#সমাপ্তির_ওপাড়ে
#জাবিন_ফোরকান
#পর্বসংখ্যা৪৩ (প্রথমাংশ)
ঠাস!
জোরালো এক শব্দ প্রতিধ্বনিত হলো অ্যাপার্টমেন্টের সমস্ত দেয়ালজুড়ে। প্রথমটায় কেউই বুঝে উঠতে পারলনা, মাত্রই কি ঘটে গিয়েছে। যখন বুঝলো, তখন মনে হলো বুঝি প্রত্যেকের পায়ে শিকড় গজিয়ে গিয়েছে।
জেসমিন নিজের বড় সন্তানকে সজোরে থাপ্পড় মেরেছেন। গুরুতর আঘাতে জায়দানের মুখটা একপাশে হেলে গিয়েছে, চশমাটা ছিটকে গিয়ে পড়েছে মেঝেতে। অথচ অভিব্যক্তি তার বড়ই শীতল, নির্বিকার, ফাঁপা। জেসমিনের কন্ঠ কাঁপলো ভীষণ ক্রোধের তাড়নায়,
“নিজের গর্ভধারিনী মা কে কুকুরের সাথে তুলনা করিস, এই তোর উচ্চশিক্ষা আর সুশীলতার নমুনা?”
নিস্তব্ধতা। সাবিন, আরওয়া, মিসির প্রত্যেকে আজ নিজেদের ভাষা হারিয়ে ফেলেছে। এই প্রাঙ্গণে আজ শব্দরা বিলীন হয়েছে ভীষণ আবেগের যুদ্ধের সামনে। মুখোমুখি মা এবং সন্তান! পৃথিবীর সবথেকে পবিত্র সম্পর্কের বাঁধনে বাঁধা দুটি সত্তা যখন একে অপরের বিপরীতে দাঁড়ায়, তখন তৃতীয় ব্যক্তির সাধ্য কি তাদের রুখে দেয়!
আঙ্গুল তুলে গর্জে উঠলেন জেসমিন,
“তোর জারজ বউকে একটা দুটো কথা বলেছি কি বলিনি, অমনি তোর গায়ে তেল ছিটকে পড়লো? তাহলে চিন্তা কর, তোর মতন একটা পাপের বীজকে নিজের পেটে নয় মাস দশ দিন ছয় ঘণ্টা সাতচল্লিশ মিনিট রাখতে আমার কেমন লেগেছিল?”
হাঁপিয়ে গেলেন জেসমিন, ভারী নিঃশ্বাস ফেলতে লাগলেন। তবুও আজ থামলেন না তিনি।
“আমি একদম সঠিক ছিলাম! আমার জীবন ধ্বংসের মূল কারণ তুই! তোকে পেটে ধরা তো আমার উচিত হয়নি! তোর মতন একটা জানোয়ারকে গর্ভে পালার শাস্তি ভোগ করছি এখন। আমি যদি কোনভাবে অতীতে পৌঁছাতে পারি, তাহলে সবার আগে কি করব জানিস? তুই পেটে থাকতেই অ্যাবোরশন করিয়ে ফেলে দেবো!”
“জেসমিন শিকদার!”
সকলে চুপ থাকলো। শুধু চুপ থাকতে পারলোনা সাবিন নামক বেয়াদব মেয়েটা। নিজের শ্বাশুড়ির মুখোমুখি গিয়ে দাঁড়ালো সে। চোখজুড়ে তার ভয়ানক আক্রোশ, অথচ শরীরজুড়ে তীব্র নিয়ন্ত্রণ। পুরাতন সাবিন এই মুহূর্তে কারো গায়ে হাত তুলতেও দ্বিতীয়বার চিন্তা করত না। অথচ এই সাবিন চিন্তা করে, ভীষণ রকমের চিন্তা! সেই চিন্তাই আজ রক্ষা করল জেসমিনকে।
“আপনি কি আদৌ মানুষ? কোন মাটিতে গড়া হয়েছে আপনাকে সত্যি করে বলুন তো?”
হাহাকার করে উঠল সাবিন রীতিমত। পিছনে দন্ডায়মান জায়দান ভীষণ নির্বিকার। চাবি দেয়া কাঠপুতুলের মতন মেঝেতে হাঁটু গেঁড়ে বসে অত্যন্ত শান্তি ভঙ্গিতে সে চশমাখানি তুলে নিলো। খেয়াল করলো, চশমার লেন্স ভেঙে গিয়েছে। ওই ভাঙা চশমাই নীরবে সে চোখে পড়ল। সাবিন লালচে চোখে আর্তনাদ মেখে বলে উঠলো,
“আপনি আজ আমার মতন বেয়াদবকেও বাকরুদ্ধ করে দিয়েছেন, জেসমিন শিকদার! পাখিরা মাঝে মাঝে নিজের পাড়া ডিম নিজেই খেয়ে নেয়। আরে, ওরা তো অবুঝ জন্তু! আল্লাহ তায়ালা ওদের আমার আপনার মতন মস্তিষ্ক নামক শক্তিশালী অস্ত্র দেননি। ওরা ক্ষুধায় কাতর হয়ে নিজের সন্তানকে ভক্ষণ করে। আপনার কিসের তাড়না? কিসের এত ক্ষুধা? আপনি না আশরাফুল মাখলুকাত? পাখি হতে চাইছেন কেন? নিজের সন্তানকে পাপের বীজ, জানোয়ার বলার আগে একটাবার বিবেককে জিজ্ঞেস করে দেখুন, আসল জানোয়ারটা কে?”
সাবিনের চোখজোড়া ঝাপসা হয়ে এলো কথাগুলো বলার সময়। শরীর কাঁপলো। এমন একটা বোবা অনুভূতি, ভোঁতা যন্ত্রণা কখনো হয়নি তার। জায়দান কিভাবে সহ্য করছে এই ব্যথা?
“তুই আমার সম্পর্কে কতটুকু জানিস?”
জেসমিনের তেজস্বী কন্ঠস্বর হঠাৎ করেই গম্ভীরতা ধারণ করলো। সাবিন জায়দানের দিকে এগোতে প্রস্তুতি নিলেও মাঝপথে থমকে গেলো। জেসমিনের মুখজুড়ে নেমে এসেছে গাঢ় কালো ছায়া।
“তোরা কে কি জানিস আমার সম্পর্কে, বল? তোরা সবাই শুধু বিচার করতে জানিস। অন্তর পড়ার ক্ষমতা থাকলে হয়ত আমার সামনে দাঁড়ানোর আগে কয়েকশো বার চিন্তা করতি।”
ঢোক গিললেন জেসমিন, তার গলা কম্পিত হলো যখন তিনি বলতে শুরু করলেন,
“আমাকে দেখলে কি মনে হয়? আমার সব আছে তাইনা? স্বামী, সন্তান, ধন, দৌলত সবকিছু। কোনোকিছুর অভাব নেই। অথচ দিনশেষে হিসাব কষতে বসলে দেখি, এই নারীর জীবনে প্রাপ্তির খাতা আজও শূণ্য পরে আছে।”
গাঢ় নিস্তব্ধতা ভর করল সমস্ত ঘরজুড়ে। আজ প্রতিটি চরিত্র যেন একে অপরকে নিজেদের নতুন রূপে চমকে দেয়ার প্রতিযোগিতায় নেমেছে। জেসমিনের প্রতিটি শব্দ ধ্বনিত হচ্ছে সকলের অন্তরজুড়ে,
“বিয়ে হয়েছিল আমার বড় ঘরে। তা হওয়ারই ছিল। বিয়ে, পরিবার, স্বামী, সন্তান, সংসার নিয়ে কত্ত স্বপ্ন বোনা থাকে একজন নারীর! নিজের সকল শখ, স্বপ্ন, ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা বিসর্জন দিয়েছিলাম আমি একটা সুখের সংসারের জন্য। অথচ কী পেয়েছি তোরা বলতে পারিস? স্বামীর অবহেলা। হ্যাঁ, আমার স্বামী কোনো মানুষ ছিল না, সে ছিল একটা টাকা কামানোর মেশিন। এখনো সে তাই রয়ে গিয়েছে। সে মনে করত, আলিশান বাড়িতে বস্তা বস্তা টাকা ঢোকাতে পারলেই শান্তি আপনা আপনি হেঁটে চলে আসে। একটা মেয়ে বিয়ের পর কি চায়? তুই বল সাবিন, তুই কি চাস নি নিজের স্বামীর উপস্থিতি? তোর সব বিশেষ মুহূর্তে তার পদচারণা? দুপুরে, রাতে একবেলা দুবেলা একসাথে বসে খাবি। তোর মুখে খাবার তুলে দেবে সে আদর করে। রাতে চায়ের কাপ নিয়ে বসবে বারান্দায়। দুজনে গল্প করবি, ভবিষ্যতের স্বপ্ন বুনবি। সারাদিন কাজের শেষে তোর স্বামী শান্তির নীড়ে ফেরার জন্য উদগ্রীব হয়ে থাকবে, বাসায় ফেরার সময় হাতে করে একটা ফুল নয়ত চকলেট নিয়ে আসবে তোর জন্য। তুই যখন প্রথমবার গর্ভধারণ করবি, তাকে জানাবি, সে অশ্রুসিক্ত হয়ে তোকে আগলে নিয়ে জানাবে সে কতটা খুশি হয়েছে! আমি কি খুব বেশি কিছু চেয়ে ফেলেছিলাম, সাবিন?”
নীরবতা। কেউ কারো দিকে তাকিয়ে থাকতে পারছেনা। জেসমিন দৃষ্টি মেলালেন নিজের বড় সন্তানের দিকে। যে নির্লিপ্তভাবে অদূরে জানালার দিকে চেয়ে রয়েছে। ভাঙা চশমার ওপাশে জ্বলজ্বল করছে বাদামী জহরতজোড়া।
“আমার স্বাভাবিক চাহিদাগুলোর বিপরীতে কি পেয়েছি জানিস তোরা? ফাঁকা বিছানা, ঠান্ডা ঘর, স্বামীহীন সংসার। দিনের পর দিন আমি নিজেকে মানিয়ে নিয়েছি, উনি খুবই ব্যস্ত মানুষ, কত দিক তাকে সামলাতে হয়! তিনি সব দিক সামলেছেন ঠিকই, শুধু নিজের সংসারটাই অবহেলায় পড়েছিল। ভূতের মতন বসবাস ছিল আমার। এই ভূতের জীবনে অমাবস্যার মতন কদাচিৎ দেখা দিত আমার স্বামী, বোঝাতে আসত সে বেঁচে আছে! আমার হাজারটা ফোনের বিপরীতে উত্তর আসতো, আমি বিজি আছি। পরে তো সেটুকু উত্তর আসাও বন্ধ হয়ে গেলো! প্রেগন্যান্সি! একটা মেয়ের জীবনের কত্ত বিশাল টার্নিং পয়েন্ট। অথচ এই সময়েই আমার স্বামী, আমার সবথেকে বিশ্বস্তভাজন মানুষটা আমায় সবচেয়ে বড় ধোঁকাটা দিলো! আমার কি দোষ ছিলো তোরা বলতে পারিস?”
নির্বাকতা। আরওয়া পেছাতে পেছাতে মিসিরের পাশাপাশি গিয়ে দাঁড়িয়েছে। সে সহ্য করতে পারছেনা আর এমন দূর্বিষহ বহিঃপ্রকাশ। সাবিন নিটল, নিশ্চল। জায়দান পাথুরে, নির্বিকার। জেসমিনের চোখ ছলছল করছে, তিনি শাড়ির আঁচল তুলে চোখজোড়া মুছে নিয়ে বললেন,
“সবকিছু আমারই দোষ। আমারই উচিত হয়নি সংসারের মতন একটা বিশাল স্বপ্ন দেখা! আমারই উচিত হয়নি একটা সন্তান জন্ম দেয়া! যেসব ব্যাপার উচিত হয়নি, তাই শুধরে নিচ্ছি আমি।”
পুনরায় কর্কশ হয়ে উঠলো জেসমিনের গলা। তীব্র দৃষ্টিতে তাকালেন তিনি বড় সন্তানের দিকে। ভয়ানক ক্রোধান্বিত কন্ঠে ঘোষণা করলেন,
“সমাজের বিষ তোর মতন ছেলেরাই, বুঝেছিস জায়দান আরেফিন? যারা বউয়ের কানপড়ায় নিজের শেকড় উপড়ে ফেলতে দ্বিধা করেনা! কে বাবা, কে মা? দরকার আছে তখন? জন্মের ঋণ শোধ করার মুরোদ না থাকলে হবে কি? তাদের থাকে দেমাগ, উচ্চাকাঙ্ক্ষা আর ভবিষ্যতের চিন্তা। নিজের বউয়ের সংসার গড়তে তারা জন্মদাতার সংসার ভাঙতে পারে! মেরুদণ্ডহীন! আমার বাড়িতে আমি বেঁচে থাকাকালীন এসব সহ্য করা হবেনা। তাই আজ তোকে আমি পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দিচ্ছি। আরেফিন বাড়ির বড় বউ হবে, কেবল এবং একমাত্র আরওয়া এহসান। এটা আমার হুকুম! আর আমার হুকুমের অমান্যতা হলে, আরেফিন বাড়ির ইতিহাস থেকে তোর নাম ও নিশান মুছে যাবে। কেউ কোনোদিন জানবেও না, আমার একটা নয়, দুটো ছেলে ছিল!”
“তোমার দুজন ছেলে ছিল কবে, আম্মু?”
কন্ঠস্বরটি এতটা ম্রিয়মাণ শোনালো যে বাকিদের বুঝতে খানিক বেগ পোহাতে হলো। সুদীর্ঘ অবয়বে শিরদাঁড়া টানটান করে দাঁড়িয়ে থাকলেও জায়দানকে দেখাচ্ছে জীবন যুদ্ধে পরাজিত এক সৈনিকের মতন। আস্তে করে মাথা ঘুরিয়ে সে নিজের মায়ের দিকে তাকালো। মন্থর এক প্রাণহীন কন্ঠে শুধালো,
“তুমি নিশ্চিত, তোমার সন্তান একজন নয়?”
“মাম্মি!”
একটা ডাক চিরে ফেললো চারপাশ। আবেগে মোড়া দৃশ্যপটে হঠাৎ করেই আগমন ঘটল দুই উদ্ভ্রান্ত সত্তার। হালকা চাপানো দরজা দিয়ে ছুটে ভেতরে প্রবেশ করলো আয়দান। তার অনুসরণে হনহন করে রীতিমত তেড়ে আসা জাফর। কিছুক্ষণ আগেই মিসিরের কাছ থেকে জেসমিনের জায়দানের কাছে আসার খবর পেয়েছেন তিনি। পিতৃহৃদয়ের বুঝতে কিছুই বাকি থাকেনি। প্রথমবারের মতন নিজের কোম্পানির কাজ উপেক্ষা করে ছুটে এসেছেন তিনি যত দ্রুত সম্ভব। তাকে একা আসতে দেয়নি কনিষ্ঠ পুত্র।
ভেতরে ঢুকেই হিমশীতল পরিস্থিতি খেয়াল করে থমকে গেলো আয়দান। ডাগর ডাগর বাদামী চোখ মেলে সে প্রথমে দেখলো জননীকে। পরবর্তীতে প্রশ্নবোধক চোখে তাকালো চারদিকে। একটি ঢোক গিলে অবুঝের মতন এগোলো জেসমিনের দিকে। কাঁধে হাত জড়িয়ে নরম গলায় বলল,
“তুমি এখানে কেনো এসেছ, মাম্মি?”
সূক্ষ্মতম এক তীর্যক হাসির প্রস্ফুটন ঘটলো জায়দানের ঠোঁটজুড়ে। যেন তার তোলা সকল প্রশ্নের উত্তর ওই একটি দৃশ্যমাঝেই ফুটে উঠেছে।
“জেসমিন। আমি তোমাকে কতবার বারণ করেছি রাগের মাথায় কোনোকিছু না করতে! তোমার শরীর ভালো নেই, তারপরও তুমি অবাধ্য কেন হয়েছ? যা করেছ, অনেক করেছ। এবার বাড়িতে চলো।”
এগোলেন জাফর। নিজের স্ত্রীর বাহু ধরে তাকে সরিয়ে নিতে চাইলেন। তবে একচুল নড়লেন না জেসমিন। এমনকি অতি সাধের ছোট ছেলের দিকেও একটাবার তাকালেন না। তার জ্বলজ্বলে প্রসারিত দৃষ্টি নিবদ্ধ বড় ছেলের অবয়বে। যে অত্যন্ত শান্ত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে।
“কিছু মানুষ মনে করে, তার জন্ম দেয়া সন্তান তার নিজস্ব প্রপার্টি। তাকে যখন ইচ্ছা যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে ব্যবহার করা যাবে। এটা সন্তানের উপর বাবা মায়ের জন্ম দেয়া ঋণ!”
জায়দান বলতে শুরু করলো। অত্যন্ত ধীর পায়ে একটু একটু করে সে এগিয়ে এলো সামনে।
“সন্তানকে যখন ইচ্ছা দুটো থাপ্পড় লাগিয়ে দেয়া যায়। যখন ইচ্ছা তাকে মানসিকভাবে টর্চার করা যায়। যখন ইচ্ছা তাকে চাকরের থেকেও অধম মনে করা যায়। যখন ইচ্ছা তার জীবনে এসে সবকিছু তছনছ করে দিয়ে কিছুই হয়নি এমন ভঙ্গিতে হেঁটে চলে যাওয়া যায়! কারণ…সে সন্তান! জন্ম দেয়া সন্তান! সন্তান নামের বাপের সম্পত্তি!”
অন্তিম বাক্যে এতটা জোর পড়লো যে বুক কেঁপে উঠলো সকলের। নির্বাকতার চূড়ান্ত সীমা আজ পেরিয়ে গিয়েছে। জায়দান জেসমিনের কয়েক হাত দূরে এসে থামলো। ভাঙা চশমার ভেতর থেকে নিগূঢ় দৃষ্টিতে দেখলো নিজের জন্মদাত্রীকে।
“একটা সুখের সংসারের স্বপ্ন তো আমিও বুনেছিলাম আম্মু। সাজানো গোছানো একটা সংসার, বাবা, মা, ভাই, স্ত্রী সকলকে নিয়ে একটা পরিপূর্ণ পরিবার। আমিও কি তা পেয়েছি? তোমার প্রাপ্তির খাতায় নাহয় শূণ্য আছে। আমার প্রাপ্তির খাতার পৃষ্ঠাগুলোও যে ছিঁড়ে গিয়েছে!”
বুকের ভেতরটা ঝরঝর করে ভেঙে আসার মতন দমবন্ধকর এক অনুভূতি হলো সকলেরই। অথচ, কেউই বুঝল না, অপর মানুষগুলো একই অনুভব করলো কিনা। জায়দান চুলে আঙুল চালিয়ে এলোমেলো করে ফেললো নিজের সকল পরিপাটি মনোভাব।
“৩২ টা বছর আমি একটা মিথ্যা স্বপ্নকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থেকেছি। আমার ধ্যান-জ্ঞান, রন্ধ্রে রন্ধ্রে শুধু তুমি ছিলে আম্মু। আমি তোমার একজন সন্তান হতে চেয়েছিলাম। আমি তোমার কাছে জায়দান নয়, আয়দান হতে চেয়েছিলাম। তোমার মনে আছে আম্মু? তুমি একদিন আমাকে বলেছিলে, যতদিন আমি চুপ থাকব, ততদিন নাকি তুমি আমায় ভালোবাসবে? আমি ৩২ টা বছর চুপ থাকলাম। কই? তুমি তো আমাকে ভালোবাসলে না!”
মিসিরের পাশে দাঁড়ানো আরওয়া কথাগুলো আর সহ্য করতে পারলোনা। সে এসেছিল, তবে জায়দানের অধিকার আদায়ে নয়, ভিন্ন একটি কারণে। অথচ নিজেকে প্রকাশ করবে কি? পারিবারিক ঝামেলার মাঝে এত বড় এক উদঘাটন তাকে অভ্যন্তর থেকে সম্পূর্ণ নাড়িয়ে দিয়েছে। বুঝে ওঠার আগেই অশ্রুপাত ঘটেছে তার। অজান্তেই মিসিরের হাত চেপে ধরে ফেলল সে, মিসির তাকে সরিয়ে দিলোনা। বরং দাঁড়ালো এক ঢালস্বরূপ। চোখের মাঝে ছেলেটার দারুন শোকের ছায়া। বন্ধুর কষ্টে জর্জরিত মিসিরের নিজের হৃদয়ও।
জায়দান আজ থেমে নেই। এক দু শব্দে বাক্য শেষ করা পটু তুখোড় বুদ্ধিমান প্রফেসরও বুঝি হার মেনেছে বুকের ভেতর চেপে রাখা পর্বতপ্রমাণ কষ্টের সামনে। সে নিবিড় কন্ঠে বলে যাচ্ছে,
“ছোটবেলা থেকেই আমি একটু অন্যরকম। আমি জানতাম, আমি আর পাঁচজন ছেলেমেয়ের মতন না। আমার হাসতে, খেলতে, অনুভূতি বুঝতে সময় লাগতো। সমবয়সীদের ভিড়ে নিজেকে বুড়ো মনে হতো কারণ আমি একটু বেশীই বুঝতে পারতাম। টিচার এক বললে দশ বুঝে যাওয়া এই আমিটাকে কেউ সহ্য করতে পারতোনা, কারণ আমার জন্য তাদের পড়ালেখার চাপ বেড়ে যেতো। শুধু একটা মিসিরই ছিল আমার সঙ্গী। কিভাবে আমার সঙ্গে জুড়েছে সেটা ওই ছেলেটাই জানি, আমি সূত্র দিয়ে আজও মিলাতে পারিনি। ভাবতাম, বুঝি আমার এই অপারগতাই আমাকে আমার আম্মুর ভালোবাসা থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে। আমি হাসতে পারিনা, অনুভূতি বুঝি না, এই কারণে আম্মু আমাকে ভালোবাসে না। তোমার ভালোবাসার জন্য আমি কি না করেছি আম্মু? আয়দানের অ্যাক্সিডেন্টকে সবাই দোষী ভাবলেও আমি বলি, সেটা শুধু তোমার বুকের নিভু নিভু আগুনকে জ্বালিয়ে দিয়েছে। তুমি এর আরো আগে থেকেই আমায় দেখতে পারতে না। কেনো আম্মু? বিশ্বাস করো, আমি জগতের কোনো অনুভূতি না বুঝলেও শুধু তোমাকে ভালোবাসার অনুভূতি বুঝতাম। সেটা তো জন্মগত! তুমি তো আমার মা, জন্মদাত্রী, গর্ভধারিনী! আমার শরীরে যতটা না আব্বুর র*ক্ত, ঠিক ততটাই তোমার র*ক্ত। তাই যতটা না দোষ তোমার, ঠিক ততটাই আব্বুরও!”
পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটলো একেবারে অতর্কিতে। জায়দানের প্রশান্ত চেহারা হঠাৎ করেই বদলে গেলো। তাতে ভর করল সুতীব্র আক্রোশ। কেউ কিছু বুঝতে পারার আগেই একপাশের ডাইন ইন টেবিলটা প্রচন্ড জোরে ঠেলে মেঝেতে ফেলে দিলো সে। ঝনঝন করে আছড়ে পড়ল সবকিছু। ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে গেলো চারপাশে। লাফিয়ে উঠলো প্রত্যেকে, ছিটকে সরে গেলো দূরে। ভাংচুরের ধ্বংসযজ্ঞের আওয়াজকেও ছাপিয়ে গেলো জায়দানের হিংস্র পশুর ন্যায় তোলা গর্জন!
“দোষ হলো জাফর আরেফিনের মতন লম্পট পুরুষগুলোর! যারা নারীদেহের লোভে একটা গোটা সুখের সংসারকে ভেঙে খানখান করে দিতে চিন্তা করেনা! যাদের জন্য গোটা পুরুষজাতি লজ্জায় স্ত্রীজাতির সামনে মাথা তুলতে পারেনা! যাদের পাপের শাস্তি ভোগ করতে হয় তার সন্তানদের! পুরুষের অহংকার, পুরুষের মনের পর্দা, পুরুষের গৌরব তাদের চাহিদার সামনে ভূলুণ্ঠিত হয়! কে দিয়েছে এই অধিকার জাফরদের? তারা নিজেরা কেন মরেনা? তিলতিল করে মারে তার আশেপাশের মানুষদের!”
ঝট করে ঘুরল জায়দান। তার মুখটা হয়ে উঠেছে টকটকে লাল। একপাশের গালে দগদগে ঘা হয়ে জ্বলছে জেসমিনের দেয়ার চড়ের চিহ্ন। সরাসরি জাফরের দিকে তাকালো পৈশাচিক হয়ে ওঠা বাদামী চোখজোড়া। কেঁপে উঠলেন জাফর। মনে হলো, বড় সন্তান নয়, সামনে দন্ডায়মান কোনো র*ক্তখেকো দানব। চিৎকার করে উঠলো জায়দান, হাতের আশেপাশে যা কিছু পেলো তার সবগুলো আছাড় দিতে দিতে বললো,
“কেনো আব্বু? কেনো করলে তুমি এমন? তুমি জানো না পিতা মাতার প্রভাব সন্তানের উপর এসে পড়ে? সেটা সওয়াব হোক, গুনাহ হোক কিংবা হোক পাপ! তোমার পাপের শাস্তি আমি কেন ভোগ করছি? তুমি তো দিব্যি ভালো আছো! তোমার সব আছে! পরিবার, প্রিয়জন। আমার কি রইলো? আমি কি পেলাম? আমার জীবন থেকে মা নামক আদরটাকে কেড়ে নিতে তোমার বুকে বাঁধলো না? আমি আসলেই তোমার সন্তান? নাকি আম্মুর বলা পাপের বীজ?”
“চুপ করো! চুপ করো জায়দান আল্লাহর দোহাই লাগে!”
জাফর কেঁদে ফেললেন। তার সমস্ত শরীর এমনভাবে কাঁপছে যে তিনি দাঁড়িয়ে থাকতে পারছেন না। হাঁটুতে মুখ গুঁজে ফেললেন তিনি। অথচ জায়দানের মাঝে একটুও পরোয়া হলোনা আজ। ঝট করে ফিরে তাকালো সে জেসমিনের দিকে। যাকে এই মুহূর্তে নিজের বুকে আগলে রাখার চেষ্টা করছে আয়দান। অথচ জননীর দৃষ্টি একবারের জন্যও সরছেনা বড় সন্তানের উপর থেকে।
“আম্মু! আমি তোমাকে কি করেছি আম্মু? শুধু আমি আব্বুর সন্তান, এটাই আমার অপরাধ? আমি আব্বুর মতন দেখতে এটা আমার দোষ? আমাকে তো আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন, আম্মু। যেমন করেছেন আয়দানকে। অথচ তুমি ওকে দেখলে, আমায় দেখলে না। সংসার পাওনি তুমি আব্বুর জন্য, সেই ঝাঁঝ তুমি আমার উপর মেটালে বছরের পর বছর ধরে! মানসিক সমস্যা? হ্যাঁ, মানসিক সমস্যা তোমার ছিল! কিসের সমস্যা জানো? আমার মধ্য দিয়ে তুমি আব্বুকে কষ্ট দিতে চাইতে! তুমি তাকে সরাসরি আঘাত করতে না পেরে আমার মধ্য দিয়ে করতে। তুমি বলো, আব্বু বলো, দুজনই নিজ নিজ জীবনের না পাওয়ার ঝাঁঝ মিটিয়েছ আমার উপর দিয়ে। কারণ আমি ছিলাম তোমাদের অবলা সন্তান। তোমাদের জন্ম দেয়ার ঋণে ঋণী। আমায় জন্ম দিয়ে তোমরা নিজেদের হতাশা নিবারণের পুতুল লাভ করেছিলে।”
তীব্র আক্রোশে সজোরে লাথি হাঁকিয়ে বসার ঘরের সোফা উল্টে ফেলে জায়দান চিৎকার দিয়ে উঠলো,
“আই অ্যাম আ হিউম্যান, নট ইওর ফাকিং পাঞ্চিং ব্যাগ!”
ভয় এবং আতঙ্কে কুঁকড়ে গেলো একেকজন। এগোনোর সাহস করলো শুধুমাত্র একজন, সেই বেয়াদব সাবিন। ছুটে গিয়ে স্বামীর বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ল সে। শক্তভাবে তাকে আঁকড়ে ধরে বুঝি শান্ত করতে চাইলো এক অশান্ত হয়ে ওঠা সমুদ্রকে। অতি কষ্টে কান্না নিবারণ করে সে উচ্চারণ করলো,
“শান্ত হও তুমি, তোমার প্রাপ্তির খাতা শূন্য নয়, তাতে আছি আমি। আ’ম হেয়ার মাই লাভ, আ’ম হেয়ার।”
জমে গেলো জায়দান। তখনো হাঁপাচ্ছে সে। ক্রোধের কারণে শিরা উপশিরা জেগে উঠেছে ঘাড়ের উপর, কপালের পাশজুড়ে। লম্বা দুখানা হাত দুপাশে কাঁপলো থরথর করে। চোখ বুঁজে নিলো সে। যেন মাত্র ফিরে এসেছে ঝড়ের চূড়ান্ত পর্যায় থেকে। সাবিনকে পাল্টা জড়িয়ে ধরতে পারলোনা সে। শুধু নুয়ে এসে মাথাটা রাখলো অর্ধাঙ্গিনীর কাঁধের উপর। টানলো গভীর প্রশ্বাস। অতঃপর যখন সে চোখ খুললো, তখন ঐ বাদামী দৃষ্টিজুড়ে টলটলে পানি। প্রথমবারের মতন সদা নির্লিপ্ত পর্বতের মাঝে অশ্রুঝর্ণার দেখা পেলো সকলে। অবিশ্বাস, বিস্ময়, অভূতপূর্ব— কোনো শব্দই দৃশ্যটিকে ব্যাখ্যা করতে যথেষ্ট নয়। সাবিনের কাঁধে মাথা রেখেই অশ্রুসজল চোখে অসহায় দৃষ্টিতে জেসমিনের দিকে তাকালো জায়দান। যখন তার চোখ পেরিয়ে গাল বেয়ে অশ্রু বিন্দু গড়াতে আরম্ভ করলো, তখন সে অস্ফুট স্বরে বললো,
“আমি তোমার জন্য আমার আত্মার অংশটাকেও উৎসর্গ করে দিয়েছিলাম, আমি সত্যিই তোমাকে খুব ভালোবেসেছিলাম আম্মু, অপ্রয়োজনীয় ভাবে বেশি!”
_________চলবে_________

