#মেঘমেদুর_দিনে
লেখনীতে: #মাশফিত্রা_মিমুই
[পর্ব:২৬]
আজ বৃহস্পতিবার। বৃহস্পতিবারে রাস্তায় জ্যাম থাকে অন্যান্য দিনের তুলনায় একটু বেশি। সেই জ্যাম ঠেলেই নামিদামি এক দোকান থেকে কয়েক পদের মিষ্টান্ন,ফল ফলাদি নিয়ে হামিদুল হক হাজির হলেন মালিবাগে। মোজাম্মেল হোসেনের শান্তিনগরের বাসভবনে।উনাকে দেখে বেজায় খুশি হলেন শাহিনূর। আশ্চর্যও হলেন বটে। গতকাল রাতে ফোনকলে আসার কথা জানিয়ে রেখেছিলেন হামিদুল হক। কিন্তু বিস্তারিত কোনো কিছু বলেননি।
আসমার মৃত্যুর পর তার দিকের আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ ভদ্রলোকের তেমন নেই বললেই চলে। যা যোগাযোগ হতো যান্ত্রিক মোবাইলে। তাই হঠাৎ উনার আগমনে আশ্চর্য হওয়াই স্বাভাবিক। শাহিনূর এবং মোজাম্মেল হোসেন উনাকে আপ্যায়ন করে সোফায় বসালেন। সামনে এনে রাখলেন লেবুর ঠান্ডা শরবত।
সৌজন্য সকল কথার সমাপ্তিতে শাহিনূর হাস্যোজ্জ্বল মুখে বলে উঠলেন,“আপনি এসেছেন তাতে কি খুশি যে আমি হয়েছি, দুলাভাই! আসমা মারা যাওয়ার পর বলে কয়েও আপনাকে আর এখানে আনতে পারিনি। শিথিলটাও হয়েছে একেবারে আপনার মতো। আসার কথা বললেই শুরু হয়ে যায় ওর হাজারটা বাহানা।”
“তবে আজ কিন্তু শিথিলের জন্যই আমি এখানে এসেছি। বলতে পারো তোমাদের কাছে কিছু চাইতে এসেছি।”
মোজাম্মেল হোসেন আর শাহিনূর দুজনেই খানিকটা চমকালেন।একে অপরের দিকে চাওয়াচাওয়ি করলেন। হামিদুল হকের মতো মানুষ উনাদের কাছে কিছু চাইতে এসেছে! ব্যাপারটা বড়োই অবিশ্বাস্য। মোজাম্মেল হোসেন হাসলেন,“আমাদের সাধ্যে থাকলে অবশ্যই দিবো, ভাইজান।”
“সাধ্যের মধ্যেই আছে।”
একটু থামলেন হামিদুল হক। এর মাঝেই মিতা এসে দিয়ে গেলো কয়েক পদের নাস্তা। হামিদুল হক সেসব ছুঁলেন না। মিতা যেতেই মৃদু হেসে জিজ্ঞেস করলেন, “আবৃত্তি কোথায়?”
স্বামী-স্ত্রী আরো একদফা চমকালো বোধহয়। শাহিনূর বললেন,“ঘরে আছে। আপনি ওকে চিনেন, দুলাভাই?”
“চিনি না। শিথিলের কাছে নাম শুনেছি। ছবিও দেখেছি ওর মোবাইলেই। এই জন্যই তো সব কাজকর্ম ফেলে আজ এখানে আসা। কই ডাকো তাকে। আগে সামনা সামনি দেখি।”
অপ্রস্তুত হলেন শাহিনূর। মোজাম্মেল হোসেন স্ত্রীকে ইশারা করলেন,“আবৃত্তি কোথায়? ভাইজান যেহেতু বলছে, যাও ওকে নিয়ে এসো।”
স্বামীর আদেশ অমান্য করলেন না শাহিনূর। বসা থেকে উঠে চলে এলেন ছোটো মেয়ের ঘরে। বিছানায় পায়ের উপর পা তুলে শুয়ে আছে মিশমি। বাইরে যে কেউ এসেছে সে খেয়াল তার নেই। মোবাইলে কিছু একটা করছে। আবৃত্তিও সেদিকেই তাকিয়ে আছে।ক্ষণে ক্ষণে কিছু নিয়ে দুজনে হাসছে। শাহিনূর চাপা ধমক দিলেন,“দিনদুপুরে এভাবে কে শুয়ে থাকে? বাড়িতে কেউ এলে যে ভদ্রতার খাতিরে সালাম দিতে হয় সেটাও ভুলে গিয়েছিস?”
মায়ের ধমকে হুড়মুড়িয়ে শোয়া থেকে উঠে বসলো মিশমি। চুল ঠিক করতে করতে জিজ্ঞেস করল,“কে এসেছে?”
“তোর খালু।”
“কোন খালু?”
“শিথিলের বাবা।”
মিশমিও অবাক হলো যেন। শাহিনূর এবার তাকালেন আবৃত্তির দিকে। গম্ভীর মুখে বললেন,“পরনের পোশাক বদলে নাও। আমি যেই জামাটা দিয়েছি সেটা পরে এসো।”
“এখন? কিন্তু কেনো?”
“আমি বলেছি তাই। তাড়াতাড়ি করো। জানি না, শিথিল হঠাৎ কী বললো? দুলাভাই তোমাকে দেখতে চাইছেন। এসো তাড়াতাড়ি। গিয়ে সুন্দর করে সালাম দিবে, ঠিক আছে?”
কথাটা শুনেই বুক ধড়ফড় করে উঠল আবৃত্তির। হঠাৎ! তার মানে গতকাল এই জন্যই শিথিল চুপ ছিল? মামীর তাড়ায় পোশাক বদলে এলো আবৃত্তি। চুলে হাত খোঁপা করে মাথায় ঘোমটা টেনে মামীর পিছুপিছু বাইরে এলো। আজ ছাত্রীনিবাসে ফেরার কথা থাকলেও সেজো মামা তাকে যেতে দেয়নি। কাল শুক্রবার। সাপ্তাহিক ছুটির দিন। তাই অযথা আজ গিয়ে হবে কী? এর থেকে শনিবার বিকেলে না হয় চলে যাবে। তাই আবৃত্তিও আর মানা করল না।
আবৃত্তি এসেই মামার দিকে সর্বপ্রথম তাকালো। মামার ইশারায় সালাম দিলো সামনে বসা ভদ্রলোককে। হামিদুল হক সালামের জবাব নিলেন। অধরের হাসি চওড়া করে বললেন,“দাঁড়িয়ে আছো কেনো? এখানে এসে বসো।”
বাধ্য মেয়ের মতো মামার পাশে বসলো আবৃত্তি। দৃষ্টি স্থির করে রাখলো মেঝেতে। মিশমিও কিছুক্ষণ পর এলো। তার আবার রাখঢাক নেই। যেকোনো আত্মীয় স্বজনের সঙ্গেই সে এমনভাবে কথা বলে যেন কত বছরের পরিচয়! তার সালামের জবাব নিয়ে ভালো মন্দ জিজ্ঞেস করলেন হামিদুল হক। কথা শেষ হতেই শাহিনূর কৃত্রিম হেসে জিজ্ঞেস করলেন,“তা দুলাভাই বললেন না তো, হঠাৎ আবৃত্তিকে দিয়ে কী দরকার? আর শিথিল কী বলেছে ওর সম্পর্কে?”
মনে মনে সব কথা গুছিয়ে নিলেন হামিদুল হক। হেসে আসল কথাটা বলেই ফেললেন,“আর বলো না। ওই একটামাত্র ছেলে আমার। একেবারে খুঁতখুঁতে স্বভাবের। আসমা মারা যাওয়ার পর থেকে ছেলে-মেয়েদের আমি নিজে মানুষ করেছি। তাই যখন যা চায় তাই দেওয়ার চেষ্টা করি।”
এরপর কয়েক সেকেন্ডের জন্য তিনি থামলেন। এটা উনার স্বভাব। কথার মধ্যে থেমে বিপরীত মানুষটিকে আকৃষ্ট করার টেকনিক। ফের মুখ খুললেন,“শিথিলের নাকি আবৃত্তিকে খুব পছন্দ হয়েছে। শুধু পছন্দ হলেও না হয় মানা যেতো। কিন্তু ছেলে আমার একেবারে বিয়ে পর্যন্ত ভেবে ফেলেছে। চাঁদ রাতে বাড়ি ফিরে সেকথা আবার আমাকে বললোও সরাসরি। শিথিল কেমন ছেলে তা তো তোমার থেকে আর কেউ ভালো জানে না, নূর। তাই বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এসেছি। তোমরা রাজি থাকলে এই মাসেই দুজনের বিয়েটা না হয় দিয়ে দিলাম। আমার বাড়িটা খালি পড়ে রয়েছে। একজন পুত্রবধূ রূপী মেয়ে ভীষণ দরকার।”
ঝলমলে পরিবেশটা হঠাৎ করেই থমকে গেলো। হয়ে গেলো ছিমছাম, ঠান্ডা। আবৃত্তি শক্ত হয়ে বসে রইল নিজ স্থানে। এমন কিছুর জন্য সে মোটেও প্রস্তুত ছিল না। শাহিনূর শুকনো ঢোক গিলে বলতে চাইলেন, “কিন্তু দুলাভাই ও তো…
উনাকে কথাটা সমাপ্ত করতে দিলেন না ভদ্রলোক। বললেন,“আবৃত্তি মায়ের সম্পর্কে আমি সমস্ত কথাই জানি। শিথিল বলেছে। আমার সেসবে আপত্তি নেই। ছেলের উপর আমার পূর্ণ আস্থা রয়েছে। তাই আমি রাজি।”
বাকরুদ্ধ হয়ে বসে রইল সকলে। এমন কিছু স্বপ্নেও ভাবতে পারেন না শাহিনূর। শিথিলকে তিনি নিজ সন্তানের দৃষ্টিতে দেখেন। ছেলেটার জন্য উনার কষ্ট হয়, চিন্তা হয়। তাই এ বিষয়ে ভাবা উনার পক্ষে অসম্ভব। আবৃত্তির উদ্দেশ্যে কড়া কণ্ঠে বললেন,“তুমি আর মিশমি ঘরে যাও।”
মিশমি বুঝলো মা কোনো কারণে রেগে গিয়েছে। তাই আর দাঁড়াল না সেখানে। আবৃত্তি উঠে দাঁড়াল। চলে যাওয়ার উদ্দেশ্যে পা বাড়াল। তখনি হামিদুল হক তাকে আটকে দিয়ে বললেন,“যেই প্রয়োজনে এতোদূর থেকে এসেছি, সেই প্রয়োজন না মিটিয়েই ও চলে গেলে তো হবে না। ওর সঙ্গে আমার আরেকটু কথা আছে।”
ভয়ে হাত-পা রীতিমতো কাঁপছে আবৃত্তির। আসন্ন ঝড়ের পূর্বাভাস পাচ্ছে। শাহিনূর বললেন,“ও থেকে কী করবে, দুলাভাই? ওর যাবতীয় সব দায়িত্ব ওর মামার। ওর মামা যা বলবে তাই ওর সিদ্ধান্ত।”
“এটা ভুল বললে। ছেলে-মেয়েদের উপর কখনো কিছু চাপিয়ে দিতে নেই। নিজেদের জীবন নিয়ে তাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার রয়েছে। বিয়ে নিয়ে মতামত প্রকাশের অধিকারও রয়েছে। কারণ সংসার তো তারাই করবে। আমরা নই। এ কথা আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি। তাই কখনো সন্তানদের উপর কোনো কিছু চাপিয়ে দেইনি।”
শাহিনূর বিপরীতে আর কিছু বলতে পারলেন না। বাকি সবার মতো তিনিও হামিদুল হককে মান্য করে চলেন। হামিদুল হক এবার আবৃত্তির উদ্দেশ্যে সোজাসুজি প্রশ্ন ছুঁড়লেন,“তোমাকে এখন আমি কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন করবো। ভেবেচিন্তে মন থেকে উত্তর দিবে। মনে রাখবে, এই প্রশ্নের উত্তরের উপরেই তোমার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। এবার বলো, শিথিলকে তুমি চেনো?”
আবৃত্তি নিচের দিকে তাকিয়েই মাথা নাড়ল,“হ্যাঁ।”
“কেমন আমার ছেলে?”
“ভালো।”
“কেমন ভালো? নির্দ্বিধায় বিয়ে করা যায়? একসঙ্গে জীবনের বাকিটা পথ পাড়ি দেওয়া যায়?”
শরীরের ঘাম ছুটে গেলো আবৃত্তির। প্রশ্নগুলো সহজ হলেও মামা-মামীর সামনে উত্তর দিতে শরীরে কাঁপুনি দিয়ে উঠছে। এবার আর মুখে কিছু উচ্চারণ করল না সে। উপরনিচ মাথা নাড়িয়ে আশানুরূপ উত্তর দিলো। অধরের হাসি চওড়া হলো হামিদুল হকের। এবার মূল প্রশ্নটি করলেন,“তুমি কী আমার ছেলের বউ হতে রাজি, মা?”
শাহিনূরের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি আবৃত্তির উপরেই স্থির।তাই এবার আর চট করে উত্তর দিতে পারলো না আবৃত্তি। বেশ কিছুক্ষণ উত্তরের অপেক্ষায় বসে থেকে ভদ্রলোক ফের বললেন,“আমার ছেলেকে বিয়ে করলে ঠকবে না তুমি। যদিও বেকার তবুও ছেলে ভালো। সারাজীবন কী আর কেউ বেকার থাকে? আমিও কিন্তু বেকার অবস্থাতেই বিয়ে করেছিলাম। এখন তুমি রাজি হলেই হবে। আমার অত বড়ো বাড়ি যে তোমার জন্য অপেক্ষা করছে।”
ভদ্রলোকের ব্যবহার অমায়িক। আবৃত্তি তা খেয়াল করল। উনার আচরণের সঙ্গে শিথিলের আচরণেরও বেশ মিল পেলো যেন। তাই উনাকে অপেক্ষা করাতে মোটেও ইচ্ছে হলো না তার। কিন্তু ভয়ে কোনো শব্দ সে উচ্চারণ করতে পারলো না। এরপরের ঝড় যে তার উপর দিয়েই বইবে! তার হাবভাবে যা বুঝার বুঝে গেলেন হয়তো হামিদুল হক। নরম স্বরে বললেন, “আচ্ছা তুমি এবার যেতে পারো।”
হাফ ছেড়ে বাঁচলো আবৃত্তি। বড়ো বড়ো কদম ফেলে দ্রুত প্রস্থান করল। মোজাম্মেল হোসেন পুরো সময়টা নিরব দর্শক হয়ে শুধু দেখলেন এবং শুনলেন। উনার অবশ্য এসবে কোনো আপত্তি নেই। শিথিলকে তিনি বরাবরই পছন্দ করেন। অপছন্দ করার কোনো কারণ নেই। এমন যোগ্য, ভালো ছেলেদের কে অপছন্দ করে? যদি উনার নিজের মেয়ের জন্য প্রস্তাব আসতো তাও হয়তো রাজি হয়ে যেতেন। তাছাড়া তিনি আবৃত্তির ভালো চান। দ্রুত বিয়েটা দিয়ে দিতে চান। তাহলে আর চাইলেও আইয়ুব আলী এসে মেয়ের উপর অধিকার ফলাতে পারবেন না। বললেন, “আবৃত্তি মা মরা মেয়ে। ছোটো থেকে আমাদের কাছেই মানুষ, ভাইজান। শিথিল নাকি আপনাকে সব জানিয়েছে। তাই বিস্তারিত আজ না হয় না-ই বললাম। সারাটা জীবন মেয়েটা কষ্ট করেছে। খুব করে চেয়েও একটা পরিবার, সুস্থ পরিবেশ আমরা ওকে দিতে পারিনি। সেই আফসোসের আমার শেষ নেই। আপনাদের উপর পরিপূর্ণ বিশ্বাস আছে। তবুও, যদি আর একবার ভালো করে ভেবে দেখতেন। হুটহাট সিদ্ধান্ত নেওয়া উভয়ের জন্যই ক্ষতিকর।”
“আপনার পরিস্থিতি বুঝতে পারছি, ভাই। আমি কিন্তু হুটহাট সিদ্ধান্ত নেই না। শিথিলও নেয় না। আমার মতোই হয়েছে। সমস্ত দায়িত্ব আমি নিলাম। নিজের মেয়ের মতো যত্ন করে রাখবো।”
সন্তুষ্ট হলেন মোজাম্মেল হোসেন। বুঝাই গেলো তিনি যে রাজি। কিন্তু রাজি হলেন না শাহিনূর। বোঝানোর ভঙিতে বললেন,“শিথিল বাচ্চা ছেলে, দুলাভাই। ওর কী এখনো সংসার করার বয়স হয়েছে?অদূর ভবিষ্যৎ পড়ে রয়েছে সামনে। এখন লেখাপড়া, ক্যারিয়ারের পেছনে ওর দৌড়ানোর সময়। ওর জীবনে মেয়ের কী অভাব পড়েছে নাকি? আপনি অন্তত ওর সঙ্গে তাল মেলাবেন না। হাল শক্ত করে ধরুন। এই বিয়ের চক্করে সুহাসিনীর লেখাপড়াটাও সম্পন্ন হলো না। মেহমাদ নিতান্তই ভালো ছেলে বলে তা না হয় মেনে নেওয়া যায়। কিন্তু তাই বলে আবৃত্তি! ও শিথিলের সঙ্গে যায়? আমি ওই বাঁদরের সঙ্গে কথা বলবো। ওকে ভালো করে বুঝাবো। আমি নিশ্চিত, ও বুঝবে। এই বয়সে ছেলে-মেয়েরা এমন একটু আধটু ভুল সিদ্ধান্ত নেয়। ও লেখাপড়া শেষ করুক। ওর বিয়ের দায়িত্ব আমার। পুরো বাংলাদেশ খুঁজে ওর জন্য যোগ্য মেয়ে নিয়ে আসবো। যদি না পাই তারপরেও চিন্তা নেই। আমার সুশ্রী তো আছেই। আপনাদের চোখের সামনে বড়ো হয়েছে।”
একনাগাড়ে কথাগুলো বলে থামলেন শাহিনূর। স্ত্রীর কথায় বিরক্ত হলেন মোজাম্মেল হোসেন। কিছু বলার চেষ্টা করলেন,“প্রাপ্ত বয়স্ক ছেলে-মেয়ে। আমি, তুমি না করার কে?”
স্বামীর দিকে চোখ রাঙিয়ে তাকালেন তিনি।চাপা ক্ষোভ ঝাড়লেন,“তুমি চুপ করো। তোমার ভাগ্নিকে আমার ভাগ্নের ঘাড়ে ঝুলাতে চাইছো? আমি তা কখনোই হতে দিবো না।”
হামিদুল হক হতাশ শ্বাস ফেললেন। ব্যাপারটা যে এত জটিল হবে তা তিনি ভাবতে পারেননি।তবুও শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করে গেলেন। বুঝলেন, শাহিনূরের মত বদলানো কিছুতেই সম্ভব নয়। তবে এর মত বদলানো না গেলে বিয়েও তো সম্ভব নয়। অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া কী আর মেয়েদের বিয়ে হয়? সেদিনের মতো আলাদাভাবে মোজাম্মেল হোসেনের সঙ্গে কথা বলে বিদায় নিলেন হামিদুল হক। যদিও শাহিনূর সেদিন রাতটা ও বাড়িতে থাকার অনুরোধ করলেন কিন্তু তিনি থাকলেন না। এমনকি এতোদূর এসেও ছেলের সঙ্গে দেখা করলেন না। ফিরে এলেন বাড়ি।
__________
বাড়িতে এত বড়ো একটা কান্ড যে ঘটে গেলো তা সুশ্রী জানলো না। সে বাড়ি ফিরল সন্ধ্যার একটু আগে। নিজ ঘরে প্রবেশ করেই গোসল সেরে বিছানায় লুটিয়ে পড়ল। চঞ্চল মিশমিও আজ বড়ো বোনকে এসে কিছু বললো না।
হামিদুল হক যাওয়ার পর থেকেই শাহিনূর ভীষণ রেগে আছেন। উনার সমস্ত রাগ আবৃত্তির উপর। রাতের খাওয়ার পর আবৃত্তির ডাক পড়ল উনার ঘরে। আবৃত্তি এলো। চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল দরজার পাশ ঘেঁষে। তার দিকে রূষ্ট দৃষ্টিতে তাকালেন শাহিনূর। রাখঢাক না রেখেই প্রশ্ন ছুঁড়লেন,“তোমার আর শিথিলের মধ্যে কোনো সম্পর্ক আছে? কতদিনের সম্পর্ক? কীভাবে হয়েছে? সত্যি কথা শুনতে চাই।”
“কোনো সম্পর্ক নেই।”
“সম্পর্ক ছাড়াই কেউ বিয়ে করতে চায়? চোখ ধাঁধানো রূপও তো নেই যে পুরুষ মানুষ পাগল হয়ে যাবে।”
কণ্ঠে বিদ্রুপ ঝরে পড়ল। আবৃত্তি চুপ রইল। শাহিনূর কঠিন স্বরে বললেন,“লেখাপড়ার নাম করে হোস্টেলে গিয়ে এসবই করা হচ্ছে? ছেলে নাচানো হচ্ছে?”
“আমি কোনো ছেলে নাচাইনি। উনি নিজেই এসে কথা বলেছেন। বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছেন। এখানে আমার দোষ কোথায়?”
“একদম মুখে মুখে তর্ক করবে না।তোমার বাপ তোমায় ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে। এসে পড়েছো মামাদের ঘাড়ে।আর এসেই কিনা এসব করে বেড়াচ্ছো? যাই হোক, আমি এসব ভুলে যেতে চাই। তুমিও ভুলে গেলেই ভালো। হোস্টেলে ফেরার প্রয়োজন নেই। তুমি এখানেই থাকবে। এখান থেকে গিয়ে ক্লাস করবে। যাওয়ার পথে সুশ্রীর সঙ্গে যাবে। শিথিল ছেলেমানুষ। দুনিয়া সম্পর্কে কতটুকু জানে? ওর সঙ্গে আর যোগাযোগ রাখবে না। এটাই তোমার জন্য ভালো হবে। বুঝতে পারছো?”
হ্যাঁ না কিছুই বললো না আবৃত্তি। তার নিরবতায় বিরক্ত হলেন শাহিনূর। রাগত স্বরে বিদায় দিলেন, “যাও এখন।”
আবৃত্তি চুপচাপ চলে এলো ঘরে। মিশমি গালে হাত রেখে বিছানায় বসে ছিল। কোনো এক ভাবনায় মগ্ন। আবৃত্তিকে দেখেই ললাটে ভাঁজ পড়ল তার। টেনে এনে বসালো বিছানায়। অবিশ্বাস্য কণ্ঠে বলে উঠল, “আমি কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছি না, আপু। এ তুমি কী ঘটনা ঘটিয়ে ফেললে?”
মিশমিও যে এমনভাবে প্রশ্ন করবে তা ভাবতেও পারেনি আবৃত্তি। নিজেকে তার হীন মনে হচ্ছে। সবাই কী তাকে নিচু দৃষ্টিতে দেখছে? বোধহয়। মিশমির উত্তেজনা কিছুতেই কমছে না। শিথিল আর আবৃত্তি নাম দুটো একত্রে উচ্চারণ করতেই তার বাঁধছে। সেখানে বিয়ে! মারাত্মক ব্যাপার। চিন্তায়ও আনতে পারে না। পুনরায় বললো,“আমার মনে হচ্ছে আমি স্বপ্ন দেখছি। শিথিল ভাই আর তুমি কীভাবে?”
“কেনো?”—কণ্ঠে কিছুটা ক্ষোভ ঝরে পড়ল যেন আবৃত্তির।
মিশমি ভড়কে গেলো,“না, আসলে এটা কীভাবে হয়? শিথিল ভাই কীভাবে তোমাকে পছন্দ করতে পারে?”
“আমি কালো বলে আমায় কেউ পছন্দ করতে পারবে না? তোমাদের বাড়িতে এতোকাল থাকতাম বলে কারো যোগ্য নই? নাকি তোমারও ধারণা তোমার শিথিল ভাইকে আমি ফাঁসিয়েছি?”
স্তব্ধ হয়ে গেলো মিশমি। এমন কিছু সে ভাবনায় আনেনি। সে তো শুধুই নিজের কৌতূহল দমাতে না পেরে জিজ্ঞেস করেছে। তাছাড়া আরো একটি কারণ অবশ্য রয়েছে। মিশমির ধারণা, সুশ্রীও শিথিলকে পছন্দ করে। তার হাবভাবে এমন ধারণা আসা অসম্ভব কিছু নয়। বড়ো বোনকে মিশমি খুব ভালো করেই চেনে। সে যদি একবার জানতে পারে এ বিষয়ে! তাহলে কী হবে কে জানে? ভাবলেই দেহ শীতল হয়ে ওঠে মিশমির। তাই এ বিষয়ে তার বিস্তারিত না জানলেই নয়।
আবৃত্তির সারা দেহে তাপমাত্রা বেড়ে গিয়েছে। হাত-পা ঘেমে একাকার। কয়েক মুহূর্তে কি থেকে যে কি হয়ে গেলো! তার জীবনটা এত জটিলতায় ভরা কেনো? এই মুহূর্তে এসেও বাবার প্রতি প্রচন্ড রাগ হলো। ওই একটা লোকের জন্য তার আজ এই দশা।
তখনি মোবাইলে রিং হলো। স্ক্রীনে তাকাতেই বুক চিরে বেরিয়ে এলো দীর্ঘশ্বাস। আরেক সমস্যার মূল কল করেছে। মোবাইলটা নিয়ে বারান্দার দিকে হাঁটা ধরলো আবৃত্তি। মিশমির উদ্দেশ্যে বলে গেলো,“সত্য বললেও আমার কথা তোমাদের বিশ্বাস হবে না। কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা আসামিদের কথা কেই বা বিশ্বাস করে? এরচেয়ে তুমি তোমার ভাইকেই জিজ্ঞেস করো, কীভাবে তাকে ফাঁসিয়েছি।”
চলবে _______
(কপি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।)

