#মেঘমেদুর_দিনে
লেখনীতে: #মাশফিত্রা_মিমুই
[পর্ব:১৬]
কবির বর্ণনার মতো সুন্দর একটি দিন। ধরিত্রী জুড়ে খেলা করছে ঝলমলে রোদ্দুর। আকাশে উড়ে বেড়ানো শঙ্খচিল আজ প্রচন্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে খুঁজে ফিরছে শিকার। তারপর বছর দেড়েক পেরোলো। লেখাপড়ার ব্যস্ততায় শিথিলের অবস্থা নাজেহাল। তৃতীয় বর্ষ শেষ করে চতুর্থ বর্ষে উঠেই সকল ছলচাতুরি ছেড়ে এক দফা লেখাপড়ায় মনোনিবেশ করতে হয়েছে ছেলেটাকে।
ক্লাসরুম, লাইব্রেরি, ক্যাম্পাস, টিউশন, সবকিছুতেই যেন হাঁপিয়ে উঠেছে শিথিল। এবার একটু শান্তি আর স্বস্তি দরকার। কিন্তু সেই শান্তি আর স্বস্তির বদলে তার মনটা আজ ভীষণ উদাস।
ইমন, তৌসিফ, রিজভীর গ্ৰাজুয়েশন শেষ হয়েছে মাস তিনেক আগে। রিজভী অবশ্য ভেবে রেখেছে, মাস্টার্স সে করবে।তবে বিপত্তি বেঁধেছে ইমন আর তৌসিফকে নিয়ে। ওরা ওদিকে আর যাবে না। ইমন কোনো এক প্রাইভেট কোম্পানিতে মোটামুটি ভালো একটা চাকরি পেয়েছে। ভবিষ্যতে পদোন্নতি পাওয়ারও সম্ভাবনা রয়েছে। অযথা আর অত লেখাপড়া করে হবেটা কী? তাছাড়া প্রেমিকাও বছর তিনেক ধরে অপেক্ষায় বসে আছে। লুকিয়ে চুপিয়ে ভাঙছে অজস্র বিয়ে। মেয়েটাকে এত অপেক্ষা করানো মোটেও কোনো ভালো পুরুষ এবং প্রেমিকের কাজ হতে পারে না। তাই তো নাওয়া, খাওয়া ভুলে মাস দুয়েক শুধু চাকরির পেছনেই ছুটে বেরিয়েছে সে। ওদিকে তৌসিফের চিন্তাভাবনা ভিন্ন। স্কলারশিপ নিয়ে দেশের বাইরে যাবে সে। কানাডায় নাকি তার কোন মামা থাকে। ওখানে গিয়েই উঠবে। উচ্চশিক্ষা নিবে।
বন্ধুদের সাফল্যে আনন্দিত হওয়া উচিত। কিন্তু শিথিলের সেই আনন্দ হচ্ছে না। তার ভীষণ মন খারাপ। যেই ছেলেগুলোর সঙ্গে সে এই ফ্ল্যাটে তিন বছর ধরে ছিল— তারা এই ফ্ল্যাটে আর থাকবে না। চাইলেই আর ঝগড়া করা হবে না। করা হবে না রাত জেগে গল্প। একজনের দোষ আরেকজনের উপরেও চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। ওরা চলে যাবে নিজ নিজ জীবনের গন্তব্যে। অথচ শিথিলকে এখানে থাকতে হবে। আরো এক বছর। কিংবা তার চেয়েও আরেকটু সময় বেশি!
এশার পরপর ঘরে ফিরে পড়তে বসে শিথিল। সেই ছোটোবেলার অভ্যাস হঠাৎ করেই আবার গড়ে উঠেছে তার। ইমন ঘরের দরজায় এসে দাঁড়াল। ব্যাগপত্র সব গোছানো শেষ। আগামীকালকের মধ্যেই ফ্ল্যাট ছাড়বে সম্ভবত। জিজ্ঞেস করল,“কী রে, মন খারাপ?”
শিথিল পেছন ফিরে তাকালো না। দীর্ঘশ্বাস আড়াল করে নির্লিপ্ত কণ্ঠে বললো,“আমার কী আর প্রেমিকা আছে নাকি যে মন খারাপ হবে?”
“আমরা কী প্রেমিকার থেকে কোনো অংশে কম?”
“গে নাকি ভাই?”
শব্দ করে হেসে উঠল ইমন। এগিয়ে এসে বিছানায় পা ঝুলিয়ে বসলো। তারপর হঠাৎ করেই কিছুক্ষণ নিরব রইল। উদাস কণ্ঠে বললো,“আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর একটা সময় আমি কাটিয়েছি ঢাকা শহরের এই দুই কামড়ার চার দেয়ালের মাঝে। কত হাহাকার, সুখ, দুঃখ, হাসি, চোখের পানির সাক্ষী যে আছে এই দেয়াল আর ভেতরে থাকা মানুষগুলো! এসব আমি কখনো ভুলতে পারবো না।”
তারপর আবারো ক্ষণকালের জন্য চুপ হয়ে গেলো ইমন। আজ নিজের অনুভূতি সে কিছুতেই বোঝাতে পারছে না। বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদায়বেলা অনেক সহপাঠী মেয়েদের একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে দেখেছে সে। কিন্তু একটা ছেলেও কাঁদেনি। এই যে আজ যেমন সে নিজেই কাঁদতে পারছে না। অথচ ছেলেদের বন্ধুত্বই তো হয় সবচেয়ে গভীর, বিশেষ। একে অন্যের জন্য বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়তেও তারা দু’বার ভাবে না। অথচ! স্লান হাসলো ইমন,“এটাই জীবনের নিয়ম। জীবন কিংবা সময় কোথাও কারো জন্য থেমে থাকে না। তাদের সাথে আমাদেরও কাঠের পুতুলের মতো চলতে হয়। কিছু করার নেই। এই দুই কামড়ায় বন্ধুদের নিয়ে থাকার সময় আমার ফুরিয়েছে। তোরও একদিন ফুরাবে। সবারই ফুরিয়ে যায়। তবে খুব মন খারাপ হলে কিংবা ধোঁয়া ওঠা এক কাপ চা, উড়ে যাওয়া সিগারেটের ধোঁয়ায় তোদের কথা সবসময় আমার মনে পড়বে। এটাই জগতের নিয়ম। ভালো সময়ে বন্ধুদের মনে পড়তে নেই। যেমন সুস্থ শরীর নিয়ে মানুষ ওষুধ সেবন করে না?”
শিথিল মৃদু হাসলো। দুঃখ প্রকাশ করতে কিংবা আবেগ দেখাতে সে পারে না। এসব কিছু একান্তই তার নিজের। ভেতরের বাগিচায় চাপা পড়ে থাকে কোথাও। সহজ স্বরে ঠাট্টা করে বললো,“প্রেম করা মানুষরা সবকিছুতে এত আবেগ দেখায় কেনো? বুঝি না। তোদের জন্য আমার একদম কষ্ট হচ্ছে না। আমার শুধু চিন্তা হচ্ছে, পরের রুমমেটগুলো কেমন হবে? আদৌ ওদের সঙ্গে থাকতে পারবো তো? তোরা তো জানিসই, আমি কত খুঁতখুঁতে স্বভাবের মানুষ!”
ইমন তাকিয়ে রইল শিথিলের পানে। তবে অবাক হলো না। এই ছেলেটাকে সে চিনে। ভাঙবে তবু মচকাবে না। কলিং বেল বেজে ওঠার শব্দ হলো। রিজভী, তৌসিফ ঘরে নেই। কোথায় গিয়েছে কে জানে? আজ আর দরজা খোলার জন্য ইমনকে ধমকিয়ে পাঠালো না শিথিল। বসা থেকে নিজেই উঠে দাঁড়াল। যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই আচমকা ইমন এসে তাকে জড়িয়ে ধরল। শিথিল থমকালো। ধমক দিলো,“ছিঃ, ছিঃ! একা ঘরে একটা ছেলেকে পেয়ে কী করছিস?”
কয়েক সেকেন্ড পর ছেড়ে দিয়ে তার বুকে আলতো কিল বসিয়ে দিলো ইমন। যেতে যেতে বললো, “আমার হবু বউ আছে, ভাই। পরে যাতে আফসোস না করিস তার জন্য বড়ো ভাই হিসেবে সান্ত্বনা দিয়ে গেলাম।”
অগোচরে মুচকি হাসলো শিথিল। ইমন গিয়ে দরজা খুলে দিতেই হুড়মুড়িয়ে একে একে ভেতরে প্রবেশ করল স্বাধীন, সজীব, তুহিন, শান্ত। হেসে একত্রে বলে উঠল,“বিদায় উপলক্ষ্যে আজ সারারাত পার্টি চলবে, ব্রো।”
এদের হঠাৎ আগমনে ইমন ভড়কে গেলো। পেছন পেছন তৌসিফ আর রিজভীও এলো। দু হাত ভর্তি বাজারের ব্যাগ নিয়ে।
মুহূর্তেই ছোট্ট নিরব ড্রয়িং রুমটা ভরে উঠল চিৎকার, চেঁচামেচি আর আনন্দে। এখানেই আজ রান্না হবে। বিরিয়ানি। প্রায় দুই বছর ধরে পিকনিক করা হয় না। সেই যে সেই কবে বিরিয়ানি রাঁধতে গিয়ে স্বাধীনের চক্করে খিচুড়ি রেঁধে ফেলেছিল ইমন এরপর আর করা হয়নি পিকনিকের আয়োজন।
শিথিল সবাইকে একপলক দেখে প্রশ্ন ছুঁড়ল,“তোদের কী লেখাপড়া নেই? এই অসময়ে এখানে ঝামেলা করতে এসেছিস কেনো?”
তার কথায় পাত্তা দিতে দেখা গেলো না কাউকে। শান্ত বললো,“লেখাপড়া তোর আর তুহিনের জন্য। তোরা কর গিয়ে।”
“একজন কম কম লাগছে। আরফিন কোথায়?”
“জানি না। ইদানিং হুটহাট কোথায় যেন হারিয়ে যায়। কিছু জিজ্ঞেস করলে বলে না। বিকেল থেকে রুমেও নেই। ফোন করেছিলাম কিন্তু ধরেনি। এরপর ম্যাসেজও দিয়েছিলাম কিন্তু রেসপন্স করেনি।” —সজীব বললো।”
তুহিন বিজ্ঞের মতো বললো,“আমার মনে হয় আরফিন প্রেমে পড়েছে। একবার শান্তর কাছে ধরাও পড়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে বিভিন্ন কথা বলে কনভেন্স করে ওই ব্যাপারটা ওখানেই ধামাচাপা দিয়ে দিয়েছিল। তবে ওর হাবভাব সুবিধার নয়। ক্লাস ফাঁকি দেয়, রাত জেগে ফোনালাপ করে। গত সেমিস্টারে সিজিপিএ লো হয়ে গিয়েছে দেখলাম।”
স্বাধীন ভাবলেশহীন কণ্ঠে বললো,“তোর কথা যদি সত্যি হয় রে, তুহিন্না! তাইলে আরফিইন্নার কপালে বিশাল দুঃখ আছে।”
শান্ত পাঁশুটে মুখে বললো,“দুইদিন পর যহন কাঁদতে কাঁদতে আইবো তখন ওর পাছায় আমি দুইটা লাত্থি মারমু দেখিস।”
ইমন চোখমুখ কুঁচকে নিলো,“শ্লা তোরা প্রেম করিস না বলে আর কী কেউ করতে পারবে না? সবাই কিন্তু ছ্যাঁকা খায় না।”
“তুমি তো মিয়া ভুলবশত জিতে গেছো। নেহাৎ আগে আগেই বান্ধবীর সাথে আকাম ঘটিয়ে ফেলেছিলে তাই বেচারি ছাড়তে পারেনি তোমায়।”
ইমন চেতে গেলো স্বাধীনের কথায়,“একদম বাজে কথা বলবি না। সিমি খুবই অনেস্ট, লয়্যাল আর ভালো একটা মেয়ে। আমরা কখনো একে অপরকে জড়িয়ে পর্যন্ত ধরিনি।”
“ভালো মেয়েরা কখনো প্রেম করে না, ব্রো। সাড়ে তিন বছর ধরে একটা সম্পর্ক এমনি এমনিও চলে না। সব জানি আমি।”
ব্যাপারটা এবার হাতের বাইরে চলে যাওয়ার মতো অবস্থা। ইমন নিজের ব্যক্তিগত নারী সম্পর্কে অন্য পুরুষের মুখে কোনো কথা সহ্য করতে পারে না। শিথিল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার প্রচেষ্টা করতে বিরক্ত হয়ে বললো,“থাম তো তোরা। অন্যের পার্সোনাল লাইফ নিয়ে কথা বলে ঝামেলা না বাঁধালেই হচ্ছে না?”
ইমন মুখ ভার করে বললো,“ওকে বল। সব বিষয়ে এত পাকনামি কেনো করে?”
“নির্দিষ্ট কাউকে বলিনি। সবাইকেই বলেছি।”
বাকিরাও নিমিষেই প্রসঙ্গ বদলে ফেললো। শুরু করে দিলো রান্নার আয়োজন। তবে আজ আর আসরটা তেমন জমলো না। গিটারিস্ট আরফিনের বিভিন্ন সুর আন্দোলিত করল না কাউকে। উৎসুক হয়ে গলা ছেড়ে গানও গাইল না কেউ। টুং টাং সুর ছাড়া গান হয় নাকি?
____________
দিনটি সোমবার। ইমনরা পরেরদিন ঠিক দুপুরের সময় যে যার মতো বিদায় নিয়ে চলে গেলো। যাওয়ার আগে অবশ্য রুমমেটও ঠিক করে দিয়ে গেলো। ছেলেগুলো ওদেরই জুনিয়র এবং পরিচিত। তাদের সঙ্গে এখনো আলাপ হয়নি শিথিলের। ক্লাস করে ঘরে ফিরে গোসল সেরেই সে বেরিয়ে এসেছে। চাবি দিয়ে এসেছে দারোয়ানের কাছে। ছেলেগুলো এলে যেন দিয়ে দেয়।
চারিদিকে তখন বসন্তের আগমনী উৎসব। বাসন্তী রঙের শাড়ি, পাঞ্জাবী পরিধিত পুরুষ রমণীর ঢল নেমেছে পথে প্রান্তরে। কেউ মেতে আছে বইমেলা নিয়ে আবার কেউ বা মেতেছে বসন্ত উৎসবে। শিথিলের সেসবে ধ্যান জ্ঞান নেই। বইমেলায় সে এখনো যায়নি। এখনকার বইমেলা তার ভালো লাগে না। ছেলেবেলায় বাবার হাত ধরে বহুবার গিয়েছিল। তখন অবশ্য অলিতে গলিতে ক্যামেরা, মাইক হাতে ভুলভাল সংবাদ ছাপানো যত্রতত্র সাংবাদিক ছিল না। ছিল না লেখার মানের চেয়ে স্যোশাল মিডিয়ার ফলোয়ার দেখে যা তা বই বের করার অত তাগিদ। তখন মেলায় আসতো জাদুকরেরা। তাদের নিয়ে মেতে উঠতো পড়ুয়া মানুষের দল। সংবাদে প্রচার হতো মানসম্মত লেখা। এখন অবশ্য তা হয় না বললেই চলে। সচেতন, জ্ঞানী, পড়ুয়া প্রকাশক এবং পাঠকের ভীষণ অভাব!
সাহিত্যের এই অধঃপতন দেখে আজকাল বাবা ভীষণ আফসোস করেন। এইতো সেদিন এ বিষয় সম্পর্কেই তাকে বিশাল বড়ো একটা চিঠি লিখে পাঠালেন। শিথিল তা মন দিয়ে পড়েছে। না পড়ে উপায় নেই। বাবা ছাড়া এই ভালোবাসাটা কোথায় আর পাবে সে? তবে বিপরীতে শিথিল কোনো চিঠি লিখেনি। তার চিঠি লিখতে ভালো লাগে না। এই জন্য বাবা তাকে নিয়ে প্রায় সময় মজা কুড়োয়। মাঝেমধ্যে হতাশ হয়ে বলেন, “স্যোশাল মিডিয়া নিয়ে পড়ে থাকা ছেলে- মেয়েগুলো চিঠির মর্ম বুঝলো না। সবকটা গর্দভ।”
শিথিল সেসব শুনে শব্দহীন হাসে। চিঠির মর্ম বুঝতে হলেও এই শহরে ডাক পিয়নের যে ভীষণ দরকার! সেই ডাক পিয়নই তো কোথাও নেই। তাই সে চিঠির উত্তর দেয় ম্যাসেঞ্জারে। কখনো বা হুট করে বাড়িতে চলে যায়। বাবার মুখোমুখি বসে কথার ফাঁকে ফাঁকে বলে দেয় মনের সকল কথা।
রমনা পার্কে কপোত কপোতীর ভিড়। তাই বন্ধুদের সঙ্গে চন্দ্রিমা উদ্যানে এসেই গাছের ছায়ায় বসেছিল শিথিল। আজকের আড্ডার মধ্যমণি আরফিন। আগাগোড়া তাকে দেখলো শিথিল।কেমন মনমরা হয়ে আছে। চোখ দিয়ে উপচে পড়তে চাইছে নীল বেদনার দল। তার প্রিয় গিটারটা আজ বড়ো অযত্নে স্বাধীনের দুহাতের আগলে পড়ে রয়েছে। সেদিকে আরফিনের ধ্যান নেই। অথচ গিটারের অযত্ন সে সহ্য করতে পারে না।স্বাধীনের সাথে যে এ নিয়ে কতবার ঝগড়া লেগেছিল এই শান্তশিষ্ট ছেলেটার! তার হিসেব নেই।
সজীব প্রথম মুখ খুললো,“গতকাল রাতে তুহিনের কথাটাই মিলে গেছে। ব্যাটা দুই বছর ধরে আমাদের অগোচরে প্রেম করে ফাইনালি দুদিন আগে ছ্যাঁকা খেয়েছে।”
শিথিল জিজ্ঞেস করল,“কথা কী সত্য?”
আরফিন দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মলিন হেসে লেকের দিকে তাকিয়ে রইল। বিকাল রোদে হীরার মতো চিকচিক করছে পানি। বসন্তের বাতাসে ঢেউ খেলছে। সময় নিয়ে সে মাথা নাড়াল। ভারি কণ্ঠে বললো,“আজ ওর গায়ে হলুদ। কাল সম্ভবত বিয়ে। ছেলে কর্পোরেট অফিসার। মাস শেষে মোটা অংকের টাকা মাইনে। শহরে উচ্চবিত্ত পরিবার নিয়ে বসবাস। তাই বাবার মুখের উপর আর না করতে পারলো না।”
কত সহজে অবলীলায় কথাগুলো বলে দিলো আরফিন! অথচ বুকে জমে রইল হাজারো বেদনা। বন্ধুরা খুব সহজেই তা টের পেলো। এই জন্যই তো তারা বন্ধু।
আরফিনের বাবা নেই।বছর তিনেক আগে কলের কাজ করতে গিয়ে মারা গিয়েছেন।ভদ্রলোক দিনমজুর ছিলেন। যখন যা পারতেন তা করেই কোনোমতে ছয় সদস্যের পরিবার চালাতেন। আরফিনদের পরিবারে অভাব অনটন নিত্যদিনের সঙ্গী। বাবা মারা যাওয়ার পর তা আরো বেড়েছে। চার ভাই-বোনদের মধ্যে সে দ্বিতীয়। বড়ো বোনের বিয়ে হয়ে গেছে। বোন জামাই রাজমিস্ত্রী। সংসারে তিন তিনটে ছেলে-মেয়ে। অথচ দুলাভাই ভীষণ লোভী। শ্বশুরবাড়ির লোকেদের সাহায্য করা তো দূরে থাক বরং যৌতুক নেওয়ার জন্য মুখিয়ে থাকেন। বোনটাও হয়েছে যা তা। পরিস্থিতি বুঝতে চায় না। মা কতবার যে বোঝালো,“তোর বাপ নাই। সংসার কেমনে চলতাছে সবই তো জানোস। তারপরেও তগো আবদার আমি কেমনে মিটামু? আমি কি কামাই করি?”
অথচ তবুও সে বোঝে না। মায়ের কথায় বিরক্তিতে মুখ কালো করে রাখে। ছোটো দুই ভাই-বোন লেখাপড়া করছে। ভাইটা গত বছর সবে কলেজে উঠেছে আর সবার ছোটো যে বোনটা, সে অষ্টম শ্রেণীর ছাত্রী। মা বলেছেন, মাধ্যমিক দিলেই ভালো পাত্র পেলে তাকে বিয়ে দিয়ে দিবেন। বাপ মরা দরিদ্র পরিবারের সন্তানের আবার অত লেখাপড়া কীসের? আরফিনের গল্পটা সবার চেয়ে ভিন্ন। আজকের অবস্থানে আসতে তাকে কষ্ট করতে হয়েছে। অনেক চড়াই উৎরাই পাড়ি দিতে হয়েছে। সংসারের দায়িত্বও এসে পড়েছে তার উপর। যে কটা টিউশন করায় তার থেকে প্রাপ্ত টাকা কিছুটা রেখে বাকি সব পাঠিয়ে দেয় বাড়িতে। আর মাসের শেষ দিকে নিজেরই চলতে হয় টানাটানি করে। তবুও কেউ সেসব জানতে পারে না। আরফিন জানতে দেয় না। তার কষ্ট তার নিজের। সে বিশ্বাস করে, কষ্টের মধ্যেই রয়েছে স্বস্তি। সফলতার দিন একদিন আসবে। আঁধার কেটে আলো আসবেই আসবে।
তবে দীপ্তির সঙ্গে কীভাবে যে জড়িয়ে গেলো! সে লম্বা এক গল্প। সংক্ষিপ্তভাবে বলতে গেলে দীপ্তি তার এক বছরের জুনিয়র। একই ডিপার্টমেন্ট। প্রথম যেদিন ফ্রেশার হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছিল তখন দেখা হয়েছিল ক্যাম্পাসে। নিজ ডিপার্টমেন্ট খুঁজে না পেয়ে মেয়েটা সাহায্য চেয়েছিল তার কাছে। আরফিন তখন সাহায্য করে। সঙ্গে করে নিয়ে গিয়ে দেখিয়ে দেয় ক্লাসরুম। পরের সপ্তাহে আবারো দেখা। এরপর ক্যাম্পাস, হল বিল্ডিং, ক্যান্টিন ঘুরিয়ে দেখায়। মাঝেমধ্যে পড়া না বুঝলে সাহায্যও অবশ্য করেছে।
মেয়েটি রূপবতী। পুরুষ মনে রূপবতীর জন্য প্রেম আসা কঠিন কিছু নয়। তাই আরফিনের মনেও এসেছিল। কিন্তু প্রকাশ সে করেনি। বামন হয়ে চাঁদে হাত বাড়ানো অন্যায়। কিন্তু প্রথম হাত বাড়ালো দীপ্তি নিজেই। কীভাবে কীভাবে যেন কেটে গেলো দুটি বছর। অথচ তাদের প্রেমকথন চাপা পড়ে রইল রমনা, গুলিস্তান, নীলক্ষেত, বইমেলা, লাইব্রেরি আর গাজরার ভাঁজে। কেউ জানতেই পারলো না সেকথা! সেই দীপ্তির নাকি কাল বিয়ে। অন্যের জন্য বউ সাজবে মেয়েটা।
বন্ধুর দুঃখ কারো সহ্য হলো না। শিথিল বলে উঠল, “প্রেম করার সময় বাপের মতামত, ইচ্ছা অনিচ্ছার দাম যখন দেয়নি তাহলে বিয়ের সময় কেনো বাপের কথায় ভেজা বিড়াল হয়ে বিয়ে করবে? আর তুই বা মুখ এমন করে রেখেছিস কেনো, ভাদাইম্মা? পুরুষ মানুষের এমন করে থাকা মানায়?”
“তো কী করবো? দুঃখ সারাতে সময় তো লাগে।”
“চল গিয়ে তুলে নিয়ে আসি। তোরা দুইটাই তো প্রাপ্ত বয়স্ক। সর্বপ্রথম কোর্ট ম্যারেজ করাবো। এরপর মেয়ের বাপ এমনিতেই মেনে নিবে। না মানলে পায়ে ধরে কান্না করবি। ঠিক শরিয়াহ মতে বিয়ে দিয়ে দিবে।”
স্লান হাসলো আরফিন। শান্ত তৎক্ষণাৎ ধমকালো, “বেহায়ার মতো হাসিস ক্যান? পাগল হয়ে গেছিস? শিথিলের আইডিয়া তো খারাপ না।”
স্বাধীন মাথা নাড়াল,“ইয়েস ইয়েস। শিথিল ইজ রাইট।”
আরফিন বললো,“বাবা তো শুধুই একটি মাধ্যম মাত্র। দীপ্তি নিজেই রাজি। ফেসবুকে দেখলাম মেহেদী রাঙা হাতের ছবি আপলোড দিয়েছে। মুখে কি অমায়িক হাসি! যে নিজ থেকে চলে যায় তাকে কোনোভাবেই বেঁধে রাখা যায় না।”
সূর্য পশ্চিমাকাশে কিছুটা হেলে পড়েছে। স্বাধীন গিটারে শব্দ তুললো। দু হাতে ভর করে বসে আছে শিথিল। হঠাৎ করেই সে গেয়ে উঠল,
‘এরা সুখের লাগি চাহে প্রেম
প্রেম মেলে না, শুধু সুখ চলে যায়
এমনই মায়ার ছলনায়…
আড্ডা জমে উঠল। সঠিক সময়ে সঠিক গানের জন্য বাহবা দিয়ে উঠল শিথিলকে। কিন্তু শিথিল হঠাৎ থেমে গেলো। হয়ে উঠল অন্যমনস্ক। তার ধ্যান, জ্ঞান, দৃষ্টি কোথাও হারিয়ে গেলো। কারো কথা শ্রবণালী পর্যন্ত পৌঁছালো না। এভাবে কত সময় পেরোলো কে জানে? আরফিন হয়তো একসময় তা খেয়াল করল। তার বাহুতে ধাক্কা মেরে বললো,“তোর আবার কী হলো? কোথায় হারিয়ে গেলি? শিথিল! এই শিথিল!”
হুঁশ ফিরল শিথিলের। কিন্তু দৃষ্টি সরলো না। পূর্বের মতোই স্থির রইল। শুকিয়ে এলো গলা। শুকনো ঢোক গিলে আচমকাই বলে বসলো,“আমার কেমন কেমন যেন হচ্ছে। বুক ধড়ফড় করছে। মনে হচ্ছে…
“কী মনে হচ্ছে?”
“মনে হচ্ছে, প্রেমে পড়ে যাচ্ছি।”
“কার? ধুর বাল, কথা শেষ কর ভালো করে।”
অধৈর্য হয়ে পড়ল স্বাধীনসহ বাকিরাও। শিথিল কথা শেষ করল,“একটা মেয়ের।”
সবাই অবাক হলো। সমস্বরে চেঁচিয়ে উঠল,“হোয়াট!”
ওদের বিস্ময়ে পাত্তা দিতে দেখা গেলো না শিথিলকে। সে চোখ বুঁজে পুনরায় গলায় সুর তুললো,
এরপর বিষণ্ন দিন বাজে না মনোবীণ,
অবসাদে ঘিরে থাকা সে দীর্ঘ দিন,
হাজার কবিতা, বেকার সবিতা
তার কথা কেউ বলে না!
সে প্রথম প্রেম আমার…..
চলবে________
(কপি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।)

