#চৈত্রের_প্রেম_নির্বাসন — — ১৯ #আরোবী_খান_সিনথিয়া

0
1

#চৈত্রের_প্রেম_নির্বাসন — — ১৯
#আরোবী_খান_সিনথিয়া

মাহিরের গাড়ি থেমেছে মাঝপথে। গাড়ি থামতে দেখে পিহু বাইরে তাকালো , এখনো বাড়ি পৌঁছায় নি তারা ! পিহু ভ্রু কুঁচকে তাকালো মাহিরের দিকে। মাহিরের দৃষ্টি আগে থেকেই পিহুর ওপর ছিল বিধায় দু’জনের দৃষ্টি আটকে আসল। পিহুর জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে মাহিরের দিকে। মাহির সিট বেল্ট খুলে , বের হয়ে আসল গাড়ি থেকে। পিহু আরও খানিকটা অবাক!

মাহির পিহুর জন্য গাড়ির দরজা খুলে দিল , পিহু ভ্যাবলার কোন প্রশ্ন না করেই , গাড়ি থেকে বের হয়ে আসল। রাত গভীর ! কিছুক্ষণ পর পর গাড়ি , বাইক পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছে ! তার সাথে পিহু আর মাহিরকে ছুঁয়ে যাচ্ছে , ঠান্ডা , স্নিগ্ধ বাতাস!

পিহু আর না পেরে প্রশ্ন ছুঁড়ল ,
— “বাড়ি যাবো না , মাহির ভাই ?”

এতক্ষণ ধরে হাঁসফাঁস করতে থাকা মাহির মুহূর্তেই জড়িয়ে ধরল পিহু! মাহির পিহুর মাথায় বুলাচ্ছে! পিহুর মাথায় আলতো করে চুমু খেয়ে উঠল। পিহু মূর্তির ন্যায় ! হেলদোল নেই তার মাঝে!

মাহির এক ঢোক গিলে , অস্থির কন্ঠে বলল ,
— “আম…আমি ভীষণ ভয় পেয়েছিলাম , পিহু! মনে হচ্ছিলো , এই আমি তোকে হারিয়ে ফেলছি ! জানিস , মাথায় কত বাজে চিন্তা আসছিল ?”

পিহু নিরুত্তর! মাহিরের পিঠে হাত বুলাতে লাগল! পিহু অনুভব করল , তার পরণের কামিজে , কিছু পরেছে ; মুহূর্তেই মাহিরের ফুঁপিয়ে উঠার শব্দ আসল !

পিহু ঘাবড়ালো ; চাপা স্বরে বলল ,
— “কাঁদছেন কেন আপনি? মরে গেছি নাকি আমি ? এই যে আপনার সামনে , আপনার কাছেই তো আছি!”

***

মির্জা বাড়ির ড্রয়িংরুম জুড়ে সবাই! এক সোফায় বসে আছে , মোহনা , রাহা , রেহান আর রেদওয়ান ! আরেক সোফায় রাশেদা বেগম আর জাহানারা বেগম ! মাহির দাঁড়িয়ে সোফার পাশটায়! তার পাশে পিহু! ছোটদের সামনেই প্রিয়তা বেগমকে বকছেন আলিফ মির্জা ,

— “মেয়েটার যখন খেয়াল রাখতে পারবে না , নিয়ে গেলে কেন নিজের সাথে ?”

প্রিয়তা আমতা আমতা করতে লাগল ,
— “ভাইয়া দেখুন…”

প্রিয়তা বেগমের কথা কেটে আলিফ মির্জা বললেন ,

— “থামো…আর কোন কথা শুনতে চাইছি না আমি তোমার ! কাল তোমার বান্ধবীর বাড়ি থেকে নিজেদের জিনিস নিয়ে এসো! তোমরা আর কোথাও যাচ্ছো না! এটাই আমার শেষ কথা !…”

প্রিয়তা বেগম অস্থির কন্ঠে বললেন ,
— “না , ভাই…”

আলিফ মির্জা গর্জে উঠলেন ,
— “তোমাকে আমি জিজ্ঞেস করেছি , তোমরা ফেরত আসবে নাকি ? হা ? আমি এ ব্যাপারে আর কোন কথা বলতে চাই না !”

কথাটা বলেই আলিফ মির্জা নিজের রুমের দিকে চলে গেলেন। তার পিছু পিছু আসলেন রাশেদা বেগম। জাহানারা বেগম প্রিয়াকে বিদায় দিয়ে , নিজের বাড়ির দিকে চললেন। রাত হওয়ায় , রেদওয়ান তাকে বাড়ি দিয়ে আস্তে বের হলো ! রাহা এই সিদ্ধান্তে মোটেও খুশি হলো না ! সাথে সাথে বড় বড় কদম ফেলে , সিঁড়ি বেয়ে নিজের রুমের দিকে চলে গেল! পিহুকে একবার আড়চোখে তাকিয়ে মোহনা কিছু বলল না! কিন্তু অনেক দিন পর প্রিয়তা বেগমকে দেখে ভীষণ খুশি হলো! প্রিয়তা বেগম একবার মেয়ের দিকে চাইলেন , ফের মোহনার জোর করায় তার সাথে চলে গেলেন!

****

পিহু , মাহির আর রেহান খাবারের টেবিলে বসা। রাশেদা বেগম খাবার বাড়ছেন সবার পাতে! রেহান মিটি মিটি হাসতে হাসতে পিহুকে দেখে যাচ্ছে ! মাহির পানির গ্লাসে পানি ঢালতে পানি ঢালতে , চাপা স্বরে বলল ,

— “রেহান ?”
— “ইয়েস , ব্রো ?”
— “ভাত খাও !”

মাহিরের কথা শুনে পিহু থেকে চোখ সরিয়ে , রেহান নিজের প্লেটের দিকে তাকালো , শুধু ভাত বাড়া হয়েছে! রাশেদা বেগম ফের রান্না ঘরে গেলেন , তরকারি , ভাজি , ভর্তা এসব নিয়ে আসতে !

ফের রেহান মাহিরের দিকে তাকালো। ভ্রু কুঁচকে
বলল , — “কীভাবে খাবো , ব্রো ?”

মাহির নির্লিপ্ত কন্ঠে বলল , — “কেন ? হাত দিয়ে !”

রেহান শুকনো শুকনো দানা ভাত চিবিয়ে বলল ,
— “শুধু ভাত কীভাবে খাবো ?”

মাহির ফের বলল , — “হাত দিয়ে !”

রেহানের কপালে ভাঁজ পরল! ঠোঁট কামড়ে মাহিরের দিকে তাকিয়ে থাকল। মাহির তখনো নির্লিপ্ত ! রেহান তার দিকে তাকানো , ব্যাপারটা জেনেও মাহির স্বাভাবিকভাবে বসে আছে ! রেহানকে কিছু বলছে না!

রাশেদা বেগম সবার পাতে তরকারী ঢেলে দিলে , সবাই খেতে লাগল। খেতে খেতে তখনও রেহান পিহুর দিকে মিটি মিটি তাকাচ্ছে আর হাসছে ! হাসতে হাসতে বললেই ,

— “পিহু বোকা মেয়ে ! এখনো খাবার খেতে শেখলো না!”

পিহু ভ্রু কুঁচকালো। বিরক্তিতে বলল ,
— “আমি বোকা না !”

পিহু বিরক্ত হয়েছে , বুঝতে পেরে সশব্দে হেসে উঠলো রেহান , — “এই দুনিয়ায় যদি বোকাদের লিস্ট হতো! তাহলে তুই এক নাম্বারে থাকতি , বোকা…”

পিহু মুহূর্তেই রাগান্বিত হয়ে হাত তুলতেই , রাশেদা বেগম বকা দিলেন রেহানকে! পিহুকে যেন সে বিরক্ত না করে ! পিহুর খাওয়া শেষে , পিহু হাত ধুতে রান্না ঘরের দিকে গেল , সে মুহূর্তেই হেঁচকি উঠল রেহানের!
রেহান হবেই পানির গ্লাসটা নিতে যাবে , কিন্তু তার চোখের সামনেই পানির গ্লাসটা মাহির ছোঁ মেরে নিয়ে নিল! রেহান ভ্রু কুঁচকে তাকালো মাহিরের দিকে !

মাহির ধীর কন্ঠে বলল , — “পিহুকে আর জ্বালাবে না?”

রেহান দ্রুত ডানে বামে মাথা নাড়ল। সে আর কখনো পিহুকে জ্বালাবে না ! মাহির ফের বলল ,
— “প্রমিস?”

রেহান মাথা নাড়ল , — “প্রমিস!”

রেহানের দিকে পানির গ্লাসটা এগিয়ে দিল মাহির। রেহান ঝটপট গ্লাসটা হাতে নিয়ে ঢকঢক করে পানি পান করতে লাগল! পিহু রেহানকে এভাবে পানি পান করতে দেখে , ভ্রু কুঁচকে বলল ,

— “ইশ! পানি কী জীবনে খাওনি তুমি ? এই প্রথম যাচ্ছো নাকি? ইশ! পুরো টিশার্টে পানি ফেলে দিলে!”

পানি পান করতেই , রেহান পিহুর দিকে শাহাদাত আঙুল তুলে বলল , — “এ্যা চুপ…”

মাহির খাবারের টেবিলে বাড়ি দিয়ে উঠল। মুহূর্তেই কেঁপে উঠল রেহান! মাহিরের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে চুপচাপ খেতে লাগল! পিহু সিঁড়ি বেয়ে উপরের দিকে যাচ্ছে দেখে , মাহিরও উঠে পরল ; আর খেলো না!

নিজের রুমকে পাশ কাটিয়ে মাহির , পিহুর রুমের দিকে যেতে গিয়েও থেমে গেল। নিজের রুমের ভেতর উঁকি দিয়ে দেখল , পিহু তার রুমে ! মাহির এক হাত দরজার পাশটায় দিয়ে হেলান দিয়ে দাঁড়ালো ! মিথ্যে কাশি দিতেই , পিহু তার দিকে তাকালো !

মাহির হাসি চেপে বলল , — “কী ? আমার রুমে কী ? নিজের রুমের রাস্তা কী ভুলে গেছিস?”

পিহু কিছুটা লজ্জা পেল ! উত্তর না দিয়ে , দৌড়ে পালাতে চাইল। কিন্তু মাহির পিহুর হাতের কব্জি ধরে ফেলল ! পিহুকে টানতে টানতে নিজের কাছে নিয়ে আসল! পিহু লজ্জায় ফ্লোরের দিকে তাকানো! মাহির হাঁটু গেড়ে পিহুর সামনে দাঁড়ানো ! পিহু চমকালো! চোখ দু’টো বিস্ময়ে বড় বড় হয়ে আসল !

মাহির মুখে হাসি নিয়ে ক্ষীণ কন্ঠে বলল ,

— “আমি তোকে কতটা মিস করেছি , জানিস?”

পিহু ডানে বামে মাথা নাড়ল ! জানে না সে ! মাহির হাসল , — “আমি তোকে কতটা ভালবাসি , জানিস?”

পিহু ফের মাথা নাড়ল , সে জানে না ! মাহির চোখ দু’টো জলে টলমল করছে! মাহির কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলল ,
— “এবার আর তোকে কোথাও যেতে দেব না! আমার পাশে দাঁড়াবি না? আমার হাতে হাত রেখে , সবার সামনে বলতি পারবি না , তুই আমাকে ভালোবাসিস ! আমার সাথে থাকবি ?”

চলবে—

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here