“হ্যাঁ, এখন তো তাই বলবে। পারোনি যে।”
হামিদুল হক তার হাত ধরলেন না। বরং করে বসলেন ছলচাতুরি। দু হাতে পানি নিয়ে ছুঁড়লেন ছেলের মুখে। প্রবল উৎসাহ নিয়ে বললেন,“বাপ সবসময় বাপই হয়। বুঝেছিস গর্দভ?”
“এটা কিন্তু চিটিং, বাবা!”
মুখ ভার করে বাবার পাশ ঘেঁষে বসে পড়ল শিথিল। পাঞ্জাবীর হাতায় মুখ ঘষলো। এরপর দুজনে একত্রেই হেসে উঠল। হাসতে হাসতে চোখের কোণে জমলো অশ্রু। আনন্দের অশ্রু। দূরে দাঁড়িয়ে অবাক নয়নে বাবা ছেলের এক অপূর্ব মুহূর্তের সঙ্গে পরিচিত হলো স্বাধীন। করে রাখলো সব ক্যামেরাবন্দি। বাবা-ছেলের মধ্যেও এত সুন্দর, বন্ধুসুলভ সম্পর্ক হতে পারে? কই তার বাবার সঙ্গে তো তার এমন সম্পর্ক নেই। বরং স্বাধীনের বাবা সর্বদা ব্যস্ত থাকেন ব্যবসায়িক কাজে। মাসের নির্দিষ্ট একটি সময়ে কিংবা প্রয়োজন হলেই টাকা দিয়ে বাকি সব দায় এড়িয়ে চলেন।মাঝেমধ্যে খাবার টেবিলে দেখা হলেও ভদ্রলোক তাদের সঙ্গে কখনো হেসে কথা বলেন না। টুকটাক সৌজন্যতা আর দায়িত্বের খাতিরেই কিছু হয়তো বলে। বাইশটা বছর এটাকেই তো পরিবার হিসেবে জেনে এসেছিল স্বাধীন!
অথচ তার ধারণা এবং জানা সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণিত করে দিলো বন্ধু শিথিল। সেটা কোনোভাবেই একটা পরিবার হতে পারে না। পরিবারে থাকতে হয় প্রাণ, সম্পর্কের ভেতরে অদৃশ্য ভালোবাসার মেলবন্ধন। এখানে মন খুলে হাসতে হয়। এখান থেকেই তো শিক্ষার শুরু। স্বাধীনের মনে হলো, শিথিল ছেলেটা তার চেয়েও সুখী। শিথিলের মা না থাকলেও একজন বাবা আছেন। আদর্শ বাবা। যিনি পরিবেশ, স্থান এবং সময় অনুযায়ী বিভিন্ন রূপ ধারণ করেন। কখনো পিতা, কখনো মাতা, কখনো শিক্ষক আবার কখনো বা একজন ভালো বন্ধু।
__________
আবৃত্তির লেখাপড়া লাটে উঠেছে। অল্প কয়েকদিনের ব্যবধানে মামার বাড়িতে তার অবস্থা খালার বাড়ির চেয়েও করুণ। বিশেষ করে সাবেরা বিবি বাড়িতে পা দেওয়ার পর থেকে মামী শাহিনূরের কী হয়েছে কে জানে? ভদ্রমহিলা কুটোটিও নাড়েন না এখন। সারাক্ষণ মিতা এই কর, ওই কর। এমনকি আবৃত্তিকেও কাজে লাগিয়ে দিতে কার্পণ্য করেন না। এইতো দুদিন আগে মিতা কাজে আসেনি। পেট ব্যথার অজুহাতে ছুটি নিয়েছিল ফোনে। ব্যস, শাহিনূর এসেই ইনিয়ে বিনিয়ে বললেন,“আজ আর তোমাকে কলেজ যেতে হবে না। একদিন কলেজে না গেলে কিছু হয় না। নিলুফা আপার কাছে শুনেছি তুমি নাকি ভালো রাঁধতে পারো? ওখানেও তো তুমিই রাঁধতে। আজ মিতা আসবে না। রেঁধে ফেলো তো।”
আবৃত্তি চুপচাপ সেকথা মেনে নিলো। মেনে না নেওয়ার কোনো উপায়ও অবশ্য নেই। সে তো সর্বদা ভিতু আর দুর্বল মেয়ে। তাই কলেজে গেলো না। সকালের নাস্তা, দুপুর আর রাতের খাবার একা হাতেই রান্না করল। মাঝেমধ্যে শাহিনূর এসে শুধু তদারকি করে গেলেন। এরপর থেকে সকালের নাস্তা তৈরির দায়িত্ব পড়েছে আবৃত্তির উপর। মিতা মেয়েটা আসে সকাল নয়টার পর। তখন কী নাস্তা তৈরির সময়?
তার মধ্যে সাবেরা বিবি কেমন যেন। বৃদ্ধার দু পায়ে বয়সজনিত ব্যথা। ডাক্তারের ভাষ্যমতে, বয়সের ভারে হাড় ক্ষয়ে গিয়েছে। ডায়াবেটিসের রোগী। মাঝেমধ্যে রাতবিরেতে প্রেশার ওঠে। তাই সুশ্রীর ঘর থেকে নিজের মায়ের ঘরে আবৃত্তিকে পাঠিয়ে দিয়েছেন শাহিনূর। সেবা করার জন্য। যেন বিনে পয়সায় বাড়ির কাজের লোক সে। মোজাম্মেল হোসেন বিষয়টি লক্ষ্য করে স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করেছিলেন,“সুশ্রীর সাথে থাকছিল থাকতো। মায়ের ঘরে কেনো আবার পাঠাতে গেলে ওকে? মা নয়টার আগে আলো নিভিয়ে ঘুমিয়ে পড়েন। কিন্তু আবৃত্তি তো স্টুডেন্ট মানুষ। ওর তো রাত জেগে পড়তে হয়, তাই না?”
শাহিনূর চট করে মিথ্যা বললেন,“তোমার কী মনে হয় আমি জোর করে ওকে মায়ের ঘরে পাঠিয়েছি? ওর নিজেরই সুশ্রীর সঙ্গে থাকতে ভালো লাগছিল না। সারা ঘরে জিনিসপত্র ছড়িয়ে রাখে সুশ্রী। রাত জেগে পড়ে।তাই আমার কাছে এসে আবৃত্তি বলতেই আমি মায়ের ঘরে ওর থাকার ব্যবস্থা করে দিলাম।”
শাহিনূর ভালো করে মিথ্যা বলতে পারেন না। বিশেষ করে স্বামীর সামনে। তাই মোজাম্মেল হোসেন সহজেই বিষয়টি ধরে ফেললেন। কিন্তু বলতে পারলেন না কিছু। কোন পুরুষ কি আর চায় অযথা ঘরণীর সঙ্গে ঝগড়া ঝামেলায় জড়াতে?
রাতে ঠিকমতো ঘুম হয় না আবৃত্তির। কদিনেই পুরো ফ্ল্যাটটা তার কাছে নরক মনে হচ্ছে। যতক্ষণ না বৃদ্ধা ঘুমান ততক্ষণ বিরতিহীন উনার পা টিপতে হয়। আবার রাতবিরেতে হঠাৎ ব্যথা উঠলে ঘুমন্ত আবৃত্তির ঘুম ভাঙাতেও ভুলেন না। একবার ঘুম ভাঙলে পরবর্তীতে আর ঘুমাতে পারে না আবৃত্তি। তার উপর সে আবার ফজরের নামাজ পড়ে। সকালের নাস্তা তৈরি করে এরপর কলেজ যেতে হয়। কলেজ থেকে ফিরে আবার নেমে পড়তে হয় ঘর পরিষ্কারের কাজে। বৃদ্ধা প্রচুর পান খায়। পানের পিক কিংবা সুপারি বিছানা বা মেঝেতে ফেলে রাখেন। গোসল করে কাপড় ধৌন না। মাথায় উকুনে ভরতি। ছোটো মেয়ের বাড়ি থেকে নিয়ে এসেছেন সম্ভবত। বিকেলে বসে মাথার উকুন সব তাকেই আনতে হয়।
উফ! এসব কী আবৃত্তির কাজ? সে কেনো করবে? এ ঝামেলা তো শ্বশুরবাড়িতেও মনে হয় না পোহাতে হয় মেয়েদের। ওদিক দিয়ে আবার বৃদ্ধা সেয়ানা ভীষণ। নিজের নাতি নাতনিদের দিয়ে তিনি কখনোই কোনো কাজ করান না। অথচ খাটের নিচের পানির বোতলের জন্যও আবৃত্তিকে পড়ার মাঝখান থেকে উঠিয়ে আনেন। অগত্যা কিছু বলতেও পারে না মেয়েটা। যদি মাথার উপর থেকে ছাদ চলে যায়?
দিনে পড়ার সুযোগ পায় না সে। বৃদ্ধা আলো নিভিয়ে দেন। আলোতে নাকি উনার ঘুম আসে না। সকলে ঘুমিয়ে গেলে বাধ্য হয়ে ড্রয়িং রুমের ল্যাম্প জ্বালিয়ে পড়তে বসে আবৃত্তি। একবার কলেজটা শেষ হোক। এরপর আবৃত্তি আর এখানে থাকবে না। কিছুতেই না।
আজ সাপ্তাহিক ছুটির দিন। এই দিনে অন্যান্য দিনের তুলনায় বাড়িতে খুব ভালো আয়োজন হয়। দুপুরের রান্নাগুলো সব আবৃত্তি নিজেই করল। বেশিরভাগ রান্না সে শিখেছে খালার কাছে। তার মধ্যে পোলাও, মাংস আর পায়েস শিখেছে পাশের বাড়ির এক চাচীর থেকে। ভদ্রমহিলা খুব ভালো রান্না জানতেন। উনার বাপের বাড়ি ছিল বরিশাল আর স্বামীর বাড়ি চট্টগ্রাম। তাই হয়তো রান্নার হাত একটু বেশিই ভালো ছিল।
রোজকার মতো বিকেলের দিকে শাহিনূরকে চা দিয়ে ঘরে এলো আবৃত্তি।সাবেরা বিবি পান চিবোতে চিবোতে বলে উঠলেন,“হওড়ার তেল দিয়া আমার পা দুইডা মালিশ কইরা দে। কহন ধইরা চিলিক মারতাছে।”
ভেতরে ভেতরে রাগে ফুঁসে উঠলেও বাইরে তা প্রকাশ করল না আবৃত্তি। দাঁতে দাঁত চেপে রান্নাঘর থেকে সরিষার তেল এনে মালিশ করতে লাগলো রুক্ষ পায়ে। সন্ধ্যা পর্যন্ত সেসব চললো। একটু পরপর বৃদ্ধা আহ উহ শব্দ করে পা বাঁকিয়ে বললেন,“এখানে দে, ওখানে দে।”
আজান পড়তেই এর থেকে নিস্তার মিললো আবৃত্তির। অযু করে নামাজ আদায় করে বই নিয়ে পড়তে বসলো। সাবেরা বানু চোখমুখ কুঁচকে নিলেন,“পড়তে বইলি যে? পা টিপার কী হইবো? নামাজের লাইগ্গা না ছাড়ছি তোরে।”
হঠাৎ করেই যেন ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেলো আবৃত্তির। খালা যাই করুক, কখনো পড়ার মাঝখানে বাঁধা দিতো না তাকে। তাছাড়া গতকাল ইংরেজি ক্লাসে পড়া না পারায় সকলের সামনে দাঁড় করিয়ে অনেক কথা শুনিয়েছেন স্যার। দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে বললো,“আমার অনেক পড়া বাকি আছে। আপনি মিতা আপাকে কিংবা মিশমিকে ডেকে বলুন।”
“তুই থাকতে হেগো ডাকমু ক্যান? হেরা কী তোর মতো আজাইরা?”
“আমিও আজাইরা না। আমার পড়া আছে। তাছাড়া আমি আপনার নার্স নই যে দিনরাত চব্বিশ ঘণ্টা সেবা করবো।”
অবাক হলেন বৃদ্ধা। হায় হুতাশ করে চেঁচিয়ে উঠলেন, “নূর! কই গেলি রে নূর! দেইখা যা। দেইখা যা তগো বাড়িতে থাকা মাইয়া আমারে কী কয় এসব!”
চেঁচামেচিতে শাহিনূর আর মিশমি দৌড়ে এলো। মাকে এখনো চিৎকার করতে দেখে শাহিনূর জিজ্ঞেস করলেন,“কী হয়েছে, মা? এভাবে চিৎকার করছো কেনো?”
বৃদ্ধা সবটা বললেন। সাথে একটু বাড়িয়েই বললেন, “এই মাইয়া আমারে খোডা দেয়। একটু পা টিপতে কইছি দেইখা কত কথা কইয়া দিলো। আমি কি এমনি এমনি পা টিপতে কইছি?”
শাহিনূরের চোখেমুখে রাগ স্পষ্ট। কড়া দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন,“তোমার থেকে এমনটা আশা করিনি, আবৃত্তি। গুরুজনদের সঙ্গে এ কেমন আচরণ?”
আজ অদৃশ্য কোনো কারণে আবৃত্তির ভেতরের সব ভয় ডর মিলিয়ে গেলো। নরম স্বরে বললো,“সারাদিন বাড়ির সমস্ত কাজ আমি করেছি, পুরো বিকেল উনার পা মালিশ করে দিয়েছি। রাতবিরেতে উনার জন্য ঘুমাতে পারি না, তখনো হাত-পা টিপে দিতে হয়। দ্রুত আলো নিভিয়ে ঘুমিয়ে যাওয়ায় পড়তে পারি না। কাল স্যারের কাছে অনেক কথা শুনেছি— এখন কী আমি পড়বো না? আমি তো নার্স নই যে সারাক্ষণ উনার সেবা করবো।যখন আমি ছিলাম না তখন এসব কে করেছে? আমার কেউ নেই বলেই বাধ্য হয়ে আপনাদের এখানে থাকতে হচ্ছে। তাই বলে সারাদিন এসব করবো? আমি লেখাপড়া করবো না?”
একনাগাড়ে বলা কথাগুলো শুনে শাহিনূর চমকালেন। এই মেয়েকে তো তিনি বোবা ভেবেছিলেন। আবৃত্তি ফের মিনমিনে স্বরে বললো,“আমায় নিয়ে যে আপনাদের সমস্যা হচ্ছে তা আমি বুঝতে পারছি। তাই সেজো মামার সঙ্গে আরেকবার এ বিষয়ে কথা বলে দেখবো। আমায় যেন উনি হোস্টেলে পাঠিয়ে দেন।”
আঁতকে উঠলেন শাহিনূর। স্বামীর কান পর্যন্ত কথাটা গেলে মহা ঝামেলা হয়ে যাবে। কিছু বলবেন তার আগেই মিশমি মুখ বাঁকিয়ে বললো,“এই বুড়ি এমনই। কারো শান্তি দেখতে পারে না। এর আগেও একটা কাজের লোক এই বুড়ির নির্যাতনে চলে গিয়েছে। তুমি আমার ঘরে এসো তো, আপু। তোমাকে এর কথা আর শুনতে হবে না।”
নাতনির কথায় সাবেরা বিবি তেতে উঠলেন। এ তো ঘর শত্রু বিভীষণ!
চলবে ________
(কপি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।)

