#মেঘমেদুর_দিনে
লেখনীতে: #মাশফিত্রা_মিমুই
[পর্ব:২৭]
বিশ্ববিদ্যালয় জীবন প্রথম দুই বছরই স্বর্গীয়। এরপর জীবনে নেমে আসে ধোঁয়াশা, ব্যস্ততা। কেউ বন্ধু হারায়, কেউ হয় নিঃসঙ্গ আবার কেউ বা বিচ্ছেদের অতল সমুদ্রে ডুবে গিয়ে মানসিক বিপর্যস্ততার মুখোমুখি হয়। শিথিলের বন্ধুমহলে লেখাপড়ার ভীষণ ব্যস্ততা। বিশেষ করে শান্ত আর সজীবের। আর কদিন পর তাদের ফাইনাল। যেকোনো মুহূর্তে কর্তৃপক্ষ থেকে নোটিশ চলে আসতে পারে। তাই বিভিন্ন আড্ডায় কিংবা শতশত দুষ্টুমিতে তাদের উপস্থিতি কমে গিয়েছে। শিথিলদের অবস্থাও অবশ্য আহামরি ভালো নয়। তাদেরও পরীক্ষা। চতুর্থ বর্ষ থেকে পঞ্চম অর্থাৎ শেষ বর্ষে ওঠার অসহ্যকর পরীক্ষা।
শিথিল আর আরফিনের পরীক্ষা দিতে ভালো লাগে না। প্রয়োজন হলে সারাবছর বিশ্ববিদ্যালয়ের আনাচে কানাচে তারা ঘুরে বেড়াতে রাজি কিন্তু পরীক্ষা দিতে রাজি নয়। তবুও দিতে হয়। বাধ্য হয়ে। তবে রোজার মধ্য থেকে চাপটা যেন একটু বেশিই পড়েছে। স্বাধীন আঙুলে কলম ঘুরাতে ঘুরাতে প্রফেসরের দিকে দৃষ্টি রেখেই বই দিয়ে মুখ ঢেকে বিরক্তি নিয়ে বললো, “শান্তিমতো একটু ঘুমাতেও পারি না। এত সকালে কে ক্লাস নেয়, ভাই? রোজ এত কষ্ট করে ক্লাস করেও আবার লাভ নেই। সিজিপিএ মেরে দেয়।”
আরফিন তার মতো করেই বললো,“রমজান মাস হলো ইবাদতের মাস। সারা বছরের সকল পাপ ধুয়ে সওয়াব কামানোর মাস। ওই পবিত্র মাসেই তো এই মগাগুলো ক্লাস করিয়েছে। একটুও ছাড় দেয়নি। সেখানে এটা তো সাধারণ মাস। দূর ভাল্লাগে না।”
শিথিল তার মতো করেই বললো,“এরা হচ্ছে মানুষরূপী শয়তান। আল্লাহ মাফ করুক। সঠিক বোঝ দান করুক এই দুনিয়া আঁকড়ে বেঁচে থাকা বলদদের।”
আরফিন আর স্বাধীন চোখ বন্ধ করে করুণ সুরে বলে উঠল,“আমিন!”
দূর থেকে স্যার হয়তো দেখলেন। কলম উঁচু করে ধমক দিলেন স্বাধীনকে। দাঁড় করিয়ে বেশ কিছুক্ষণ ভরা ক্লাসে কথা শোনালেন। সারা রাত ঠিকমতো ঘুম হয়নি স্বাধীনের। ফজরের নামাজটা পড়ে বিছানায় শুয়ে চোখ বন্ধ করতেই বেজে উঠেছিল সাড়ে সাতটার অ্যালার্ম। চোখে ঘুম নিয়ে অযথা কথা শুনতে ভালো লাগলো না তার। তবুও ভান করল যেন বিশাল একটা ভুল করে ফেলেছে! শেষ মুহূর্তে প্রফেসরদের চেতানো উচিত নয়। সিজিপিএ তো এদের হাতেই!
সবগুলো ক্লাস শেষ করে বিল্ডিং থেকে নিচে নেমে এলো ওরা চারজন। চারিদিকে ছেলে-মেয়েদের গল্পের আসর বসেছে। শান্ত, সজীব না থাকায় আজ আর ওরা আড্ডায় বসলো না। স্বাধীন প্রস্তাব রাখলো,“চল দুপুরের খাবারটা কাছেপিঠে কোথাও খেয়ে রমনা থেকে ঘুরে আসি।”
আরফিন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,“বহুদিন সুন্দর সুন্দর মেয়ে দেখি না।”
তুহিন চমকালো,“তুই আবার এমন লুচ্চা হলি কবে থেকে? এসব তো শান্ত, সজীবের কথা।”
“ব্রেকাপের পর থেকে। মেয়ে না দেখলে বিয়ে করবো কীভাবে?”
“আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে মেয়ের অভাব আছে?”
“না, ওদিকে আর যেতে চাই না।”—হতাশা মিশ্রিত কণ্ঠ তার।
কথার এক ফাঁকে আরফিন শিথিলের পানে পূর্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে প্রশ্ন ছুঁড়ল,“তুই বিয়ে করছিস কবে? ভাবি রাজি হয়েছে?”
“ধারণা অনুযায়ী তো আজ কালকের মধ্যেই করার কথা ছিল। গতকাল বাবা প্রস্তাব নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এরপর কী হলো কে জানে? বাবাও ঠিকমতো কিছু বললো না, ওদিকে ভবিষ্যৎ বউও কল ওঠাচ্ছে না। এই ঝামেলা ভালো লাগে?”
তুহিন বললো,“রিজেক্ট হয়েছিস? কেমনে সম্ভব? তার মামী না তোর আন্টি?”
“এখানেই মূল সমস্যা। গতকাল রাতে ফোন করে আজ আন্টি যেতে বলেছে। জরুরি তলব। তোরা কোথায় যাবি যা। আমি বাসায় ফিরবো। ফ্রেশ হয়ে ওখানে গিয়ে দেখি কী অবস্থা!”
স্বাধীন ভরসা দিয়ে বললো,“একদম চিন্তা করবি না। তোর আন্টি যদি ভিলেন হয় তাহলে ভাবিকে তুলে নিয়ে কাজী অফিসে গিয়ে তোদের বিয়ে পড়িয়ে দেওয়ার দায়িত্ব আমাদের। প্রয়োজনে ভাবির বাপ হবে আমাদের ব্রিলিয়ান্ট ছাত্র তুহিন।”
তুহিন বাদে সকলে হাসলো। তেতে উঠে বললো, “আমি বাপ হবো মানে? মেজাজ গরম করবি না, স্বাধীন। আমার কী বাপ হওয়ার বয়স হয়েছে?”
“উকিল বাপ হবি।”
“তুই হ গিয়ে।”
“আমি উকিল বাপ হলে দেবর হবে কে?”
“আমি আর আরফিন হবো।”
স্বাধীন হায় হায় করে উঠল,“দেখ বন্ধু শিথিল, দেখ। এই পোলার মাথায় তোর বউ নিয়ে কী চলছে দেখ। বন্ধুর বউ মানে নিজের বউ নামক পোস্ট দেখে তোর মাথায়ও এসব আসেনি তো?”
তাদের ঝগড়ার মধ্যে আর থাকলো না শিথিল। যেতে যেতে বলে গেলো,“তোদের একটাকেও আমি আমার বউ দেখাবো না। যা ইচ্ছে কর।”
তিনজনেই আহাম্মক বনে গেলো। স্বাধীন চেঁচালো, “বউ না দেখালে তুই দাম্পত্য জীবনে অসুখী হবি, মগা।”
সেকথায় বিশেষ পাত্তা দিলো না শিথিল।
________
সাবেরা বিবি ছোটো কন্যার বাড়ি থেকে মেজো কন্যার বাড়িতে এসে পৌঁছেছেন সকাল দশটার আশপাশ সময়ে। মাকে পেয়ে ভীষণ খুশি হলেন শাহিনূর। পেটের মধ্যে চেপে রাখা সমস্ত কথা গড়গড় করে মায়ের কানে উগলে দিলেন। এই জন্যই মূলত শিথিলকে আজ তিনি আসতে বলেছেন। দুজনে মিলে বুঝালে অবশ্যই শিথিল বুঝবে।
আবৃত্তিকে সাবেরা বিবির একদম পছন্দ নয়। বিশেষ করে যেদিন মেয়েটা উনার সঙ্গে তর্ক করে বিরুদ্ধাচরণ করেছে সেদিন থেকেই। কথাগুলো শোনার পর থেকে রাগে গজগজ করছেন বৃদ্ধা। তেড়ে যেতে চেয়েছিলেন আবৃত্তির কাছে। কয়েকটা কড়া কথা না শোনালে হবে না। কিন্তু শাহিনূর বুঝিয়ে সুঝিয়ে আটকে রেখেছেন মাকে। স্বামী জানলে রেগে যাবেন। সর্বদা কী আর স্বামীকে নারাজ করা যায়?
শিথিল এলো ঠিক তিনটা বেজে পাঁচ মিনিটে। গেটের পাহারায় বসে দারোয়ান আজিজ পুরোনো আমলের গান শুনতে শুনতে গুনগুন করছেন। তাকে দেখে হেসে উঠে দাঁড়ালেন ভদ্রলোক। শিথিলও বিপরীতে হাসলো। ঠান্ডা মিল্ক সেকের বোতল ধরিয়ে দিয়ে বললো,“আজ অনেক গরম পড়েছে! নিন মিল্ক সেক খেয়ে চাঙ্গা হয়ে উঠুন।”
খুশি হলেন আজিজ। সবার মতো উনার সঙ্গেও সম্পর্ক বেশ ভালো শিথিলের। যতবার আসে ততবারই কিছু না কিছু দিবেই। মুখের ললিপপটা ডাস্টবিনে ফেলে উপরে উঠে এলো শিথিল। কলিং বেল বাজাতেই দরজা খুলে দিলো মিশমি। শিথিল ভ্রু কুঁচকালো। তেতো মুখে প্রশ্ন করল,“পড়াশোনা নেই? অসময়ে বাড়িতে কী?”
“কলেজে এপ্লাই করেছি।”
“ফলাফল কী?”
“আজ সন্ধ্যায় আসবে।”
“সরো সামনে থেকে।”
“আকাম কুকাম ঘটিয়ে এত চিল মুডে কীভাবে আছেন? লজ্জা করছে না?”
“না, লজ্জা থাকলে পৃথিবীর জনসংখ্যা এত বেশি কী করে হতো?”
“আপনার থেকে এসব আশা করিনি। কে কাকে পটালো?”
“বলবো না। জানলে কীভাবে?”
“না জানার কিছু নেই। আমার সামনেই ঘটেছে।”
“ভালোই হয়েছে। তা সে কোথায়?”
“কে?”
“তোমার ভাবি।”
হতভম্ব হয়ে গেলো মিশমি।যতটা ভেবেছিল তার চেয়েও নির্লজ্জ এই ছেলে। বোনকে ভাবি বানিয়ে দিলো? হাত থেকে পলিথিন দুটো টেনে নিলো। খুশিতে গদগদ হয়ে বললো,“দুদিন ধরে মনটা আইসক্রিম আইসক্রিম করছিল। জানলেন কীভাবে, ভাইয়া? চকলেট ফ্লেভার আমার বেশি পছন্দ। ওটাই আনতেন।”
তাকে পাশ কাটিয়ে ভেতরে এসে সোফায় বসলো শিথিল। মুখ কুঁচকে বললো,“যা এনেছি তা নিয়ে খুশি থাকো।” এরপর আস্তে করে বললো,“কল ধরছে না মেয়েটা। এখান থেকে গিয়ে ভিডিও কল দিলে রিসিভ করে ওর সামনে ধরবে কিন্তু।”
“ভালোবাসা উতলে পড়ছে।”
“স্বাভাবিক। আন্টিকে ডেকে আনো তাড়াতাড়ি।”
মিশমি সর্বপ্রথম শাফিনকে ডেকে পিরিচ আর চামচ আনতে পাঠিয়ে খবর পৌঁছে দিলো মায়ের কাছে। এরপর চলে গেলো নিজের ঘরে। আবৃত্তি বই পড়ছিল। তার পড়ায় ব্যাঘাত ঘটিয়ে আইসক্রিমের বাটি দেখিয়ে দেখিয়ে বললো,“কে এসেছে জানো?”
“কে?”
“তোমার প্রিয়তম।”
“মানে?”
“শিথিল ভাই।”
অবাক হলো আবৃত্তি। মিশমি ফের বললো,“তোমার জন্য নয়। আম্মু ডেকে এনেছে। যাবে নাকি একবার? কালো শার্টে আজ একটু বেশিই সুন্দর লাগছে।”
প্রত্যুত্তর করল না আবৃত্তি। মিশমি গিয়ে ফ্যান বন্ধ করে দিলো। ড্রয়িং রুমের আওয়াজ তার ঘর পর্যন্ত পরিষ্কার আসে না। তবে সুশ্রীর ঘরে বসে আবার সেসব ভালো করেই শোনা যায়। কিন্তু সেখানে আপাতত আবৃত্তিকে নিয়ে যাওয়া যাবে না। পথে শিথিলের সঙ্গে দেখা হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
শাহিনূর আর সাবেরা একসঙ্গে এসে বসলেন। বৃদ্ধাকে দেখে অধরে হাসি ফুটে উঠল শিথিলের,“আরে বড়ো নানু যে! আসসালামু আলাইকুম। কেমন আছেন?”
“ ওয়া আলাইকুমুসসালাম, আলহামদুলিল্লাহ ভালা। তোর কী খবর?”
“আলহামদুলিল্লাহ ভালো। তা হঠাৎ জরুরি তলব?”
“এইডা তোর বিয়ার বয়স? তাও আবার বেহায়ার মতো বাপেরে পাডাইছোস বিয়ার প্রস্তাব লইয়া। এই যুগের পোলা হইয়া রুচি এত খারাপ কেমনে হয়? শেষমেশ ওই কাল্লিরে পছন্দ হইছে?”
অধরের হাসি নিভে গেলো শিথিলের। ফ্যালফ্যাল নয়নে তাকিয়ে রইল বৃদ্ধার পানে। শেষ কথাটা বুঝতে পারলো না যেন। মায়ের কথায় শাহিনূর বিরক্ত হলেন। কোথায়, কার সামনে কী বলতে হয় এখনো শিখেননি। শিথিল কিছুক্ষণ সময় নিয়ে কৌতূহলী হয়ে বললো, “বিয়ে হালাল এবং গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়। সবাইকেই একসময় না একসময় করতে হয়। তাহলে বাবাকে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে পাঠাতে লজ্জা কীসের? তাছাড়া রুচি খারাপ মানে? আর কাল্লি কে?”
শাহিনূর জোরপূর্বক হাসলেন,“রাখ তো তোর নানীর কথা। কী বলতে কী বলে ফেলেছে।”
মেয়ের কথায় মুখ বাঁকালেন সাবেরা বিবি। পুনরায় বললেন,“ভুল কী কইছি? মাইয়ার মা নাই, বাপের ঠিক নাই, অন্যের কাছে থাইক্কা বড়ো হইছে। একেবারে বিয়া করার মতন চেহারা সুরতও তো নাই। তাইলে এমন সিদ্ধান্ত নিলি কেমনে? আর তোর বাপেও বা কেমনে নাচতে নাচতে চইল্লা আইলো?”
বাবার নামে কোনো কথা শুনতে পারে না শিথিল। এবারো পারলো না। গম্ভীর মুখে বললো,“আমার বাবা আপনার চেয়েও জ্ঞানী এবং রুচিশীল মানুষ। তিনি কখনো কারো অবস্থান এবং গায়ের রং নিয়ে খোঁটা দেন না। কিংবা সন্দেহবশত গীবত করেন না। তিনি সৎ, বুদ্ধিমান মানুষ। উনার সম্পর্কে একটা শব্দ উচ্চারণ করার আগেও ভেবে নিবেন।”
শাহিনূরের বুক ধড়ফড় করে উঠল। চাপা ধমক দিলেন মাকে,“তোমাকে এসব বলার জন্য এখানে এনেছি? তুমি বেশি কথা বলো, মা। ছেলে-মেয়ের আবদার দুলাভাই ফেলতে পারেন না তাই এসেছেন। খারাপ কিছু তো করেননি। আমাদের উচিত শিথিলকে সঠিকটা বোঝানো।”
মিইয়ে গেলেন বৃদ্ধা। শাহিনূর নমনীয় হয়ে ভাগ্নের উদ্দেশ্যে বললেন,“মায়ের কথা ধরিস না, বাবা। আমরা কী তোর খারাপ চাই? তুই জানিস না আমি তোকে কত ভালোবাসি? সারাক্ষণ তোর চিন্তায় থাকি।”
“জানি।”
“তোর মা আমার নিজের বোনের থেকেও বেশি ছিল। নিজের বোনদের কাছে আমি যা বলতে পারতাম না তোর মায়ের কাছে তা অনায়াসে বলে দিতাম। আমার বিয়েটা পর্যন্ত হয়েছে তোদের বাড়ি থেকে। আজ সে বেঁচে থাকাকালীন তুই ভুল করলে এভাবেই তো তোকে বুঝাতো, তাই না?”
“হ্যাঁ, সব মানছি। কিন্তু ভুল কী করেছি?”
তৎক্ষণাৎ জবাব দিতে পারলেন না শাহিনূর। যুবক ছেলেদের সঙ্গে একটু বুঝেশুনে, বুদ্ধি করে কথা বলতে হয়। তা তিনি জানেন। উনার নিরবতায় শিথিলও নরম স্বরেই বললো,“হারাম পন্থা অবলম্বন না করে হালাল পথ বেছে নিয়েছি। মেয়েটাকে পছন্দ হয়েছে বিধায় বাবাকে বলে রাজি করিয়েছি। তোমরা ওর অভিভাবক তাই তোমাদের কাছেই প্রস্তাব পাঠিয়েছি। এটা কী ভুল, আন্টি? তোমার কী মনে হয় একদিনে আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি?”
“সেকথা আমি বলিনি। আমরা জানি তুই ভালো ছেলে। তোর সিদ্ধান্ত একদম যথাযথ। ভুল হচ্ছে, ভুল মানুষকে বেছে নেওয়া। সবার সঙ্গে কী সবাইকে মানায়? তুই তো সব জানিস। পৃথিবীতে ভালো মেয়ের অভাব পড়েছে?”
“আবৃত্তি মেয়েটা ভালো না বলছো?”
“তা না, কিন্তু ওর পারিবারিক ব্যাপারটা তো জানিস? ও তোর জন্য সঠিক মানুষ নয়। বরং তোর জন্য একজন ভালো সাংসারিক মেয়ে প্রয়োজন। যে তোকে আগলে রাখতে পারবে। সংসারটা শক্ত হাতে সামলাতে পারবে।”
“আমি কী বাচ্চা ছেলে যে আমাকে আগলে রাখতে হবে? নিজের দায়িত্ব নিজে নেওয়া আমার বাবা আমাকে শিখিয়েছেন। তাছাড়া মেয়ে কী রান্নাবান্না জানে না?”
“তা জানে।”
“চরিত্র খারাপ?”
“এ কী বলছিস? এদিক থেকে ভালো।”
“শারীরিক সমস্যা আছে? কানে কম শোনা, মানসিক ভারসাম্যহীন টাইপ?”
“তা নেই।”
“তাহলে সমস্যা আসলে কোথায়? এমন মেয়েই তো স্ত্রী হিসেবে পারফেক্ট। মা তো আমারো নেই। মা ছাড়া বড়ো আমিও হয়েছি। পৃথিবীতে কত মানুষেরই মা নেই। তাই বলে ওদের বিয়ে হয় না?তোমরা কী ওকে কখনো বিয়ে দিবে না? তাহলে আমার সঙ্গে দিলে কী সমস্যা?”
সাবেরা বিবি কাঁচুমাচু মুখে বললেন,“মা নাই তো কী হইছে? তুই আর ওই মাইয়া এক?”
“এক অবশ্য নই। পার্থক্য হচ্ছে, আমি ছেলে আর সে মেয়ে। আমি বয়সে বড়ো, সে ছোটো। আমি একজন ভালো বাবা পেয়েছি কিন্তু সে পায়নি।”
শিথিলকে বোঝানো যতটা সহজ শাহিনূর ভেবেছিলেন ততটা সহজ যেন নয়। এই ছেলের সঙ্গে যুক্তিতর্কে জেতা অসম্ভব। শিথিল মৃদু হেসে বললো,“গায়ের রঙের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে মানুষের মনের রঙ, চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য এবং চিন্তা-ভাবনা। শ্যামলা আর কালোর মধ্যে বহু পার্থক্য রয়েছে। তার থেকেও সত্য কথা হচ্ছে, আমার মাও ছিলেন শ্যামলা। তাই বলে কী বাবা ভুলে গিয়েছিলেন মাকে? অন্য কাউকে ঠাঁই দিয়েছিলেন মায়ের স্থানে? নাকি আমার মাকে নিয়েও আপনার মস্তিষ্কে এমন কুৎসিত চিন্তা-ভাবনা ছিল, নানু? যা আজ অন্যভাবে প্রকাশ করলেন?”
সাবেরা বিবি মিইয়ে গেলেন। এমন কিছু ভেবে কথাটা বলেননি। বোনঝিকে তিনি ভীষণ আদর করতেন। শাহিনূর চঞ্চল কণ্ঠে বললেন,“ভুল বুঝিস না, বাবা। বয়স হয়েছে তাই কী বলতে যে কী বলে ফেলে না!”
ঠিক সেই সময়ে এসে উপস্থিত হলো সুশ্রী। ক্লান্ত তার দেহ। দুপুরে ভারি কিছু পেটে পড়েনি। মিতা তার হাত থেকে দ্রুত ব্যাগ আর সাদা ইউনিফর্মটা নিয়ে চলে গেলো ঘরে। সোফায় বসে থাকা শিথিলকে দেখে অবাক হলো সুশ্রী। ক্লান্ত শ্রান্ত মুখশ্রীতে সূর্যের মতো উদিত হলো ঝলমলে হাসি। এগিয়ে এসে হাস্যোজ্জ্বল মুখে বললো,“আরে শিথিল ভাই যে! হঠাৎ কী মনে করে? আপনার তো আজকাল দেখা মেলা ভার।”
মেয়ের আগমনে কিছুটা খুশি হলেন শাহিনূর। শেষ ভরসা এবার যেন উনার বড়ো কন্যা। বললেন,“ভালো সময়ে এসেছিস। বোস তুই। ওকে একটু বুঝা। যদি তোর কথা শোনে।”
শিথিল নিরব রইল। ব্যাপারটা ধরতে পারলো না সুশ্রী। মায়ের দিকে একপলক তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,“কী হয়েছে আবার?”
“কী হয়নি সেটা বল। তোর ভাইয়ের মাথায় বিয়ের ভূত চেপেছে। লেখাপড়া শেষ হয়নি অথচ তিনি বিয়ে করবেন। তাও না হয় মানা যায়। বিয়ের বয়স হয়েছে যখন করুক। কিন্তু কাকে করতে চাইছে জানিস?”
মনে হলো বুকে যেন কেউ তীর ছুঁড়ল। বাকরুদ্ধ হয়ে কিছুক্ষণ বসে রইল সুশ্রী। ভুল শুনলো সে? জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে জিজ্ঞেস করল,“কাকে?”
“আবৃত্তিকে। তোর খালু গতকাল বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এসেছিল।”
বিমূঢ় দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সুশ্রী। শরীর রীতিমতো কাঁপছে। ক্লান্তিতে নাকি এমন জঘন্য এক সত্য শুনে? তবুও বিশ্বাস হলো না। এক টুকরো আশা নিয়ে কান পেতে রইল শিথিলের মুখ থেকে সত্যটা শোনার জন্য। শিথিল ভেতরে ভেতরে বিরক্ত হচ্ছে। নিজের ব্যক্তিগত জীবনে বাবা ছাড়া আর কাউকে সে হস্তক্ষেপ করতে দিতে নারাজ। এমনকি নিজের বড়ো বোনকেও। এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তি মেলা প্রয়োজন।তাই হাতঘড়িতে সময় দেখলো। চাপা শ্বাস ফেলে বললো,“যা সিদ্ধান্ত নিয়েছি অনেক ভেবেই নিয়েছি। তাই আমার সিদ্ধান্তে আমি অনড়। আমার অভিভাবক হচ্ছে আমার বাবা। আর বাবা সব জানে এবং মেনেও নিয়েছে। প্রাপ্ত বয়স্ক ছেলে-মেয়ে আমরা। তাই কারো আপত্তি থাকার কথা নয়। আশা করি তুমি এ বিষয়ে আরেকবার ভাববে, আন্টি। তাছাড়া এতে আবৃত্তিরও কোনো দোষ নেই। আমি নিজেই ওকে পছন্দ করে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছি। তাই এ বিষয়ে ওকে কিছু বলো না।”
এরপর টেবিল থেকে পানির গ্লাসটা তুলে নিয়ে গলা ভেজালো। নত স্বরে বললো,“কয়েকদিন পর পরীক্ষা আমার।তাই লেখাপড়ার ভীষণ ব্যস্ততা। টিউশন আছে। এখন যেতে হবে। আসি তবে?”
মূল প্রসঙ্গ বাদ দিয়ে ভাগ্নের মন থেকে নিজের জন্য তৈরি খারাপ ভাবনা দূর করতে চাইলেন শাহিনূর। আরো মিনিট পাঁচেক কথা বলে এরপর বিদায় দিলেন।
সুশ্রী সেই নিরবতা বজায় রেখে উঠে দাঁড়াল। বড়োই বেখেয়ালি কদমে নিজের ঘরের দিকে পা বাড়ালো। পথে মিতার হাত থেকে ঠান্ডা পানির বোতলটা নিয়ে দরজা আটকে সেই অবস্থাতেই বিছানায় শুয়ে পড়ল। আজ দিনটি ভীষণ খারাপ।
চলবে ________
(কপি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।)

