সমাপ্তির_ওপাড়ে #জাবিন_ফোরকান #পর্বসংখ্যা৪১

0
2

#সমাপ্তির_ওপাড়ে
#জাবিন_ফোরকান
#পর্বসংখ্যা৪১

কুঠিজুড়ে আজ কেমন যেন সাজ সাজ রব। মেয়েরা ব্যাস্ত হয়ে ছোটাছুটি করছে এদিক সেদিক। কেউ চাল ধুয়ে আনছে, কেউ বা মাংস কেটে নিচ্ছে। কেউ চুলায় কড়াই চাপিয়েছে পেঁয়াজ ভেজে বেরেস্তা তৈরী করতে। কাউকে বাজারে পাঠানো হয়েছে দরাদরি করে তাজা মাছ এবং সবজি নিয়ে আসতে। গোটা কুঠি আজ মেহমান আপ্যায়নে ব্যস্ত।

সিঁড়ি বেয়ে যখন উপরে উঠছি, তখন জায়দান আমার হাত চেপে ধরে রেখেছে প্রচন্ড শক্তভাবে। মুখটা যথাসম্ভব স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করলেও খানিকটা অস্বস্তিকর ভাব সে কিছুতেই মুছতে পারছেনা। এমনিতেও অতিরিক্ত লম্বা হওয়ার দরুণ কুঠির সরু বারান্দায় মাথা নিচু করে চলতে হচ্ছে, উপরন্তু আশপাশ থেকে মেয়েদের উঁকিঝুঁকি দিতে দেখে সে সংকুচিত হয়ে গিয়েছে। আমি তার হাতটা নিজের মুঠোয় চেপে আশ্বাস দিলাম,

“তোমার যদি খারাপ লাগে, তাহলে আমরা চলে যাই? বাইরে কোথাও নাহয় দেখা করব।”

জায়দান কথাটি শুনে মাথা নাড়লো। আঙুলে চশমা ঠিকঠাক করে নিয়ে জানালো,

“না। কথার বরখেলাপ করা উচিৎ নয়। আমি ঠিক আছি, চিন্তা করোনা।”

মোলায়েম হাসার চেষ্টা করলাম। অভ্যন্তরে এতটা মুগ্ধতা কাজ করছে যা বলে বোঝানো সম্ভব নয়। আমার আম্মু, সাবিনার সঙ্গে কুঠি অবধি জায়দান নিজ থেকে দেখা করতে আসবে, বিষয়টা আমার কল্পনাতীত ছিল।

প্রথমবারের মতন ভদ্র পুরুষের পা পড়েছে এই অঙ্গনে। তাই চারপাশে রমরমা আনন্দ। আম্মুর ঘরের কাছে আসতেই তীব্র বেলীর সুবাস নাকে এসে ঠেকলো। সঙ্গে ভেতরের উত্তেজিত কন্ঠস্বর,

“কাচ্চিটা কিন্তু আগে টেস্ট কইরা দেখবি বানু। আর আস্ত মুরগীটা যেন মশলা মাইখা ভালোমত রান্দে। আমার জামাইয়ের আদর যত্নের যদি কোনো কমতি হইসে তো ভালা হইব না বইলা দিলাম!”

“আম্মু?”

না পারতে উত্তেজিত হয়ে ডেকে উঠলাম। তড়াক করে ঘুরে দাঁড়ালেন সাবিনা। পরিপাটি বাদামী রঙের শাড়ী পরনে, হালকা গহনা এবং স্নিগ্ধ সাজসজ্জা। আমাকে দেখেই বিরাট হাসি খেলে গেলো তার মুখজুড়ে। টানা টানা গভীর নয়নজোড়া জ্বলজ্বল করে উঠল খুশিতে।

“আমার আম্মাজান! তুমি আইসো?”

ভেতরে দৌঁড়ে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লাম জননীর বুকে। সাবিনা নিজের ভেতর যেন লুকিয়ে নিলেন। আগলে ফেললেন উষ্ণতার চাদরে।

“তুমি ভালো আছো, আম্মু?”

“জানিনা। কিন্তু এখন খুব ভালো আছি আম্মা। তুমি আইসা পড়ছো আমার বুকে, আমার আর কিচ্ছু লাগবো না।”

অদূরে কক্ষের প্রবেশপথে দাঁড়িয়ে নীরবে আমাদের আবেগ বিনিময় পর্যবেক্ষণ করলো জায়দান। আমি নিজেকে আলিঙ্গন থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে তাকে ইশারা করলাম ভেতরে আসার জন্য। সাবিনা প্রসারিত নয়ন মেলে দেখলেন আমার স্বামীকে। ভেতরে ঢুকতে গিয়ে উচ্চতার কারণে দরজার কাঠামোর সঙ্গে কপালে গোত্তা খেলো বেচারা! ফিক করে হেসে ফেললাম আমি। জায়দান অবশ্য বিশেষ প্রতিক্রিয়া করলোনা। কপাল ডলে নিয়ে লম্বা পা ফেলে ভেতরে এলো।

“আসসালামু আলাইকুম, আন্টি।”

“ওয়া আলাইকুমুস সালাম।”

সালাম করার উদ্দেশ্যে জায়দান ঝুঁকতে যেতেই সাবিনা দুহাতে তার বাহু আঁকড়ে ধরে আটকে ফেললেন।

“আরে, করো কি করো কি? সন্তানের জায়গা মায়ের বুকের মইদ্যে হয়।”

জায়দান থমকে গিয়ে আমার মায়ের দিকে তাকালো। সাবিনা বড় সাধ নিয়ে দেখলেন তাকে। কাঁপা কাঁপা দুহাত তুলে অত্যন্ত আলতোভাবে ছুঁয়ে দিতে চাইলেন মুখ, অথচ পারলেন না। স্পর্শেও এমন অনীহা যেন পবিত্র কিছু ছুঁয়ে অপবিত্র বানিয়ে ফেলবেন। জায়দান নিজে থেকে তার হাত দুখানা গালে চাপলো নিজের। ছোঁয়ায় কেঁপে উঠলেন সাবিনা। কাজলটানা চোখের মাঝে ভর করলো আবেগাশ্রু। ঠোঁটে বিরাট খুশির চওড়া হাসি।

“এ তো পুরাই ইলেক্ট্রিসিটির খাম্বা রে, আম্মা!”

অভাবনীয় প্রশংসায় বিব্রত বোধ করলো জায়দান। তার গাল দুটো অতি সামান্য রাঙা হয়ে উঠলো। অপরদিকে আমি অট্টহাসি হেসে উঠলাম।

“ঠিক বলেছ আম্মু, আমার ব্যক্তিগত টাওয়ার!”

জায়দানের গাল হালকা টেনে আদর বুলিয়ে সাবিনা নরম গলায় স্নেহকাতর কন্ঠে বললেন,

“আমার আব্বাজান! আপনি ভালো আছেন?”

জায়দানের জন্য এমন হৃদয় নিংড়ানো আদর অপ্রত্যাশিত সেটা তার অভিব্যক্তি দেখেই বোঝা গেলো। শক্ত পাথুরে চেহারায় এক নমনীয় ভাব ফুটে উঠল। মাথা দুলিয়ে সে আবেগে সামান্য ভেঙে আসা কন্ঠে উত্তর করলো,

“জি আন্টি, আমি ভালো আছি।”

“আন্টি না, আম্মু বলবা। যেমন আমার আম্মাজান আমার মেয়ে, তেমন তুমিও আমার ছেলে, আমার আব্বাজান!”

জায়দান শুধু স্তব্ধ হয়ে চেয়েই রইলো, কোনো প্রত্যুত্তর আর করতে পারলোনা।

কিছুক্ষণের মাঝেই আমি আর জায়দান দুজনই বসলাম সাবিনার ঘরের বিছানায়। ক্ষণে ক্ষণে উৎসাহী অনেক মেয়ে এসে কৌতূহল নিয়ে উঁকিঝুঁকি মেরে দেখছে। গ্রামের বাড়িতে নতুন বর – বউ আসলে যেমন আচরণ করা হয়, এদের আচরণও তেমনটা। জায়দান সমস্ত সময়টা ফ্লোরের দিকে চেয়ে থাকলো। তার অস্বস্তি হচ্ছে স্পষ্ট, তবে নিজেকে সংযত রেখেছে সে। সমস্ত কুঠিজুড়ে রটিয়ে পড়লো, ম্যাডামের মেয়ের জামাই আকাশের তারার টুকরা! এমন ভদ্র পুরুষ তারা বাপের জন্মে দেখেনি। মোটামুটি কৌতূহল মিটে গেলে দরজা আটকে দিলেন সাবিনা, আদেশ করে দিলেন যেন কেউ আর তার মেয়ে জামাইকে অস্বস্তিতে না ফেলে।

ইতোমধ্যে শরবত, ফলমূল, নাস্তা চলে এসেছে। আমি তো গোগ্রাসে গিলছি যেন কতদিনের অভুক্ত প্রাণী। সাবিনার নিজের হাতে বানানো সেমাই চামচের পর চামচ গিলছি শুধু। সাবিনা তাতে আমায় মাথায় এক চাটি মারলেন,

“খাবার এমনে খায় মানুষ? রোজা রাখছিলা নাকি চারদিন?”

মুখভর্তি খাবার নিয়েই হাসলাম,

“হেহেহে। তোমার হাতের রান্না তো আম্মু, প্রতিদিন পাই নাকি? শুনো, সবকিছু চার বাটি করে প্যাকেট করে দেবে, বাসায় গিয়ে একমাস খাবো।”

“কত্ত বড় নোলা মেয়ের!”

হাসাহাসি করে গড়িয়ে পড়লাম মা মেয়ে। জায়দান একদৃষ্টে আমাদের দুজনের খুনসুঁটি দেখে গেলো। বেশ দীর্ঘ সময় যাবৎ সে সাবিনাকে দেখে যাচ্ছে আমি খেয়াল করেছি। বুকের ভেতরটা চেপে এলো আমার উপলব্ধিতে। এমন একজন মায়ের বড্ড অভাব ছেলেটার জীবনে! এর আগে কেউ তাকে আব্বাজান বলে ডেকেছিল? কেউ আদর করে আম্মু ডাকতে আবদার করেছিল?

উত্তর জানা নেই আমার। কারণ, জেসমিন শিকদার জায়দানের জীবনের এমন এক অধ্যায়, যে অধ্যায়ের সম্পর্কে আমার ধারণা নিতান্তই নগণ্য।

“ও কি আব্বাজান? আপনি একটুও খাইলেন না? আম্মা আমারে বলছে, আমি আপনার জন্য আলাদা কইরা মিষ্টি ছাড়া বানাইসি, গুড় দিয়া।”

সম্বিৎ ফিরে পেয়ে ঘোর থেকে বেরিয়ে এলো জায়দান। দ্রুত চামচ মুখে তুলতে তুলতে বললো,

“ জি জি, খাচ্ছি আন্টি…”

“আম্মু!”

“জি…আম্মু!”

রীতিমত ফিসফিস করে উচ্চারণ করলো জায়দান। অতঃপর চামচ মুখে ঢুকিয়ে দিয়ে নিজের অভিব্যক্তি লুকিয়ে ফেললো।

মানুষের জীবনে আনন্দের সময়গুলো দ্রুত কাটে। তেমনি সাবিনার সঙ্গে সময়গুলোও বেশ জলদি ফুরিয়ে এলো। দুপুরের খাবারের আয়োজন ছিল এলাহী। মনে হচ্ছিল, আমরা ভুলে কোনো বিয়ে বাড়ীতে হাজীর হয়েছি। জায়দান, যে কখনো নিজের প্রয়োজনের অতিরিক্ত এক দানাও মুখে তোলেনা, তাকে তোষামোদ করে আস্ত মুরগীর অর্ধেক খেতে বাধ্য করার বিষয়টা বেশ মনে ধরেছে আমার। বেচারা জোরালোভাবে কাউকে মানাও করতে পারছিলোনা। একটা সময় তো অবস্থা এতই বেগতিক হয়ে গিয়েছিল যে, নিজের প্যান্টের বেল্ট ঢিলে করে হলেও পেটে জায়গা করতে হয়েছে বেচারা জায়দানকে! স্বামীকে খোঁচাখুঁচি করে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ফেলেছি আমি। আমাদের খুনসুঁটি দেখে তৃপ্তির হাসি হেসেছেন সাবিনা।

বিকালের দিকে। আমরা হয়ত আর মিনিট ত্রিশেক আছি এখানে। কাচ্চি, রোস্ট, রসমালাই, কাবাব হজমের সময় না দিয়েই এখন বসেছে চায়ের আসর। জায়দানের জন্য কড়া লিকারের তেঁতো রং চা প্রস্তুত। সেটিতে এই মুহূর্তে নির্বিকার চুমুক দিচ্ছে সে। অন্যদিকে আমি মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে বসে আছি। এভাবে আর কতদিনই বা এতটা কাছাকাছি থাকতে পারবো?

আরামদায়ক গাঢ় নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করলো জায়দানের কন্ঠস্বর। চায়ের কাপ নামিয়ে রেখে সে সাবিনার দিকে তাকালো, নরম দৃষ্টিতে।

“আপনি আমাদের কাছে চলে আসুন, আম্মু। আমাদের ছোট্ট পরিবার তাহলে এক গুরুজনের ছায়া পেতো।”

জামাইয়ের প্রস্তাবে মৃদু হাসলেন সাবিনা। আমার চুলে বিলি কেটে দিতে দিতে জানালেন,

“যাওয়ার হইলে, ওই মানুষটার হাত ধইরা কবেই সমাজে চইলা যাইতাম!”

“ড্যাড?”

আমি বলে উঠতেই সাবিনা একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে সায় দিলেন।

“হ্যাঁ, তোমার ড্যাড। লোকটা আমাকে শুরুতে অনেক অনুরোধ করতো, খুব ভালবাসতো, আমাদের একটা পরিবার চাইতো। কিন্ত আমি তো বাস্তবতা বুঝছিলাম। তার সন্তান পেটে আসার পর আমিও চাইছিলাম তার সঙ্গে যাইয়া সংসার বাঁধতে। কিন্তু….”

“কিন্তু কি?”

অধীর আগ্রহে শুধালাম আমি।

“কিন্তু বাস্তব আর গল্প এক হয়না, আমার আম্মা। তোমার বাপের তখন রমরমা ব্যবসা, নিজের মাথার ঘাম পায়ে ফেইলা উনি উঠছেন অভিজাত সমাজের সিংহাসনে। ওইরকম সময়ে, একটা নাপাক মাইয়ার সাথে যদি উনি সংসার করতেন, তাইলে কেমন হইত বলো তো? উন্নতির জন্য তার শত্রুর কোনো কমতি ছিলনা, সবাই ওৎ পাইতা বইসা ছিল। একটা দূর্বলতা পাইলেই ওনাকে ঘায়েল কইরা ফেলত।”

“এজন্য ড্যাড পিছিয়ে এসেছিলেন?”

এবার জায়দান জিজ্ঞেস করলো। সাবিনা মাথা নাড়লেন।

“উনি পিছাইতে চায়নাই। উনি চাইতেন, আমারে নিয়া সমাজে প্রতিস্থাপন করবেন। যে যাই বলুক না কেন, উনি আমাকে নিজের রাজরানী মানবেন। কিন্তু আমি মানতে পারিনাই। আমার সন্তানকে সবাই বলবে পাপের সন্তান, নিষিদ্ধ প্রাণ, এইটা আমি মানতে পারতাম না কোনোদিন। আমি আমার আপন মানুষগুলার জীবনে বিপদ হইতে চাইনাই। শুরুতেই ওনার সঙ্গে সম্পর্কে আমার সায় দেয়া ঠিক হয়নাই। কিন্তু ওনার মতন কইরা আমাকে কেউ আদর দেয়নাই! এই তল্লাটে পুরুষ আসে বহু, কিন্তু তারা আদর দেয়নাই, হাসিল করে। আমার আম্মার বাপ হয়ত ভিন্ন ধাতুতে গড়া ছিলেন। তিনি এইটাও স্বীকার করছিলেন, এর আগে ওনার বহু মেয়েকাণ্ড ছিল, বিভিন্ন পল্লীতে যাতায়াত ছিল। কিন্তু আমার উপর আইসা উনি আটকিয়ে গেছিলেন। আর নড়তে পারেন নাই।”

জায়দান আর আমি একে অপরের দিকে তাকালাম নিঃশব্দে। আমার বাবা – মায়ের এই কাহিনী আমার নিজেরও অজানা ছিল এতদিন। তাদের মধ্যকার সবকিছুই কেমন যেন নিষিদ্ধ ধাঁচের, অত্যন্ত জটিলতায় ঘেরা, সামাজিক দৃষ্টিতে অত্যন্ত দৃষ্টিকটু। যদি পবিত্র বলে কিছু থেকেই থাকে, সেটা ছিল তাদের একে অপরের প্রতি ভালোবাসা এবং আমার প্রতি দায়িত্ববোধ।

সাবিনা আজ নিজের অসমাপ্ত কাহিনী সমাপ্ত করলেন,

“একটা সময় উনিও বুঝলেন, চারিদিকে কালসাপ, আমাকে নিয়া যাওয়াটা ঝুঁকির হইতে পারে। কত যে সাবধান ছিলাম আমরা! ভালোবাসার সময় মনে রং ছিল, কিন্তু নাড়িছেঁড়া ধনকে দূরে পাঠাই দিতে সেই রং ছাই হইয়া গেলো। আমি দূর থেকেই আমার জীবনের ভালোবাসার মানুষগুলার সুখ দেখতাম। কখনো নিজের ছায়াও পড়তে দিতে চাইনাই কারণ আমি জানতাম, একদিন আমার পরিচয়ই ওই মানুষগুলার উপর কাল হইয়া দাঁড়াইতে পারে। আর দেখো আব্বা, সারাটা জীবন যেটা না হওয়ার জন্য পালাইছি, সেটাই হইয়া গেলো আমার আম্মার সাথে!”

এক মুহুর্ত থেমে তিনি যুক্ত করলেন,

“আর এখন এইটাই আমার জীবন। আমি চইলা গেলে এইখানের অসহায় মেয়েগুলা যাবে কোথায়? ওরাই আমার আমানত এখন, বাকিটা জীবন ওদের দেখাশোনা কইরাই আমার কাইটা যাবে।”

সাবিনার চোখজোড়া ছলছল করে উঠলো। জাপটে ধরলাম নিজের জননীকে। জায়দান এগিয়ে এসে দ্বিধা কাটিয়ে সাবিনার একটি হাত তুলে নিলো নিজের হাতে। যেন ভরসাস্বরুপ। কয়েক মুহূর্ত আমরা কেউই কোনো কথা বললাম না। নীরবে অনুভব করলাম একে অপরকে। আমাদের প্রত্যেকেরই মনে হলো, জীবনে আমরা কেউই আর একলা নেই। আমাদের খেয়াল রাখার দুজন করে মানুষ আছে এই পৃথিবীতে!

“আপনি একজন সংগ্রামী নারী, আম্মু।”

নরম গলায় বলে সাবিনার ঝনঝনে চুরি পরনে হাতখানি নিজের কপালে ঠেকালো জায়দান। পরক্ষণে খানিকটা কঠোর কন্ঠে বললো,

“আমার মনে হয়না এই ঝামেলায় আপনার জড়ানো…”

“না আব্বা। তোমার এই কথাটা মানতে পারলাম না।”

সাবিনা আঙুল তুলে আদুরে শাসন করলেন জায়দানকে। হাত বাড়িয়ে তার মাথায় স্নেহ বুলিয়ে বললেন,

“তাকদীর হুসেইন আমার স্বামী। উনি আমারে বিয়া করার পর আমি দ্বিতীয় কোনো পুরুষরে আমার রুমের চৌকাঠ অবধি আসতে দেইনাই। আজকে আসছো, শুধুমাত্র তুমি। ওনার হক আদায় করা দরকার। ওনার সঙ্গে অনেক অন্যায় হইসে। আমি প্রায় রাতে ওনাকে স্বপ্নে দেখি, কষ্টে আছেন উনি, আমি বুঝি। কালসাপগুলাকে শায়েস্তা করা দরকার। আমার স্বামীর ভালোবাসার হক ছাইড়া দিলেও ওনার মর্যাদার জন্য আমি লড়াই করতে প্রস্তুত। তুমি এখন পরিকল্পনা বদলাইও না। শুধু বলো, আমাকে কি করতে হবে।”

জায়দান নিশ্চিত হওয়ার জন্য একনজর আমার দিকে তাকালো। আমি মাথা দুলিয়ে সম্মতি জানালাম। অবশেষে সে উঠে দাঁড়ালো। নিজের কোটের পকেট থেকে ছোট্ট একটি বস্তু বের করে আনলো। অতঃপর সেটি সাবিনার হাতে দিলো। আমরা মা মেয়েতে মিলে বস্তুটা দেখলাম। একটা অতি সাধারণ দেখতে ছোট পেনড্রাইভ। জায়দান গুরুগম্ভীর স্বরে ব্যক্ত করলো,

“এটা টার্গেটের ল্যাপটপে কানেক্ট করবেন। যেকোনোভাবে দুই মিনিট সময় নেবেন। ব্যাস। বাকি কাজ আমার।”

***

পড়ন্ত বিকাল।

আম্মুর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সোজা বাসায় ফেরার কথা থাকলেও কেন যেন ফিরতে মন চাইছেনা। জায়দান মাঝপথেই নিজের বাইক পার্ক করে রেখেছে। আমরা দুজন সড়কের ধার বেয়ে একে অপরের হাত ধরে হেঁটে যাচ্ছি। ব্যস্ত জনজীবন। এদিক সেদিক স্ট্রীট ফুডের স্টল। মানুষের হাকডাক। লোকাল বাসের কন্ডাকটরদের চিৎকার। সকলের বাড়ি ফেরার তাড়া। কোচিং শেষ করে ঘরের পথে বাচ্চারা। অত্যন্ত সাদামাটা শহুরে দৃশ্য দেখতে ভীষণ ভালো লাগছে আমার। কারণ এভাবে কখনো নিজের স্বামীর সঙ্গে সময় কাটানো হয়ে উঠেনি আমার।

জায়দানের বাহু চেপে নিজেকে তার মাঝে বিলিয়ে দিয়ে আমি কোমল কন্ঠে বললাম,

“জায়দান?”

“হুম?”

“চলো না। আমরা আবার বিয়ে করি?”

জায়দান থামলো। আমার দিকে ফিরে তাকালো। একটি হাত তুলে আমার কপালে চলে আসা চুলের গুচ্ছ কানের পিছনে গুঁজে দিয়ে বললো,

“একবার বিয়ে করেই ইতিহাস হয়ে গেল। আরো একবার করতে চাও?”

খিলখিল করে হাসলাম আমি।

“ধুরু ব্যাডা!”

আমার এমন প্রতিক্রিয়া শুনে অতি সূক্ষ্ম হাসি ফুটলো জায়দানের ঠোঁটে। পাল্টা বললো,

“ধুরু বেডি!”

অট্টহাসি হেসে তার কাঁধে চাপড় দিলাম আমি। পরক্ষণেই গুঙিয়ে উঠে বললাম,

“জায়দাআআআন! আমি সিরিয়াস!”

“বলুন আমার সিরিয়াস বউ!”

“আমাদের তালাক হয়নি, তুমি এখনো আমার স্বামী, মানছি। কিন্তু আইনগতভাবে আমরা সেপারেটেড। আমার ম্যারেজ সার্টিফিকেট চাই।”

জায়দান আমার হাতটি নিজের মুঠোয় পুরে পুনরায় হাঁটতে হাঁটতে উত্তর করল,

“যেমনটা আমার বউয়ের ইচ্ছা।”

“সত্যি? আমরা আবার বিয়ে করব?”

“হুম। করব। বাট, লেট আস বি সেটেল্ড ফার্স্ট। এতদিন অপেক্ষা করেছ, আর একটুখানি পারবেনা?”

প্রশস্ত হাসলাম আমি।

“খুব পারবো!”

হাসির মাঝেই হঠাৎ সামনের একটি দৃশ্য দেখে আমি সম্পূর্ণ জমে গেলাম। আমার পরিবর্তনটা স্পষ্ট খেয়াল করলো জায়দান। তাই মুখ ঘুরিয়ে তাকালো সেদিকে।

সড়ক থেকে বেশ খানিকটা দূরে একটা ছোট্ট পার্কের মতন জায়গা। সেখানে একটি বেঞ্চ ঘিরে বেশ কতক পথশিশু বসে আছে। প্রত্যেকের কাছে খাতা, কলম, বই। দুজন শিশুর সঙ্গে দরিদ্র পিতা মাতাকেও চোখে পড়ছে। তাদের সামনের বেঞ্চে বসে আছে এক তাগড়া তরুণ। সুদর্শন মুখজুড়ে খোঁচা খোঁচা দাড়ি, ঝাঁকড়া চুল এবং চোখে আঁটা পুরাতন দিনের মোটা ফ্রেমের একটি চশমা। একটা ছোট হোয়াইট বোর্ড বসিয়ে সেখানে মার্কার পেন দিয়ে দাগ কাটছে সে। বাচ্চাগুলো তার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনে নিজেদের খাতায় পেন্সিল দিয়ে লিখছে। তাদের পড়ালেখা শেখানো হচ্ছে। আমার চোয়াল ঝুলে পড়লো।

“ওটা…আয়দান না?”

আমার অবিশ্বাস ভরা কণ্ঠের বিপরীতে জায়দান নির্লিপ্ত উত্তর করলো।

“হুম। আয়দান আরেফিন।”

_⁠_⁠_⁠_⁠_⁠_⁠_⁠_⁠_চলবে_⁠_⁠_⁠_⁠_⁠_⁠_⁠_⁠_

[ 🫣 যে স্পয়লারের পর্বের অপেক্ষা জাতির, সেটা নেক্সট পর্বে আসবে। এই পর্ব অত্যধিক বড় হয়ে যেতো, তাই কাটছাঁট করেছি। পরের পর্ব শুক্রবার পাবেন খুব সম্ভবত। আগামীকাল আমার ছুটি।

আর যারা গল্প সম্পর্কে জানতে ইচ্ছুক, তাদের জন্য বলছি, গল্পের দুই তৃতীয়াংশ লিখা শেষ। অর্থাৎ, আমরা সমাপ্তির দ্বারপ্রান্তে না এলেও কাছাকাছি চলে এসেছি। কত পর্ব বাকি আছে এক্সাক্ট বলতে পারছিনা, কারণ জানেন, আমি ছোট গল্প লিখতে পারিনা। এটা ৩০ পর্ব করার কথা থাকলেও পারিনি। তাই আগ বাড়িয়ে আর কিছু বলবো না।

শেষ কথা। যদি গল্প পড়ে থাকেন, তবে একটু কষ্ট করে রেসপন্স করবেন। কারণ জানেনই তো, ফলোয়ার বাড়ছে পেইজের, কিন্তু সেই তুলনায় রেসপন্স আগের মতোই। উল্টো ইদানিং কমেছে। এই কারণে রিচ বারবার উঠানামা করছে। একটু কষ্ট করে রিয়েক্ট কিংবা একটা লাইন হলেও কমেন্ট করার অনুরোধ রইলো। ভালোবাসা। 🩷 ]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here