চৈত্রের_প্রেম_নির্বাসন — — ২০ #আরোবী_খান_সিনথিয়া

0
2

#চৈত্রের_প্রেম_নির্বাসন — — ২০
#আরোবী_খান_সিনথিয়া

“মাহির ভাই ! বাড়িতে আসতে না আসতেই অত্যাচার শুরু করে দিলেন !”

কথাটা বলেই থেমে ছিল পিহু। ভ্রু কুঁচকে তাকানো মাহিরের দিকে ! কিন্তু মাহিরের সেদিকে কোন ভ্রু ক্ষেপ নেই। বইয়ের পৃষ্ঠা উল্টাতে উল্টাতে মাহির প্রশ্ন ছুঁড়ল ,

— “বোর্ড এক্সাম কবে জানিস?”

পিহু ঠোঁট কামড়ে ধরল। আশপাশ তাকাতে তাকাতে মিনমিনিয়ে বলল ,

— “চার মাস পর !”
— “বই কত বার শেষ করেছিস ?”

এবার পিহুর কন্ঠ শোনায় গেল না। উত্তর না পেয়ে মাহির বই থেকে চোখ সরিয়ে পিহুর দিকে তাকালো। পিহুর চোখ নামানো। মাহির ঘাড় বাঁকিয়ে পিহুর দিকে তাকালো। পিহুর দৃষ্টি ভয়ার্ত !

মাহির এক ভ্রু উঁচিয়ে ফের প্রশ্ন করল , “কতবার ?”

পিহু হাত দিয়ে “শূণ্য” দেখালো ! মাহির ঠোঁট কামড়ে তাকিয়ে থাকল পিহুর দিকে। পাশ থেকে রেহান হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খেতে লাগল ,

— “তোকে কী আমি এমনি এমনি বোকা মেয়ে বলি?
তুই যাস্ট বোকা না ! তার সাথে পড়াচোরও…”

পিহু চোখ কটমট করে তাকালো রেহানের দিকে। রেহানের বাহুতে চিমটি কাটতেই , রেহান ধড়ফড়িয়ে উঠল। মাহির আড়চোখে তাকিয়ে দৃশ্যটি দেখে , বই দিয়ে টেবিলে এক বাড়ি মারল। মুহূর্তেই চুপ হয়ে গেল দুই পিচ্চি ! পিহু এক ঢোক গিলে আড়চোখে মাহিরের দিকে তাকালো।

মাহিরের চোখ মুখ শক্ত দেখে , ভ্রু কুঁচকে গেল পিহুর।
মাহির কেন এত রেগে আছে তার ওপর ? পিহু বুঝল না! মাহির দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে , খাতায় ম্যাথ রিলেটেড প্রশ্ন লিখতে লিখতে গম্ভীর কন্ঠে বলল ,

— “ আজ যে এই ম্যাথগুলো করতে পারবে সময়ের মধ্যে , সে যা চাইবে ! আমি তাকে তাই গিফট করব !”

রেহান উৎফুল্ল হয়ে বলল , — “ম্যাথ গুলো করতে পারলে , আমাকে তুমি স্টেডিয়ামে খেলা দেখাতে নিয়ে যাবা , মাহির ভাই ?”

“হ্যাঁ , যাবো !” — ছোট উত্তরটা দিয়ে মাহির রেহান থেকে দৃষ্টি সরিয়ে পিহুর দিকে তাকালো। পিহুর ভ্রু কুঁচকানো ! মাহিরকে সে পরখ করছে ! মাহির পরীক্ষা নেয়ার আগে সচরাচর বলে দেয় ! কিন্তু যখন রেগে থাকে তখনই হুটহাট পরীক্ষা নেয় ! আর তখনই পরীক্ষার প্রশ্ন ভীষণ কঠিন করে ! তার মানে , পরীক্ষায় বেশি নাম্বার পেলেও , মাহির মনের ইচ্ছে পূরণ করবে না! শর্ত একটাই , সময়ের মধ্যে সবগুলো ম্যাথই করতে হবে !

পিহুর চিন্তার মাঝেই , মাহির রেহানকে পিহুর পাশ থেকে উঠিয়ে বিছানার ওপর বসিয়ে দিল যেন রেহান চিটিং করতে না পারে !

আধা ঘন্টা ধরে , পিহু আর রেহান পরীক্ষা দিচ্ছে! পিহুর মাথার ঘাম ছুটে যাচ্ছে , ম্যাথগুলো করতে ! স্কুলের টেস্টেও এত কঠিন ম্যাথ দেয় না ! তাদের স্কুলটা অবশ্য স্বনামধন্য হওয়ায় , পরীক্ষা কঠিন করে !
সেই প্রশ্নগুলোও বোধ হয় আজ হার মানাচ্ছে !
পিহু রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে মাহিরের দিকে তাকায় ! মাহির এক দৃষ্টিতে তাকেই দেখছে , তার প্রেয়সীর নাকের ডগা ফুলে উঠছে রাগে ক্ষোভে! মাহির চাপা হাসল ! মুখ ভেংচি কেটে পিহু মুহূর্তেই দৃষ্টি সরিয়ে নিল!

কিন্তু রেহান ? রেহান ম্যাচে এমনি দুর্বল , যার জন্য হাঁস ফাঁস করছে ভীষণ , — “এগুলো ম্যাথ নাকি ইট পাথর , মাহির ভাই ? আমার দাঁতই ভেঙে যাচ্ছে ম্যাথগুলো করতে যেয়ে !”

মাহিরের গম্ভীর কন্ঠে উত্তর আসল ,
— “শাট আপ ! এক্সাম দে চুপচাপ !”

মাহিরের ধমকে চুপসে গেল রেহান। একবার পিহুকে দেখল। পিহু ভীষণ সিরিয়াসলি পরীক্ষাটা দিচ্ছে! দৃশ্যটি দেখে মুখ বাঁকালো রেহান ! এত মেহনত করে পরীক্ষা দিয়ে কী লাভ ওর ? ফুল মার্কস তো পাবেই না! মাহির ভাই গিফটও দিবে না !

*
এক বিছানায় মোহনা আর রেদওয়ান ঘুমালেও , তাদের মাঝে ভীষণ দূরত্ব ! রেদওয়ান পিহুর সাথে হওয়া ঘটনাটা নিয়েই ভাবছিল ! চাপা স্বরে মোহনার উদ্দেশ্যে বলল ,

— “তু…তুমি করিয়েছিলে এসব , তাই না ?”

মোহনা ভ্রু কুঁচকালো , — “কীসব?”

রেদওয়ান উঠে বসল , — “পিহুকে কিডন্যাপ করিয়ে , পতিতালয়ে পাঠিয়েছিলে ! তাই না ?”

মোহনা ভড়কালো , — “পাগল হয়েছো তুমি , রেদওয়ান? কি বলছো , বুঝে শুনে বলছো তো ?”

রেদওয়ান চাপা স্বরে বলল , — “বুঝেই বলছি !”

কথাটা বলেই থেমেছিল রেদওয়ান! ফের বলল ,

— “পিহুর ওপর এসিড মারার কাজটাও , তুমিই লোক দিয়ে করিয়ে ছিলে! আমার কাছে প্রমাণও আছে !”

মোহনা চুপসে আসল ! আশপাশ তাকাতে লাগল ! রেদওয়ান ফের বলল ,

— “আমি কখনো ভাবিনি! আমার ভালোবাসার মানুষটা এতটা নিকৃষ্ট হবে !”

মোহনা তাকালো রেদওয়ানের দিকে। নিজের স্বামীর মুখে নিজের জন্য ঘৃণা দেখে বুকটা জ্বলছে ভীষণ তার! মোহনার কান্না পেল ,

— “আমি সত্যি বলছি , পিহুকে আমি কিডন্যাপ করাইনি , রেদওয়ান! বিশ্বাস করো !”

রেদওয়ান মলিন হেসে বলল , — “তোমাকে বিশ্বাস করতে করতে আমি এখন ভীষণ ক্লান্ত , ভুবনমোহিনী !”

কথাটা বলেই থেমেছিল রেদওয়ান! দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল , — “আমি আর তোমার সাথে থাকতে পারছি না! কেমন যেন দম বন্ধ হয়ে আসে ! আমাদের কী এখন ডিভোর্স নিয়ে নেয়া উচিৎ?”

*

দুই ঘন্টা পর পরীক্ষা শেষে মাহির দু’জনের খাতা থেকে করছে ! রেহানের খাতায় ম্যাথ বাদে কিসব আঁকিবুঁকি! মাহির রেহানের দিকে আড়চোখে তাকালো ! রেহান মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল ! মিইয়ে আসা কন্ঠে বলল ,

— “টেনে টুনে করতাম পাশ ! তুমি পাশ করার মতোও ম্যাথ দিলে না আমায় ! আমি কী করতাম ?”

মাহির দীর্ঘশ্বাস ফেলল। পিহুর হাসির শব্দ পেয়ে মাহির তাকালো ! পিহু দাঁত কেলিয়ে হাসছে !

“পিহু…” — মাহিরের ডাকে , পিহু নিজের মুখ খানিকটা মাহিরের কাছে নিয়ে আসল ! ভীষণ ভদ্র সুরে বলল , — “জ্বি ?”

মাহির ভ্রু কুঁচকালো। কিছুটা দূরে সরে আসল ! কিছুটা অস্থির ঠেকল তার মুখখানি! পিহুর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে ,
পিহুর খাতায় দৃষ্টি দিল ! পিহু দেখল , কাটছাট চলছে খাতায় ! পিহুর মুখ ফ্যাকাশে হয়ে আসল ! একশত এর মাঝে পিহু তুলল ষাট মার্কস!

পিহুর চুপসে আসা মুখ দেখে , মাহির দীর্ঘশ্বাস ফেলল ,

— “যখন প্রশ্নগুলো ভীষণ কঠিন ছিল , তখন আমি আমার শর্ত পাল্টাচ্ছি ! যে সবচেয়ে বেশি মার্কস পেয়েছে , তাকে আমি নিজ থেকে ট্রিট দেব…কিন্তু আমার পছন্দের !”

মাহিরের কথা শুনে , পিহুর চোখে মুখে হাসির জোয়ার!
পিহু নিজের অজান্তেই বলে উঠল ,

— “আমি আপনাকে ভীষণ ভালোবাসি , মাহির ভাই !”

কথাটি শুনে মাহির ভয়ার্ত মুখে রেহানের দিকে তাকালো। রেহান ব্যাপারটা ধরতে পেরেছে কী
পারেনি ? মাহির বুঝল না ! কিন্তু পিহুর কথায় রেহান ভড়কালো ,

— “আমিও তো তোর ভাই হই! এক বছরের বড় হলেও তো হই নাকিইইই ? আমাকে তো কোন দিন বললি না! রেহান ভাইয়া , আমি তোকে ভীষণ ভালোবাসি! আমাকে কী পরিবারের লোক রাস্তা থেকে কুড়িয়ে এনেছিল নাকি যে , এত বৈষম্য?”

রেহানের কথায় , মুখ ভেংচি কাটল পিহু! মাহিরের দিকে উত্তরের আশায় তাকালো ভীষণ উচ্ছ্বাস নিয়ে!
কিন্তু অপর পাশ থেকে মাহিরের উত্তর আসল। পিহু নিরাশ হলো! আরও একবার ট্রাই করল ,

— “আমি আপনাকে ভীষণ ভালোবাসি , মাহির ভাই ! আপনি আমাকে ভালোবাসেন না ?”

মাহির দেখল , পিহুর চোখে মুখে উচ্ছ্বাস! তার বড্ড কষ্ট হলো সেই উচ্ছ্বাসটুকু কেড়ে নিতে! মাহির চেয়ার ছেড়ে উঠে , পিহুকে পাশ কাটালো ! জানালার কাছে যেতে যেতে বলল ,

— “টেস্ট পরীক্ষায় যখন ফেল করবি ; এই মাহির ভাইই…তখন তোকে পেটাবে! তখন তোর ভালোবাসার ভূত জানালা দিয়ে উড়াল দিবে !”

পিহুর ভ্রু জোড়া কুঁচকে আসল ! মাহির তার সাথে এমন কেন করছে ? এর উত্তর মেলছে না পিহুর কাছে!
খাতা বই গুছিয়ে রেহান পিহুকে ডাকলেও , পিহু উঠল না! মাহির পেছন ঘুরে পিহুকে দেখে ধমকালো ,

— “কী হলো ? পড়া তো শেষ ! উঠছিস না কেন এখনও? নাকি এখানেই ঘুমানোর প্ল্যান করেছিস ?”

পিহু ফ্যাকাশে মুখেই বলল ,

— “হু , আজ এখানেই ঘুমাবো আমি !”

পিহুর কথায় বাকরুদ্ধ মাহির! চোখের পলক ঝাঁপটে কয়েক বার দেখল পিহুকে! কিছুটা অস্থিরতা মেশানো কন্ঠে বলল , — “যলদি উঠ ! বের হো আমার রুম থেকে!”

পিহু তখনো উঠল না। মাহির এবার না পেরে , পিহুর
হাত ধরে তাকে টেনে টেনে রুম থেকে বের করে দিল! পিহুর পেছন পেছন রেহানও রুমের দরজার বাইরে দাঁড়ানো!

“কাল স্কুল যাওয়ার কোন দরকার নেই ! কাল তোরা বাড়িই থাক !…আর কাল আমি পিহুকে ঘুরতে নিয়ে যাচ্ছি ! মনে থাকে যেন…” — কথাটা পিহুর মুখের ওপরই মাহির দরজা লাগিয়ে দিল!

চলবে—

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here