চৈত্রের_প্রেম_নির্বাসন — — ১৪ #আরোবী_খান_সিনথিয়া

0
2

#চৈত্রের_প্রেম_নির্বাসন — — ১৪
#আরোবী_খান_সিনথিয়া

“রাস্তায় যদি মাহিরকে দেখেছিস! তার সাথে দেখা করবি না ! সে যদি কথা বলতে আসে , দৌড়ে চলে যাবি! বাড়ি এসে আমাকে জানাবি , কেমন ?”

পিহুর মাথায় দু’টো বেনুনি করতে করতে কথাটা বললেন প্রিয়তা বেগম। পিহু মন খারাপ নিয়ে কিছুই বলল না।

রুমের দরজার সামনে এসে দাঁড়ালেন জাহানারা। হেসে ডাকলেন , — “নাস্তা রেডি করেছি , প্রিয়তা ! যদি পিহুকে নিয়ে নিচে আয়।”

প্রিয়তা বেগম দ্রুততার সাথে পিহুর বেনুনি করতে লাগলেন , — “আসছি ! তুই যা ! আর পাঁচ মিনিট!”

প্রিয়তার কথা শুনে , জাহানারা চলে গেলেন। জাহানারা বেগম প্রিয়তার ছোটবেলার ফ্রেন্ড। বাড়িটি জাহানারা বেগমের বাবার ! জাহানারা বেগম কখনো মা হতে পারবেন না ; কথাটি জানতে পেরে দ্বিতীয় বিয়ে করেছিলেন তার হাসবেন্ড। তারপর জাহানারা ডিভোর্স নিয়ে চলে আসে , তার বাবার রেখে যাওয়া সম্পত্তি ! একমাত্র এই বাড়িটিতে ! বর্তমানে এক স্কুলে টিচারের জব করছেন। সেখান থেকে যত স্যালারি পাচ্ছেন তা দিয়ে চলে যায় তার ! তারপরও তিনি একটা সরকারী চাকরি পেতে , বিভিন্ন জায়গায় পরীক্ষা দেন বছরে। সমাজে নারীর একা বাঁচতে হলে , প্রতিষ্ঠিত হওয়ার বিকল্প নেই ! তাই বয়স ২৮ হওয়ার পরও পড়াশোনা করছেন রোজ ! পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছেন একটু একটু করে।

পিহুকে নিয়ে প্রিয়তা বেগম ডাইনিং টেবিলে চলে আসলেন। পিহুর প্লেটে খাবার তুলে দিতে দিতে জাহানারা বেগম বললেন , — “কী হয়েছে , সোনা মনি? মনটা খারাপ কেন তোমার ?”

পিহু জেদ করে বলল , — “আমরা এখানে কেন এসেছি ? আমি বাড়ি যাবো ! থাকব না এখানে !”

প্রিয়তা বেগম রেগে উঠলেন , — “কী ভেবেছিস? আমি জানি না ! তুই ওখানে কেন যেতে চাইছিস? পিহু মাথায় ঢুকিয়ে ফেল , মাহির তোর কেউ না !”

পিহু রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে মায়ের দিকে তাকালো। রাগে নাক টানতে টানতে বলল , — “খাবো না আমি !”

ডাইনিং টেবিল থেকে উঠে চলে গেল। জাহানারা বেগম রাগলেন বান্ধুবীর ওপর। টিন এইজ মেয়েদের সাথে কেউ এভাবে কথা বলে ? এই বয়সের মেয়েরা ভীষণ সেনসিটিভ হয় !

পিহু নিজের রুম থেকে স্কুল ব্যাগ নিয়ে , চলে যেতে নিলে , জাহানারা বেগম তাকে থামিয়ে দিলেন । হাতে পঞ্চাশ টাকার এক নোট ধরিয়ে হেসে বললেন ,

— “কিছু তো খেলে না , মা ! স্কুল যেয়ে খেয়ে নিও , কেমন ? আর সাবধানে হেঁটো! মন দিয়ে পড়ালেখা করো , কেমন ?”

পিহু কিছু বলল না ! টাকা ফেরত দিয়ে , বের হয়ে আসল বাড়ি থেকে। সে হাঁটা শুরু করেছে , পেছন থেকে প্রিয়তা বেগম দৌড়ে আসলেন ,

— “এই মেয়ে ! এতো কিসের জেদ তোর ? না খেয়ে চলে আসলি ! টাকাও নিলি না !”

পিহু টলমলে চোখ নিয়ে , ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলল ,
— “লাগবে না টাকা। আমাকে মাহির ভাইয়ার কাছে দিয়ে এসো !”

কথাটা বলতে না বলতেই পিহুর গালে থাপ্পড় এসে পরল। প্রিয়তা বেগম আর না পেরে , রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বললেন , — “ তোকে ন’মাস পেটে ধরেছিলাম কী মাহির মাহির শোনার জন্য ? তোকে আমি ভালোবাসিনি কখনো ? মাহিরই তোকে আদর করেছে শুধু আমি করিনি ?”

পিহুর কাঁধ ধরে , তাকে ধাক্কা দিয়ে নিজের থেকে দূরে সরিয়ে বললেন , — “যাহ ! চলে যা , তোর মাহিরের কাছে! আমার আশে পাশেও যেন তোকে আর না
দেখি !”

কথাটা বলেই বড় বড় কদম ফেলে বাড়ির ভেতর চলে গেলেন প্রিয়তা বেগম। পিহু তার পিছু নিয়ে ছিল। কান্না করতে করতে আম্মুকে ডাকল। কিন্তু প্রিয়তা বেগম শুনলেন না। পিহুর কান্নারত মুখের ওপর দরজা লাগিয়ে দিলেন। লোহার দরজায় পিহু কতক্ষণ কষাঘাত করল। কিন্তু কেউ দরজা খুলল না। পিহু শুনল , ভেতর থেকে জাহানারা বেগম প্রিয়তাকে দরজা খোলার জন্য বললেন । কিন্তু প্রিয়তা বেগম উল্টো ঝাড়ি দিয়ে তাকে সরিয়ে ফেললেন ব্যাপার থেকে। পিহু আর না পেরে , কাঁদতে কাঁদতে স্কুলের পথে হাঁটা ধরল। অভিমান নিয়ে বিড় বিড় করল , — “আম্মু ভালো না !
আম্মু পচা ! আম্মু খারাপ ! সে আর আমাকে ভালোবাসে না !”

রাস্তায় পিহুর কেউ রাস্তা আটকেছে , দেখে , পিহু মুখ তুলে তাকালো। চেঁচিয়ে উঠলো , — “মাহির ভাইয়া !”

কথাটা বলেই , মুহূর্তেই জড়িয়ে ধরল মাহিরকে পিহু।
কান্না করতে লাগল বাঁধ ভেঙে। মাহির মুহূর্তেই থমকে গেল। পিহুর কান্নার শব্দ মাহিরের বুকে তীরের মতো বিঁধছে।

মাহির পিহুর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে , কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলল , — “কী হলো ? কাঁদছিস কেন তুই এখনো ? আমি তো এসে পরেছি নাকি ?”

পিহু মুখ তুলে তাকালো। ভাঙা ভাঙা গলায় বলল ,
— “আমি ভেবেছিলাম ! আপনার সাথে আর দেখা হবে না আমার ! আম্মুকেও বলেছিলাম , আপনার কাছে দিয়ে আসতে! দেখুন , সে আমাকে থাপ্পড় মেরেছে উল্টো ! বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে !”

কথাগুলো বলতে বলতে পিহু আরও ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল। মাহির দেখল , পিহুর ডান গালটা লাল হয়ে আছে কিছুটা। মাহির সে গালে হাত বুলাতে বুলাতে দাঁতে দাঁত পিষে বলল , — “বেশি জোরে মেরেছে তোকে ? আবারও মেরেছে ?”

পিহু কিছু বলল না। মাহির পিহুর হাত ধরে , স্কুলের দিকে এগিয়ে যেতে লাগল , — “নাস্তা করেছিস ?”

পিহু নাক টানতে টানতে বলল , — “নাহ !”

মাহির এক হোটেলের সামনে থামল। নাস্তা কিনে পিহুর হাতে ধরিয়ে দিল। পকেট থেকে কিছু টাকা বের করে , পিহুর হাতে ধরিয়ে দিল। পিহু ভ্রু কুঁচকালো। মাহির স্বাভাবিক কন্ঠে বলল ,

— “রাখ ! লাগবে তোর ! আর শোন , মিসেস প্রিয়তার সাথে আর ঝগড়ায় জড়াস না , পিহু। আমি চাই না , কেউ তোকে আঘাত করুক ! কিছু দিন অপেক্ষা কর ! আমি তোকে নিজের কাছে নিয়ে আসব !”

পিহু উৎকণ্ঠা হয়ে বলল , — “কখন ?”

মাহির থমকালো। ক্ষীণ কন্ঠে বলল , — “ শীঘ্রই ! আগে তুই বড় হো !”

পিহু মুখ বাঁকালো , — “আর কত বড় হবো ? পরের বছর ক্লাস টেনে উঠব আমি !”

মাহির পিহুর হাত ধরে আবার স্কুলে যেতে যেতে বলল ,
— “যখন ভার্সিটিতে উঠবি তখন !”

পিহু হাত ঝাড়া মেরে ছেড়ে দিল। মাহির হতভম্ব হয়ে তাকালো পিহুর দিকে। পিহু মুখ ফুলিয়ে বলল ,
— “তা তো অনেক দেরি ! আমি এখনই আপনার সাথে থাকব !”

মাহির অস্থির কন্ঠে বলল , — “এখন পসিবল না , পিহু। বোঝার চেষ্টা কর!”

“আমি কিছু বুঝতে চাই না। আপনারা সবাই এমন কেন করছেন আমার সাথে ? সবাই বলে , তাদের বুঝতে! কিন্তু কেউ আমাকে বুঝতে চায় না !” — কথাটা বলেই মাহিরের দেয়া নাস্তা আর টাকা মাহিরের হাতে ধরিয়ে দিয়ে পিহু স্কুলের দিকে দৌড়ে গেল। মাহির ডাকল পিহুকে। কিন্তু পিহু পেছন ফেলল না।

মাহির দীর্ঘশ্বাস ফেলে গাড়ির দিকে যেতে লাগল। মাহিরের সামনে এক মহিলা এসে দাঁড়ালেন। প্রশ্ন ছুঁড়লেন , — “তুমি মাহির ?”

মাহির কিছুটা ভ্রু কুঁচকে বলল , — “জ্বি ; কিন্তু আপনি ?”

মহিলাটি বলল , — “আমি জাহানারা…জাহানারা ইমাম ! প্রিয়তার ছোটবেলার ফ্রেন্ড। চলো , কোথাও বসা যাক! পিহুর ব্যাপার নিয়ে কথা বলাও যাক !”

মাহির সম্মতি জানালো। মাহির জাহানারা বেগমকে নিয়ে গাড়ি করে এক রেস্টুরেন্টের সামনে আসল।
রেস্টুরেন্টে এসেছে তারা পাঁচ মিনিট হলো , জাহানারা বেগম খুচিয়ে খুঁচিয়ে মাহির কে দেখছে। মাহির কিছুটা বিরক্ত হয়ে বলল ,

— “আপনি আমাকে এভাবে দেখা বন্ধ করবেন প্লিজ ? আমি অস্বস্তিতে পরছি!”

জাহানারা বেগম সে কথার তোয়াক্কা করলেন না। স্বাভাবিক কন্ঠে বললেন , — “পিহুকে ভালোবাসো
তুমি ?”

স্পষ্টভাষী কথায় মাহির কিছুটা বিস্মিত হলো ,
— “হ্যাঁ , বাসি তো ! ভীষণ ভালোবাসি আমি পিহুকে!”

জাহানারা বেগম কফির মগে চুমুক দিয়ে বললেন ,
— “আমি যদি বলি ? এটা ভালোবাসা না ! শুধু আবেগের বয়সের আবেগ! তখন কী বলবে? অবশ্যই অস্থির হয়ে আমাকে বোঝানোর চেষ্টা করবে , এটা ভালোবাসা !”

মাহির এক মুহূর্ত তাকালো , জাহানারা বেগমের দিকে। তারপর বলল , — “মোটেও বলব না !”

জাহানারা বেগম কিঞ্চিত অবাক হলেন , — “কেন? তার মানে , তুমিও ভালো করে জানো এটা শুধুই তোমার আর পিহুর আবেগ !”

মাহির ডানে বামে মাথা নেড়ে বলল ,
— “নাহ ! কারণ– আপনিও জানেন , এটা ভালোবাসা! তাই আপনি আমাকে বিপাকে ফেলতে চাইছেন। কনফিউজ করে , পিহুকে ভোলাতে চাচ্ছেন !”

জাহানারা বেগম চেয়ার হেলান দিয়ে বললেন ,
— “ ভালোবাসা আদৌও এক্সিস্ট করে না , পিচ্চি ছেলে ! তাই এটাতে বিশ্বাস করাটাও বোকামি !”

মাহির দাঁতে দাঁত পিষে বলল , — “কিন্তু আমার মতে , লাভ এক্সিস্টস! এন্ড আই বিলিভ দ্যাট!”

জাহানারা বেগম ছুড়লেন , — “কতদিন ভালোবাসবে তুমি পিহুকে ? এক বছর , দু বছর কিংবা সর্বোচ্চ পাঁচ বছর ! তারপর ? তারপর যখন পিহুর অন্য কোথাও বিয়ে হয়ে যাবে ! তখন কী করবে তুমি ? নিজেও অন্য কাউকে বিয়ে করে নিবে ! কারণ তোমাদের বিয়েতে কেউ রাজি হবে না !”

মাহির টেবিলে , মুষ্টিবদ্ধ হাত মেরে বলল ,
— “সেই কেউ এর মানুষদের পরোয়া করি না আমি।
শুধু পাঁচ বছর না ! যতদিন শ্বাস নিচ্ছি , ততদিন ভালোবাসব তাকে ! পিহুর বিয়ে শুধু আর শুধু মাত্র আমার সাথেই হবে ! পিহু শুধু আমার বউ হবে ! এন্ড আই উইল প্রুভ দ্যাট!”

কথাটা বলেই মাহির উঠে পরল। রেস্টুরেন্টে কফির বিল মিটিয়ে চলে গেল। জাহানারা বেগম আড় চোখে মাহিরের শুধু যাওয়া দেখলেন। মাহিরকে তার ভীষণ জেদি মনে হলো ! ছেলেটার সাথে পিহুর বিয়ে হলেও , পরে যে ভালোবাসা উড়ে যাবে না ! সে গ্যারান্টি তিনি পাচ্ছেন না ! কিন্তু নিজের অতীতের মতো সব ছেলে হয় না ! তিনি মাহিরকে সুযোগ দিতে চান। কিন্তু তিনি মাহিরকে ভরসা করতে পারছেন না।

জাহানারা বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেলে রিক্সা ঠিক করে। নিজের চাকরির স্থানে যেতে লাগলেন।

*
পিহুর পেটে ক্ষিধায় দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে। এভাবে মাহিরের ওপর রাগ করাটা তার উচিৎ হয় নি। কিন্তু সে কীভাবে এত বছর মাহিরকে ছাড়া থাকবে। তার পক্ষে সম্ভব না এতদিন ! পিহু ভালো করে জানে , ভার্সিটিতে উঠতেও তার চার বছরের মতো লাগবে ! এত অপেক্ষা সে কীভাবে করবে ?

পিহু এসব ভাবতে ভাবতে স্কুল গেটের সামনে আসল। বাইরে মাহিরের গাড়ি দেখে বিস্মিত হলো। পিহু অংশ পাশ দেখল দারোয়ান নেই। এই সুযোগে বের হয়ে গেল স্কুল থেকে। এখন পিটি পিরিয়ড চলছে। এরপর ক্লাস শুরু হবে তার। মাহিরের গাড়ির সামনে আসতেই পিহু জানালা দিয়ে মাহিরকে খুঁজতে লাগল। কিন্তু মাহির গাড়িতে ছিল না।

“এখানে কী করছিস?” — কারো পেছন থেকে ডাকে , পিহু কেঁপে উঠল। দ্রুত পেছন ঘুরে মাহিরকে দেখে শান্ত হলো কিছুটা। কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলল ,

— “আপনিও এখনো যাননি? এখনো এখানে কী করছেন?”

মাহির ভ্রু কুঁচকালো , — “তা আমি তোকে কেন বলব?”

পিহু মুখ ভেংচি কাটল। মাহির পিহুকে সরিয়ে , গাড়ি থেকে টিপুর জন্য নাস্তা বের করে , পিহুর হাতে ধরিয়ে দিল। পকেট থেকে টাকা বের করে পিহুর অন্য হাতে ধরিয়ে শক্ত চোয়ালে বলল ,

— “আর একবার আমার সামনে জেদ দেখালে , তোর আরেক গাল এবার আমি লাল করে দেবো ! স্কুলে যা এখন! আর বের হবি না ! আমি আবার কাল আসব!”

পিহুর মাথায় হাত বুলিয়ে কথাটা বলল মাহির। পিহু ভ্রু কুঁচকে বলল , — “সত্যি কাল আসবে তো ?”

মাহির মাথা নাড়ল। পিহু মাহিরকে বিদায় জানিয়ে স্কুলে দৌড়ে ঢুকে গেল। পিহু স্কুলে ঢুকেছে দেখে মাহিরও গাড়ি করে এবার বাড়ির উদ্দেশ্যে চলে গেল।

চলবে—

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here