#সমাপ্তির_ওপাড়ে
#জাবিন_ফোরকান
#পর্বসংখ্যা৪২
চাপা গলির মতন সড়ক বেয়ে মানুষেরা হেঁটে যাচ্ছে। দুপাশে দেয়ালে ঘেরা ঘরবাড়ি। একটা পুরাতন একতলা ভবনের পুরাতন মরচে পড়া গেটের পিছনে দাঁড়িয়ে আছে মীরা। ভবনটা বন্ধ, কাঠের দরজায় তালা। শ্যাওলা লেপ্টে থাকা দেয়াল থেকে দূরে, সাবধানে দাঁড়িয়ে নিজের হাতের ফোন ঘেঁটে দেখছে সে। স্ক্রীনে উজ্জ্বল একটি ছবি। সাবিন পাঠিয়েছে তাকে। এক তরুণ ছেলে রাস্তার ধারে পথশিশুদের পড়াতে মশগুল। মীরা যবে থেকে ছবিটা দেখেছে, তবে থেকে কিছুতেই মাথা থেকে বের করতে পারছেনা বিষয়টাকে।
দুজন পাঞ্জাবী এবং টুপি পরনে বয়স্ক মানুষ গলি বেয়ে বেরিয়ে গেলো। মসজিদে নামাজ শেষে বাড়ি ফিরছে তারা। মীরা গেটের বাইরে উঁকি দিলো। অবশেষে দেখলো কাঙ্ক্ষিত মানুষটাকে। চেক শার্ট এবং ঢোলা ট্রাউজার পরনে, মাথায় ঝাঁকড়া চুলগুলো আড়ালে রয়েছে পরনের টুপির কারণে। এক হাত পকেটে ঢুকিয়ে মাথার টুপিটা খুলতে খুলতে এগিয়ে আসছে আয়দান। মীরাকে সে খেয়াল না করেই গলির বাইরে বেরিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু পিছন থেকে তার কব্জি পাকড়াও করে এক টানে গেটের এপাশে দেয়ালের আড়ালে নিয়ে এলো মীরা। আয়দান প্রথমটায় কিছু বুঝতে না পেরে থতমত খেয়ে গেল। মীরার মুখটা নজরে আসার পর সম্পূর্ণ জমে গিয়ে অবুঝ দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো।
মীরা ভ্রু কুঁচকে বুকে দুবাহু বেঁধে দারোগার ভঙ্গিতে আপাদমস্তক দেখলো আয়দানকে। পরিবর্তনটা স্পষ্ট। সর্বদা ক্লিন শেভড চেহারায় বাঙালি ছেলেদের মতন খোঁচা খোঁচা দাড়ি গজিয়েছে। চুলের দৈর্ঘ্যও বেড়েছে বেশ খানিকটা। ঘাড় অবধি ছুয়েছে, তাতে কোনো স্টাইলিশ কাট না থাকা সত্ত্বেও দেখতে অসাধারণ লাগছে। দীর্ঘ উচ্চতা, চেহারার গঠন যদিও অনেকখানি ভেঙে এসেছে, তবুও বেশ জেল্লাদার। আয়দানকে প্রথমবারের মতন শুধু একজন ছেলে নয়, বরং একজন পুরুষ মনে হচ্ছে। বিশুদ্ধ দেশী পুরুষ।
“তারপর বলো, তোমার নাটক কবে বন্ধ হচ্ছে?”
মীরার কাঠখোট্টা কণ্ঠের প্রশ্নে আয়দান ভ্রু তুলে উত্তর করলো,
“নাটক?”
একটি দীর্ঘশ্বাস ফেললো মীরা। নিজের কপালে দুই আঙ্গুল ঘষে মাথা দুলিয়ে উত্তর করল,
“এইযে, মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়া, রাস্তার ছেলেমেয়েদের পড়ালেখা শেখানো। এই পূর্ণদৈর্ঘ্য বাংলা ছায়াছবির মেয়াদ কতদিনের?”
আয়দানকে প্রথমবারের মতন অপমানিত দেখালো। মীরার উপর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিজের মাথায় হাত চালালো সে। বুঝি, তেঁতে ওঠা ক্রোধটুকু নিয়ন্ত্রণের চেষ্টায় আছে। মীরা ছেলেটাকে আরো একটু বাজিয়ে দেখার জন্য স্বেচ্ছায় বললো,
“তোমার কি মনে হয় আয়দান? এসব করলেই আমার মন গলে যাবে? কি ভেবেছ? ক্যাফের আশেপাশে সারাদিন ঘুরঘুর করো আমার চোখে পড়েনি? মসজিদে গিয়ে, ভালো কাজ করে কি বোঝাতে চাও যে তুমি ভালো হয়ে গিয়েছ? তোমাকে আমার মাফ করে দেয়া উচিৎ? তোমার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়া উচিৎ? হ্যাঁ? আই অ্যাম সরি, তবে তোমার ভাবনাটা ভুল। বুঝেছ?”
বাদামী দৃষ্টি ফিরিয়ে সরাসরি মীরার চোখের দিকে তাকালো আয়দান।
“আমি তোমার ক্ষমা চাই, ইয়েস। বাট অ্যাবাউট এভরিথিং এলস, ইউ আর টেরিবলি রং!”
বাঁকা হাসলো মীরা।
“ওহ আচ্ছা? তাহলে আমাকে বোঝাবেন মিস্টার আয়দান আরেফিন? ঠিক কোন বিষয়টা নিয়ে আমি ভুল? আপনি এসব আমার জন্য করছেন না? আমাকে আবারো ভালোবাসার ফাঁদে ফেলার কোনো ধান্দা নয়?”
“তোমার মনে হয়, সবকিছু আমি তোমার জন্য করছি?”
“অফকোর্স! নাটক!”
“তুমি ভুল।”
“তবে সঠিকটা কি?”
“আমি সবকিছু আমার নিজের জন্য করছি।”
মীরা প্রতিবাদ করতে প্রস্তুত ছিল, তবে এই জবাবের পর সে থমকে গেলো। বিস্মিত হলেও আয়দানকে বুঝতে না দিয়ে উপভোগ্য হাসি ফোটালো সে ঠোঁটে।
“ওহ আচ্ছা? নিজের জন্য? এক্সপ্লেইন প্লীজ?”
আয়দান মাথা ঘুরিয়ে এদিক সেদিক তাকালো। প্রথমটায় নিজের মুখে হাত ঘষে বুঝি হতাশা চাপলো। তারপর বলতে শুরু করলো,
“আমি জানি না আমার মাঝে ঠিক কতটুকু পরিবর্তন এসেছে, তবে জানি আমাকে হয়ত তোমার অবিশ্বাস হচ্ছে। সেটাই স্বাভাবিক। তবে এটুকু নিশ্চিত থাকো, আমি কিছুই তোমাকে ভোলাতে করছিনা, সবটাই আমার নিজস্ব আত্মপরিশুদ্ধি।”
মীরা নিঃশব্দে শুনতে লাগলো। আজ সে মূলত শুনতেই তো এসেছে।
“মীরা, যদি তোমার জন্য আমি বদলে যেতাম, তবে সেই বদলানোর হয়ত কোনো মূল্য থাকতো না। কারণ তখন আমি আগাগোড়াটাই হতাম মিথ্যা। লাইক, জোর করে একটা ধাতুকে অন্য ধাতুতে রূপান্তর করা শুধুমাত্র কোনো মানুষকে খুশি করার জন্য। তবে আমি ইদানিংকালে বুঝতে পারছি, মানুষের চাইতেও বৃহৎ সত্তা রয়েছে, এই পৃথিবীর চাইতেও বৃহৎ কোনো উদ্দেশ্য রয়েছে। আমি হয়ত সেই নতুন পথের সন্ধানেই বেরিয়েছি। রাতের পর রাত আমি ঘুমাতে পারিনি, অথচ এখন সারাদিন এখানে সেখানে ঘুরে, আমার মনের মতন কাজ করে বাড়ি ফিরে বালিশে মাথা দিলেই ক্লান্তিতে ঘুম নেমে আসে চোখে। অদ্ভুত একটা শান্তি আছে আমার বুকের মাঝে।”
মীরার চোখমুখজুড়ে বিস্ময় এবার স্পষ্ট প্রকাশ পেলো। আয়দান? সে আদও আয়দান আরেফিন নামক বাজে ছেলেটার কথা শুনছে বিশ্বাস হচ্ছেনা তার। আয়দান তার দিকে চেয়ে নেই, দৃষ্টিপাত সুদূরে। বাদামী দৃষ্টিতে প্রতিফলিত হচ্ছে আকাশে ভেসে চলা সাদা সাদা তুলোর মতন মেঘ।
“আমি অপরাধবোধে বাঁচতে পারছিলাম না মীরা। তোমার প্রতি অপরাধ করেছি আমি, করেছি আমার আপন ভাইয়ের প্রতি। এই অবুঝ জীবনে হেলাফেলা করে চলেছি কত কিছু! এত এত দায় আমার জীবনের রং কেড়ে নিয়েছে। নিজেকে হারিয়ে আমি খুঁজে ফিরতাম একটুখানি শান্তি। তুমি ছিলে আমার জীবন পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় উছিলা। তুমি এমন এক অধরা, যার স্বপ্নে আমি না চাইলেও সারাটা জীবন বিভোর থাকবো।”
এইবার মীরার চোখে চোখে তাকালো আয়দান। তার অসম্ভব মোলায়েম মুখখানি দেখালো নিষ্পাপ শিশুদের মতন।
“আমি এখনো পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তে পারিনা। প্রথমদিন যখন মসজিদে গিয়েছিলাম, আবিষ্কার করলাম আমি নামাজ কিভাবে পড়তে হয় তাই জানিনা! ইমাম সাহেবকে যখন জিজ্ঞেস করলাম, তখন অন্যরা আমাকে নিয়ে খুব হাসাহাসি করলো। এত বড় ছেলে নাকি নামাজ জানেনা! অথচ প্রথমবারের মতন আমার কষ্ট হলোনা। যে জিনিস জানিনা সেটা নতুন করে শিখতে দোষ কি? ইমাম সাহেব সেদিন হাসেননি মীরা। হাসলে হয়ত, এই পথটাও আমার জন্য রুদ্ধ হয়ে যেতো। আমি আসরের নামাজের আগে বাচ্চাদের সঙ্গে ইমাম সাহেবের কাছে কায়দা পড়ি। ওদের থেকেই জেনেছিলাম, ওদের গরীব বন্ধুরা কিভাবে পড়াশোনা করার সুযোগ পাচ্ছে না। সেখান থেকেই ওদের পড়ানো শুরু করি। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা হয়ত দিতে পারবনা, তবে এটুকু শিক্ষিত করতে পারব যাতে কেউ ওদের অশিক্ষিত না বলতে পারে। আমি যে শিক্ষা কোনোদিন পাইনি, সেটা যদি ওদের দিয়ে অপরাধীর বদলে কয়েকটা ভালো মানুষ তৈরিতে কিঞ্চিৎ ভূমিকা রাখতে পারি তাতে ক্ষতি কি?”
মস্তিষ্ক হাতড়ে কোনো শব্দ খুঁজে পেলনা মীরা। এই ছেলেকে কি বলা যায়? যে নিজেকে পরিবর্তনে শান্তির খোঁজ করতে গিয়ে একটু একটু করে এগোচ্ছে, তাকে রুখে দেয়ার সাধ্য কার? মীরা কাঠখোট্টা প্রশ্নগুলো আর করতে পারলোনা, যতটুকু বোঝার সে বুঝে গিয়েছে। আয়দান একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঠোঁটে মৃদু হাসি ফোঁটালো।
“তোমার সন্দেহ স্বাভাবিক। তোমার স্থানে আমি থাকলে নিজের সাথে আরো খারাপ কিছু করতাম। তুমি সেই তুলনায় বেশ উদার। তবে একটা অনুরোধ থাকবে, দয়া করে আমার কাজকর্মকে কাউকে সন্তুষ্ট করার গন্ডিতে ফেলো না। আমি কোনো মানুষকে সন্তুষ্ট করতে আগ্রহী নই। আমার হিসাব হবে সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে।”
“আধ্যাত্মিক কথাবার্তা বলতে শুরু করেছ।”
অবশেষে বলল মীরা। আয়দান মাথা দোলালো।
“হয়ত। তবে নিজের প্রতি আগের মতন আর আফসোস হয়না।”
অতি সাবধানে মীরার দিকে এক পা এগোলো আয়দান। নিজেদের মাঝে যথেষ্ট নিরাপদ দূরত্বে রেখেই।
“শেষ একটা কথা বলি মীরা? আমি যাই করি না কেন, যেমনি হই না কেন, যেখানেই গিয়ে পৌঁছাই না কেন। একটা কথা জেনে রেখো। এই আয়দান মৃত্যুর আগ পর্যন্ত একটা জিনিসের অপেক্ষা করবে।”
একটু বিরতি দিয়ে আরেফিন কনিষ্ঠ বলল,
“তোমার ক্ষমার।”
এটুকুই। আর দাঁড়ালোনা আয়দান। মীরাকে পাশ কাটিয়ে গেট পেরিয়ে বাইরে বেরিয়ে গেলো। মীরা নিজের জায়গায় শিরদাঁড়া টানটান করে দাঁড়িয়ে থাকলো বেশ কিছুক্ষণ। অতঃপর সে বাইরে বেরোলো। গলি ফাঁকা হয়ে গিয়েছে। মীরা নিজের গায়ের ওড়নাটা মাথায় তুলে ভালোমত সতর ঢেকে এগোলো সামনে। কিছুক্ষণ বাদে সে পৌঁছালো পুরাতন এক মসজিদের সামনে। পুরাতন হলেও স্থাপনায় ঐতিহ্যবাহী। মসজিদের বারান্দায় দুজন মুসল্লী বসে নীরবে বই পড়ছেন। মীরা এগিয়ে গেলো তাদের দিকে।
“আসসালামু আলাইকুম। আমি একটু ইমাম সাহেবের সঙ্গে কথা বলতে চাচ্ছিলাম।”
***
সাপ্তাহিক ছুটির দিন শুক্রবার আজ। জায়দানের ঘুম ভাঙলো বিকট এক শব্দে। ভারী জিনিস মেঝেতে পরে ঝনঝন করে কাঁপুনি তুলে দেয়া এক শব্দ। ঝট করে বিছানায় উঠে বসতেই তেঁতো মতন একটা গন্ধ নাকে ঠেকলো। ঘড়ির দিকে নজর পড়তেই জায়দান দেখলো, সময় সাড়ে আটটা। এর মধ্যে কি হলো?
দ্রুত বিছানা ছেড়ে নাইটস্ট্যান্ড থেকে চশমা তুলে চোখে পড়ল জায়দান। এগোলো বেডরুমের বাইরে। পায়ে পায়ে ডাইন ইন এরিয়ায় আসতেই কিচেন চোখে পড়লো। থমকে গেলো সে। প্রসারিত নয়ন মেলে দেখলো দৃশ্যখানি।
রান্নাঘর জুড়ে ছোটাছুটি করছে তার অর্ধাঙ্গিনী, সাবিন। মেয়েটা সবসময় শার্ট, প্যান্ট, ট্রাউজার, পাজামা সেটের মতন সহজ এবং আরামদায়ক পোশাক ব্যবহার করে অভ্যস্থ। তবে আজ, তার সমস্ত রুপটাই বদলে গিয়েছে।
সাবিনের পরনে একটা কালো বর্ণের কামিজ। কমলা জর্জেট ওড়না কাঁধের দুপাশে ছড়ানো। চুলগুলো মাঝখানে সিঁথি করে হাতখোঁপা বাঁধা। ব্যস্ত হয়ে ছুটছে সে কিচেনের এই প্রান্ত থেকে সেই প্রান্তে। স্টোভে ননস্টিক পাতিলে টগবগ করে ফুটছে তরকারী। একপাশে রুটি তৈরীর সরঞ্জাম। সাবিনের কপালের একপাশ আটায় মাখামাখি। মেঝেতে একটা আটা ভর্তি স্টিলের পাত্র পরে গিয়েছে, বেচারী সেটা নিয়েই আহাজারি করছে। দ্রুত পরিষ্কারে হাত চালাচ্ছে। বেশ অপ্রস্তুত হাতে হেঁশেল ঠেলছে এক গৃহিণী।
সাবিনের উপর থেকে নিজের দৃষ্টি ফেরাতে পারলোনা জায়দান। অতি মুগ্ধতায় চেয়ে রইলো অর্ধাঙ্গিনীর নতুন রূপের পানে।
***
জায়দানের জন্য সকালের নাস্তা তৈরী করতে গিয়ে পরোটা পুড়িয়ে ফেলেছি আমি! নতুন করে পরোটার খামি গুলতে গিয়ে আটা শুদ্ধ পাত্রটাই উল্টে পরে গিয়েছে মেঝেতে। কি এক যাচ্ছেতাই অবস্থা!
কালো কামিজে সাদা আটায় মাখামাখি হয়ে যখন অপটু হাতে আমি মেঝে পরিষ্কার করছি, তখন কিচেনে এসে ঢুকলো জায়দান। প্রথমেই আমাকে টপকে দৌঁড়ে গিয়ে সে স্টোভ বন্ধ করলো। তড়াক করে লাফিয়ে উঠে দেখলাম, তরকারি শুকিয়ে কাঠ হয়ে এসেছে!
“এহহহহ…সরিইইই!”
গুঙিয়ে উঠলাম। আমার দিকে ঘুরে দাঁড়ালো জায়দান। ঠোঁটজুড়ে অতি সূক্ষ্ম এক কোমল হাসি।
“তুমি কি করছিলে, মাই ওয়াইফ?”
চোখমুখ কাচুমাচু করে লজ্জায় লাল টুকটুক হয়ে নিজের পক্ষে সাফাই গাইলাম।
“বিশ্বাস করো! আমি কিন্ত রান্না পারি! একা একা খেয়েছি না? কিন্তু কি বলো তো? মানুষের জন্য কিছু করতে গেলেই আমার সব তালগোল পাকিয়ে যায়।”
আমরা একসাথে থাকতে বেশিরভাগ রান্নার দায়িত্ব মীরার ছিলো। একা থাকাকালীন এই রান্না বান্নার ঝামেলা এড়াতে বাইরে খেতাম বেশি। এই বিষয়ের সঙ্গে আমার পূর্ববর্তী শত্রুতা। কিন্তু স্বামীর সামনে স্বীকার করব? ইশ! শখ কত!
জায়দান এগিয়ে এসে ঝাড়ু এবং বেলচা তুলে মেঝেতে পরে থাকা আটাটুকু পরিষ্কার করতে করতে শুধালো,
“এর কোনো প্রয়োজন ছিল? আজ শুক্রবার। প্রতিদিন তো ভোর ভোর উঠে ক্যাফেতে চলে যাও। আজ একটুখানি ঘুমাতে। উঠলে আমরা কিছু অর্ডার করে নিতাম।”
ঠোঁট ফুলিয়ে আমি জবাব দিলাম,
“কিন্তু আমি নিজের হাতে তোমার জন্য রান্না করতে চেয়েছিলাম!”
জায়দান ডাস্টবিনে সবকিছু ফেলে হাত ঝেড়ে আমার দিকে ফিরে তাকালো। তার সদা নির্বিকার চেহারায় এতটা নরম ভাব ফুটলো যে আমার বুকটা মায়ায় টইটুম্বুর হয়ে গেলো। সন্নিকটে সরে আমার কপালের পাশে লেগে থাকা আটা নিজের হাতের আঙুল ছুঁয়ে মুছে নিলো জায়দান। অতঃপর ঝুঁকে সেখানে নিজের ঠোঁট ছুঁয়ে ফিসফিস করল,
“আমার জন্য এই তুমিটাই যথেষ্ট।”
চোখ তুলে ওই বাদামী সমুদ্রমাঝে ডুবে গেলাম যেন। জায়দান দু হাতের আজলায় আমার মুখটি তুলে আপাদমস্তক খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলো। অজান্তেই নিজের ওড়নার খুঁট পেঁচিয়ে ফেললাম আঙুলের মাঝে। গালজোড়া লালচে হয়ে উঠল। এই বান্দা কি বুঝতে পেরেছে আমি শুধুমাত্র তার জন্যই এই বিশেষ পোশাক পড়েছি?
“তোমাকে দেখেই আমার পেট ভরে গিয়েছে। খাবার খাওয়ার জায়গা কোথায়?”
দাঁতে ঠোঁট কামড়ে ধরলাম এমন মন্তব্যে। সলজ্জ দৃষ্টি মিলিয়ে বললাম,
“ইশ! আমি কি খাবার নাকি?”
জায়দানের ঠোঁট তীর্যক রেখায় ভাসলো। ঝুঁকে এসে আমার কানের লতিতে আলতো কামড় দিয়ে সে জানালো,
“ইফ ইউ ওয়ান্ট, আই ক্যান ইট ইউ, ইউ নো?”
কাঁপুনি খেলে গেলো সমস্ত শরীরে। ঝপাৎ করে জায়দানের কাঁধে চাপড় মারলাম। মৃদু শব্দ তুলে হাসলো সে। আমার কোমরে জড়িয়ে ফেললো নিজের দুবাহু। আমি ঘুরে দাঁড়াতেই নিজের বুকে টেনে নিলো সে আমায়। কাউন্টারে হাত রেখে আমি হতভাগা পোড়া পরোটাগুলো দেখিয়ে বললাম,
“পুড়ে গিয়েছে। আমার মনে হয় তুমি অর্ডার করলেই ভালো হবে।”
“উঁহু। আমি এগুলোই খাবো।”
“মানে কি?”
জায়দান হাত বাড়িয়ে পরোটা তুলে উপরের পোড়া অংশগুলো চেঁছে ফেলতে ফেলতে বললো,
“আমার বউ বিষ বানালেও তা অমৃত। বুঝেছ?”
হতবাক হয়ে জায়দানের দিকে তাকাতেই আমার নাকে নিজের নাক ঘষে সরে গেলো জায়দান।
“আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি। খাবারটা দিয়ে দাও টেবিলে।”
জায়দান সত্যিই নিজের কথা রাখলো। পোশাক বদলে ফ্রেশ হয়ে সে টেবিলে আসতে আসতে আমি সবকিছু সাজিয়ে ফেললাম। অবাক নয়নে দেখলাম, জায়দান সত্যিই আমার পুড়িয়ে ফেলা পরোটাগুলো খাচ্ছে। এর মধ্যে যে দুটো কোনমতে ভালো হয়েছে বলে চালিয়ে দেয়া যায়, সেই দুটোই সে আমার প্লেটে তুলে দিলো। হাভাতের মতন নিজের ভালো খাবার গিলতে গিলতে স্বামীর পোড়া পরোটা খাওয়া দেখলাম। লোকে বিশ্বাস করবেনা, আমার একটুও কষ্ট হলোনা! আপনি বাঁচলে বাপের নাম! আমি তাকে ওসব খেতে বলেছি? ওরে আহ্লাদ!
গৃহস্থালীর সময়টুকু স্বপ্নের মতন কাটতে কাটতে হঠাৎ ইন্টারকমে কল এলো। আমি টেবিল থেকে উঠে গিয়ে ফোন ধরলাম। রিসিপশন থেকে ফোন দেয়া হয়েছে। জায়দান দ্বিতীয় পরোটার টুকরো মুখে দিয়ে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালো। বললাম,
“নিচে নাকি মিসির এসেছে গেস্ট নিয়ে। অনুমতি চাইছে।”
“গেস্ট?”
“হুম।”
জায়দান এক মুহূর্ত চুপ থেকে শেষমেষ বলল,
“ওকে। আসতে দিতে বলো।”
কিছুক্ষণ বাদেই দরজায় কলিং বেল বাজলো। টিস্যুতে তৈলাক্ত হাত মুছে নিয়ে দ্রুত এগিয়ে গিয়ে দরজা খুলে দিলাম আমি। প্রথমেই ভেসে উঠলো মিসিরের উজ্জ্বল মুখটি। বিরাট হেসে পুলকিত হয়ে বলতে নিলাম,
“আরে মিসির তুম…”
মুখের কথা মুখেই আটকে গেলো আমার যখন দেখলাম মিসিরের সঙ্গে গেস্ট বলতে কে কে এসেছে।
তার ঠিক পিছনেই দাঁড়িয়ে আছেন জেসমিন এবং আরওয়া! আমার হতবিহ্বল চাহুনি খেয়াল করে মিসির দৃষ্টি নত করে নিলো। বিড়বিড় করে বললো,
“আ’ম সরি।”
সে কি বলতে চেয়েছে শোনার আগেই জেসমিন মিসিরকে সামনে থেকে সরিয়ে হনহন করে ভেতরে ঢুকে গেলেন। অফ হোয়াইট বর্ণের সাদা শাড়ী পরনে তাকে দেখতে লাগছে ঠিক নিজের নামের মতনই অভিজাত। চোখমুখ জুড়ে তীক্ষ্ণ সূচারু দৃষ্টি। সমস্ত বাসা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলেন তিনি। অতঃপর তার দৃষ্টি স্থির হলো টেবিলে বসে থাকা জায়দানের উপর। অবাক হয়ে খেয়াল করলাম, জায়দান একটুও নড়ছে না। বরং এখনো আগের মতোই বসে খাচ্ছে, যেন তার আশেপাশে এইমাত্র বিরাট কিছু ঘটে যায়নি! চোখ ঘুরিয়ে সে তাকায়নি অবধি।
“অন্য মানুষের জীবন তছনছ করে দিয়ে শান্তিতে গান্ডে পিন্ডে গেলা কেউ আমার বড় ছেলের থেকে শিখুক!”
বাঁকা হেসে বিষাক্ত কন্ঠে বলে উঠলেন জেসমিন। জায়দানের মাঝে কোনো হেলদোল দেখা গেলো না। অথচ আমার বুকের ভেতর বিরাট এক আতঙ্ক ভর করল। ওড়না সামলে দ্রুতপায়ে এগিয়ে গেলাম। দাঁড়ালাম জেসমিনের মুখোমুখি।
“ভুলে গিয়ে থাকলে আমি মনে করিয়ে দিতে চাই, যে এটা আরেফিন বাড়ি নয়, আমার স্বামীর বাসা। এই বাসার গন্ডির ভেতর দাঁড়িয়ে তাকে অপমান করতে চাইলে, আমি কিন্ত গুরুজন বলে কাউকে ছেড়ে কথা বলবো না, জানেন তো আপনি? জানেন না?”
জেসমিন নিজের তীব্র দৃষ্টি মেলালেন আমার সঙ্গে।
“স্বামী?”
“হ্যাঁ। আমার স্বামী!”
আত্মবিশ্বাস ঝরে পড়লো আমার কন্ঠে। দুহাতের মুঠো শক্ত হয়ে উঠেছে, নিজেকে নিয়ন্ত্রনে রেখে পর্যবেক্ষণ করছি আমি। জেসমিন আমার কথা শুনে অট্টহাসি হেসে উঠলেন। তারপর ঘুরে গিয়ে পিছনে দাঁড়ানো আরওয়ার কব্জি ধরে টেনে সামনে নিয়ে এসে হাসতে হাসতে বললেন,
“এই দেখো মা, তোমার কপাল দেখো! বিয়ের আগেই সতীন জুটে গিয়েছে!”
তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে জায়দানকে আড়চোখে দেখলেন তিনি। পরক্ষণে বিহ্বল আরওয়ার দিকে ফিরে বললেন,
“গুষ্টিগত সমস্যা, বুঝেছ? বাপের লিগেসি ধরে রাখতে হবে তো, নাকি? আফটার অল, অ্যাপল ডায নট ফল ফার ফ্রম দ্যা ট্রি!”
জায়দান প্রতিক্রিয়াহীন। তৃতীয় পরোটাটি আলুভাজির ঝোলে ভিজিয়ে মুখে পুরলো সে। নির্বিকার, পাথুরে অভিব্যক্তি। তার সহ্য হলো ঠিকই, কিন্তু আমার সহ্য হলনা এবার। কন্ঠস্বর হয়ে উঠলো রুক্ষ। তবে ক্রোধের উপর থেকে এবার নিয়ন্ত্রণ হারালাম না আমি। বরং, কন্ঠে এলো তেজ।
“আমি শেষ বারের মতন আপনাকে ভদ্রভাবে বলছি মিসেস জেসমিন শিকদার, অপমানের বদলে পাল্টা অপমানের আগে আমাদের বাসা থেকে বেরিয়ে যান। আর মিসির! তুমি এনাদের এখানে এনেছ কোন সাহসে? এতই যুদ্ধ দেখার শখ থাকলে টিভিতে ডাব্লিউ ডাব্লিউ ই চ্যাম্পিয়নশিপ দেখতে! বন্ধু হয়ে শত্রুর ভূমিকা পালন করতে লজ্জা লাগলো না?”
আমি মিসিরের দিকে এগোতে যাচ্ছিলাম কিন্তু হঠাৎ আমার বুকে হাত রেখে ঠেলে দিলেন জেসমিন। সামান্য দুলে পিছনে সরে আসতে বাধ্য হলাম। জেসমিনের দৃষ্টিতে আগুন ঝরে পড়লো,
“আমাদের এই বাসা থেকে বের করার তুই কে? কি তোর পরিচয়? স্বামী স্বামী বলে মুখে ফেনা তোলার আগে বল, তোর স্বামী হলো কবে ও? মিসিরকে কিসের লজ্জা শিখাচ্ছিস তুই? তোর লজ্জা আছে? অন্যের আংটি পড়ানো হবু স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও তারই বাসায় এসে ঘর বেঁধেছিস?”
“আপনি এবার বাড়াবাড়ি করছেন! এরপর যা হবে তার জন্য আমাকে দায় দেবেন না!”
গর্জে উঠলাম আমি। সঙ্গে সঙ্গে জেসমিন পাল্টা হুংকার তুলে বললেন,
“আমার উপর চিৎকার করার তুই কে, বেশ্যা? পরপুরুষের বাসায় এসে থাকিস, আবার বড় বড় কথা? কি? টাকা আসেনা আর পিৎজার ব্যবসায়? তাই আবার শরীরের ব্যবসায় নেমে গিয়েছিস? নিজের এক্সের নিচে এসে শুতেও বাঁধলো না, তাইনা? অবশ্য তোকে কি দোষ দেব? তোর জাতটাই তো এরকম! সংসার ভাঙা নাচনেওয়ালী!”
“মাইন্ড ইওর টাং হোয়েন ইউ স্পিক উইদ মাই ওয়াইফ!”
জায়দানের গুরুগম্ভীর জোরালো কন্ঠস্বর যেন বি*স্ফোরণ ঘটালো ভয়ানক এক অগ্নুৎপাতের। এতক্ষণ যাবৎ সম্পূর্ণ নির্বিকার থাকা মানবটি সহসাই সকলের মনোযোগ কেড়ে নিলো। ঝট করে ফিরে তাকালাম আমি।
জোরালো টানে সশব্দে চেয়ারখানি উল্টে পড়লো, টেবিল থেকে দন্ডায়মান হলো জায়দান। তীক্ষ্ণ দৃষ্টি স্থাপন করলো সে নিজের জন্মদাত্রীর উপর। এই দৃষ্টিতে কোনো সম্মান নেই, নেই কোনো মমত্ববোধ।
আমরা সকলে বাকরুদ্ধ হয়ে দেখলাম সদা নির্বিকার থাকা এক পুরুষকে। জেসমিন হতবাক হয়ে দেখলেন নিজের বড় সন্তানকে। পরমুহুর্তে ভ্রু কুঁচকে অবিশ্যম্ভাবী ক্রোধ নিয়ে গর্জে উঠলেন,
“কি বললে তুমি আমাকে?”
জায়দান এক পা অগ্রসর হলো, শীতল ভঙ্গিতে। দৃষ্টি সরালোনা নিজের। বরং আগের চাইতেও দ্বিগুণ উত্তাপ ঢেলে বললো,
“বলেছি, আমার স্ত্রীর সঙ্গে মুখ সামলে কথা বলবে!”
জেসমিন এক মুহুর্ত কোনো কথাই বলতে পারলেন না। পরক্ষণে বিষাক্ত এক হাসি ছড়িয়ে গেলো তার ঠোঁটজুড়ে।
“আমি তোমার জন্মদাত্রী মা হই!”
“সেই মা, যে মা আমাকে জন্মের পর আছাড় দিয়ে মে*রে ফেলতে চেয়েছিল।”
ঝুঁকে এলো জায়দান, জননীর জ্বলন্ত নয়নে নিজের বরফশীতল দৃষ্টি মিলিয়ে মৃদু গলায় বললো,
“জন্ম তো কুকুরেও দেয়। কিন্তু আফসোস, কুকুর মা হতে পারলেও আমার জন্মদাত্রী তা পারলোনা।”
_________চলবে_________

