সমাপ্তির_ওপাড়ে #জাবিন_ফোরকান #পর্বসংখ্যা৪০ (শেষাংশ)

0
2

#সমাপ্তির_ওপাড়ে
#জাবিন_ফোরকান
#পর্বসংখ্যা৪০ (শেষাংশ)

বাইক চলছে আমার মনমতো গতিতে। উন্মাতাল, ঝড়ো, স্বাধীন, দূর্বার, অপ্রতিরোধ্য। ভয়ানক সকল বাঁক কেটে যাওয়ার সময় শরীরে মস্ত এক উত্তেজনা ভর করে। সেই উন্মাদনায় থেকে থেকে খিলখিলিয়ে হাসছি আমি।

আমার অবস্থান জায়দানের বাইকের সামনে। কোয়ালা প্রাণীর মতন চার হাত পায়ে তার শরীরের সঙ্গে লেপ্টে আছি আমি। দুহাতে বাইকের হ্যান্ডেল চেপে গতি নিয়ন্ত্রণ করছে জায়দান, কখনো বা একটি হাত আমার পিঠে ঠেকাচ্ছে, এক ভরসার আশ্রয়স্বরুপ। এই মুহূর্তটুকু এত ভালো লাগার, যে আমি চাইনা এর ইতি ঘটুক আর কখনো।

আমার স্বামীর সঙ্গে শ্বশুড়বাড়ির যাত্রা করেছি আমি। জায়দান বাড়িতে গিয়ে ওই একটি বাক্যই উচ্চারণ করেছিল, আমাকে বাড়িতে নিয়ে যেতে এসেছে সে। চাইলে মানা করতে পারতাম, হাজারটা প্রশ্ন ছুঁড়তে পারতাম। অথচ, অদ্ভুত এক বিশ্বাস ভর করেছে লোকটার উপর। যেন তার সবটুকু জুড়ে শুধু আমার ভালো চাওয়াই রয়েছে। তার এই চাহিদা, এই স্বপ্ন আমায় কোন পথে নিয়ে যায় তা দেখতে উৎসুক আমি। মীরা একটু গড়িমসি করেছিল। সবে তার সঙ্গে থাকতে শুরু করেছিলাম, এর মধ্যেই আবারো তাকে একা ফেলে আসতে কষ্ট হয়েছে। তবে ক্যাফে তো আমাদের! আর রাতে ঘুমানো বাদে অধিকাংশ সময়টা সেখানেই তো কাটবে, একে অপরের কাছাকাছি। শেষমেষ আর আমার পথে বাঁধ সাঁধেনি প্রিয় বান্ধবী।

“চা খাবে?”

বাতাস কেটে কেটে বেরিয়ে যাচ্ছে। হেলমেটের ভেতর থেকে জায়দানের হঠাৎ কন্ঠস্বর শুনতে বেগ পোহাতে হলেও আবছাভাবে শুনলাম। মাথা ঘুরিয়ে তার বুক থেকে মুখ তুলে হেলমেটে ঢাকা চেহারার পানে তাকালো। জায়দান উইন্ডো তুলে চশমাবিহীন বাদামী দৃষ্টিতে আমায় দেখলো।

“তুমি খাওয়াবে?”

চিৎকার করে বললাম যেন সে শুনতে পায়। জায়দান জবাব না দিয়ে ধীরে ধীরে গতি কমিয়ে রাস্তার ধারে বাইক পার্ক করলো। প্রথমে নিজে নেমে হেলমেট খুলে নিলো, অতঃপর আমার কাঁধের নিচে দুহাত চেপে আমায় বাচ্চাদের মতন তুলে ফেলে নিচে নামিয়ে রাখলো। খানিকটা বিস্মিত শব্দ করে তার বাহু খামচে ধরে ফেললাম আমি। হেলমেট খুলে নিতে নিতে সড়কের ধারের টং দোকান চোখে পড়ল।

বহুদিন আগে, যখন আমি ভাইরাল হওয়ার ঝামেলার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলাম, তখন তার সাথে টং দোকানে বসে চা খেতে খেতে টাওয়ার ডেকে ক্ষেপিয়েছিলাম। ঠিক সেই জায়গাটাই! জায়দান মনে রেখেছে? নাকি বিষয়টা কাকতালীয়?

দুজন হেঁটে হেঁটে গেলাম টং দোকানে। আজ কোনো মানুষ নেই। বেঞ্চ ফাঁকা। আমি বলে উঠলাম,

“মামা, দুটো দুধ চা। একটা চিনি ছাড়া, আরেকটা চিনি বেশি।”

“একটা দুধ চা চিনি বেশি, আরেকটা রং চা চিনি ছাড়া।”

আমার অর্ডার শুধরে দিয়ে লম্বা পা দুটো খেঁচে কাঠের বেঞ্চে বসে পড়ল জায়দান। স্যুট বুট পরনে টং দোকানের সামনে এভাবে তার অবস্থান যেমন বেমানান, তেমনি যেন অতীব মুগ্ধকর এক দৃশ্য। তাকিয়েই থাকতে ইচ্ছা করে। সুরসুর করে গিয়ে তার পাশের জায়গাটাই দখল করে নিলাম।

“দুধ খাওয়াও ছেড়েছ? কবে থেকে?”

“ছাড়িনি। সিম্পলি মুড নেই।”

শান্ত মুখটি দেখলে আগে কেমন যেন অস্বস্তি হতো। এত নির্লিপ্ত থাকতে পারে একজন মানুষ? অথচ এখন, এই নির্বিকারতাই যেন আমার প্রিয়! আমি ভালোবাসি এই প্রতিক্রিয়াহীনতা। তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্যই তাকে করে তুলেছে অনন্য। চা এসে গেলো কিছুক্ষনেই। দুজনেই নীরবে চুমুক দিলো। দূর আকাশে জ্বলজ্বল করছে নক্ষত্রের দল। বায়ুর ঝাঁপটা, খোলা সড়কের ধার এবং রাত্রির প্রশান্তির মাঝে আমরা দুটো অস্তিত্ব। দীর্ঘ এক কণ্টকাকীর্ণ পথ মাড়িয়ে এক হওয়া দুজন ভাঙাচোরা মানুষ। নিজেদের নীরবতায় যাদের প্রশান্তি।

নিজের চায়ে আয়েশ করে এক চুমুক দিয়ে শেষমেষ আমি বললাম,

“একটা কথা জিজ্ঞেস করার ছিল।”

জায়দান উত্তর করলো না, আমার দিকে তাকালোও না। কিন্তু জানি, তার সমস্ত মনোযোগ আমার প্রতি নিবদ্ধ।

“তুমি আমাকে তালাক দাওনি কেন? না মানে, আমার ধর্মের বিশেষ জ্ঞান নেই। কিন্তু তুমি তো জানতে? নাকি তুমিও জানতে না?”

দূর আকাশে নিবদ্ধ জায়দানের দৃষ্টি। আমার প্রশ্নের জবাব দেয়ার লক্ষণ দেখলাম না তার মাঝে। ভাবলাম, জবাব বুঝি আসবেনা। অথচ এলো।

“কিছু প্রশ্নের কখনো উত্তর হয়না। এই যেমন, তুমি যদি আমায় জিজ্ঞেস করো আমি তোমায় ভালোবাসি কিনা? আমি বলব হ্যাঁ। কিন্তু যদি বলো কতটুকু কিংবা যখন থেকে বাসি? আমি বলতে পারবোনা।”

নিজের হাঁটুর দিকে তাকালাম। কেমন যেন দর্শন টাইপ উত্তর। উত্তর আদও দেয়নি সে। খোচাখুচি করব আরো? কিন্তু তার দরকারই বা কোথায়? এটাই তো আমার স্বামী! রহস্যের আড়ালে ঢাকা। তার নিজস্ব জগৎ এবং নিজস্ব চিন্তা বোঝা বড়ই দুষ্কর।

“আমাদের ভবিষ্যত কি হবে, জায়দান?”

আমার দ্বিতীয় প্রশ্নটি জায়দানকে থমকাতে বাধ্য করলো। চায়ের কাপ বেঞ্চের উপর রেখে দিয়ে সে মুখ ঘুরিয়ে আমার দিকে তাকালো। নির্লিপ্ততায় আবেগের প্রলেপ পেরেছে। জ্বলজ্বলে অনুভূতি নিয়ে বুঝি চেয়ে আছে সে, একেবারে আমার অন্তরমাঝে।

একটি হাত তুলল সে। সযত্নে ছুঁয়ে দিলো আমার গাল। আমি না চাইতেও বিড়ালছানার মতন আদর খুঁজে মুখ ঘষলাম তার হাতের তালুতে। জায়দানের কন্ঠস্বর গভীর হলো।

“অতীত আমি তোমার, বর্তমান তুমি আমার, তবে ভবিষ্যত হোক আমাদের দুজনার।”

চায়ের দোকানদার উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও জায়দান বিশেষ কোনো পরোয়া দেখালোনা। ঝুঁকে এসে আমার কপালে নিজের কপাল ছুঁইয়ে পরক্ষণেই আমার মাথার পাশে গাঢ় এক চুমু খেলো। অজান্তেই তার উরুর উপর আঁকড়ে বসলো আমার হাত। তার কথা এবং ভালোবাসার তাড়নায় সিক্ত হলো আমার সমস্ত অস্তিত্ব। আর কোনো সন্দেহ রইলোনা নিজের সিদ্ধান্তের উপর। যতটুকু ছিল, তা বুঝি ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছে তার উন্মাদ করা মায়া।

আমরা দুজন বেশ সময় নিয়ে, আয়েশ করে চা খেলাম। অতঃপর আবারো যাত্রা শুরু করলাম। আমার প্রিয় সেই স্থান। জায়দানের বাইকের সামনের ট্যাঙ্ক, তার শরীরে লেপ্টে বুকে মাথা গুঁজে রাখা। আমাদের যাত্রা থামলো নীরব এবং স্নিগ্ধ এক এলাকায়। বাইকে বসে স্বামীর বুকের আশ্রয়ে প্রায় ঘুমিয়েই পড়েছিলাম। সম্বিৎ ফিরল সামনের অত্যাধুনিক পনেরো তলা এক অ্যাপার্টমেন্ট ভবন দেখে। ভ্রু কুঁচকে আশেপাশে তাকালাম। চোখ লেগে আসায় খেয়াল করিনি কোন পথে এসেছে জায়দান। তাই শুধালাম,

“এটা কোন জায়গা?”

“বসুন্ধরা সিটি।”

অবাক হলাম বেশ। স্পেশাল গ্যারেজে নিজের বাইক পার্ক করে আমায় ভেতরে নিয়ে গেলো জায়দান। রিসেপশন এরিয়া বিশাল। খানিকটা হোটেলের মতন। জমকালো এল ই ডি লাইটের বহর। এতটা স্বচ্ছ এবং পরিষ্কার টাইলস বাঁধানো মেঝে যে তাতে নিজের প্রতিচ্ছবি অবধি দেখা যায়। জায়দানকে রিসিপশনের লোক সালাম দিলো। সেটি গ্রহণ করে আমায় লিফটে নিয়ে গেলো সে। লিফট যখন আট তলার পথে চলছে, তখন আমি না পারতে জিজ্ঞেস করলাম,

“আমরা কার বাসায় এসেছি?”

জায়দান উত্তর করলোনা। লিফটে আরো দুজন মানুষ ওঠায় কথা চাপা পরে গেলো। আট তলায় পৌঁছে আমাকে ফ্ল্যাট এ তে নিয়ে গেলো জায়দান। দরজায় ফিঙ্গারপ্রিন্ট লক সিস্টেম। নিজের বৃদ্ধাঙ্গুল বসিয়ে স্ক্যান করে দরজা খুলল জায়দান। ভীষণ কৌতূহল নিয়েই ভেতরে ঢুকলাম আমি।

আমায় বরণ করে নিলো এক অত্যাধুনিক অ্যাপার্টমেন্ট। সাদা এবং কালো ইন্টেরিয়র। মোলায়েম আলোয় উজ্জ্বল। বাতাসে সুঘ্রাণ ছড়ানো ক্যান্ডেলের সুবাস। পরিপাটি করে সাজানো। আলাদা ড্রেসিং রুম এবং ডেকরেটিং স্পেস সবই রয়েছে। আসবাব সেই তুলনায় বেশ কম। ভ্রূজোড়া কুঁচকে আমি ঘুরে ঘুরে চারপাশ দেখতে লাগলাম।। জায়দান ঢুকে নিজের জুতো এবং আমার জুতো ক্যাবিনেটে রাখতে রাখতে বললো,

“সবকিছু এখনো ইন্সটল করিনি। তোমার ঘর, তুমি তোমার মতন করে সাজিয়ে নেবে। পারবেনা?”

চমকে উঠলাম। ঝট করে ফিরে তাকালাম অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে।

“আমার ঘর মানে?”

জায়দানের নিজের স্যুট খুলতে খুলতে নির্বিকার কন্ঠে জানালো,

“তুমি আর আমি এখানে থাকবো।”

“কেন? তোমার আগের ফ্ল্যাট?”

“ওখানে কিছু খারাপ স্মৃতি আছে। জীবনে সেসবের রেশ রাখতে চাইছিনা।”

উপলব্ধি গ্রাস করলো আমায়। জায়দানের পুরাতন ফ্ল্যাটেই মীরার সঙ্গে ন্যাক্কারজনক ঘটনাটি ঘটে গিয়েছে। বান্দা হয়ত এতদিন তক্কে তক্কে ছিল ঠিকানা বদলানোর উদ্দেশ্যে। মসৃণ মেঝেতে পা ফেলে দ্রুত কাছে গেলাম তার।

“আর আরেফিন বাড়ি?”

জায়দান জমে গেলো। খানিকটা সময়ের জন্য তার নয়নমাঝে বুঝি চাপা এক আর্তনাদ দেখতে পেলাম। অতটুকুই। মাথা ঝাঁকিয়ে আমার নয়ন বরাবর তাকালো সে। দৃপ্ত কণ্ঠে বলল,

“তোমাকে আমি নিজের বাড়ি দিতে চাই, হোটেল নয়।”

কথাটার মাঝে কতখানি হাহাকার লুকানো ছিল তা নির্লিপ্ত আওয়াজে বোঝা না গেলেও আমি ঠিকই অনুভব করতে পারলাম। আমার দুহাত জড়িয়ে গেলো জায়দানের কোমরজুড়ে। উৎসুক হয়ে তার উদ্দেশ্যে চেয়ে বললাম,

“বাড়ি? কি হবে আমার নিজের বাড়ি দিয়ে?”

জায়দান এক হাতে আমার মুখ ছুঁয়ে জবাব দিলো,

“সংসার।”

বৈদ্যুতিক তরঙ্গ খেলে গেলো বুঝি আমার মাথা থেকে পা অবধি। কেঁপে উঠলাম। অতি আকুতি নিয়ে শুধালাম,

“সংসার?”

“হ্যাঁ। তোমার আমার সংসার।”

“আমরা দুজন?”

“শুধু আমরা দুজন।”

“টোনা টুনির সংসার?”

“তুমি যদি টুনি হও আমি তবে টোনা হতে রাজী।”

এমন আদুরে উত্তর আমার হজম হলোনা। চোখ দুটো আবেগের অশ্রুতে ভরে এলো। তবে এই অশ্রু সুখের। আনন্দের। পরিপূর্ণতার। ঝুঁকে জায়দানের বুকে মাথা রাখলাম। আমায় সযত্নে নিজের বাহুডোরে আগলে নিলো স্বামী। তার শরীরে লেপ্টে থাকা সুবাস গ্রহণ করলাম প্রাণভরে।

“এই সংসারের সুখ আমার কপালে সইবে?”

“না সইলে আমার কপালের সবটুকু সুখ লিখে দেব তাকে। তোমার কপাল ছেড়ে আর কোথাও যেতেই চাইবেনা সুখ।”

আলিঙ্গনের জোর বাড়ালাম। অভিমানী সুরে জিজ্ঞেস করলাম,

“তুমি শুরু থেকে আমাকে এভাবে ভালোবাসলে না কেন জায়দান?”

“শুরু থেকে ভালোবাসলে তো বুঝতাম না, তোমায় ভালোবাসা কতটা ভাগ্যের ব্যাপার।”

আমার মুখটি নিজের আজলায় তুলে মোলায়েম দৃষ্টিতে তাকালো জায়দান। ওই নির্বিকার খোলসের আড়ালে উঁকি দিলো মায়া, মুগ্ধতা এবং ভালোবাসা। চোখ জুড়িয়ে যায় এমন দৃষ্টি দেখলে। জায়দান ঝুঁকে এসে আমার গালে নাক ঘষে মৃদু আঁচে বলল,

“আমি জানি, আমি তোমার সঙ্গে বহু অন্যায় করেছি। সবথেকে বড় অন্যায় ছিল আমার নির্লিপ্ততা। আমি তোমায় যতটা না কষ্ট দিয়েছি, তার চাইতে দ্বিগুণ যাতনা নিজে বরণ করেছি। যদি পারো, কোনো একদিন আমায় মাফ করে দিও।”

গাল বেয়ে গড়ালো আমার একফোঁটা অশ্রু। আবেশিত হয়ে আবদার করলাম,

“তবে কথা দাও, আর কখনো ছেড়ে যাবেনা।”

জায়দান দীর্ঘ একটা সময় আমার দিকে তাকিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলো আমার মুখ। যেন নিজের মস্তিষ্কে আজীবনের জন্য ছেপে নিলো স্মৃতিটুকু। অতঃপর বললো,

“কথা দিলাম, তোমার হৃদফলকে থাকবে আমার নাম।
দোয়া করি, আমার কবরের পাশে হোক তোমার স্থান।”

মাথায় হাত বুলিয়ে আনলো সে। মমতার হাত। আবেশে চোখ বুঁজে নিলাম। ড্যাডের পর একটামাত্র পুরুষ মানুষ আমায় এভাবে আগলে নিলো। কোনো প্রশ্ন ছাড়া, আমার আত্মপরিচয় সম্পর্কে কোনো দ্বিধা ছাড়া। যখন চোখ খুললাম, তখন নিজের ভেতর নতুন আশা ছাড়া আর কিছু টের পেলাম না।

পায়ের পাতায় ভর দিয়ে উঁচু হওয়া সত্ত্বেও ছ ফুটি বান্দার নাগাল পেলাম না ঠিকঠাক। আশেপাশে তাকিয়ে সোফা দেখতে পেলাম। তাতেই তড়াক করে লাফিয়ে উঠলাম। জায়দান ভ্রু উঁচু করে আমার কান্ড দেখলো।

“এদিকে আসো, কুইক!”

হুকুম করলাম আমি রীতিমত। জায়দান কৌতূহলী হয়ে এগিয়ে আসতেই দুহাত তার কাঁধে রেখে ভর দিয়ে তার গলা জড়িয়ে ধরলাম। অতঃপর মুখ নামিয়ে তার ঠোঁটে নিজের ঠোঁট বসিয়ে ফেললাম। চোখজোড়া বুঁজে এলো আমার। জায়দান প্রথমটায় জমে গেলেও পরক্ষণে আমার ফিনফিনে কোমরজুড়ে নিজের হাত জড়িয়ে ফেললো।

—আমি তোমাকে ভালোবাসি। আই লাভ ইউ।

বাক্যগুলো কেন যেন আসলোনা আমার ভেতর থেকে। কারণ, ভালোবাসা হয়ত কেটে যায়, কাটেনা শুধু মায়া। তাইতো জায়দানের ঠোঁটের মাঝে আমি ফিসফিস করলাম,

“তোমার প্রতি আমার অশেষ মায়া, বরফমানব!”

আমার দেয়া নতুন নাম কানে যেতেই জায়দানের ঠোঁটে দূর্লভ এক হাসি ফুটলো। অতি ক্ষীণ শব্দ তার, অথচ এর পিছনে আবেগ অসীম। প্রাণভরে জীবনে প্রথমবারের মতন নিজের স্বামীকে আনন্দের হাসি হাসতে দেখলাম আমি। জায়দান দ্রুতই আমার ঠোঁটের দখল নিতে নিতে উত্তর করলো,

“আর তোমার প্রতি এই বরফের সবটুকু জলের নিবেদন, মাই ওয়াইফ।”

অত্যন্ত মধুর চুম্বনখানি ধীরে ধীরে হয়ে উঠলো উত্তপ্ত। কেউ কাউকে ছাড়তে রাজী নই আমরা। নিজেদের মাঝে ডুবে যেতে চাই। মিশে যেতে চায় দুটো অস্তিত্ব। জায়দান আমায় কোলে তুলে টি টেবিলের উপর বসালো। হাঁটু মুড়ে আমার সামনে বসে পড়ে তৎক্ষণাৎ আমার ঠোঁটে হারিয়ে ফেললো নিজেকে। অধরের ছোঁয়া পেরিয়ে তার আদর ঠেকলো আমার চিবুকে। চিবুক বেয়ে আরো নিচে। কাঁধের উপর থেকে টপের স্ট্র্যাপ সরিয়ে নমনীয় ঠোঁটজোড়া বুলিয়ে আনলো জায়দান। শিউরে উঠে তার চুল খামচে ধরলাম আমি। মাথা ঝুলে পড়লো পিছনে।

“আহ্…জায়…জায়দান!

“বলো, বউ।”

আমার গ্রীবাজুড়ে ছোট ছোট চুমু এঁকে দিতে লাগলো সে। গুঙিয়ে উঠলাম।

ভালোবাসার মুহূর্তমাঝে বিশ্রীভাবে হস্তক্ষেপ করে ভয়ানক আওয়াজে বেজে উঠল রিংটোন।

~সোনা বন্ধু তুই আমারে~

পরনের ট্রাউজারের পকেটে আমার ফোনটা লাফিয়ে চলেছে। উভয়ই জমে গেলাম সম্পূর্ণ। এক লহমায় বুঝি সবকিছু গুঁড়িয়ে গিয়েছে। তাড়াহুড়ো করে পকেটে হাত ভরলাম।

~সোনা বন্ধু তুই আমারে ভোঁতা দাও দিয়া কাইট্টালা
পিরিতের খ্যাতা দিয়া যাইত্তা ধইরা মাইরালা~

জায়দান ড্যাবড্যাব করে আমার দিকে চেয়ে রইলো। আমার হাতে সশব্দে ভাইব্রেট করতে করতে সাইরেনের মতন বেজে যাচ্ছে রিংটোন। মুখটা পানসুটে হয়ে গেলো আমার। তেঁতে উঠলাম আমি। কলার আইডি কে হবে আর?

“মীরা শালীর ঝিঁ, খায় গাঞ্জুটি বিড়ি!”

গলা উঁচিয়ে চিৎকার করে উঠলাম। ফোনটা আছড়ে ফেললাম মেঝের দিকে! জায়দান সেটা ক্যাচ ধরে ফেললো। ভ্রু উঁচু করে শুধালো,

“তুমি নার্গিস আপার ভক্ত নাকি?”

“হ্যাঁ! নারিকেলের খোল শক্ত, সাবিন নার্গিসের ভক্ত!”

আমার কাচুমাচু অবস্থা এবং ভীষণ লজ্জা দেখে জায়দান নিজেই ফোনটা রিসিভ করলো।

“হ্যাঁ মীরা, বলো। হ্যাঁ, আমরা পৌঁছে গিয়েছি, চিন্তা করোনা। জি অবশ্যই। আগামীকাল লোক পাঠাবো আমি, কষ্ট করে সাবিনের জিনিসপত্রগুলো বুঝিয়ে দিও। থ্যাংকস। ও ফ্রি হয়েই তোমাকে কল করবে। গুডনাইট।”

ফোন কেটে সোফায় রাখলো জায়দান। সরস মুখে তাকালো আমার দিকে। কারণ ছাড়াই জায়দানকে জড়িয়ে ধরে তার কাঁধে মুখ লোকালাম আমি। আমায় পাল্টা নিজের মাঝে আশ্রয় দিয়ে পিঠে আদরের হাত বুলিয়ে দিলো সে। উপহাস করে বললো,

“রিংটোনের বেলায় আমার বউ সেরা!”

আরো লজ্জা পেয়ে গুঙিয়ে উঠলাম।

“উমমম! সকাল সকাল উঠতে হয় আমার! এমন রিংটোন রেখেছি যেন কল এলে বা অ্যালার্ম বাজলে ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি বলে নিজের উঠে গিয়ে অ্যালার্ম বন্ধ করতে হয়!”

জায়দান বুঝি আবারো হাসলো! শব্দ না শুনলেও টের পেলাম। আমায় শক্তভাবে আলিঙ্গনে বেঁধে রেখে দুলতে দুলতে সে ব্যক্ত করলো,

“এখন থেকে রোজ একই অ্যালার্মে নিজের ঘুম ভাঙবে ভেবেই ভালো লাগছে বেশ, মাই প্রিটি লিটল ইউনিক ওয়াইফ।”

অসম্ভব এক উষ্ণতা আমায় ছেয়ে গেলো সম্পূর্ণ।

***

পরদিন সকাল।

আরামদায়ক উষ্ণ বিছানায় যখন আমার ঘুম ভাঙলো, তখন ঘড়ির কাঁটায় সাড়ে দশটা। চোখ কঁচলে আড়মোড়া ভেঙে উঠে বসতেই খেয়াল করলাম, বিছানার পাশ ফাঁকা পরে আছে। একদম পরিপাটি করে গোছানো। সেদিকে চেয়ে মুচকি হাসলাম। গত রাতের কথা মনে পড়তেই মনের মাঝে খুশি ছলাৎ ছলাৎ করে উঠলো।

নীরবে মেঝেতে পা নামাতে গিয়েই দেখলাম, ইতোমধ্যে স্লিপার প্রস্তুত আছে। গতকাল রাত অবধি আমার সাইজের ছিলোনা। জোগাড় করে ফেলেছে সে! বেশ! মোলায়েম হাসি ঠোঁটে নিয়ে বাথরুমে গেলাম। নতুন ব্রাশ এবং মোটামুটি সকল প্রয়োজনীয় প্রসাধনী ইতোমধ্যে প্রস্তুত আছে। মুখ হাত ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে ক্লোজেট থেকে জায়দানের একটি টি শার্ট বের করে পড়লাম। আমার সকল কিছু আজ বিকাল নাগাদ হয়ত এসে পৌঁছাবে। ক্ষুধা লেগেছে ভীষণ। হেলেদুলে যখন কিচেনের দিকে এগোলাম, তখনি ডাইন ইন টেবিলের সামনে এসে থেমে গেলাম।

একটি হটপট রাখা। তার উপর একটি স্টিকি নোট। নোট তুলে আগে হটপট খুললাম। ভেতরে গরম গরম নুডুলস এবং সিদ্ধ ডিম রাখা। পাশেই ছোট একটা বক্সে কিছু ফলমূল, এবং হট ফ্লাস্ক ভর্তি চা। হতবাক হয়ে গেলাম। চোখ পিটপিট করে নোটের দিকে তাকালাম। হাতের লিখা চিনতে একটুও বেগ পোহাতে হলোনা।

“নাস্তা সবটুকু খেয়ে শেষ করবে, কেমন? সরি, আমি খুব ভালো রাঁধতে পারিনা বিধায় নুডুলস ভরসা। দুপুরে টেইক আউট এসে যাবে তোমার জন্য। আর হ্যাঁ, বেডরুমের ক্লোজেটের ড্রয়ারে আমার কার্ড আছে। বাড়ি সাজাতে বা নিজের জন্য আরো যা যা প্রয়োজনীয় মনে হয়, সবকিছু অর্ডার করে নিও। সি ইউ সুন মাই বিলাভড ওয়াইফ, লাভ ইউ। কিস কিস!”

নোটটা যখন শেষ করলাম, তখন আমার দৃষ্টি সম্পূর্ণ ঝাপসা। বুক ভর্তি আশা ভরসা। পরিপূর্ণ জীবন। নোটের কাগজটা তুলে নিজের ঠোঁটে ছুঁয়ে গাঢ় এক চুমু খেলাম আমি। ফিসফিস করলাম,

“সংসার! আমার ছোট্ট একটা সংসার!”

_⁠_⁠_⁠_⁠_⁠_⁠_⁠_⁠_চলবে_⁠_⁠_⁠_⁠_⁠_⁠_⁠_⁠_

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here