#চৈত্রের_প্রেম_নির্বাসন — — ১৫
#আরোবী_খান_সিনথিয়া
পিহুকে নিয়ে প্রিয়তা বেগম , মির্জা বাড়ি ছেড়েছে এক মাস দশদিন হলো। পিহু এখন অনেকটায় সামলেছে। জেদ করে না মায়ের সাথে। পড়ালেখায় বেশ মনোযোগী। রোজ দ্রুত স্কুল চলে যায়। অবশ্য তার আসল কারণ প্রিয়তা বেগমের কল্পনার বাইরে ! মাহিরের সাথে দশ মিনিটের সেই আলাপের জন্য পিহু ভীষণ ছটফট করে!
শুক্র আর শনিবারকে তো জঘন্য মনে হয় পিহুর কাছে!
কেননা স্কুল সে দু’টো দিন বন্ধ থাকে। আজও সেই শনিবার ! কাল স্কুল খুলবে ! এখনো স্কুল খুলতে আরও সাতাশ ঘন্টা বাকি ! পিহু ঘুম থেকে উঠে পরেছে আজ যলদি! বাড়িতে থাকা জাহানারা আর প্রিয়তা বেগম এখনো ঘুম ! পিহু দেখে এসেছে !
মাহির তাকে কিছু দিন আগেই মোবাইল দিয়েছিল। যেন তারা কথা বলতে পারে। পিহুর এখন মাহিরের সাথে কথা বলতে মন ছটফট করছে ! কারণ সে কথা বলার সুযোগ পেয়েছে। আর এই সময়টা সে হাতছাড়া করতে চায় না ! পিহু দুরুদুরু বুকে স্কুল ব্যাগ থেকে মোবাইলটা বের করল। একবার ভাবল , কল করবে না! যদি ঘুমে থাকে ? ঘুমটা নষ্ট হয়ে যাবে না বেচারার? ইদানিং মাহির নাকি জব করছে? জবটাও পিহুর জন্য করছে! এই যে পিহু মোবাইলটা পেলো! মাহির নিজের ইনকামের টাকায় কিনেছে ! পিহু জানে না , মাহির এসব কেন করছে ? পিহুর মনও ভীষণ খারাপ হয় , শুধু শুধু জব করে , এতটা কষ্ট করার কী দরকার
তার ?
পিহু এতসব চিন্তার মাঝে কখন মাহিরকে কল করল টেরই পেল না। কল রিং হতে হতে কেটে গেল। পিহু বুঝল , মাহির ঘুমাচ্ছে এখন ! এমনিতেও এসময় মাহিরের জেগে থাকার কথাও না ! পিহু মোবাইল রাখতে যাবে , তার আগেই মোবাইল ভাইব্রেট হতে শুরু করল। পিহু দেখল , মাহির কল করেছে !
পিহু ঝটপট কল তুলে ফেলল । ওপাশ থেকে মাহির অস্থির কন্ঠে বলল , — “পিহু ঠিক আছিস তুই ?”
পিহু ভ্রু কুঁচকালো। ফিস ফিস করে বলল ,
— “আমার আবার কী হবে ?”
মাহির চিন্তিত কন্ঠে বলল , — “এসময় জেগে আছিস! কল করলি !”
পিহু ফিসফিসিয়ে বলল , — “আজ ঘুম ভেঙে গিয়েছিল দ্রুত! আমি ছাড়া বাড়িতে সবাই ঘুমাচ্ছে! ভাবলাম , আপনাকে কল করি !”
মাহিরের উত্তর আসল না অপর পাশ থেকে। পিহু কিছুটা ঘাবড়ালো। মাহির কী রাগ করেছে এ সময় কল করায় ? মাহির ক্ষীণ কন্ঠে বলল ,
— “শুধু কল করি ? দেখাতে করতে মন চায় না?”
পিহুর দুরুদুরু বুকের কম্পন আরও বেড়ে গেল । বুকের বা’পাশটায় কিছুটা ব্যথাও অনুভব করল! কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলল ,
— “আমরা তো অনেক কিছুই চাই ! কিন্তু সব চাওয়া কী পূরণ হয় ?বলুন ! তাই সাধ্যের মধ্যে যা পাচ্ছি ! তা নিয়েই খুশি থাকা উচিৎ! হা হুতাশ করলে , যতটুকু পাচ্ছি ! তাও যদি ফুরিয়ে যায় ?”
পিহুর কথাগুলো শুনে , মাহির থমকালো। পিহু কত কম বয়সেই এত কিছু বুঝে গেল , তাই না? মাহিরের নিজেকে কেমন ব্যর্থ মনে হলো! নিজের প্রেয়সীকে সে কখনো সুখের খোঁজ এনে দিতে পারেনি! শুধু অপেক্ষা! অপেক্ষায় করিয়ে যাচ্ছে , কোন একদিন পিহুকে সে নিজের করে ফেলবে!
মাহিরকে চুপ থাকতে দেখে , পিহু ফিসফিসিয়ে
ডাকল , — “মাহির ভা…”
মাহির দ্রুত সামলে বলল , — “ক্ষিদে লেগেছে?”
পিহু ভ্রু কুঁচকালো , — “হু ?”
মাহির ফের প্রশ্ন ছুঁড়ল , — “ক্ষিদে লেগেছে তোর? এত সকালে উঠেছিস! খিদে লাগেনি ! এমনও হতে পারে?”
পিহু ভ্রু কুঁচকালো , — “ক্ষিদে লাগলেও , এত সকাল সকাল নাস্তা কোথায় পাবেন আপনি?”
মাহির ঝাড়ি মারল , — “তোকে কেউ এত কিছু ভাবতে বলেছে ?”
পিহু চুপসে গেল। আমতা আমতা করতে লাগল। মাহির আধা ঘন্টা ওয়েট করতে বলে কল কেটে দিল। বাড়িতে পিহু হাঁস ফাঁস করতে লাগল। আধা ঘন্টা পর কী হবে? মাহির কী সত্যি বাড়ি অব্দি এসে পরবে নাস্তা দিতে? তখন যদি সবাই জেগে যায় ! তখন ?
আধা ঘন্টা পর আবার মাহির কল আসল। মোবাইল হাতে থাকায় তড়িৎ গতিতে পিহু কলটা তুলল।
মাহির বলল , — “একটু বাইরে আয়!”
পিহু দ্রুত বেলকনির কাছে আসল। রাস্তার দিকে দেখল , মাহির নাস্তা হাতে দাঁড়ানো। আশপাশ দেখছে। তখন মাহিরের চোখ পরল পিহুর ওপর! পিহুকে হাত দিয়ে ইশারা করল , যলদি আসার জন্য ! পিহু ঝটপট দৌড় লাগালো মাহিরের কাছে যাওয়ার জন্য!
মাহিরের কাছে ছুটে আসতেই , কিছুটা হাপাচ্ছে সে! কিন্তু তার চেয়েও বেশি ভয় লাগছে , মাহিরকে যদি আন্টি কিংবা আম্মু দেখে ফেলে , তাহলে সর্বনাশ হয়ে যাবে ! মাহিরের কাছে আসতেই , পিহুকে খাবারের প্যাকেট এগিয়ে দিল মাহির। পিহু সেটা নিয়ে দ্রুত চলে যেতে নিলে , মাহির পিহুর হাতের কব্জি ধরে , তাকে আবার থামিয়ে দিল। মিষ্টি হেসে বলল ,
— “থাম ; একটু দাঁড়া! আমাকে দেখতে দে , একটু তোকে! একদিন হলো পুরো! দেখিনি তোকে!”
পিহু হাঁস ফাঁস করতে লাগল। অস্থির হয়ে উঠল। মাহীর তাকে এক মুহূর্ত দেখে ছেড়ে দিল। পিহু হাত নাড়িয়ে, বিদায় জানিয়ে দৌড়ে গেল বাড়ির ভেতর!
পিহু সবেই এসেছিল বাড়ির ভেতর। জমের মতো থেমে গেল। শরীরের সব লোম দাঁড়িয়ে গেছে তার। সামনে জাহানারা বেগমকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে। হাতে থাকা মোবাইলটাও ভাইব্রেট করছে ! মাহির কল করেছে। পিহু এক ঢোক গিলল। শরীরের ঘাম ছুটে যাচ্ছে তার! পিহু ক্ষীণ কন্ঠে বলল ,
— “আন্টি প্লিজ আম্মুকে কিছু বলো না!”
জাহানারা বেগম শক্ত চোয়ালে বলল ,
— “রুমে যাও !”
পিহু ছুটে গেল রুমে। রুমে ঢুকতেই হাঁস ফাঁস করছে ভীষণ। মাহিরের সাথে কথা বলারও সাহস নেই আর তার! কল কেটে দিল দ্রুত।
কল কাটতে দেখে মাহির ভ্রু কুঁচকালো। টেনশন হচ্ছে! এভাবে কল কাটার মেয়ে না পিহু! তাহলে কী সত্যি কোন বিপদ হলো ?
মাহির পিহুর বেলকনির দিকে তাকালো। পিহু সেখানে নেই! আশপাশ তাকাতে যেয়ে দেখল , জাহানারা বেগম গেটের সামনে দাঁড়িয়ে। মাহির বুঝল , পিহু কেন কল কেটেছিল?
মাহির জাহানারা বেগমের কাছে এগিয়ে আসল। জাহানারা বেগম শক্ত মুখে বলল ,
— “একটুও ভয় করে না তোমার , তাই না?”
মাহির ভ্রু কুঁচকালো , — “কেন ভয় করবে ? ভুল কিছু করেছি ?”
জাহানারা বেগম কোন উত্তর দিতে পারলেন না। মাহির ফের বলল , — “আপনার কাছে একটা অনুরোধ রাখছি , পিহুকে বকবেন না !”
জাহানারা বেগম প্রশ্ন ছুঁড়লেন , — “কতদিন এসব করবে? একদিন এসব মোহ কেটে গেলে ? জানো তো , পিহু কতটা কষ্ট পাবে ?”
মাহির দাঁতে দাঁত পিষে বলল , — “এটা কোন মোহ না , আন্টি ! আমি পিহুকে সত্যিই ভালোবাসি ! তাকে কষ্ট দেয়ার ব্যাপারে আমি কল্পনাও করতে পারি না !”
জাহানারা বেগম বললেন , — “ এখন তো সবে শুরু!
কঠিন সময় আসলেই বোঝা যাবে , কতটা ভালোবাসো তুমি পিহুকে! যখন সমাজ তোমাদের মানবে না , কঠিন হয়ে পরবে বাঁচা! তখন ভালোবাসা জানালা দিয়ে উড়াল দিবে! ফাঁকা হবে বুক!”
মাহির শক্ত মুখে বলল , — “সেসময়ও আমি তার পাশেই থাকব ! তাকে আগলে নেবো আমার বুকের মাঝে! পিহুর দিকে কেউ আঙুল তোলার সাহসও দেখাবে না , এতটা পিহুকে প্রটেক্ট করব !”
জাহানারা বেগম আর কিছু বলতে পারলেন না। মুখ ঝামটি মেরে বাড়ির ভেতর চলে গেলেন। মাহির দেখল , পিহু বেলকনিতে দাঁড়িয়ে। পিহুকে দেখল , পিহুর চোখ থেকে গালে অশ্রু গড়িয়ে পরছে! মাহির পিহুকে ইশারা করে কান্না মুছে নিতে বলল। রুমে যেতে বলল! পিহু যাচ্ছে না! পিহুকে কতক্ষণ মানিয়ে রুমে পাঠালো! মাহিরও চলে গেল। পিহু রুমে ঢুকতেই দেখল , জাহানারা বেগম দরজার সামনে দাঁড়ানো। পিহুর ভয় হলো! জাহানারা বেগম পিহুর রুমে ঢুকলেন!
চলবে—দুঃখিত এতদিন পর ছোট গল্প দেয়ার জন্য!

