মেঘমেদুর_দিনে লেখনীতে: #মাশফিত্রা_মিমুই [পর্ব:৩৩]

0
2

#মেঘমেদুর_দিনে
লেখনীতে: #মাশফিত্রা_মিমুই
[পর্ব:৩৩]

ভাদ্র মাসের তীব্র রোদ পড়েছে বাইরে। চারপাশ ঝলসে যাওয়ার মতো গরম, কিন্তু ঘরের ভেতরে আজ অন্যরকম ব্যস্ততা। বহুদিন পর আত্মীয়-স্বজন দিয়ে ভরে উঠেছে বাড়ি। ভেসে আসছে মানুষের গুঞ্জন, হাসি আর কথাবার্তার আওয়াজ। ঘরের কোথাও যেন পা ফেলার জায়গাটুকুও অবশিষ্ট নেই। তবে আত্মীয়- স্বজন আর পরিচিতদের আনাগোনায় বাড়িটা ফিরে পেয়েছে তার হারানো চঞ্চলতা।
শিথিলের বন্ধুরা আগেভাগেই দুপুরের খাবার খেয়ে বিদায় নিয়েছে। গন্তব্য শান্তদের বাড়ি। সেখানে কিছু সময় কাটিয়ে রাতের ট্রেনে ফিরে যাবে তারা ঢাকায়। আবার কবে সবাই একসঙ্গে হবে, কেউ তো আর জানে না সেকথা। তাই শান্ত-ই জোর করল সবাইকে।

বসার ঘরের সোফাগুলো দখল করে আছেন শিথিলের ফুফু ও ফুফারা। ফুফাতো ভাই-বোনেরা বসেছে কিছুটা দূরে, চেয়ারে। চেয়ারগুলো হারুন চাচা অন্যান্য ঘর থেকে এনে দিয়েছেন তাদের বসার জন্য। বাড়ি জুড়ে মিথিনের সঙ্গে ছোটাছুটি করছে তাদের বাচ্চারা। তাতে যেন আরো কোলাহলপূর্ণ হয়ে উঠেছে পরিবেশ। এমন সময় বড়ো ফুফু নাসরিনের কণ্ঠস্বর থেকে ঝরে পড়ল অভিযোগ,“সেদিন জন্ম নেওয়া ছেলেটাকে হঠাৎ ধুম করে বিয়ে দিলি তাও আবার কাউকে না জানিয়ে। ওর কী সংসারের দায়িত্ব নেওয়ার বয়স হয়েছে? সেসব না হয় আপাতত বাদই দিলাম। অন্তত আমাদের তো জানাতে পারতি? তোর থেকে কিন্তু এটা আমি আশা করিনি, হামিদ।”

ছোটো বোন বিলকিসও সহমত পোষণ করলেন,“এইটা তুমি ঠিক করলে না ছোটো ভাইজান। আর কয়েকটা দিন কী অপেক্ষা করা যেতো না?”

হামিদুল হকের মুখে হাসি নেই। চুপচাপ মাথা পেতে মেনে নিলেন বোনদের অভিযোগ। বুঝিয়ে বললেন ঘটে যাওয়া সত্য ঘটনার আংশিক। কিছুক্ষণ নিরব থেকে ফের বললেন,“রাগ করিস না তোরা। যার বিয়ে সেই তো জানতে পেরেছে বিয়ের দিন দুপুরে।”

বড়ো ফুফা আজমল সায় দিয়ে বললেন,“আমি কিন্তু হামিদের সিদ্ধান্তকে সম্মান করছি। দিনকাল ভালো না। পথেঘাটে মেয়েবাজি করে হারামে জড়ানোর চেয়ে হালাল উপায় অবলম্বন করে বিয়ে করেছে। একদম ঠিক কাজ করেছে।”

“তা কই সেই হাড়ে বজ্জাতটা?” ছোটো ফুফু জিজ্ঞেস করলেন।

নাম নিতে না নিতেই ছোটো ফুফুর ছেলে আরবিনের সঙ্গে বাড়িতে প্রবেশ করল শিথিল। সবাইকে সালাম দিয়ে বসে পড়ল বড়ো ফুফার পাশে। নাসরিন জিজ্ঞেস করলেন,“বিয়েতে দাওয়াত না দিয়ে এখন যে বিভিন্ন তাল বাহানা দাঁড় করাচ্ছে তোর বাপ! তার জন্য তোর বাপকে এখন আমাদের কী করা উচিত, তুই বল।”

“আমার আপু তো আমার পিঠে, বাহুতে ধামধুম কিল ঘুষি মেরে দেয়। তুমিও মারতে পারো। এল্ডার সিস্টার বলে কথা!”

হামিদুল হক ছেলেকে চোখ রাঙালেন কিন্তু সেসবে পাত্তা দিতে দেখা গেলো না শিথিলকে। ভদ্রমহিলা হেসে পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন,“তোর বউ কোথায়?”

“ঘরে মনে হয়।”

বিলকিস মুখ বাঁকিয়ে বললেন,“তো এখানে নিয়ে আসছিস না কেনো? আমাদের দেখাবি না?”

ছোটো ফুফুর সঙ্গে শিথিলের বয়সের পার্থক্য চৌদ্দ। তাই দুজনের মধ্যকার ফুফু ভাতিজার থেকে শত্রুতার সম্পর্কই একটু বেশি। এর অবশ্য কারণ একটা আছে। ছোটো বেলায় বিলকিসকে যেদিন পাত্রপক্ষ দেখতে এসেছিল তার আগেরদিন বিকেলেই হাত থেকে কেড়ে নিয়ে শিথিলের চকলেট খেয়ে নেওয়ায় ফুফুর গালে নতুন গজানো দাঁত দিয়ে কামড় মেরেছিল সে। সেই কামড়ের চোটে কি বিচ্ছিরি এক দাগই না পড়েছিল কিশোরী মুখে!সেই দাগের স্থায়িত্ব ছিল টানা দেড় মাস। আর বিয়েটাও গিয়েছিল সেবারের মতো ভেঙে।

শিথিল ভ্রু উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করল,“গিফট এনেছো সঙ্গে?”

“গিফট পেতে হলে আগে আগে বিয়ের কথা জানাতে হয়। তাহলেই না বিদেশ থেকে সঙ্গে করে নিয়ে আসতাম।”

“তোমাদের গিফট মানেই তো ওই ডাব শ্যাম্পু, লাক্স সাবান আর গোটা কতক চকলেট। এত বছর ধরে এগুলো ছাড়া তো আর কিছুই আনতে দেখলাম না। বাবার ঘর তল্লাশি করলে এখনো কতগুলো পাওয়া যাবে। যা দিয়ে অনায়াসে একটা মুদি দোকান খোলা যাবে।”

নাসরিন থাপ্পড় মারলেন ভাতিজার বাহুতে। বিলকিস অভিযোগ করলেন ভাইয়ের কাছে,“দেখো ভাইজান, এই বদমাইশ কী বলে!”

“বিচার দিয়ে লাভ নেই। তোমাদের মতো অপ্রিয় বিদেশী আত্মীয়-স্বজন থাকার পরেও আমার কোনো লাভ লস নেই। আমি যদি কখনো বিদেশে যাই তাহলে কখনোই আমার ভাগ্নে আর বোনকে এসব পাঠাবো না। শুধু গোল্ড আর আইফোন পাঠাবো।”

মেহমাদ সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন ছুঁড়ল,“আর আমার জন্য?”

“বোন দিয়েছি, ভাগ্নে দিয়েছি এরপরেও আর কী চান দুলা ব্রো?”

“তুমি দাওনি, আমি অর্জন করেছি।”

“ওই একই ব্যাপার।”

শালা দুলাভাইয়ের খুনসুটির খবর কারোর অজানা নয়। হামিদুল হক হেসে উঠে গেলেন সেখান থেকে। কোনো এক কাজের বাহানায়। বিলকিস বললেন, “এবার ডাক তোর বউকে। দেখে একটু চোখ জুড়াই।”

“ডাকা যাবে না। দেখতে হলে তোমরা মেয়ে মানুষরা ঘরে গিয়ে দেখে এসো।”

“সে কোন রাজ্যের মহারানী যে ঘরে গিয়ে দেখে আসতে হবে?”

“আমার রাজ্যের।”

বড়ো ফুফা মুখ ভার করে বললেন,“সেকি রে শিথিল! আমাদের বউ দেখাবি না?”

“না।”

“কেনো?”

“আপনাদের আমি ভালোবাসি তাই।”

“ভালোবাসার সাথে বউ না দেখানোর কী সম্পর্ক?”

“কোনো সম্পর্ক নেই। এমনিই বউকে পর পুরুষের সামনে আনবো না।”

বিলকিস কথা কেড়ে নিলেন,“তোর বউ কী এমন পর্দা করে যে ফুফা শ্বশুর, দেওরদের সামনে আসতে পারবে না? শুনেছি তো এখনো লেখাপড়া করে।”

“বাইরে বের হলে বোরকা আর হিজাব পরে বের হতো। এখন যেহেতু আমার বউ সেহেতু বউকে নিকাব, হাত মোজা, পা মোজাও পরাবো। যখন ইচ্ছে হবে শুধু আমিই দেখবো। আর পড়ে তো গার্লস কলেজে অনার্স। ওইটা ব্যাপার না।”

আর কথা বাড়ালেন না উনারা। মেনে নিলেন ছেলের যুক্তি। সব নারীরাই হাঁটা ধরলেন ঘরের দিকে। নতুন বউ দেখার উদ্দেশ্যে।

আবৃত্তি তৈরি হয়ে পা ঝুলিয়ে বসে আছে বিছানায়। রান্নার দিকটা সুশ্রীর সামলানোর কথা থাকলেও মাংস, পোলাও, পায়েস, ডাল সে নিজেই রান্না করেছে। যতই হোক,নতুন বউ বলে কথা! বিয়ের পর যে নতুন বউদের রান্না করে সবাইকে খাওয়াতে হয় তা আবৃত্তি জানে। তখনি ঘরে এলো সুহাসিনী। ব্যস্ত কণ্ঠে বললো,“মাথায় ঘোমটা দিয়ে ঠিক হয়ে বসো। ফুপিরা আসছে।”

ননদের কথায় কপাল পর্যন্ত ঘোমটা টেনে ঠিক হয়ে বসলো আবৃত্তি। নাসরিন, বিলকিস প্রবেশ করলেন ভেতরে। উনাদের পেছনে বড়ো জনের দুই ছেলের বউ। উনাদের চাহনিতে ভয়ে দুরু দুরু করছে আবৃত্তির বুক। তবে তার ভয়কে পুরোপুরি দূর করে দিয়ে দুজনেই হেসে বসলেন তার দুপাশে। ছোটো ছোটো দুটো গহনার বাক্স হাতে ধরিয়ে দিয়ে নাসরিন বললেন,“আমরা হচ্ছি তোমার ফুফু শাশুড়ি। আমি বড়ো, তোমার শ্বশুরের থেকেও বড়ো। আর ও হচ্ছে সবার ছোটো। গতকাল দেশে ফিরে তোমাদের বিয়ের কথা জানতে পারলাম। তাই আর দেরি না করে আজই চলে এলাম তোমাকে দেখতে।”

আবৃত্তি প্রত্যুত্তরে কৃত্রিম হাসলো। বিলকিস উৎসুক কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন,“তা তোমার আর শিথিলের কী প্রেমের বিয়ে? কীভাবে হলো শুনি?”

আবৃত্তি ঘাবড়ে গেলো বোধহয়। সুহাসিনী তার হয়ে উত্তর দিলো,“আরে প্রেমের বিয়ে না ফুপি। নূর আন্টির কথা মনে আছে তোমাদের? ওই যে মায়ের খালাতো বোন? আন্টির ননদের মেয়ে আবৃত্তি। শিথিলকে তো তোমরা জানোই? একবার যা পছন্দ হবে তা ওর লাগবেই। ওভাবেই আরকি আবৃত্তিকেও পছন্দ হয়েছে। ব্যস, তারপর বাবার কাছে বিয়ের আবদার। পরে আঙ্কেল আর বাবা মিলে সাদামাটা ভাবে বিয়েটা দিয়ে দিলো।”

ব্যাপারটা এবার সকলের কাছেই পরিষ্কার। নাসরিন প্রশ্ন করলেন,“তা তোমার বাবা-মা কী করেন? ভাই- বোন কয়জন? নিজের সম্পর্কে একটু বলো, শুনি।”

“মা নেই, ছেলেবেলায় মারা গিয়েছেন।”

সঙ্গে সঙ্গে আফসোসের সুর ভেসে এলো। সান্ত্বনা দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,“আর বাবা?”

ভেতর থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিলো আবৃত্তি। এই প্রশ্নের মুখোমুখি হলেই সে কথা বলতে ভুলে যায়। আঁতকে ওঠে। সুহাসিনী-ই বড়ো বোনের মতো সামলে নিলো পরিস্থিতি,“আর পাঁচটা বাঙালি পুরুষ যা করে তাই করেছে। সবাই তো আর আমাদের বাবা আর তোমাদের ভাইয়ের মতো নয়, ফুপি। বাদ দাও এসব। মেয়েটা এমনিতেই নতুন পরিবেশে, নতুন মানুষদের দেখে ঘাবড়ে গিয়েছে।”

ভদ্রমহিলা দুজন মেনে নিলেন সেই কথা। দীর্ঘ জীবন দেশের বাইরে থাকায় উনাদের চিন্তাধারা আর পাঁচটা বাঙালি নারীদের মতো অবশ্য পুরোপুরি এক নয়। মানুষের চেহারা বা অবস্থান নিয়ে কটাক্ষ করতে উনারা জানেন না। কথাবার্তা, পরিচয় পর্ব শেষে সবাই গিয়ে খেতে বসলো। শিথিলের কড়া নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও বিলকিস জোরপূর্বক আবৃত্তিকে নিয়ে গেলো সেখানে।

খেতে বসে পারিবারিক, রাজনৈতিক, সামাজিক নানা ধরণের আলোচনা চললো। এক ফাঁকে চাপা স্বরে নাসরিন জিজ্ঞেস করলেন,“বড়ো ভাইজানকে আসতে বলিসনি, হামিদ? এলো না যে?”

“হারুনের হাত দিয়ে বিয়ের আগেরদিন একবার গ্ৰামে চিঠি পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু সেই চিঠির উত্তরও আসেনি এমনকি বিয়েতেও সে আসেনি। কাল নিজে ফোন করে বলেছিলাম তবুও এলো না। সামান্য সম্পত্তির জন্য যদি ভাই-বোনদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে দেয় তাহলে আর কী করার আছে?”

নাসরিন মাথা নাড়ান। মগ্ন হন কোনো এক চিন্তায়। বাপের ঘরে এমন একটা অমানুষ যে কীভাবে হলো?

দুপুরের খাওয়া শেষে সবাই যখন বিশ্রাম নিচ্ছে তখনি শ্বশুরের ঘরে ডাক পড়ল আবৃত্তির। গুটি গুটি পায়ে দোরগোড়ায় এসে দাঁড়াল সে‌। দরজায় টোকা দিয়ে কোমল স্বরে অনুমতি চাইলো,“আসবো বাবা?”

ভেতর থেকে সঙ্গে সঙ্গে উত্তর এলো,“এসো।”

অনুমতি পেয়ে ভেতরে প্রবেশ করল আবৃত্তি। সম্মুখে তাকাতেই দেখতে পেলো বিছানায় বেশ কতগুলো শাড়ি এবং কাঠের একটা বাক্স নিয়ে বসে আছেন শ্বশুরমশাই। হামিদুল হক ইশারায় তাকেও বসতে বললেন। আবৃত্তি বসতেই তিনি হাস্যোজ্জ্বল মুখে বলে উঠলেন,“এখানে যেই শাড়িগুলো দেখছো, সব তোমার শাশুড়ির। কিছু সে বেঁচে থাকতে কেনা হয়েছে আবার কিছু তার মৃত্যুর পর।”

“মৃত্যুর পর?” অবাক হলো আবৃত্তি।

ভদ্রলোক মৃদু হাসলেন,“শাড়ি পরতে ভীষণ পছন্দ করতো তোমার শাশুড়ি মা। শিথিলের মতোই বেকার অবস্থায় বিয়ে করায় নতুন স্ত্রীকে তেমন দামি শাড়ি কিনে দিতে পারিনি। দিতে হয়েছিল সস্তা, সুতির ছাপা শাড়ি। এক ধোয়া দিলেই বালতির পর বালতি রঙ ধুয়ে উঠতো। পরে অবশ্য চাকরি পেয়ে সেই দিন বদলেছিল আমাদের। আলমারিতে সস্তা শাড়ির বদলে স্থান পেয়েছিল টাঙ্গাইল, জামদানি, মসলিনসহ আর কত কি! প্রতি ঈদে নিজের জন্য পাঞ্জাবি কিনতে গিয়ে সাথে কেনা হতো শাড়ি। তবে তোমার শাশুড়ির যেন মন পড়েছিল পুরোনো সেই সস্তা শাড়িতেই। সেই অভ্যাস আমার বদলায়নি। সে দুনিয়া ছেড়ে চলে যাওয়ার পরেও আমি কিনেই গিয়েছি একের পর এক শাড়ি।
সেসব গল্প অন্য কোনোদিন না হয় করবো। তোমার সঙ্গে আমার অনেক গল্প করার আছে। এই শাড়িগুলো এখন থেকে তোমার। তুমি পরবে। সুহাসিনীকে অর্ধেক দিতে চেয়েছিলাম কিন্তু সে মায়ের স্মৃতি হিসেবে এর থেকে মাত্র দুইটা পুরোনো শাড়ি নিয়েছিল। বলেছিল, এগুলো তুমি শিথিলের বিয়ের পর ওর বউকে দিও। ওহ একটা কথা বলে রাখি, তোমার ননদ কিন্তু অনেক ভালো একটা মেয়ে। সর্বদা তার সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখবে। যত তাকে আপন করে নিবে ততই ভালোবাসা পাবে‌। দুটো ছেলে- মেয়েকেই আমি অনেক যত্নে বড়ো করেছি তো!”

থামলেন হামিদুল হক। কাঠের বাক্স খুলে বের করলেন কিছু ছিমছাম নিত্য পরার জন্য গয়না। পুত্রবধূর হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন,“তোমার শাশুড়ি বেঁচে থাকলে আজ হয়তো সে-ই এগুলো তোমার হাতে তুলে দিয়ে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিতো। কিন্তু সে তো নেই তাই আমাকেই তার দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। এগুলো সব পুরোনো আমলের ডিজাইন। তখনকার সময় এসব ডিজাইন-ই চলতো। আমি একা পুরুষ মানুষ তাই এগুলোই পালিশ করে এতদিন আঁকড়ে ধরে রেখেছিলাম। এখন তুমি এসেছো তাই এগুলো সব তোমার। আরো আছে, তবে সেগুলো লকারে। বাড়ি বেশিরভাগ সময় ফাঁকা পড়ে থাকে। কখন চোর ডাকাত ঢুকে পড়ে তার তো কোনো ঠিকঠিকানা নেই। বাড়িতে মানুষের ভিড় কমুক তখন না হয় এনে দিবো। তোমার পছন্দ মতো স্বর্ণাকারের দোকানে গিয়ে ডিজাইন বদলে নিও।”

বাক্সর দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল আবৃত্তি। চোখে জমলো অশ্রু। নাক টেনে মিইয়ে যাওয়া কণ্ঠে বললো, “আমার জন্মদাতা পিতাও আমার সঙ্গে হেসে দুটো কথা বলেনি কখনো। পালন করেনি কোনো দায়িত্ব। অথচ বিয়ের পর থেকে আপনি!
আপনার হাসি দেখে, কথা শুনে কিছুতেই আপনাকে আমার শ্বশুর বলে মনে হচ্ছে না। মনে হচ্ছে, আপনি আমার বাবা।”

“আমি তো তোমার বাবাই। মনে নেই আজ সকালে বললাম, শ্বশুর হচ্ছে দ্বিতীয় বাবা। তারপর থেকে কতবার বাবা বলে ডাকলে!”

আবৃত্তি এবার কেঁদেই ফেলল ফুঁপিয়ে। হামিদুল হক মিছেমিছি ধমকালেন,“আহা কাঁদে কেনো, মা? চোখ থেকে পানি মোছো। মোছো বলছি। এভাবে কাঁদতে নেই।”

সেকথা শুনলো না আবৃত্তি। তার ভীষণ কান্না পাচ্ছে। সে কাঁদবেই। এত বছর বাদে সে একটা বাবা পেয়েছে। সেই খুশিতেও তো মানুষ একটু কাঁদে নাকি? সুযোগ পেলে আরেকবার নিজের বাবার মুখোমুখি হয়ে এই মানুষটিকে নিয়ে সে দেখিয়ে দিবে, বাবা আসলে কেমন হয়!
___________

বাসার ভেতরকার অবস্থা ভীষণ ছিমছাম, নিরব। গত রাতে ঝগড়াঝাটির পর সকাল থেকে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে আর কোনো কথাবার্তা নেই। একে অপরকে এড়িয়ে চলছেন তারা। মিশমির থেকে আংশিক ঘটনা শুনে ভয়ে ভয়ে চুপচাপ কাজ করছে মিতা। মোজাম্মেল হোসেন বাড়িতে নেই। সকালের নাস্তা করে সেই যে দোকানে গিয়েছেন তারপর দুপুরে খেতেও আসেননি। এমনকি বিকেলে এসে ভাত ঘুমও দেননি আজ। মিশমি গিয়েছে কলেজে, শাফিন স্কুল থেকে এসে গোসল সেরে খেয়েদেয়ে ঘুমিয়েছে। তাও নিজে নিজে। মা রেগে থাকলে সে ভদ্র বাচ্চা হয়েই থাকে। মার খাওয়ার ভয়ে। আর সুশ্রী! সে তো ঘরবন্দি হয়েই বসে আছে।

শাহিনূর ঘর থেকে বের হয়ে টেবিলে খেতে বসলেন। মিতাকে জিজ্ঞেস করলেন,“সুশ্রী খেয়েছে?”

“না, আপু তো আজ ঘর থেকেই বের হয়নি। সকালে একবার নক করেছিলাম ঘর ঝাড়ু দেওয়ার জন্য কিন্তু সাড়াশব্দ করেনি।”

কথাটা শুনে ললাটে ভাঁজ পড়ল শাহিনূরের। স্বামীর সঙ্গে রাগের জেরে সেই যে রাতে ঘরে গিয়েছিলেন এরপর আর ছেলে-মেয়েদের খবর নেওয়া হয়নি। সকালে মিশমিই শাফিনকে স্কুলের জন্য রেডি করে দিয়েছিল। চিন্তায় পড়লেন শাহিনূর। উনার বড়ো মেয়ে এমন কখনো করে না। কলেজ, ক্লাস মিস দেয় না। এমনকি কম খেলেও সময় মতো খায়‌। অনিয়ম করে না। তাই খাওয়া ছেড়ে উঠে গেলেন তিনি। হাত ধুয়ে এসে দাঁড়ালেন বড়ো কন্যার ঘরের সামনে। দরজায় বেশ কয়েকবার করাঘাত করে ডাকলেন,“সুশ্রী! ঘুমিয়ে আছিস? এই অসময়ে কীসের ঘুম? দরজা খোল।”

ভেতর থেকে কোনো উত্তর এলো না। এমন করেই কাটলো প্রায় মিনিট দশেক সময়। চিন্তা বাড়লো শাহিনূরের। এমন কখনো তো মেয়েটা করে না। তার ঘুম মোটেও গাঢ় নয়। তবে? চিন্তিত কণ্ঠে শেষবারের মতো বললেন,“দরজা খুলবি নাকি তোর বাবাকে ফোন করবো? আজিজকে এনে দরজা ভাঙবো?”

কথাটায় কাজ দিলো। মিনিট দুয়েক পর খুলে গেলো দরজা। ভেতরে রাতের মতো অন্ধকার। সুশ্রীর মাথার চুল থেকে শুরু করে পরনের পোশাকটা পর্যন্ত বিশ্রী রকমের এলোমেলো। চোখের নিচে পড়েছে নির্ঘুম রাতের ছাপ। মেয়ের অবস্থা দেখে ভারি অবাক হলেন শাহিনূর। দ্রুত ঘরে প্রবেশ করে লাইট জ্বালালেন। খুলে দিলেন বন্ধ জানালা। কেমন এক বিদঘুটে গন্ধ ছড়িয়ে আছে চারিদিকে। উনার পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন মেয়ের একি দুর্দশা? সন্দেহ ভরা দৃষ্টিতে আগাগোড়া তাকে দেখলেন।

সুশ্রীর শরীরে দাঁড়িয়ে থাকার মতো শক্তিটুকুও অবশিষ্ট নেই। দরজা খুলে দিয়ে এসেই সে বসে পড়ল বিছানায়। শাহিনূরের নজর তার দিক থেকে গিয়ে পড়ল মেঝেতে শুকিয়ে যাওয়া ছোপ ছোপ রক্তের দাগের উপর। বুক কেঁপে উঠল উনার। আতঙ্কিত দৃষ্টিতে ভালো করে লক্ষ্য করতেই দেখা মিললো ফর্সা হাতের কব্জির উপর বেশ কয়েকটা কাটা দাগের। সেখানেও জমাট বেঁধে আছে রক্ত। বিছানায় রক্তাক্ত ব্লেড। পড়ার টেবিলের বইগুলো এখানে সেখানে ছড়ানো। মাথা ঘুরে উঠল শাহিনূরের। ছুটে গিয়ে মেয়ের পাশে বসে জড়িয়ে নিলেন তাকে।কান্নাজড়িত ভারি, চিন্তিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন,“মা! আমার মা! কী হয়েছে? এই অবস্থা কেনো তোর? হাত কাটলো কীভাবে?”

মাতৃ ছোঁয়া পেয়ে নিজেকে সামলাতে পারলো না সুশ্রী। হো হো করে কেঁদে উঠল। শেষ রাতে মেয়েটার যে কী হলো কে জানে? এমন বোঝদার মেয়ে কিনা একটা ছেলের জন্য বিশ্রী এক কান্ড ঘটাতে পর্যন্ত গিয়েছিল! মেয়ের কান্নায় সমস্ত শরীর কেঁপে উঠল শাহিনূরের। উনার আদরের, বোঝদার, সুন্দর মেয়েটা কাঁদছে! তার রক্ত শুকিয়ে আছে মেঝেতে! এই মেয়েকে শাহিনূর কত ভালোবাসেন! যক্ষের ধন উনার। একে নিয়ে উনার কত স্বপ্ন! কত আশা, ভরসা! এই মেয়ে তো উনার গর্ব! শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে মেয়েকে বুকের সঙ্গে আঁকড়ে ধরে রাখলেন শাহিনূর। পারলে যেন ভেতরেই ঢুকিয়ে ফেলতেন। কী করবেন না করবেন কিছুই যেন বুঝতে পারছেন না। স্বামীকে ফোন করে সবটা জানাবেন? নাকি হাসপাতালে নিয়ে যাবেন? সারা শরীরে হাত বুলাতে বুলাতে অস্থির কণ্ঠ বললেন,“আমার মায়ের কী হয়েছে? বল আম্মুকে। কেউ কিছু বলেছে? কিছু করেছে? কী করেছে শুধু বল একবার। জানে মেরে ফেলবো। কেউ ছুঁয়েছে?”

শেষ কথাটা বলতে গিয়ে কণ্ঠনালী কাঁপলো উনার। মেয়ের মা হওয়া যে অত সহজ নয়। সারাক্ষণ মাথায় আজেবাজে চিন্তা ঘুরতে থাকে। মায়ের হাহাকারে কান্নার বেগ বাড়লো সুশ্রীর। এই সময়ে এমন বিশ্বস্ত হাত আর বুকের যেন ভীষণ প্রয়োজন ছিল তার।মায়ের ছটফটানি দেখে নাক টেনে ভাঙা গলায় বললো, “আমার কষ্ট হচ্ছে, আম্মু। খুব কষ্ট হচ্ছে। মাথা ব্যথা করছে। এখন আমি কী করবো, আম্মু?”

কি করুণ সেই সুর! কিছুটা নিশ্চিন্ত হলেন শাহিনূর। নিজের চিন্তায় নিজেই লজ্জিত হলেন। কে কী করবে? মেয়ে তো গতকাল বিকেল থেকেই ঘরে‌। তাহলে কী হয়েছে তার? প্রশ্ন করতে গিয়েও করলেন না শাহিনূর। নিজ চেষ্টায় কিছু বুঝতেও পারলেন না। দুজনার মনের দূরত্ব যে সহস্র মাইলের চেয়েও বেশি। অজস্র চুমু খেলেন মেয়েকে। ছেড়ে দিয়ে উদ্ভ্রান্তের মতো সারা ঘর খুঁজে বের করলেন ফার্স্ট এইড বক্স। ক্ষত স্থান পরিষ্কার করে ওষুধ লাগিয়ে ব্যান্ডেজ করে দিলেন। মিতাকে ডাকতে গিয়েও ডাকলেন না।তিনি চান না উনার পবিত্র, নিষ্পাপ মেয়েকে কেউ এমন রূপে দেখুক। পুরো ঘরটা ঝড়ের গতিতে যতটুকু সম্ভব গুছিয়ে ফেললেন। আবার এসে বসলেন মেয়ের পাশে। সারা শরীর বরফের মতো জমে আছে। কিছু বলতে গিয়েও বললেন না। খানিক সময় ভেবে কণ্ঠে নমনীয়তা ঢেলে বললেন,“মাথা ব্যথা করছে? আয় শ্যাম্পু করে গোসল করিয়ে দেই। হালকা লাগবে।”

“করবো না, আম্মু। তুমি যাও।”

শাহিনূর শুনলেন না সেকথা। ছোটবেলায় অসুস্থ হলেই কান্নাকাটি করতো এই মেয়ে। তখন জোর করে ওকে গোসল করিয়ে খাইয়ে দিতেন তিনি। বুকে নিয়ে ঘুম পাড়াতেন। এরপর সব অসুখ বাপ বাপ বলে পালাতো। আজকেও তাই করার সিদ্ধান্ত নিলেন। টেনে নিয়ে গেলেন বাথরুমে। জোর করেই আহ্লাদী কথায় ভুলিয়ে গোসল করালেন। তোয়ালে দিয়ে মাথা মুছিয়ে তারপর হেয়ার ড্রায়ার দিয়ে শুকালেন চুল। পায়ে পা উল্টে বারবার পড়ে যেতে গেলেই তাকে ধরে নিচ্ছেন শাহিনূর। যেন ফিরে গিয়েছেন সেই ছোটবেলায়। যতই হোক, মা তো! মানুষ হিসেবে যেমনি হন, মা হিসেবে তিনি আদর্শ, কোমলমতী।

মিতাকে চেঁচিয়ে ডাকতেই মিতা এসে হাজির হলো। শাহিনূর সুশ্রীকে নিয়ে ঘর থেকে বের হতে হতে বলে গেলেন,“ও অসুস্থ। ঘরটা তুই ভালো করে গুছিয়ে দে‌। গোছানো শেষ হলে পারফিউম স্প্রে করে দিবি, বিচ্ছিরি গন্ধটা যেন দূর হয়।”

মিতা মাথা নেড়ে নেমে পড়ল কাজে। শাহিনূর মেয়েকে ধরে নিয়ে এলেন নিজের ঘরে। বিছানায় বসিয়ে নিয়ে এলেন গরুর মাংস আর সাথে বেশ কয়েকটা ভাজা মরিচ দিয়ে ঝাল ঝাল করে ভাত মাখিয়ে। মুখের মধ্যে জোর করেই ঠেসে দিয়ে বললেন,“কী হয়েছে জিজ্ঞেস করবো না। যদি মনে হয়, আম্মুকে বলা যাবে না তাহলে বলতে হবে না। কিন্তু এভাবে নিজেকে কষ্ট দিতে নেই, মা। তোমার আব্বু-আম্মু তোমাকে কত ভালোবাসে, বলো! তোমার ছোটো ছোটো দুই ভাই-বোন তোমাকে একটু না দেখলে অস্থির হয়ে যায়। তোমার নানু সারাক্ষণ তোমার নামে এর ওর কাছে সুনাম করে। তুমি যদি অসুস্থ হয়ে পড়, নিজেকে কষ্ট দাও, রক্ত ঝরিয়ে নিজেকে ধ্বংস করতে চাও, পাগলামি করো তাহলে আমাদের কী হবে? আদৌ কী তুমি ধ্বংস হবে? না। বরং ধ্বংস হবে তোমার আপন মানুষেরা। তোমার মতো মিষ্টি একটা মেয়ে কেনো যে এমন করেছে বা করছে তা আমি জানি না। তবে মনে রাখবে, আমরাই তোমার আপনজন। তোমার সব পরিস্থিতিতে আমরা তোমার পাশে আছি। আর কখনো এমন করো না, আম্মু। মনে দুঃখ পুষে রেখো না। সহ্য ক্ষমতা হারালে, এসে জড়িয়ে ধরে না হয় একটু কেঁদে মন হালকা করো। আমায় না বলতে পারলে আল্লাহকে বলো। তবুও তুমি কষ্ট পেও না। তোমার কষ্ট দেখলে আমাদেরও ভীষণ কষ্ট হয়।”

শাহিনূরও কান্নায় ভেঙে পড়লেন। সুশ্রী চমকালো। তার কান্না থেমে গিয়েছে। এমন করে তো কখনো সে ভেবে দেখেনি? বরং ভেবেছে শুধু নিজের একপাক্ষিক প্রেম, ভালোবাসার কথা। আম্মুকে সে আবার জড়িয়ে ধরলো শক্ত করে। সারাজীবন শুধু জেনে এসেছে বাবাই তাকে বেশি ভালোবাসে। অথচ আজ! এই মুহূর্তে!

যখন তার হুঁশ ফিরবে, যখন ধোঁয়াশা কাটিয়ে ফিরে আসবে বাস্তব জীবনে— তখন হয়তো নিজের করা অবুঝপনার জন্য ভীষণ আফসোস করবে সুশ্রী। মরীচিকার পেছনে ছুটে সে নিজের ক্ষতি করতে চেয়েছিল। ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দিচ্ছিল নিজের সুন্দর, সুস্থ পরিবারকে। আফসোস তো তাকে করতেই হবে!

চলবে _________

(কপি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here