মেঘমেদুর_দিনে লেখনীতে: #মাশফিত্রা_মিমুই [পর্ব:৩২]

0
2

#মেঘমেদুর_দিনে
লেখনীতে: #মাশফিত্রা_মিমুই
[পর্ব:৩২]

গাজীপুর থেকে মালিবাগ পৌঁছাতে পৌঁছাতে রাত সাড়ে নয়টা বেজে গেলো মোজাম্মেল হোসেন এবং মিশমির। শাহিনূর এতক্ষণ ধরে তাদের অপেক্ষাতেই বসে ছিলেন। ভেতরে ঢুকেই স্ত্রীর হাতে বেশ কয়েকটা প্যাকেট ধরিয়ে দিলেন ভদ্রলোক। হাস্যোজ্জ্বল মুখে বললেন,“ধরো এগুলো, তোমাদের তিনজনের জন্য গরম গরম বিরিয়ানি, চিকেন চাপ, বাদামের শরবত আর রসমালাই নিয়ে এসেছি। আমি আর মিশমি কিন্তু বাইরে থেকেই খেয়ে এসেছি। শাফিন কোথায়?”

বলেই গলা উঁচিয়ে ডাকলেন,“শাফিন, সুশ্রী?”

প্যাকেটগুলো টেবিলে নিয়ে রাখলেন শাহিনূর।জিজ্ঞেস করলেন,“বাসা থেকে গেলে তিনজন অথচ ফিরে এলে দুইজন। আরেকজন কোথায়?”

প্রশ্নের উত্তরটা মোজাম্মেল হোসেন দিলেন না। মিশমিকে ইশারা করে স্ত্রীর উদ্দেশ্যে বললেন,“খাবার বেড়ে সুশ্রী আর শাফিনকে নিয়ে তুমি খেতে বসে পড়। আমি বরং গোসল করে আসি। তুইও ঘরে যা মিশমি।”

প্রশ্নটা যে ভদ্রলোক এড়িয়ে গেলেন তা খুব ভালো করেই বুঝতে পারলেন শাহিনূর। তাই আপাতত ছেড়ে দিলেন। ফ্রেশ হয়ে আসুক তখন না হয় চেপে ধরা যাবে। উনারা যেতেই ঘর থেকে বেরিয়ে এলো শাফিন আর সুশ্রী। খাবারগুলো দেখে শাফিনের খুশি যেন আর ধরে না। বাইরের খাবার তার বরাবরই প্রিয়। এসেই সে বসে পড়ল খেতে। সুশ্রী গোমড়া মুখে বললো,“অল্প দিও, আম্মু।”

“অল্প দিবো মানে? শরীরের কী অবস্থা হয়েছে সেই খেয়াল আছে?সারাক্ষণ বইয়ে মুখ গুঁজে বসে থাকলেই চলবে? যা দিবো চুপচাপ খেয়ে নিবি।”

“পেটে যতটুকু জায়গা নেবে ততটুকুই তো খাবো নাকি?”

“আমায় এসব শেখাতে আসিস না। মনে রাখিস, আমি তোর পেটে হইনি বরং তুই আমার পেটে হয়েছিস।”

দমে গেলো সুশ্রী। এই জন্যই সকালের নাস্তা ব্যতীত পরিবারের সঙ্গে সহজে সে খেতে বসে না। মা তাকে জোর করে ঠেসেঠুসে বেশি খাবার খাওয়াতে চায়‌।

খাওয়া যখন প্রায় শেষের দিকে তখনি হন্তদন্ত হয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো মিশমি। রান্নাঘর থেকে পিরিচ আর চামচ এনে চেয়ার টেনে বসলো রসমালাই খেতে। সুশ্রী জিজ্ঞেস করল,“কোথায় গিয়েছিলি? কেমন কাটলো দিন? আর আবৃত্তি কোথায়?”

“দিন ভালোই কেটেছে। গিয়েছিলাম ঢাকার বাইরে। আর আবৃত্তি আপু শ্বশুরবাড়িতে।”

পাল্টা প্রশ্ন করল না সুশ্রী। ভেবে নিলো ছোটো বোন রসিকতা করছে তার সঙ্গে। তবে শাহিনূরের ললাটে ভাঁজ পড়ল। চিন্তিত হয়ে ধমকালেন,“অযথা ফাইজলামি করলে দিবো একটা থাপ্পড়। সত্যি করে বল, আবৃত্তি কোথায়? কাল তোর ছোটো খালার শ্বশুরবাড়ি থেকে লোক আসবে আংটি পরাতে। তারপরেও তোর বাবা কোথায় রেখে এলো তাকে? আমার মাথা কী সবার সামনে হেট করতে চায়?”

মোজাম্মেল হোসেন সবে গোসল সেরে এসেছেন। স্ত্রীর কথা শ্রবণাতীত হতেই এবার আর কথা ঘুরালেন না বা এড়িয়ে গেলেন না। গম্ভীর কণ্ঠে উত্তর দিলেন,“ও মজা করছে না। যা বলছে সত্যি বলছে। তুমি তোমার বোনের শ্বশুরবাড়ির লোকজনকে আসতে নিষেধ করে দাও।”

উপস্থিত বাকি দুই নারী চরিত্র চমকালো। শাহিনূর বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন,“মানে? কী বলছো?”

“আমরা গাজীপুর গিয়েছিলাম। যেহেতু আবৃত্তির অভিভাবক আমি তাই ওর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার শুধুই আমার। এমনকি বিয়ে দেওয়ার দায়িত্বও আমার। তাই বিয়ে দিয়ে দিয়েছি।”

“কার সঙ্গে?”

“শিথিলের সঙ্গে।”

মুহূর্তেই স্থানটিতে যেন বিস্ফোরণ ঘটলো। খাওয়া থেমে গেলো সুশ্রীর। ফ্যালফ্যাল নয়নে তাকিয়ে রইল বাবার দিকে। শাহিনূরও অবাক, বাকরুদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন অনেকক্ষণ। চেঁচামেচি করতে গিয়েও পারলেন না। ধীর কণ্ঠে বললেন,“কী আবোল-তাবোল বলছো?”

“আবোল-তাবোল বলছি না। তোমার একগুঁয়েমির কারণে তো আর দুটো ছেলে-মেয়ের ইচ্ছের বিরুদ্ধে যেতে পারি না, তাই ওদের বিয়ে দিয়ে দিয়েছি। আমি আর শিথিলের বাবা দুজনে দাঁড়িয়ে থেকে বিয়ে দিয়েছি।”

“আমাকে না জানিয়ে?”

“তোমাকে জানিয়েই বা কী হতো? সেই মাঝখানে বাঁধা সৃষ্টি করতে। তাই জানানোর প্রয়োজন মনে করিনি।”

বিপরীতে কী বলবেন বা বলা উচিত বুঝতে পারলেন না শাহিনূর। আবারো নিরব রইলেন। কত সময়ের জন্য কে জানে? হঠাৎ করেই সেই নিরবতা রূপ নিলো রাগে। তুমুল রাগ। আশপাশ ভস্ম করে দেওয়ার মতো রাগ। ধাপধুপ পা ফেলে চলে গেলেন শোবার ঘরে। অথচ সবে নিজের জন্য প্লেটে খাবার বেড়েছিলেন তিনি। সেই খাবার আর খাওয়া হলো না। মোজাম্মেল হোসেন তার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইলেন। মেয়েদের উদ্দেশ্যে বললেন,“তোদের মা রেগে গেছে। বিরক্ত করিস না। খেয়েদেয়ে সব গুছিয়ে শাফিনকে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়িস। আর সুশ্রী, একদম রাত জাগবি না বলে দিচ্ছি।”

এরপর তিনিও আর দাঁড়ালেন না। পিছু নিলেন স্ত্রীর। মেয়েরা বুঝলো, বাসায় এখন ঝামেলা চলবে। সুশ্রীর গলা দিয়েও আর খাবার নামলো না। মেয়েটা কেমন করে যেন বাসি ফুলের মতো নেতিয়ে পড়ল। ঘোলাটে হয়ে গেলো আঁখি। বিমূঢ় দৃষ্টিতে তাকিয়ে ক্লান্ত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,“হ্যাঁ রে মিশমি, নিয়ম অনুযায়ী আজ তাদের বাসর রাত তাই না?”

হাস্যোজ্জ্বল মিশমির বুকটা বড়ো বোনের অসহায় কণ্ঠ থেকে নিঃসৃত বাক্যে ধ্বক করে উঠল আচমকাই। মনে পড়ে গেলো সেদিন রাতের সমস্ত ঘটনা। কণ্ঠনালী দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না তার। কথা বলতে গিয়ে সুশ্রীর গলা কেঁপে উঠল। পুনরায় প্রশ্ন ছুঁড়ল, “আমায় একবারও জানালি না কেনো? এত পর হয়ে গিয়েছি?”

এই মুহূর্তে এসে মিশমির ভীষণ কান্না পেলো। সাফাই গাওয়ার ভঙিতে বললো,“আমি ওখানে গিয়েই সবটা জেনেছি। আবৃত্তি আপুও তাই।”

“শিথিল ভাই নিশ্চয়ই অনেক খুশি হয়েছেন? আর আবৃত্তি? যাক, মেয়েটা অন্তত জীবনে একজন ভালো, আগলে রাখার মতো মানুষ পেয়েছে। আচ্ছা, ওদের একসঙ্গে দেখতে কেমন লাগছিল? ভীষণ সুন্দর তাই না? ছবি আছে তোর কাছে?”

মিশমি ফ্যালফ্যাল নয়নে তাকিয়ে রইল তার দিকে। ঠোঁট উল্টে কান্না আটকে রাখার প্রয়াস চালালো। সে খুব ভালো করেই বুঝতে পারছে বোনের মনের অবস্থা। ভালোবাসার মানুষকে অন্যের হয়ে যেতে দেখা বা শোনার মতো বিদীর্ণ কষ্ট কী আর আছে? সুশ্রী হাত ধুয়ে উঠে গেলো। যেতে যেতে বললো,“থাক লাগবে না। কষ্ট বাড়বে। এগুলো একটু গুছিয়ে রাখিস, প্লিজ। আমার কেমন যেন লাগছে। দম বন্ধ হয়ে আসছে। মনে হচ্ছে, একটু ঘুমানো প্রয়োজন।”

মিশমি পেছন থেকে ডেকে বললো,“দরজা আটকাস না, আপু। আজ আমরা একসঙ্গে ঘুমাবো।”

কিন্তু সেকথা সুশ্রীর শ্রবণালী পর্যন্ত পৌঁছেছে বলে মনে হলো না। মুহূর্তেই খট করে দরজা লাগানোর শব্দ হলো। মিশমি হতাশ হলো। আফসোস হলো খুব। যদি আরো আগে সে টের পেতো! তাহলে হয়তো এমন একটা পরিস্থিতি তৈরি হতে কিছুতেই দিতো না।

দুর্বল শরীরটা ঠেলেঠুলে বিছানায় এনে ছেড়ে দিলো সুশ্রী। মৃগী রোগীদের মতো শরীরটা তার কাঁপছে। শব্দ করে কান্না করার মতো শক্তিটুকু যেন হারিয়ে গিয়েছে কোথাও। নিঃশব্দে চোখ দিয়ে ঝরছে অশ্রু। ভালোবাসা এত করুণ কেনো? সমাপ্তিতে যদি না পাওয়াই থাকে নিয়তি, তাহলে এতশত অনুভূতি জেগে ওঠার প্রয়োজন কী ছিল? সুশ্রীর মনে হতে লাগলো সে হ্যালুসিনেশন করছে। শিথিলের সেই পরিচিত হাস্যোজ্জ্বল মুখশ্রী ভেসে উঠছে চোখের সামনে। তার দিকেই চেয়ে আছে, ঘোলাটে দু’চোখ অথচ কত আকুতি! হাত বাড়িয়ে ডাকছে তাকে। অস্পষ্ট সেই ডাক— তবুও নিখুঁতভাবে হৃদয় ভেদ করছে সুশ্রীর।সেই ডাকে সাড়া দিতে চাইলো মেয়েটি। অনেক কষ্টে উঠে বসলো। কিন্তু তার কল্পনা ছুটে গেলো। সারা ঘরে তাকিয়ে দেখলো— শিথিল নেই, কোথাও নেই, কেউ নেই। একা, নিঃসঙ্গ ঘরটা নিঃশব্দে ভয়ানকভাবে চেয়ে আছে তার দিকে।

নড়বড়ে পায়ে হেঁটে গিয়ে পড়ার টেবিলে বসলো সে। কাঁপা কাঁপা আঙুলে ধরলো সফেদ কাগজের উপর কলম। অশ্রুসিক্ত নয়নে তাকিয়ে লিখে ফেলল অগোছালো কিছু শব্দের বুননে আস্ত এক গোপন চিঠি,

‘প্রিয় শিথিল ভাই,
এক আকাশের নিচে এত কাছাকাছি থাকার পরেও আপনি জানতে পারলেন না, এক নারীর আপনার প্রতি আকাশসম প্রেম আর হাহাকারের কথা। জানলেন না, আপনার জন্য পাহাড়সম ভালোবাসা জমিয়ে রেখে, কতশত দিবারাত্রি নিদ্রাহীন কাটিয়ে দেওয়া ‘সুন্দরী’ খেতাবপ্রাপ্ত এক নারীর কথা। জানলেন না, আপনার হাসি আর দিপ্তী ছড়ানো চেহারা কল্পনায় বন্দি করে কিশোরী থেকে যুবতী হওয়া, হেরে যাওয়া মেয়েটির কথা।
আমি আজ হেরে গেছি। কী করুণ, কী লজ্জাজনক সেই হার! আপনাকে পাওয়ার যুদ্ধে এত বাজেভাবে হারতে হবে— এ কথা যদি শুরুতেই একবার জানতে পারতাম, তাহলে আজ হয়তো এত বড়ো সর্বনাশ আমার হতো না। অথচ আপনি কিছুই জানলেন না। এই আফসোস, এই হাহাকার আমি রাখবো কোথায়? কীভাবে বয়ে বেড়াবো সারাজীবন? এত ভার সইবো কেমনে?

অতঃপর, লুকোচুপি ভালোবেসে আপনাকে পাওয়ার অপেক্ষা আমার ফুরোলো। ছাই হয়ে উড়ে গেলো ছোট্ট একটি সংসার সাজানোর স্বপ্ন।
আপনি চিরকাল ভালো থাকুন, সুখে থাকুন। শরীরে জড়িয়ে রাখুন অন্য নারীর গন্ধ। আর আমি? আমি না হয় মানিয়ে নেবো। খুঁজে নেবো বেঁচে থাকার কোনো এক পথ। কারণ, একতরফা ভালোবাসায় ব্যর্থ হওয়া মানুষদের যে কখনো ভালো থাকতে নেই। ভালো থাকা তাদের জন্য স্রেফ অপূর্ণ, অবিচ্ছেদ্য একটি স্বপ্ন।

ইতি—
হেরে যাওয়া এক ব্যর্থ নারী।’

কলম থেমে গেলো সুশ্রীর। চোখের অশ্রুতে ভিজতে লাগলো কাঁচা হাতের লেখা চিঠি। ঘরের আনাচে কানাচে ভ্যাপসা গরম মিশে কান্নার ভার বাড়িয়ে দিচ্ছে। প্রবল যন্ত্রণায় হাঁসফাঁস করছে সদ্য অনুভূতিতে আঘাত হানা ক্লান্ত দেহ। দূর কোথা থেকে ভেসে আসছে গানের কিছু লাইন—
‘আমি কাউকে বলিনি সে নাম
কেউ জানেনা, না জানে আড়াল
জানে কান্নার রং, জানে জোছনার ছায়া।’

নাক টেনে কান্না আটকে রাখার ব্যর্থ চেষ্টায় দম আটকে এলো তার। গলার কাছে দলা পাকানো আহাজারি, আর চোখ ভেজানো শত সহস্র না বলা কথা যেন একসঙ্গে চেপে বসেছে বুকে। চিঠির অস্তিত্ব মুছে দিতে হাত বাড়িয়ে ড্রয়ারের খুঁটিনাটি জিনিসপত্র হাতড়ে কাঁপা আঙুলে খুঁজে বের করল সে দেশলাই। কাঠির মাথায় আগুন জ্বালিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে সেই আগুনেই পুড়িয়ে দিলো অন্তিম চিঠির পৃষ্ঠা। চোখের পলক ফেলার আগেই আগুনে ভস্ম হয়ে গেলো তার সেই না বলা সমস্ত কথা। চোখের সামনে ধোঁয়া হয়ে মিলিয়ে গেলো, একটা বেদনা দায়ক রাত— ছোট্ট একটা সংসার, একটু ভালোবাসা, একটা সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ।

জানালার ধারে গিয়ে ছাইগুলো হাওয়ায় উড়িয়ে দিলো বাইরে— বড়োই অবহেলায়, অথচ অপার মমতায়। যেন বুকের গভীরে সযত্নে লালন করা অনুভূতিগুলোকে চিরতরে বিদায় জানাচ্ছে সে।
একতরফা ভালোবাসার প্রমাণ যে জমিয়ে রাখতে নেই। লোকে জানলে বলবে কী?
________

বাইরে তখনো অন্ধকার। চারিদিক থেকে ভেসে আসছে পাখির কিচিরমিচির শব্দ। শহুরে জীবনে এত সুমধুর শব্দ তেমন একটা শোনা যায় না। তবে আবৃত্তির ঘুমটা ভাঙলো কারো ডাকে। ঘুমের ঘোরেই সে শুনতে পেলো কেউ তাকে ডাকছে,“আবৃত্তি! আর কত ঘুমাবে? এবার উঠে পড়। এই আবৃত্তি!”

ঘুম ঘুম চোখ দুটো মেলে তাকালো আবৃত্তি। দৃষ্টিগোচর হলো তার দিকে ঝুঁকে থাকা একটি পরিচিত মুখ। সঙ্গে সঙ্গে শোয়া থেকে লাফিয়ে উঠল সে।ভয়ে থু থু ছিটালো বুকে। ভারি কতক শ্বাস ফেলে পলকহীন চোখে অচেনা এই ঘর, আসবাব দেখে গতকালের সমস্ত কিছু ভেসে উঠল স্মৃতির পাতায়। নিজেকে ধাতস্থ করতে সময় লাগলো কিছুটা। শিথিল কোমল স্বরে বললো,“ভয় পেয়েছো?”

আবৃত্তি ফিরে তাকালো তার দিকে। দুদিকে মাথা নাড়িয়ে না বোঝালো। জিজ্ঞেস করল,“সকাল হয়ে গিয়েছে?”

প্রশ্নটা করেই তাকালো পর্দার আড়ালে থাকা বন্ধ জানালায়। শিথিল বললো,“এখনো পুরোপুরি হয়নি। কিছুক্ষণ আগে ফজরের আজান দিয়েছে। নামাজের ওয়াক্ত চলছে। নামাজ পড়বে না? আমি মসজিদে যাচ্ছি। দরজা আটকে দিয়ে তুমিও অযু করে নামাজে বসো। জায়নামাজ আলমারির প্রথম ড্রয়ারে পেয়ে যাবে।”

সম্মতি দিলো আবৃত্তি। শিথিল আর দাঁড়াল না সেখানে। দরজা খুলে ঘর থেকে বের হলো। দ্বিতীয় তলায় গিয়ে সবকটা বন্ধুকে ঘুম থেকে একপ্রকার টেনে হেঁচড়ে তুলে তাদের নিয়েই রওনা দিলো মসজিদের উদ্দেশ্যে। সে যেতেই দরজা আটকে হাতমুখ ধুয়ে শাড়ি বদলে থ্রী পিস পরিধান করল আবৃত্তি। অযু করে নিজেও বসলো নামাজ পড়তে।

নামাজ শেষে জায়নামাজ ভাঁজ করে জানালার ধারে দাঁড়িয়ে রইল বেশ কিছুক্ষণ। বাইরের অন্ধকার কেটে গিয়ে ধীরে ধীরে আবছা আলো ফুটছে চারিদিকে। কাছে পিঠে কোথাও থেকে যেন ভেসে আসছে মিহি কণ্ঠের কোরআন তেলাওয়াত। এত সুমধুর তেলাওয়াত এতকাল শুধু ইউটিউবেই শুনেছে আবৃত্তি।

ঘড়ির কাঁটায় সাড়ে পাঁচটার এদিক ওদিক। মাথায় ওড়না দিয়ে ঘোমটা টানলো আবৃত্তি। ঘর থেকে অতি সাবধানে সে বেরিয়ে এলো। বাড়ির পরিবেশ এখনো নিস্তব্ধ। ঘুম ভাঙেনি কারো।

দুতলা বিশিষ্ট বাড়িটায় শিথিলের ঘর হচ্ছে নিচতলায়। নিচতলায় শোবার ঘর তিনটা, একটি রান্নাঘর আর লাগোয়া একটি বাথরুম। যদিও ঘরেও এটাচ বাথরুম রয়েছে। তবে দ্বিতীয় তলায় এখনো যাওয়া হয়নি তার। বউ হয়ে এসেছেই তো গতকাল। শিথিলের ঘর থেকে বেরিয়ে যেই ঘরটা সামনে পড়ে সেটা খালি। সেই খালি ঘর পেরিয়ে প্রথম ঘরটির সামনে যেতেই দেখা মিললো স্বল্প কৃত্রিম আলোর। আবৃত্তি খেয়াল করল, এতক্ষণ ধরে ভেসে আসা সুমধুর কোরআন তেলাওয়াতের উৎস তবে এখানেই। উঁকি দিবে কি, দিবে না সেই দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগতে লাগলো। অনুমতি ছাড়া কারো ঘরে উঁকি দেওয়া অনুচিত।

বেশ কিছুক্ষণ ভেবে উল্টো দিকে ঘুরে আবারো ঘরের দিকে পা বাড়াতেই দরজাটা পুরোপুরি খুলে গিয়ে সাদা আলোয় ঝলমল করে উঠল ড্রয়িং রুম। আবৃত্তি থেমে দাঁড়াল। পিছু ফিরতেই দৃষ্টিগোচর হলো এক বয়স্ক লোককে। মাথায় চাপ প্রয়োগ করতেই মনে পড়ল, ইনিই শিথিলের বাবা। তার শ্বশুরমশাই। কিছুটা ঘাবড়ে গেলো আবৃত্তি। কেনো যে ঘর থেকে বের হতে গিয়েছিল? ভেবেই রাগ হলো নিজের উপর। চাপা স্বরে সালাম দিলো,“আসসালামু আলাইকুম।”

হামিদুল হক অমায়িক হাসলেন। স্নিগ্ধ কণ্ঠে বললেন, “ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু। শুভ সকাল, আবৃত্তি মা।”

চকিতে মুখ তুলে তাকায় আবৃত্তি। শেষ বাক্যে কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে সৌজন্য হাসে। হামিদুল হক ততক্ষণে ঘরের আলো নিভিয়ে ড্রয়িং রুমের বিশাল জানালাটা খুলে দিয়েছেন। তৎক্ষণাৎ শা শা করে জানালার পর্দা উড়িয়ে সকালের স্নিগ্ধ বাতাস প্রবেশ করল ভেতরে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন,“শিথিল কোথায়? ঘরে?”

“না, নামাজ পড়তে মসজিদে গিয়েছে।”

“ওহ, চা খাবে?”

দুদিকে মাথা নাড়ায় আবৃত্তি,“না।”

“আরে খেয়েই দেখো। বুড়ো হলেও আমার তৈরি চা কিন্তু মন্দ নয়।রোজ ফজরের নামাজ পড়ে তেলাওয়াত করে এক কাপ চা ছাড়া চলে না।”

আবৃত্তি শুনলো সে কথা। কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে সাহস সঞ্চয় করে বললো,“তাহলে আমি বানাই? চা কিন্তু আমিও ভালোই বানাই।”

“বানাবে? আচ্ছা বানাও তবে। আমি কিন্তু আদা চা খাই। চিনি এক চামচ দিবে।”

“আচ্ছা।”

“তাহলে আমি বাগানে যাই? চা নিয়ে তুমি ওখানেই এসো। বাপ, বেটিতে মিলে প্রকৃতি উপভোগ করতে করতে চা খাবো। ভোরের আলো, বাতাস স্বাস্থ্যের জন্য খুবই উপকারী।”

বলেই শব্দ করে হাসলেন হামিদুল হক। আবৃত্তি মাথা তুলে তাকালো। বাপ, বেটি শব্দ দুটো শুনতেই ইতস্তত বোধ করল। এই সমস্ত কিছুই তার কাছে নতুন। এত সুন্দর আচরণ, আবদার! হামিদুল হক তার মুখখানা যেন খুব সহজেই পড়ে ফেলতে পারলেন। বললেন, “শ্বশুর কিন্তু বাবার মতোই। বলতে পারো দ্বিতীয় বাবা। শিথিল, সুহাসিনীর মতো তুমিও আমায় বাবা বলেই কিন্তু ডাকবে। ঠিক আছে?”

“আচ্ছা।”

“এবার ডেকে ফেলো দেখি।”

চাপা স্বভাবের হওয়ায় এবারো ব্যর্থ হলো আবৃত্তি। চুপ করে রইল। বিব্রত হলেই তার মুখে ঘাম জমে। হামিদুল হক অবশ্য জোরাজুরি করলেন না। সময় হলে মেয়ে এমনিতেই স্বাভাবিক হয়ে যাবে। তাই দরজার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বললেন,“ব্যাপার না, হুটহাট কাউকে বাবা বলে ডাকা যায় না। একটু সময় লাগে। একসময় ঠিক অভ্যাস হয়ে যাবে।”

উনি যেতেই রান্নাঘরে প্রবেশ করল আবৃত্তি। শিথিল, সুশ্রী, মিশমির থেকে যতটা শুনেছিল তারচেয়েও ভদ্রলোকের আচরণ সুন্দর এবং অমায়িক।

আবৃত্তির রং চা পছন্দ নয়। তাই নিজের জন্য দুধ চা আর শ্বশুরের জন্য রং চা বানালো। সিল্কে পেয়ে গেলো মিষ্টি ছাড়া কুকিজের প্যাকেট।সেখান থেকেই কয়েকটা কুকিজ একটা বাটিতে সাজিয়ে ট্রে নিয়ে চলে এলো বাড়ির বাইরে।

শিথিলদের বাড়ির বাইরে অর্থাৎ রাউন্ড এরিয়ায় বেশ কিছুটা ফাঁকা জায়গা রয়েছে। দেখেই বুঝা যাচ্ছে, নতুন রঙ করা হয়েছে বাড়িটিতে। পেছনের দিকে বিল্ডিংয়ের সাথে লাগোয়া দুটি আম গাছ, একটি কাঁঠাল আর বেল গাছ রয়েছে।সামনের দিকের একপাশে রয়েছে করমচা গাছ এবং একটি বেঞ্চ। অপরপাশে শুধু ফুল গাছ আর ফুল গাছ। তার মধ্যে গেটের কাছে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকা চন্দ্রপ্রভা গাছটা একটু বেশিই দ্যুতি ছড়াচ্ছে যেন। গতকাল এসেই তা খেয়াল করেছে আবৃত্তি। ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠেছে মুচকি হাসির রেখা।

ট্রে থেকে চায়ের কাপটা শ্বশুরের দিকে বাড়িয়ে দিলো আবৃত্তি। এবার সম্বোধন করেই বললো,“আপনার চা, বাবা।”

অবাক চোখে তাকালেন হামিদুল হক। অধরে প্রশান্তির দেখা মিললো। এত দ্রুতই যে মেয়েটা মানিয়ে নিতে পারবে বুঝতে পারেননি। মাথা নাড়িয়ে চায়ের কাপে চুমুক দিলেন। নাহ, চা টাও বেশ ভালোই বানায়। ছেলে তবে নিজের জন্য একেবারে রত্ন পছন্দ করেছে। বললেন,“আজ কিন্তু তোমার ফুফু শাশুড়িরা পরিবার সমেত তোমাকে দেখতে আসবে, মা।”

“আজ?”

“হ্যাঁ, তোমার ফুফু শাশুড়িরা দেশে ফিরেছে গতকাল রাতে। কয়েকদিন থেকে চলে যাবে। আবার কবে না কবে আসবে কে জানে? তাই ভাতিজা বিয়ে করেছে শুনেই ওরা কিছুটা ক্ষেপে গিয়েছে। তুমি এ নিয়ে চিন্তা করো না। সুহাসিনীকে আমি বলে রেখেছি। ও নিজ দায়িত্বে সব ব্যবস্থা করে নিবে‌। তোমায়ও তৈরি করে দিবে। তুমি শুধু ওকে একটু সাহায্য করো। নতুন বউ বলে কথা!”

একটু থেমে তারপর বললেন,“বউ ভাতের অনুষ্ঠান তো নিয়ম অনুযায়ী আজ কালকের মধ্যেই করা উচিত ছিল কিন্তু হঠাৎ বিয়ে হওয়ায় তা করা হচ্ছে না। আমাদের অনেক আত্মীয়-স্বজন। একমাত্র ছেলের বিয়েতে তো আর আলাদা করে সবাইকে বলা হয়নি তাই বৌ ভাতটা ধুমধাম করে না করলেই নয়। একটু প্রস্তুতি লাগবে। এই মাসটা যাক পরের মাসেই না হয় করবো।”

এভাবেই শ্বশুর বউমার মধ্যে চলতে আরম্ভ করল এক কথা থেকে বহু কথা। ধীরে ধীরে জড়তা কাটিয়ে উঠতে লাগলো যেন আবৃত্তি। বেলা কিছুটা বাড়তেই বাড়িতে অবস্থানরত সকলের ঘুম ভাঙলো। চা পর্ব সমাপ্ত করে সকলের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সে চলে এলো ঘরে।

মিথিন ঘুম থেকে উঠে মায়ের হাতে ব্রাশ করে এদিক ওদিক না দেখেই চলে এলো মামার ঘরে। উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে চিৎকার করে ডাকলো,“বউ! বউ!”

আবৃত্তি সবে গোসল সেরে বেরিয়েছে। ননদের আদেশ। বাচ্চাটা দৌড়ে এসে তাকে জাপটে ধরতেই মুচকি হেসে কোলে তুলে নিলো। গতকাল সন্ধ্যায় দুজনার বেশ ভাব হয়েছে। জিজ্ঞেস করল,“ঘুম ভেঙেছে, মিথিন বুড়ার?”

উত্তর না দিয়ে স্বভাবসুলভ হাসলো মিথিন। বললো, “তোমাকে একন বউ বউ লাগছে না ক্যানো?”

“সাজ মুছে ফেলেছি তাই।”

“ক্যানো মুছেছো?”

“বিয়ে হয়ে গেছে তাই।”

“বিয়ে হয়ে গেছে?”

“হুম, কালই না বিয়ে হলো?”

“নিচে নামাও, বউ।”

ছটফট করে উঠল মিথিন। শিথিল এতক্ষণ বন্ধুদের সঙ্গেই ছিল। তাদের সাথেই নাস্তা করে ড্রয়িং রুমে আড্ডা দিচ্ছিল। দরজার কাছে আসতেই তাদের সমস্ত কথা সে শুনলো। সদ্য স্নান করা ব্যক্তিগত রমণীকে দেখে তার চোখ জোড়া থমকে গেলো। গলায় এসে আটকে গেলো রবীন্দ্রনাথের কবিতার একটি অংশ—
“মুখের পানে চাহিনু অনিমেষে,
বাজিল বুকে সুখের মতো ব্যথা।
মেঘের মতো গুচ্ছ কেশরাশি
শিথান ঢাকি পড়েছে ভারে ভারে;

আবৃত্তির কোল থেকে ততক্ষণে নিচে নেমে এসেছে মিথিন। দরজার সামনে মামাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ডাকলো,“মামু!”

সেই ডাকে শিথিল নড়েচড়ে উঠল। কাব্যিক ভ্রম ভাঙলো। ভেতরে ঢুকে ভ্রু কুটি করে ভাগ্নের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন ছুঁড়ল,“কে তোর বউ?”

মামার প্রশ্নে আবৃত্তির দিকে আঙুল তাক করে দেখিয়ে উত্তর দিলো মিথিন,“এইটা।”

“কার বউ?”

“আমার।”

“নিশ্চিত তোর ধুরন্ধর বাপ শিখিয়েছে?”

অবলীলায় মাথা নাড়াল মিথিন। যেন তার বাপের নাম আসলেই ধুরন্ধর। শিথিল এসে বিছানায় বসলো। দুই হাতে ভাগ্নের বাহু ধরে বললো,“উহুম, এইটা আমার বউ। কাল বিয়ে করেছিলাম, ভুলে গিয়েছিস?”

“তোমার বউ?”

“হ্যাঁ, আর তোর মামী। বুঝেছিস? মামার বউ হয় মামী। জোরে জোরে মামী বলে ডাক।”

বরাবরের মতো এবারো বাধ্যগত ছেলের মতো মামার কথা শুনলো মিথিন। পিছু ফিরে ডাকলো,“মামী!”

শিথিলের পছন্দ হলো না ডাকটা। মন বদলালো। ফের বললো,“না রে মিথিন, এই ডাকটা ভালো লাগছে না। মামানি ডাক।”

“আবার মামানি?”

“হ্যাঁ, বেগুন বেসনে চুবালে যেমন হয় বেগুনী? ঠিক তেমনি মামার বউ হয় মামানি। এটাই কনফার্ম। ডাক ব্যাটা মামানি বলে।”

“মামানি!”

আবৃত্তি এবার ভীষণ লজ্জা পেলো। লজ্জায় ঘোমটা টানলো সিঁথি পর্যন্ত। মিছেমিছি ধমকালো,“বাচ্চা ছেলেকে কী শেখাচ্ছেন এসব?”

“রিয়েলিটি শেখাচ্ছি। জামাইয়ের সঙ্গে কিউট একটা ভাগ্নে ফ্রি পেয়েছো। অনুভূতি কেমন, আবৃত্তি?”

“ভালো।”

বলেই আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল আবৃত্তি।

চলবে ________

(কপি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here