#মেঘমেদুর_দিনে
লেখনীতে: #মাশফিত্রা_মিমুই
[পর্ব:২৮]
ধরিত্রীতে রাত নেমেছে। কিন্তু রাতের এই আঁধার শহরে যেন ভীষণ বেমানান। কৃত্রিম আলোতে আলোকিত হয়ে উঠেছে চারিদিক। অন্ধকার, বদ্ধ ঘরে জানালার কোল ঘেঁষে উদাস যুবতীর ন্যায় বসে আছে সুশ্রী। দৃষ্টি আকাশে জ্বলজ্বল করা তারকামণ্ডলীর পানে। ক্যারিয়ার নিয়ে আত্মসচেতন মেয়ে আজ আর বইয়ে হাত লাগায়নি। নোট পাঠাতে বলা বান্ধবীর কলটাও রিসিভ করেনি। করেনি লম্বা চুলে বেনুনী। রূপে যেন বিষণ্ণতার ছাপ পড়েছে।
হঠাৎ অন্ধকার ঘরে কারো উপস্থিতি টের পাওয়া গেলো। সাবধানে পা ফেলে পাশে এসে দাঁড়াল মিশমি। উশখুশ করতে করতে জিজ্ঞেস করল,“রাতে খাবি না? দুপুরেও তো মনে হয় না খেয়েছিস। নুডলস্ রান্না করে আনবো?”
“না, ঘুমা গিয়ে।”
“আপু!”
“বিরক্ত করিস না।”
“শিথিল ভাইকে পছন্দই যেহেতু করিস তাহলে এতদিন বলিসনি কেনো? এতদিন যখন বলিসনি এখন কেনো অনশনে বসেছিস?”
স্থির, অনুভূতিশূন্য হয়ে বসে থাকা সুশ্রী হঠাৎ করেই চমকে গেলো। বিস্ফোরিত নেত্রে তাকালো ছোটো বোনের মুখ পানে। এ কথা কখনো কাউকে বলেনি সে। চেপে রেখেছে নিজের মন মস্তিষ্কে। তাহলে ও জানলো কীভাবে? মিশমি হয়তো তা বুঝতে পারলো। বসে পড়ল পাশের ফাঁকা স্থানে। বললো,“জানাটা বোধহয় কোনো কঠিন কিছু নয়। তোর বোন হই আমি। তোর চোখের ভাষা, আচরণ, কোন হাসির কী অর্থ সব বুঝতে পারি।”
শরীরটা যেন দুর্বল হয়ে পড়ল সুশ্রীর। দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে ক্লান্ত, ভঙ্গুর কণ্ঠে বললো,“অথচ উনি বুঝলেন না। আমার তিলতিল করে গড়ে ওঠা অনুভূতি সম্পর্কে কিচ্ছুটি জানলেন না। আবৃত্তির সাথে কীভাবে? কখন হলো এসব? আমি কেনো জানতে পারলাম না?আবৃত্তি কী আমার থেকেও সুন্দরী?”
“ব্যাপারটা সৌন্দর্যের নয়। ব্যাপারটা হচ্ছে অনুভূতি আর মনের মিলের। সবাই কী আর সৌন্দর্যের পূজারী হয়? শিথিল ভাই তো বরাবরই অদ্ভুত মানুষ। তাই উনার কাজকর্ম, পছন্দও অদ্ভুত হবে এটাই তো স্বাভাবিক।”
“এখন আমার কী করা উচিত?”
“যখন করা উচিত ছিল তখন কেনো করিসনি? নিজের অনুভূতি গোপন রেখে লাভ কী হলো?”
“একতরফা অনুভূতি। কীভাবে প্রকাশ করতাম?”
“আমায় তো বলতে পারতি।”
“অত গভীর সম্পর্ক কোনোকালেই আমাদের ছিল না।”
“তার দায়ও কিন্তু তোর। সারাজীবন শুধু প্রাতিষ্ঠানিক ক্যারিয়ার নিয়েই ভেবে গেলি। কী হবে এসব ক্যারিয়ার দিয়ে? চাকরি, টাকা-পয়সা দিয়ে কী হয়? মানব জীবনের মূল এচিভমেন্ট কখনোই এগুলো হতে পারে না। সবার আগে হচ্ছে মানসিক শান্তি। সেই শান্তি পেতে হলে লাগে একজন আদর্শ জীবনসঙ্গী। সুন্দর একটা সংসার।”
“এত কঠিন, বোঝদার কথা শিখলি কোত্থেকে? ছোটো বোন বলে একদম মনে হচ্ছে না।”
উত্তর দিলো না মিশমি। চুপচাপ বসে থাকলো বেশ কিছুক্ষণ। আজ কথা বলতে ভীষণ ইচ্ছে করছে সুশ্রীর। তাই সে চুপ থাকলো না। বললো,“এখন কী করবো আমি? আবৃত্তিকে গিয়ে বলবো? বল না, বলবো গিয়ে? শিথিল ভাইকে আমি পছন্দ করি। তুই মাঝখানে আসিস না।”
“বোঝদার মানুষদের বাচ্চামো করা উচিত নয়। এখানে আবৃত্তি আপুর কোনো দোষ নেই। সে কখনো মাঝখানে আসেনি। তোর আর শিথিল ভাইয়ের মধ্যে কিছু ছিলই না। তাই তাকে আনা হয়েছে।স্বয়ং শিথিল ভাই এনেছে। তবুও বেচারিকে আম্মুর কটু কথা শুনতে হচ্ছে। আজ তো নানু এসেও যোগ দিয়েছে। হোস্টেলে যেতে নিষেধ করে দেওয়া হয়েছে। অকারণে বাইরে বের হওয়া নিষেধ। এর মধ্যে তুইও যদি গিয়ে একথা বলিস তাহলে আপুর মনে কী প্রভাব পড়বে ভাবতে পারছিস?”
“তাহলে আম্মুকে গিয়ে বলবো?”
“অশান্তি আরো বাড়বে। সম্পর্কগুলো নষ্ট হয়ে যাবে।”
ভেঙে পড়ল সুশ্রী,“তাহলে?”
দীর্ঘশ্বাস ফেলল মিশমি,“সময় কারো জন্য থেমে থাকে না। এটাই চিরন্তন সত্যি। যখন সময় ছিল তখন কিছু না বলে অপেক্ষা করেছিলি। সে জন্যই আজকের দিনটা দেখতে হচ্ছে। রবের ফয়সালার উপর ছেড়ে দে সব। শিথিল ভাই তোর ভাগ্যে থাকলে নিজ থেকেই তোর কাছে আসবে। আর না থাকলে হয়তো জীবনে উত্তম কাউকে রব পাঠাবেন।”
“আমার শিথিল ভাইকেই লাগবে।”
“কবে থেকে ভালোবাসিস? কতদিনের এই অনুভূতি?”
“তখন আমি টুয়েলভে পড়ি। শিথিল ভাই পড়ে বুয়েটে, ফার্স্ট ইয়ার। তা নিয়ে আম্মুর সেকি গর্ব! আম্মুর ডাকে বাধ্য হয়েই হয়তো মাসে দুই তিনবার এ বাসায় আসতে হতো উনাকে। ওখান থেকেই ভালো লাগা শুরু। আম্মুর মুখে সারাক্ষণ উনার গল্প শুনে ভাবনার শুরু। এরপর এইচএসসি পরীক্ষা এলো। আমার সেকি ভয়! প্রত্যেক বোর্ড পরীক্ষার আগেই এমন হতো।আম্মু বললো, তোর শিথিল ভাইয়ের সঙ্গে কথা বল। এ বিষয়ে সে ভালো জানে। আমি বললাম। উপলব্ধি করলাম, ভারি সুন্দর করে কথা বলেন উনি। তখনকার মতো আমার ভয় কেটে গেলো। এরপর এলো এডমিশন। ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন আমার সেই ছোটোবেলার। শাফিন যখন আম্মুর পেটে তখন আম্মুর সঙ্গে কত যে হাসপাতালে যাওয়া হয়েছে! স্টেথোস্কোপ গলায় জড়িয়ে সাদা ইউনিফর্ম পরে ডাক্তারদের দৌড়াদৌড়ি দেখে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম আমিও ডাক্তার হবো। যেহেতু আমরা দুজনেই সাইন্সের তাই এখানেও শিথিল ভাইয়ের সাহায্য নিলাম। উনিই তো ফরম ফিলাপ করে দিলেন। বুয়েটে পরীক্ষা দিতে গিয়েও উনাকে পেলাম। তখন আমি সদ্য যৌবনে পা দেওয়া এক প্রেমপিপাসু যুবতী। ওই সময়টাতেই সম্ভবত পা পিছলে গিয়েছে। নিজের অনুভূতি সম্পর্কে যখন অবগত হলাম তখন আর পিছু হটার পথ নেই। সমস্ত পুরুষকে অবজ্ঞা করে উনাকে নিয়ে ভেবেছি, ছুতো পেলে দৌড়ে গিয়েছি একপলক দেখার জন্য, কথা বলার জন্য। লজ্জায় লাল হয়ে চোখে চোখ রেখে কথা বলতে পারিনি। অপ্রয়োজনে বান্ধবী, সিনিয়রদের ম্যাসেজ সিন না করা আমি বিভিন্ন বাহানায় ম্যাসেজ করেছি, নিজের ছবি দিয়েছি। এরপরেও বুঝলো না? কীভাবে সম্ভব?”
বলেই কান্নায় ভেঙে পড়ল সুশ্রী। হাতের আজলে মুখ ঢাকলো। আকাশে জ্বলন্ত সুখ তারাটা আচমকাই ঢাকা পড়ল এক খন্ড মেঘের আড়ালে। মিশমি তা দেখলো। মনে হলো বৃষ্টি আসবে। বৃষ্টি আসার আগমনী বার্তায় তার মন ছলাৎ করে ওঠে। আনন্দে নাচতে ইচ্ছে করে। কিন্তু বড়ো বোনের কান্না আর বিরহের সামনে সেসব বড়োই ফিকে হয়ে উঠল। মেয়েটিকে কাঁদতে দিলো। কাঁদলে মন হালকা হয়। সে ছাড়া কার কাছেই বা মনের কথা খুলে বলবে মেয়েটা? কার সামনেই বা ঝরাবে চোখের পানি? অত ভালো বন্ধু আছে কী? যারা আছে তারা নিতান্তই শুভাকাঙ্ক্ষী। বোঝদার মিশমি বোনের মাথায় সস্নেহে হাত বুলাতে লাগলো। যেন আজ দাবার গুটি বদলে গিয়েছে। সুশ্রী নয় বরং মিশমিই যেন আজ বড়ো বোন।
__________
তারপর বহুদিন পেরোলো। বৈশাখ শেষে জৈষ্ঠ্য এলো। বিশ্ববিদ্যালয়ে পুরোদমে শুরু হলো পরীক্ষা। ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের আড্ডা কমলো। যে যার মতো লেখাপড়ায় ভীষণ ব্যস্ত। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে একবার রিটেক খেয়েছিল শিথিল। তাতেই দারুণ এক শিক্ষা পেয়েছে সে। মিটে গিয়েছে ফাঁকিবাজির শখ।
স্বাধীন, আরফিন, তুহিন আর শিথিল মিলে গ্ৰুপ স্টাডি করছে। শান্ত আর সজীবের ডিপার্টমেন্ট ভিন্ন হওয়ায় ওরা দুজন হলরুমে বসে পড়ছে। বাকি রুমমেটরা অন্য ঘরে ঘুমাচ্ছে। কয়েল জ্বালানোর পরেও মশার উপদ্রব কিছুতেই কমছে না। লেখাপড়া বাদ দিয়ে এর ওর উপর থেকে মশা মারছে তুহিন। আরফিন আর স্বাধীন মিলে বড়ো এক সাদা কাগজে তৈরি করছে কিছু ডিজাইন। আশেপাশে ছড়িয়ে আছে নষ্ট করা কাগজ।শিথিল বসে একবার ল্যাপটপে কিছু করছে তো আরেকবার মোটা মোটা বইয়ে নজর ঘুরাচ্ছে।
পেন্সিল হাত থেকে ফেলে কৈ মাছের মতো লাফিয়ে উঠল স্বাধীন। পিঠ চুলকাতে চুলকাতে রাগত স্বরে বললো,“এই মশাগুলোর হাতেই হয়তো আমার মরণ হবে। আর ভাল্লাগে না। তোরা পড় আমি নিচ থেকে ঘুরে আসি।”
তুহিন বললো,“নিচে তো আরো বেশি মশা।”
আরফিন মজার ছলে বললো,“জামালপুইরা বিড়ি খাইতে যায়। মশা আবার বিড়ির গন্ধ সহ্য করতে পারে না। কারণ বিড়িতে আছে একশ কয়েলের শক্তি।”
স্বাধীন গর্জে উঠল,“এসব আজাইরা কথা কোত্থেকে শিখেছিস? যা বলবি মেনে নিবো কিন্তু সিগারেট নিয়ে কোনো কটু কথা মানবো না। কী বলিস শিথিল?”
শিথিল সহমত পোষণ করল,“একদম।”
আরফিন ঠাট্টা করে বললো,“আর কিছুতে মিল থাকুক আর না থাকুক দুই বিড়িখোরের এই জায়গায় এসে ঠিকই মিল থাকবে।”
তার কথায় পাত্তা দিলো না দুজন। স্বাধীন নিচে চলে গেলো। কিন্তু শিথিল গেলো না। এই ছাইপাশ খাওয়ার বদঅভ্যাস সে বদলাতে চাইছে। বাধ্য হয়ে দিনে এখন দুয়েকটা খায়। খুব শীঘ্রই এটাও ছেড়ে দিতে পারে।
আবৃত্তির জীবন আবারো আগের মতোই হয়ে গিয়েছে। সেই অন্যের আশ্রয়ে থাকা, দুবেলা কথা শোনা। বাধ্য হয়ে সেজো মামার বাড়িতেই থাকতে হচ্ছে তাকে। বাবা একবার দেখা করতে এসেছিলেন কিন্তু মোজাম্মেল হোসেন দেখা করতে দেননি। মিথ্যে বলেছেন। শাহিনূর সম্ভবত তাকে বিয়ে দেওয়ার জন্য উঠে পড়ে লেগেছেন। এছাড়া আর উপায় কী?
মোজাম্মেল হোসেন তখন সকালের নাস্তা করছেন। রুটি আর ঝাল ঝাল লাল মুরগির মাংস। সাথে লেবু চিপতেও ভুললেন না।ভাত হোক কিংবা রুটি দুটোতেই তিনি লেবু চিপে খেতে পছন্দ করেন। শাহিনূর পাশের চেয়ার দখল করে বসে পড়লেন। খেতে খেতে বললেন,“আজ তোমার ভাগ্নিকে দেখতে আসবে।”
মনোযোগে বিঘ্ন ঘটলো ভদ্রলোকের। মাথা তুলে তাকালেন। কিছু মুহূর্ত নিরব থেকে জিজ্ঞেস করলেন, “দেখতে আসবে মানে?” প্রশ্নটি করেই ফের চট করে বলে উঠলেন,“শিথিলের বাবা? তুমি মেনে নিয়েছো?”
বিরক্তিতে চোখমুখ কুঁচকে নিলেন ভদ্রমহিলা। মুখের খাবার চিবিয়ে বললেন,“প্রশ্নই আসে না।”
“তবে?”
“বিয়ের বয়স হয়েছে। আর কতকাল মামাদের উপর নির্ভর হয়ে থাকবে? মানসম্মান ডুবানোর আগে বিয়ে দিয়ে দেওয়াই উত্তম। মা এ বিষয়ে মাকসুদার সঙ্গে কথা বলেছিল। পাত্র মাকসুদার জায়ের ছোটো ছেলে। তার বিয়ের জন্যই মেয়ের খোঁজ চলছে। তাই আমিই ওদের আসতে বললাম। দেখে যাক। পছন্দ হলে তো ভালোই।”
“কী করে ছেলে?”
সেই উত্তর দিলেন না তিনি। মোজাম্মেল হোসেন ফের বললেন,“বোনের জায়ের ছেলের সঙ্গে বিয়ে দিতে কোনো আপত্তি নেই কিন্তু খালাতো বোনের ছেলের সঙ্গে বিয়ে দিতেই যত আপত্তি? কেনো নূর? শিথিল, ভাইজান দুজনেই তো রাজি। তবুও এমন করছো কেনো?”
এবারো উত্তর দিলেন না শাহিনূর। চুপ করে খাচ্ছেন। এটা উনার স্বভাব। ভালো করে মিথ্যে বলতে পারেন না তিনি। তাই নিরবতাই শ্রেয়।
বিকেলের দিকে ছেলেপক্ষ এলো। সাথে এলো ছেলের মা, বাবা, বড়ো ভাবি আর শাহিনূরের ছোটো বোন মাকসুদা, বোন জামাই আলামিন। কয়েকদিনের মধ্যেই কীভাবে যে এতকিছু করে ফেললেন শাহিনূর কে জানে? ভাবতেই ভীষণ অবাক হচ্ছেন মোজাম্মেল হোসেন। আবৃত্তি গিয়েছিল কলেজে।গত তিনদিন ধরেই যাচ্ছে। তবে সুশ্রীর সঙ্গে। ফেরার পথে একলা এলেও দুদণ্ড দেরি হলে পড়তে হয় জেরার মুখে। তাকে দেখতে আসার কথাটা সে জেনেছে কলেজ থেকে ফেরার পর। অর্থাৎ দুপুরে। দীর্ঘশ্বাস ফেলা ছাড়া আর কিছুই করার নেই তার। জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোতে কখনো কেউ তার মতামত নেওয়ার প্রয়োজন মনে করেনি। কারণ সে সকলের জীবনে অপ্রয়োজনীয়। টানা দু’দিন মামীর ভয়ে শিথিলের কল ধরেনি সে। তাও ছেলেটা দমেনি। মিশমির মাধ্যমে কথা বলেছে। এরপর হঠাৎ করেই যোগাযোগ বন্ধ। আবৃত্তি নিজ থেকে দুবার কল দেওয়ার পরেও রিসিভ হয়নি। তার অবজ্ঞার প্রতিশোধ নিচ্ছে নাকি কে জানে?
আজ আর আবৃত্তির সঙ্গে খারাপ আচরণ করলেন না শাহিনূর। সামনে বসিয়ে মিশমিকে দিয়ে সাজালেন তাকে। হাস্যোজ্জ্বল মুখে বললেন,“মাঝেমধ্যে রাগের মাথায় একটু বকাঝকা করেই ফেলি। মিশমিকেও করি। এর থেকে আরো বেশি। আর শাফিনকে তো দুবেলা মারতে হয়। তোমাদের ভালো চাই বলেই এমন করি। তাই খারাপ ধারণা মনে পুষে রেখো না। ছেলে খুব ভালো। নাম সজল। লেখাপড়া বেশি না করলেও নিজের একটা হার্ডওয়্যারের দোকান আছে। তাছাড়া আমার নিজের বোনের জায়ের ছেলে। কোনো সমস্যা হবে না তোমার। সারাক্ষণ চোখে চোখে থাকবে। আমি খবরাখবর নিতে পারবো। একেবারে চিন্তামুক্ত। অতীতে কী হয়েছে না হয়েছে ভুলে যাও। বর্তমান আর ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবো।ওখানে তুমি একটা পরিবার পাবে, মা পাবে, বোনের মতো জা পাবে, আর পাবে বাবা এবং ভরা সংসার।”
আবৃত্তি চুপচাপ শুনলো শুধু। ভেতরে ভেতরে ভীষণ ভেঙে পড়েছে মেয়েটা। চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করছে, এসব তার লাগবে না।কিন্তু বলতে আর পারলো কই? বিমূঢ় দৃষ্টিতে একপলক মিশমির দিকে তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নিলো। মামীর সঙ্গে বেরিয়ে এলো ঘর থেকে। মিশমি দীর্ঘশ্বাস ফেললো। তার এখানে কিছুই করার নেই। বেচারি পড়েছে ফাঁদে। না পারছে নিজের আপন বোনের কষ্ট সহ্য করতে আর না পারছে দুঃখের মধ্যে বড়ো হওয়া মামাতো বোনের কষ্ট সহ্য করতে।
ড্রয়িং রুম ভরা মানুষদের সম্মুখে একেবারে গুটিয়ে গেলো আবৃত্তি। টেনে ধরলো শাহিনূরের আঁচলের এক কোণা। শাহিনূর কিছু বললেন না। অধরে অমায়িক হাসি। বলি দেওয়ার আগেও মানুষের মুখে এমন হাসিই হয়তো থাকে। মুখ থেকে ঝরে পড়ছে আজ মিষ্টি বাক্য। তিনি ধরে আবৃত্তিকে বসালেন ছেলের মা সুলতানার পাশে। মা সুলতানা এবং বড়ো ছেলের বউ মার্জিয়া যেন এতক্ষণ অধীর আগ্রহে বসে ছিল মেয়ে দেখার জন্য। দুজনেই হাসলো। আগাগোড়া ভালো করে দেখে একে অপরকে ইশারা করল। সুলতানা প্রথম জিজ্ঞেস করলেন,“নাম কী, মা?”
“আবৃত্তি।”
“বয়স?”
উত্তরটা শাহিনূর দিলেন,“সবে কুড়িতে পা দিয়েছে।”
“ভালো। তা বড়ো বউ, ছবিতে মেয়েকে একটু বেশিই ফর্সা মনে হয়েছিল না? মনে হয় ইডিট ফিডিট করেছে।”
মার্জিয়া মাথা নাড়াল,“হ্যাঁ, তাই তো মনে হচ্ছে। আমরা যে কত মেয়ে বাতিল করেছি! একটামাত্র দেবর আমার। বউ আনলে সুন্দরীই আনবো।”
সুজন ফ্যালফ্যাল নয়নে তাকিয়ে আছে আবৃত্তির দিকে। দেখতে স্বাস্থ্যবান, পেটের ভুঁড়িটা শার্টের উপরে ভাসমান। গায়ের রঙ অনুজ্জ্বল। বয়স সাতাশ আটাশ হলেও দেখতে লাগছে পঁয়ত্রিশের। ঠোঁটের উপর মোটা একটা গোঁফ তার। শাহিনূর মনে মনে বিদ্রুপ করলেন, “যেই না একটা ছেলে! তার জন্য আবার সুন্দরী মেয়ে খুঁজছে।”
কিন্তু মুখে বললেন,“শোনেন ভাবি, পৃথিবীতে নিখুঁত মানুষ আপনি পাবেন না। রূপ পেলে গুণ খুঁজে পাবেন না, আর গুণ পেলে রূপ খুঁজে পাবেন না। সংসার রমণীর গুণে হয়, রূপে নয়। আমাদের আবৃত্তি মেয়ে ভালো। খোঁজ নিয়ে দেখতে পারেন। রান্নাবান্না থেকে শুরু করে ঘরের সব কাজ একা একা সামলে ফেলতে পারে।লেখাপড়ার দিক থেকে আপনার ছেলের থেকেও এগিয়ে। বাপের বাড়ির কোনো ঝঞ্ঝাট নেই। যেভাবে রাখবেন সেভাবেই থাকবে।”
বলেই ইশারা দিলেন ছোটো বোনকে। মাকসুদা মাথা নাড়িয়ে জায়ের উদ্দেশ্যে বললেন,“আপা ঠিক বলেছে, ভাবি। এমন মেয়ে লাখে একটা। তাছাড়া বয়সকালে যদি ছেলের বউয়ের সেবা যত্ন না পান তাহলে কীভাবে হবে? সুজনের থেকেও গায়ের রঙ উজ্জ্বল আছে।”
জায়ের সঙ্গে সুলতানার ভীষণ ভাব।মার্জিয়াকেও বড়ো ছেলের বউ হিসেবে তিনিই খুঁজে দিয়েছিলেন। তাই এ কথাও মেনে নিলেন। সংসার সামলানোই তো আসল ব্যাপার। তাই এ বিষয়ে আর কিছু বললেন না।আবৃত্তির হাত দুটো টেনে নিয়ে দেখতে দেখতে বললেন,“মাথার কাপড় সরাও। দেখি, চুলগুলো কত বড়ো?”
আঁতকে উঠল আবৃত্তি। বোঝ হওয়ার পর থেকে বাইরের মানুষের সামনে সে কখনোই মাথায় কাপড় ছাড়া যায়নি। সেখানে চুল খুলবে? হাত দুটো টেনে নিয়ে চেপে ধরলো ওড়না।মার্জিয়া তাল মেলালো,“হ্যাঁ, আগে একটু হেঁটে দেখাও। পা বাঁকা হলে তো আবার সমস্যা।”
মোজাম্মেল হোসেন ওখানেই বসা। চুপ করে এতক্ষণ শুনছিলেন আর দেখছিলেন তাদের কর্মকান্ড। মনে হচ্ছে মেয়ে নয় বরং কিনতে এসেছে কোনো পণ্য। চোখ রাঙিয়ে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে গমগমে স্বরে ভাগ্নির উদ্দেশ্যে বললেন,“ঘরে যা, আবৃত্তি।”
ভয়ে থিতু হলো শাহিনূরের মন। এমনিতেই স্বামীর উপরে উপরে চলছেন ভদ্রমহিলা। তার উপর এদের কান্ড কারখানা একটু বেশি বেশিই। এখনো পড়ে রয়েছে আগের যুগে। মাকসুদা বোনের পরিস্থিতি বুঝতে পেরে জায়ের উদ্দেশ্যে বললেন,“আহা, ভাবি! আজকাল এসব চলে না।”
“তাই বলে যাকে তাকে তো আর ছেলের বউ করে নিয়ে যেতে পারি না। একটু দেখতে দাও তো।”
মোজাম্মেল হোসেন ফের ধমকালেন,“তোকে ঘরে যেতে বলেছি না?”
মারজিয়া বলে উঠল,“সেকি! এখনো তো ঠিক করে দেখাই হলো না।”
আবৃত্তি হাফ ছেড়ে বাঁচলো। কপালের ঘাম মুছে উঠে চলে গেলো ঘরে। মোজাম্মেল হোসেনের এসব পছন্দ নয়। ছেলেটাকেও উনার পছন্দ হয়নি। তার উপর পারিবারিক কার্যকলাপ তো আরো নয়। নেহাৎ শালীর শ্বশুরবাড়ির লোক বলে বেশি কিছু বললেন না। রাগ চেপে বললেন,“একঘর লোকের সামনে একটা মেয়ের সঙ্গে এমন আচরণ করা শোভনীয় নয়।”
সুলতানা গম্ভীর কণ্ঠে প্রত্যুত্তর করলেন,“শোভনীয় নয় মানে? আমাদের বিয়ের সময়ও এসব হয়েছে। তাই বলে আমাদের কী বিয়ে হয়নি? সংসার করছি না?”
শাহিনূর আর মাকসুদা মুহূর্তেই কথা ঘুরিয়ে ফেললেন। মেতে উঠলেন গল্পে। দেখাদেখির পর্ব যখন হয়েছে বিয়েও হতেই হবে। হাতে অত সময় কোথায়? সে জন্যই তো মাকেও এখানে রাখেননি। বৃদ্ধার তো উল্টোপাল্টা কথা বলার বাতিক রয়েছে। মোজাম্মেল হোসেন সেখানে পূর্বের মতো চুপ করে বসে রইলেন। এদের যাওয়ার অপেক্ষা করতে লাগলেন।
চলবে _______
(কপি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।)

